নেফার জানত বৃদ্ধ লোকটির জন্যে এখন তার আর কিছু করার নেই। সে ছায়াময় জগতের অনেক দূরে চলে গেছে, যেখানে পৌঁছানো নেফারের দ্বারা সম্ভব না এবং এই ধাঁধার ভয়ংকর জ্বালা-যন্ত্রণা সহ্য করতেও সে পারবে না যা এই বৃদ্ধ মনীষী সহ্য করছে। নিরবে সে উঠে দাঁড়াল। গুহার পিছন থেকে তীর ও ধনুক নিয়ে ঝুঁকে গুহার প্রবেশ দ্বার দিয়ে বাইরে বেড়িয়ে গেল। পাহাড়ের বিপরীতে সূর্য ততক্ষণে নিচে নেমে গেছে এবং দিগন্তের শেষে হলুদ বর্ণ ধারণ করেছে। সে পশ্চিমের বালিয়াড়ির উপর উঠে এলো এবং যখন সে শীর্ষে পৌঁছে উপত্যকার দিকে তাকাল তখন পাখিটা হারানো দুঃখ তার মনে এতোটাই প্রবল হল যে সে টাইটার কথা, তার আমন রা-এর ধাঁধার কথা ভুলে গেল এবং দৌড়াতে শুরু করল। যেন পালাতে চাইছে কোন ভয়ংকর শিকারীর হাত থেকে। তার পায়ের নিচে বালি হিসহিস শব্দ তুলল। অনুভব করল তার চোখের কোণে ভয়ের অশ্রু জমেছে এবং তার গাল বেয়ে গড়িয়ে তা বাতাসে শুকাতে লাগল। সে দৌড়াতেই লাগল যতোক্ষণ না ঘামে তার শরীর ভিজে উঠল ও সূর্য পটে অস্ত গেল। অবশেষে সে গেবেল নগরের দিকে ফিরতি পথ ধরল এবং শেষ কয়েক মাইল অন্ধকারে হাঁটল।
টাইটা তখনো আগুনের পাশে চাদরের নিচে কুঁকড়িয়ে ছিল, তবে এখন অনেকটা আরাম করে ঘুমাচ্ছে। নেফার তার পাশে গিয়ে শুয়ে পড়ল এবং শীঘ্রই ঘুমের অতলে হারিয়ে গেল যা স্বপ্ন দ্বারা অস্থির এবং দুঃস্বপ্ন দ্বারা তাড়িত ছিল।
যখন সে জাগল দেখল গুহার প্রবেশ মুখে উষা ঝলমল করছে। আর টাইটা আগুনের পাশে বসে হরিণের মাংস কয়লায় ঝলসাচ্ছিল। তাকে অসুস্থ ও বিবর্ণ দেখাল কিন্তু সে তার ব্রোঞ্জের ছুরির এক পাশে এক টুকরো মাংস গেঁথে নেফারের দিকে বাড়িয়ে দিল। হঠাৎ করে ক্ষিধেয় বালকটির পেট চনমন করে উঠল এবং সে দ্রুত উঠে বসে হাড্ডি থেকে মাংস খুলে খেতে লাগল। সুস্বাদু মাংসের তৃতীয় টুকরাটা যখন সে মুখে পুড়ছিল তখন সে প্রথম বারের মতো কথা বলল। তুমি কি দেখলে, টাইটা? সে জিজ্ঞেস করল।কেন গড বার্ড প্রত্যাখ্যান করল?
ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। টাইটা তাকে বলল এবং নেফার জানে নিশ্চয়ই ভবিষ্যদ্বাণীটা অশুভ তাই টাইটা তাকে বলতে চাইছে না।
তারপর কিছুক্ষণ তারা নীরবে খেল, তবে নেফার আর এখন খাবারে কোন মজা পেল না এবং অবশেষে সে নরম স্বরে বলল, তুমি তো ফাঁদগুলো মুক্ত করে দিয়েছ। তো কি ভাবে আমরা কাল জাল টানাবো?
গড বার্ড গেবেল নাগারে আর আসবে না। টাইটা সহজভাবে কথাটা বলল।
তাহলে কি আর আমি আমার পিতার স্থলে কখনো ফারাও হতে পারব না? নেফার জানতে চাইল।
নেফারের কণ্ঠে গভীর কষ্ট ছিল তাই টাইটা তার উত্তরটা নরম স্বরে দিল। তোমার পাখি আমরা তার নীড় থেকে তুলে আনবো।
কিন্তু আমরা তো জানি না গড বার্ডের বাসা কোথায়। নেফার তার খাওয়া থামিয়ে দিয়েছে। একটা করুণ আবেদন নিয়ে সে টাইটার দিকে তাকিয়ে রইল।
বৃদ্ধ লোকটি তার মাথা হ্যাঁ সূচক করে নাড়ল। বাসাটা কোথায় আমি জানি। এটা ধাঁধা থেকে পেয়েছি। কিন্তু তোমার শক্তি ধরে রাখার জন্য তোমাকে খেতে হবে। আগামীকাল প্রথম আলো ফোঁটার আগেই আমরা এই স্থান ত্যাগ করব। সেখানে পৌঁছতে অনেক সময় লাগবে।
বাসায় কি ছানা আছে?
হ্যাঁ, টাইটা বলল, বাজ পাখি বাচ্চা তুলেছে। বাচ্চাগুলো উড়ার জন্যে প্রায় প্রস্তুত। আমরা সেখান থেকে তোমার পাখিটা নেব। তারপর নীরবে সে নিজে নিজে বলল, অথবা প্রভু আমাদের জন্যে হয়তো অন্য আরো কোন রহস্য উন্মোচন করবেন।
*
ভোরের আগে অন্ধকার থাকতেই তারা পানির থলে ও ঘোড়ার পিঠের থলেগুলো পূর্ণ করে নিল। টাইটা রাস্তা দেখাল, তারা পাহাড়ের মুখের কিনারার দিয়ে সহজ রাস্তা বেছে নিল। এরই মধ্যে সূর্য দিগন্তের উপরে উঠে এসেছে। গেবেল নাগার তারা অনেক পিছনে ফেলে এল। যখন নেফার সামনে তাকাল সে অবাক হয়ে গেল। তাদের সামনে পাহাড়ের ক্ষীণ সীমারেখা, নীল দিগন্তের বিপরীতে আরেক নীল, এখনো এতো দূরে যে ওটাকে পৃথিবীর কোন পর্বত মনে না হয়ে কুয়াশাচ্ছন্ন বায়বীয় কোন বস্তু মনে হচ্ছে। নেফারের এমন অনুভূতি হল যেন সে পূর্বে এটা দেখেছে এবং সে বলল, ঐ পাহাড়টা। সে হাত তুলে নির্দেশ করল। ঐ পাহাড়ে যেখানে আমরা যাচ্ছি, তাই না টাইটা? সে এতোটাই নিশ্চিত হয়ে বলল যে টাইটা পিছন ফিরে তার দিকে তাকাল।
তুমি কিভাবে জানলে?
গতরাতে আমি এটা স্বপ্নে দেখলাম–নেফার উত্তর দিল।
টাইটা ঘুরে গেল যাতে বালকটি তার অভিব্যক্তি দেখতে না পারে। অবশেষে ভোরের আলোয় যেভাবে মরুভূমি প্রস্ফুটিত হয় সেভাবে তার মন খুলছে। কালো পর্দা যা ভবিষ্যৎকে আমাদের থেকে লুকিয়ে রাখে তার মধ্য দিয়ে উঁকি মারতে সে শিখছে। প্রাপ্তির এক গভীর আত্মতৃপ্তি টাইটা অনুভব করল। একশ বার সে হুরাসের নাম নিল, তার চেষ্টা বিফল হয়নি।
অর্থাৎ আমরা কোথায় যাচ্ছি তা আমি জানি, নেফার খুব জোর দিয়ে আবার বলল।
হ্যাঁ, অবশেষে টাইটা সম্মতি জানাল। আমার বার-আম-মাসারায় যাচ্ছি।
দিনের সবচাইতে উত্তপ্ত ভাগের পূর্বেই টাইটা একাসিয়া কণ্টক গাছের গভীর একটা ঝোঁপের পাশে আস্তানা গাঢ়ল যাদের শিকড় মাটির গভীরে পানির কাছাকাছি পর্যন্ত বিস্তৃত। যখন তারা ঘোড়ার পিঠ থেকে সবকিছু নামাল এবং তাদের পানি খাওয়াল, নেফার বনের চারপাশে চোখ বুলিয়ে নিল এবং মিনিটের মধ্যে সে অন্যদের চিহ্ন আবিষ্কার করল যারা এ স্থান দিয়ে চলে গেছে। উত্তেজিতভাবে সে টাইটাকে ডাকল এবং রথের ছোট ভাগের চাকার দাগ দেখাল, গুনে দেখল দশটা যান; সেই সাথে রান্নার ছাই এবং মসৃণ ভূমির চিহ্ন–যেখানে ঘোড়াগুলোকে একাসিয়ার গুঁড়ির সাথে বেঁধে তারা ঘুমিয়েছে, সব খুঁজে পেল।
