বাজপাখিটা যখন রেশমি জালের উপর এসে নামবে এবং ফাঁদে আটকা পড়বে সে সময়ের জন্য সে নিজেকে শক্ত করল। সে অনুভব করল পাশে থাকা টাইটাও একই কাজ করল। তারপর দুজনেই একসাথে সামনে দৌড়ে গেল। আর ঠিক তখন এমন কিছু একটা ঘটল যা সম্ভব হবে তা তার বিশ্বাস ছিল না। বাজপাখিটা পূর্ণবেগে নিচে নেমে এল, তার বেগ এতো ছিল যে পায়রাগুলোর নরম পালকের দেহ ছাড়া কোন কিছুই তাকে থামাতে পারত না। কিন্তু সমস্ত জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে বাজটা তার পথ পরিবর্তন করল এবং আকাশের নীলে একটা ছোট কালো বিন্দুর ন্যায় হারিয়ে গেল।
সে প্রত্যাখান করল! নেফার ফিস্ ফিস করে বলল। কেন, টাইটা কেন?
প্রভুদের মর্জি আমাদের বোঝার বাইরে। যদিও কয়েক ঘণ্টা ধরে সে স্থির হয়ে বসে ছিল। তারপর ঠিক একজন দৌড়বিদের মত শক্ত ভঙ্গিমায় টাইটা উঠে দাঁড়াল।
সে কি ফিরে আসবে না? নেফার জানতে চাইল। সে আমার পাখি। আমি তাকে আমার হৃদয়ে অনুভব করেছি। সে আমার পাখি। তাকে অবশ্যই ফিরতে হবে।
সে প্রভুর মাথার অংশ। টাইটা মৃদু স্বরে বলল। সে প্রকৃতির সাধারণ নিয়মের অধীন নয়।
কিন্তু সে কেন প্রত্যাখান করল? নিশ্চয়ই কোন কারণ আছে। নেফার জোর দিল। টাইটা তৎক্ষণাৎ কোন উত্তর দিল না। সে পায়রাগুলো মুক্ত করতে চলে গেল। এরই মধ্যে তাদের পালক আবার গজিয়েছে কিন্তু টাইটা তাদের মুক্ত করার পরও তারা উড়ে যাবার চেষ্টা করল না। একটা উড়ে এসে তার কাঁধে বসল। তারপর যখন টাইটা হাল্কাভাবে দুহাতে ধরে উড়িয়ে দিল তখনই ওটা পাহাড়ের দিকে উড়ে গেল।
সে ওটার উড়ে যাওয়া দেখল এবং তারপর ঘুরে গুহার প্রবেশ দ্বারে হেঁটে ফিরে এল। নেফার ধীরে ধীরে তাকে অনুসরণ করল। তার হৃদয় ও পা হতাশায় ভারি হয়ে গেছে। গুহার অন্ধকারে টাইটা পিছনের দেয়ালের পাথরটার উপর বসল এবং সামনের দিকে ঝুঁকে রইল যততক্ষণ না গাছের কণ্টক-ডাল ও ঘোড়ার শুকনো গোবর ধোয়া ছেড়ে আগুনে পরিণত হল। দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে নেফার তার বিপরীতে বসল।
দীর্ঘক্ষণ দুজন কোন কথা বলল না। বাজ পাখিটা হারানোর ব্যথা নেফারের হৃদয়ে এতোটাই গম্ভীর হয়ে বাজল যেন সে তার হাত আগুনে পুড়িয়ে ফেলেছে। সে জানত টাইটা তখনই কথা বলবে যখন সে প্রস্তুত হবে। অবশেষে টাইটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল এবং মৃদুভাবে বলল, আমাকে অবশ্যই আমন রা-এর ধাঁধা অনুশীলন করতে হবে।
নেফার চমকে উঠল, সে এটা আশা করেন নি। যতোদিন ধরে তারা এক সাথে আছে এর মধ্যে নেফার তাকে দুবার তা করতে দেখেছে। সে জানত এটা একটা ক্ষুদ্র মৃত্যুর মতই যা বৃদ্ধ লোকটি জীবনী শক্তি শোষণ করে নেবে। যখন আর কোন রাস্তা খোলা না থাকে তখন সে ঐ অতি প্রাকৃতিক পন্থা অবলম্বন করে।
নেফার চুপ করে রইল এবং ভয়ের সাথে দেখল যে টাইটা ধাঁধার জন্যে প্রস্তুতি নিতে যাচ্ছে। প্রথমে সে ঔষধি গাছগুলোকে পাত্রে নিয়ে পিষল এবং মাটির পাত্রে পরিমাপ করল। তারপর তামার কেটলি থেকে তার মধ্যে পানি ঢালল। বাষ্পসমূহ যা মেঘের কুন্ডলীর ন্যায় ওখান হতে উদ্গরিত হচ্ছিল তাতে এতো ঝাঁঝ ছিলো যে নেফারের চোখে পানি এসে গেল।
মিশ্রণটা ঠাণ্ডা হতেই টাইটা গুহার পিছনের লুকানো জায়গা থেকে ধাঁধার রাখার চামড়ার থলেটা নিয়ে এল। আগুনের পাশে বসে সে আইভরি পাতগুলোকে তার এক হাতে নিল ও আঙুল দিয়ে আলতোভাবে ঘষতে লাগল এবং সুর করে আমন রা-এর মন্ত্র পাঠ করে যেতে লাগল।
মন্ত্ৰসমূহ বা ধাঁধাগুলো দশটা আইভরি পাতের সমষ্টি যা টাইটা নিজে খোদাই করে তৈরি করেছে। প্রতিটি খোদাই করা চিহ্ন দশটি ক্ষমতার প্রতীক এবং ক্ষুদ্রতম শৈল্পিক প্রয়াস। মন্ত্রগুলো পড়ার সাথে সাথে সে পাতের খোদাই করা চিহ্নগুলোকে আঙুল বুলিয়ে স্পর্শ করে গেল। প্রতিটি স্তব পাঠ করার মাঝে সে পাতগুলাতে ফুঁ দিল যাতে তারা তার জীবনি শক্তি পায়। যখন ওগুলো তার শরীরের তাপ নিয়ে নিত, তখন সেগুলো সে নেফারকে দিত। এগুলো ধরে রাখ এবং এ থেকে দম নাও। সে বলল এবং নেফার তার নির্দেশমত কাজ করে যেতে লাগল। টাইটা সুর করে তার ঐন্দ্রজালিক স্তবগুলো পড়ে যেতে লাগল এবং তার সাথে তালে তালে দুলতে লাগলো। ধীরে ধীরে তার চোখ দুটোকে মনে হল বুঝি উজ্জ্বল হয়ে মনের কোন গুপ্ত জায়গা দেখল। যখন নেফার ধাঁধাগুলোকে দুই সারিতে সাজিয়ে তার সামনে রাখল, তখন সে এ পার্থিব জগৎ সম্পর্কে সম্পূর্ণ অচেতন।
তারপর টাইটা যেভাবে তাকে শিখিয়েছে সেভাবে সে মাটির পাত্রে রাখা মিশ্রণের তাপমাত্রাটা আঙুল দিয়ে পরখ করে দেখল। যখন একে যথেষ্ট ঠাণ্ডা মনে হল যা মুখ পুড়িয়ে দেবে না তখন নতজানু হয়ে সে বৃদ্ধ লোকটির সামনে বসল এবং দুই হাতে ধরে তাকে তা দিল।
টাইটা এর শেষ ফোঁটা পর্যন্ত পান করল এবং আগুনের আলোতে তার চেহারা আসোয়ানের খনির চকের ন্যায় সাদা দেখাল। অনেকক্ষণ মন্ত্র পাঠ করার পর ক্রমশ তার কণ্ঠ ফিফিসানির মত শোনাল এবং একসময় চুপ হয়ে গেল। তখন শুধু তার জোরে শ্বাস টানার শব্দ শুনা গেল। সে ওষুধ ও যাদুর মন্ত্রে বিভোর হল। সে গুহার মেঝেতে পড়ে গেল এবং আগুনের পাশে একটা ঘুমন্ত, বিড়ালের ন্যায় কুন্ডলী পাকিয়ে শুয়ে রইল। নিজের পশমি চাদর দিয়ে নেফার তখন তাকে ঢেকে দিল এবং তার পাশে বসে রইল যতক্ষণ না সে গোঙানো শুরু করল এবং তার চেহারা বেয়ে ঘাম মাটিতে ঝরে পড়ল।
