মানবিকতার এই একটু ছোঁয়া তার প্রতি নেফারের ভালোবাসাটা আরো বাড়িয়ে দিল যা তার বুকের মাঝে ব্যথা অনুভব জাগাল। তার ইচ্ছে হল যদি সে তা কোনভাবে প্রকাশ করতে পারত। কিন্তু সে জানে টাইটা তা বুঝতে পারে কারণ টাইটা সব জানে। টাইটার বাহু সে স্পর্শ করতে যাবে এমন সময় টাইটা জেগে উঠল। নেফার জানে যে টাইটা প্রকৃতপক্ষে ঘুমাচ্ছিল না, বরং তার সমস্ত শক্তি দিয়ে সে গড বার্ড কে ফাঁদে আনার চেষ্টা চালাচ্ছে। যে বুঝতে পারল যে তার এলোমেলো চিন্তা ও চলাফেরা বৃদ্ধ লোকটির কাজে কোন না কোনভাবে সমস্যা করছে, কারণ একটা বিরক্তির ভাব টাইটার মুখে দেখা গেল যা স্পষ্টত: বিষয়টা বুঝিয়ে দিল।
টাইটা যেভাবে তাকে শিখিয়েছে সেভাবে সে লম্বা দম নিয়ে নিজের দেহ ও মনের উপর নিয়ন্ত্রণ নিল। ব্যাপারটা এমন যেন কোন গোপন রাস্তা দিয়ে শক্তির : স্তরে পৌঁছানো। কোন কিছু বোঝার আগেই সময় দ্রুত চলে যাচ্ছিল। সূর্যটা তার সর্বোচ্চ উচ্চতায় পৌঁছে গেল এবং মনে হল যেন দীর্ঘক্ষণ ওটা সেখানে অবস্থান করল। হঠাৎ করে, নেফারের মাঝে একটা অতিন্দ্রিয় ক্ষমতা ভর করল। তার মনে হল যেন সে পৃথিবীর উপর শূন্যে ঝুলে আছে এবং নিচে যা ঘটছে তার সবকিছু সে দেখতে পাচ্ছে। সে দেখল টাইটা ও সে গেবেল নাগারের একটা কূপের পাশে বসে আছে এবং তাদের পাশে মরুভূমিটা প্রসারিত হয়ে গেল। সে নদীটা দেখল যেটা মরুভূমিকে এটা বিশাল বাধের ন্যায় ধারণ করে আছে এবং যা মিশরের সীমা নির্দেশ করছে। সে শহর, রাজ্য, ভূমি যা দ্বৈত মুকুট দ্বারা বিভক্ত, সৈন্যবাহিনী, দুষ্টু মানুষের অপকর্ম এবং ন্যায় ও সৎ লোকের কষ্ট এবং আত্মত্যাগ দেখল। মুহূর্তেই সে তার গন্তব্য সম্পর্কে সচেতন হল যা তাকে প্রায় আচ্ছন্ন করে ফেলল ও সাহস জোগাল। একই সাথে সে জানল যে আজ তার গড়-বার্ড আসবে। কারণ এখন অবশেষে সে তা গ্রহণ করার জন্য প্রস্তুত। পাখিটা এখানে!
শব্দগুলো এতো স্পষ্ট ছিল যে মুহূর্তের জন্যে নেফারের মনে হল টাইটা কথাটা বলছে, কিন্তু সে লক্ষ্য করে দেখল তার ঠোঁট নড়ছে না, টাইটা অলৌকিকভাবে চিন্তাটা নেফারের মনে ঢুকিয়ে দিয়েছে। এটা যে তারই সে ব্যাপারে সে নিশ্চিত, আর একটু পরেই ফাঁদের পায়রাগুলো দিয়ে তা নিশ্চিত হল।
সে যে শুনেছে এবং বুঝতে পেরেছে তার কোন কিছুই নেফার প্রকাশ করল। সে মাথা ঘুরিয়ে দেখল না কিংবা আকাশের দিকে চোখও তুলল না। সে উপরে তাকানোর সাহস দেখাল না কারণ এতে করে পাখিটা সচেতন হয়ে যেতে পারে অথবা টাইটা রাগান্বিত হতে পারে। কিন্তু সে তার অস্তিত্বের পুরোটা অনুভব করতে পারল।
রাজকীয় বাজপাখি এমন একটা দুর্লভ প্রাণী যাকে খুব কম লোকই মুক্ত ও বন্য অবস্থায় দেখতে পেয়েছে। পেছনের হাজার বছর ধরে প্রত্যেক ফারাও-এর শিকারীরা পাখিগুলোকে খুঁজেছে, ফাঁদ পেতেছে এবং রাজত্বকে পূর্ণ করার জন্যে উড়তে শেখার আগেই ছোট ছানাদের তাদের বাসা থেকে নিয়ে এসেছে। এই পাখি অধিকারে থাকার অর্থ হচ্ছে, ফারাও-এর মিশরে রাজত্ব করার প্রতি প্রভু হুরাসের অনুমতি রয়েছে।
বাজ পাখি প্রভুর আরেক রূপ, বাজ পাখির মাথা দ্বারা তিনি তার প্রতিচ্ছবি প্রকাশ করেন। ফারাও নিজেই একজন প্রভু তাই সে এটা ধরতে পারেন, জয় করতে পারেন এবং শিকার করতে পারেন কিন্তু অন্য কেউ করলে নির্ঘাত মৃত্যু।
এখন পাখিটা এখানে। তার একান্ত নিজের পাখি। টাইটা এটা স্বর্গ থেকে নামিয়ে এনেছে। উত্তেজনায় নেফারের দম বন্ধ হয়ে যাবার অবস্থা হল এবং ফুসফুসে বাতাসটা মনে হচ্ছে বুক ফেটে বেড়িয়ে যাবে। কিন্তু তবুও সে উপরে তাকানোর সাহস করল না।
সে বাজ পাখিটার আওয়াজ শুনল। এটার চিৎকার একটা তীক্ষ্ণ আর্তনাদ মনে হল, যা আকাশ ও মরুভূমির অসীমত্বে হারিয়ে গেল। কিন্তু এটা নেফারের অন্তরে শিহরণে সৃষ্টি করল যেন প্রভু সরাসরি তার সাথে কথা বলছেন। মাথার ঠিক উপরে পাখিটা যখন দ্বিতীয় বার ডাকল এটার কণ্ঠ আরো কম্পিত ও বন্য শোনাল।
পায়রাগুলো ভয়ে বন্য হয়ে উঠল, জালের নিচে লাফালাফি করতে লাগল। এমনভাবে পাখা ঝাঁপটাতে লাগল যে তাদের থেকে পালক খসে পড়তে লাগল এবং তাদের চারপাশে বিবর্ণ ধুলার মেঘ সৃষ্টি হল।
মাথার অনেক উপরে নেফার শুনল বাজপাখিটা ফাঁদের দিকে নামতে শুরু করেছে এবং বাতাস তার ডানায় ঊর্ধ্বমুখী গান গাইতে লাগল। অবশেষে নেফার মাথা তুলল এবং নিরাপদ মনে করে ওটার দিকে তাকাল। কারণ সে জানত যে সব বাজ পাখির ধ্যান তার শিকারের দিকেই থাকে।
সে উপরের দিকে তাকাল এবং দেখল যে পাখিটা মরুর নীল আকাশ থেকে নেমে আসছে। একটা স্বর্গীয় সৌন্দর্য! একটা অর্ধবাহিরকৃত তলোয়ারের ন্যায় পাখিটার পাখা অর্ধ-গুটানো এবং মাথা সামনের দিকে ঝুঁকে আছে। এর শক্তি ও ক্ষমতা নেফারকে জোরে আওয়াজ করতে বাধ্য করল। সে তার বাবার কাছে একটা বাজপাখি দেখেছে, তবে এটার মতন আগে কখনও দেখেনি–এটা যেমন বন্য তেমনি রাজকীয়। সে যেখানে বসে আছে সেদিকে যখন পাখিটা নেমে আসছিল তখন মনে হল যেন অলৌলিকভাবে বাজপাখিটার আকার বড় হল এবং এটার রং গাঢ় হল।
বাঁকানো ঠোঁটের চঞ্চুটা তীক্ষ্ণ ও গাঢ় হলুদ বর্ণের এবং দেখতে আগ্নেয় শিলার মত কালো। চোখগুলো হিংস্র এবং ভেতরের কোনায় কান্নার মতো সোনালি রঙের দাগ, গলাটা ক্রীম রঙের ও আরমাইনের ন্যায় ছোপ-ছোপ। ডানাগুলো কর্পিল ও কালো। প্রতিটি অংশের সমষ্টিতে প্রাণীটা এমন এক অপরূপ সৃষ্টি যে এটা যে প্রভুর প্রতিমূর্তি এ ব্যাপারে তার কোন সন্দেহ রইল না। সে এটাকে পেতে চায়, তবে তা কি করে সম্ভব হবে তা সে বুঝতে পারছে না।
