যদিও তারা ভোর থেকে ধুলোয় ঢাকা রাস্তায় চলছে তবুও পিছনের রক্ষী সেনা দলকে ধরার পূর্বে মধ্য সকাল হয়ে গেল তাদের। সমগ্র অভিযাত্রী সৈন্যরা ইতোমধ্যে ছাউনিতে চলে গেছে এবং রান্নার আগুনের ধূয়া সামনের রাস্তা বরাবর শত শত আলাদা আলাদা ক্যাম্প নির্দেশ করছে।
নেফার তাদের ঘুরানো রাস্তা দিয়ে নিয়ে গেল। তারা মালপত্র এবং গাড়ি এড়ানোর জন্য ঘুরে এল, রাস্তার দৃষ্টি সীমার বাইরে রইল। সামনে ভালোভাবে দেখে তারা সতর্কভাবে আগ বাড়ছে। ঘটনাক্রমে তারা রত্নের গাড়ির বহরের ও রাজ-স্ত্রীদের পালকির কাছে পৌঁছে গেল যা একটা জলপাই গাছের ঝোপে থামানো। নেফার হামাগুড়ি দিয়ে ওগুলোর কাছাকাছি একটা গাছে উঠল। সেখান থেকে সে লুকিয়ে কাঁটার ঝোপে ঘেরা ক্যাম্পের ভেতর দেখতে পারল। রাণী মেরিকারার তাঁবু হেজারেটের তাঁবুর কাছ থেকে একটু দূরে স্থাপন করা কিন্তু দুই বোন একটা লিনেনের চাদোয়ার নিচে বসে আছে, সূর্য থেকে সুরক্ষিত এবং খাবার খাচ্ছে যা তাদের পরিবেশন করতে দাসীরা মাত্র আগুন থেকে নামিয়ে এনেছে।
তাদের কথাবার্তা শোনার মত কাছে নেফার ছিল না। হেজারেট তার দিকে মুখ বারে বসা, কথা বলছে ও আনন্দে হাসছে। সে আরো সুন্দর হয়েছ যখন শেষ বার নেফার তাকে দেখেছিল তার চেয়েও। এমনকি এ রকম সাধারণ পরিবেশেও সে খুব সতর্ক ভাবে প্রসাধন ব্যবহার করেছে, যাতে তাকে ম্যামফিসের হাহোরের মূর্তির ন্যায় লাগছে। সে দামী অলংকারে সজ্জিত একটা পোশাক পরিধান করেছে এবং তার ঘন কালো চুল সুন্দরভাবে তেল দেওয়া ও কোঁকড়ানো করে বাঁধা। মিশা, লম্বা কালো দাসী মেয়েটি চমৎকার পশ্চাদ্দেশ নিয়ে তার কাঁধের উপর ঝুঁকে আছে তার স্বর্ণের পাত্রটি পূর্ণ করার জন্য। একটু লাল মদ হেজারেটের পোষাকের সামনে ছলকে পড়ে গেল। সে লাফ দিয়ে দাঁড়াল এবং মিশার মাথায় রূপা ও অস্ট্রিচের পালকের পাখা দিয়ে আঘাত করল। মেয়েটি দুহাত দিয়ে মাথা ঢেকে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল কিন্তু তার আঙ্গুলের মধ্য দিয়ে রক্তের ধারা বেরোতে দেখা গেল এই দূর থেকেও। মেরিকারা তার বড় বোনকে থামানোর চেষ্টা করল কিন্তু হেজারেট মিশার মাথায় এক নাগারে আঘাত করে চলল যতোক্ষণ না পাখাটার হাতল দুভাগ হয়ে গেল। তারপর ভাঙ্গা প্রান্তটা মেরিকারার দিকে সজোরে নিক্ষেপ করে গটগট করে চলে গেল সে। হুমকি দিল এবং তার কাঁধের উপর দিয়ে বিশ্রি ভাষায় গালি দিল।
মেরিকারা দাস মেয়েটিকে ধরে দাঁড় করিয়ে নিজের তাঁবুতে নিয়ে গেল। নেফার তেঁতুল গাছে উপরের শাখায় লুকিয়ে ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে লাগল। কিছু সময় পর মিশা তার মাথায় ব্যান্ডেজ নিয়ে তাঁবু ত্যাগ করে কাঁদতে কাঁদতে গাছ পালার মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল। নেফার নড়ল না, যতক্ষণ না তার তাঁবুর প্রবেশ দ্বারে দৃশ্যমান হল মেরিকারা।
শেষবার যখন তারা কথা বলেছিল নেফার তখন তাকে যে কোন কাজ করতে ও কাছে আসার ব্যাপারে সতর্ক থাকতে বলেছিল। এখন সে তার চারপাশে সতর্কভাবে দেখল তাবুর দরজায় দাঁড়ানো রক্ষীর সাথে কথা বলল এবং ঘোরাঘুরি শুরু করল, দৃশ্যত কোন উদ্দেশ্য ছাড়াই ক্যাম্পের পরিধির চারপাশে। পরিষ্কার ভাবে সে নেফারের নির্দেশনা গুরুত্ব সহকারে নিয়েছে এবং ঝোঁপের চতুর্দিকে তার উদ্ধারকারীকে এক ঝলক দেখার জন্যে খুঁজছে। একমাত্র সে-ই নড়াচড়াকারী ব্যক্তি; অন্যরা বেশির ভাগ সূর্য ও তাপ থেকে আশ্রয় নিচ্ছে এবং এমনকি রক্ষীরাও তার প্রতি মনোযোগ দিল না।
নেফার তার থলে থেকে একটা ছোট রূপার পলিশ করা আয়না হাতে তুলে নিল, সূর্যের প্রতিফলন দেখাল। মেরিকারা সাথে সাথে থেমে গেল, চোখের উপর হাত রেখে আলো আসার পথে চোখ সরু করে তাকাল। নেফার আরো তিনবার করল তা। পূর্ব কথিত সংকেত এবং সে এমনকি এতো দূর থেকেও তার হাসিটা দেখল যা সূর্যের রশ্মির মতই উজ্জ্বল, যা তার মনোরম চেহারায় নৃত্য করে উঠল।
*
মেরিকারা দুল্যমান নৃত্যরত পালকিতে রাজ হাঁসের পালকের কুশনে শুয়ে আছে। পাশেই একটা গালিচার উপর মিশা তার পায়ের কাছে একটি ঘুমন্ত কুকুরের ন্যায় দেহটা বাঁকিয়ে কুকড়ে আছে, কিন্তু সে জাগ্রত ও সচকিত ছিল। পালকির পর্দাটা কতক উঠানো যাতে রাতের ঠাণ্ডা বাতাস ঢুকতে পারে। সে সেনাদের কুচকাওয়াজের শব্দ শুনছিল: খুরের ঠনঠন শব্দ, ওয়াগনের কড় কড় ও ঝন ঝন শব্দ, গাড়িটানা ষাঁড়গুলোর ডাকাডাকি, ওয়াগনের যাত্রীদের কান্না এবং পালকির পাশে রক্ষীদের ভারি পদ শব্দ মিলে মিশে একাকার। হঠাৎ সামনে হৈ চৈ বাধল, চাবুকের শাই শাই ও আকস্মিক তীক্ষ্ম শব্দ ভেসে এল। পাথরে চাকার ঠুকনো শব্দ, বয়ে চলার পানির আওয়াজ এবং পশুগুলোর চলায় ওখানে ছল ছলৎ শব্দ হচ্ছে। তখন মেরিকারা তার বোনের ঝগড়াটে কণ্ঠ শুনল, ওখানে কি! কি হচ্ছে?
মহারাণী, আমরা একটা ছোট ঝর্ণা পার হচ্ছি। আমি আপনার কাছে অনুনয় করছি নামার জন্য, নাইলে পালকি উল্টে যাবে। আপনার নিরাপত্তাই আমাদের লক্ষ্য।
সে শুনল হেজারেট তিক্ত ভাবে এই বিড়ম্বনার জন্য অভিযোগ করছে এবং মেরিকারা এই মতানৈক্যের সুযোগ নিল। সে মিশাকে ফিসফিসিয়ে তার শেষ নির্দেশনা দিল। তারপর পালকি থেকে নামল তারা। দাসরা প্রদীপ নিয়ে নদীর তীরে পথ দেখাতে অপেক্ষা করছিল, হেজারেট ইতোমধ্যে সেখানে অপেক্ষা করছে।
