জালটাকে আলতো করে বাধো, টাইটা তাকে দেখিয়ে দিল, খুব শক্ত করেও না আবার ঢিলা করেও না। এটাকে পাখিটার ঠোঁট ও পায়ের নখকে ছুঁতে হবে এবং তাকে অবশ্যই জড়াতে হবে যাতে আমরা তাকে অবমুক্ত করার পূর্ব পর্যন্ত ওটা ধস্তাধস্তি করে নিজেকে না জখম করে।
যখন সবকিছুতে টাইটা সম্ভষ্ট হল তখন থেকে তাদের অপেক্ষার পালা শুরু হল। শীঘ্রই পায়রাগুলো নিজেদের বন্দীদশায় অভ্যস্ত হয়ে গেল এবং নেফারের দেওয়া খাবার লোভীর ন্যায় খেতে লাগল। তারপর তারা রেশমি জালের নিচে আনন্দ চিত্তে গায়ে সূর্যের আলো ও ধুলা মাখতে লাগল। একটার পর একটা সূর্য স্নাত গরম দিন অতিবাহিত হতে লাগল এবং তারা অপেক্ষায় রইল।
বিকেলের ঠাণ্ডায় তারা পায়রাগুলোকে খাবার দিয়ে আসত। টাইটা পাহাড়ের চূড়ায় উঠে কিনারায় বজ্রাসনে বসে সুদীর্ঘ উপত্যকা অবলোকন করত। আর নিচে নেফার ওত পেতে অপেক্ষা করত, কখনো একই স্থানে সে তা করত না। তাই খেলাটা সবসময়ই ছিল বিস্ময়কর, বিশেষ করে যখন প্রাণীগুলো ঝর্ণায় পানি খেতে আসত। টাইটা তার ধ্যান মগ্ন অবস্থায় থেকে যাদু চালনা করত যা কদাচিৎ গজলা হরিণগুলোর বেলায় ব্যর্থ হতো, আর নেফার পানি বরাবর তীর তাক করে বসে থাকতো। প্রতি সন্ধ্যায় তারা গুহার প্রবেশ মুখে বসে হরিণের মাংস আগুনে পুড়ে খেতো।
রানী লসট্রিসের মৃত্যুর পর টাইটা এ গুহায় সাধুর জীবন কাটিয়েছে। এটা তার শক্তির স্থান। যদিও নেফার একজন শিক্ষানবিস এবং বৃদ্ধ মানুষটির যাদুর শক্তি সম্পর্কে তার কোন গভীর জ্ঞান নেই, তবে এ ব্যাপারে তার কোন সন্দেহ নেই, কারণ প্রতিদিন ঐ ক্ষমতাগুলো তাকে বিমোহিত করছিল।
তারা যে শুধু গড বার্ড ধরতে আসে নি তা নেফারের বুঝতে বুঝতে গেবেল নাগারে তাদের অনেক দিন অতিক্রান্ত হল। নেফারের যততদূর মনে হয় এই মধ্য বিরতিটা প্রশিক্ষণ ও নির্দেশনার একটা অংশ, যা টাইটা তার পিছনে ব্যয় করছে। এমনকি ফাঁদের পাশে অপেক্ষার দীর্ঘ ঘন্টাগুলোও পাঠের একটা অংশ। টাইটা তাকে তার দেহ ও সত্তার উপর নিয়ন্ত্রণ শিখাচ্ছে, মনের দরজা খোলার দীক্ষা দিচ্ছে, এমনকি গভীর ভাবে নিজেকে দেখার শিক্ষাও। নিরবতার পাঠোদ্ধার ও ফিসফিসানি শুনা শিখাচ্ছিল যা অন্যরা শুনতে পায় না।
অবশেষে একদিন সে নীরবতার ঐ স্থিরতায় পৌঁছল। এখন নেফার আরো গভীরজ্ঞান ও শিক্ষায় দীক্ষিত, যা টাইটা তাকে দিতে চায়। মরু রাতে তারা একসাথে বসে থাকত, ঘূর্ণায়মান তারার জটিল নকশার নিচে, যা অনাদি কিন্তু মহাসাগরের বাতাস ও স্রোতের ন্যায় অবর্তিত এবং তাকে সে সেই বিস্ময় বর্ণনা করত যার কোন ব্যাখ্যা নেই, যা শুধু ভোলা ও প্রসারিত মন দিয়ে অনুধাবন করা যায়। সে অনুভব করত যে সে এই অলৌকিক জ্ঞানের ছায়াময় পরিধিতে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু সেই সাথে সে তার নিজের ভেতরে জ্ঞানের বর্ধিত ক্ষুধাও অনুভব করত।
একদিন সকালে নেফার যখন ভোরের পূর্বাহ্নে ধূসর আলোতে বাইরে গেল, দেখল ঝর্ণার অপর পাশে মরুভূমির মধ্যে এক গাদা লোক অন্ধকারে নীরবে বসে আছে। সে টাইটাকে তা জানালে বৃদ্ধটি শুধু মাথা নাড়াল। তারা সারা রাত ধরে অপেক্ষা করছে। টাইটা তার কাঁধে একটা পশমি চাদর জড়িয়ে তাদের নিকট গেল।
লোকগুলো যখন আধো আলোতে টাইটার রোগা দেহ চিনতে পারল, তখন তারা করুন অনুনয়ে ফেটে পড়ল। তারা মরুর আদিবাসী এবং তাদের বাচ্চাদের সাথে নিয়ে এসেছে। বাঁচাগুলো ইয়েলো ফ্লাওয়ার-এ আক্রান্ত। আগুন জ্বর এবং সারা শরীর রোগের হলুদ ক্ষতে তাদের ঢেকে গেছে।
ঝর্ণার অপর পাশে রেখে টাইটা তাদের চিকিৎসা করল। কোন শিশুই মারা গেল না এবং দশ দিন পর আদিবাসীরা গুহার মুখে জওয়ার, লবণ ও অজিন রেখে গেল। তারপর তারা জঙ্গলে চলে গেল। ঐ ঘটনার পর যারা মানুষ ও পশু দ্বারা সৃষ্ট রোগ ও ঘা-এর ক্ষতে ভুগছিল যা তারা আসল। টাইটা তাদের সবার কাছেই গেল এবং কাউকে ফিরিয়ে দিল না। নেফার তার পাশে থেকে কাজ করল এবং যা দেখল ও শুনল তা থেকে আরো অনেক বেশি সে শিখল।
অসুস্থ বেদুইনকে সেবা-শশ্রুষা বা খাবার সংগ্রহ বা নির্দেশনা বা শিক্ষা যা তাকে দেয়া হচ্ছিল এগুলোর পরেও তারা প্রতি সকালে রেশমী জালের নিচে ফাঁদ পাততো ও তার পাশে অপেক্ষা করত।
সম্ভবত তারা টাইটার শান্ত শক্তি বলে বশীভূত হয়েছিল কেননা একদা বন্য পায়রাগুলো এখন শান্তশিষ্ট ও গৃহপালিত মুরগির বাচ্চার মতো হয়ে গেছে। আগের মতো কোন ভয়ের চিহ্ন ছাড়াই তারা নিজের কাছে ঘেঁষতে দেয় এবং যখন তাদের পা খোপের মধ্যে আটকে যেতো তখন জানান দিতে মৃদু কু-কু শব্দ করত ও ডানা ঝাঁপটাত।
তাদের অবস্থানের বিশতম সকালে, প্রতিদিনের মতই নেফার যখন ফাঁদের কাছে তার অবস্থান নিয়েছে তখন এমনকি সরাসরি টাইটার দিকে না তাকিয়ে নেফার গভীরভাবে তার উপস্থিতি বুঝতে পারল। বৃদ্ধলোকটির চোখ বন্ধ এবং সে পায়রাগুলোর মতই সূর্যালোকে ঝিমাচ্ছে। তার ত্বকে অসংখ্য সুন্দর আঁকা-বাঁকা বলি রেখা। প্যাপিরাসের চমৎকার পার্চমেন্টের মতো এটাকে পাঠ করা যাবে বলে মনে হল। তার চেহারায় কোন লোম নেই, ভ্রু বা দাড়ির কোন চিহ্ন নেই; শুধুমাত্র চোখের চারপাশে সুন্দর কাঁচের মত স্বচ্ছ পাপড়ি বিরাজমান। নেফার তার পিতার কাছে শুনেছে খোঁজা করার ফলে টাইটার চেহারায় দাড়ি গজায়নি আর কিছুটা সময়ের স্রোতের জন্যে। কিন্তু সে নিশ্চিত তার দীর্ঘায়ু এবং এই অনঢ় দৈহিক ও জীবনী শক্তির পেছনে আরো কোন গভীর রহস্য রয়েছে। অন্যান্য বৈশিষ্ট্যের মধ্যে, একজন যুবতীর চুলের ন্যায় টাইটার চুল ঘন ও শক্ত কিন্তু রূপালি বার্ণিশ এর ন্যায় চকচকে। এটা নিয়ে টাইটা গর্বিত ও ঘাড়ের নিচে সে এটাকে পুরু বেণী করে রাখে ও নিয়মিত পরিষ্কার করে। তার শিক্ষা ও বয়স সত্ত্বেও বৃদ্ধ ম্যাগোসের মাঝে এতোটুকু অহমিকা নেই।
