এদিন গুলিতে প্রেমিক যুগল মরুতে ঘুরে বেড়াল, কথা বলে সময় কাটাল। তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে হাজার পরিকল্পনা করল, সিদ্ধান্ত নিল কখন ও কিভাবে তারা বিয়ে করবে, কয়জন ছেলে ও কয়জন মেয়ে সে তাকে দিবে এবং প্রতি জনের জন্যে নাম খুঁজে এক স্বপ্নীল সময় অতিবাহিত করতে লাগল দুজনে।
তারা একে অন্যের মধ্যে এতোটাই হারিয়ে গেল যে তারা ভুল গেল এই নির্জন মরুর বাইরের দুনিয়ার কথাটা। এক সকালে তারা ভগ্ন শহরটা ছেড়ে এক কুন্ডলী রশি ও দুটা তেলের প্রদীপ নিয়ে পাহাড়ে এল। এবার তারা দৃঢ় সংকল্প আরো গভীরে পুরানো কবরগুলো আবিষ্কার করতে। একটা ঘুরো পথে তারা পর্বতের চূড়ায় পৌঁছে যায়, সেখানে তারা দম নেওয়ার জন্য থামল এবং নীল, গোপন পাহাড়ে ভোরের আগমনের চমৎকার দৃশ্য দেখার জন্য বসল।
দেখ! মিনটাকা হঠাৎ চিৎকার দিল, তার বান্ধন থেকে বেড়িয়ে যেতে শুরু করল এবং পশ্চিম দিকে পুরানো জনপদ বরাবর নির্দেশ করল যা মিশরের দিকে চলে গেছে। নেফার লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল এবং তাদের নিচে উপত্যকার অদ্ভুত ক্যারাভানের দিকে যানগুলোর আগমনের দিকে চেয়ে রইল। পাঁচটা ভগ্নপ্রায় যান। আগে চলছে, পিছিয়ে পড়া এক সারি মানুষ তা অনুসরণ করছে।
ওখানে অবশ্যই একশত লোক হবে, কমপক্ষে, মিনিটাকা বিস্মিতভাবে বলল। তারা কারা হতে পারে?
আমি জানি না। নেফার গম্ভীরভাবে স্বীকার করল। কিন্তু আমি চাই তুমি দৌড়ে টাইটার কাছে যাও এবং তাদের আগমনের কথা টাইটাকে সতর্ক কর। এদিকে আমি লুকিয়ে তাদের কার্যকলাপ লক্ষ্য করছি।
মিনটাকা তর্ক করল না, বরং গালালার উদ্দেশ্যে সঙ্গে সঙ্গে রওনা দিল। সে দৌড়ে পাহাড়ের কালো খাজ দিয়ে নামল, একটা বন্য আইবেক্সের ন্যায় ক্ষিপ্রগতিতে পাথর থেকে পাথরে লাফিয়ে এগিয়ে চলল। নেফার রাশি ও প্রদীপ লুকিয়ে রাখল তারপর তার ধনুকে গুণ লাগিয়ে খাপের তীরটা পরীক্ষা করল। পাহাড়ের চূড়ার দিক থেকে হামাগুড়ি দিয়ে দৃষ্টির আড়ালে গেল। সে একটা উপযুক্ত জায়গায় পৌঁছে সেখান থেকে নজর রাখতে লাগল নিচে ধীরে আসা ক্যারাভানের দিকে।
এ ছিল এক করুণ দৃশ্য। বহরটা কাছাকাছি আসতেই নেফার দেখল প্রথম দুটো যান যুদ্ধ রথের মতো স্কুল ও হৈ-চৈ ভরা। ওগুলো টানা হচ্ছে শুকনো পরিশ্রান্ত ঘোড়া দিয়ে। যানগুলো দুজন লোক বহন করার মত নকশা করা কিন্তু প্রতিটায় চার থেকে পাঁচজন করে অবস্থান নিয়েছে। তাদের পিছনে আসছে নানা রকমের ওয়াগন ও এক্কা গাড়ি, প্রথম রথগুলো থেকে তাদের অবস্থা মোটেও ভালো নয়। নেফার দেখল যে ওগুলো অসুস্থ অথবা আঘাতপ্রাপ্ত লোকে ভরা, করুণভাবে গাদাগাদি করে আছে সবাই অথবা অন্য কিছু না পেয়ে খড়ের গাদায় শুয়ে আছে কেউ কেউ। ওয়াগনের পিছনে লম্বা এক সারি হন্টনরত মানুষ পিছিয়ে পড়েছে, কয়েকজন লাঠিতে ভর দিয়ে খোঁড়াচ্ছে অথবা লাঠির উপর ঝুঁকে আছে। অন্যরা স্ট্রেচার বহন করছে যার উপর অন্য অসুস্থ বা আঘাতপ্রাপ্ত লোক শুয়ে রয়েছে।
হুরাসের নামে, তাদের যুদ্ধের ময়দান থেকে ফেরারি লোকেরা মতই দেখাচ্ছে। নেফার বিড়বিড় করল, সে তার চোখ টান করল সামনে রথের লোকদের ঠিকভাবে দেখার জন্য।
হঠাৎ সে পাথরের পিছন থেকে উঠে দাঁড়াল যা তাকে লুকিয়ে রেখেছিল এবং উত্তেজনায় চিৎকার দিয়ে উঠল, ম্যারন! সে অবশেষে লম্বা অবয়বটা চিনতে পেরেছে যে প্রথম রথের লাগাম ধরে আছে। ম্যারন লাগাম টেনে ঘোড়াগুলোকে থামাল এবং চোখে ছায়া দিয়ে উদিয়মান সূর্যের চোখের ভেতর দিয়ে তাকাল। তখন সেও চিৎকার দিল এবং হাত নাড়াল যখন সে আকাশের সীমায় উঁচুতে নেফারকে দেখতে পেল। নেফার দৌড়ে খাঁজ বেয়ে নামল এবং পিছলে গেল খোলা নুড়ি পাথরে। অবশেষে ম্যারনের নিকট পৌঁছে তাতে সজোরে আলিঙ্গন করল, হাসল এবং একই সাথে দুজনে কথা বলল।
তুমি কোথায় ছিলে?
মিনটাকা ও টাইটা কোথায়?
তারপর হিল্টো দ্রুত নেফারের কাছে এল এবং রাজকীয় সম্বোধন করল। তার পিছনে পরিশ্রান্ত ও আঘাতপ্রাপ্ত লোকেরা জড়ো হল। তাদের মুখগুলো পরিশ্রান্ত ও রোগা এবং রক্ত ও পুঁজ তাদের নোংরা ব্যান্ডেজ ভেদ করে বের হয়ে আছে এবং শুকিয়ে তা মচমচে হয়ে গেছে। এমনকি ওয়াগন ও স্ট্রেচারের লোকেরা যারা দাঁড়াতেও অক্ষম নিজেদের ভুল দেখছে ভেবে নেফারের দিকে ভয়ে তাকাল।
দ্রুত পর্যবেক্ষণে নেফার দেখতে পেল এই লোকগুলো যোদ্ধা, কিন্তু যুদ্ধে আহত, তাদের দেহ ও স্পৃহা ভাঙ্গা।
হিল্টো নেফারকে অভিবাদন জানিয়ে তাদের দিকে ঘুরে চিৎকার করে বলল, এই যা আমি তোমাদের কাছে ওয়াদা করেছিলাম। এখানে তোমাদের সম্মুখে তোমাদের প্রকৃত ফারাও নেফার সেটি দাঁড়ানো। ফারাও মৃত নন! ফারাও জীবিত!
নিশ্চুপ ও উদাসীন, অসুস্থ ও মনোবলহীন লোকগুলো অনিশ্চিতভাবে নেফারের দিকে চেয়ে রইল।
মহামান্য, হিল্টো তাকে ফিসফিস করে বলল, দয়া করে এই পাথরের উপর দাঁড়ান যাতে তারা আপনাকে পরিষ্কারভাবে দেখতে পায়। নেফার লাফ দিয়ে পাথটার উপর উঠল এবং মনোযোগ দিয়ে সামগ্রিকভাবে তাদের অবলোকন করল। তারাও চুপ করে তার দিকে চেয়ে রইল, অধিকাংশই পূর্বে কখনো তাদের রাজাকে চোখে দেখেনি। এমনকি অল্প কয়েক জন যারা তাকে রাজপ্রাসাদের অনুষ্ঠানে দেখেছে তারাও অনেক দূর থেকে দেখেছে। তখন সে দেখতে একটা পুতুলের মতো ছিল, গলা থেকে পা পর্যন্ত দামী কাপড় ও গহনায় ঢাকা, তার মুখে প্রসাধনের সাদা মুখোশ শক্ত হয়ে বসত, রাজকীয় গতিতে যা সাদা মহিষ টানত। তারা সেই দূরবর্তী অস্বাভাবিক অবয়বের সাথে এই লম্বা সুন্দর তরুণ মানুষটিকে মিলাতে পারল না। পৌরুষদীপ্ত ও শক্ত সামর্থ তার চেহারা সূর্যে পোড়া এবং তার অভিব্যক্তি জীবন্ত ও সচকিত। সে এখন বাচ্চা ফারাও নয় যাকে তারা শুধু নামে সম্মান করতো।
