এদিকে এসো, প্রিয়তমগণ। নাজা তাদের ডাকল, আর তখনি শুধু তারা লোকটিকে চিনতে পারল যে তাদের পিতার খুব ঘনিষ্ঠ ও কাছের মানুষ ছিল। তারা হাসল ও বিশ্বাসের সাথে এগিয়ে গেল। নাজা সিংহাসন থেকে উঠে দাঁড়াল ও তাদের সাথে মিলিত হতে নিচে নেমে এল এবং তাদের কাঁধের উপর হাত রাখল। তার কণ্ঠ ও অভিব্যক্তিতে করুণ অনুভূতি ফুটে উঠল। তোমাদের এখন শক্ত হতে হবে এবং মনে রাখবে যে তোমরা রাজকন্যা। কারণ আমি তোমাদের জন্যে একটা দুঃখের সংবাদ নিয়ে এসেছি। তোমাদের পিতা ফারাও নিহত হয়েছেন। মুহূর্তের জন্য তারা কিছু বুঝতে পারল না। তারপর হেজারেট করুণ তীক্ষ্ণ চিৎকারে ফেটে পড়ল সেই সাথে মেরিকারা।
আলতো করে নাজা তাদের জড়িয়ে ধরল এবং সিংহাসনের পায়ের কাছে বসিয়ে দিল। তারা সেখানে হাঁটু গেড়ে বসে একে অপরকে জড়িয়ে কাঁদতে লাগল।
রাজকন্যাদের এই দুঃখ ও দুর্দশায় সময় সাহায্য করাটা আমার দায়িত্ব ও কর্তব্য। নাজা সাদস্যদের বলল। যেভাবে আমি প্রিন্স নেফারকে আমার দায়িত্বে নিয়েছি সেভাবে এই দুরাজ কন্যা, হেজারেট ও মেরিকারাও আমার অধীনে থাকবে।
এখন পুরো রাজ-গোত্র তার হাতে। প্রিন্স নেফার কোথায় ও কত শক্তিশালী এটা কোন ব্যাপার না। টালা তার পাশের জনকে ফিস্ ফিস্ করে বলল। আমার মনে হয় সে ইতোমধ্যে মৃত্যু পথযাত্রী। আর নতুন রাজ-প্রতিভূ তার শাসন পদ্ধতির ধারণাটা পরিষ্কার সবাইকে বুঝিয়ে দিয়েছে।
*
গেবেল নগরের সুউচ্চ পাহাড়ের ছায়ায় নেফার বসেছিল। যততক্ষণ না সূর্য তার প্রথম রশ্মি উপত্যকার উপর প্রসারিত করল ততক্ষণ সে নড়ল না। প্রথমে এই ভাবে স্থির হয়ে বসে থাকাটা তার স্নায়ুতন্ত্রে জ্বালা ধরিয়ে দিত এবং তার শরীরের চামড়ার মধ্যে এমন অনুভূত হতো যে যেন কোন পোকা এর উপর দিকে হেঁটে গেল। কিন্তু সে জানে যে টাইটা তাকে দেখছে তাই সে তার দেহকে জোর করে ধরে রাখল। এখন অবশেষে তার অনুভূতিগুলো চরম সীমায় পৌঁছে গেছে। সে পাহাড়ের গভীর থেকে উঠে আসা পানির গন্ধ অনুভব করতে পারে। এটা ধীরে উঠে এসে পাথরের বেসিনটার মধ্যে পড়ে যা তার দুই হাতের তালু একসাথে করে কাপ, আকৃতি দিলে যতোখানি হবে তার চাইতে বড় নয়। তারপর পরের বেসিনে ফোঁটায় ফোঁটায় পড়ে, পিচ্ছিল শেওলার সবুজ লাইন ধরে। সেখান থেকে এটা নিচের দিকে বয়ে চলে উপত্যকার শুকনো বালির মধ্যে চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার জন্যে। তারপরও অনেক জীবন এই পানির উপর নির্ভর করে বেঁচে থাকে। প্রজাপতি ও শুয়ো-পোকা, নাগিন ও টিকটিকি, মনোহরী গজলা-হরিণ, সহজ সাবলীলভাবে তারা নেচে বেড়ায়, ঠিক যেন তাপে কম্পিত ভূমির উপর জাফরণের গন্ধে সুরভিত ধুলির দমকা বাতাস; গায়ে ফুটকি আঁকা ওয়াইন রঙের গলকণ্ঠের পায়রাগুলো–যেগুলো পানির কাছের পর্বত শ্রেণীতে বসবাস করে সবাই এখানে এসে পানি পান করে। এই মূল্যবান জলাশয়গুলোর কাছে টাইটা তাকে নিয়ে এসেছে তার গড-বার্ড ধরার জন্যে।
গেবেল নাগার পৌঁছবার পর থেকেই তারা জাল বুনা শুরু করেছে। থেবসের এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে টাইটা সুতা কিনে এনেছিল। সুতার দাম একটু বেশি পড়েছিল কেননা এটা পূর্বের সে সুদূর ইনডাস নদীর দেশ থেকে আনা হয়েছে যা কিনা নিয়ে আসতে এক জন লোকের কয়েক বছর লেগে যায়। সুন্দর সুতা দিয়ে কিভাবে জাল বুনতে হয় টাইটা নেফারকে শিখিয়ে দিয়েছে। লিনেনের সুতার গুচ্ছ বা চামড়ার ফালির চাইতেও জালের খোপের গিরাগুলো–গাটগুলো বেশি শক্তিশালী, কিন্তু খালি চোখে প্রায় দেখাই যায় না।
যখন জ্বালা বুনা শেষ হল, টাইটার ইচ্ছে ছিল নেফার নিজে ফাঁদগুলো পাতুক। এটা তোমার গডবার্ড। নিজেকেই তোমার সব করতে হবে। সে ব্যাখ্যা করল। আর ঐভাবে প্রভু হুরাসের কাছে তোমার চাওয়ার অধিকারটা বেশি গুরুত্ব পাবে।
তাই ছ্যাকা দেয়ার মতো দিনের আলোতে উপত্যকার মেঝেতে বসে টাইটা ও নেফার ঐ পার্বত্য এলাকাটা অবলোকন করছিল। যখন আঁধার নামল টাইটা পাহাড়ের পাদদেশে ছোট আগুনের কুন্ডলির পাশে এসে বসল এবং নরম সুরে তার যাদুমন্ত্র পাঠ শুরু করল। মাঝে মাঝে বিরতিতে একমুঠো করে হার্ব সে আগুনে ফেলছিল। যখন মাঝরাতের অন্ধকারকে আলোকিত করার জন্য আকাশে অর্ধ বাঁকা চাঁদ উঠল, নেফার পানির কাছের পাহাড়টায় চড়ার অভিযান শুরু করল, যেখানে পায়রাগুলো তাদের বাসা বেঁধেছে। সে দুটি বড় ডানা ওয়ালা পাখি ধরল, সেগুলো অন্ধকারে দ্বিধান্বিত হয়ে পড়েছিল এবং ডানা ঝাঁপটাচ্ছিল। তাছাড়া তাদের উপর টাইটার যাদুরও কিছুটা প্রভাব ছিল। কাঁধে ঝুলানো চামড়ার ব্যাগে করে সে ওগুলো নামিয়ে আনল।
টাইটার নির্দেশনা অনুযায়ী নেফার প্রতিটি পাখির ডানা থেকে পালক ছিঁড়ে ফেলল যাতে ওগুলো আর উড়তে না পারে। তারপর তারা পাহাড়ের পাদদেশে ও ঝর্ণার কাছাকাছি একটা জায়গা, পছন্দ করল। স্থানটা এতোটুকু ভোলামেলা যে পাখিগুলোকে উপরের আকাশ থেকে দেখা যাবে। পায়রাগুলোর পা ঘোড়ার লেজের চুলের তৈরি সুতা দিয়ে বাঁধল এবং মাটি পেতে কাঠের খুঁটির সাথে বেঁধে দিল। তারপর তাদের উপর হালকা জালটা ছড়িয়ে দিল এবং বড় বড় ঘাসের উপর তা নিয়ে রেখে এল যা সহজে গড-বার্ডগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারবে।
