নেফার তার কুঞ্জিত শুষ্ক ঠোঁটের মধ্য দিয়ে তাকে উপহাস করল। আমি তোমার আবেগী স্বভাবের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাশীল।
তাহলে আমাকে আর তিরস্কার করো না; সে তাকে সর্তক করল। নইলে তুমি এর আরো অনেক প্রমাণ সামনে দেখবে। এই প্রথম বারের মতো খামসিন শেষ হওয়ার পর মিনটাকা হাসল। এখন যাও অন্যদের গিয়ে সাহায্য কর। আমাদের তো আর পানির বিশাল সরবরাহ নেই।
নেফার তাকে ছেড়ে বালির মধ্য দিয়ে চলে গেল যেখানে টাইটা ভূমিতে আরো অনুসন্ধার চালাচ্ছে। হিকস্দের সবগুলো রথই হালকা ভাবে বালিতে ঢাকা ছিল না যেমন করে তারা প্রথমটা খুঁজে পেয়েছিল। অনেকগুলো উঁচু নতুন বালিয়াড়ির নিচে ঢাকা পড়েছে।
তারা অনুসন্ধান চালিয়ে পাথুরে গিরি থেকে আরো অনেক দূর পর্যন্ত এগিয়ে গেল এবং বালির নিচে অনেক মরদেহ পেল যাদের ফীত পেট থেকে দুর্গন্ধ বেরোচ্ছে। শীঘই তারা যেখানে মিনটাকা সেবিকার ভূমিকায় ঘোড়াগুলোর যত্ন নিচ্ছিল তার সীমার বাইরে চলে গেল।
*
সব শব্দ থেমে গেলে টর্ক নিজের সম্বতি ফিরে পেল। তারপর একটু এগুবার জন্যে নড়ার চেষ্টা করতেই সে ঝাঁকিয়ে উঠল ব্যথায়। বালির পাহাড় যেন তার উপর চেপে বসে আছে। মনে হলো তার পাঁজর ভেঙে যাবে এবং ফুসফুস থেকে বাতাস বের করে দিবে, তবুও সে জানত ঝড় থেকে বাঁচার জন্যে এ স্থানটি ইশতার তাদের জন্য পছন্দ করেছে। ভাগ্যবশত অথবা নিয়তি যাই বলা হোক অন্য কোন জয়গায় হলে হয়ত তারা চির দিনের জন্যে সমাহিত হয়ে যেতো।
এখন সে উঠার জন্য লড়াই করল; ডুবুরির মতো আলো ও বাতাস যেন গভীর পুকুরের গভীরতা থেকে তার কাছে আসছে। বালির মধ্যে দিয়ে কষ্ট করে যখন সে সাঁতার কাটল, তখন তা হলো এক জ্বলন্ত যন্ত্রণা। সে লড়াই চালিয়ে গেল যতোক্ষণ তার কাপড়ে ঢাকা মাথাটা বালির বাঁধ ভেঙে বেরিয়ে এল। নতুন এক জগৎ তার সামনে উন্মোচিত হল তখন। চিকচিক আলোয় তার চোখ পিটপিট করে উঠল। ঝড়ো বাতাস থেমে গেছে কিন্তু বাতাসে উড়ন্ত ধুলা সুন্দর করে উজ্জ্বল হয়ে জ্যোতি ছড়াচ্ছে। সে ঐ ভাবেই কিছুটা সময় বিশ্রাম নিল সে যততক্ষণ না তার কাঁধের ব্যথা একটু কমল। তারপর সে বালির স্তরের এক পাশে উঁচু হয়ে থাকা ঢিবিটা ধাক্কা দিয়ে সরাল যা তার দেহের নিমাংশ ঢেকে রেখেছিল এবং ডাকার চেষ্টা করল, ইশতার! তুমি কোথায়? কিন্তু তার কণ্ঠ যেন কিছু চেপে ধরে আছে। ধীরে ধীরে সে মাথা ঘুরিয়ে যাদুকরকে দেখল। তার কাছাকাছি বসে রয়েছে, পিঠটা পাথুরে পর্বতের দিকে মুখ করা। তাকে কবর থেকে তুলে আনা শব দেহের মতো দেখাল যা কয়েক দিনের মৃত দেহের ন্যায় শীর্ণ। আর তখন ইশতার তার একটা ভালো চোখ খুলল।
পানি? টর্কের কণ্ঠটা শুধু একটু বোঝা গেল। কিন্তু যাদুকর তার মাথা দোলালো।
তাহলে আমারা ঝড়ের মধ্যে বেঁচে আছি, এই বালির কবরে মরতে মরতে। টর্ক বলার চেষ্টা করল, কিন্তু কোন শব্দ তার বিধ্বস্ত গলা ও মুখ দিয়ে বের হলো না।
সে আরো কিছুক্ষণ শুয়ে রাইল। ইচ্ছে করছে চোখ বন্ধ করে তার ঘুমিয়ে পড়তে এবং আর কখোনই জেগে না উঠতে। ভাবনাটা তাকে তাড়িত করল এবং জোর করে সে তার শক্ত চোখের পাতা খুলল, অনুভব করল কাঁকড় তার পাতার নিচে অক্ষিগোলকের সাথে ঘষা খাচ্ছে।
পানি সে বলল। পানি খোঁজ।
পাথরকে ভিত্তি ধরে সে একদিকে কাত হয়ে পায়ের উপর ভর দিয়ে দাঁড়াল এবং দুর্বলতায় দুলে উঠল ও ঘামতে লাগল।
ইশতার তাকে দেখল, একটা অন্ধ চোখে তাকে কোন সরীসৃপ অথবা মরদেহের চোখের মতই লাগছে। টর্ক মাতালের ন্যায় সামনে এগোতে শুরু করল। প্রতি পদক্ষেপে সে বাঁধা খেয়ে পড়ে যাচ্ছিল। পাহাড়ের পাদদেশ বরাবর তারা রাস্তা করে নিল যতোক্ষণ না সে বাইরে মরুভূমিতে তাকাল। বালিয়াড়গুলো আদিম ও নিখুঁত, একজন তরুণীর দেহের মতই ইন্দ্রিয় সুখাবহ রূপ নিয়ে বাঁকানো।
মানুষ বা রথের কোনো চিহ্ন নেই। তার যুদ্ধ বাহিনী সমগ্র মিশরে সবচেয়ে সুন্দর, কোন চিহ্ন ছাড়াই তারা বিলীন হয়ে গেছে। সে তার ঠোঁট অবলেহন করতে চাইল। কিন্তু বালুতে মাখামাখি মুখে তার কোন থু থু ছিল না। সে অনুভব করল তার পা নিচে ভেঙে পড়তে চাইছে এবং জানে যদি পড়ে যায় তাহলে কখনোই সে আর উঠতে পারবে না। তারা কোথায় যাচ্ছে সে জানে না। তার মাথায় এখন একটাই চিন্তা, শুধু এগিয়ে যাওয়া।
তখন সে মানুষের কণ্ঠস্বর শুনল এবং জানত তার হ্যাঁলুসিনেশন হচ্ছে। তারপর আবার নিরবতা। সে মনোযোগ দিল। কণ্ঠস্বরগুলো আবার এল। এবার ওগুলো আরো কাছে এবং আরো পরিষ্কার। তার দেহে সে অপ্রত্যাশিত এক শক্তি প্রবাহতা অনুভব করল। কিন্তু যখন সে ডাকার চেষ্টা করল তার শুকনো গলা থেকে কোনো শব্দ বের হল না। আরো একবার সব নিরব হল। কণ্ঠস্বরগুলো থেমে গেছে।
সে আবার সামনে বাড়ল, তারপর হঠাৎ থেমে গেল। একটি নারী কণ্ঠ, কোনো ভুল নেই। একটি মিষ্টি, পরিষ্কার গলা।
মিনটাকা! নামটা নিরবে তার স্ফীত ঠোঁটের উপর সৃষ্টি হল। তারপর আরেকটি কণ্ঠ। এবার একজন পুরুষের। সে শব্দগুলো বুঝতে পারল না বা বক্তাকে চিনতে পারল না। কিন্তু যদি সে মিনটাকার সাথে হয় তবে সে অবশ্যই আসামীদের একজন হবে যাদের টর্ক অনুসরণ করছে। শত্রু!
টর্ক নিজের দিকে তাকাল। তার তলোয়ারের বেল্টটা হারিয়ে গেছে এবং সেই সাথে তার হাতিয়ারটাও। সে নিরস্ত্র; আর তার পরিহিত কাপড়ে এতো বালি লেগে আছে যে তা তার শরীর একটা পশমের শার্টের ন্যায় গরম করে রেখেছে। একটি অস্ত্রের জন্য সে তার চারপাশে তাকাল, একটি লাঠি কিংবা একটা পাথর, কিন্তু কিছুই ছিল না। সব কিছু বালিতে ঢাকা পড়েছে।
