তার অবশিষ্ট সমস্ত শক্তি নিয়ে, সে নিরবে নিজেকে মুক্ত করার জন্য লড়াই করে গেল, কিন্তু পরিশ্রম শীঘ্রই তাকে নিঃশেষিত করল এবং তার গলা তৃষ্ণায় জ্বালা ও ব্যথা করতে লাগল। সে ভাবল এখন মারা যাওয়া কি নিষ্ঠুর হবে না! যখন বাতাস ও আলোর প্রতিজ্ঞা নিয়ে ঐ ক্ষুদ্র ছিদ্র তাকে উপহাস করছে।
সে ক্লান্তিতে চোখ আবার বন্ধ করল ও খুলল। অনুভব করল আলোতে অন্য একটা পরিবর্তন যেন হয়েছে, এবং তার চোখ আবার খুলল তখন সে। অবিশ্বাস্য অনুভূতি নিয়ে সে দেখল একটা হাত বালুর ভেতর থেকে বেরিয়ে তার ভোলা মুখের দিকে এগিয়ে আসছে। বৃদ্ধ হাত, শুষ্ক চামড়া বয়সের গভীর দাগে ঢাকা।
নেফার! সে একটা কণ্ঠ শুনল; এতো অপরিচিত, এতো কর্কশ এবং এতে পরিবর্তিত যে মুহূর্তের জন্য সে সন্দেহ করল এটা ম্যাগোস কিনা। নেফার, আমার কথা কি তুমি শুনতে পাচ্ছো?
নেফার উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করল কিন্তু এবারও কোন কথা বলতে পারল না। সে হাত বাড়াল ও টাইটার আঙুল স্পর্শ করল। সঙ্গে সঙ্গে বৃদ্ধ মানুষটির আঙুল তার আঙুলগুলোকে বিস্মিত শক্তিতে জড়িয়ে ধরল।
শক্ত করে ধরে রাখো। আমরা তোমাকে খুঁড়ে বের করবো।
তখন সে অন্য কণ্ঠগুলোও শুনল, তৃষ্ণায় রুক্ষ ও ক্ষীণ ও পরিশ্রমে কাতর। তারপরও সবাই তাদের হাতগুলো দিয়ে খাবলে বালি সরাতে লাগল যা তাকে আটকে রেখেছিল। অবশেষে তারা তাকে তুলে ধরল এবং টান দিকে নরম ও ভয়ংকর বালির কজা থেকে মুক্ত করল।
নেফার পিছলে সরু ফাটল দিয়ে বের হল যা পাথুরে গিরিটায় সে জন্ম দিয়েছে। তারপর হিল্টো ও ম্যারন পুনরায় প্রবেশ করে মিনটাকাকে নরম ও অন্ধকার বালির গর্ভ থেকে উজ্জ্বল সূর্যালোতে টেনে বের করল।
তারা তাদের দুজনকে দাঁড় করালো এবং পড়ে যাওয়া হতে তাদের ধরে রাখল, কারণ তাদের পায়ে কোন শক্তি ছিল না। নেফার এক পাশে কাত হয়ে মিনটাকার কাছে গেল এবং নিরবে তাকে জড়িয়ে ধরল। মিনটাকা কাঁপছিল যেন তার ম্যালেরিয়া হয়েছে। কিছুক্ষণ পর নেফার তার মুখটা দুই হাতে তুলে ধরে ভয় ও করুণা নিয়ে তা লক্ষ্য করল। তার চুল বালিতে সাদা, তার চোখের ভ্রু পুরু হয়ে আছে ঐ বালিতে। তার চোখগুলো গাঢ় লাল গহ্বরে পরিণত হয়েছে যেন এবং ঠোঁট ফুলে কালো হয়ে গেছে। ফলে যখনই সে কথা বলার চেষ্টা করল, ওগুলো ফেটে গেল এবং এক ফোঁটা রক্ত; রুবির ন্যায় লাল দেখাতে, তার চিবুক দিয়ে গড়িয়ে পড়ল।
পানি, নেফার অবশেষে কোন রকমে উচ্চারণ করল। তাকে (মিনটাকাকে) অবশ্যই পানি পান করাতে হবে।
সে তার হাঁটুতে ভর দিয়ে বসে পড়ল এবং পাগলের মতো বালি খুঁড়তে করতে লাগল। ম্যারন ও হিল্টোও তার সাথে হাত মেলালো এবং তারা পানির থলেটা উন্মুক্ত করল। ওটা টেনে বের করে তারা দেখল যে বেশিরভাগ পানিই যা ওটার মধ্যে অবশিষ্ট ছিল বাষ্পে পরিণত হয়েছে অথবা চাপে তা থেকে বেড়িয়ে গেছে। এখন প্রত্যেকের জন্য কয়েক বার মুখ ভরে পান করার মতো অবশিষ্ট আছে কেবল, তবে ঐ পরিমাণ তাদের আরো কিছুক্ষণ বাঁচিয়ে রাখার জন্য যথেষ্ট। নেফার তার জল শূন্য দেহে শক্তি ফিরে আসা অনুভব করল এবং প্রথম বারের মতো নিজের দিকে মনোযোগ দিল।
সময়টা ছিল সকালের মাঝামাঝি। সে জানে না কোন সকাল বা কত দিন তারা সমাহিত ছিল। এখনো স্থির বাতাসে স্বর্ণের ধুলার ন্যায় বালির একটা পাতলা আবরণ ভেসে বেড়াচ্ছে।
সে তার চোখের উপর হাত রেখে মরুভূমির বাইরে তাকাল এবং কিছুই চিনতে পারল না। জায়গাটা পুরোপুরি বদলে গেছে। উঁচু বালিয়াড়িগুলো চলে গিয়ে অন্য পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে, যা ভিন্ন আকৃতির ও ভিন্ন বিন্যাসের। যেখানে পর্বত ছিল সেখানে উপত্যকা এবং এখন যেখানে পাহাড় দাঁড়িয়ে আছে তা সমতল ছিল। এমনকি রং-টা পর্যন্ত বদলে গেছে। চাপা রক্তবর্ণ ও ভাঙ্গা নীলের স্থানে লাল ও সোনালি হলুদ বর্তমান।
সে বিস্ময়ে তার মাথা নাড়ল এবং টাইটার দিকে তাকাল। ম্যাগোস তার লাঠিতে ভর দিয়ে বেঁকে আছে, নেফারকে দেখছিল সেই মলিন, পুরানো কিন্তু। বয়সহীন চোখ দিয়ে।
টর্ক? নেফার কোনভাবে বলল।কোথায়?
সমাহিত, টাইটা উত্তর দিল এবং এখন নেফার দেখতে পারল যে সেও লাকড়ির লাঠির মতো শুষ্ক হয়ে গেছে এবং একই যন্ত্রণায় ভুগছে যেমনটা তারা ভুগছে।
পানি? নেফার ফিসৃফিস্ করে বলল, তার স্ফীত ও রক্তাক্ত মুখ স্পর্শ করল।
এসো, টাইটা বলল।
নেফার মিনটাকার হাত নিল এবং ধীরে ধীরে তারা ম্যাগোসকে অনুসরণ করে পিঙ্গল বর্ণের বালির মধ্যে বেরিয়ে এল। প্রচন্ড তৃষ্ণা ও সূর্যালোক টাইটার উপর যেন জেকে বসেছে, তথাপি তার চলার গতি ধীর ও দৃঢ়। অন্যরা তার পিছনে টল মল পায়ে এগিয়ে চলল।
টাইটাকে মনে হল উদ্দেশ্যহীন ভাবে সুন্দর বালির নতুন উপত্যকার মধ্য দিয়ে তাদের নিয়ে চলছে। হঠাৎ সে তার সামনে তার লাঠিটা তুলে ধরে ওটা ঝাড় দেওয়ার মতো গতি তৈরি করে একি ওদিক ঘুরালো। একবার, তারপর আবার হাঁটুতে ভর দিয়ে সে নিচু হয়ে কপাল দিয়ে মাটি স্পর্শ করল।
সে কি করছে? মিনটাকা ফিসফিসিয়ে বলল। যে টুকো পানি তারা পান করেছে তা তাদের ধরে রাখার জন্য যথেষ্ট ছিল না এবং সে আবার দুর্বল হয়ে পড়ছে। সে কি প্রার্থনা করছে?
নেফার শুধু তার মাথা নাড়ল। সে অপ্রয়োজনীয় কোনো কথা বলে শক্তি ব্যয় করল না। টাইটা ধীরে এগিয়ে চলল এবং প্রসঙ্গত তার লাঠি দিয়ে সে একই রকম ঝাড় দিয়ে যাচ্ছে, নেফারের পানি গনকের কাজটার কথা মনে পড়ে গেল।
