এবং ঝড় বেড়েই চলল।
দুই দিন তিন রাত ধরে ক্লান্তহীন ভাবে বাতাস বয়েই চলল। এই সময়টাতে নেফার কোনো রকমে তার মাথা ও হাত নড়ানোর মতো যথেষ্ট বালি সরাতে পারল, কিন্তু তার দেহের নিমাংশ শক্ত ভাবে বন্দী হয়ে গেছে। বালি খনন করে সে নিজেকে করে বের করতে পারল না, কারণ সেখানে এমন কোন স্থান ছিল না যে সে বালি সরিয়ে রাখবে।
সে একটা হাত তুলে তা বাড়িয়ে আঙুল দিয়ে শক্ত পাথরটার অবস্থান বুঝার চেষ্টা করল এবং বুঝল এটা একটু গম্বুজাকৃতির। ইতোমধ্যে বালি গুহার প্রবেশ পথ বন্ধ করে দিয়েছে যার ফলে আর বালি ঢুকছে না। কিন্তু সে তখনো শুনতে পেল ঝড়টা সীমাহীন ভাবে গর্জন করছে।
সে অপেক্ষা করল। মাঝে মাঝে সে অনুভব করল মিনটাকা তার পাশে নিরবে কাঁদছে। নেফার তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করল তার বাহুতে আলতো চাপ দিয়ে। যেহেতু বাতাস চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে ফলে স্থানটি দূষিত, গন্ধময় ও জীর্ন হয়ে গেল। ভাবল শীঘ্রই তারা আর জীবিত থাকবে না, কারণ প্রতিটি নিশ্বাস এখন একটি লড়াই এ পরিণত হয়েছে, তবুও তারা এখন পর্যন্ত জীবিত।
পানির থলেতে যতোটুকু অবশিষ্ট ছিল তা তারা পান করে ফেলেছে, তলায় এখন একটু রয়েছে। সবাই এখন প্রচন্ড তৃষ্ণার্ত। এ গদাগদির মধ্যেও তারা এতটুকু ঘামছিল না, কারণ গরম-শুষ্ক বালি ও বাতাস দ্রুত শুষে নিচ্ছিল তা। নেফার অনুভব করল তার জিভ ধীরে ধীরে মুখের তালুর সাথে আটকে যাচ্ছে। তারপর তা শুষ্ক হতে শুরু করল ফলে তার শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়াটা কষ্ট সাধ্য হয়ে প্রায় অম্ভব হয়ে পড়ল, বিশাল স্পঞ্জের মতো যেন কিছু তার মুখ পূর্ণ করে রয়েছে।
ভয় ও তৃষ্ণায় সে সময়ের বহতা হারিয়ে ফেলল; এবং মনে হল বছর পার হয়ে গিয়েছে। নেফার নিজেকে ইন্দ্রীয় সচেতনহীন অবস্থা থেকে টেনে তুলল যা তাকে ক্রমশ গ্রাস করে ধরেছিল। সে বুঝল কিছু একটা পরিবর্তন হয়েছে। সে বুঝার চেষ্টা করল ওটা কি। কিন্তু তার মনটা ছিল অসাড় ও প্রতিক্রিয়া হীন। মিনটাকা তার পাশে স্থির হয়ে বসে আছে। নেফার তাকে ভয়ার্ত ভাবে চাপ দিল। জবাবে সে নড়াচড়া ও মৃদু কম্পন অনুভব করল।
সে এখনো জীবিত। তার দুজনেই জীবত, কিন্তু সমাহিত, শুধুমাত্র নিজেদের দেহের কিছু ছোট অংশ নড়াচড়া করতে সক্ষম।
নেফার অনুভব করল আবার তাকে ঘিরে ফেলছে যেন কোন জল কুন্ডলী, বিশাল উন্মুক্ত নদীর মাঝে যার অবস্থান। সে নিজেকে অন্ধকার থেকে জোর করে টেনে তুলল এবং শোনার চেষ্টা করল। কিন্তু সে কিছুই শুনল না যা তাকে জাগিয়েছে। কোন শব্দ ছিল না। খামসিনের হুংকারের উচ্চশব্দ গভীর নিরবতা দিয়ে গেছে। একটা বদ্ধ কবরের নীরবতা, সে ভাবল, এবং ভয় পূর্ণ শক্তিতে ফিরে এল আবার।
সে আবার লড়াই করতে শুরু করল, বালি থেকে বের হবার রাস্তা তৈরির চেষ্টা করল। অবশেষে কোন রকমে সে তার ডান হাত মুক্ত করে হাতটা বাড়াল এবং মিনটাকার ঢাকা মাথাটা খুঁজে পেল। সে তার মাথায় হাত বুলালো এবং নীরবতার মাঝেও তার কাতর কণ্ঠের কান্না শুনল। তাকে আশ্বস্ত করতে সে কথা বলার চেষ্টা করল। কিন্তু তার স্ফীত শুষ্ক জিভ তাকে কোনো শব্দ বের করতে দিল না। এর পরিবর্তে সে তখন হাত সরিয়ে হিল্টোকে স্পর্শ করার উদ্দেশ্যে সামনে বাড়ালো, যে তার অপর পাশে বসে আছে। হয় হিল্টো চলে গেছে অথবা তার হাতের সীমার বাইরে আছে, কারণ সে কিছুই স্পর্শ করল না।
একটু সময় বিশ্রাম নিয়ে আরেকবার নিজেকে টেনে তুলল নেফার এবং গুহার প্রবেশ মুখের বালি পরিষ্কার করার চেষ্টা করল। কিন্তু ভেতরে অল্প স্থানই ছিল বালুগুলো সরিয়ে রাখার জন্যে। প্রতি বারে এক মুঠো করে সে তা সরাল এবং ধাক্কা দিয়ে তাদের ক্ষুদ্র কক্ষের এক কোনায় রাখল। শীঘ্রই সে তার ডান হাতের সীমার সবচেয়ে দূরে পৌঁছে কাজ করতে সামর্থ্য হল, প্রতিবার অল্প করে বালি তুলে ফেলছিল। এটা ছিল একটা হতাশজনক প্রয়াস কিন্তু সে জানে তাকে অবশ্যই চেষ্টা করতে হবে। নইলে আশা ছেড়ে ভাগ্যের হাতে জীবন সমর্পণ করা ছাড়া আর কিছু করার নেই।
হঠাৎ সে অনুভব করল বালির ধারা তার নিচে নেই। এমনকি তার মাথার কাপড়ের ভাজের মধ্য দিয়ে সে সতেজ বাতাসের ঝটকা অনুভব করল যা গুহার মধ্যে নব জীবন সঞ্চারিত করল এবং সে তার চোখের পাতার উপর আলোর ক্ষীণ প্রভা সম্পর্কে সচেতন হল। বহু কষ্টে সে তার মুখের উপর থেকে কাপড়টা খুলে ফেলতেই আলোটা আরো জোরালো হল এবং বাতাস তার শুষ্ক মুখ ও যন্ত্রণায় কাতর ফুসফুসে মিষ্টি দোলা দিয়ে গেল। সে তার একটি চোখ অর্ধেক খুলল, সাথে সাথে আলোতে সে প্রায় ধাধিয়ে গেল। তার দৃষ্টি মানিয়ে গেলে সে দেখল বাইরের দিকে একটি গর্ত সে করেছে যা তার বৃদ্ধাঙ্গুল ও তর্জনীর বৃত্ত থেকে বড় না, কিন্তু বাইরে সম্পূর্ণ নীরবতা। ঝড় থেমে গেছে।
উত্তেজিত ও নতুন আশা নিয়ে সে কাপড়টা টান দিল যা মিনটাকার মাথা ঢেকে রেখেছে। সাথে সাথে সে তাকে সতেজ বাতাসে দমের নিঃশ্বাস নিতে শুনল। নেফার কথা বলার চেষ্টা করল, কিন্তু আবারও তার কণ্ঠ তাকে নিরাশ করল। সে নড়ার চেষ্টা করল, ভারি বালির ভয়ংকর থাবা থেকে পালাতে চেষ্টা করল, কিন্তু তার দেহ এখনো বগল পর্যন্ত বালির নিচে বন্দী।
