বালি ও বাতাসের ঘূর্ণনের মাঝে টর্ক চিৎকার করে উঠল, আমাকে বাঁচাও! আমাকে বাঁচাও, ইশতার! আমি তোমাকে তোমার সর্বোচ্চ লোভনীয় স্বপ্নের চাইতেও বেশি পুরস্কার দেবো।
এই কান ফাটানো গর্জনের মধ্যে তার কথা কেউ যে শুনবে এটা অসম্ভব। আর ঠিক তখন সে অনুভব করল ইশতার তার হাত ধরেছে এবং সজোরে ধরে তাকে সর্তক করতে চাচ্ছে।
তারা হোঁচট খেয়ে পড়ল, মাঝে মাঝে হাঁটু পর্যন্ত বালিতে ডুবে যাচ্ছিল যা পানির মতো প্রবাহিত হচ্ছে। একটা বাঁধায় পা আটকে টর্ক হোঁচট খেয়ে পড়ে গেল এবং ইশতারের সাথে সংযোগ হারিয়ে ফেলল। সে আতংকে তাকে অন্ধের মতো খুঁজল। তখন সে ঐ বস্তুটি স্পর্শ করল যা তাকে ফেলে দিয়েছে এবং বুঝল এটা একটা ফেলে যাওয়া রথ তার পাশে পড়ে আছে। সে ইশতারের উদ্দেশ্যে চিৎকার করল, চক্রাকারে টলমল পায়ে ঘুরল। ইশতার হাত দিয়ে তার দাড়ি আকড়ে ধরে তাকে পথ দেখাল। সে বালিতে প্রায় ঝলছে যাচ্ছে, অন্ধ হবার উপক্রম এবং বালিতে ডুবে যাচ্ছে।
সে হাঁটু পর্যন্ত ডুবে গেল এবং ইশতার তাকে আবার টেনে তুলল, এতে তার এক মুঠো দাড়ি ছিঁড়ে গেল। টর্ক কথা বলার চেষ্টা করল কিন্তু মুখ খুলতেই বালি দ্রুত মুখের ভেতর ঢুকে পড়ল এবং তার দম আটকে গেল। সে অনুভব করল যেন সে মারা যাচ্ছে, কোন মানুষের পক্ষে এই ভয়ংকর পরিস্থিতির মধ্যে বাঁচা সম্ভব না। মনে হল এটা সীমাহীন, এ যেন তাদের লক্ষ্যহীন এক যন্ত্রণাদায়ক কোনো যাত্রা। তারপর আচমকা সে অনুভব করল বাতাসের বেগ শেষ হয়ে গেল। কিন্তু গর্জন তখনো থামে নি–পক্ষান্তরে মনে হল তা তখনো চড়াও হচ্ছে। তাদের অবস্থা মাতালের মতো, হেলে দুলে এক জন অন্যজনের সাথে ঠেস খাচ্ছে যেন দুজন মাতাল একে অপরকে সরাইখানা থেকে বাড়ির পথ দেখানোর চেষ্টা করছে। বাতাসের শক্তি পড়তির দিকে। একটা অনিশ্চিত ও দ্বিধান্বিত পথে, টক ভাবল কোন ভাবে ইশতার তাদের রক্ষা করার জন্য কোন যাদু চেলেছে, কিন্তু তখন একটি আকস্মিক ঝাঁপটা তাকে প্রায় শূন্যে তুলে ফেলে দিল এবং তাদের বন্ধন ভেঙে দিল যা ইশতার ও তার দাঁড়ির মধ্যে স্থাপিত ছিল। সে একটা পাথরে দেয়ালের উপর এতো জোরে গিয়ে পড়ল যে তার মনে হল বুঝি তার ঘাড়ের হাড় ভেঙে গেছে। সে তার হাঁটু ভেঙে পড়ে গেল এবং পাথরে ঝুলে রইল, একটি শিশু যেমন তার মাতৃ দুগ্ধে ঝুলে থাকে। কীভাবে ইশতার তাদের এখানে নিয়ে এসেছে সে তা জানে এবং এর তোয়াক্কাও করে না। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যে তাদের উপর পূর্বের ঝড়টি পূর্ণ গতিতে ভেঙে পড়েছে। সে অনুভব করল ইশতার তার পাশে হাঁটু ভর দিয়ে বসে আছে এবং কাপড় তুলে তার মাথা ঢেকে দিল সে। তারপর ইশতার তাকে পর্বতের আশ্রয়ে ধাক্কা দিয়ে সমতলে শুইয়ে দিয়ে তার পাশে শুয়ে পড়ল।
৬. ক্ষুদ্র গুহা
ক্ষুদ্র গুহার মধ্যে নেফার হামাগুড়ি দিয়ে মিনটাকার কাছে গেল এবং তাকে তার বাহুতে টেনে নিল। সে তার সাথে কথা বলার ও তাকে সান্ত্বনা সাহস দিতে চেষ্টা করল। কিন্তু দুজনেরই মাথা কাপড়ে ঢাকা এবং বাতাসে সব শব্দ হারিয়ে যাচ্ছে। মিনটাকা তার মাথা নেফারের কাঁধে রাখল এবং তারা একে অপরকে আঁকড়ে ধরল সজোরে। গর্জনরত অন্ধকারে তারা যেন সমাহিত। প্রত্যেকটি গরম শ্বাস তারা কাপড়ের মধ্য দিয়ে হেঁকে টানছে এবং প্রতিবারে একটু করে দম নিচ্ছে তারা, যা সাদা সুন্দর বালি তাদের ঠোঁটের মধ্যে দিয়ে যাওয়াটা প্রতিরোধ করছে।
কিছুক্ষণ পর বাতাসের গর্জন তাদের বধির করে দিল এবং তাদের অন্য অনুভূতিগুলো ভোঁতা করে দিল। কোন বিরতি বা ক্লান্তি ছাড়াই তা বয়ে চলল অবিরত। সময়ের আবর্তন পরিমাপ করার জন্য তাদের কোন পথ ছিল না, শুধুমাত্র তাদের চোখের পাতার মধ্যে দিয়ে আলো ও আধারের ন্যূনতম সচেতনা ব্যতীত। দিনের আগমন নির্দেশ করতে সেখানে একটা ক্ষীণ আলোর আভা ছিল; যখন রাত নামত তখন তা ঘোর অন্ধকারে বিলীন হয়ে যেতো। নেফার কখনোই এমন পূর্ণ ও অসীম অন্ধকারকে সহ্য করতে পারেতো না যদি সে মিনিটাকার দেহের খুব কাছে থাকতো। অন্য সময় হলে ভাবতো সে হয়তো পাগল হয়ে গিয়েছে।
প্রতিবার যখন দীর্ঘ সময়ের জন্যে মিনটাকা তার দিকে ঝুকতো তখন সে তার নিজের বাহু দিয়ে তার বাহু চাপ দিয়ে তাকে আশ্বস্ত করতো। হয়তো কখনও নেফার ঘুমিয়ে পড়তো কিন্তু সেখানে কোনো স্বপ্ন থাকতো না, শুধুমাত্র খামসিনের গর্জন ও অন্ধকার ছাড়া।
আরো অনেকক্ষণ পর সে তার পা নড়াতে চেষ্টা করল, কিন্তু সে পারল না। অজানা আতংকে সে ভাবল সম্ভবত সে তার দেহের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে। অর্থাৎ সে দুর্বল ও মারা যাচ্ছে। সে তার পুরো শক্তি দিয়ে আবার চেষ্টা করল এবং কোনভাবে তার পা ও পায়ের পাতা নড়াল, তখন সে বুঝল সে বালির ফাঁদে পড়েছে যা তাদের আশ্রয়ের জেবরা দেয়ালের ছোট ছোট ফুটো দিয়ে ঢুকেছে। এরই মধ্যে তা তার কোমর সমান উঁচু হয়ে গেছে। তারা ধীরে ধীরে জীবন্ত সমাহিত হতে যাচ্ছে। ঐ কুচক্রী মৃত্যুর চিন্তা তাকে ভয়ে পূর্ণ আতংকিত করে তুলল। তার নগ্ন হাত দিয়ে সে তার পা নাড়নোর মতো সামর্থ হওয়ার জন্য যথেষ্ট বালি সরাল এবং মিনটাকার জন্যে একই কাজ করল।
সে বুঝল অন্যরাও জানাকীর্ণ গুহার ভিতরে একই কাজ করছে, বালি দূরে সরানোর চেষ্টা করছে কিন্তু তা পানির মতো চুয়াচ্ছে। এটা তাদের উপর ঘূর্ণায়মান ধুলার ঘন মেঘ হয়ে ন্যস্ত হয়েছে যেন।
