ঐ অদ্ভুতের বাইরে, মেঘহীন প্রভা, তারা দেখল; ওটা আসছে। ওটা ছিল শক্ত মেঠো বর্ণের বালির দেয়াল যা মাটি থেকে উঠে আকাশের উঁচু পর্যন্ত পৌঁছে গেছে।
খামসিন! টর্ক ফিসফিসিয়ে ভয়ংকর শব্দটা বলল।
বাতাস বাহিত বালির দেয়ালটা তাদের দিকে ভয়ংকর ধীরতা নিয়ে এগিয়ে আসছে। জীবন্ত প্রাণীর ন্যায় ওটা দোলল ও স্পন্দিত হল এবং ওটার কণ্ঠ বদলে গেল। এখন আর ফিসফিসানি নেই। গর্জনে পরিণত হয়েছে তা। এক শয়তানের কণ্ঠ।
খামসিন? শব্দটা রথ থেকে রথে ধ্বনিত হল। কোন যোদ্ধার আর যুদ্ধ করার মতো উৎসাহ নেই এখন। ছোট ভয়ার্ত এই ঝড়টা মানব, শহর ও সভ্যতা ধ্বংস কারীর চেহারায়, বিশ্ব খাদকের ভূমিকায় আবির্ভূত হয়েছে।
রথের সারি শৃংখলা হারিয়ে ফেলল এবং ছোট ছোট হয়ে ভেঙে গেল। তারপরও রথীরা চাকা ঘুরিয়ে ওটা থেকে পালানোর চেষ্টা করল প্রাণপনে।
যখনই তারা শক্ত ভূমির সরু রাস্তা থেকে সরে গেল বালির তাদের চাকাগুলোকে টেনে ধরল। লোকজন ককপিট থেকে লাফিয়ে নামল এবং তাদের যান ছেড়ে দিল, ঘোড়াগুলোকে বাঁধা অবস্থাতেই ফেলে পালাতে লাগল। সহজাত প্রবৃত্তিতে ঘোড়গুলো বিপদ বুঝতে পারল এবং পিছনে তাকাল এবং চিৎকার করল, পালানোর চেষ্টা করছে, লাথি মেরে নিজেদের লাগাম থেকে মুক্ত করতে চেষ্টা করল।
খামসিনটা নির্মম ভাবে আঘাত হানল তাদের উপর। ওটার কষ্ঠ গর্জন থেকে হুংকারে পরিণত হয়েছে এখন। নির্মম যন্ত্রণায় লোকগুলো ওটার আগে ছুটল জীবন বাজি রেখে।
তারা পিছলে গেল এবং নরম বালিতে আছড়ে পড়ল, নিজেদের আবার টেনে তুলে দিল দৌড়। পিছনে তাকিয়ে দেখল বিশাল ঝড়টা দ্রুত এগিয়ে আসছে, পাগলা দৈত্যের ন্যায় গর্জন করতে করতে নিজের উপর গড়াগড়ি খাচ্ছে, বালির পর্দাটা বারবার পাকিয়ে উঠছে। সূর্যালোক যেখানে তাদের উপর পড়ছিল সে স্থানটা চকচক করে উঠছিল। বাকি অংশটুকু ছিল পিঙ্গল ও অন্ধকার। টাইটা তার হাত ও লাঠি প্রসারিত করে দাঁড়াল এবং তার নিচে সেনাবাহিনীকে বন্দী হতে দেখল। সে দেখল টর্ক ও ইশতার এখানে একজোড়া মূর্তির মতো সূর্যালোকে দাঁড়িয়ে আছে, এবং তারপর, যখন ঝড়টার সামনের দিকে তাদের কাছে পৌঁছে গেল, তারা যাদুর দ্রুততা নিয়ে চলে গেল। তারা এবং তাদের সকল লোক, রথ ও ঘোড়াগুলো খামসিনের ঘূর্ণনরত ঢেউ-এ ঢুকে গেল।
টাইটা তার হাত নামিয়ে দৈত্যটার দিকে তার পিঠ ঘুরিয়ে ধীরে ধীরে গিরি থেকে নামতে শুরু করল। তার দীর্ঘ পাগুলো বন্ধুর স্থানটির এক পাশ থেকে অন্য পাশ পর্যন্ত প্রসারিত হল এবং সে তার লাঠির উপর ঝুঁকে কিনার থেকে কিনারে পা এলিয়ে এগিয়ে চলল।
নেফার ও মিনটাকা পর্বতের পাদদেশে হাতে হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে। তারা তাকে বিমোহিত অভিব্যক্তি নিয়ে স্বাগত জানাল এবং মিনটাকার কণ্ঠ চাপা ও অবিশ্বাসী। সে জিজ্ঞেস করল, আপনি ঝড়টা ডেকে এনেছেন।
এটা গত কয়েক দিন যাবৎ সৃষ্টি হচ্ছিল; টাইটা বলল। তার চেহারা অভিব্যক্তিহীন এবং কণ্ঠ দ্ব্যর্থ। তোমরা তাপ ও বিষাদময় হলুদ কুয়াশাটা নিশ্চয় লক্ষ্য করেছ।
না; নেফার বলল। এটা প্রকৃতিতে ছিল না। এটা তুমি, তুমিই সব জানতে ও বুঝেছিলে। তুমি ওটাকে ডেকে এনেছে এবং আমি এ বিষয়ে তোমাকেই সন্দেহ করছি।
এখন নিরাপদ আশ্রয়ে যাও; টাইটা বলল। এটা প্রায় আমাদের উপর–আসছে। তার কণ্ঠ খামসিনের বেসুর আওয়াজে হারিয়ে গেল। মিনটাকা পথ। দেখিয়ে এগুগো, নিচু সরু গুহার মধ্যে হামাগুড়ি দিয়ে রুক্ষ দেয়ালের খোলা মুখ দিয়ে ঢুকল। অন্যরা তাকে অনুসরণ করল, ক্ষুদ্র জায়গায় গাদাগাদি হয়ে অবস্থান নিল সবাই। ভেতরে ঢোকার ঠিক পূর্বে হিল্টো প্রায় খালি হয়ে যাওয়া পানির থলেটা তুলে নিল এক হাতে।
শেষে, শুধুমাত্র টাইটা আশ্রয় স্থানের বাইরে রইল। প্রায় যেন ঝড়টা তার সৃষ্টি এমনভাবে তার চেহারা অভিব্যক্তিহীন রইল এমনকি যখন তা তার উপর আবছা ভাবে পড়ল তখনও। এতো জোরে ঝড়টা আঘাত হানল যে তাদের আশপাশের পাথরগুলোকে মনে হল যেন দুলে উঠল ও কেঁপে উঠল এবং টাইটা এর ভেতরে ঢুকে গেল, তার লম্বা অবয়বটা তার মাঝে উধাও হয়ে গেল। প্রথম ঝটকা করে কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী হল ঝড়টা। কিন্তু যখন তান্ডব শেষ হল দেখা গেল টাইটা তখনও সেখানে অনড় ও স্থির। ঝড়টা ক্ষিপ্ত দ্বৈতের ন্যায় গর্জন করে নিজেকে সমর্পণ করল এবং ওটা তার সমস্ত ভয়ংকর শক্তি তাদের উপর সজোরে নিক্ষেপ করল। টাইটা, গুহার খোলা মুখ দিয়ে নিচু হয়ে ভেতরে ঢুকে তার পিঠ ভেতরের দেয়ালে লাগিয়ে বসে রইল।
এটা বন্ধ করে দাও, সে বলল এবং ম্যারন ও হিল্টো প্রবেশ পথটা তাদের হাতের কাছে থাকা পাথর দিয়ে বন্ধ করে দিল।
তোমাদের মাথা ঢাকো; টাইটা বলল এবং হাতের কাপড় দিয়ে তারা চেহারা ঢাকল। চোখ বন্ধ কর, নইলে তোমরা তোমাদের দৃষ্টিশক্তি হারাবে। সর্তকভাবে তোমাদের মুখ দিয়ে নিশ্বাঃস টেনে নাও নইলে ভেতরে বালি টেনে নেবে।
*
ঝড়টা এতো শক্তিশালী ছিল যে ওটা প্রথম টানে টর্কের রথ তুলে নিল এবং ঘোড়াগুলোসহ পাকিয়ে তা ধ্বংস করে দিল, আর্তনাদ করতে করতে প্রাণীগুলো লুটিয়ে পড়ল।
টর্ক দূরে নিক্ষিপ্ত হল। নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জন্যে সে লড়াই করল। কিন্তু আবার তাকে আঘাত করল ঝড়টা, কোন রকমে সে নিজেকে দাঁড় করাল তার সকল পশুর শক্তি ব্যবহার করে, কিন্তু সে চলার পথের সকল জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। যখন সে তার চোখ খোলার চেষ্টা করল, বালিতে সে অন্ধ হয়ে গেল। সে জানল না কোন দিকে সে যাচ্ছে কিংবা কোথায় পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা উচিত। ঝড়টার কর্কশ গতি তার গাল ও ঠোঁট থেকে ঘষা দিয়ে শক্ত চামড়া তুলে ফেলল যতোক্ষণ না সে ওগুলো তারহাতের কাপড় দিয়ে ঢাকল রক্ষা করতে।
