এই জেবরার কি হবে? নেফার তার পিছনে চিৎকার করে বলল। এটা কি উদ্দেশ্যে করা হল?
টাইটা তাদের থেকে ৩০ ফুট উপরে সংকীর্ণ তাকের উপর থেমে নিচে তাকাল। সময় হলেই মহামান্য তা জানবেন। টাইটা আবার চড়তে শুরু করল।
একটি লুকানোর স্থান? একটি কবর, সম্ভবত? নেফার তাকে ব্যঙ্গ করল কিন্তু টাইটা কোন উত্তর দিল না কিংবা ফিরেও তাকাল না।
বিশ্রাম কিংবা না থেমেই টাইটা এক নাগারে চড়ে গিরির চূড়ায় পৌঁছল। সেখানে সে দাঁড়িয়ে যে দিক থেকে টর্ক আসতে পারে সে দিকে তাকিয়ে রইল এক দৃষ্টিতে।
গিরি শৈলীর পাদদেশ থেকে ছোট দলটাকে দেখতে লাগল–কিছু হতাশা, কিছু আশা নিয়ে এবং কিছুটা রাগান্বিত হয়ে।
নেফার নিজেকে তুলল। রথ থেকে বলুম ও অন্যান্য অস্ত্র নিয়ে এসো। নিজেদের রক্ষা করার জন্য আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে। যেখানে তারা রথ রেখে এসেছে সে দিকে দৌড়ে সবাই। সে হাত ভর্তি বল্লম নিয়ে ফিরল এবং ম্যারন ও হিল্টো তার পিছনে একই ভাবে অনুসরণ করল। টাইটা কি করছে? সে মিনটাকাকে জিজ্ঞেস করল। সে চূড়ার দিকে নির্দেশ করে বলল,
সে নড়েছে না।
তারা অস্ত্রগুলো সাজিয়ে রেখে রুক্ষ পাথরের আশ্রয়ে প্রবেশ মুখে বসল। সবার চোখ আবার টাইটার দিকে গেল।
ভয়ংকর সালফার আকাশের নিচে সে একটি সংক্ষিপ্ত রূপরেখা যেন। কেউ কথা বলল না। কেউ নড়ল না। যতোক্ষণ না তারা সেই ভয়ংকর শব্দটা আবার শুনল। প্রচন্ড ভয় নিয়ে তারা শত শত রথের চাকার, মানুষের কোলাহল, ক্ষীণ ঝন ঝন ও কিচির মিচির শব্দ শোনার জন্যে তাদের মাথা ঘুরালো, কখনো তা বালিয়াড়িতে চাপা পড়ছিল, কখনও পরিষ্কার ও ভীতিকর শুনালো।
ধীরে ধীরে টাইটা তখন তার দুহাত তুলে আকাশের দিকে নির্দেশ করল। সে গতিটা অনুসরণ করল সকলের চোখ। ডান হাতে সে তার লাঠিটা ধরে আছে আর বা হাতে ধরে রেখেছে লসট্রিসের কবজ এবং গলায় সে পরিধান করে আছে বে-এর দেওয়া উপহারটা।
সে এখন কি করছে? হিল্টো জিজ্ঞেস করল, ভয়ার্ত কণ্ঠে। কেউ তাকে জবাব দিল না। টাইটা এমন ভাবে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল যেন তাকে পাথর কেটে তৈরি করা হয়েছে। তার মাথা পিছনে হেলানো, আর চুলগুলো তার কাঁধের উপর রুপার সুতোর ন্যায় ছড়িয়ে আছে। তার পোশক উপরে উঠানো যার ফলে তার সরু জঙ্গ বেরিয়ে আছে। তাকে নীড়ে থাকা বৃদ্ধ পাখির মতো দেখাচ্ছে।
আকাশটা নিচু, ভারি মেঘে একটা ঘূর্ণি খেয়ে গেল। আলো ক্ষণস্থায়ী হয়ে মলিন হচ্ছে ক্রমশ। হঠাৎ লুকানো সূর্যটা আরো ভারি ভাবে দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল। মেঘমালা পাতলা হয়ে থোয়া উদ্গীরণ করতে লাগল।
তখনো টাইটা নড়ল না, তার লাঠিটা আকাশের গর্ভপূর্ণ পেটের দিকে স্থির করা। আগমনরত বাহিনীর অস্ত্রের ঝনঝন আওয়াজ আরো স্পষ্ট হল এবং হঠাৎ দূরে রাম হর্ণের তুর্য ধ্বনি বেজে উঠল।
এটার যুদ্ধের ডাক। টর্ক টাইটাকে দেখে ফেলেছে, মিনটাকা শান্ত কণ্ঠে বলল।
*
টর্ক তার তুর্য বাদকের উদ্দেশ্যে চেঁচিয়ে উৎসাহ দিল, আরো বাজাও! কিন্তু মনে হল যুদ্ধের শব্দটা শূন্য মরু ও নিচু রাগান্বিত আকাশ সব গিলে ফেলবে।
থামো? ইশতার দি মেডি বলল। সে পাথরের পাহাড়ের উপর টাইটার ক্ষুদ্র দেহটা দেখতে পেয়েছে। থাম!
ওটা কি? টর্ক জানতে টাইল।
এখনও আমি তা বুঝতে পারি নি। ইশতার জবাবে বলল, ওয়ারলকের উপর থেকে তার দৃষ্টি না সরিয়ে। কিন্তু এটা ব্যাপক ও শক্তিশালী।
যুদ্ধ বাহিনী থেমে গেল, ভয়ে প্রত্যেকে চূড়ার উপরস্থ অবয়টার দিকে এক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে। একটা ভয়ংকর নিরবতা নেমে এল মরুতে। সামান্য কোন শব্দও ছিল না। এমনকি ঘোড়াগুলোও স্থির, অস্ত্র-শস্ত্রের কোন ঝন্ঝনানি বা রুন রুন শব্দটা পর্যন্তও নেই।
শুধু মাত্র আকাশ নড়ল। এটা ম্যাগোসের মাথার উপর একটা ঘূর্ণিঝড় তৈরি করল, ধিক ধিক করে জ্বলা মেঘের বিশাল ঘূর্ণিচাকা। তারপর ধীরে ধীরে ঘূর্ণি ঝড়টির কেন্দ্রস্থল খুলে একটা জাগ্রত দৈত্যের চোখে পরিণত হল। ঐ স্বর্গীয় চোখ থেকে চোখ ধাঁধানো আলোর একটি বান ফেটে পড়ল।
হুরাসের চোখ! ইশতার দম নিল, সে প্রভুকে ডেকেছে। ইশতার প্রতিরক্ষার একটা চিহ্ন আঁকল এবং তার পাশে টর্ক নিরব ও শক্ত হয়ে আছে কুসংস্কারাচ্ছন্ন ভয়ে।
চমকপ্রদ আলোর বজ্রটা চূড়ায় আঘাত করল এবং ওয়ারলকের অবয়বকে আলোকিত করে দিল ঠিক অন্ধকারে চমকানো বজ্রপাতের ভারি তীরের মতো। এটা তার মাথার চারপাশে জ্যোতি চক্রের হয়ে ঘুরল। সে তার লম্বা লাঠি দিয়ে একটি ধীর চক্র অতিক্রম করল এবং হিকস্ রথীরা চাকের নিচে অসভ্য কুকুরের মত নুইয়ে পড়ে তার প্রভাবে। তারপর মেঘ প্রশস্ত হয়ে গেল এবং আকাশ হয়ে গেল পরিষ্কার। সূর্যালোক বালিয়াড়ির উপর নেচে উঠল যেন এবং তাদের চোখে তা পলিশ করা ব্রোঞ্জের শীটের ন্যায় প্রতিফলিত হল, চিক চিক করল ও তাদের অন্ধ করে দিল। ঐ অদ্ভুত রশ্মি থেকে নিজেদের চোখ রক্ষা করতে তারা তাদের ঢাল ও হাত তুলল মুখের উপর। কিন্তু তারা কোন আওয়াজ করল না।
চূড়ার উপর টাইটা তার লাঠি দিয়ে আরেকটি ইচ্ছাকৃত বৃত্ত রচনা করল এবং অবশেষে আওয়াজ হল। দীর্ঘশ্বাসের ন্যায় তা ঐ আকাশ থেকে নিঃসৃত হল। সবাই উৎসটা খুঁজতে মাথা ঘুরাল।
আরো একবার টাইটা ইশারা করতেই চাপা শব্দটা শশন্ ধ্বনি, একটা কোমল শীষে পরিণত হল। ওটা পূর্বে থেকে আসছে এবং সবার মাথা ওদিকে ঘুরে গেল ধীরে ধীরে।
