ঘোড়াগুলোর পুরোটাই কাদার ডুবে গেছে। শুধু তাদের মাথা ও সামনের অংশ মুক্ত ছিল। কিন্তু যখন ভয়ে তারা মৃদু হ্রেষাধ্বনি তুলল এবং নড়ল তখন আরো গভীরে তারা ডেবে যেতে লাগল।
নেফার হতভম্ব হয়ে গেল এবং চোখের সম্মুখে ঘটা বিপদে খুব ধীর প্রতিক্রিয়া দেখাল। সে ঘুরে যাওয়ার প্রয়াস নিল কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। তার রথের চাকা কেন্দ্রস্থল পর্যন্ত ডুবে গেছে এবং দুটি ঘোড়াই কাঁধ পর্যন্ত কাদায় ডুবে গেছে। সে তাদের সাহায্য করতে লাফিয়ে নামল। হার্নের্স খোলার এবং তাদের ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে সে আঠালো কাদার ফাঁদে আটকা পড়ল, হাঁটু অবধি সে ডুবে গেল এবং তারপর কোমর পর্যন্ত। দাঁড়িয়ে থাকার চেষ্টা করো, মিনটাকা তাকে পাগলের মতো সতর্ক করল। এটা তোমাকে নিচে নিয়ে যাবে, নিজেকে চিৎ কর ও সাঁতার কাট।
মিনটাকা নিজেকে ডুবন্ত যান থেকে অধোমুখে নিক্ষেপ করল এবং কম্পমান কাদার সমতলে পড়ল। এইভাবে নেফার, আমি যেমন করছি।
সে তার বুদ্ধি ফিরে পেল এবং উপরি ভাগে সমতল হয়ে হাত পা ছড়িয়ে দিল। একটা অস্বস্তিকর সাঁতারের চেষ্টা করল সে যার গতিবেগ শিক্ষারত শিশুর হাঁটার মতো। রথটা পুরোপুরি চোরাবালিতে অদৃশ্য হবার আগে সে ওটার নিকট গেল। ছুরি দিয়ে চামড়ার রশিটা কেটে কাঠের পাদানিটা খুব দ্রুত উপরে ছিঁড়ে আনল এবং ওগুলো নিক্ষেপ করে ভাসিয়ে দিল। পাদানিটা বালির উপরি স্তরে ভেসে রইল, আর ভারি রথটা ততোক্ষণে নিপুণভাবে স্তরের নিচে পিছলে গেল এবং ঘোড়াগুলোকেও তার সাথে টেনে নিয়ে নিল। কয়েক মিনেটের মধ্যে সেখানে বালিয়াড়ির রং এর সমতলে এক ক্ষুদ্র পুচ্ছ রইল শুধু তাদের দুর্দশা চিহ্নিত করতে।
হিল্টোর রথও নিচে চলে গেছে এবং সেই সাথে তার ঘোড়াও। সে ও ম্যারন বৃথা চেষ্টা করছে, ভয়ে চিৎকার করছে, কোন রকমে শুধু তাদের কাদায় মাখা মাথা ও কাঁধ জাগিয়ে তারা ভেসে আছে।
নেফার একটা তক্তা মিনটাকার দিকে ঠেলে দিল। এটা ব্যবহার কর! যে তাকে আদেশ দিল এবং সাথে সাথে মিনটাকা হামগুড়ি দিয়ে ওটার উপর চড়ে বসল।
সে অন্য একটা তক্তা চামড়ার রশি ধরে টেনে নিয়ে কোন রকমে কাদার ফাঁদ গলে নিজেকে হিল্টো ও ম্যারনের কাছাকাছি নিক্ষেপ করার মত নিকটে গেল। অবশেষে তারা নিজেদের কাদার ক্ষুধার্ত থাবা থেকে টেনে বের করল একে অন্যের সাহায্য নিয়ে। চারজনের সবাই কঠোর সাঁতার কেটে ফিরতে লাগল। টাইটা ও বে শক্ত ভূমি থেকে ভয়ে ভয়ে তাদের দেখছে।
টাইটা তার হাত নেড়ে সতর্ক চিৎকার করল, তোমাদের এখনো অর্ধেক পথ বাকি। এখানে ফিরে এসো না। চালিয়ে যাও। অন্য পাশ দিয়ে অতিক্রম কর।
নেফার সঙ্গে সঙ্গে তার কথার ইঙ্গিতটা বুঝল। তারা দুরের অন্য তীরের দিকে ঘুরল। ধীর ও কষ্ট সাধ্য ছিল কাজটা। কারণ কাদা তাদের বাহু ও পা এবং তার তল দেশে শক্ত করে আটকে থাকতে চায়। মিনটাকা তার হালকা ওজন কাজে লাগাল এবং অন্যদের চেয়ে এগিয়ে গেল। প্রথমে সে শক্ত মাটিতে পৌঁছে নিজেকে চোরাবালির কবল থেকে মুক্ত করল। অবশেষে নেফার, হিল্টো ও ম্যারন তাকে অনুসরণ করল। তারা প্রায় নিঃশেষিত। পূর্ব দিকের বালিয়াড়ির পাদদেশে পৌঁছে তারা গা ছেড়ে বসল অবশেষে।
তারা পেরোতেই তাদের দুর্দশা নিয়ে টাইটা তার চিন্তা করার সময়টা পেল। এটা মনে হচ্ছিল আশাতীত। তারা দুই ভাগে ভাগ হল, তাদের মাঝে দুইশ কিউবিট প্রশস্ত উপসাগর। তারা তাদের অস্ত্র ও মালপত্র হারিয়েছে কিন্তু সবচইতে বেশি খারাপ যা তা হল মূল্যবান পানির থলেও। বে তার বাহু স্পর্শ করে ফিসফিস করে বলল, শুনুন!
বাতাসে একটা চাপা গুঞ্জন, অনেক দূরে। মাঝে মাঝে ক্ষীণ হচ্ছে, তারপর। আবার জোরালো হচ্ছে। একটি দূরবর্তী প্রতি ধ্বনি বালিয়াড়ির দেয়াল ঘেষে বার বার প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। যদিও ক্ষীণ তবুও তা নির্ভুল; এক সারি যুদ্ধ রথের বহর এগিয়ে আসার শব্দ তা।
উপত্যকার অন্য তীরে কাঁদায় ঢাকা তিনটি অবয়বও শব্দটা শুনল এবং উঠে দাঁড়াল। তারা সবাই বালিয়াড়ির ভেতর দিয়ে পিছনে চেয়ে রইল এবং টর্ক ও তার লোকদের দ্রুত এগিয়ে আসতে শুনল। হঠাৎ করে মিনটাকা চোরা বালির কিনারে দৌড়ে গেল যেখানে তারা তক্তাগুলো ছেড়ে এসেছিল, যা তাদের বয়ে এনেছে। নেফার তার পিছনে তাকিয়ে রইল, তার ইচ্ছা বোঝার চেষ্টা করছে। মিনটাকা তক্তাগুলো একত্রিত করল এবং হাঁটু পর্যন্ত নেমে চামড়ার রশি ধরে তার পিছন পিছন টেনে আনল।
নেফার হঠাৎ করেই বুঝল সে কি করছে, কিন্তু তাকে থামাতে তার বেশি দেরি হয়ে গেল। মিনটাকা নিজেকে একটা তক্তার উপর সমতলে ফেলে হলুদ কাদায় ভেসে এগুতে শুরু করল। নেফার তাকে থামাতে কোমর পর্যন্ত নামতে বাধ্য হল কিন্তু ততোক্ষণে সে তার আয়ত্তের বাইরে চলে গেছে।
ফিরে এসো; সে তাকে পিছন থেকে ডাকল, আমিও যাবো।
আমি তোমার চেয়ে হালকা ও দ্রুতগামী। সে বলল। নেফারের শত অনুনয় সে অবহেলা করে তার সব দম ও শক্তিকে ব্যবহার করল সামনে ভেসে যাওয়ার জন্যে।
রথের আওয়াজ জোরালো হল এবং মিনটাকা আরো জোরে চেষ্টা করল এগিয়ে যেতে। তার এ ধরনের কাজ দেখে তার নিরাপত্তার কথা ভেবে নেফারের রাগ হলো, কিন্তু তার চেয়ে বেশি গর্ব হলো তার অহংকার ও তার সাহসের জন্য। তার হৃদয় একজন যোদ্ধা ও একজন রাণীর হৃদয়ের মতোই। নেফার ফিসফিস করে বলল। অবশেষে মিনটাকা অন্য তীরের কাছাকাছি পৌঁছে গেল।
