ক্ৰাতাস ব্যতীত আর সবাই তার দিকে হত-বিহ্বল ভাবে চেয়ে রইল। সেই প্রথম এ দুঃসংবাদের আঘাত সামলে উঠল। তার দুঃখ ক্রোধে পরিণত হল। সে ধীরে ধীরে তার পায়ের উপর ভর করে দাঁড়াল এবং নাজা ও তার দেহরক্ষীদের পানে ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে তাকাল, ঠিক যেভাবে কাদায় নিমজ্জিত একটা ষাঁড়ের বাচ্চা একটা অর্ধবয়স্ক সিংহের বাচ্চা দেখে অবাক হয়। কোন ধৃষ্টতায় বাজপাখির মোহর তুমি তোমার বাহুতে পরিধান করেছে? নাজা, টিমলাট এর পুত্র; যে কিনা একজন হিক এর গর্ভে জন্মেছে। আর যার তলোয়ার তুমি কোমরে ঝুলিয়েছ তার পায়ের নখের যোগ্যও তো তুমি নও। ক্রাতাসের টেকো মাথা রাগে লাল হয়ে উঠল।
মুহূর্তের জন্যে নাজা হতভম্ভ হয়ে পড়ল। আশ্চর্য! এই বৃদ্ধ দানবটা তার মায়ের গোপন ব্যাপারটা জানল কি করে! খুব গোপন ছিল বিষয়টা। টাইটা ছাড়া এই একজন ব্যক্তি আছে যে তার কাছ থেকে দ্বৈত মুকুট ছিনিয়ে নেবার যোগ্যতা রাখে।
নিজের অজান্তে সে এক পা পিছিয়ে গেল। আমি প্রিন্স নেফারের রাজ-প্রতিভূ এবং সে অধিকার বলে এই নীল বাজপাখির সীল মোহর পড়েছি। সে উত্তর দিল।
না। কাতাসের কণ্ঠে বজ্রপাত হল। তোমার সে অধিকার নেই। শুধু মাত্র মহান ও মহৎ ব্যক্তিদেরই এই নীল বাজপাখির সীল মোহর পরার অধিকার রয়েছে। ফারাও ট্যামোসের সে অধিকার ছিল, ট্যানোস, লর্ড হারাব-এরও তা ছিল এবং তাদের পূর্বোক্ত মহান রাজাদেরও। কিন্তু তুমি, ছিঁচকে চোর, অবিশ্বস্ত কুকুর, তোমার কোন অধিকার নেই।
যুদ্ধ ক্ষেত্রে সৈন্যরা আমাকে এ দায়িত্ব দিয়েছে। আমি প্রিন্স নেফারের রাজ প্রতিভূ।
ক্ৰাতাস এবার এগিয়ে এল। তুমি কোন সৈন্য নও, তুমি হচ্ছ ঐ বেজন্মা হিকদের রক্তধারী। এমনকি তুমি কোন নাগরিক নও, কোন দার্শনিকও নও, তুমি শুধু ফারাও-এর সুদৃষ্টির কারণে একটি স্থান অর্জন করেছে। আমি ফারাওকে তোমার ব্যাপারে অন্তত ১০০ বার সাবধান করেছিলাম।
পিছু হট, বৃদ্ধ বোকা! নাজা তাকে সর্তক করল। আমি ফারাও-এর স্থানে দাঁড়িয়ে। তুমি যদি আমাকে অপদস্ত কর তবে তা মিশর ও তার মুকুটকে অপমান করার সমান হবে।
আমি তোমার কাছ থেকে সীল মোহর ও তলোয়ার কেড়ে নিচ্ছি। কাতাস নিজের অবস্থানের কথা ভুলে গেল। তারপর আমি মনের স্বাদ মিটিয়ে তোমার পিঠের ছাল চাবকে তুলে নেব।
ডান পাশে দাঁড়ানো আসমর তখন নাজার কানে ফিসফিসিয়ে বলল, বিদ্রোহের শাস্তি মৃত্যুদন্ড।
তৎক্ষনাৎ নাজা তার সুযোগটা কাজে লাগাল। বৃদ্ধের জলন্ত চোখের দিকে সে সরাসরি তাকাল। তুমি একটা পুরোনো বাতাস ও গোবর দলা। সে তাকে চ্যালেঞ্জ করল, তোমার দিন শেষ, ক্ৰাতাস, বুড়ো হাদারাম। মিশরের রাজপ্রতিভূর দিকে আঙ্গুল তোলার সাহস দেখানো ঠিক নয় তা তোমার জানা উচিত।
সে যেরূপ আশা সে করেছিল, অপমানটা ক্রাতাসের জন্যে ভারি হয়ে পড়ল। সে ছুটে তার দিকে তেড়ে এল। বয়সের তুলনায় সে আশ্চর্য রকম ক্ষিপ্ত ও শক্তিশালী ছিল। সে নাজাকে ঝাঁপটে ধরে দুহাতে শূন্যে তুলে ধরল এবং বাজপাখির মোহরটা কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করল।
তুই এটার যোগ্য না।
থামাও! নিজের চার পাশে না তাকিয়ে নাজা আসমরকে বলল, যে তার পিছনে এক পা দূরে দাঁড়িয়ে ছিল। এবং চিরতরে থামিয়ে দাও!।
আসমর এক পাশে এগিয়ে এল এবং তার খোলা তরবারি দিয়ে ক্রাতাসের ঠিক কিডনি বরাবর আঘাত চালাল। তার প্রশিক্ষিত হাতে আঘাতটা ছিল শক্তিশালী। ব্রোঞ্জের ব্লেড এমনভাবে চালাল যেন একটা সূঁচ সিল্কের কাপড়ের ভিতর দিয়ে চলে গেল। তারপর আসমর তলোয়ারটাকে ঘুরিয়ে ক্ষতটা আরো বড় করল।
ক্রাতাসের দেহ কেঁপে উঠল এবং চোখগুলো বড় হয়ে এল। তার হাতের জোর কমে গেল এবং নাজাকে ছেড়ে দিতেই সে নিজের পায়ে দাঁড়াল। আসমর তলোয়ারটা বের করে নিল, অনেকটা নিরাসক্তভাবে ক্ষতের মাংস দিয়ে ওটা বেড়িয়ে এল। উজ্জ্বল ব্রোঞ্জের ব্লেডটা রক্তে লাল হয়ে গেছে এবং রক্তের একটা ধারা ক্রাতাসের সাদা আলখেল্লার মধ্যে দিয়ে বেরুতে লাগল। আসমর আবার তার তলোয়ার চালাল। এবার আরো শক্তি দিয়ে। পেট থেকে পাজরের দিকে সে ওটা টেনে তুলল। ক্ৰাতাস বিবর্ণ হয়ে গেল এবং তার সিংহের ন্যায় মাথাটা এমনভাবে নাড়াতে লাগল যেন কোন বাচ্চা ছেলের দুষ্টুমিতে সে রেগে গেছে। সে ঘুরে চেম্বারের দরজার দিকে হাঁটতে লাগল। আসমর দৌড়ে তার পিছনে গেল এবং পিছন দিকে আঘাত করল। কিন্তু কাতাস হাঁটতেই থাকল। আমার প্রভু, আমাকে সাহায্য করুন এবং কুকুরটাকে হত্যা করতে দিন। আসমর নাজার উদ্দেশ্যে ইঙ্গিত করল এবং নাজা সাথে সাথে নীল তলোয়ারটা বের করে তার সাথে যোগ দিল। নাজার আঘাতটা অন্য আঘাতের চাইতে অনেক গভীরে গিয়ে আঘাত করল। ক্ৰাতাস দরজা দিয়ে আঙ্গিনায় বেড়িয়ে গেল, সারাদেহ তার রক্তে মাখামাখি। পিছু পিছু কাউন্সিলের বাকি সদস্যরা বেড়িয়ে এল এবং চিৎকার করতে লাগল, খুন! মহান ক্রাতাসকে ছেড়ে দাও।
আসমরও তেমন করে চিৎকার করে বলল, বিশ্বাস ঘাতক। সে মিশরের রাজ প্রতিভূর উপর হাত তুলেছে। এবং সে আবার অস্ত্র তুলে ক্রাতাসের হৃদপিন্ড বরাবর নিশানা করল কিন্তু ক্ৰাতাস ততোক্ষণে মাছের পুকুরের নিকটস্থ দেয়ালটার কাছে পৌঁছে গিয়েছে। যদিও সে দেয়াল ধরে সোজা হয়ে দাঁড়াতে চেষ্টা করছল কিন্তু নিজের রক্তে তার হাত লাল ও পিচ্ছিল হয়েছিল এবং মসৃণ পাথরের দেয়ালে কোন কিছু আঁকড়ে ধরতে সে পারল না। সে পানিতে পড়ে গেল এবং তলিয়ে গেল।
