টাইটা নিজেকে সোলেথ এর কাছে একটি কাল্পনিক নামে পরিচয় দিয়ে একটা মর্যাদাপূর্ণ সম্ভাষণ জানাল। সেও অনুসরণ করল এবং ভ্রাতৃত্বের চিহ্ন চিনতে পেরে তার কনিষ্ঠ আঙ্গুলদ্বয় বাঁকালো এবং তাদের এক সাথে স্পর্শ করল। সোলেথ বিস্ময়ে চোখ পিট পিট করল এবং তার চোখ টাইটার বাঁকানো গঠনের নিচের দিকে গেল; কিন্তু একজন খোঁজার মতো দেহাকৃতি বা মুখাবয় তার নেই। তবুও সে টাইটাকে ইশারায় তার বিপরীতে রাখা আসনে বসতে বলল। টাইটা একজন দাসের পরিবেশন করা শরবতের বাটি নিল এবং তুচ্ছ বিষয়ে তারা কথা বলল কিছুক্ষণ। দ্রুতই তাদের ভ্রাতৃত্বে টাইটা তার প্রমাণ এবং সাধারণ পরিচয় স্থাপন করল। ওরকম না করে, সোলেথ টাইটার অবয়ব পর্যবেক্ষণ করতে লাগল চিন্তিত ভাবে, নেকাবের ও কালো করা চুলের দিকে তাকাতে লাগল বারবার। ধীরে ধীরে তার চোখে ফুটে উঠল অতি চেনা অবয়ব এবং অবশেষে সে মৃদু স্বরে জিজ্ঞেস করল, আপনার যাত্রা পথে নিশ্চয়ই বিখ্যাত ম্যাগোসের সাথে সাক্ষাৎ হয়েছে, দুই রাজ্যেই যিনি বিখ্যাত এবং তার বাইরেও, টাইটা তার নাম?
টাইটাকে আমি ভালো করেই চিনি। টাইটা বলল।
সেই সাথে সম্ভবত আপনি আপনার নিজেকেও? সোলেথ জিজ্ঞেস করল রহস্যময় কণ্ঠে।
কমপক্ষে যতোটুকু আমার নিজেকে জানা দরকার ততটুকু। টাইটা দৃঢ়ভাবে বলল এবং সোলেথের গোলগাল চেহারায় একটা হাসির ঝিলিক ফুটে উঠল।
আর কোন কথা বলার প্রয়োজন নেই। এখন বলুন আপনার কি সেবায় আমি আসতে পারি? মুখ ফুটে শুধু একবার বলুন।
*
ঐ সন্ধ্যায় নেফার, ম্যারন ও হিল্টো কার্পেট ভরা ওয়াগনে চড়ল, আর কাঁচ ক্যাচ শব্দ করা ওয়াগনটার চালকের আসনে উপবিষ্ট হলো টাইটা। ওয়াগনের ত্রুটিপূর্ণ পিছনের চাকাটা ভারসাম্যহীনভাবে এপাশ ওপাশ দুলছিল। প্রাসাদের ফটকের পাশেই নিচু সরু স্থানে একদল বাজে লোক ঘুরে বেড়াচ্ছিল। টাইটা একজনকে ডেকে গাড়ি পাহাড়া দেওয়ার জন্য একটা কপারের আংটি দিল; তারপর তার লাঠির গোড়া দিয়ে ফটকে উচ্চ শব্দে আঘাত করল। তৎক্ষণাৎ ফটকটা খুলে গেল কিন্তু এক দল প্রহরীর তাক করা বর্শার মুখোমুখি হলো তারা। অন্দর মহলের প্রবেশ দ্বার খুব সুরক্ষিত। টর্ক তার ছোট হরিণীর ভালো যত্নই নিচ্ছে।
সোথে তাকে অভিবাদন জানানোর জন্য ওখানে ছিল না, নিশ্চিত সে তার নাক পরিষ্কার করছে। তবে সে তার অধীনস্থন একজনকে পাঠিয়েছে। একজন কালো দাস, টাইটাকে রক্ষীদের থেকে নিয়ে যেতে ও গাইড হিসেবে কাজ করতে এসেছে। যদিও টাইটার হাতে প্যাপিরাসের ক্রৌলটা ছিল যা সোথ তাকে দিয়েছে তবুও রক্ষীদের দল নেতা তাদের যাওয়ার পূর্বে তল্লাশি নিতে জোর করল। হিল্টোকে কার্পেট খুলতে আদেশ দিল এবং প্রতিটি ভাজ তার বর্শার ডগা দিয়ে খোঁচা দিয়ে দেখল, অবশেষে সে সন্তুষ্ট হয়ে তাদের যেতে দিল।
বৃদ্ধ দাস তাদের আগে আগে চলল, তারা সরু বারান্দার এক গোলক ধাঁধার মধ্য দিয়ে চলছিল যেন। আরো এগুতেই চারপাশ বিস্তৃত হয়ে গেল, তারা বিশাল এক চন্দন কাঠের দরজার সামনে এসে থামল যার সম্মুখে দুজন বিশালদেহী খোঁজা পাহাড়া দিচ্ছে। বৃদ্ধ দাসটি তাদের সাথে ফিসফিস করে কথা বলল, তারপর রক্ষী দুজন একপাশে সরে গিয়ে টাইটা ও অন্যদের একটি খোলামেলা বাহারী ফুলের এবং যুবতী নারীদের লোভনীয় সুগন্ধে ভরপুর কক্ষে প্রবেশ করতে দিল। সেখানে একটা ছোট স্কুল ছাদ ছিল যেখান থেকে ভেসে আসছে বীণা ও নারী কন্ঠের আওয়াজ।
বৃদ্ধ দাস ছাদে উঠে গেল। মহামান্য; সে কম্পিত কণ্ঠে বলল, আপনার অনুগ্রহ পেতে এক ব্যবসায়ী সামার কান্দের সুন্দর সিল্কের কার্পেট নিয়ে অপেক্ষা করছে।
আমি এক দিনের জন্য অনেক আবর্জনা দেখেছি। একটি মেয়ে কণ্ঠ জবাব দিল এবং নেফার ঐ পরিচিত অতি প্রিয় কণ্ঠে শিহরিত হলো এবং তার নিঃশ্বাস দ্রুত হয়ে এল। তাদের চলে যেতে বলো।
রক্ষী পিছনে টাইটার দিকে তাকিয়ে চেহারাটা তুলে হাত নেড়ে অসহায়ত্ব প্রকাশ করল। হঠাৎ নেফার জোরে আওয়াজ করে তার কাঁধে থাকা কার্পেটের রোল টাইলসের মেঝেতে ফেলে দিল এবং দুপদাপ শব্দ করে ছাদের প্রবেশ দ্বারের দিকে এগিয়ে গিয়ে থামল। সে ছেঁড়া কাপড় পড়েছে এবং নোংরা কাপড় তার মাথার চারপাশে জড়ানো যা তার মুখের নিমাংশ ঢেকে রেখেছে। শুধু তার চোখ দেখা যাচ্ছিল।
পায়ের কাছে দুজন দাস নিয়ে মিনটাকা পাঁচিলের উপর বসেছিল। সে তার দিকে তাকাল না বরং আবার গান শুরু করল। এটা বানর ও গাধার গান এবং নেফার তার হৃদয়ে ঐ শব্দগুলোর হাহাকার অনুভব করল। সে তার মিষ্টি বাঁকানো চিবুকটা ঘুরিয়ে রেখেছে এবং ঘন কালো চুল যা তার পিঠের নিচে ঝুলে আছে শুধু তা দেখা যাচ্ছে।
হঠাৎ মিনটাকা গান থামিয়ে তার দিকে রাগত দৃষ্টিতে তাকাল। ওখানে দাঁড়িয়ে আমার দিকে এভাবে তাকিয়ে থেকো না, গেয়োভূত। ধমক দিয়ে বলল।
তোমার জিনিস তুলে নাও এবং চলে যাও।
আমায় ক্ষমা করুন, মহামান্য। ক্ষমার ভঙ্গিতে সে হাত তুলল। আমি ডাব্বার নেহাত বোকা ছাড়া কিছু নই।
মিনটাকা চিৎকার করে উঠল, হাত থেকে তার বীণাটা পড়ে গেল, তারপর দুই হাতে নিজের মুখ ঢাকল সে।
এক পুচ্ছ গোলাপি আভা দেখা দিল তার গালে এবং সে তার সবুজ চোখের দিকে চেয়ে রইল এক দৃষ্টিতে। কৃষ্ণ দাস তার ছোরা বের করে দৃঢ়ভাবে ছোট ছোট পায়ে নেফারকে আঘাত করতে এগোচ্ছিল। মিনটাকা নিজেকে ফিরে পেল সাথে সাথে। না, তাকে ছেড়ে দাও। সে তার ডান হাত তুলে জোড়ালো কণ্ঠে আদেশ করল। তুমি চলে যাও। আমি অসভ্য লোকটির সাথে কথা বলব। দাসকে হতভম্ব ও ইতস্তত: দেখাল, মুক্ত চাকুটা এখনো নেফারের পেট বরাবর নিশানা করা।
