টাইটা অভিব্যক্তি হীনভাবে আগুনের দিকে চেয়ে রইল এবং নেফার বলে গেল, তোমাকে অবশ্যই আমার জন্য দূর থেকে তাকে দেখতে হবে। ভয়ংকর কোন ভুল আছে। একমাত্র তুমিই এখন তাকে সাহায্য করতে পারবে, টাইটা।
তোমার কাছে কি মিনটাকার কোন কিছু আছে? সে জিজ্ঞেস করল। কোন উপহার বা চিরকুট যা সে তোমাকে দিয়েছিল?
নেফারের হাত তার গলার নেকলেসের কাছে চলে গেল। সে ছোট সোনার লকেটটি স্পর্শ করল যা চেইনের মধ্যবর্তী স্থানে ঝুলছিল। এটি আমার সবচাইতে মূল্যবান সম্পদ।
টাইটা আগুনের উপর দিয়ে তা নিতে হাত বাড়াল। এটি আমাকে দাও। নেফার ইতস্তত করল, তারপর হুক খুলে লকেটটি তার শক্ত মুঠিতে নিল।
আমার কাছে এটা নিজের চাইতেও দামী। শেষ বার সে এটি স্পর্শ করেছিল। তার এক গোছা চুল এর ভেতর রয়েছে।
তাহলে এটি খুবই কার্যকর হবে। এটা তার অংশ ধারণ করে। যদি তুমি চাও যে আমি তাকে সাহায্য করি তাহলে এটি আমাকে দাও। নেফার তাকে তা দিল।
এখানে অপেক্ষা করো। বলেই টাইটা উঠে দাঁড়ালো। যদিও সে অন্ধকারে সারাটা সময় তার পা ভেঙে আসন করে বসেছিল, তবুও তার চলাফেরায় কোন জড়তা নেই। একজন যুবক, পৌরুষ দীপ্ত মানুষ যেন সে। ভোরের বাতাসে সে বেরিয়ে বালিয়াড়ির চূড়ায় গিয়ে উঠল। তারপর আলখেল্লাটা পায়ের চারপাশে একত্রিত করে সে বালির উপর আসন গেড়ে বসল উষার মুখোমুখি হয়ে।
মিনটাকার লকেটটি সে তার কপালে ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করল। তারপর হালকাভাবে দুলতে লাগল এপাশ ওপাশ। সূর্য দিগন্তে পরিষ্কার হয়ে তার চেহারায় আলো ছড়াতে লাগল।
তার ডান হাতে থাকা লকেটটি মনে হল যেন এক অদ্ভুত জীবন পেল হঠাৎ। টাইটা ওটার মধ্যে তার নিজের হৃদ্স্পন্দনের ছন্দ, নাড়ির মৃদু স্পন্দন অনুভব করল। সাথে সাথে সে মনটা খুলে দিল এবং অস্তিত্বের স্রোত মুক্তভাবে প্রবেশ করতে দিল। তার চারপাশে বিশাল নদীর ন্যায় এক জগৎ ফুটে উঠল তখন। তার নিজের আত্মা তার দেহ থেকে বেরিয়ে অনেক উপরে উঠে গেল। যেন সে কোন দ্বৈত পাখির ডানায় ভর করেছে। সে উড়ছিল; অপরিষ্কার মাঠ, শহর, বন, ভূমি ও মরুর অসংখ্য ছবি তার নিচে ঘুরপাক খাচ্ছে একে একে। সে আর্মিদের এগোতে দেখল, সেনা দল হলুদ ধুলোর ঝড় তুলছে, তাদের বর্শার মাথা চকচক করল। সে উজানে জাহাজ দেখল, ঢেউ ও বাতাসে যা ভেঙে গিয়েছে। সে একটা জ্বলন্ত শহর দেখল, ওগুলো লুণ্ঠন করা হয়েছে এবং সে তার মাথার ভেতর অচেনা কণ্ঠ শুনল। জানে ওগুলো অতীত ও ভবিষ্যত থেকে আসছে। সে অনেক আগের মৃতদের মুখ দেখল এবং এমনকি যারা এখনো জন্মায়নি তাদেরও।
সে চলতেই লাগল এবং তার সত্তা আরো বিস্তৃতি পেল। সবর্দা লকেটটি তার সাথে রইল চুম্বকের ন্যায়। মনে মনে সে ডাকল, মিনটাকা! এবং অনুভব করল লকেটটা গরম হচ্ছে। তারপর এক সময় তা তার হাতের মধ্যে গরম হয়ে হাত পুড়িয়ে দিতে চাইল।
ধীরে দৃশ্য পটগুলো আরো পরিষ্কার হল এবং সে তার মিষ্টি কণ্ঠের জবাব শুনল, আমি এখানে। কে আমায় ডাকল?
মিনটাকা, আমি টাইটা। সে উত্তর দিল, কিন্তু সে বুঝল কোন অশুভ সত্তা বাঁধা দিচ্ছে এবং তাদের দুজনের যোগাযোগ ভেঙে দিল। মিনটাকা চলে গিয়েছে। এবং পরিবর্তে সেখানে উপস্থিতি হল এক চরম অবস্থা। সে সমস্ত শক্তি তার উপর স্থির করল, কালো মেঘটা হটানোর চেষ্টা করল। তারপরই সব কিছু মিলিত হয়ে ভর দিয়ে দাঁড়ানো কোবরার আকার নিল। এই একই রকম অশুভ প্রভাব যা সে ও নেফার এর আগে বার-আম-মাসারার পাহাড়ে মুখোমুখি হয়েছিল রাজ বাজপাখির নীড়ে।
সে মনে মনে কোবরার সাথে লড়াই করতে ও সর্পটাকে ফেরত পাঠাতে তার শক্তি বৃদ্ধি করল। কিন্তু বশ স্বীকার করার পরিবর্তে সাপের প্রতিচ্ছবি আরো স্পষ্ট ও আরো ভয়ংকর হল। হঠাৎ সে বুঝল এটা কোনো মানসিক প্রকাশ নয়, বরং মিনটাকার জন্যে সরাসরি ও মারাত্মক হুমকি। অশুভ সত্তাটা হঠাতে এবং মিনটাকার কাছে পৌঁছতে সে তার চেষ্টা চারগুণ বৃদ্ধি করল, কিন্তু যন্ত্রণা এবং দুঃখটা এতো বেশি যে তাদের মাঝে তা অভেদ্য বাঁধা হয়ে দাঁড়াল।
তারপর হঠাৎ সে একটা হাত দেখতে পেল, চিকন ও মুষ্ঠিবদ্ধ; অভিশপ্ত সরু মাথাটা ধরতে যাচ্ছে। সে জানত এটা মিনটাকার হাত, কারণ নীল লেপিজ লাজুলি পাথরের আংটি যাতে তার স্মারক খোদাই করা তা তার তর্জনীতে শোভা পাচ্ছে। তৎক্ষণাৎ সে তার সমস্ত জীবনী শক্তি দিকে বিষধর সাপটাকে আয়ত্তে আনল এবং মিনটাকার হাত কামড়ে দেওয়া থেকে প্রতিরোধ করল। এমন কি যখন মিনটাকা সাপটার প্রসারিত ফণায় আঘাত করল তখনও। কোবরা তার অর্ধেক গুটিয়ে নিল এবং প্রায় পোষা বিড়ালের ন্যায় তার মাথা পেতে দিল আদর পেতে।
যা করতে হবে তা এটাকে করতে বাধ্য করুন। টাইটা মিনটাকার কণ্ঠ শুনল এবং আরো এক কষ্ঠ যা উত্তর দিল তাও সে চিনল। এমনটা আমি আর কখনো দেখি নি। তোমাকে অবশ্যই দূতটাকে তোমার হাত দিয়ে আঘাত করতে হবে। যা তাকে দেবীর উপহার সরবরাহ করতে বাধ্য করবে। টাইটা চিনল কণ্ঠটা হচ্ছে অ্যাভারিসের হাহোর মন্দিরের প্রধান যাজিকার। দুঃখে জর্জরিত মিনটাকা দেবীর পথ বেছে নিতে চলেছে।
মিনটাকা! তার কাছে পৌঁছতে সে নিজের আরো জোর প্রয়োগ করল এবং সফলও হল শেষ পর্যন্ত।
টাইটা? সে ফিসফিসিয়ে বলল, কারণ মিনটাকা অবশেষে তার ব্যাপারে সচেতন হয়েছে। টাইটার দৃষ্টি এতো প্রসারিত হল যে সে সবকিছু পরিষ্কার দেখতে পারল।
