নিচ থেকে টাইটা এর সবই দেখছিল এবং প্রায় গুহায় ফিরে যাবে এমন সময় মরুর নিরবতায় একটা রহস্যজনক শব্দ তাকে থামাল। সে মুখ তুলে আকাশের দিকে তাকিয়ে নীলের মধ্যে উঁচু বৃত্তাকার একটা কালো দাগ দেখতে পেল এবং খুব কাছে অনুভব করল একটা স্বর্গীয় উপস্থিতি। ওটা আবার শব্দ করে চিৎকার দিল। ছোট ও ক্ষীণ, কিন্তু তা হৃদয় বিদীর্ন করে গেল। রাজ বাজ পাখির নির্ভুল ডাক!
বালিয়াড়ির চূড়ায় দাঁড়িয়ে নেফারও তা শুনল এবং তার মাথা ঘুরালো উৎসের খুঁজে। অবশেষে সে ক্ষুদ্র অবয়টা খুঁজে পেল এবং পাখিটার দিকে তার দুহাত তুলল। যেন এ ইশারাটা ছিল একটা আদেশ। বাজটা নিচের দিকে নামতে লাগল, আকারে স্ফীত হল। বাতাস তার সঁচালো ডানায় শাই শাই শব্দ তৈরি করছে। বাজটা নেফারের দিকে ঝাঁপ দিল, যদি ওটা ঐ গতিতে আঘাত করে তাহলে পাখিটা মাংস ছিঁড়ে নিবে অথবা হাড় ভেঙ্গে দিবে; কিন্তু নেফার পিছিয়ে গেল না। বাজটা সরাসরি আসছে তার ঊর্ধ্বমূখী চেহারার বরাবর।
সম্ভাব্য শেষ মুহূর্তে পাখিটা নিম্ন গতি ছেড়ে উধ্বমুখী হল এবং বালকটির মাথার উপর খুব কাছে চক্কর দিতে লাগল এক নাগারে। নেফার হাত তুলল এবং প্রায় তার বুকের নরম ও চকচকে সুন্দর পালক স্পর্শ করছিল। এক মুহূর্তের জন্যে টাইটার মনে হল পাখিটা বুঝি নিজে নিজে ধরা দিবে, কিন্তু অন্য দিকে ঘুরে উপরে উঠে গেল ডানা ঝাঁপটিয়ে। আরো একবার পাখিটা নিঃসঙ্গ ও স্নেহার্ত চিৎকার দিল। তারপর সুর্যের দিকে গতি তুলে চলে গেল, জলন্ত গোলকের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল যেন।
*
শেষ বার গেবেল নাগারে আসার সময় তার সাথে করে একটা পূর্ণ ওজনের যুদ্ধ ধনুক এনেছে হিল্টো। টাইটার নির্দেশনায় নেফার প্রতিদিন তা দিয়ে কঠোর অনুশীলন করে গেল, যতদিন না তার পিঠের মাংস পেশী তৈরি হলো এবং যতক্ষণ না সে অস্ত্রটা সঠিকভাবে নিক্ষেপ করতে পুরোপুরি সামর্থ হলো। লক্ষ্য স্থির করতে যেন তার বাহু ক্লান্ত না হয়ে কাঁপে সে দিকটাও দেখল টাইটা। তারপর টাইটার আদেশে সে একটা তীর উপরের দিকে পাঠালো যা ২০০ কিউবিট দূরের লক্ষ্যবস্তু ভেদ করল নিখুঁতভাবে।
নেফার পাহাড়ের পাদদেশের লুকানো ঝোঁপ থেকে নিজে একটা একাসিয়া গাছের কান্ড কেটে এর একটি আকৃতি দিল, ছাঁচলো এবং চকচকে করল যতোক্ষণ তা তার হাতে তা সুষম একটা ভারসাম্য এবং দৈর্ঘ্য পেল। তারপর সে ও টাইটা ঐতিহ্যগত নিয়মে লড়াই করল ভোরের ঠাণ্ডায়। প্রথমে নেফার টাইটার বয়সের কথা ভেবে উদাসী ভাব দেখাল, কিন্তু ম্যাগোস তাকে রক্তাক্ত করল এবং তার মাথার ত্বক থেকে একটা পিন্ড তুললে সে রাগান্বিত ও অপমানিত হল। তৎক্ষণাৎ আক্রমণ করল নেফার। কিন্তু বৃদ্ধ লোকটি দ্রুত এবং চটপটে। সে লাফ দিয়ে নেফারের কাত করা লাঠির আয়ত্তের বাইরে চলে গেল। তারপর দ্রুত হাত চালাল একটা অরক্ষিত কনুই ও হাঁটুতে যন্ত্রণাদায়ক আঘাত করার জন্য। তরবারি চালনায় টাইটা তার দক্ষতা একটু হারিয়ে ফেলেছে। হিল্টো তাদের জন্য ভারি কান্ডের তলোয়ার এনেছে এবং যখন টাইটা বুঝল যে তারা লাঠি দিয়ে যথেষ্ট লড়াই করেছে তখন সে তলোয়ার বের করল। সে নেফার ও ম্যারনকে দেখাল কি করে কাটতে, আঘাত করতে ও ফেরাতে হয়। তাদের সে প্রতিটি কৌশল পঞ্চাশ বার করে অনুশীলন করতে বাধ্য করল। তারপর আবার শুরু করল। দুপুরের খাবারের জন্যে বিরতি যখন পড়ল ততক্ষণে নেফার ও ম্যারন উভয়ই লাল হয়ে গিয়েছে এবং এমনভাবে তাদের ঘাম ঝড়ছিল যেন তারা নীলের জলে নিমজ্জিত হয়ে এসেছে, যদিও টাইটার ত্বক ছিল শুকনো ও ঠাণ্ডা। যখন ম্যারন এই বিষয়ে বিষণ্ণ কণ্ঠে মন্তব্য করল তখন সে শুধু মুখ টিপে হাসল। তোমার জন্মের অনেক আগেই আমি আমার ঘামের শেষ বিন্দু ঝড়িয়েছি।
অন্য দিনের বিকেলগুলোতে নেফার এবং ম্যারন পুরোপুরি নগ্ন হয়ে নিজেদের দেহে তেল মেখে কুস্তি করত। টাইটা তখন তাদের প্রতিযোগিতার আম্পায়ার হতো এবং উপদেশ ও নির্দেশনা দিত। যদিও ম্যারন এক হাত বেশি লম্বা ছিল এবং কাঁধ ও শারীরিক গঠনে ছিল বেশি ভারি, অপরদিকে নেফারের ছিল স্বাভাবিক সুষমতা। টাইটা তাকে শিখিয়েছিল কিভাবে প্রতিপক্ষের ওজন তার বিরুদ্ধেই ব্যবহার করতে হয়। তারা একে অপরকে নিক্ষেপের পর নিক্ষেপ করত।
সন্ধ্যায় এবং গভীর রাতে টাইটা ও নেফার আগুনের পাশে বসত। তখন তারা প্রতিটি বিষয়ে ওষুধ থেকে রাজনীতি, যুদ্ধ এবং এমনকি ধর্ম নিয়ে পর্যন্ত বিতর্ক করতো। প্রায়ই টাইটা নতুন নতুন কোন তত্ত্ব দিত। তারপর নেফারকে তার উপস্থাপন ও যুক্তিতে ভুল বের করতে হতো। সে লুকানো ফাঁদ ও অযৌক্তিক বিষয় এই সব পাঠ দিত এবং এখন আরো বেশি ও অধিক কৌশলে নেফার সেসব আবিষ্কার করে গেল এবং জানতে আরো বেশি প্রশ্ন করত তাকে। তারপর সব সময় তারা বাও খেলার বিভিন্ন ধাঁধা উদ্ধার করত এবং পাথরগুলোর গতি ও আকৃতির অসীম সম্ভাবনা ও নিয়ম উদ্ধার করত।
যদি তুমি বাও-এর গুটিগুলোর সব বুঝতে পার, তবে তুমি আপনা আপনি জীবনকে বুঝতে পারবে, টাইটা তাকে বলল। খেলার চতুরতা ও সূক্ষ্ম তারতম্য বৃহৎ রহস্যের দিকে মনকে তীক্ষ্ণ করে।
দ্রুতই মাসটা কেটে গেল। তারপর নেফার যখন একটা আঘাতপ্রাপ্ত গজলা হরিণের পিছনে মরুভূমিতে জোড়ে ছুটছিল তখন তা সবার কাছে একটা ছোট বিস্ময়ের মতো মনে হল। হঠাৎ একদিন দিগন্তে তখন কিছু একটা দেখতে পেল সে। মরীচিকায় ভগ্ন হলুদ ধুলার ক্ষুদ্র মেঘ এবং তার নিচে দূরে নদীর উপত্যকায় ওয়াগনের অবয়ব দেখা গেল। তৎক্ষণাৎ সে গজলা হরিণটার কথা ভুলে হিল্টোর সাথে দেখা করতে ছুটল। যদিও হিল্টো শারীরিক ক্ষমতায় তার লোকদের চেয়ে এগিয়ে তবুও সে অনুপ্রাণিত হল যখন দেখল ভীষণ গতিতে নেফার ঝিকমিক করা তাপের মধ্য দিয়ে দৌড়ে আসছে।
