যাই হোক যখন বে সিংহের হাড় দিয়ে টাইটার বুক স্পর্শ করল ও তার পরিচিত গন্ধ যা কবরের দুর্গন্ধের অনুরূপ তা খুঁজে পেল তখন সে ঘোষণা করল সে আসলেই তাই যা সে দাবি করেছে। আর তখনই বৃদ্ধ যোদ্ধা বিষণ্ণভাবে তাকে মেনে নিল। কিন্তু কি ভাবে আপনি আমাদের আগেই এ স্থানে পৌঁছলেন? সে জানতে চাইল মিনমিন করে।
বিশেষ কুশলী কোন রাস্তা আছে নিশ্চয়ই। বে তাকে থামিয়ে রহস্যজনক কণ্ঠে বলল, এ ধরনের প্রশ্ন না করাটাই উত্তম।
হিন্টো, তোমার কাছে ব্যক্তিগত এমন কিছু আছে যা আমাদের সবার জীবন বিপন্ন করতে পারে। টাইটা সোজাসুজি বলল কথাটা। যা মৃত্যু ও দ্বিধার গন্ধ ছড়াচ্ছে।
আমি বুঝতে পারছি না তা কি হতে পারে! হিল্টো অস্বস্তি নিয়ে জবাব দিল।
এটা এমন কিছু যা এই মিশরের অধিপতি তোমার উপর দায়িত্ব দিয়েছেন। টাইটা জোর দিল। এবং তুমি ভালো করেই জান কি তা।
এই মিশরের অধিপতি, হিল্টো তার দাড়িতে আচড় কাটল এবং মাথা নাড়ল।
টাইটা তার হাত বাড়াল। হিল্টো তখন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আর বাধা না দিয়ে আত্মসমর্পণ করল। সে তার বেল্টে রাখা থলের ভেতর হাত ঢুকিয়ে কাগজের রোলটা বের করে আনল। তার কাছ থেকে নিজ হাতে জিনিসটা নিল টাইটা। এ ব্যাপারে কিছু বলবে না; টাইটা সতর্ক করে বলল তাকে। কাউকে না, এমনকি ফারাওকেও। আমার কথা কি বুঝেছো হিল্টো?
আমি আপনার কথা বুঝতে পেরেছি ম্যাগোস।
তারপর টাইটা তার ডান হাতে প্যাপিরাসটা নিয়ে ওটার দিকে এক দৃষ্টে চেয়ে রইল। কয়েক সেকেন্ড পর একটা ছোট উজ্জ্বল দাগ দেখা গেল ফ্রৌলটায়। এক গুচ্ছ ধোঁয়া রাতের বাতাসে চক্রাকারে উঠে গেল, তারপর হঠাৎ আগুন জ্বলে উঠল তাতে।
তাপের পরোয়া না করে টাইটা তার আঙুলের মধ্যে ওটাকে পুড়ে যেতে দিল, তারপর ছাই পিষে ধুলোয় পরিণত করল।
এটা যাদু হিল্টো হাঁপাতে হাঁপাতে বলল।
একটা সাধারণ কৃতিত্ব, বে বিড়বিড় করে বলল। এমন যাদু এমনকি একটা শিষ্যও করতে পারবে।
টাইটা আশীর্বাদে তার ডান হাত তুলল সমাপ্তি টানতে। চলার পথে প্রভু তোমাদের নিরাপদ রাখুন, বলেই সে তাদের ওয়াগনকে আঁধারে রেখে হারিয়ে গেল।
*
টাইটা পুনরায় গেলে নাগারের গুহায় ফিরে তার বৃদ্ধ হাড়গুলো মরুর ঠাণ্ডা থেকে উষ্ণ করতে আগুনের পাশে এসে দাঁড়াল। ভেড়ার চামড়ায় ঢাকা ঘুমন্ত নেফারের অবয়ব যা পেছনের দেয়ালের তৈরি করেছে তা সে দেখতে লাগল এক মনে।
তাকে বোকা বানানোর জন্যে বালকটির এ করুণ প্রয়াসে সে কোন রাগ অনুভব করল না। বয়স তার মানবিকতা শুকিয়ে দেয় নি কিংবা তার আবেগী যন্ত্রণার স্মৃতি নিষ্প্রভ করে নি। মিনটাকার ভয় ও কষ্ট দূর করার উদ্দেশ্যে নেফারের চেষ্টার সাথে সে একাত্ম হল।
সে কখনো নেফারকে বুঝাতে পারবে না যে এ সহানুভূতি কাজের ফলাফল কি হতে পারতো। বরং এখন টাইটা যা করল তাকে নেফারের এই মিথ্যা বিশ্বাসের সাথে শীঘ্রই মিনটাকা জানবে যে সে এখন জীবিত। সে নেফারের পাশে আসন করে বসল এবং বালকটিকে স্পর্শ না করে টাইটা বালকটির অন্তর সত্তায় তার নিজের মতো করে আলতো প্রভাব বিস্তার করল। তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় অর্জিত ধৈর্যের ক্ষমতা তৎক্ষণাৎ অর্জন করল সে। নেফার কেঁপে উঠল, গুঙ্গিয়ে উঠল এমনকি গভীর ঘুমের মধ্যেও টাইটার ক্ষমতা জালের মতো তার উপর বিস্তার করল। তাকে ছুঁয়ে গেল এবং তাকে জাগিয়ে দিল প্রায়।
তার স্বাস্থ্য এখন অনেকখানি ভালো হয়েছে। টাইটা আরো গভীরে প্রবেশ করল। তার সত্তা যথেষ্ট শক্তিশালী এবং সে যে কষ্টের মধ্য দিয়ে এসেছে তাতে সে কিছুই হারায়নি। সেই ক্ষণ এখন আর বেশি দেরি নেই, পরবর্তী প্রয়াসে তাদের যাত্রা করার।
সে আগুনের পাশে ফিরে গেল এবং আরো কিছু একাসিয়া কান্ড তার মধ্যে ফেলল। তারপর পাশ ফিরল; ঘুমাতে নয়, কারণ এ বয়সে প্রতি রাতে তার মাত্র কয়েক ঘণ্টা ঘুমের প্রয়োজন। বরং তার মন চলমান ঘটনার স্রোতে খুলে দিল, কয়েকটা দূরের এবং বাকিগুলো খুব কাছের। সে ওগুলোকে তার চারপাশে ঘুরতে দিল যেন সে অস্তিত্বের ঝর্ণায় একটি পাথর।
*
পরবর্তী পূর্ণিমটা দ্রুত কেটে গেল অন্তত গত পূর্ণিমার চেয়ে। নেফার এখন আরো শক্তিশালী ও আরো অস্থির হয়ে উঠল। প্রতিদিন তার পা একটু করে সূস্থ হতে হতে অবশেষে এক সময় তা ভালো হয়ে গেল পুরোপুরি। শীঘ্রই সে ম্যারনের সাথে উপত্যকার নিচ থেকে পাহাড়ের চূড়ায় দৌড়াতে লাগল। মরুদ্যানে তাদের প্রতিযোগিতা তাদের প্রাত্যহিক অংশ হয়ে উঠল। প্রথম দিকে ম্যারন সহজেই জিতত, কিন্তু দ্রুতই বদলে গেল তা।
হিল্টো যাওয়ার পর বিশতম দিনের সকালে তারা গুহার মুখ থেকে শুরু করে পাথুরে উপত্যকার তলটা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পেরিয়ে গেল। কিন্তু যখন তারা বালিয়াড়ির মুখের দিকে উঠতে লাগল, তখন নেফার সামনের কিনারা ঘেষে চলল একা। অর্ধেক পথ উপরে উঠে সে হঠাৎ দ্রুত গতি দিল, ফলে তার পিছনে পড়ে গেল ম্যারন। পাহাড়ের চূড়ায় উঠে ফিরে তাকিয়ে নিচে থাকা ম্যারনের উদ্দেশ্যে উপহাস সূচক একটা হাসি দিল নেফার। তার দীর্ঘ ঘন চুল কাঁধের উপর উড়ছিল ভোরের বাতাসে দোল খেয়ে। পিছনে তখন সকালের সূর্য উঠছে এবং সোনালি রশ্মি তার মাথার চারপাশে চক্রাকারে আলোর জ্যোতি তৈরি করল।
