তারপর নূম তার জামার ভাজ থেকে একটা রূপার লম্বা পিন নিল এবং নেফারের নিস্তেজ একটা হাত খুলে হাতের নখের গভীরে সূঁচালো অংশটা ঢুকিয়ে দিল এবং মাংসের প্রতিক্রিয়া অথবা এক ফোঁটা রক্ত জমাট হওয়া দেখার জন্য অপেক্ষা করল।
অবশেষে সে ধীরে উঠে দাঁড়াল এবং টাইটা ভাবল তার কুচকানো ঠোঁটে ও বিষণ্ণ অভিব্যক্তির মধ্যে গম্ভীর হতাশার সাক্ষ্য আছে, অন্তত যখন সে তার মাথা নাড়াল। টাইটা গভীরভাবে ভেবে দেখল নিশ্চয়ই ফারাও এর প্রতিক্রিয়া পেতে রূপার পিন ব্যবহার করার জন্যে নূমকে পুরষ্কারের প্রস্তাব করা হয়েছে। ফারাও মৃত, সে ঘোষণা করল এবং যারা বিছানা চারপাশে ছিল তারা শয়তানের চোখের ও প্রভুদের ক্রোধের বিরুদ্ধে চিহ্ন আঁকল।
লর্ড নাজা তার মাথা পিছনে নিয়ে প্রলাপের প্রথম চিৎকার দিল। আর হেজারেট তার পিছনে দাঁড়িয়ে শোকের কান্না তার মিষ্টি উচ্চ কন্ঠে সুর করে ধরল।
টাইটা তার অধৈর্যতা লুকিয়ে রাখল বহু কষ্টে। সে প্রলাপকারীদের একে একে বিছানা অতিক্রম করে কক্ষ ত্যাগ করার অপেক্ষায় আছে। যখন শুধু নাজা এবং হেজারেট, ম এবং উচ্চ রাজ্যের উজির অবশিষ্ট রইল, টাইটা আরেকবার সামনে এগিয়ে এল। লর্ড নাজা, আমি আপনার অনুমতি ভিক্ষে চাই। আপনি জানেন যে আমি ফারাও নেফার সেটির শিক্ষক ও দাস, তার জন্ম থেকে। অতএব আমি তার শ্রদ্ধা ও দায়িত্বের কাছে ঋণী এমনকি এখন তার মৃত্যুতেও। আমি আপনার অনুগ্রহ কামনা করছি। আপনি কি আমাকে সেই একজন হিসেবে তার মরদেহ হল অফ সরো মানে দুঃখের কক্ষে বয়ে নিয়ে যাওয়ার এবং সেখানে তার হৃদপিন্ড এবং নাড়িভুড়ি কেটে বের করার অনুমতি দিবেন? আমি তা আমার উপর আপনার মহান আশীর্বাদ হিসেবে গ্রহণ করব।
লর্ড নাজা এক মুহূর্ত ভাবল, তারপর সম্মতি সূচক মাথা নাড়ল। আপনি সেই সম্মতি অর্জন করেছেন। আমি আপনার উপর ফারাও এর পবিত্র দেহ শেষকৃত্যের মন্দিরে নিয়ে যাওয়া এবং তার দেহকে মমিতে পরিণত করার দায়িত্ব অর্পণ করলাম।
*
বৃদ্ধ যোদ্ধা হিল্টো দ্রুত টাইটার ডাকে সামনে এসে হাজির হল। সে প্রাসাদ ফটকের প্রহরী কক্ষে অপেক্ষা করছিল। সাথে করে সে নুবিয়ান ছলনাকারী বে-কে এনেছে এবং সেই সাথে চারজন তার সবচাইতে বিশ্বস্ত লোক। তাদের একজন ম্যারন, নেফারের শৈশবের বন্ধু ও সঙ্গী। সে এখন রক্ষীদের একজন সুদর্শন সৈন্য, লম্বা গঠন ও স্বচ্ছ চোখের অধিকারী। টাইটা বিশেষ করে এই কাজে তার কথা বলেছে।
তাদের মাঝে মমিকরেরা শেষ কৃত্যের জন্যে মন্দিরে মরদেহ বয়ে নিয়ে যাবার লম্বা ঝুড়িটা বহন করছে। খালি ঝুড়িটা ভারি দেখাল, যা একজনের চিন্তার চাইতেও বেশি।
টাইটা তাদেরকে মৃত কক্ষে প্রবেশ করতে দিল এবং হিল্টোকে ফিসফিসিয়ে বলল, দ্রুত কর। প্রতি সেকেন্ড মূল্যবান।
সে ইতোমধ্যে নেফারকে একটা লম্বা সাদা কাফন দিয়ে পেচিয়ে ফেলেছে, একটা ঢিলা লিনেন কাপড় দিয়ে তার চেহারাটা ঢাকা। শব যাত্রীরা ঝুড়িটা বিছানার পাশে রাখল এবং সম্মানের সাথে নেফারকে উঠিয়ে ওটার মধ্যে রাখল আলতো করে। টাইটা দেহের চারদিকে কোলবালিশ গুঁজে দিল যাতে চলার সময় সে ব্যথা থেকে রক্ষা পায়। তারপর ঢাকনা লাগিয়ে দিল এবং মাথা নেড়ে এগিয়ে যাবার নির্দেশ দিল। মন্দিরে, সে বলল। সব কিছু প্রস্তুত।
টাইটা তার থলে বিশ্বস্ততার সাথে ম্যারনকে দিল এবং তারা দ্রুত বারান্দা ও প্রাসাদের বাগান দিয়ে এগিয়ে চলল। শোক ও প্রলাপের আওয়াজ তাদের অনুসরণ করে আসল পিছু পিছু। যখন মৃত ফারাও প্রসাদের রক্ষীদের অতিক্রম করে যাচ্ছিল তখন তারা তাদের অস্ত্রের সূঁচালো দিক নিচু করে রাখল এবং হাঁটু গেড়ে বসল। মহিলারা তাদের চেহারা ঢেকে দুঃখে আর্তনাদ করে উঠল। সমস্ত প্রদীপ নিভিয়ে দেওয়া হল এবং রান্না ঘরের আগুন নেভানো হল যাতে চিমনি দিয়ে কোনো ধোঁয়া না উঠে।
উঠানোর প্রবেশ মুখে হিল্টোর রথের বাহিনী ঘোড়ার লাগাম ধরে প্রস্তুত ছিল। বাহনকারীরা সামনের রথের পাদানির উপর ঝুড়িটা বসিয়ে দিল এবং চামড়ার রশি দিয়ে তা বেঁধে দিল দ্রুত। ম্যারন টাইটার চামড়ার যন্ত্রপাতির থলে ককপিঠে রাখল এবং টাইটা তাতে চড়ে লাগাম তুলে নিল নিজ হাতে। রেজিমেন্টের বিউবলে শেষ কৃত্যের আওয়াজ ধ্বনিত হল এবং দলটা হাঁটার গতিতে তোরণ পেরিয়ে চলতে লাগল।
প্লেগের ন্যায় ফারাও-এর মৃত্যুর খবর শহরে ছড়িয়ে পড়ল দ্রুত। প্রজারা ফটকে ভিড় করল। যখন দলটা তাদের অতিক্রম করছিল তখন তারা আর্তনাদ ও প্রলাপ করতে লাগল। জনতা নদীর তীরে গিয়ে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়াল। মহিলারা দুঃখে চিৎকার করে গেল, সামনে দৌড়ে এল এবং পবিত্র ফুটন্ত পদ্ম ফুল ঝুড়ির উদ্দেশ্যে নিক্ষেপ করতে লাগল।
টাইটা ঘোড়াগুলোকে দুলকি চালে চালালো, তারপর অধিবল্পিত গতিতে নিয়ে এল। সে ঝুড়িটা শেষকৃত্য মন্দিরের গোপন কক্ষে নেওয়ার জন্যে উন্মুখ। নেফারের পিতার মন্দিরটা এখনো ভাঙ্গা শেষ হয়নি যদিও ফারাও ট্যামোসকে কয়েক মাস আগে পশ্চিমের শূন্য পাহাড়ে তার কবরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। নেফারের জন্য এখনো কোনো মন্দির তৈরি হয়নি, সে এতো তরুণ যে তার আয়ু আরো অনেক দূর পর্যন্ত আশা করা হয়েছিল। এখন অসময়ে তার মৃত্যুতে তার পিতার জন্যে তৈরি করা ভবনটা ব্যবহার ছাড়া আর কোনো বিকল্প ব্যবস্থা নেই।
