নাজা এবার তার কণ্ঠ নিচুতে নামিয়ে বলল, যদি ফারাও যুদ্ধে মারা যায় তবে আর্মিদের সে অধিকার রয়েছে যে প্রয়োজনে তারা যুদ্ধ ময়দানে একজন রাজ-প্রতিভূ নিয়োগ দিতে পারবে। সে শান্ত হল এবং এক হাতে মুষ্টি শক্ত করে বুকের উপর রাখল এবং অন্য হাতে বর্শা নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
আসমর তখন এক কদম সামনে এগিয়ে এল এবং ভারি অস্ত্রে সজ্জিত সৈন্যদের দিকে মুখ করে দাঁড়াল। নাটকীয় ভঙ্গিমায় সে তার হেলমেটটা খুলল। তার চেহারাটা কালো এবং কঠিন। নাকের এক পাশে তার তলোয়ারে কাটা লম্বা। চিকন গাঢ় দাগ পাকানো। টেকো মাথায় ঘোড়ার চুলের বিনুনি করা পরচুলা সে পরিধান করে আছে। সে তার খোলা তরবারি আকাশের দিকে উঠাল এবং চিৎকার দিল। আর এমন কণ্ঠে চিৎকার করল যা কিনা যুদ্ধে হট্টগোলের মধ্যেও শোনার জন্য প্রশিক্ষিত। লর্ড নাজা! জয় মিশরের রাজ প্রতিভূ! জয় লর্ড নাজা।
দীর্ঘ একটা নিরবতা বয়ে গেল যততক্ষণ না সৈন্যবাহিনী একত্রে হুংকার দিয়ে উঠে তাতে সায় দিল, একটা শিকারী সিংহের ন্যায়। জয় লর্ড নাজা! জয় রাজ প্রতিভূর!
চিৎকার ও জয়োধ্বনি চলল যতক্ষণ না লর্ড নাজা তার মুষ্ঠিবদ্ধ হাত আবার উঠালো। এবং সবাই নিরব হতেই সে স্পষ্টভাবে বলল : আপনারা আমাকে অনেক বড় সম্মান দেখিয়েছেন। আমি গ্রহণ করলাম সে দায়িত্ব যা আপনারা আজ অর্পণ করলেন।
বাক-হার! তারা চিৎকার করে উঠল এবং তরবারি এবং বর্শা দিয়ে তারা তাদের ঢলের আঘাত করতে লাগল যা দূরের পাহাড়ের ঢালে বাজের ন্যায় প্রতিধ্বনিত হয়ে ভেঙে পড়ল।
এই হট্টগোলের মধ্যে নাজা আসমরের সামনে এসে দাঁড়াল। রাস্তায় প্রহরী নিযুক্ত কর। আমি এ স্থান ত্যাগ করার পূর্বে এখানকার কোন কথা যেন এই জায়গা ত্যাগ না করে। একটা কথাও যেন থেবস্ এ আমার আগে না পৌঁছায়।
*
গালালা থেকে যাত্রাটা ছিল তিনদিনের কঠোর সওয়ার। ঘোড়াগুলো ক্লান্ত ও বিধ্বস্ত, এমনকি নাজাও নিঃশেষিত প্রায়। তবু সে মাত্র এক ঘণ্টা বিশ্রাম নিল, গোসল করল এবং পরিচ্ছেদ বদলে নিল। তারপর তার দাড়ি কামানো চোয়াল, তৈলাক্ত চুল এবং আচড়ানো মাথা নিয়ে সে অনুষ্ঠানের জন্য সাজানো রথে উপবিষ্ট হল, যা আসমর তার জন্যে প্রস্তুত করে রেখেছে। রথটি তাঁবুর নিকট অপেক্ষা করছিল। স্বর্ণের পাতা দিয়ে রথের ড্যাশবোর্ড সাজানো যা সূর্যের আলোয় জ্বলজ্বল করছে।
নাজা একটা লিনেনের সাদা আলখেল্লা পরিধান করেছে এবং বুকে স্বর্ণের প্লেট আর বাহুটা তার মূল্যবান পাথরের বাজুবন্ধে সজ্জিত। কটিতে তার ঝুলছিল সোনালি খাপের মধ্যে অসাধারণ সুন্দর নীল তলোয়ারটা, যা সে ফারাও-এর মৃত দেহ থেকে তুলে নিয়েছে। যার ফলাটা অসাধারণ এক ধাতু পিটিয়ে বানানো হয়েছে, যা ছিল ব্রোঞ্জের চাইতে ভারি, শক্ত ও ধারালো। সমগ্র মিশরে এর মত আর একটিও নেই। এক সময় এটি ট্যানোস, লর্ড হারাব-এর অধিকারে ছিল এবং পরবর্তীতে ফারাওকে তিনি এটা অর্পণ করে গেছেন। তার বেশ-ভূষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিসটা হচ্ছে তার ডান বাহুর কুনুই-এর উপর পরিহিত বাজ পাখির মোহরাঙ্কিত স্বর্ণের মসৃণ বন্ধনি অথচ তা কিনা সবচাইতে কম দৃষ্টি নন্দনীয় অবস্থায় রয়েছে। তলোয়ারের মত এটাও সে নাজা ট্যামোসের শব দেহ থেকে নিয়ে নিয়েছে। মিশরের রাজ প্রতিভূ হিসেবে নাজা এখন থেকে এই বিশেষ ক্ষমতাধারী ব্যাজ পরার ক্ষমতা রাখে।
তার দেহরক্ষীরা তাকে ঘিরে রয়েছে আর পুরো বাহিনী তার পিছন চলছিল। প্রায় পাঁচ হাজার সৈন্য নিয়ে মিশরের নতুন রাজ প্রতিভূ থেবসের দিকে যাত্রা শুরু করল।
আসমর তার বর্শা-বাহক হিসেবে রথে উঠল। পুরো বাহিনীকে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে সে হয়তো অনভিজ্ঞ কিন্তু হিকস্দের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যোগ্য রূপে সে নিজেকে প্রমাণ করেছে এবং সে নাজার একজন বিশ্বস্ত সহযোগী। তাছাড়া তার দেহে হিকস্দের রক্ত বইছে। একসময় আসমর ভাবত একটা রেজিমেন্ট নেতৃত্ব দিতে পারাটাই হবে তার সফলতার চূড়ন্ত কিন্তু এখান সে পাহাড়ের চূড়ায় আরোহণ করেছে এবং হঠাৎ করেই তার সামনে অসীম ক্ষমতার রাস্তা আজ উন্মোচিত। আর যা সে একসময় ভাবতেও ভয় পেতো সে পদমর্যাদার সর্বোচ্চ পর্যায়ে এখন সে পদোন্নতি প্রাপ্ত। এমন কিছু নেই যা সে আজ করতে পরবে না। আর তার পৃষ্ঠপোষক লর্ড নাজকে মিশরের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করাতে এমন কোন অসংঙ্গত বা হীন কাজ নেই যা সে আজ করতে দ্বিধা করবে।
আমাদের সামনে এখন কি অবশিষ্ট, আসমর আমার পুরনো কমরেড? সঠিক সময়ে নাজা এমন ভাবে সঠিক প্রশ্নটা করল যেন সে তার চিন্তাগুলো পড়তে পারছে।
ইয়েলো ফ্লাওয়ার ট্যামোস হাউজের একজন প্রিন্স ছাড়া সবাইকে সরিয়ে দিয়েছে, আসমর উত্তর দিল এবং বর্শা দিয়ে পলিবাহিত ধূসর রঙের নীলের পারের পশ্চিমে পাহাড়ের দিকে নির্দেশ করল। উপত্যকার গহীন কবরে তারা শুয়ে আছে।
তিন বছর আগে হলুদ ফুলের প্লেগ বা ইয়েলো ফ্লাওয়ার দুই রাজ্যে ছড়িয়ে পড়ে। আক্রান্ত রোগীর প্রচন্ড জ্বর সহ সারা দেহে ও মুখে হলুদ রঙের ভয়ংকর ক্ষতের সৃষ্টি হয় বলে এর উপর ভিত্তি করে এ রোগের এমন নামকরণ করা হয়েছে। এ রোগ বাছ-বেছে হয়নি। সমাজের প্রতিটি স্তর ও পর্যায়ের লোকদের এটি আক্রমণ করেছে। কাউকে ছাড় দেয়নি–না মিশরীয়, না হিক; না পুরুষ, না মহিলা; না বাচ্চা, কোন কৃষক; না কোন প্রিন্সকে। কাস্তে দিয়ে যেভাবে গাছ বাছা হয় সে ভাবে এটা সবাইকে কচুকাটা করেছে।
