মৃত ফারাও-এর দুঃখে কান্না এবং তার অনুক্রমীর জন্যে সোৎসাহ কলরবে কক্ষ ভরে উঠল। চিৎকার চেঁচামেচির মধ্যে মিনটাকা রাজদূতের দিকে এক দৃষ্টিতে চেয়ে রইল। প্রসাধনের নিচে সে চুনা পাথরের ন্যায় বিবর্ণ হয়ে গেল এবং তার চোখগুলোকে বড় ও করুণ করার জন্য কোন সুরমার প্রয়োজন হল না। তার চারপাশের পৃথিবী মনে হলো অন্ধকার হয়ে গেল এবং সে তার আসনে দুলতে লাগল। যদিও সে শুনেছে নেফারের মৃত্যু পরিকল্পিত ও ষড়যন্ত্রমূলক তবুও সে নিজেকে বুঝিয়েছিল যে এটা হয়ত হবে না। সে নিজেকে বিশ্বাস করিয়েছিল যে এমন কি তার সতর্কবাণী ছাড়াও নেফার টাইটার সাহায্যে হয়তো নাজা ও টর্কের ষড়যন্ত্রের জাল এড়িয়ে যাবে।
টর্ক তাকে লাজুক আত্মতৃপ্তির হাসি নিয়ে দেখছিল এবং মিনটাকা জানে সে তার কষ্টে আনন্দ পাচ্ছে। সে আর কোনো তোয়াক্কা করে না। নেফার আর নেই এবং এর সাথে তার ইচ্ছে ও প্রতিবন্ধকতার কারণ এবং নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার কারণও চলে গিয়েছে। সে সিংহাসন ছেড়ে উঠে দাঁড়াল এবং এক জন ঘুমন্ত হাঁটাকার মতো কক্ষ ছাড়ল। সে আশা করেছিল তার স্বামী তাকে ফিরিয়ে আনার আদেশ দিবে, কিন্তু সে তা করল না। সাধারণ দুঃখ-কষ্ট ও প্রলাপে অন্য অতিথিদের কয়েক জন তার চলে যাওয়াটা দেখল যারা তার ভয়ংকর দুঃখের ব্যাপারে সচেতন ছিল। তারা সবাই স্মরণ করল যে এক সময় সে মৃত ফারাও-এর বাগদত্তা ছিল।
মিনটাকা তিন দিন, তিন রাত পর্যন্ত না খেয়ে তার কক্ষে অবস্থান করল। সে শুধু পানির সাথে একটু ওয়াইন মিশিয়ে পান করল। সে সবাইকে তাকে ছেড়ে যাওয়ার আদেশ দিল, এমনকি তার দাসীদেরও। সে কারো সাথে সাক্ষাৎ করল না এমনকি চিকিৎসকের সাথেও না যাকে টর্ক তার কাছে পাঠাল।
চতুর্থ দিন সে হাহোরের প্রধান যাজিকাকে ডেকে পাঠাল। তারা একসাথে সারা সকাল অবস্থান করল। এবং যখন বৃদ্ধ মহিলাটি প্রাসাদ ত্যাগ করল সে তার ন্যাড়া মাথা তার সাদা ভোয়ালে দিকে ঢেকে রাখল শোকের চিহ্ন স্বরূপ।
পর দিন যাজিকা তার দুজন সহকারী সহযোগে এল যারা একটা বড় পান পাতার তৈরি ঝুড়ি বহন করছিল। তারা ঝুড়িটা মিনটাকার সামনে রাখল। তারপর তারা তাদের মাথা ঢাকল এবং উঠিয়ে নিল।
যাজিকা হাঁটুগেড়ে মিনটাকার পাশে বসে শান্ত ভাবে তাকে জিজ্ঞেস করল, তুমি কি নিশ্চিত যে দেবীর পথে তুমি আসতে চাও, বাছা?
আমার বেঁচে থাকার আর কোন কিছু নেই। মিনটাকা স্বাভাবিকভাবে বলল।
যাজিকা গতদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাকে বোঝানোর চেষ্টা করেছে এবং এখনও সে শেষ চেষ্টা করল। তুমি এখনো তরুণী…
মিনটাকা তার একটা সরু হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিল। মাতা, আমি বেশি দিন হয় দুনিয়াতে আসিনি, কিন্তু সে অল্প সময়েই আমি বিশাল দীর্ঘ জীবনের মতোই অসহনীয় কষ্ট পেয়েছি।
যাজিকা তার মাথা নিচু করল এবং বলল, চল আমরা দেবীর কাছে প্রার্থনা করি। যখন সে প্রার্থনা করতে লাগল মিনটাকা চোখ বন্ধ করল। আশীবার্দি নারী, আকাশের মহান গো, দেবীর সঙ্গীত ও ভালোবাসা, সর্বদর্শী সর্ব ক্ষমতাবান, তোমার ভক্তদের প্রার্থনা শোন যারা তোমাকে ভালোবাসে। তাদের সামনে রাখা ঝুড়ির মধ্যে কিছু নড়ল এবং প্যাপিরাসের ঝোঁপের মধ্যে নদীর হাওয়া যেমন বয় তেমন একটা ক্ষীণ আন্দোলন হল। মিনটাকা তার পাকস্থলিতে একটা শীতল অনুভূতি অনুভব করল এবং জানত এটা মৃত্যুর প্রথম শিহরণ। সে প্রার্থনা শুনছিল কিন্তু তার চিন্তায় ছিল নেফার। সে স্পষ্টভাবে সে সময়ের কথা ভাবল যা তারা একসাথে কাটিয়েছে এবং তার মনে তার একটা ছবি এল যেন সে এখনো জীবিত! সে আবার তার হাসি দেখল এবং সে তার শক্ত সোজা ঘাড়ে মাথাটা ধারণ করে আছে। সে বিস্মিত হয়ে অনুভব করল পরের জীবনে সে কোথায় যেন ভয়ংকর ভ্রমণ করছে এবং তার নিরাপত্তার জন্যে সে প্রার্থনা করল। সে তার জন্যে সবুজ পাহাড়ের স্বর্গে পৌঁছানোর প্রার্থনা করল এবং সেই সাথে শীঘ্রই তার সাথে সেখানে যোগ দিতে ইচ্ছা প্রকাশ করল। তোমাকে সেখানে অনুসরণ করবো, আমার হৃদয়। তার উদ্দেশ্যে ওয়াদা করল সে।
তোমার প্রিয় কন্যা মিনটাকা, মহান ফারাও টর্ক উরুর স্ত্রী তোমার কাছে ভিক্ষা চাচ্ছে সেই সবের জন্য যা তুমি এই দুনিয়ায় যারা অনেক কষ্ট পায় তাদের জন্য ওয়াদা করেছ। তাকে তোমার অন্ধকার দূতের সাথে মিলিত হওয়ার অনুমতি দাও এবং তার মাধ্যমে তোমার বুকে শান্তি খুঁজে পেতে, মহান হাথোর।
যাজিকা তার প্রার্থনা শেষ করল এবং অপেক্ষা করল। পরের কাজটা মিনটাকাকে একা করতে হবে। মিনটাকা তার চোখ খুলল এবং ঝুড়িটা পর্যবেক্ষণ করল যেন এটা সে প্রথমবারের মতো দেখছে। ধীরে সে দুই হাত বাড়িয়ে ঢাকনা তুলল। ঝুড়ির ভেতরটা অন্ধকার কিন্তু ভেতরে একটা নড়া-চড়া হচ্ছিল; যেন একটা ভারি অসাড় কিছু কুন্ডলী পাকাচ্ছিল ও খুলছিল, কালোর উপর কালোর ঝলক ঠিক যেন গভীর কুয়ার পানির মধ্যে তেল ছলকে পড়া।
ভেতরে উঁকি দেওয়ার জন্য মিনটাকা সামনে ঝুকল এবং ধীরে একটা রুলারের মতো মাথা তার সাথে সাক্ষাতের জন্য মাথা তুলল উদ্ধত ভঙ্গিতে। যখন প্রাণীটা আলোতে উঠে এল ও ফণা খুলল তখন ওটা একজন মহিলার কটির ন্যায় প্রশস্ত হল যেন কালো ও আইভরিতে সজ্জিত কোন বস্তু। চোখগুলো কাঁচের গোটার মতো জ্বলজ্বলে পাতলা, ঠোঁটগুলো বিদ্রুপাত্মক হাসিতে বাঁকানো, পালক তুল্য কালো জিহ্বা ওগুলো মধ্য দিয়ে বেরিয়ে আছে। জীবটা বাতাসের স্বাদ গ্রহণ করছে এবং সেই সাথে মেয়েটার গন্ধও যে তার সামনে বসে আছে।
