সে তার চোয়াল দৃঢ়ভাবে চেপে রাখল যখন আঘাত তার উপর বৃষ্টির মত পড়ল এবং তা সহ্য করে গেল যততক্ষণ পারল। কিন্তু এক সময় সে আর যুদ্ধ করতে পারল না। এদিকে তা দেখে হয়তো করুণা দেখিয়ে টর্কও সরে গেল, ভারি দম নিতে নিতে।
টর্ক তার দাগওয়ালা ও ধুলোয় মাখা জামা গায়ে চাপিয়ে কোমরে তলোয়ারের খাপটা বেঁধে খাপের মধ্যে ভরল তলোয়ারটা। তখনও ওটা মিনটাকার রক্তে ভিজে আছে এবং দ্রুত দরজার দিকে সে বেরিয়ে গেল। বের হবার পূর্বে সে থামল ও তার দিকে ফিরে তাকাল। একটা কথা মনে রেখো, স্ত্রী, পোষ না মানলে আমি আমার ঘোটকীগুলোর ঘাড় ভেঙ্গে দেই, সে বলল। অথবা, সেথের কসম তারা আমার হাতে মৃত্যুবরণ করে। কথাটা বলেই সে ঘুরে চলে গেল।
মিনটাকা ধীরে ধীরে তার মাথা তুলে তার চলে যাওয়া দেখল। কথা বলার মতো তার অবস্থা ছিল না, তার পরিবর্তে সে তার মুখে থুথু জড়ো করে টর্কের উদ্দেশ্যে ছুঁড়ে মারল। তার স্ফীত মুখ থেকে ছিটকে পড়া রক্ত মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ল।
মিনটাকার চামড়ার ক্ষতের আঘাত শুকাতে আইসিস পূর্ণিমা পার হবার পরও অনেক দিন চলে গেল এবং ক্ষতগুলো তার মসৃণ কোমল ত্বকের উপর সবুজাভ হলুদ বর্ণ ধারণ করল। হয় ইচ্ছে করে না হয় ভাগ্য শুনে টর্ক তার কোন কোমল দাঁত ফেলে দেয়নি, কোন হাড় ভাঙেনি অথবা তার মুখ মন্ডলে কোন দাগ ফেলেনি।
তাদের বিয়ের দিনের দুর্দশার পর থেকে সে তাকে একা রেখেছে। তখন থেকে অধিকাংশ সময় সে দক্ষিণে ক্যাম্প করেছে। এমনকি যখন সে অল্প সময়ের জন্য অ্যাভারিসে ফিরত তখনও টর্ক তাকে এড়িয়ে যেত। সম্ভবত সে তার দেওয়া অদৃশ্য ক্ষতগুলো থেকে দূরে থাকতে চেয়েছে অথবা তাদের বিয়েটা সফল করতে ব্যর্থ হয়েছে দেখে সে লজ্জা পেতো। মিনটাকা খুব গভীর ভাবে কারণটা নিয়ে ভাবল না। তবে কিছু সময়ের জন্যে যে সে তার বন্য আকর্ষণের হাত থেকে মুক্ত তাতেই সে খুশি।
রাজ্যের দক্ষিণে আরো গুরুতর বিদ্রোহ দেখা দিল, টর্ক বন্য ভাবে তাতে সাড়া দিল। সে বিদ্রোহীদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল এবং যারা তার বিরোধিতা করল তাদের সে হত্যা করল, তাদের সম্পত্তি জব্দ করল এবং তাদের পরিবারের বাকিদের দাস হিসেবে বিক্রি করে দিল। লর্ড নাজা তার ভাই ফারাওকে সমর্থন দিতে এবং এই কাজে সহযোগিতার জন্যে দুই রেজিমেন্ট সৈন্য পাঠাল।
মিনটাকা জানত তিনদিন আগে টর্ক বিজেতার ন্যায় অ্যাভারিসে ফিরেছে কিন্তু এখনো সে তার দেখা পায় নি। সে কারণে সে দেবীকে ধন্যবাদ দিল, কিন্তু তা স্থায়ী হল না। চতুর্থ দিন তার কাছ থেকে হাজিরা এল। মিনটাকাকে রাজ্যের এক বিশেষ সভায় উপস্থিত থাকতে হবে। এতে গুরুত্বপূর্ণ যে নিজেকে তার তৈরি করতে মাত্র এক ঘণ্টা সময় দেওয়া হল। বার্তায় তাকে সতর্ক করা হয়েছে যে যদি সে আদেশ অবহেলা করে তবে দেহরক্ষী পাঠিয়ে তাকে সভাকক্ষে জোর করে নেওয়া হবে।
এটা ছিল প্রথম উপলক্ষ যেখানে সে তার বিয়ের পর লোকজনের সামনে যাচ্ছে। সতর্কতার সাথে সে প্রসাধন লাগাল যা তাকে সব সময়ের মতই সুন্দর দেখাল। পরিমিতভাবে সাজানো প্রাসাদের সভাকক্ষে প্রবেশ করে সে তার নির্দিষ্ট আসন রাণীর সিংহাসন গ্রহণ করল যা ছিল ফারাও-এর আসনের ঠিক নিচে। সে তার অভিব্যক্তি চেপে রাখার চেষ্টা করল এবং কাজকর্ম থেকে অমনোযোগী থাকতে চাইল। কিন্তু তার সংযম চলে গেল যখন সে রাজদূতকে চিনতে পারল। লোকটা
এখন দ্বৈত সিংহাসনের মধ্যখানে ভূ-লুষ্ঠিত হয়ে কুর্ণিশরত অবস্থায় আছে। মিনটাকা, আগ্রহ নিয়ে সামনে ঝুকল।
টর্ক রাজদূতকে গ্রহণ করে তাকে উঠতে বলল এবং তার বার্তা সভাসদের নিকট উপস্থাপন করার অনুমতি দিল।
যখন সে উঠে দাঁড়াল মিনটাকা দেখল লোকটি খুব আবেগাপ্লুত হয়ে আছে। একটা শব্দ উচ্চারণ করে নিতে তাকে কয়েকবার তার গলা পরিষ্কার করে নিতে হলো। অবশেষে সে কথা বলল এমন কাঁপা কাপ কণ্ঠে যে মিনটাকা প্রথমে বুঝতে পারল না সে কি বলছে। সে শব্দগুলো শুনল কিন্তু নিজেকে বিশ্বাস করতে পারল না।
মহামান্য ফারাও টর্ক উরুক, মিনটাকা অ্যাপেপি উরুক, রাজ্য সভার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, অ্যাভারিসের নাগরিক, ভায়েরা এবং এই পুনরায় সংযুক্ত মিশরের স্বদেশীরা; আমি দক্ষিণ থেকে একটি করুণ সংবাদ নিয়ে এসেছি। এই খবর আপনাদের বলার চাইতে আমি বরং যদি যুদ্ধে শত অগণিত লোকের সাথে এক বেওয়ারিশের মতো মরতে পারতাম তাতে শান্তি পেতাম। সে থামল এবং আবার কাশল। তারপর তার কণ্ঠ আরো শক্তিশালী ও পরিষ্কার হলো।
আমি থেব থেকে ভাটিতে দ্রুত যাত্রা করে এসেছি। রাত দিন চলেছি, শুধু বৈঠা বাহক বদলানোর জন্য থেমেছি, আমি মাত্র বার দিনে অ্যাভারিস পৌঁছেছি।
সে আবার থেমে হতাশার ভঙ্গিতে তার হাত ছাড়ল। গতমাসে হাপির অনুষ্ঠানের বিকেলে, তরুণ ফারাও নেফার সেটি যাকে আমরা সবাই ভালোবাসতাম এবং যার প্রতি আমরা খুব বিশ্বাস ও আশা রেখেছিলাম মারা গিয়েছেন। ভয়ংকর আঘাতের কারণে, যা তিনি ডাব্বায় পেয়েছিলেন যখন গবাদি পশু শিকারী সিংহটা শিকার করছিলেন। হতাশার দীর্ঘ নিঃশ্বাসে কক্ষটা ভরে উঠল। একজন সভাসদ তার চোখ ঢেকে নিরবে কাঁদতে লাগল।
রাজদূত নিরবতার মধ্যে বলে উঠল, উচ্চ রাজ্যের রাজ-প্রতিভূ লর্ড নাজা, বিবাহসূত্রে যে রাজকীয় ট্যামোস পরিবারের সদস্য এবং তিনি পরবর্তী অনুক্রমে মৃত ফারাও-এর স্থানে সিংহাসনে আরোহণ করেছেন। তিনি ভূমিকে তার কাইফান নামে পবিত্র করেন। অনন্ত কাল পর্যন্ত তার যে নামটি সমগ্র বিশ্ব এখন থেকে স্মরণ করবে তা হলো মহান ফারাও নাজা কাইফান।
