একদিন একটু বেশিই সন্ধ্যা হয়ে গেল। চারপাশে অত্যন্ত শীতল বাতাস বইছে। শিরশির করে নিকোলাসের সব লোম দাঁড়িয়ে গেল ঠাণ্ডা আর উত্তেজনায়।
এক হাতে নৌকার স্টিয়ারিং ধরে অন্য হাতে ছেলের কাধ ধরল রামোন। প্রথমে শক্ত হয়ে গেলেও একটু পরে গুটিসুটি মেরে বাবার বুকের ভেতর সেধিয়ে গেল নিকোলাস।
হাতের মাঝে কাঁপতে থাকা ছোট্ট দেহটাকে নিয়ে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইল রামোন। আবারো মনে পড়ে গেল আদ্দিস আবারা’তে দেখা আবুনা’র ছেলেদের মৃতদেহের কথা। সকেট থেকে বেরিয়ে এসেছে চোখ, আঙুলের সমান কর্তিত পুরষাঙ্গ ঝুলছে মৃত ঠোঁটে। তবে এসব কিছুরই প্রয়োজন ছিল; যেমন ছিল বুকের কাছে লেপ্টে থাকা বাচ্চাটাকে পানিতে ডুবিয়ে রাখা। মাঝে মাঝে কঠিন আর নিষ্ঠুর দায়িত্ব পেলেও পিছপা হয় না। রামোন। তারপরেও এখনকার মতো আর কখনো সন্তানপ্রেমে আপ্লুত হয়নি।
নৌকা থেকে নেমে লণ্ঠনের আলোয় ক্যাম্পে ফেরার সময়েও রামোনের হাত ধরে রইল নিকোলাস। কম্পাউন্ডের গেইটে না পৌঁছানো পর্যন্ত পিতা-পুত্র কেউই কোনো কথা বলল না। এরপর আস্তে আস্তে নিকি জানালো : “আমার ইচ্ছে করছে তোমার সাথে সবসময় এখানেই থাকতে।”
রামোন এমন ভাব করল যেন কিছুই শুনতে পায়নি;
কিন্তু বুকের মাঝে কেমন যেন টনটন করে উঠল।
মাঝ রাতের পরে ঘুম থেকে জাগিয়ে দিল সিগন্যাল ক্লার্ক। ঘরের দরজায় হালকা একটা টোকার শব্দ শুনলেই টোকারেভ পিস্তল নিয়ে পুরোপুরি সজাগ হয়ে যায় রামোন।
“কী হয়েছে?”
“মস্কো থেকে লাল গোলাপের মেসেজ এসেছে।” লাল গোলাপ যখনই যোগাযোগ করুক না কেন দিনে কিংবা রাতে সাথে সাথে রামোনকে ডেকে তোলার নির্দেশ দেয়া আছে ক্লার্কের উপর।
“আমি এখনি আসছি।”
স্কাইলাইট প্রজেক্টের সিডিউল ডেট আর প্লেস জানিয়ে দিয়েছে লাল গোলাপ।
মেইন এএনসি ক্যাম্পে ড্রাইভার পাঠিয়ে দিল রামোন। চল্লিশ মিনিটের মাঝে রাতেই তাবাকা চলে এলো।
“আমাদেরকে এখনি লন্ডনে যেতে হবে।” রালেই মেসেজটা পড়তে পড়তে জানালো রামোন। “এটা এত গুরুত্বপূর্ণ যে এখান থেকে কো-অর্ডিনেট করা যাবে না। লন্ডন অ্যামব্যাসি আর ইউকে এএনসি অফিসের মাধ্যমে যোগাযোগ করতে হবে।”
তৃপ্তির হাসি হাসল রামোন। সপ্তাহ শেষ হবার আগেই নিরাপত্তা পরিষদের সামনে পাটি পেতে বসে পড়বে বোয়ারা।”
নিকোলাসকে ঘুম থেকে জাগিয়ে বিদায় জানাল রামোন।
“তুমি কখন ফিরে আসবে পাদ্রে?” কোনো রকম দুঃখবোধ না দেখিয়েই জানতে চাইল নিকি।
“জানি না, নিকি।” প্রথমবারের মতো ডাকনামটা ধরে ছেলেকে ডাকল রামোন। ওর ঠোঁটে কেমন যেন আজব লাগল শব্দটা।
“তুমি ফিরে আসবে তো পাদ্রে?”
“হ্যাঁ। প্রমিজ করছি।”
“হ্যাঁ, নিকি তুমি আর আদ্রা এখানেই থাকবে।”
“আর আমাদেরকেও এখানে থাকতে দেবে? তাই না?”
“থ্যাংক ইউ। আমি খুব খুশি হয়েছি।” জানাল নিকোলাস, “গুড বাই পাদ্রে।”
একে অন্যের সাথে হাত মিলিয়ে দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে নেমে অপেক্ষারত জিপে, উঠে বসল রামোন।
***
স্কাইলাইট টেস্টকে ভণ্ডুল করে দেয়া তেমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু না। কারণ প্রায় তিন বছর আগে থেকেই দক্ষিণ আফ্রিকার পারমাণবিক বোমা তৈরির প্রচেষ্টা সম্পর্কে সবকিছুই তারা জানে।
যেটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তা হলো পশ্চিমা বিশ্বের কাছ থেকে দক্ষিণ আফ্রিকাকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়া; রাজনৈতিক অঙ্গনে দক্ষিণ আফ্রিকার ললাটে কালিমা লেপন করে দেয়া।
সোভিয়েত অ্যামব্যাসির সেলারে অ্যামব্যাসাডরের সেইফ রুমে জড়ো হলো সকলে। মস্কো থেকে উড়ে এসেছেন জেনারেল বোরেদিন আলেক্সেই ইউদিনিচ। বোঝাই যাচ্ছে ফরেন মিনিস্ট্রি কেজিবি’র আফ্রিকান সেকশনকে কতটা গুরুত্ব দেয়। ফলে বহুগুণে বেড়ে গেল কর্নেল জেনারেল রামোন মাচাদোর পার্সোনাল প্রেস্টিজ।
আসছে সপ্তাহেই স্কাইলাইট টেস্ট করা হবে। তাই পুরো ব্যাপারটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কিন্তু বেশ বিস্তারিত রিপোর্ট পাঠিয়েছে লাল গোলাপ। বোমার স্পেসিফিকেশন, নতন ডিফাইভ আর্টিলারী রাউন্ডের ডেলিভারী, টেস্ট হোলের গভীরতা আর অবস্থান; এমনকি ডিটোনেট করার ইগনিশন সিস্টেম পর্যন্ত সমস্ত কিছুই রিপোর্টে লেখা আছে।
“আজ ঠিক করতে হবে যে আলোচনা শুরু করলেন ইউদিনিচ, “এই তথ্যকে কিভাবে কাজে লাগানো যায়।”
“আমার মনে হয় কমরেড়” আগ্রহ নিয়ে যোগ করল রালেই লন্ডনে একটা প্রেস কনফারেন্স করার অনুমতি দিয়ে দিন।”
রামোনের ঠোঁটের কোনে ফুটে উঠল বাঁকা হাসি।
“কমরেড সেক্রেটারী-জেনারেল চওড়া হাসি হাসলেন ইউদিনিচ, “আমার মনে হয় ঘোষণাটা যদি সোভিয়েত রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট দেন, তাহলে ব্যাপারটা যথোচিত গুরুত্ব পাবে।” বিদ্রুপের স্বরে বলে উঠলেন ইউদিনি। তিনি আবার কালোদেরকে পছন্দ করেন না।
এই মিটিং-এর আগে ব্যক্তিগতভাবে রামোনকে জানিয়ে ছিলেন- এসব “বানর” কে আলোচনা থেকে বাদ দেয়ার কথা। আপনার তো ওদের সাথে মেশার ভালো অভিজ্ঞতা আছে, কমরেড। এক প্যাকেট বাদাম নিয়ে আসব নাকি, কী বলেন?; মিটি মিটি হেসেছেন ইউদিনিচ।
ঝাড়া বিশ মিনিট ধরে কোনো কথা বলল না রামোন। বাকি দুজনের উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় দেখে অবশেষে মধ্যস্থতা করলেন বোরোদিন : “আচ্ছা কমরেড জেনারেল মাচাদোর রায় জানলে হয় না? উনার সোর্সের কাছ থেকে তো তথ্যটা এসেছে- হয়তো উনিই ভাল বলতে পারবেন যে এ থেকে কতটা ফায়দা লোটা যায়।”
