ডেজার্ট গড

১. চর্বির ভাঁজে

ডেজার্ট গড – উইলবার স্মিথ
ভাষান্তর : কাজী আখতারউদ্দিন

চর্বির ভাঁজে থাকা ছোট ছোট চোখদুটো পিট পিট করে, এটন বাও খেলার ছক থেকে মাথা তুলে একপাশে তাকালো। একটু দূরে ত্যামোস রাজবংশের দুই রাজকুমারি উদোম গায়ে উপহ্রদের স্বচ্ছ পানিতে খেলা করছিল। নিরাসক্তভাবে ওদের দিকে তাকিয়ে সে মন্তব্য করলো, ওরা আর ছোটটি নেই।

নীল নদের ভাটিতে একটি উপহ্রদের পাশে পামপাতার ছাউনির নিচে আমরা মুখোমুখি বসেছিলাম। আমাদের দুজনের মাঝে একটা বাও খেলার ছক পাতা ছিল। খুঁটির পরবর্তী চাল থেকে আমার মনোযোগ অন্য দিকে সরিয়ে দেবার উদ্দেশেই সে মেয়েগুলো সম্পর্কে ওই মন্তব্য করেছে তা বুঝতে পারলাম। এটন হারতে পছন্দ করে না, কাজেই কীভাবে জিতবে সে বিষয়ে তার খুব একটা মাথা ব্যথা নেই।

এটন আমার সবচেয়ে পুরোনো এবং প্রিয় বন্ধু। আমার মতো সেও একজন খোঁজা, সেও এককালে ক্রীতদাস ছিল। তবে তার অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা ও মানসিক দৃঢ়তার কারণে, কৈশোরেই তার প্রভু তাকে অন্যান্য ক্রীতদাসের কাছ থেকে আলাদা করে নিয়েছিলেন। এটন সবসময় তার এই অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করতো, তবে সবধরনের কামনাবাসনা থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতো। সে ছিল বহুমূল্য সম্পদের মতো। তাই তার প্রভু তাকে খোঁজা করার জন্য মিসরের সবচেয়ে বিখ্যাত চিকিৎসককে নিযুক্ত করেছিলেন। এখন সে থিবসে ফারাও রাজপ্রাসাদের ব্যবস্থাপনার প্রধান ব্যক্তি। একইসাথে গুপ্তচরদেরও প্রধান। সমস্ত সভ্য জগতজুড়ে ছড়িয়ে থাকা সংবাদবাহক আর গুপ্তচরদের এক বিশাল চক্রকে সে পরিচালনা করছে। কেবল আরেকটি সংগঠন এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ, আর সেটি হচ্ছে আমার সংগঠনটি। আর প্রায় সবকিছুর মতো এই ক্ষেত্রেও আমরা পরস্পরের সাথে বন্ধুত্বমূলকভাবে প্রতিযোগিতা করি আর একজন আরেকজনকে টপকাতে পারলে যে পরিমাণ আনন্দ লাভ করি, তা আর কোনো কিছুতে পাই না।

তার সঙ্গ আমি খুব পছন্দ করি। তার সুপরামর্শ আর উপলব্ধি ক্ষমতা অনেক সময় আমাকে বেশ অবাক করে। আবার মাঝে মাঝে বাও খেলার ছকে সেও আমার দক্ষতা পরীক্ষা করে। সাধারণত উদারভাবেই সে আমার প্রশংসা করে, তবে বেশিরভাগ সময় আমার বুদ্ধির কাছে হার মানে।

এই মুহূর্তে আমরা দুজনেই বেকাথাকে লক্ষ্য করছিলাম। দুই রাজকুমারির মাঝে সে বড় বোনের চেয়ে দুই বছরের ছোট। তবে বয়সের তুলনায় বেশ লম্বা আর ইতিমধ্যেই তার বুক দুটো সামান্য উঁচু হয়ে উঠেছে। মেয়েটি বেশ চটপটে আর সবসময় হাসিখুশি। বেশ উপস্থিতবুদ্ধিও আছে। কাটাকাটা চেহারায় সোজা আর খাড়া নাক, কঠিন চিবুক আর পাতলা ঠোঁট। তামাটে ঘন চুল রোদে ঝিলিক দিচ্ছে। ওর বাবার কাছ থেকে সে এসব পেয়েছে। এখনও তার রজোদর্শন হয়নি, তবে মনে হয় আর বেশি দিন নেই।

আমি তাকে খুব ভালোবাসি, তবে সত্যি বলতে কী তার বড় বোনটিকে একটু বেশি ভালোবাসি।

দুজনের মধ্যে বড়-বোন তেহুতি আরও সুন্দর। যখনই আমি তার দিকে তাকাই তখনই আমার মনে হয় যেন আমি আবার তার মাকে দেখছি। রানি লসট্রিস ছিল আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ ভালোবাসা। হ্যাঁ, একজন পুরুষ যেমন একজন নারীকে ভালোবাসে সেরকমই আমি তাকে ভালেবাসতাম। আমার বন্ধু এটনকে যেমন ছোট থাকতে খোঁজা করা হয়েছিল, আমার বেলায় তা হয়নি। আমাকে যখন খোঁজা করা হয় তখন আমি পুরোপুরি যৌবনে পৌঁছে নারী দেহের আনন্দ বুঝতে শিখেছি। তবে এটা সত্যি, রানি লসট্রিসের সাথে আমার ভালোবাসা কখনও সে পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি, কেননা তার জন্মের আগেই আমাকে খোঁজা করা হয়েছিল। তবে কখনও কামনা-বাসনা মেটাতে না পারলেও তার প্রতি আমার প্রবল ভালোবাসা ছিল। শৈশবে আমি তাকে লালন পালন করেছি, তারপর বড় হওয়া পর্যন্ত দীর্ঘকাল তার চলার পথে উপদেশ দিয়েছি। কোনো ধরনের কার্পণ্য না করে নিজেকে উজাড় করে ঢেলে দিয়েছি। সবশেষে আমার হাতে মাথা রেখেই সে মারা যায়।

নিচের পৃথিবীতে যাওয়ার আগে লসট্রিস ফিসফিস করে আমাকে কিছু কথা বলেছিল, যা আমি কখনও ভুলতে পারবো নাঃ আমি জীবনে কেবল দুজন পুরুষকে ভালোবেসেছি। আর তার মাঝে তায়তা, তুমি হলে একজন।

এরকম মিষ্টি কথা আমি আর কখনও শুনিনি।

তার রাজকীয় সমাধির পরিকল্পনা আর নির্মাণের তত্ত্বাবধান আমিই করেছিলাম। তারপর সমাধির মাঝে সেই সুন্দর নিথর দেহটি রেখে আমার ইচ্ছা হচ্ছিল আমি নিজেও সেই নিচের পৃথিবীতে চলে যাই। তবে জানতাম তা হবার নয়; কেননা আমাকে তার সন্তানদের দেখাশুনা করতে হবে, যেরকম তারও করেছিলাম। সত্যি বলতে কী এই দায়িত্বটি গুরুভার ছিল না, কেননা এই পবিত্র দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আমার জীবন আরও সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছিল।

ষোল বছর বয়সে তেহুতি একজন পুরোপুরি নারীতে পরিণত হয়েছে। তার গায়ের ত্বক চকচকে আর মসৃণ। সরু, নিটোল বাহু আর পাদুটো ছিল একজন নৃত্যশিল্পীর মতোই সুগঠিত। কিংবা বলা যায় তার বাবার সেই বিখ্যাত যুদ্ধের ধনুকের মতো, যা আমি নিজে বানিয়েছিলাম আর তার মৃত্যুর পর সেটা তার শবাধারের ঢাকনির উপর রেখে সমাধিটি সিলমোহর করে দিয়েছিলাম।

তেহুতির নিতম্ব চওড়া হলেও কোমর ছিল একটি সুরার জগের গলার মতো সরু। বুকদুটো গোলাকার আর নিটোল। মাথাজুড়ে সোনালি কোঁকড়া চুল ছিল তার সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য। মায়ের মতো তার চোখদুটোও ছিল সবুজ। তার সৌন্দর্যের কথা বলে শেষ করা যাবে না আর যখনই সে আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসতো আমার বুক ধক করে উঠতো। তার স্বভাব ছিল কোমল, সহজে রাগতো না তবে একবার রেগে উঠলে সে অকুতোভয় আর কঠিন হয়ে উঠতো।

আমি তাকে প্রায় সেরকমই ভালোবাসি যেমনটি তার মাকে এখনও ভালোবাসি।

এটন মুক্তকণ্ঠে আমার প্রশংসা করে বললো, তুমি ভালোভাবেই ওদের মানুষ করছো তায়তা। ওরাই হচ্ছে সেই সম্পদ যা আমাদের মিসরকে বর্বরদের হাত থেকে রক্ষা করতে পারে।

এই বিষয়টিসহ আরও অনেক বিষয়ে এটন আর আমি সম্পূর্ণ একমত ছিলাম। আর এটিই আসল কারণ যেজন্য আমরা দুজন এই সূদুর নির্জন স্থানে এসেছি। যদিও স্বয়ং ফারাওসহ রাজপ্রাসাদের সবাই জানে আমরা এখানে বাও খেলার প্রতিযোগিতা করছি।

তার এই মন্তব্যের তাৎক্ষণিক কোনো উত্তর না দিয়ে আমি চোখ নামালাম বাও ছকের দিকে। আমি যখন মেয়েদের দিকে তাকিয়ে ছিলাম, তখন এটন ওর শেষ চালটা দিয়েছিল। মিসরের এই ভীষণ সুন্দর খেলায় সে ছিল অত্যন্ত কুশলি একজন খেলোয়াড়, কিংবা সমগ্র সভ্য জগতেরও একজন শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড় বলা চলে। শুধু আমি ছাড়া। আমি সাধারণত চারটি খেলার মধ্যে তিনটিতেই তাকে হারিয়ে দিতাম।

এখন একবার নজর দিয়েই বুঝতে পারলাম সেই তিনটি জিতের একটি এবার হতে যাচ্ছে। তার শেষ চালটা বেশ দুর্বল ছিল, খুঁটির বিন্যাস

এলোমেলো হয়ে পড়েছিল। কোনো কোনো সময় যখন সে ভাবতে শুরু করে যে, এই দানে তার জয় নিশ্চিত হবে তখন প্রায়ই সে এই ভুলটি করে ফেলতো। বাতাসে তার অসাবধানতা টের পাওয়া যেত আর তখন সে সাতটি খুঁটির নিয়ম মেনে চলতো না। এরপর সে দক্ষিণ দিকের নৌকা থেকে পূর্ণ আক্রমণে মনোযোগ দিতে গিয়ে পুর্ব কিংবা পশ্চিম দিকের দখল নিতে আমাকে সুযোগ করে দিত। এবার পূর্বদিক ভোলা ছিল। আমি আর দ্বিতীয় সুযোগের জন্য অপেক্ষা না করে গোখরা সাপের মতো একটা ছোবল মারলাম।

আমার আচমকা এই চালটা যখন সে বুঝতে পারলো তখন হতবাক হয়ে পেছন দিকে হেলে পড়তেই টুলের পেছন দিকে প্রায় উল্টে পড়লো। আমার এই চাতুরিটি বুঝতে পেরে রাগে তার মুখ কালো হয়ে গেল। কথা বলতে গিয়ে তার গলা ভেঙে গেল, আমার তোমাকে ঘৃণা করা উচিত তায়তা। আগে না করলেও এখন অবশ্যই করা উচিত।

আমি যদুর সম্ভব আবেগ দমন করে বললাম, শোন তুমি আমার পুরোনো বন্ধু। আসলে আজ আমার ভাগ্য ভালো ছিল। যাইহোক এটাতো শুধু একটা খেলা।

সে রাগে গাল ফুলিয়ে বললো, এ যাবত যত ফাঁকাবুলি তোমার কাছ থেকে শুনেছি, তার মধ্যে এটা হচ্ছে সবচেয়ে মোটাদাগের। এটা শুধু খেলা নয়। এটা হচ্ছে বেঁচে থাকার একটা কারণ। এবার সে আসলেই রেগে গেছে। মনে হল।

আমি টেবিলের নিচে থেকে তামার মদের জগটা বের করে তার কাপটা ভরে দিলাম। এটা সর্বোৎকৃষ্ট মদ, পুরো মিসরের মধ্যে সেরা। আমি নিজে ফারাওর প্রাসাদের নিচের মদ্য-ভান্ডার থেকে সরাসরি নিয়ে এসেছিলাম। এটন আবার গাল ফুলিয়ে রাগটা আমার উপর ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করতে যাবে, কিন্তু তার আগের মোটা মোটা আঙুল দিয়ে কাপের হাতলটা ধরতেই সে কাপটা ঠোঁটের কাছে তুললো। দুই ঢোক গিলতেই সুখের আমেজে তার চোখ মুদে এল। তারপর কাপটা নামিয়ে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো।

তারপর বাও খেলার খুঁটিগুলো চামড়ার থলেতে ভরতে ভরতে বললো, হয়তো তোমার কথাই ঠিক তায়তা। বেঁচে থাকার আরও ভালো কারণ নিশ্চয়ই আছে। উত্তরদিক থেকে কী খবর পেলে? তোমার গোয়েন্দা বুদ্ধির চমক আরেকবার আমাকে দেখাও দেখি।

এবার আমাদের এই সাক্ষাতকারের আসল উদ্দেশ্যে আমরা পৌঁছেছি। উত্তরদিকটা সবসময়ই বিপজ্জনক ছিল।

একশো বছর আগে বিশ্বাসঘাতকতা আর বিদ্রোহের কারণে শক্তিশালী মিসর বিভক্ত হয়ে পড়ে। লাল দাবীদার নকল ফারাও, ইচ্ছে করেই আমি তার নাম নিচ্ছি না–অনন্তকাল সে অভিশপ্ত হোক। এই বিশ্বাসঘাতক লোকটি আসল ফারাওয়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে আসিউতের উত্তরে পুরো অংশ দখল করে নেয়। তারপর থেকে আমাদের এই মিসরে একশো বছর ধরে গৃহযুদ্ধ চলছে।

পরবর্তীতে এই লাল দাবীদারের উত্তরাধিকারী সিনাইয়ের ওপারের তৃণভূমি থেকে আসা বন্য এবং যোদ্ধা এক উপজাতির আক্রমণের শিকার হল। ঘোড়া আর রথের সাহায্যে এই বর্বররা পুরো মিসর জয় করে নিল। এমন অস্ত্রের কথা আমরা আগে কখনও শুনিনি। লাল দাবীদারকে পরাজিত করার পর এরা মধ্য সাগর থেকে শুরু করে আসিউত পর্যন্ত মিসরের সম্পূর্ণ উত্তরাংশ দখল করে নিল। তারপর এই হাইকসোরা দক্ষিণে আমাদের উপর হামলা চালাল।

আমরা অর্থাৎ আসল মিসরীয়রা তাদের হামলা প্রতিহত করতে পারলাম। আমরা নিজ ভূমি থেকে বিতাড়িত হলাম। তারপর আরও দক্ষিণে নীলনদের জলপ্রপাতের ওপারে এলিফ্যান্টিনি দ্বীপ আর পৃথিবীর শেষ সীমানার জঙ্গলে পালিয়ে গেলাম। যখন আমরা ক্রমশ নির্জীব আর অবসন্ন হয়ে পড়ছিলাম তখন আমাদের প্রভু, রানি লসট্রিস নতুন করে সেনাবাহিনী পুনর্গঠন করছিলেন।

এই নবজন্মলাভে আমার ভূমিকাও খুব একটা তুচ্ছ ছিল না। নিজের ব্যাপারে আমি সাধারণত বেশি বলি না, তবে অন্তত এটুকু বলতে পারি যে, আমার পরামর্শ আর পথনির্দেশ ছাড়া আমার প্রভু এবং তার পুত্র যুবরাজ মেমনন, যিনি এখন ফারাও ত্যামোস হয়েছেন, কোনদিন তাদের উদ্দেশ্য সাধন করতে পারতেন না।

প্রভুর জন্য আমি যেসব কাজ করেছিলাম, তার মধ্যে প্রথমটি ছিল স্পোকওয়ালা চাকা দিয়ে তৈরি উন্নত প্রযুক্তির রথের গাড়ি। হাইকসোদের নিরেট কাঠের চাকা থেকে এগুলো অনেক হালকা আর দ্রুতগামি ছিল। এই রথ টেনে নেবার জন্য ঘোড়া খুঁজে আনলাম। তারপর যখন আমরা পুরোপুরি প্রস্তুত হলাম, তখন নতুন ফারাও নবযুবা ত্যামোসের নেতৃত্বে আমাদের সেনাবাহিনী জলপ্রপাতের মধ্য দিয়ে উত্তরে মিসর অভিযানে বের হল।

হানাদার হাইকসো নেতা নিজেকে রাজা স্যালিটিস নামে পরিচয় দিত, তবে সে মোটেই রাজা ছিল না। বড়জোর সে ছিল একজন দস্যুসর্দার এবং একজন অপরাধী। তবে তার সেনাবাহিনী সংখ্যায় মিসরীয়দের দ্বিগুণ ছিল। এরা ছিল অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিত এবং দুর্ধর্ষ প্রকৃতির।

আমরা হঠাৎ থিবস আক্রমণ করে ওদের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড লড়াই করলাম। ওদের রথগুলো চুর্ণবিচুর্ণ করে প্রচুর সৈন্য হত্যা করলাম। আর বাদবাকিদেরকে উত্তরদিকে তাড়িয়ে দিলাম। যুদ্ধক্ষেত্রে দশহাজার মৃতদেহ আর দুই হাজার ভাঙা রথ ফেলে ওরা পিছু হটে গেল।

তবে আমাদেরও অনেক ক্ষয়ক্ষতি হল। আর সেজন্যই তাদেরকে অনুসরণ করে পুরোপুরি ধ্বংস করতে পারলাম না। তখন থেকেই হাইকমোরা নীলনদের বদ্বীপে লুকিয়ে থাকতে শুরু করলো।

সেই লুটেরা রাজা স্যালিটিস এখন মৃত। যুদ্ধক্ষেত্রে একজন মিসরীয় যোদ্ধার তরবারির আঘাতে সে মারা যায়নি, যা তার জন্য সঠিক বিচার হত। চারপাশে একগাদা অতিকুৎসিৎ স্ত্রী আর বীভৎস অগুণতি সন্তান নিয়ে বার্ধক্যের কারণে সে মারা গিয়েছিল। এর মধ্যে তার সবচেয়ে বড় ছেলে বিওনও ছিল। এই বিওন এখন নিজেকে রাজা বিওন নামে উচ্চ এবং নিম্ন মিসর সাম্রাজ্যের ফারাও ঘোষণা করেছে। আসলে সে একজন হত্যাকারী ছাড়া আর কিছুই নয়, সে তার বাবার চেয়েও নিকৃষ্ট। আমার গুপ্তচরেরা নিয়মিত আমাকে জানাতে যে, থিবসের যুদ্ধে বিধ্বস্ত হয়ে যাওয়া হাইকসো সেনাবাহিনীকে সে আবার পুনর্গঠন করছে।

এই খবরগুলো বেশ অস্বস্তিকর ছিল, কেননা একই যুদ্ধে আমাদের যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল তা পুষিয়ে উঠার রসদ সংগ্রহ করতে আমাদের বেশ কষ্ট হচ্ছিল। চতুর্দিকে স্থলবেষ্টিত আমাদের দক্ষিণ রাজ্যটি বিশাল মধ্যসাগর থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ছিল আর সভ্যজগতের বিভিন্ন দেশ এবং নগর রাষ্ট্রের সাথেও বাণিজ্য হচ্ছিল না। যুদ্ধ করার জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ চামড়া, কাঠ, তামা, খাদ, টিন এবং শক্তির অন্যান্য উৎস এই দেশগুলোতে প্রচুর ছিল, অথচ আমাদের এগুলোর অভাব ছিল। এছাড়া আমাদের মানবসম্পদেরও কমতি ছিল। আমাদের এখন মিত্র প্রয়োজন।

অন্যদিকে আমাদের শত্রুপক্ষ হাইকসোদের নীল নদের মোহনায় চমৎকার বন্দর ছিল। এছাড়া আমার গুপ্তচরেরা আমাকে আরও জানিয়েছে যে, হাইকসোরাও অন্য যোদ্ধা দেশের সাথে মিত্ৰতা করার চেষ্টা করছে।

এসব বিষয় নিয়ে আলাপ করতেই এটন আর আমি এই নির্জন জায়গায় মিলিত হয়েছিলাম। আমাদের প্রিয় মিসরের অস্তিত্ব এখন তরবারির ডগায় ঝুলছে। এটন আর আমি এনিয়ে অনেকবার দীর্ঘ আলাপ করেছি, তবে এই শেষবার আলাপআলোচনা করে একটা সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ফারাওর সামনে তুলে ধরবো।

তবে রাজকুমারিদের উদ্দেশ্য ছিল অন্যরকম। ওরা লক্ষ্য করেছিল এটন বাও খেলার খুঁটি তুলে নিচ্ছে আর এটাকেই ওরা একটা ইঙ্গিত হিসেবে ধরে নিয়েছিল যে, এবার আমাকে পুরোপুরি ওদের দখলে নিতে পারবে। আমি ওদের দুজনের প্রতি আত্মনিবেদিত হলেও ওদের চাহিদা ছিল খুব বেশি। উপহৃদের পানি চতুর্দিকে ছিটিয়ে ওরা দ্রুত আমার দিকে ছুটে আসতে লাগলো। বেকাথা ছোট হলেও সে ছিল খুব দ্রুত আর দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। কোনো কিছু পাওয়ার জন্য সে যে কোনো কিছু করতে পারত। তেহুতিকে পেছনে ফেলে সে ভেজা আর ঠাণ্ডা শরীর নিয়ে আমার কোলে ঝাঁপিয়ে পড়লো।

তারপর আমার গলা জড়িয়ে ধরে আমার গালে ওর লাল চুলো মাথাটা খুঁজে ধরে চেঁচিয়ে উঠলো, আমি তোমাকে ভালোবাসি তাতা। আমাদেরকে একটা গল্প শোনাও, তাতা।

এদিকে তেহুতিও ছুটে এলো, তবে সে জায়গা পেল আমার পায়ের কাছে। ভেজা শরীরে মাটিতে বসে সে আমার পা তার বুকে চেপে ধরলো, তারপর আমার হাঁটুর উপর থুতনি রেখে উপরের দিকে মুখ তুলে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বললো, হ্যাঁ, তাতা। আমাদের মায়ের কথা বল। বল, মা কীরকম সুন্দরী আর বুদ্ধিমতি ছিল।

আমি প্রতিবাদের সুরে বললাম, আগে আমাকে এটন চাচার সাথে কথা বলতে হবে।

বেকাথা বললো, আচ্ছা ঠিক আছে। তবে বেশি সময় নিও না। এটা খুবই বিরক্তিকর।

ঠিক আছে, কথা দিলাম, বেশি সময় নেব না। তারপর এটনের দিকে ফিরে হাইকসো ভাষায় কথা বলতে শুরু করলাম। আমরা দুজনেই আমাদের শত্রুর ভাষায় স্বচ্ছন্দে কথা বলতে পারতাম।

আমি সবসময় আমার শত্রুকে জানার চেষ্টা করতাম। শব্দ আর ভাষার ব্যাপারে আমার বেশ পটুত্ব ছিল। থিবসে ফেরার পর লেখাপড়ার জন্য আমি অনেক বছর সময় পেয়েছিলাম। এটন নুবিয়ার শরণার্থীদলের সাথে যোগ দেয় নি। অভিযানের প্রতি তার খুব একটা আগ্রহ ছিল না। সে মিসরেই রয়ে যায় আর হাইকসোদের অত্যাচার সহ্য করে। তবে ভাষাসহ হাইকসোদের কাছ থেকে শেখার যা কিছু ছিল সব শিখে নেয়। রাজকুমারিরা এই ভাষার এক বর্ণও বুঝতে পারে না।

বেকাথা রেগে ঠোঁট ফুলিয়ে বললো, তোমাদের এই বিশ্রী ভাষায় কথা বলা শুনলে আমার ঘেন্না করে। তেহুতিও মাথা নেড়ে তার সাথে সুর মিলিয়ে বললো, যদি তুমি আমাদের ভালোবাস তাহলে মিসরি ভাষায় কথা বল তায়তা।

আমি বেকাথাকে জড়িয়ে ধরে তেহুতির মাথায় হাত রেখে আদর করলাম। তবে তারপরও এটনের সাথে সেই ভাষায় কথা বলে চললাম, যা মেয়েরা ভীষণ অপছন্দ করে। বাচ্চাদের কথায় কান না দিয়ে যা বলার বলে যাও বন্ধু।

এটন হাসি চেপে বললো, তাহলে সেই কথাই রইল তায়তা। আমাদের মিত্র প্রয়োজন আর সেই মিত্রদের সাথে বাণিজ্য করতে হবে। তবে সেই সাথে এসব বিষয় হাইকসোদের কাছে গোপন রাখতে হবে।

আমি মাথা নেড়ে গম্ভীরস্বরে বললাম, সবসময়ের মতো তুমি সঠিক জায়গায় পৌঁছেছ আর সত্যিকার সমস্যাটির কথাও উল্লেখ করেছ। মিত্র এবং বাণিজ্য। খুব চমৎকার বলেছ। তাহলে বল বাণিজ্য করার মতো কী আছে আমাদের কাছে, এটন?

জলপ্রপাতের ওধারে নুবিয়ায় নির্বাসিত জীবন কাটাবার সময় আমরা খনি থেকে যে সোনা পেয়েছি সেগুলো আছে। যদিও এটন কখনও মিসর ছেড়ে যায়নি, কিন্তু তার কথা শুনে মনে হচ্ছে যেন সে সেই দলবদ্ধ অভিযানে নেতৃত্ব দিয়েছিল। ভেতরে ভেতরে আমার হাসি পেলেও আমি গাম্ভীর্য বজায় রাখলাম। তারপর সে বললো, যদিও এই হলুদ ধাতুটি রূপার মতো তেমন মূল্যবান নয় তবুও মানুষ এর জন্য লালায়িত। ফারাও যে পরিমাণ সোনা তার কোষাগারে জমা করেছেন তা দিয়ে আমরা সহজেই বন্ধু আর মিত্র কিনতে পারবো।

আমি একমত হয়ে মাথা নাড়লাম। যদিও আমি জানতাম এটন কিংবা ওর মতো অন্য যারা আমার মতো রাজার এত কাছাকাছি নয়, তারা ফারাওয়ের সম্পদ সম্পর্কে বাড়িয়ে বলে। বিষয়টার আরও ব্যাপ্তি দেবার জন্য আমি তাকে মনে করিয়ে দিয়ে বললাম, তবে প্রত্যেকবছর প্লাবনের সময় আমাদের মা নীলনদ থেকে যে কালো দোঁআশলা মাটি আমরা দুই তীরে পাই সেকথা ভুলে যেও না। মানুষকে খেয়েপড়ে বাঁচতে হবে এটন। ক্রিট, সুমেরিয় আর হেলেনিয় নগর রাষ্ট্রগুলোর চাষযোগ্য জমির পরিমাণ খুব কম। ওদের জনগণের মুখে খাবার তুলে দেবার মতো শস্য জোগাতে ওদের খুব ভোগান্তি পোহাতে হয়। আর আমাদের প্রচুর শস্য রয়েছে।

আরে তাইতো তায়তা। বাণিজ্য করার মতো আমাদের কাছে শস্য আর ঘোড়া আছে। আমাদের ঘোড়া পৃথিবীর মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। এছাড়া এর চেয়েও আরও দুর্লভ এবং মূল্যবান কিছু বস্তু আমাদের কাছে আছে। এই কথা বলে এটন একটু থামলো, তারপর আমার কোলে বসা যে শিশুটিকে আমি আদর করছিলাম আর আমার হাঁটুর কাছে বসা সুন্দর শিশুটির দিকে সে তাকাল।

এই বিষয়ে আর কিছু বলার প্রয়োজন ছিল না। টাইগ্রিস আর ইউফ্রেটিস নদীর মাঝের এলাকার ক্রিট আর সুমেরিয়রা ছিল আমাদের সবচেয়ে কাছের এবং অত্যন্ত শক্তিশালী প্রতিবেশি। এই দুই জাতের মানুষেরাই সাধারণত শ্যামবর্ণ হত আর ওদের মাথার চুলও ছিল কালো। ওদের শাসক গোষ্ঠির কাছে এজিয়ান গোত্র আর মিসরের রাজপরিবারের সুন্দর চুল আর ফর্সা ত্বকের মেয়েদের ভীষণ কদর রয়েছে। তবে ফ্যাকাসে চেহারার কাঠখোট্টা হেলেনিয় মেয়েদের সাথে আমাদের নীল নদের অববাহিকার উজ্জ্বল রত্নের মতো লাবণ্যময়ী মেয়েদের কোনো তুলনাই করা যায় না।

আমার এই দুই রাজকুমারির বাবা তানুসের ছিল আগুনে রঙের কোঁকড়ানো চুল আর মা রানি লসট্রিস ছিলেন উজ্জ্বল স্বর্ণকেশি। তাদের বংশধর, এই দুই রাজকন্যার সৌন্দর্যের খ্যাতি সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছিল। দূরদূরান্ত থেকে বিভিন্ন দেশের দূতেরা ইতিমধ্যেই অতিকষ্টে বিশাল মরুভূমি এবং গভীর সমুদ্র পেরিয়ে থিবসের রাজপ্রাসাদে এসে ফারাও ত্যামোসের কাছে তাদের প্রভুদের আগ্রহ প্রকাশ করে জানিয়েছে যে, তারা ত্যামোস রাজপরিবারের সাথে বৈবাহিক সম্পর্কে স্থাপন করতে আগ্রহী। সুমেরিয় রাজা নিমরদ এবং ক্রিটের সর্বাধিরাজ মিনোজ তাদের দূত পাঠিয়েছিলেন।

আমার পরামর্শ মোতাবেক ফারাও এই দুই রাজ্যের দূতকে সাদরে বরণ করেছিলেন। রূপা আর সিডার কাঠের যেসব চমৎকার উপহারসামগ্রী ওরা এনেছিল তিনি তা গ্রহণ করেছিলেন। তারপর মনোযোগ দিয়ে তার একজন কিংবা উভয় বোনের সাথে বিয়ের প্রস্তাবের কথা শুনলেন। তবে ফারাও জানালেন দুই বোনই এখনও অনেক ঘোট, সুতরাং বিয়ের ব্যাপারে কোনো কথা এখনই বলা যাবে না। বরং ওরা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর আবার এ-বিষয়ে আলাপ করা যেতে পারে। তবে এটা বেশ কিছুদিন আগের কথা আর এখন পরিস্থিতি বদলেছে।

সে-সময় ফারাও আমার সাথে সুমেরিয় কিংবা ক্রিটের সাথে মিসরের সম্ভাব্য মৈত্রী বন্ধন নিয়ে আলাপ করেছিলেন আর আমি তাকে সুকৌশলে ইঙ্গিত দিয়েছিলাম যে, সুমেরিয়দের চেয়ে ক্রিটের সাথে মৈত্রি করাটাই বরং ভালো হবে।

প্রথমত সুমেরিয়রা সমুদ্রগামি জাতি নয়। অশ্বারোহী সেনা এবং রথসহ ওদের শক্তিশালী এবং সুসজ্জিত সেনাবাহিনী থাকলেও তাদের তেমন কোনো নৌবাহিনী ছিল না। আমি ফারাওকে মনে করিয়ে দিয়েছিলাম যে, আমাদের সাগরে যাওয়ার কোনো পথ নেই। হাইকসো শত্রুরা উত্তর দিকে নীল নদের যাওয়ার পথটি নিয়ন্ত্রণ করছে আর আমরা মূলত একটি ভূ-বেষ্টিত দেশ।

সুমেরিয়দেরও সমুদ্রপথের যাত্রা সীমিত ছিল আর তাদের নৌবহরও ছিল অন্যান্য দেশ, যেমন ক্রিট এবং পশ্চিমের মরিতানিয়দের তুলনায় বেশ ছোট। সুমেরিয়রা জাহাজবোঝাই মালামাল নিয়ে সমুদ্রপথে যাওয়ার ঝুঁকি নিতে সবসময় অনিচ্ছুক ছিল। ওরা জলদস্যু এবং সমুদ্রঝড়ের তাণ্ডবে আতঙ্কিত ছিল। তাছাড়া দুইদেশের মাঝে স্থলপথও বিপদসঙ্কুল ছিল।

মধ্য এবং লোহিত সাগরের মধ্যেকার যোজকটি হাইকসোদের নিয়ন্ত্রণে ছিল আর মিসরের সাথে উত্তরে সিনাই মরুভূমির সংযোগ ছিল। সেক্ষেত্রে সুমেরিয়দের সিনাই মরুভূমির মধ্য দিয়ে হেঁটে আরও দক্ষিণে গিয়ে জাহাজে চড়ে লোহিতসাগর পার হয়ে আমাদের কাছে আসতে হবে। এই পথ পাড়ি দিতে গিয়ে তাদের সেনাবাহিনীকে অনেক ঝামেলা পোহাতে হবে, এছাড়া পানির কষ্ট আর লোহিতসাগরে জাহাজ চলাচলের অপ্রতুলতার কথা ছেড়ে দিলেও এই পথে যাত্রা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে।

ইতিপূর্বে যে প্রস্তাবটি আমি ফারাওকে দিয়েছিলাম, এখন এটনকে তার কিছুটা ধারণা দিলাম, সেটা হল মিসর আর ক্রিটের সর্বাধিরাজ মিনোজের মাঝে একটি মৈত্রি চুক্তি। বংশপরম্পরায় ক্রিটের শাসকের উপাধি ছিল সর্বাধিরাজ মিনোজ। তিনি ছিলেন আমাদের ফারাওয়ের সমকক্ষ। অবশ্য তাকে আমাদের ফারাওয়ের চেয়ে বেশি শক্তিশালী বলাটা বিশ্বাসঘাতকতা হবে। তবে এটুকু অন্তত বললে যথেষ্ট হবে যে, তার নৌবহরে দশহাজারেরও বেশি রণতরী এবং এমন উন্নত ধরনের বাণিজ্যপোত ছিল যে, আর কোনো জাহাজ তাদেরকে সাগরে ধরতে কিংবা পরাজিত করতে পারতো না।

ক্রিটবাসীরা যা চায় তা আমাদের কাছে আছে: শস্য, সোনা এবং সুন্দরী বিয়ের কনে। আর আমাদের যা প্রয়োজন ক্রিটে তা আছে: অত্যন্ত দুর্ধর্ষ রণতরী বহর। যার সাহায্যে নীলনদের বদ্বীপের মোহনায় হাইকসোদের বন্দরগুলো অবরোধ করা যায়। আর সৈন্য বোঝাই সুমেরিয় জাহাজগুলোকে পাহারা দিয়ে মধ্য সাগরের দক্ষিণ উপকূলে পাঠিয়ে হাইকসোদের উপর একটি ভয়ঙ্কর সাঁড়াশি আক্রমণ করে, এই দুই শক্তির মাঝে ওদের সেনাবাহিনীকে চেপে ধরে পিষে ফেলা যায়।

এটন করতালি দিয়ে আমাকে অভিনন্দন জানিয়ে বললো, চমৎকার পরিকল্পনা! প্রায় নির্ভুল একটি পরিকল্পনা। তবে প্রিয় তায়তা, একটা ছোট বিষয় তোমার নজর এড়িয়ে গেছে। সে দাঁত বের করে হাসতে লাগলো আর একটু আগে বাও খেলায় আমি যে তাকে হারিয়ে দিয়েছিলাম তার একটা শোধ নিতে পেরেছে ভেবে বেশ আত্মতৃপ্তির ভাব দেখাতে লাগলো। আমি কখনও প্রতিহিংসা পরায়ণ ছিলাম না, তবে এই ঘটনার সুবাদে একটু নির্দোষ আনন্দ নেবার সুযোগও হারালাম না। একটু হতবাক হবার ভঙ্গি : করে বললাম।

আহা, দয়া করে বলনা কী সেটা! আমিতো খুব সাবধানে সবদিক ভেবে এই পরিকল্পনা করেছি। এতে ভুলটা কোথায় বল?

এটন জিহ্বায় চুকচুক শব্দ করে তার হাতির মতো বিশাল এক উরুতে চাপড় মেরে বললো, তুমি অনেক দেরি করে ফেলেছো বন্ধু। ক্রিটের সর্বাধিরাজ মিনোজ ইতিমধ্যেই হাইকসো রাজা বিওনের সাথে একটা গোপন মৈত্রিচুক্তি করে ফেলেছে। একথা বলে এটন মনে করেছে সে আমার পরিকল্পনায় একটা বিরাট খুঁত বের করে ফেলেছে।

উত্তরে আমি বললাম, হ্যাঁ ঠিকই বলেছো! আমার মনে হয় পাঁচমাস আগে তামিয়াতে ক্রিটরা বিওনের সাথে বাণিজ্য করার জন্য যে দুর্গ স্থাপন করেছে তুমি তার কথা বলছে। এটাতো নীল বদ্বীপের একেবারে পূর্বদিকের মোহনায় অবস্থিত, তাই না?

এবার এটনের হতাশ হবার পালা। তুমি কখন এটা জানলে? কীভাবে জানলে?

আমি দুই হাত দুদিকে মেলে বললাম, এটন! তুমি নিশ্চয়ই এটা আশা করতে পারো না যে আমার গোপন খবরের সমস্ত সূত্রগুলো আমি প্রকাশ করে দেব?

এবার এটন দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে বললো, সমর চুক্তি না হলেও সর্বাধিরাজ মিনোজ আর বিওনের মধ্যে ইতিমধ্যেই একটা গোপন সমঝোতা হয়েছে। সবাই জানে তুমি খুব বুদ্ধিমান তায়তা। তবে এখানে তুমি তেমন কিছু করতে পারবে না।

আমি রহস্যময়ভাবে তাকে জিজ্ঞেস করলাম, আর যদি বিওন প্রতারণা করার পরিকল্পনা করে থাকে?

সে হা করে আমার দিকে তাকিয়ে বললো, প্রতারণা মানে? বুঝতে পারলাম না তায়তা। এখানে কী ধরনের প্রতারণা হবে?

তোমার কোনো ধারণা আছে এটন, ক্রিটের সর্বাধিরাজ মিনোজ কী পরিমাণ রূপা হাইকসো এলাকার মাঝে তাদের এই নতুন দুর্গে জমা করেছে?

নিশ্চয়ই অনেক বেশি হবে। যদি সর্বাধিরাজ মিনোজ বিওনের কাছ থেকে আগামী মৌসুমের বেশিরভাগ শস্য কিনতে চান তাহলে তাকে প্রচুর পরিমাণে রূপা হাতে রাখতে হবে। তারপর এটন একটু সাবধানে হিসেব করে বললো, সম্ভবত দশ কিংবা বিশ লাখও হবে।

তোমার কল্পনাশক্তি খুবই ভালো বলতে হয়, প্রিয় বন্ধু। তবে সর্বাধিরাজ মিনোজ যে সমস্যাগুলোর সম্মুখিন হতে যাচ্ছেন, তুমি তার সামান্য অংশ বলেছ। ঝড়ের মৌসুমে তিনি খোলা সাগরে এত সম্পদ বোঝাই জাহাজ পাঠাবার ঝুঁকি নেবেন না। কাজেই বছরের পাঁচমাস তিনি মধ্য সাগরের দক্ষিণ উপকূলে রূপার পিণ্ডগুলো পাঠাতে পারছেন না। আর শীতকালে তার দ্বীপ থেকে পাঁচশো লিগেরও বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে হবে।

এটন দ্রুত বলে উঠলো, হ্যাঁ, ঠিক বলেছ! আমি তোমার যুক্তিটা বুঝতে পেরেছি। তার মানে সেই সময়ে সর্বাধিরাজ মিনোজ বিশাল সমুদ্রে আফ্রিকার উপকূলের দেশগুলোর সাথে বাণিজ্য করতে পারবেন না!

আমি একমত হয়ে বললাম, পুরো শীতকালে অর্ধেক পৃথিবীর সাথে তার কোনো সম্পর্ক থাকবে না। তবে যদি তিনি মিসরীয় উপকুলে একটি নিরাপদ নৌঘাঁটি স্থাপন করতে পারেন তবে তার নৌবহর শীতকালের ঝড়ের ধাক্কাটা সামলাতে পারবে। তারপর সারা বছর ধরে স্থলভূমির নিরাপদ আচ্ছাদনে তার জাহাজগুলো মেসোপটেমিয়া থেকে মরিতানিয়া পর্যন্ত বাণিজ্য করে যেতে পারবে। একটু থেমে আমি তাকে সর্বাধিরাজ মিনোজ কী পরিকল্পনা করতে যাচ্ছেন তার বিশালত্ব পুরোপুরি বুঝার সুযোগ দিলাম। তারপর বললাম, এই ধরনের কার্যক্রমের একশোভাগের এক অংশও বিশ লাখ রূপার বাটে পোষাবে না। কমপক্ষে পাঁচশো লাখ রূপা তাকে তামিয়াতের নতুন দুর্গে জমা রাখতে হবে যদি তাকে শীতকালে বাণিজ্য চালিয়ে যেতে হয়। তোমার কী মনে হয় এই বিপুল পরিমাণ রূপার জন্য যে কোনো লোক কি প্রতারণা করতে পারে না? বিশেষত সেই লোক যদি হয় বিওনের মতো বিশ্বাসঘাতক, লুণ্ঠনকারী এবং অসৎ একজন মানুষ?

আমার কথাগুলো শোনার পর পুরো বিষয়টা উপলব্ধি করে এটন কিছুক্ষণ নির্বাক হয়ে রইল। তারপর আবার ফ্যাসফ্যাসে কণ্ঠে আমাকে জিজ্ঞেস করলো, তাহলে তোমার কাছে প্রমাণ আছে যে, সর্বাধিরাজ মিনোজের সাথে করা প্রাথমিক মৈত্রি চুক্তি উপেক্ষা করে বিওন তামিয়াত দুর্গ আক্রমণ করবে আর সর্বাধিরাজ মিনোজের সমস্ত সম্পদ লুট করে নেবে? এই কথাই কি তুমি আমাকে বলতে চাচ্ছ তায়তা?

আমি এটা বলিনি যে, বিওন একাজ করবে তার কোনো প্রমাণ আমার কাছে আছে। আমি শুধু তোমাকে একটা প্রশ্ন করেছি। আমি কোনো উক্তি করিনি। এবার তার হতভম্ব চেহারা দেখে আমি মুখ টিপে হাসলাম। একটু বেশি নির্দয় হয়ে গেছে, তবে দুষ্টুমিটা করা থেকে নিজেকে সামলাতে পারিনি। আমাদের এতদিনের পরিচয়ে এই প্রথম দেখলাম আমার কথার পিঠে সে কিছুই বলতে পারছে না। এবার সত্যি তার জন্য আমার করুণা হল।

দেখ এটন, আমরা দুজনেই জানি বিওন একজন জংলি আনাড়ি-গেঁয়ো ভূত। সে রথ চালাতে পারে, তলোয়ার ঘোরাতে পারে, তীর ছুঁড়তে পারে আর একটা নগরে লুটতরাজ করতে পারে। তবে আমার মনে হয়, গদাইলস্করি চাল আর যন্ত্রণাদায়ক ধীরগতি ছাড়া সে গোপন কোনো জায়গায় অভিযান চালাতে পারবে না।

এটন বললো, তাহলে কে সর্বাধিরাজ মিনোজের কোষাগার আক্রমণ করবে? তার কথার তাৎক্ষণিক কোনো উত্তর না দিয়ে আমি টুলে আরাম করে বসে মৃদু হাসলাম। এরপর সে আমার দিকে তাকিয়ে বললো, নিশ্চয়ই তুমি নও তায়তা! সর্বাধিরাজ মিনোজের পাঁচলাখ রূপা লুট করার পরিকল্পনা করে কীভাবে তুমি ক্রিটের কাছে সহায়তা আর মৈত্রী আশা করবে?

আমি তাকে বললাম, অন্ধকারে কে হাইকসো আর কে মিসরী তা বুঝা বেশ কঠিন। বিশেষত মিসরীয়রা যদি হাইকসো যোদ্ধার পোশাক পরে, হাইকসো অস্ত্র হাতে নিয়ে হাইকসো ভাষায় কথা বলে। সে মাথা নাড়লো, মুখে কোনো কথা জোগাল না। তারপরও আমি আবার বললাম, তুমি নিশ্চয়ই একমত হবে যে, এ-ধরনের একটা বিশ্বাসঘাতক আক্রমণের পর আমাদের বিরুদ্ধে ক্রিট আর হাইকসোদের মাঝে কোনো ধরনের সমঝোতা হবার আদৌ আর কোনো আশা থাকবে?

এবার এটন মৃদু হেসে বললো, তুমি সত্যিই খুব চতুর, তায়তা। ভাবছি তোমাকে কখনও বিশ্বাস করতে পারবো না। তারপর সে জিজ্ঞেস করলো, আচ্ছা তামিয়াতে ক্রিটের গ্যারিসন কত বড় হবে?

এ-মুহূর্তে সৈনিক আর তীরন্দাজ মিলিয়ে হাজার দুয়েক হবে। তবে এদের বেশিরভাগই ভাড়াটে সৈনিক।

এবার সে আগ্রহ দেখিয়ে বললো, আচ্ছা! তারপর একটু থেমে বললো, তোমার কত লোক লাগবে কিংবা এভাবেও বলতে পারি, বিওনের কত লোক লাগবে এই কাপুরুষচিত পরিকল্পনা কাজে লাগাতে?

আমি বাধা দিয়ে বললাম, যথেষ্ট হয়েছে। সবকিছু আমি এটনকে বলতে পারি না আর সেও তা বুঝতে পেরে আর চাপাচাপি করলো না। তবে ঘুরিয়ে আরেকটা প্রশ্ন করলো।

তামিয়াত দুর্গে তুমি কাউকে জীবিত রাখবে না? সবাইকে মেরে ফেলবে?

তার এই প্রশ্নের উত্তরে বললাম, ওদের বেশিরভাগকেই পালিয়ে যাবার সুযোগ দেব। আমি চাই যেন বেশিরভাগ লোক ক্রিটে ফিরে গিয়ে সর্বাধিরাজ মিনোজকে বিওনের বিশ্বাসঘাতকতার কথাটা জানিয়ে তাকে সাবধান করে।

এটন বললো, আর ক্রিটের সম্পদ? ঐ পাঁচ লাখ রূপার কী হবে?

ফারাওয়ের সিন্দুক প্রায় খালিই বলা চলে। সম্পদ ছাড়া আমরা মিসরকে রক্ষা করতে পারবো না।

তারপর সে জিজ্ঞেস করলো, এই অভিযান কে চালাবে? তুমিই কি নেতৃত্ব দেবে তায়তা?

আমি চেহারায় দুঃখ নিয়ে বললাম, তুমি জানো আমি যোদ্ধা নই, এটন। আমি একজন চিকিৎসক, কবি এবং একজন শান্তিপ্রিয় দার্শনিক। যাইহোক যদি ফারাও নির্দেশ দেন তবে অধিনায়কের একজন উপদেষ্টা হিসেবে অভিযানে অংশ গ্রহণ নেবো।

তাহলে কে নেতৃত্ব দেবে? ক্রাটাস?

ক্রাটাসকে আমি পছন্দ করি, সে একজন ভালো সৈনিক। তবে লোকটা বুড়ো, মাথামোটা আর কোনো ধরনের যুক্তি কিংবা মতামতের ধার ধারে না।

এবার এটন চুক চুক করে বললো, হে শান্তিপ্রিয় কবি! তুমি জেনারেল ক্রাটাসের একেবারে সঠিক বর্ণনা দিয়েছ। সে না হলে ফারাও কাকে নিযুক্ত করবেন?

সম্ভবত জারাসকে নিযুক্ত করবেন।

ও আচ্ছা! রাজকীয় রক্ষিবাহিনীর নীল কুমির ডিভিশনের সেই বিখ্যাত ক্যাপ্টেন জারাস? তোমার পছন্দের লোক, তাই না তায়তা?

আমি তার কথায় টিটকারির সুর উপেক্ষা করে বললাম, আমার কোনো বিশেষ পছন্দের লোক নেই। তবে এই কাজের জন্য জারাস সবচেয়ে উপযুক্ত।

.

ফারাওকে আমার এই পরিকল্পনা জানালাম, কীভাবে ক্রিটের সর্বাধিরাজ মিনোজের কাছে রাজা বিওনকে অবিশ্বাসি করে তোলা হবে আর দুজনের মাঝে এমন সন্দেহের বীজ ঢুকানো হবে, যার ফলে ওরা পরস্পরকে অবিশ্বাস করবে। অথচ এই দুজনই পৃথিবীতে আমাদের চরম শত্রু। আমার এই চমৎকার আর অত্যন্ত সহজ পরিকল্পনা শুনে ফারাও ভীষণ অবাক হয়ে গেলেন।

আমি একান্তে তার সাক্ষাত প্রার্থনা করতেই তিনি সাথে সাথে রাজি হয়েছিলেন। আমরা দুজনে তার সিংহদরবারের চারপাশ ঘিরে থাকা দুপাশে পামগাছশোভিত চওড়া বারান্দায় হাঁটছিলাম। দক্ষিণ মিসরের নীল নদের সবচেয়ে চওড়া তীরে এর অবস্থান। অবশ্য আসিউতের পরই নদী আরও চওড়া হয়ে যখন হাইকসোদের অধিকৃত অঞ্চলের মধ্য দিয়ে বয়ে যায় তখন এর স্রোত প্রবাহ ধীর হয়ে আসে। তারপর বদ্বীপের মধ্য দিয়ে নদী মধ্যসাগরে উপনীত হয়।

শক্ৰমিত্র কেউই যাতে আমাদের দেখতে কিংবা আমাদের কথা শুনতে না পারে তা নিশ্চিত করার জন্য বারান্দার দুই মাথায় প্রহরী নিযুক্ত রয়েছে। এরা বিশ্বস্ত কর্মকতার সরাসরি অধীনস্থ ছিল, তবে এরা ফারাও আর আমার দৃষ্টির আড়ালে অবস্থান নিয়েছিল। মার্বেল পাথরে ছাওয়া পায়ে চলা পথ দিয়ে আমরা পায়চারি করছিলাম। এখন যেহেতু আমরা দুজন একা, তাই তার কাঁধে-কাঁধ মিলিয়ে চলা আমার জন্য সম্ভব ছিল। কেননা তার জন্ম মুহূর্ত থেকেই আমি তার সাথে খুবই ঘনিষ্ঠ ছিলাম।

প্রকৃতপক্ষে আমার হাতেই তার জন্ম হয়। যখন রানি লসট্রিস এক টানে তাকে গর্ভ থেকে বের করে আনেন তখন আমিই প্রথম এই নবজাত শিশুর দেহটি হাতে ধরেছিলাম। আর প্রথম যে কাজটি এই রাজকুমার করেছিলেন, তা হল আমার গায়ে প্রস্রাব করা। এই কথা মনে পড়তেই আমি মৃদু হাসলাম।

সেদিন থেকেই আমিই ছিলাম তার শিক্ষক এবং গুরু। আমিই তাকে শিখিয়েছিলাম কীভাবে শৌচকর্ম করতে হয়, তারপর লেখাপড়া, তীর ঘোড়া আর যুদ্ধরথ চালনা শিখিয়েছিলাম। আমার কাছ থেকেই তিনি শিখেছেন কীভাবে একটি জাতিকে শাসন করতে হয়। অবশেষে এখন তিনি একজন চমৎকার যুবক, সাহসী ও বলবান যোদ্ধা আর এই মিসরের একজন পরিশীলিত শাসক হয়েছেন। তবে আমরা এখনও খুব ভালো বন্ধু। অন্তত এতটুকু আমি বলতে পারি, ফারাও আমাকে একজন পিতার মতো ভালোবাসেন, যে পিতাকে তিনি কখনও দেখেননি। আর আমিও তাকে সেই পুত্রের মতো ভালোবাসি যে পুত্র আমার কখনও ছিল না।

শত্রুসৈন্যকে বোকা বানাবার জন্য আমি যে কৌশল উদ্ভাবন করেছি, তার বিবরণ শুনতে শুনতে তিনি পায়চারি করা থামিয়ে অবাক বিস্ময়ে আমার দিকে তাকিয়ে রয়েছেন। আমার বলা শেষ হলে তিনি তার ইস্পাত কঠিন হাত দিয়ে আমার দুই কাঁধ চেপে ধরলেন। তলোয়ার ঘুরিয়ে, তীর ছুঁড়ে আর একটি চার ঘোড়ার রথের লাগাম সামলিয়ে তার হাতদুটো কঠিন আর ব্রোঞ্জের মতো শক্ত হয়ে গিয়েছিল।

তারপর আমার মুখের দিকে তাকিয়ে তিনি চিৎকার করে বলে উঠলেন, তায়তা, তুমি একটি বুড়ো পাজির পা ঝাড়া! সবসময় আমাকে অবাক করে দাও। তুমি ছাড়া আর কেউ এ-রকম সাংঘাতিক পরিকল্পনা করতে পারে না। আমার মনে আছে যখন তুমি আমাকে হাইকসো ভাষা শেখার জন্য জোরজবরদস্তি করেছিলে তখন আমার খুব রাগ হয়েছিল; আর এখনতো এটা ছাড়া আমি কিছুই করতে পারতাম না। এ-ধরনের অভিযানে আমাদের শত্রুদের একজন হিসেবে চলতে না পারলে তো আমি কখনও এই অভিযানে নেতৃত্ব দিতে পারতাম না।

এরপর আমার কয়েকঘন্টা লাগলো তাকে বুঝাতে যে ইতিহাসের এরকম চরম একটি মুহূর্তে একজন নেতার মিসর ছেড়ে যাওয়াটা অত্যন্ত বিপজ্জনক হতে পারে আর তামিয়াতে মিনোজের দুর্গ দখল কিংবা সেখানকার সম্পদের চেয়ে তার দেশে থাকাটা অনেক জরুরী। আমি হোরাসকে ধন্যবাদ দিলাম এজন্য যে, তার বয়স কম হওয়ায় তার মত বদলাতে অসুবিধা হয় না, আবার অন্যদিকে ভালোমন্দ বুঝার মতো বয়সও তার হয়েছে। অনেক আগে থেকে আমি শিখেছি কীভাবে তাকে বুঝতে না দিয়ে তার মত আমার দিকে ফেরাতে হয়। পরিশেষে প্রত্যেকবারই আমি আমার মতো করতে পারি।

যাইহোক আমার প্রস্তাব মতো ফারাও জারাসকেই এই অভিযানে নেতৃত্ব দিতে নির্দেশ দিলেন। ফারাওয়ের মতো জারাসের বয়সও মাত্র পঁচিশ বছর হলেও–সে ইতিমধ্যেই তার সামরিক পদবী অনুযায়ী যথেষ্ট সুনাম অর্জন করেছে। আমি ইতিপূর্বে বেশ কয়েকবার তার সাথে কাজ করেছি এবং জানতে পেরেছি যে তার সুনাম যথার্থ। সবচেয়ে বড় কথা সে আমাকে শ্রদ্ধা করে।

যাইহোক বিদায় নেবার আগে ফারাও ত্যামোস আমার হাতে রাজকীয় বাজপাখির সীলমোহরটা তুলে দিলেন। এর মানে হচ্ছে এটি বহনকারীর হাতে ফারাও তার পূর্ণ ক্ষমতা তুলে দিচ্ছেন। এই সীলমোহর যার হাতে থাকবে সে কেবল ফারাওকে জবাবদিহি করবে। রাজকীয় দায়িত্ব পালনকালে কোনো মানুষ মৃত্যু যন্ত্রণায় কাতর হলেও সীলমোহরধারীকে কোনো প্রশ্ন করতে পারবে কিংবা তার কাজে বাধা দিতে পারবে না।

প্রথানুযায়ী ফারাও কেবলমাত্র যথাযথ পবিত্র অনুষ্ঠানের মাধ্যমে রাজদরবারের জ্যেষ্ঠ সদস্যদের উপস্থিতিতে কারও হাতে এই সীলমোহর তুলে দেন। তবে আমি বুঝতে পারলাম এ-ধরনের একটি সংবেদনশীল বিষয়ে তিনি সম্পূর্ণ গোপনীয়তার মধ্যে এটি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। যাইহোক আমার প্রতি তার এই আস্থা দেখানোর কারণে আমি অত্যন্ত বাধিত হলাম।

হাঁটুগেড়ে বসে তার সামনে মাটিতে কপাল ঠেকালাম। তবে ফারাও নিচু হয়ে আমাকে ধরে দাঁড় করালেন।

তারপর আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন, তুমি আমাকে কখনও বিফল করনি, তায়তা। জানি এবারও করবে না।

.

আমি জারাসকে খুঁজে বের করে তাকে এই মিশনের গুরুত্ব বুঝিয়ে বললাম। আর এও বললাম ফারাওয়ের কাছে নিজের সম্পর্কে উচ্চ ধারণা তুলে ধরার এটি একটি সুযোগ। এই মিশনের সফলতা তাকে উন্নতির সোপানে দৃঢ় পদক্ষেপ রাখা আর রাজার সুনজরে থাকার পথ খুলে দেবে। আমার কথা শুনে সে অভিভূত হল।

অভিযানের জন্য আমরা দুজন মিলে দুইশোজনের একটি তালিকা ঠিক করলাম। প্রথম দিকে জারাস প্রতিবাদ করেছিল যে, এত কম লোক দিয়ে ক্রিট সেনা ছাউনির প্রায় দুই হাজার সেনার মোকাবেলা করা সম্ভব হবে না। তখন আমি তাকে মিশনের বিশেষ অংশটি বুঝিয়ে বললাম, যা এটন আর ফারাওকেও বলিনি। তারপর সে আমার পরিকল্পনা পুরোপুরি বুঝতে পেরে তা গ্রহণ করলো।

আমি তাকে নিজের পছন্দ মত লোক বেছে নেবার সুযোগ দিয়েছিলাম। শুধু একটা বিষয়ে জোর দিয়েছিলাম, আর তা হল যাদেরকে সে পছন্দ করবে তাদের প্রত্যেককে হাইকসো ভাষা জানতে হবে। হাইকমোরা যখন দক্ষিণ মিসর আক্রমণ করেছিল তখন জারাস খুব ছোট ছিল, তাই সে অন্যান্যদের সাথে নির্বাসনে নুবিয়ায় যায়নি। প্রকৃতপক্ষে তার যখন ষোল বছর বয়স তখন তাকে জোর করে হাইকসো সেনাবাহিনীতে ভর্তি করা হয়েছিল। ফলে সে এত চমৎকার হাইকসো ভাষায় কথা বলতে শিখেছিল যেন সে তাদেরই একজন। যাইহোক সে একজন প্রকৃত মিসরী ছিল। আর তাই ফারাও ত্যামোস যখন আমাদের সেনাদের নেতৃত্ব দিয়ে জলপ্রপাতের মধ্য দিয়ে এসে থিবসের যুদ্ধে হাইকসোদের আক্রমণ করে তাড়িয়ে দেন, তখন সেই প্রথম তার আসল

জাতির কাছে ফিরে আসে।

জারাস যে লোকগুলোকে বেছে নিয়েছিল, তারা বেশিরভাগই তার অধীনস্থ প্রশিক্ষিত এবং কুশলী যোদ্ধা ছিল। তারা যেমন নাবিক ছিল তেমনি যোদ্ধাও ছিল। আর যখন ওরা যুদ্ধের রথ টানতো না তখন নদীর বুকে নৌযোদ্ধা হিসেবে সময় কাটাত। জারাসের তাদেরকে আর কিছুই শেখাবার বাকি ছিল না।

আমি তাকে বললাম লোকগুলোকে পনেরো বিশজনের ছোট ছোট দলে ভাগ করে নিতে, যাতে থিবস শহর থেকে বের হবার সময় কারও দৃষ্টি আকর্ষণ না হয়।

নগরের মূল ফটকে রাজকীয় বাজপাখির সীলমোহর দেখাতেই প্রহরীদলের অধিনায়ক আমাকে কোনো প্রশ্ন করলো না। পরপর তিন রাত ধরে জারাসের বাহিনীর লোকগুলো ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে শহর থেকে বের হয়ে পূর্বদিকের জঙ্গলের দিকে চললো। ওরা প্রাচীন আকিতা নগরীর ধ্বংসাবশেষ এলাকায় এসে আমার সাথে মিলিত হল। আমি ওদের জন্য সেখানে অপেক্ষা করছিলাম।

আমি সেখানে কয়েকগাড়ি বোঝাই আসল হাইকসো শিরস্ত্রাণ, বর্ম, যুদ্ধের পোশাক আর অস্ত্র এনে রেখেছিলাম। থিবসের যুদ্ধে শত্রুর কাছ থেকে আমরা যেসব যুদ্ধ উপকরণ দখল করেছিলাম, এগুলো তার সামান্য কিছু অংশ ছিল।

আকিতা থেকে পুবে লোহিত সাগরের উত্তরদিকের শেষ মাথায় সুয়েজ উপসাগরের সৈকতের দিকে আমরা হাঁটা শুরু করলাম। উর্দি আর অস্ত্রের উপর সবাই বেদুইন আলখাল্লা পরে নিল।

জারাস আর আমি ঘোড়ায় চড়ে মূল দলের আগেই রওয়ানা দিয়েছিলাম। আমরা দুজন উপসাগরের সৈকতে আল নাদাস নামে একটি ছোট্ট জেলে পল্লীতে ওদের জন্য অপেক্ষা করছিলাম, দলের বাকিরা সেখানে এসে আমাদের সাথে যোগ দিল।

জারাস তার পূর্বপরিচিত বিশ্বস্ত একজন পথপ্রদর্শক নিযুক্ত করেছিল। লোকটির নাম আল-নামজু। একচোখবিশিষ্ট দীর্ঘদেহী লোকটি অধিকাংশ সময় নীরব থাকতো। সে আল নাদাসে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল।

আমাদেরকে পুবদিকের সৈকতে নিয়ে যাবার জন্য আল-নামজু গ্রামের সমস্ত মাছ ধরা নৌকা ভাড়া করেছিল। এই জায়গায় উপসাগর বিশ লিগেরও কম চওড়া, আমরা ওপারে সিনাই এলাকার নিচু পাহাড়গুলো দেখতে পাচ্ছিলাম।

রাতে তারার আলোয় পথ দেখে ওপারে গেলাম। উপসাগরের পূর্বসৈকতে আরেকটা ছোট জেলে পল্লীর কাছে পৌঁছলাম। জুবা নামে এই গ্রামটিতে আল নামজুর ছেলেরা আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল। ভারী মালপত্রগুলো বহন করার জন্য ওরা একশো গাধা ভাড়া করেছিল। উত্তরদিকে মধ্যসাগরে পৌঁছাতে আমাদেরকে আরও দুইশো লিগ পথ হেঁটে যেতে হবে। তবে আমাদের লোকেরা যে কোনো পরিস্থিতিতে চলার মতো প্রশিক্ষিত ছিল, কাজেই আমরা দ্রুত চলতে শুরু করলাম।

হাইকসো সেনাচৌকি এড়াতে আল নামজু আমাদেরকে নিয়ে আফ্রিকা আর এশিয়ার সংযোগকারী সিনাই যোজকের পূর্ব প্রান্তের কাছাকাছি থাকতে চেষ্টা করলো। শেষপর্যন্ত আমরা মধ্যসাগরের দক্ষিণ তীরের ফোনিশিয় বন্দর উশুর কাছে পৌঁছলাম। এই স্থানটি সুমেরিয় সীমান্ত আর হাইকসো হানাদারদের অধিকৃত উত্তর মিসরের প্রায় মাঝামাঝি অবস্থানে ছিল।

বন্দরের বাইরে জারাস আর তার লোকজনদের রেখে আমি দুটি গাধার পিঠে শস্য আর গমের চামড়ার থলেতে সোনার বাট লুকিয়ে নিয়ে সামনে এগিয়ে চললাম। সাহায্য করার জন্য সাথে চারজন লোক বেছে নিলাম। বন্দরের বণিকদের সাথে তিনদিন দরকষাকষির পর তিনটি মাঝারি মাপের একতলা পাল তোলা জাহাজের ব্যবস্থা করলাম। জাহাজ ফোনিশিয় মেলকার্ট মন্দিরের নিচে সমুদ্র সৈকতে আনার ব্যবস্থা করা হল। প্রচুর অর্থ ব্যয় হল, থিবস থেকে শস্যের থলেতে লুকিয়ে আনা আর কয়েকটা মাত্র সোনার বাট অবশিষ্ট রইল।

স্থলভাগের দিক থেকে আসা হালকা বাতাস আমাদেরকে সামনে এগিয়ে নিল। বড়পালগুলো খাঁটিয়ে মাল্লাদের মাঝে মাঝে বিশ্রাম দেওয়া হল। আবার উশু পার হলাম, তবে এবার বিপরীত দিকে। আমি নৌকাগুলো দিগন্তসীমার নিচে আর বন্দরের নজরের বাইরে রাখার চেষ্টা করলাম।

এক একটা নৌকায় সত্তর জনেরও বেশি মানুষ বসলেও আমরা বেশ দ্রুত গতিতেই এগিয়ে চললাম। পরদিন বিকেলে আমি হিসাব করে দেখলাম তামিয়াতের ক্রিট দুর্গ সামনে একলিগেরও কম দূরত্বে রয়েছে।

আমি অবশ্য জারাসের সাথে সামনের নৌকাতেই ছিলাম। এবার তাকে জানালাম যেহেতু উশু অনেক পেছনে ফেলে এসেছি, কাজেই এখন আমরা সবাই কাছাকাছি হয়ে সৈকতের দৃষ্টিসীমার মধ্যেই থাকতে পারি। কেননা স্থলভূমি দেখে আমার পক্ষে অবস্থান নিশ্চিত হয়ে নৌকা চালানো সুবিধা ছিল। শেষবেলায় সূর্য সামনের সাগরের পানি ছুঁতেই আমি কান্ডারীকে একটা নির্জন বালুকাবেলা দেখালাম। নৌকার তলভাগ মাটি ছুঁতেই লোকজন লাফিয়ে নেমে বালুর উপর দিয়ে নৌকাটি টেনে নিয়ে গেল।

থিবস থেকে এত দূর আসতে অনেক কষ্ট হলেও আমরা আমাদের লক্ষ্যের বেশ কাছাকাছি চলে এসেছি। সন্ধ্যায় আমাদের শিবিরের সবার মাঝে বেশ উত্তেজনা, উদ্দীপনা জেগে উঠলো।

জারাস তার সবচেয়ে চৌকশ দুইজন লোকের উপর অন্যান্য জাহাজের নেতৃত্বের ভার দিয়েছিল। প্রথমজনের নাম দিলবার। দীর্ঘদেহী সুন্দর চেহারার এই লোকটির পেশিবহুল, শক্তিশালী দুটি হাত ছিল। প্রথম সাক্ষাতেই সে আমার মনোযোগ আকর্ষণ করেছিল আর আমিও তাকে পছন্দ করেছিলাম। তার কালো চোখদুটো তীব্ৰভেদী হলেও ডানদিকের গালে আড়াআড়িভাবে তলোয়ারের একটা দগদগে ক্ষত ছিল। এতে অবশ্য তার সুন্দর চেহারায় বিরূপ প্রভাব রাখেনি। সে কোনো আদেশ দিলে লোকজন সাথে সাথে তা পালন করতো।

তৃতীয় জাহাজের অধিনায়ক ছিল গাট্টাগোট্টা চেহারার বৃষকন্ধ এক লোক। এর নাম আকেমি। হাসিখুশি এই লোকটি উচ্চকণ্ঠে কথা বলতো। তার পছন্দের হাতিয়ার ছিল লম্বা হাতলওয়ালা একটা কুঠার। সবার খাওয়াদাওয়া শেষ হওয়ার পর আকেমি আমার কাছে এলো।

আমাকে অভিবাদন করে সে বললো, প্রভু তায়তা। লোকজন আমাকে বলেছে আজ রাতে আপনি কি গান গেয়ে আমাদেরকে সম্মানিত করবেন? প্রথম প্রথম লোকজন আমাকে এই সম্বোধন করায় আমি মৃদু প্রতিবাদ করেছিলাম, কেননা আমি এর যোগ্য নই। কিন্তু কেউ তা মানেনি আর আমিও আর এরপর থেকে বিষয়টা নিয়ে তেমন মাথা ঘামাইনি।

আমার কণ্ঠস্বর ছিল অসাধারণ আর আমার হাতের আঙুলে বীণাও প্রায় স্বর্গীয় সুর নিয়ে বাজতো। আমি খুব কমই এ-ধরনের অনুরোধ ফিরিয়ে দিতাম।

সেই রাতে তামিয়াত যুদ্ধের আগে আমি তাদের জন্য বেছে নিলাম রানি লসট্রিসের শোকসঙ্গীত। এটা ছিল আমার বিখ্যাত একটি রচনা। আমার চারপাশে সবাই আগুন ঘিরে বসলো। আমি পুরো ১৫০টি চরণই গেয়ে শোনালাম। ওদের মধ্যে যারা ভালো গান গাইতো ওরা আমার সাথে কোরাসে গলা মেলাল আর অন্যরা গুণগুণ করলো। গানের শেষে সবার চোখ সজল হল। আমার চোখের জল অবশ্য আমার গান গাওয়ায় কোনো ব্যাঘাত ঘটায় নি।

.

পরদিন ভোরে প্রথম আলো ফোঁটার সাথে সাথেই আমাদের শিবিরে কর্মচাঞ্চল্য জেগে উঠলো। এখন আমাদের লোকজন বেদুঈন পোশাক আর মাথার আবায়া খুলে হাইকসো উর্দি, বর্ম আর অস্ত্রশস্ত্রভরা গাটরি খুললো। বর্মটি মূলত চামড়ার তৈরি তবে শিরস্ত্রাণটি ছিল ব্রোঞ্জের আর নাকের উপরিভাগ ধাতুর টুকরা দিয়ে ঢাকা। প্রত্যেকে একটা করে শক্তিশালী বাঁকা ধনুক আর তূণ ভর্তি চকমকি পাথরের মাথাওয়ালা তীর নিয়ে সজ্জিত হল। তীরগুলোর গোড়ায় হাইকসো রীতিতে বিভিন্ন রঙের পালক লাগানো ছিল। তলোয়ারগুলো পিঠের খাপে ভরা ছিল, হাতল ছিল উপরের দিকে যাতে সহজে হাত দিয়ে টেনে বের করা যায়। তলোয়ারের পাতগুলো মিসরীয় তলোয়ারের মতো সোজা ছিল না, এগুলো প্রাচ্যের রীতিতে বাঁকা ছিল।

বর্ম আর অস্ত্রগুলো খুব ভারী ছিল আর প্রচণ্ড রোদে খুব গরম হয়ে যাওয়ায় এগুলো পরে দাঁড় বাওয়া খুব কষ্টকর ছিল। কাজেই আমাদের। লোকেরা পরনের কাপড় খুলে শুধু লেঙটি পরলো আর যুদ্ধের পোশাক-আশাক সবকিছু পায়ের কাছে ডেকে বিছিয়ে রাখলো।

এদের বেশিরভাগেরই গায়ের রঙ ফর্সা আর চুল সোনালি। আমি ওদের সকলকে বলালাম চুলার ছাই নিয়ে মুখে আর দাড়িতে মেখে নিয়ে কালো করতে যাতে ওদের দেখে হাইকসো সৈন্য মনে হয়।

তিনটি জাহাজ সৈকত থেকে উপসাগরের পানিতে ভাসলো। আমি জারাসের সাথে সবার আগের জাহাজে থাকলাম। কাণ্ডারীর পাশেই দাঁড়ালাম, সে লম্বা হাতটা ধরেছিল। উশু বন্দরে যে ব্যবসায়ীর কাছ থেকে জাহাজগুলো কিনেছিলাম, তার কাছ থেকে একটা প্যাপিরাস মানচিত্রও সাথে নিয়েছিলাম। এতে জেবেল আর ওয়াদি আল নিলামের মাঝে মধ্য সাগরের দক্ষিণাংশের বিশদ বিবরণ তুলে ধরা ছিল। লোকটি দাবী করেছিল সে তার প্রত্যক্ষ

অভিজ্ঞতা থেকে নিজ হাতে মানচিত্রটি তৈরি করেছে। মানচিত্রটা ডেকে বিছিয়ে চারকোণায় চারটি নুড়ি পাথর দিয়ে চাপ দিলাম। আর সাথে সাথে সৈকতের কিছু বৈশিষ্ট দেখে মানচিত্রের সাথে মেলাতে পারলাম। দেখে মনে হল মানচিত্রটা নিভরযোগ্য।

সকালে দুইবার আমরা দিগন্ত রেখার কাছে অন্যান্য জলযানের পাল দেখতে পেলাম। তবে আমরা সরে গিয়ে ওগুলোকে চলে যাওয়ার সুযোগ দিলাম। তারপর সূর্য যখন ঠিক মাথার উপর তখন জাহাজের সামনের গলুই থেকে দাঁড়ি চিৎকার করে সকলকে সাবধান করে সামনের দিকে দেখাল। আমি চোখে হাত দিয়ে রোদ ঢেকে সে যেদিকে দেখিয়েছিল সেদিকে তাকালাম। অবাক হয়ে দেখলাম দিগন্তজুড়ে সাগরের পানি সাদা হয়ে ভারী ঝড়ো বাতাসের মতো আমাদের উপর আছড়ে পড়তে যাচ্ছে। কিন্তু এখনতো ঝড়ের ঋতু নয়।

আমি জারাসকে বললাম, পাল নামিয়ে ফেলতে বল! দাঁড়গুলো তুলে ভেতরে রেখে নোঙর তৈরি করে রাখতে বল।

প্রচণ্ড বেগে পানি আমাদের দিকে ছুটে আসছিল। বাতাসের ধাক্কা সামলাবার জন্য আমরা তৈরি হলাম। সাদা পানি প্রচণ্ড গর্জন করে এদিকে ছুটে আসছে। আমি শক্ত হাতে নৌকার একপাশ ধরে থাকলাম। সাগরের ঢেউ পাটাতনের উপর আছড়ে পড়লো। লোকজনের চিৎকার-চেঁচামেচি আর জাহাজের দুইধারে ঢেউ ভেঙে পড়ার হট্টগোলে কানে তালা লেগে গেল। কিন্তু কোন হাওয়া নেই দেখে অবাক হলাম। সাথে সাথে আমার মনে হল হাওয়া ছাড়া ঝড় মানে নিশ্চয়ই অতিপ্রাকৃতিক কোনো ব্যাপার। এই বিপদ থেকে আমাদের রক্ষা করার জন্য আমি চোখ বুজে মহান দেবতা হোরাসের কাছে প্রার্থনা করতে লাগলাম।

তারপর একটি হাত আমার কাঁধ ধরে জোরে ঝাঁকাতে লাগলো আর সেই সাথে কানের কাছে প্রচণ্ড চিৎকার শুনতে পেলাম। আমি জানি এটা জারাসের গলা কিন্তু তারপরও চোখ খুললাম না। আমি অপেক্ষা করছিলাম দেবতা আমাদেরকে রক্ষা করার ব্যবস্থা নেবেন। কিন্তু জারাস অনবরত আমাকে ধরে ঝাঁকিয়েই চলেছে, আমি সাবধানে চোখ খুললাম কিন্তু সেই সাথে প্রার্থনাও করে চললাম। তখনই বুঝলাম জারাস কিছু বলতে চাচ্ছে আর তখন একপাশে সাগরের দিকে তাকালাম।

সাগর জীবন্ত হয়ে উঠেছে তীরের ফলার মতো বিশাল চকচকে কতগুলো দেহ নিয়ে। তারপর একমুহূর্ত পর বুঝতে পারলাম এগুলো জীবন্ত প্রাণী আর এক একটা প্রাণী একটা ঘোড়ার সমান আকৃতির। দানবাকৃতির এই মাছগুলো এতঘন হয়ে এক সাথে ছিল যে, নিচেরগুলো উপরেরগুলোকে ঠেলে উপরের দিকে ভেসে উঠতে চেষ্টা করায় বিশাল ঢেউ সৃষ্টি করে পানি ছিটিয়ে চলছিল।

জারাস চেঁচিয়েই চলেছে, টুনা! এগুলো টুনা মাছ।

উচ্চ মিসর একটি স্থলবেষ্টিত দেশ হওয়ায় খোলা সাগরে যাওয়ার আমার তেমন সুযোগ হয়নি। আর এত বিশাল পরিমাণে টুনা মাছও দেখিনি। তবে এগুলো সম্পর্কে অনেক লেখা পড়েছি, তাই আমার বুঝা উচিত ছিল কী হচ্ছে। সাথে সাথে চোখ খুলে আমিও জারাসের মতো চিৎকার করে উঠলাম। অবশ্যই এগুলো টুনা মাছ! হারপুন নিয়ে লোকজনকে তৈরি হতে বল!

জাহাজে উঠার সময়েই আমি হারপুন লক্ষ্য করেছিলাম। এগুলো দাঁড়িদের বসার বেঞ্চের নিচে রাখা ছিল। আমার ধারণা ছিল জলদস্যুদের হামলা ঠেকাতে এগুলো ব্যবহৃত হয়। একজন মানুষের দ্বিগুণ দৈর্ঘ্যের সমান লম্বা বল্লম। ডগা ধারালো সংকর ধাতুর। ডগার পেছনে একটা চোখের মতো ছিদ্র দিয়ে নারিকেলের ছোবড়ার আঁশের দড়ি ঢোকানো ছিল। আর দড়ির অপর প্রান্তে একটা বাঁকা কাঠের ফাত্না বাঁধা ছিল।

আমার নির্দেশের সাথে সাথে সবচেয়ে আগে জারাস কাজে লেগে পড়লো। তারপর অন্যরা তাকে অনুসরণ করলো।

সে লম্বা অস্ত্রটা বেঞ্চের তলা থেকে তুলে নিয়ে দড়ির গিঁট খুলে রশি ছাড়তে ছাড়তে জাহাজের এক পাশে ছুটে চললো। লম্বা হারপুনটা কাঁধে রেখে রশিবাধা মাথাটা নিচে ঝাঁক বেঁধে চলা টুনার চকচকে রূপালি স্রোতের দিকে তাক করলো। বিশাল গোল গোল চোখ নিয়ে মাছগুলো মনে হচ্ছে আতঙ্কিত হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে।

আমি লক্ষ্য করলাম, সে লক্ষ্য স্থির করে হারপুনের মাথা নিচু করে সোজা পানিতে ছুঁড়ে মারলো। ভারী হারপুনের ডগাটা বিশাল মাছের শরীরে সজোরে বিধতেই মাছটি একটা ঝটকা মারতেই হারপুনটা একটু কেঁপে পানিতে তলিয়ে গেল।

জারাস এক লাফে ডেকে নেমে লম্বা রশিটা ধরে ফেললো। আরও তিনজন নাবিক এগিয়ে এলো ওর সাহায্যে, তারপর সবাই মিলে রশিটা সামলে টানতে টানতে মাছটা টেনে তুললো।

চারজন লোক জারাসকে অনুসরণ করে বেঞ্চের নিচ থেকে হারপুন তুলে নিয়ে জাহাজের একপাশে ছুটে গেল। একটু পর জাহাজের দুইপাশেই লোকজন ছুটাছুটি করে হারপুন গেঁথে বিশাল মাছগুলো জাহাজের ডেকে টেনে উঠাতে লাগলো। লোকজনের উত্তেজিত চিৎকার, চেঁচামেচি, নির্দেশ আর হট্টগোলের শব্দে জাহাজের পুরো পরিবেশে কর্মচাঞ্চল্য জেগে উঠলো।

একটার পর একটা মাছ ডেকে উঠিয়ে হাতুড়ির আঘাতে মেরে ফেলা হল। হারপুনে গেঁথে শেষ মাছটা তুলে কেটে ফেলার পর বাদবাকি মাছের দল হঠাৎ যেরকম উদয় হয়েছিল সেরকম হঠাৎ আবার গভীর পানির নিচে অদৃশ্য হয়ে গেল।

সেই রাতে আমরা আবার সৈকতে নামলাম, তারপর বেলাভূমিতে আগুন জ্বেলে মাছ রান্না করে খেলাম। এটি ছিল সাগরের সবচেয়ে সুস্বাদু মাছ। স্বাদ বাড়াবার জন্য ওরা একটু লবন মেখে নিল। সবাই পেটপুরে খেল তারপর চামড়ার মশক থেকে মদ খেল।

আমি জানতাম শক্তি সঞ্চয়ের পরদিন সকালে ওরা শত্রুর মোকাবেলা করার জন্য উদগ্রীব হয়ে থাকবে। মাংস খেলে একজন যোদ্ধার মনে যে দানবটি থাকে তা জেগে উঠে।

সেই রাতে আমি গাইলাম তানুস এবং নীল তরবারির গাথা। এটা ছিল সাগরের রণসঙ্গীত। আর এই গান ওদের মনে চরম উদ্দীপনা জাগিয়ে তুললো। সবাই আমার সাথে গলা মিলিয়ে গানটা গাইতে লাগলো, এমনকি যার গলা একেবারে বেসুরো সেও বাদ গেল না। তারপর আমি লক্ষ্য করলাম ওদের চোখে লড়াই করার মানসিকতা তীব্র হয়ে উঠেছে। এখন ওরা যেকোনো শত্রুর মোকাবেলা করতে প্রস্তুত।

.

পরদিন ভোরের আলো ফোঁটার সাথে সাথে আমরা জাহাজগুলো পানিতে ভাসালাম। হালকা আলোয় পানির নিচে ডুবো পাহাড়ের চূড়া সামলে নিরাপদ পথ বেছে নিয়ে চলতে লাগলাম।

নীলনদের বদ্বীপের মুখের কাছাকাছি আসতেই আমি আমার অবস্থান সম্পর্কে আরও নিশ্চিত হলাম। শেষবিকেলে একটা মোহনা পার হলাম, এর পূর্বপাশে নিচু জঙ্গল আর পশ্চিমে খোলা মাটির তীর। একটু ভেতরে সাগরের দিকে মুখ করা জঙ্গলাকীর্ণ স্থানটিতে একটি কাদামাটির ইটের তৈরি চুনকামকরা দুর্গ দেখা গেল। দুর্গের চূড়াটা প্রায় ভেঙে পড়েছে আর সাগরের দিকের অধিকাংশ দেয়ালেরও ভগ্ন দশা। তবে আমি বুঝতে পারলাম এটা হচ্ছে তামিয়াত প্রণালীর নৌচলাচলের সংকেত কেন্দ্র। সম্ভবত অনেক আগে মৃত কোনো মিসরী নাবিক এটা তৈরি করেছিল।

আমি একছুটে আমাদের জাহাজের একমাত্র মাস্তুলের কাছে গিয়ে খুঁটি বেয়ে উপরে উঠতে শুরু করলাম। উপরে পালের খুঁটি পা দিয়ে আঁকড়ে ধরে সামনে তাকালাম। এখান থেকে সামনে তীরভূমি পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। দূরে তীরভূমির আরও ভেতরে গাছের মাথার উপর দিয়ে একটি আয়তাকার স্থাপনা পরিষ্কার দেখা গেল। এটাও সাদা চুনকাম করা। এবার আমি নিঃসন্দেহ হলাম মিনোয়ানদের যে বাণিজ্য-দুর্গ আর কোষাগার আমরা খুঁজছি এগুলো তার সূরক্ষিত পর্যবেক্ষণ চৌকি। আমি মাস্তুলের খুঁটি বেয়ে সর সর করে নিচে নেমে চিৎকার করে কাণ্ডারীকে বললাম, জলদি হাল ধর! জাহাজ সামনের ডানদিকে তিন পয়েন্ট ঘোরাও!

জারাস দৌড়ে কাছে এসে জিজ্ঞেস করলো, তাই করবো?

আমি মৃদু হেসে কাণ্ডারীর দিকে ঘাড় কাত করে বললাম, হ্যাঁ, তাই করতে বল। আমরা আবার সাগরের দিকে ঘুরে চললাম। অন্য জাহাজ দুটোও আমাদের অনুসরণ করলো। এখন আমরা সৈকত থেকে বেশ দূরে সরে চলতে লাগলাম। তারপর কিছুদূর সামনে গিয়ে তামিয়াত দুর্গের পাহারা চৌকির নজর এড়ালাম। আবার গতিপথ বদলালাম। এরপর সোজা বদ্বীপের গোলকধাঁধার মতো জলাভূমির দিকে এগোলাম।

মানচিত্র থেকে আমি জেনেছিলাম কোথায় নোঙর বাধার মতো নিরাপদ স্থান পাওয়া যেতে পারে। পালগুলো নামিয়ে ডেকে বিছিয়ে রাখা হল, তারপর প্যাপিরাস আর নলখাগড়ার ঘন বনের মধ্য দিয়ে পথ করে আমার পছন্দমতো একটা উপদের দিকে চললাম। এখানে পৌঁছে আমরা গাছপালার ঘন জঙ্গলে পুরোপুরি ঢাকা পড়লাম। অগভীর পানিতে নোঙর ফেলা হল, জাহাজের তলা সাগরের নিচে কাদার একটু উপরে রইল। থুতনি পর্যন্ত শরীর পানিতে ডুবিয়ে আমরা এক জাহাজ থেকে অন্য জাহাজে আসা যাওয়া করতে লাগলাম।

সূর্যাস্তের পর চাঁদ উঠতেই সবাই অবশিষ্ট টুনা মাছ দিয়ে রাতের খাবার খেলাম। জারাস নিঃশব্দে তিন জাহাজ থেকে আট জন লোক বেছে নিল। ওদেরকে জানাল পরদিন ভোরে সূর্য ওঠার সাথে সাথে আমাদের সাথে শত্রুপক্ষের অবস্থান পরীক্ষা করার অভিযানে যেতে হবে।

ভোর হবার ঘন্টা খানেক আগে আমরা সবাই দুটো এক বৈঠার ডিঙিতে চড়লাম। এদুটো জাহাজের পেছনে বেঁধে আনা হয়েছিল। চওড়া উপহ্রদের মধ্য দিয়ে বৈঠা বেয়ে অন্তরীপের যে জায়গায় দুৰ্গটা দেখেছিলাম তার একটু কাছে পৌঁছলাম।

অন্ধকারে মাথার উপর দিয়ে উড়ে যাওয়া জলাভূমির পাখির ডাক আর ডানা ঝাঁপটানোর শব্দ শোনা যাচ্ছে। অন্ধকার হালকা হতেই আবছা আলোয় জলচর জংলি হাঁস, রাজহাঁস, লম্বা ঠ্যাং আর গলার বক, সুন্দর পালক আর লেজ বিশিষ্ট বিভিন্ন ধরনের অন্তত পঞ্চাশটারও বেশি সারসজাতীয় পাখি দেখা গেল। আমরা উপহ্রদের মধ্য দিয়ে ডিঙ্গি বেয়ে এগোতেই হাঁসগুলো ঝাঁক বেঁধে ডানা ঝাঁপটাতে ঝাঁপটাতে পানির উপর থেকে শূন্যে উড়াল দিল। দিগন্তের উপর সূর্য উঠতেই দেখা গেল চারপাশের জায়গাটি পুরোপুরি জংলি আর মনুষ্যবসতির অনুপযোগী একটি স্থান।

শক্ত মাটিতে পৌঁছার পর ডিঙি দুটো টেনে নিয়ে নলখাগড়ার ঝোঁপের আড়ালে লুকিয়ে রাখলাম। তারপর ঘন ঝোঁপের মধ্য দিয়ে সাবধানে এগিয়ে চললাম।

তারপর হঠাৎ একটা গভীর খালের কাছে এসে পৌঁছলাম। প্যাপিরাসের মধ্য দিয়ে খালটা দক্ষিণ দিকে সোজা সাগরের দিকে চলে গেছে। প্রায় একশো কদম চওড়া খালটা বেশ গভীর, হেঁটে পার হওয়া সম্ভব নয়। খালের অপর তীরে পাহারা চৌকির সমতল ছাদ দেখা যাচ্ছে। ছাদের পাচিলের উপরে কমপক্ষে তিনজন পাহারাদারের শিরস্ত্রাণপরা মাথা দেখা যাচ্ছে।

এরপর হঠাৎ সাগরের দিক থেকে একটা জলযান আসার পরিষ্কার শব্দ শোনা গেল। আমি সবাইকে সাবধান করলাম। জাহাজ চলার কাঁচকোচ, মাঝিমাল্লাদের বৈঠা বাওয়ার শব্দ বেড়ে চলেছে। তারপর হঠাৎ খালের বাঁকে একটা সমুদ্রগামি বিশাল জাহাজ দেখা গেল।

এত বড় আর এ-ধরনের জাহাজ আমি কখনও দেখিনি। তবে আমার গুপ্তচরদের পাঠানো বর্ণনা থেকে আমি নিশ্চিত হলাম এটা ক্রিটদের তিন সারিতে দাঁড় বাওয়া একটা রণতরী। এতে যেমন মাল বহন করা যায়, তেমনি যুদ্ধজাহাজ হিসেবেও ব্যবহার করা যায়। একটার পর একটা তিনতলা ডেকে তিন সারি দাঁড় রয়েছে।

জাহাজের সামনের লম্বা সরু ডগাটি ব্রোঞ্জের পাত দিয়ে মোড়ানো, যাতে শত্রুপক্ষের জাহাজকে গুঁতো দেওয়া যায়। দুটি মাস্তুলে বেশ বড় জায়গা জুড়ে পাল খাটানো যায়। তবে পালগুলো এখন গোটানো রয়েছে, যেহেতু সংকীর্ণ খালের মধ্য দিয়ে দাঁড় বেয়ে আসতে হচ্ছে। জাহাজটি বেশ সুন্দর, দড়িদড়া পরিষ্কার আর উঁচু বরগা। এই জাহাজটি দেখে সহজেই বুঝা যায় ক্রিটের নৌবাহিনী কেন পৃথিবীর মধ্যে সেরা। মাল বোঝাই হওয়ার কারণে এখন একটু নিচু হলেও অন্য কোন জাহাজই এর মোকাবেলা করতে পারবে না। ভাবলাম জাহাজের খোলে কি মাল বোঝাই করা হয়েছে কে জানে।

নলখাগড়ার ঝোঁপের যে জায়গায় আমরা লুকিয়েছিলাম, জাহাজটি তার সমান্তরাল হতেই আমি নাবিকদের চেহারা দেখতে পেলাম। সামনের দিকে তিনজন নৌ-কর্মকর্তা দাঁড়িয়ে রয়েছে আর পাশেই চারজন মাঝি লম্বা দাঁড় সামলাচ্ছে। তিন নৌযোদ্ধার মুখের বেশিরভাগ বর্ম দিয়ে ঢাকা থাকলেও বুঝা যাচ্ছে লোকগুলো গড়পরতা মিসরীয়দের চেয়ে বেশ লম্বা আর বলিষ্ঠ। ওরা যে বাণিজ্যপোতের নাবিক নয় বরং যোদ্ধা, তা সহজেই বুঝা যায়।

জাহাজটি আমাদের পাশ কাটাবার সময় লক্ষ করে বুঝতে পারলাম, সবচেয়ে উপরের সারিতে যারা লম্বা দাঁড় বাইছে তারা মোটেই ভারবাহী পশুর মতো মাঝিমাল্লা নয়, ওরা অবশ্যই যোদ্ধা। অধিনায়কের নির্দেশ পাওয়ার সাথে সাথেই দাঁড় ছেড়ে দিয়ে পায়ের কাছে রাখা অস্ত্র নিয়ে লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বে।

তবে নিচের সারিগুলোতে শিকলে বাঁধা ক্রীতদাসেরা দাঁড় বাইছিল। ওদের শরীরের গন্ধ থেকে আমি বুঝতে পারলাম ওরা সেই হতভাগ্যের দল যারা সারা জীবন এই দাঁড় বাওয়ার বেঞ্চেই জীবন কাটিয়েছে। যেখানে ওরা বসে রয়েছে, সেখানে বসেই দাঁড় টানে, খায়, ঘুমায়, মল ত্যাগ করে আর শেষপর্যন্ত সেখানেই মারা যায়।

জাহাজটি আমাদের পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় নৌকর্মকর্তাদের চেঁচিয়ে নির্দেশ দিতে শোনা যাচ্ছিল। উপরের সারির দাঁড়গুলো একটা রূপালি চিলের ডানার মতো এক সাথে পানি থেকে উঠছিল আর নামছিল। আর নিচেরগুলো ঝপঝপ করে পানিতে পড়ছিল আর পেছনে টানছিল। খালের শেষমাথার বাঁক পার হয়ে জাহাজটি একটু দূরে চকচকে চুনকাম করা দুর্গের দিকে ভেসে চললো।

তারপর একটা আশ্চর্য ঘটনা ঘটলো, যার জন্য আমি মোটেই প্রস্তুত ছিলাম না। ঠিক প্রথমটির মতোই আরেকটি জাহাজ সাগর থেকে মোহনার মধ্য দিয়ে খালে ঢুকলো, তারপর আমাদের পাশ কাটিয়ে একই পথে সামনে চলে গেল। এই জাহাজটিও মাল বোঝাইয়ের কারণে নিচু ছিল।

তারপর আবার হতবাক আর আনন্দে আত্মহারা হয়ে লক্ষ্য করলাম ঠিক একই রকম তৃতীয় আরেকটি জাহাজ খাল বেয়ে এসে আমাদের পাশ কাটিয়ে গেল। এটিও আগের দুই জাহাজকে অনুসরণ করে দুর্গের পথে চলে গেল।

এবার আমি বিষয়টা বুঝতে পারলাম। তিনমাস আগে আমার চর আমাকে খবর দিয়েছিল যে, ধনরত্ন বোঝাই তিনটি জাহাজ ক্রিটের প্রধান সমুদ্র বন্দর আগাফের থেকে রওয়ানা দেবার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে এই খবরটা আমার কাছে পৌঁছতে পৌঁছতে কয়েক মাস লেগে যায়। ইতিমধ্যে কোনো কারণে এই নৌবহরের সমুদ্র যাত্রা বিলম্বিত হয়ে যায়, সম্ভবত প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে এটা হয়েছে। তবে দেরি হওয়ার খবরটা গুপ্তচরেরা আমাকে জানাতে পারেনি।

আমার ধারণা ছিল, জাহাজগুলো তামিয়াত দুর্গে মাল খালাস করে আবার ফিরতি যাত্রায় আগাফের বন্দরের দিকে রওয়ানা দেবার অনেক পরে আমি তামিয়াতে পৌঁছাবো।

কিন্তু এই জাহাজগুলো যখন তামিয়াতে পৌঁছাবে তখন আমিও সেখানে পৌঁছব এরকম আশা আমি করিনি, সম্ভবত কোন দেবতার অনুগ্রহে এটা সম্ভব হয়েছে। ছোটকাল থেকে আমি জেনে এসেছি যে আমি দেবতার প্রিয়পাত্র। বিশেষত প্রধান দেবতা হোরাসের, যার কাছে আমি সবসময় প্রার্থনা করি। তা নাহলে জন্মের পর থেকেই আমার মধ্যে এত বুদ্ধি আর গুণের সমন্বয় কী করে হল? কী কারণে আমি এতবার ভয়ঙ্কর বিপদ থেকে রক্ষা পেয়েছি, যেখানে অন্য কোনো সাধারণ মানুষ হলে অবশ্যই ধ্বংস হয়ে যেত? কী করে আমি এত তরুণ আর সুন্দর থাকতে পারলাম আর এত তীক্ষ্ণধী থাকলাম। অথচ আমার আশেপাশের সবারই বয়সের সাথে সাথে চামড়া কুঁচকে গেল, চুল সাদা আর মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল? নিশ্চয়ই আমার মাঝে এমন কিছু আছে যা, অন্যান্য সাধারণ মানুষ থেকে আমাকে আলাদা করেছে।

এটাও নিশ্চয়ই হোরাস দেবতার অনুগ্রহের আরেকটি দৃষ্টান্ত। আমি মনে মনে তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে প্রতিজ্ঞা করলাম প্রথম সুযোগেই তার কাছে একটি বড় ধরনের উৎসর্গ নিবেদন করবো। তারপর হামাগুড়ি দিয়ে জারাসের কাছে গিয়ে তার জামার হাত ধরে টান দিয়ে বললাম,

খাল পার হয়ে আমাকে ক্রিস্টানদের দুর্গের কাছে যেতে হবে।

আমাদের এই মিসরের দুটো বিষয় আমার কাছে বেশ হেঁয়ালিপূর্ণ মনে হয়, যার কোনো অর্থ আমি খুঁজে পাই না। প্রথমটি হল ঘোড়াকে আমরা মাল বহন করার জন্য আর যুদ্ধের প্রধান অস্ত্র, রথ টানার কাজে ব্যবহার করলেও প্রায় কোনো মিসরিই ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হয় না। আর দ্বিতীয় ধাঁধাটি হল বিশাল একটি নদীর তীরে বাস করলেও কেউ সাঁতার কাটতে জানে না। কাউকে এ-বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে কেবল কাঁধে একটা ঝাঁকি দিয়ে বলবে, এ ধরনের আচরণ দেবতাদের পছন্দ নয়।

তবে আমি আগেই বলেছি অন্যদের চেয়ে আমি আলাদা। অবশ্য একথা বলবো না যে, সবদিক দিয়েই আমি শ্রেষ্ঠ। শুধু এটুকু বলতে পারি, আমি একজন চৌকস ঘোড়সওয়ার আর সেই সাথে একজন শক্তিশালী এবং অক্লান্ত সাঁতারু।

আমি জানতাম জারাসের এদুটো গুণের কোনোটাই নেই, তবে রথের রশি যখন তার হাতে থাকে, তখন তাকে হারাবার মতো কেউ নেই। তাই তাকে আমি নির্দেশ দিলাম কর্ক গাছের ছাল দিয়ে বয়া বানিয়ে নিতে যার সাহায্যে সে পানিতে ভেসে থাকতে পারবে। তারপর আমরা দুজনে কোমর পর্যন্ত পোশাক খুলে খালের পানিতে নেমে পড়লাম। জারাস ওর তলোয়ারটা কর্কের বয়ার সাথে বেঁধে নিয়েছিল, আমি আমারটা পিঠে বেঁধে নিলাম। একটা ভোঁদড়ের মতো দ্রুত সাঁতার কেটে আমি খালের অপর তীরে পৌঁছে গেলাম, এদিকে জারাস তখনও দম নিতে নিতে কেবল অর্ধেক পথ পার হয়েছে।

সে খালের এপারে পৌঁছার পর আমি তাকে তীরে উঠতে সাহায্য করলাম। তারপর সে একটু ধাতস্থ হওয়ার পর আমরা নলখাগড়ার জঙ্গলের মধ্য দিয়ে চুপিসারে ক্রিটান দুর্গের দিকে রওয়ানা দিলাম। তারপর একটা সুবিধামতো জায়গায় পৌঁছে দালানটা পরিষ্কার দেখতে পেলাম। বুঝতে পারলাম ওরা কেন এই জায়গাটা বেছে নিয়েছিল। চুনাপাথর পাহাড়ের একটা লম্বা আর সরু চূড়ার উপর শক্ত ভিত্তির উপর দুৰ্গটা খাড়া করা হয়েছে।

মূল খালটা ভাগ হয়ে দুর্গের চারপাশ ঘিরে একটা দুর্গপরিখা তৈরি করেছে। দুর্গের চতুর্দিকে নদীর প্রবাহটি যে পোতাশ্রয় সৃষ্টি করেছে সেখানে বিভিন্ন ধরনের বেশ কয়েকটি জলযান নোঙর করা রয়েছে। বেশিরভাগই বজরা, যা দিয়ে সম্ভবত ক্রিটানরা নির্মাণ সামগ্রী বয়ে নিয়ে এসেছে। এর মধ্যে একটিও সমুদ্র চলাচলের উপযোগী জাহাজ নয়। কেবল সেই তিনটি চমৎকার তিনতলা দাঁড় বাওয়া জাহাজ রয়েছে, যেগুলো আমাদের পাশ কাটিয়ে এসেছে।

এই জাহাজগুলো তামিয়াত দুর্গের মূল ফটকের ঠিক নিচে একটা পাথরের জেটিতে নোঙর করা রয়েছে। ফটকটি ভোলা আর নবাগতদের স্বাগত জানাতে কয়েকজন উর্দিপরা সৈন্য সেখানে দাঁড়িয়ে রয়েছে। পালকদিয়ে সাজানো শিরস্ত্রাণ আর সোনার সাজসজ্জা দেখে আমি বুঝতে পারলাম সেখানে বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তাও রয়েছে।

আমি আর জারাস সাঁতার কেটে খাল পার হয়ে এখানে পৌঁছার আগেই প্রথম জাহাজের নাবিকেরা জাহাজের খোল থেকে মাল নামানোর কাজ শুরু করে দিয়েছিল। শিকলে বাঁধা একদল অর্ধনগ্ন ক্রীতদাস জাহাজ থেকে মাল নামিয়ে ভেতরে নিয়ে যাচ্ছিল। অর্ধেক বর্মপরা আর কোমরবন্ধে গোঁজা ছোট তরবারি নিয়ে কয়েকজন তত্ত্বাবধায়ক এদের কাজ দেখাশুনা করছিল। এদের সবার হাতে কাঁচা চামড়ার বিনুনি করা চাবুক রয়েছে।

লম্বা একটা তক্তার উপর দিয়ে ক্রীতদাসেরা একইরকম ভারি কাঠের সিন্দুকগুলো নিয়ে তীরে যাচ্ছিল। খুব বড় না হলেও সিন্দুকগুলো বেশ ভারি, তাই এর ওজনের ভারে ক্রীতদাসেরা টলমল করে হাঁটছিল। পুরো প্রক্রিয়াটি হচ্ছিল বেশ ধীরগতিতে আর বিরক্ত তত্ত্বাবধায়করা কর্মরত ক্রীতদাসদেরকে চিৎকার করে তিরস্কার করছিল।

তারপর আমরা লক্ষ্য করলাম একজন ক্রীতদাস কাঠের তক্তা থেকে তীরে নামার সময় পা ফসকে নিচে পড়ে গেল আর মাথার উপর থেকে ভারি কাঠের সিন্দুকটা নিচে পাথরের স্ল্যাবের উপর পড়তেই এর ডালা ভেঙে খুলে গেল আর ভেতরের রূপার বাটগুলো মাটিতে ছড়িয়ে পড়লো। মাটিতে স্তূপ হয়ে পড়া চকচকে উজ্জ্বল রূপার বাটগুলোর উপর রোদ পড়ে ঝিকমিক করে উঠলো। দৃশ্যটি দেখে আমার বুক ধক করে উঠলো। এক হাতের চেয়ে ছোট দৈর্ঘ্যের রূপার চারকোণা প্রায় কুড়িটা বাট কাঠের সিন্দুকটিতে ঠেসে ভরা ছিল। যে জাহাজে এই সিন্দুকগুলো মধ্য সাগর দিয়ে বয়ে আনা হয়েছে, সেরকম একটি বিশাল জাহাজ তৈরি করার খরচ এক সিন্দুক ভরা এই রূপার বাট দিয়ে মেটানো যাবে। আমার সমস্ত আশা পূর্ণ হয়েছে। এটিই সেই বিশাল ধনভাণ্ডার যা আমি প্রত্যাশা করেছিলাম।

তিনজন তত্ত্বাবধায়ক একযোগে মাটিতে পড়ে যাওয়া ক্রীতদাসের ঘর্মাক্ত শরীরের উপর চাবুক মারতে শুরু করলো। লোকটা চিৎকার করে ছটফট করছিল আর দুইহাত দিয়ে মুখ ঢাকতে চেষ্টা করছিল। একটা চাবুকের আঘাতে তার মুখে পড়তেই লোকটির ডান চোখটি কোটর থেকে ছিটকে বের হয়ে স্নায়ুতন্ত্রির সাথে গালের উপর ঝুলতে লাগলো। ছটফট করতে করতে শেষপর্যন্ত ক্রীতদাসটি জ্ঞান হারালো, আর নিজেকে বাঁচাবার শক্তি অবশিষ্ট রইল না। একজন সৈন্য তার এক পা ধরে টানতে টানতে জেটির কিনারায় নিয়ে এক টানে নদীতে ফেলে দিল। ঝপ করে কাদাভরা পানিতে পড়ে দেহটা নিচে তলিয়ে গেল।

এই ঘটনার পর কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে অর্ধনগ্ন অন্যান্য ক্রীতদাসরা মুখ বুজে কাজ করে যেতে লাগলো, যেন কিছুই হয়নি।

জারাসের কাঁধে টোকা দিয়ে আমি তার মনোযোগ আকর্ষণ করলাম। তারপর দুজনে আবার নলখাগড়ার গভীর জঙ্গলের মধ্যে ফিরে গেলাম। এবার ঘুরে দুর্গের অন্যধারে নদীর অপর তীরের কাছে পৌঁছলাম। একঘন্টা ধরে সাবধানে চতুর্দিক লক্ষ্য করার পর একটা জায়গা খুঁজে পেলাম, যেখান থেকে দুর্গ আর আশপাশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাটি বুঝা যায়। দুর্গ সম্পর্কে আমার গুপ্তচরেরা যেসব তথ্য দিয়েছিল এবার তা সরেজমিনে যাচাই করতে পারলাম।

দুর্গ ঘিরে থাকা দেয়ালগুলো দুর্ভেদ্য মনে হলেও এলাকাটা খুব বেশি বড় নয়। যেটুকু জায়গা রয়েছে তাতে কেবল কোষাগার আর একটা ব্যারাকের স্থান সংকুলান হবে। সাগর থেকে খাল দিয়ে এসে ছোট আকারের আক্রমণ হলে তা প্রতিহত করার মতো কিছু সংখ্যক সৈন্য সেখানে থাকতে পারবে।

তবে ক্রিটানরা নিশ্চয়ই ভেবে রেখেছিল, বড় ধরনের শত্রুর আক্রমণ হলে অন্তত কয়েকহাজার সেনা হাতে রাখতে হবে। আর এই সমস্যার সমাধানের জন্য ওরা নদীর উপর দিয়ে পন্টুন সেতু তৈরি করেছিল, যাতে নদীর মাঝখানে দ্বীপে অবস্থিত দুর্গ রক্ষার জন্য নদীর যেকোনো তীর থেকে সেনারা দ্রুত নদী পার হয়ে দুর্গের দিকে ছুটে যেতে পারে।

আমি মাটিতে যেখানে শুয়েছিলাম, সেখান থেকে পূর্বদিকের একেবারে শেষ মাথায় নদীর তীরে ক্রিটানরা তাদের সৈন্যদের মূল শিবির স্থাপন করেছিল। শিবিরের চারপাশ ঘিরে দুই মানুষ সমান উচ্চতার কাঠের খুঁটি দিয়ে প্রতিরক্ষা বেড়া তৈরি করেছে। কাঠের খুঁটিগুলোর মাথা কেটে চোখা করা হয়েছে। আন্দাজ করলাম এখানে দুই থেকে তিনহাজার সৈন্য থাকতে পারে।

শিবির এলাকার চারকোণে উঁচু পাহারা মাচা স্থাপন করা হয়েছে। লক্ষ্য করলাম খুঁটি দিয়ে ঘেরা জায়গাটির মাঝে দালানের ছাদ নদীতীরের শুকিয়ে শক্ত হয়ে যাওয়া কালো মাটি দিয়ে ঘন করে লেপা হয়েছে। দেয়ালের উপর দিয়ে শত্রুসেনারা অগ্নিবাণ ছুঁড়লে এটি তা প্রতিরোধ করবে।

ফটক থেকে নদী তীরের যে জায়গায় পন্টুন সেতুটি রয়েছে সে জায়গা পর্যন্ত ক্রিটানরা শুকনো কালো মাটি দিয়ে ইটের রাস্তা তৈরি করেছে। এটাও শত্রুর তীরের আক্রমণ থেকে ক্রিস্টানদের রক্ষা করবে।

ওরা একটার পর একটা লম্বা নৌকা পাশাপাশি বেঁধে নদীর দুই খালের উপর পন্টুন সেতুটি তৈরি করেছে। সেতুর উপর তক্তা ফেলে একটা পথ করা হয়েছে। যাতে প্রয়োজন মতো অনেক সৈন্য শিবির থেকে ছুটে যেতে পারে।

পুরো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাটা পর্যবেক্ষণ করার পর জারাস মন্তব্য করলো, ওরা সবদিক বিবেচনা করেই পরিকল্পনা করেছে।

আমি একমত পোষণ করে বললাম, এর জন্যই ক্রিটানরা বিখ্যাত সবদিক বিবেচনা করা। তারপরও আমি জায়গাটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিলাম, ক্রিটানদের এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় কোনো দুর্বল দিক বের করা যায় কি না। অনেক খুঁজে একমাত্র পন্টুন সেতুটাই আমার মনে হল একমাত্র পথ যা আমি সামলাতে পারবো।

এরপর মনোযোগ ফেরালাম জেটির দিকে, সেখানে তখনও জাহাজ তিনটি নোঙর করা রয়েছে। ক্রিটানরা যে পদ্ধতিতে প্রথম জাহাজটি থেকে মাল নামাচ্ছিল, তা বিবেচনা করে বুঝতে পারলাম পদ্ধতিটা খুব একটা কার্যকর নয়। আমি হলে জাহাজের খোলের মুখে তেপায়া টেবিল আর কপিকল লাগিয়ে সিন্দুকগুলো ডেক বরাবর বারকোশের উপর রাখতাম। তারপর সেখান থেকে ঠেলাগাড়িতে সিন্দুকগুলো জেটির মধ্য দিয়ে দুর্গের ফটক পর্যন্ত নিয়ে যেতাম।– অথচ ক্রিটান ক্রীতদাসগুলো একটা একটা করে কাঠের সিন্দুক জাহাজের নিচের খোল থেকে বের করে মই বেয়ে উপরে ডেকে নিচ্ছিল। এভাবে কাজ শেষ করতে কয়েকদিন লেগে যেতে পারে।

এবার আমি একটু দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হলাম। কাজটা যে এমন বিশাল আকার ধারণ করবে তা আমি আগে বুঝে উঠতে পারিনি। লাখ লাখ রূপার বাট নাড়াচাড়া করার কথা বলা সহজ, তবে এই বিপুল পরিমাণ সম্পদের আসল ওজন আর পরিমাণ এখন চোখে দেখার পর এগুলো এখান থেকে জব্দ করে সমুদ্র, পর্বত আর মরুভূমির উপর দিয়ে শত শত লিগ দূরত্ব পার করে নিয়ে যাওয়ার কাজটা সম্পূর্ণ অন্য ব্যাপার। তার উপর পেছন পেছন থাকবে একটি প্রতিহিংসাপরায়ণ সেনাবাহিনী।

এবার সত্যিই দুশ্চিন্তায় পড়লাম, মনে হচ্ছে কাজটা অসম্ভব। একবার ভাবলাম কোনোমতে সিন্দুকগুলো কজা করতে পারলে সাগরে ডুবিয়ে দেব। সর্বাধিরাজ মিনোজ কিংবা রাজা বিওন-কেউ আর তার নাগাল পাবে না। তারপর ক্রিস্টানদের প্রতিশোধ থেকে পালিয়ে আমার লোকজনদের নিয়ে আমি থিবসে ফিরে যেতে পারি। হয়তো সর্বাধিরাজ মিনোজকে বুঝিয়ে বলতে পারবো যে, রাজা বিওনই হচ্ছে মূল অপরাধী। তবে এতে আমার সন্দেহ হচ্ছে।

সমস্যাটির তাৎক্ষণিক কোনো সমাধান মনে এলো না। প্রায় ঘন্টাখানেক আমি আর জারাস ঘাসের উপর শুয়ে সমস্যাটা নিয়ে ভাবতে লাগলাম। তারপর হঠাৎ বিদ্যুৎ চমকের মতো আমার মাথায় একটা সমাধানের সূত্র ভেসে এলো। এত সহজ আর সুন্দর একটা সমাধান কীভাবে আমার মাথায় এলো ভেবে আমি অবাক হয়ে গেলাম।

ভাবলাম সবকিছু জারাসকে খুলে বলি। তারপর আবার একটু চিন্তা করে থামলাম।

সূর্যের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, মধ্য গগন পার হয়ে পশ্চিমে প্রায় অর্ধেক পথে ঢলে পড়েছে। এবার তিনটি যুদ্ধ জাহাজের দিকে তাকিয়ে মনে মনে হাসলাম। অনুভব করলাম জারাস নিবিষ্টমনে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। মনে হল সে বুঝতে পেরেছে, আমার মনে নিশ্চয়ই কোনো একটা পরিকল্পনা এসেছে। যাইহোক এখনও সবকিছু তাকে বলার সময় আসেনি।

শেষপর্যন্ত বললাম, যথেষ্ট হয়েছে। এবার চল যাই।

কোন দিকে, তায়তা?

আমাদের নৌকায় ফিরে যেতে হবে। রাতের আগেই অনেক কাজ সারতে হবে।

.

উপহ্রদের যে জায়গায় আমাদের ছোট নৌকা তিনটা ছেড়ে এসেছিলাম, সাঁতার কেটে সেখানে ফিরতে ফিরতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে এলো। বাকি লোকজন আমাদের দুজনকে ফিরতে দেখে খুব খুশি হল। ওরা হয়তো ভেবেছিল আমরা শত্রুর হাতে ধরা পড়ে গিয়েছিলাম আর ওরা আমাদের মেরে ফেলেছে। যাইহোক এখন ওরা আমার নির্দেশের জন্য অপেক্ষা করে রইল।

সবার আগে যে কাজটা নিয়ে আমি ভাবছিলাম, তা হল ভারি বর্ম আর অস্ত্রশস্ত্র সজ্জিত আমার সৈন্যদেরকে কীভাবে এই গভীর খাল পার করিয়ে দুর্গের কাছে নিয়ে যাবো। অথচ এদের বেশিরভাগই সাঁতার জানে না।

এটা করতে গিয়ে প্রথমে সবচেয়ে ছোট আর হালকা নৌকাটা বেছে নিলাম। তারপর আমার লোকদের বললাম অন্যদুটোর তলা ফুটো করে উপহ্রদের সবচেয়ে গভীর অংশে ডুবিয়ে দিতে। একবার অবশ্য আগুন জ্বেলে পুড়িয়ে দিতে চেয়েছিলাম, কিন্তু পরে ভাবলাম ধুয়া চোখে পড়লে ক্রিটানদের সন্দেহ হলে বিষয়টা তদন্ত করার জন্য ওরা খোঁজ নিতে কাউকে পাঠাতে পারে।

তারপর ছোট নৌকাটা অগভীর পানির উপর দিয়ে টেনে দুর্গের কাছাকাছি উপহ্রদের পূর্বতীরে পৌঁছলাম। তারপর ডাঙার উপর দিয়ে নৌকাটা টেনে খালের কাছে নিয়ে যাবার কাজে সমস্ত লোক নিযুক্ত করলাম। অন্য নৌকা দুটো থেকে যে দড়িগুলো খুলে নিয়েছিলাম সেগুলো দিয়ে বেঁধে নৌকাটা টানার ব্যবস্থা করা হল।

এক একটা রশি একশোজন করে টানার কারণ নৌকার তলি একটা পিছলের মতো হল আর নৌকার কাঠামোর ওজনের ভারে প্যাপিরাসের ঘাস চ্যাপ্টা করে তার উপর দিয়ে সহজেই চলতে লাগলো। যাইহোক নদীর মূল প্রণালীতে পৌঁছতে আমাদেরকে প্রায় অর্ধেক লিগ ডাঙা পার হতে হল। এই কাজ শেষ করতে করতে প্রায় মাঝরাত হয়ে গেল আর আকাশের অনেক উপরে কুঁজো চাঁদ দেখা গেল।

কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে সবাই কিছু ঠাণ্ডা খাবার খেলাম আর সৈন্যদেরকে বর্ম আর উর্দি পরার সময় দিলাম। তারপর যতদুর সম্ভব নিঃশব্দে দাঁড় বেয়ে একেক বার পঞ্চাশজন লোক নৌকায় নিয়ে খাল পার হলাম।

একশো পঞ্চাশ জনের বড় দলটি নিয়ে জারাসকে নলখাগড়ার জঙ্গলের মধ্য দিয়ে পাহারা চৌকির নজর এড়িয়ে যতদূর সম্ভব দুর্গের মূল ফটকের কাছাকাছি পাঠালাম। আমার কাছ থেকে সংকেত না পাওয়া পর্যন্ত ওরা সেখানেই লুকিয়ে থাকবে।

দুজন আলাদা হওয়ার আগে জারাসকে আমার পরিকল্পনাটা বুঝিয়ে বললাম। পঞ্চাশজন লোকসহ আমি নৌকা নিয়ে উজানের দিকে যাব। আমার উদ্দেশ্য হল পন্টুনসেতুটা ধ্বংস করা। এটাই শক্রর মূল শিবিরের সাথে যে দ্বীপে কোষাগারটি রয়েছে সেখানে যাওয়ার একমাত্র পথ। আলাদা হওয়ার আগে জারাসকে আলিঙ্গন করে আবার কয়েকবার আমার নির্দেশগুলো তাকে বুঝিয়ে বললাম, যাতে কোনো ধরনের ভুলবুঝাবুঝি না হয়।

তাকে পাঠিয়ে দেওয়ার পর আমি নৌকায় বসে মাল্লাদের দাঁড় বাওয়ার নির্দেশ দিলাম। খরস্রোতা হলেও আমার মাল্লারা প্রাণপণে দাঁড় বেয়ে চললো। বেশ দ্রুত আমরা উজানের দিকে এগিয়ে চললাম। একটুপরই চাঁদের আলোয় চকচকে সাদা চুনাপাথরের দুর্গের চূড়াটা নজরে পড়লো। দুর্গ চোখে পড়ার সাথে সাথেই আমার লোকেরা দ্বিগুণ উৎসাহে দাঁড় বাইতে লাগলো।

এবার শেষ বাকটার কাছে পৌঁছলাম, এরপর সামনেই দুর্গ। তিনতলা জাহাজ তিনটি এর আগে যেরকম দেখে গিয়েছিলাম সেরকম এখনও পাথরের জেটিতে নোঙর করা রয়েছে। উজ্জ্বল চাঁদের আলোয় পরিষ্কার দেখতে পেলাম দুটো জাহাজ এখনও পানিতে একটু দেবে রয়েছে। তার মানে এখনও এগুলোর খোলে রূপার বাটভরা রয়েছে। তৃতীয় জাহাজটা একটু উঁচু মনে হল। এর বেশিরভাগ মাল হয়তো খালাস করা হয়েছে। তারপরও আমার আন্দাজ মতো এটিরও অর্ধেকের বেশি মাল এখনও জাহাজে রয়ে গেছে।

আশেপাশে কোন ক্রিটান পাহারাদার দেখা গেল না। বিশাল জাহাজগুলোতেও কোনো আলো নেই। যাইহোক জেটির এক মাথায় একটা অগ্নিকুণ্ড জ্বেলে রাখা হয়েছে। আর দুর্গের ফটকের দুই পাশে দুটো ব্রাকেটের মধ্যে মশাল জ্বলতে দেখা গেল।

মাথা থেকে ব্রোঞ্জের শিরস্ত্রাণটা খুলে কোলের উপর রাখলাম। তারপর গলায় পেঁচানো উজ্জ্বল হলুদ কাপড়ের টুকরাটা দিয়ে মুখের নিচের অংশ ঢাকলাম। এটা অত্যন্ত দামি অসাধারণ একটি কাপড়, যাকে রেশমি কাপড় বলা হয়। অত্যন্ত দুর্লভ এই কাপড়টি রূপার চেয়েও দামী। পৃথিবীর অন্য এক কোণ থেকে এটা আসে। সেখানে মানুষ নয়, গুটিপোকা এই কাপড় বুনে। এর ঐন্দ্রজালিক ক্ষমতা রয়েছে। এটি অশুভ শক্তিকে দূর করে, এছাড়া প্লেগ আর হলুদ ফুলের মতো রোগকে দূরে রাখে। যাইহোক এখন এটা দিয়ে আমি আমার মুখ ঢাকলাম।

আমার চেহারায় এমন বৈশিষ্ট্য রয়েছে যে, শত্রু মিত্র যে কেউ আমাকে চিনে ফেলতে পারে। আসলে সৌন্দর্যের জন্য মূল্য দিতে হয়। ফারাওয়ের পর সম্ভবত আমার মুখই সারা বিশ্বে সুপরিচিত। অবশ্য বিশ্ব বলতে আমি মিসরকে বুঝাচ্ছি। এবার শিরস্ত্রাণটি আবার মাথায় পরতেই অন্যান্য সৈন্যদের মাঝে আমি মিশে গেলাম।

স্বভাবতই আমরা ধরে নিয়েছিলাম ক্রিস্টান সেনাকর্মকর্তারা এত লোকজনের ভীড়ে এই দুর্গে নিশ্চয়ই রাত কাটাবে না। সন্ধ্যা হওয়ার সাথে সাথেই ওরা বেশিরভাগ সেনাসহ সেতু পার হয়ে খালের অন্য তীরে তাদের আরামদায়ক শিবিরে রাত কাটাতে চলে গেল।

তারপরও জেটি থেকে যতদূর সম্ভব দূরত্ব বজায় রেখে আমরা নিঃশব্দে নোঙর বাঁধা জাহাজগুলো আর দুর্গের দেয়াল পার হলাম। এগুলো পেছনে ছেড়ে আসার পর সামনে দূরে সারিবধা লম্বা নৌকাগুলো দেখা গেল, এগুলো পাশাপাশি বেঁধে পন্টুন সেতুটা তৈরি করা হয়েছে।

আমরা দাঁড় বেয়ে উজানের দিকে এগিয়ে পন্টুন সেতুর প্রায় দুইশো গজের মধ্যে পৌঁছলাম। তারপর স্রোতের দিকে নৌকা ঘুরিয়ে সরু লম্বা পন্টুন সেতুর দিকে তীর তাক করলাম। দাঁড়িদের বললাম দাঁড় ছেড়ে দিয়ে কোনো নড়াচড়া না করে স্রোতের হাতে নৌকা ছেড়ে দিতে। স্রোত আমাদেরকে সেতুর কেন্দ্রে নিয়ে যাবে।

শেষ মুহূর্তে আমি হাল ঘুরিয়ে দিয়ে সেতুর গায়ে নৌকা ঠেকালাম।

আমার লোকেরা প্রস্তুত ছিল। তিনজন তিনজন করে ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে ওরা নৌকা থেকে লাফ দিয়ে নেমে সেতুর দিকে ছুটলো। বাদবাকিরা কুঠার আর তলোয়ার নিয়ে পন্টুন সেতুর দিকের জাহাজের পাশে দাঁড়াল। আর কোন নির্দেশের অপেক্ষা না করে ওরা একটার সাথে আরেকটা বেঁধে রাখা লম্বা নৌকাগুলোর রশির বাঁধন কাটতে শুরু করলো।

কুঠারের আঘাতের শব্দ নিশ্চয়ই খালের অন্য তীরে শত্রু শিবিরে পৌঁছে গিয়েছিল, কেননা প্রায় সাথে সাথেই শুনলাম সৈন্যদের অস্ত্র হাতে তুলে নেওয়ার আহবান জানাতে ক্রিটানরা ঢাক পিটানো শুরু হয়েছে। শত্রু শিবিরে হৈ চৈ, হট্টগোল শুরু হল, সার্জেন্টরা চিৎকার করে নির্দেশ দিতে লাগলো, ঢালের সাথে তলোয়ারের ঝনঝনানি, বর্মের ঠোকাঠুকি, খটখট আর ঢাকের শব্দ এখানেও পৌঁছে গিয়েছে। তারপর মশাল জ্বালতেই চারদিক আলোয় ভরে গেল, পলিশকরা ধাতব ঢাল আর বুকের বর্মের উপর আলো প্রতিফলিত হল।

ঘুমচোখে পদাতিক সেনার দীর্ঘ একটি সারি খুঁটির বেড়ার মাঝখানে যে পথটি ছিল তার মুখ থেকে বের হয়ে পন্টুন সেতুর গোড়ায় এসে দাঁড়াল। প্রথম চারজন ক্রিটান সেনা একযোগে সরু সেতুটির উপর লাফিয়ে পড়তেই তাদের পায়ের স্যান্ডেলের চাপে সেতুটি দুলে উঠলো।

শত্রু সেনার প্রথম সারিটি আমাদের উপর আক্রমণ করতে এগিয়ে এলো। মশালের আলোয় পুরো দৃশ্যটি পরিষ্কার দেখা গেল। তখনও পন্টুন সেতুর কয়েকটা রশি কাটা বাকি ছিল। পঞ্চাশ পা দূরত্ব থাকতেই শুনলাম আক্রমণের নেতৃত্বে থাকা ওদের একজন সেনাকর্মকর্তা চিৎকার করে কিছু একটা নির্দেশ দিল। ভাষাটা পরিষ্কার না বুঝলেও তার অর্থটা সাথে সাথেই পরিষ্কার হল।

ছুটন্ত অবস্থাতেই ক্রিটান সৈন্যরা পেছনে দিকে হেলে এক যোগে বল্লম ছুঁড়লো। বল্লমগুলো আমার লোকজনের মাঝে এসে পড়লো, ওরা তখনও কুঠার দিয়ে লম্বানৌকাগুলো বেঁধে রাখা দড়ির বাঁধন কাটছিল। আমি দেখলাম একটা বল্লম আমার একজন লোকের পিঠ দিয়ে ঢুকে ডগাটা সামনের দিকে প্রায় একগজ বুক থেকে বের হল। সে নৌকাটির একপাশ দিয়ে নদীতে পড়ে গেল আর কালো পানিতে দেহটা তলিয়ে গেল। তবে তার সাথে কাজ করে যাওয়া অন্যান্য সেনারা একবারও কাজ ছেড়ে তার দিকে ফিরে তাকাল না। ওরা একমনে পন্টুন বেঁধে রাখা রশির উপর কুঠার চালিয়ে গেল।

রশিটা ছিঁড়তেই বেশ জোরে কট করে একটা শব্দ শুনলাম, তারপর কাঠের সাথে কাঠ ঘসাঘসির শব্দ শোনা যেতে লাগলো। আরও রশি ছিঁড়ে বিচ্ছিন্ন হতেই লম্বা নৌকাগুলো আলাদা হতে শুরু করলো।

তারপর একসময় সেতুটা খণ্ডবিখণ্ড হয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। তবে বিচ্ছিন্ন অংশ দুটি আমাদের নৌকার দুইপাশে লেগে থাকলো। আমি চিৎকার করে আমার লোকদের নৌকায় উঠে আসতে বললাম। নিজের নিরাপত্তা নিয়ে আমি মোটেই চিন্তিত ছিলাম না, আমার দুর্ভাবনা ছিল কেবল আমার দুঃসাহসী লোকদের নিরাপত্তা নিয়ে।

বর্মপরা ক্রিটানরা কোন ধরনের বাধা ছাড়াই ঝড়ের মতো পন্টুনের উপর দিয়ে ছুটে এল। যুদ্ধংদেহী আর গগন বিদারি চিৎকার করতে করতে ওরা বল্লম ছুঁড়তে লাগলো। আমার লোকেরা নৌকার পাটাতনের আড়ালে বসে পড়লো। সড়কিগুলো নৌকার কাঠের গায়ে এসে বিঁধলো।

সেতুর দুই অংশের মাঝখানে বেঁধে রাখা আমাদের নৌকার দড়িগুলো কাটার জন্য চিৎকার করে আমি নির্দেশ দিলাম। তবে হৈচৈ আর প্রচণ্ড কোলাহলের মাঝে কেউ আমার নির্দেশ শুনতে পেল না। আমার একজন লোকের হাত থেকে একটা কুঠার কেড়ে নিয়ে আমি নৌকার সামনের দিকে ছুটে গেলাম।

একজন ক্রিস্টান সৈন্যও আমার দিকে ছুটে এল। আমরা দুজনে একইসাথে নৌকার সামনের দিকে পৌঁছলাম। ছুটতে ছুটতে সে তার হাতের বল্লমটা আমার দিকে ছুঁড়লো, তারপর কোমরের খাপ থেকে তলোয়ারটা বের করার চেষ্টা করতে লাগলো। আমরা মুখোমুখি হতেই সে তলোয়ারটা খাপ থেকে বের করে হাতে নিল।

দেখলাম শিরস্ত্রাণের নিচে সে দাঁত বের করে হাসছে। হয়তো ভাবছিল আমার আর রক্ষা নেই, এবার নিশ্চয়ই আমাকে হত্যা করবে। তারপর তলোয়ারটা একবার পিছিয়ে আগাটা সোজা আমার বুক বরাবর চালাল। তবে তার চোখের দিকে তাকিয়ে আমি তার উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে ঠিক সময়মতো শরীরে একটা মোচড় দিলাম। ফলে তলোয়ারের ডগাটা আমার বগলের নিচ দিয়ে চলে গেল। সাথে সাথে আমি এক হাতে তার তলোয়ার ধরা হাতটির কনুই চেপে ধরলাম।

তারপর তাকে শক্ত করে সামনে খাড়া করে ধরে রাখলাম। সে ছাড়া পেতে আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগলো। কিন্তু নড়াচড়ার কারণে তার পায়ের নিচে পন্টুনের অংশটা দুলে উঠতেই সে ভারসাম্য হারাল। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই আমি তার তলোয়ার ধরা হাতটা ছেড়ে দিলাম। এর জন্য সে মোটেই প্রস্তুত ছিল না, সাথে সাথে পেছনের দিকে ঢলে পড়তেই দুই হাত সামনে বাড়িয়ে তাল সামলাতে চেষ্টা করলো।

সাথে সাথে আমি তার তলোয়ার ধরা ডান হাতের কব্জির উপর কুড়ালের এক কোপ মারলাম, শরীরের শুধু এই অংশটাই ধাতব বর্ম দিয়ে ঢাকা ছিল না। নৌকার দুলুনির কারণে আমিও ঠিকমতো দাঁড়াতে পারছিলাম না, তাই কোপটা ঠিক জায়গায় পড়েনি। তলোয়ার ধরা হাতটা সম্পূর্ণ কাটা না পড়লেও কব্জির হাড় কেঁটে গিয়ে আঙুলগুলো আলগা হয়ে পড়লো। হাতের আঙুলগুলো খুলে যেতেই তলোয়ারটা তার হাত থেকে নিচে কাঠের তক্তার উপর পড়তেই ঠনঠন ধাতব শব্দ হল। টলমল পায়ে সে তার পেছনের সঙ্গির গায়ের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়লো। জড়াজড়ি অবস্থায় দুজনেই পন্টুন সেতু টপকে ঝপাং করে নিচে পানিতে পড়ে গেল। পরনের ভারী বর্মের ওজনের কারণে সাথে সাথেই দুজনেই পানির নিচে তলিয়ে গেল।

কুড়ালটা তখনও আমার হাতে ধরা ছিল, আর যে দুটো মুরিং রশি দিয়ে আমাদের নৌকাটা পন্টুন সেতুর সাথে বাঁধা ছিল, সেগুলো ঠিক আমার সামনে শক্ত হয়ে টান টান হয়েছিল। রশির গিটের উপর দিয়ে পানির স্রোত বয়ে যাচ্ছিল। আমি কুড়ালটা মাথার উপর তুলে সর্বশক্তি দিয়ে সবচেয়ে মোটা রশিটার উপর লক্ষ স্থির করে এক কোপ দিলাম। ধনুকের ছিলার মতো রশিটা কেটে দুই টুকরা হয়ে গেল। তারপর আবার কুড়ালটা তুলে অন্য রশিটার উপর কোপ মারতেই এটিও কেটে গেল। রশিগুলো আলাদা হতেই ওজন আর টান ছুটে যেতেই নৌকার মাথাটা একবার উপরের দিকে উঠেই আবার নামলো। আর আমরা বাঁধন মুক্ত হয়ে স্রোতের অনুকূলে ভেসে চললাম।

এর ফলে ভাঙা সেতুর উপরে নাটকীয় প্রতিক্রিয়া দেখা গেল। সেতুর প্রত্যেকটি অংশ তখনও নদীর তীরে বাঁধা ছিল। তবে নদীর মাঝে অন্য দুই অংশ সংযুক্ত ছিল না আর স্রোত দুই মাথাকে আরও দূরে সরিয়ে দিল। লক্ষ্য করলাম একসাথে দল বেঁধে থাকা বেশ কয়েকজন ক্রিটান সৈন্য টলমল অবস্থায় ভাঙা সেতুর উপর দাঁড়িয়ে তাল সামলাতে চেষ্টা করছে।

ভারী ওজন নড়াচড়ার কারণে ভাসমান পন্টুন স্থিতিশীলতা হারাতে শুরু করলো। ওজনদার বর্মপরা লোকগুলো ভারসাম্য হারিয়ে মাতালের মতো একজন আরেকজনের গায়ে ঢলে পড়তে লাগলো, তারপর পন্টুন থেকে ছিটকে পানিতে পড়তে শুরু লাগলো।

আতঙ্কিত হয়ে লক্ষ্য করলাম একটা পন্টুন পানিতে ডুবে যেতেই প্রায় বিশজন মানুষ একধার দিয়ে খালের পানিতে ছিটকে পড়ে গেল। কয়েকমিনিটের মধ্যে বেশিরভাগ ক্রিটান সৈন্য কালো পানিতে হাবুডুবু খেতে খেতে ইঁদুরের মতো পানির নিচে তলিয়ে গেল।

বিষয়টা আরও বেদনাদায়ক মনে হল, কেননা এরাতো আসলে আমাদের শত্রুও ছিল না। আমি ইচ্ছা করে কারসাজি করে এদেরকে আমাদের মিত্র বানিয়েছিলাম। আমার দেশ মিসর আর ফারাওয়ের জন্য একাজটা করছি জেনেও মনে কোন সান্ত্বনা পেলাম না। আমার কৃতকর্মের এই ভয়ঙ্কর পরিণতি দেখার পর আমি মর্মাহত হলাম।

যাইহোক অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে আমার মনের অপরাধবোধ আর বিবেকদংশন একপাশে সরিয়ে দিলাম। জানি যা ঘটেছে তা আর ফিরিয়ে আনা যাবে না। ডুবে যাওয়া মানুষগুলোর কথা মন থেকে দূর করবার চেষ্টা করে নিজেদের মানুষের কথা ভাবতে শুরু করলাম। আর কী কী ক্ষতি হয়েছে তার হিসাব শুরু করলাম। ঘুরে দাঁড়িয়ে যেখানে রশিগুলো কেটেছিলাম সেদিকে এগোলাম। অকারণে চিৎকার করে আমার লোকদের উপর রাগ ঝাড়তে শুরু করলাম। ওদেরকে বললাম দাঁড় নিয়ে বেঞ্চে বসতে, কাউকে কাউকে ঠেলা দিলাম, লাথি দিলাম আর ইতস্তত করার কারণে দুএকজনকে চড়চাপড়ও দিলাম। ওরা সবাই হতবাক হল আমার কাজকারবার দেখে।

অবশেষে আমি নৌকার হাল নিজের হাতে তুলে নিলাম। দাঁড়িরা একসাথে দাঁড় বেয়ে চললো। এরপর দুর্গের মূল ফটকের নিচে পাথরের জেটির দিকে নৌকার মুখ ঘুরালাম। সেখানেই রূপার বাটভরা জাহাজগুলো নোঙ্গর করা ছিল।

.

আমাদের ছোট্ট নৌকাটির গলুই পাথরের জেটির সিঁড়ির গায়ে ঠেকতেই আমি এক লাফে নেমে পড়লাম। খোলা তরবারি হাতে জারাস সেখানে দাঁড়িয়ে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল। উত্তেজনায় সে হাঁপাচ্ছিল আর দাঁত বের করে বোকার মত হাসছিল।

রক্তমাখা তরবারি ডগা দুর্গের খোলা ফটকের দিকে নির্দেশ করে সে বললো, রত্নভাণ্ডার ভরা তিনটা জাহাজ আর দুর্গটাও আমরা দখলে নিয়েছি! পন্টুন সেতুর কাছে আপনি যে গোলমাল সৃষ্টি করেছিলেন তাতে বেশ চমৎকারভাবে ওদের মনোযোগ সেদিকে আকৃষ্ট হয়েছিল। দুর্গের রক্ষীরা যখন আপনাদের লড়াই দেখছিল, তখন আমরা আচমকা আক্রমণ করে ওদেরকে কাবু করে ফেলি। আমাদের আসা ওরা মোটেই টের পায়নি। মনে হয়না কেউ পালাতে পেরেছে আর পালাতে চেষ্টা করলেও বেশি দূর যেতে পারবে না। তারপর একটু থেমে দম নিয়ে আবার বললো, সেতুর কাজটি আপনি কীভাবে সামলালেন তায়তা? আমি বেশ খুশি হলাম শুনে যে, লড়াইয়ের উত্তেজনার মধ্যে আর বিজয়ের পরও হাইকসো ভাষায় কথা বলার কথা তার মনে আছে।

আমি তাকে সংক্ষেপে জানালাম, সেতু ভেঙে ফেলা হয়েছে আর অর্ধেকের বেশি শত্রুসেনা নদীতে ডুবে গেছে। তারপর পেছন দাঁড়িয়ে থাকা আকেমির দিকে তাকিয়ে বললাম, এই নৌকাটি আর দাঁড় বাওয়ার জন্য বারোজন লোক সাথে নাও। তারপর একটু দূরে একসারিতে নোঙর করা ছোট ছোট কয়েকটা নৌকা দেখিয়ে বললাম, মশাল আর আগুনের পাত্র নিয়ে ওগুলো সব পুড়িয়ে ফেল। নইলে ক্রিটানরা ওগুলো দখল করে ওদের সৈন্যদের খাল পার করিয়ে আবার আজ রাতে আমাদের উপর আক্রমণ চালাতে পারে।

আকেমি উত্তর দিল, এখুনি আপনার নির্দেশ পালন করা হবে, প্রভু।

আমি বললাম, সবচেয়ে বড় নৌকাটা রেখে দিও। সারির একেবারে শেষ মাথায় ঐ চতুষ্কোণ পাল-বিশিষ্ট ছোট জাহাজটা পুড়িও না। ওটা এখানে নিয়ে এস, আমরা যখন চলে যাবো তখন এটা জেটিতে বেঁধে রেখে যাবো।

আকেমি আর জারাস, উভয়েই জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাল। শুধু জারাস সাহস করে আমার এই নির্দেশ সম্পর্কে জানতে চেয়ে বললো, ক্রিটানদের জন্য এটা এখানে রেখে যাবো? কেন এটা করবো আমরা?

এটা এজন্য রেখে যাবো, যাতে ক্রিস্টানদের সেনা কর্মকর্তারা ক্রিট দ্বীপে ফিরে গিয়ে তাদের রাজাকে হাইকসো মিত্রদের বিশ্বাসঘাতকতার কথা জানাতে পারে। ক্রিটের সর্বাধিরাজ মিনোজ এই পাঁচলাখ রূপার বাট হারিয়ে নিশ্চয়ই মনে খুব কষ্ট পাবেন। তারপর আবার যখন এই ঘটনার সংবাদ পাবেন, তখন তিনি রাজা বিওনের রক্ত পান করতে চাইবেন।

তারপর আমি জেটিতে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে আকেমি আর তার লোকজনের নদীর মোহনার দিকে যাওয়া লক্ষ্য করলাম। সে চারজন লোককে বড় চারকোণা পালওয়ালা জাহাজে তুলে দিল। ওরা একটা তিনকোণা পাল তুলে জাহাজটা জেটির নিচে যে জায়গায় আমি আনতে বলেছিলাম, সেখানে এনে রাখলো।

তারপর দেখলাম আকেমি আমাদের ছোট্ট নৌকাটির সামনের গলুইর কাছে দাঁড়িয়ে আছে, আর তার লোকেরা দাঁড় বেয়ে তাকে সারিবদ্ধ ছোট ছোট নৌকাগুলোর কাছে নিয়ে গেল। যেতে যেতে সে একটা একটা জ্বলন্ত মশাল প্রত্যেক নৌকার উপর ছুঁড়ে ফেলতে লাগলো। সবগুলো ভালোভাবে জ্বলতে শুরু করার পর আমি সন্তুষ্ট হলাম। তারপর ফিরে জারাস যেখানে বোকার মতো দাঁড়িয়ে ছিল সেখানে ফিরে গেলাম।

তাকে বললাম, বাকি লোকজনদের নিয়ে আমার সাথে এসো। তারপর সবচেয়ে কাছে ধনভাণ্ডারভরা ক্রিস্টানদের তিনতলা বড় জাহাজটার দিকে ছুটতে ছুটতে বললাম, এই জাহাজটা দখল করো জারাস। আমি তোমার সাথেই যাব।

সে উত্তর দিল, অবশ্যই, প্রভু। আমার কিছু লোক ইতোমধ্যেই এই জাহাজে চড়েছে।

দ্বিতীয় তিনতলা জাহাজটা দেখিয়ে বললাম, দিলবার এটা তার অধীনে নেবে। আর আকেমি তৃতীয় জাহাজটা নেবে।

আপনার নির্দেশ যথারীতি পালন করা হবে, প্রভু। মনে হচ্ছে শুধু তায়তা হতে জারাস এবার আমাকে প্রভুর পর্যায়ে উন্নীত করেছে। যাইহোক আমার সাথে তার এখনও তেমন সখ্যতা রয়েছে যাতে সে এখনও উল্টোপাল্টা প্রশ্ন করতে পারে। আর সাথে সাথে করলোও তাই।

খোলা সাগরে পৌঁছার পর আমরা কোনদিকে যাব? আমরা কি পূর্বদিকে সুমেরিয়া না পশ্চিমদিকে মরুতানিয়া উপকূলের দিকে যাবে? তারপর সে আগবাড়িয়ে একটু উপদেশ দিতে চেষ্টা করলো। এই দুইদেশেই অবশ্য আমাদের মিত্র আছে। পুবে আছে দুই নদীর রাজ্যের রাজা নিমরদ। আর পশ্চিমে মরিতানিয়াতে আনফার রাজা শান-ডাকির সাথে আমাদের একটা মৈত্রী চুক্তি রয়েছে। আপনি কোনদিকে যেতে চাচ্ছেন তায়তা?

আমি সাথে সাথে তার কথার কোন উত্তর দিলাম না। বরং তাকে আমি আমার নিজের প্রশ্নটাই করলাম, আচ্ছা তুমিই বল জারাস। এই পৃথিবীর কোন রাজাকে তুমি এই পাঁচ লাখ রূপার সম্পদ নিয়ে বিশ্বাস করবে?

জারাস একটু হতবুদ্ধি হল। এ-ধরনের প্রশ্নের কথা সে ভাবেনি। সম্ভবত না, শান-ডাকিকে অবশ্যই বিশ্বাস করা যায় না। তার লোকেরা সবাই জলদস্যু আর তিনি হচ্ছেন চোরদের রাজা।

আমি বললাম, আর নিমরদ সম্পর্কে কি বলবে? আমি অবশ্য তাকে আমার বুড়ো আঙুলের সমান একটা রূপার টুকরা দিয়েও বিশ্বাস করতে রাজি নই।

সে প্রতিবাদ করে বললো, কিন্তু কাউকে না কাউকে তো আমাদের বিশ্বাস করতেই হবে। আর নয়তো রূপাগুলো আমরা কোনো নির্জন সৈকতে বালুর নিচে চাপা দিয়ে রেখে, পরে সুবিধামতো সময়ে এসে আবার উদ্ধার করতে পারি।

আমি তাকে মনে করিয়ে দিলাম, পাঁচ লাখ রূপার বাট? এতবড় একটা গর্ত করতে তো প্রায় একবছর লেগে যাবে আর এগুলো ঢাকতে পর্বত পরিমাণ বালু লাগবে। তার হতবুদ্ধি অবস্থা দেখে আমি বেশ মজা পাচ্ছিলাম। তারপর তার জন্য যে জাহাজটা বরাদ্দ করা হয়েছে, সেটার মাস্তুলের মাথায় ক্রিটের সোনালি আঁড়ের ছবিওয়ালা মিনোজের পতাকার দিকে তাকিয়ে বললাম, বাতাস আমাদের অনুকূলে আছে! আর দেবতা সবসময় সাহসী এবং উচ্চভিলাষী মানুষকে পছন্দ করেন।

সে আমার কথার প্রতিবাদ করে বললো, না তায়তা। বাতাস আমাদের অনুকূলে নেই। এটা সাগর থেকে খালের উপর দিয়ে সরাসরি এদিকে আসছে। বাতাসটা আমাদেরকে ডাঙার দিকে চাপ দিচ্ছে। মধ্য সাগরের খোলা পানিতে যেতে আমাদেরকে সবগুলো দাঁড় বাইতে হবে। আর আপনি যদি শান-ডাকি আর নিমরদকে বিশ্বাস না করেন, তাহলে কাকে বিশ্বাস করেন? কার কাছে যাব আমরা?

আমি তাকে বললাম, আমি শুধু ফারাও ত্যামোসকে বিশ্বাস করি। এই প্রথম সে সত্যি আমার উপর হতাশ হল।

তারপর একটু অবজ্ঞাভরে আমার দিকে তাকিয়ে বললো, তবে যে পথ ধরে আমরা এখানে এসেছি, সেই পথেই আপনি ফারাওয়ের কাছে ফিরে যেতে চান? তাহলে কি উশু থেকে মাথায় করে রূপার পেটিগুলো আমরা বয়ে নিয়ে যাব। তারপর সাঁতার কেটে লোহিত সাগর পার হব? অবশ্য সেখান থেকে থিবস অল্প হাঁটা দূরত্বে রয়েছে। ফারাও কিন্তু আপনাকে দেখে বেশ অবাক হবেন, এ-বিষয়ে আপনি নিশ্চিত হতে পারেন।

আমি একটু প্রশ্রয়ের হাসি হেসে তাকে বললাম, না জারাস। এখান থেকে আমরা দক্ষিণে নীল নদী দিয়ে যাব। বিশাল এই তিনটি ক্রিস্টান জাহাজ আর এগুলোর খোলে যে রূপা আছে তা সবশুদ্ধ নিয়ে সরাসরি আমরা থিবসে ফিরে যাব।

এবার সে হাসি থামিয়ে বললো, আপনি কি পাগল হয়েছেন তায়তা? এখান থেকে আসিউত পর্যন্ত নীলনদের প্রতিটি ইঞ্চি বিওনের অধীনে। হাইকসোদের মধ্য দিয়ে তিনশো লিগ আমরা নদী পথে যেতে পারবো না। এটা সত্যি পাগলামি। উত্তেজনার চোটে সে হাইকসো ভাষা বাদ দিয়ে মিসরী ভাষায় কথাটা বলছিল।

আমি এ কথার প্রতিবাদে তাকে তিরস্কার করে বললাম, তুমি যদি হাইকসো ভাষায় কথা বল, তাহলে সবকিছু সম্ভব হবে। যাইহোক আমাদের দুটো নৌকাতো আগেই ডুবিয়ে দিয়েছি আর তামিয়াত ছাড়ার আগে তৃতীয়টাও পুড়িয়ে যাব। নিশ্চিত করে যাব, যাতে আমাদের প্রকৃত পরিচয়ের কোনো ধরনের চিহ্ন এখানে না থাকে।

এবার সে আবার দাঁত বের করে হেসে বললো, মহান মাতা আসিরিস আর তার প্রিয় পুত্র হোরাসের নামে শপথ করে বলছি তায়তা, আমার মনে হয় আপনি যা বলছেন তা আপনি বিশ্বাস করেন। আবার সে দুইগাল হাসিতে ভরিয়ে দিয়ে বললো, তার মানে আপনার পরিকল্পনা ছিল যে, এসব কথা বলে আমাকে আপনার মতোই পাগল বানিয়ে ছাড়বেন, যাতে আমিও পাগল হয়ে আপনার কথায় রাজি হই, তাই না?

যুদ্ধের সময় পাগলামিই হয়ে যায় মতিস্থিরতা। আমার পিছু পিছু এসো। আমি তোমাকে দেশে নিয়ে যাব। একথা বলে আমি সিঁড়ি বেয়ে সামনের জাহাজের ডেকে উঠলাম। জারাসের বিশজন লোক সেখানে আমার জন্য অপেক্ষা করছিল। ওরা ইতোমধ্যেই নাবিকসহ পুরো জাহাজটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। ক্রিটান জাহাজটির নাবিকেরা ডেকের উপর এক সারিতে মাথা নিচু করে বসে রয়েছে, হাত পেছন দিকে বাঁধা। বেশিরভাগেরই শরীরের ক্ষত থেকে রক্ত ঝরছে। মোট ছয়জন ক্রিটান নাবিকের পেছনে জারাসের লোকেরা খোলা তলোয়ার নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে।

আমি ওদেরকে উৎসাহ দিয়ে বললাম, ভালো কাজ করেছ। তারপর জারাসের দিকে ফিরে বললাম, তোমার লোকদের বল, বন্দীদের সবার পরনের উর্দি আর বর্ম খুলে নিতে। সে নির্দেশ জারি করতে করতেই আমি ডেক থেকে সিঁড়ি দিয়ে সবচেয়ে উপরের দাঁড় বাওয়া ডেকে নামতে শুরু করলাম। বেঞ্চে কেউ নেই আর লম্বা দাঁড়গুলো এমনি পড়ে রয়েছে। তবে এই দাঁড়গুলো বাওয়ার জন্য আমার কাছে পঞ্চাশজন মানুষ আছে। এখানে সময় নষ্ট না করে সিঁড়ি বেয়ে নিচে ক্রীতদাসদের ডেকে নামলাম। সাথে সাথে প্রচণ্ড দুর্গন্ধ নাকে এল। দুর্গন্ধটা এমন শক্তিশালী যে প্রায় দম বন্ধ হয়ে এলো। তারপরও নামতে লাগলাম।

নিচু ছাদে আটকানো ব্রাকেটে তেলের প্রদীপ টিমটিম করে জ্বলছে। এই আলোয় দেখতে পেলাম সারিবদ্ধ প্রায় অর্ধনগ্ন ক্রীতদাসেরা বেঞ্চে বসে ওদের সামনের লম্বা দাঁড়ে মাথা রেখে ঘুমাচ্ছে। যারা জেগেছিল, তারা শূন্য দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাল। ওদের নড়চড়ার সাথে সাথে শিকলের ঝনঝন শব্দ শোনা যাচ্ছিল।

ভাবলাম একটা ছোটখাট বক্তৃতা দিয়ে বলি, যদি ওরা ভালোভাবে দীর্ঘক্ষণ দাঁড় বেয়ে চলে, তবে থিবসে পৌঁছে ওদেরকে মুক্তি দেব। কিন্তু এই চিন্তাটা বাদ দিলাম, কেননা ওরা এখন আর পুরোপুরি মানুষের পর্যায়ে নেই। জঘন্য বন্দী জীবন আর নির্মম ব্যবহারের ফলে ওরা প্রায় পশুর পর্যায়ে নেমে এসেছে। আমার ভালো কথা ওদের কাছে কোনো অর্থই বয়ে আনবে না। চাবুক ছাড়া আর কিছুই ওরা এখন বুঝে না।

নিচু ছাদ থেকে মাথা বাঁচাতে প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে ক্রীতদাসের সারির মধ্য দিয়ে হেঁটে শেষমাথায় একটা দরজার কাছে গেলাম। নিশ্চিত এটাই মাল রাখার খোল। দরজায় একটা ভারি পিতলের তালা ঝুলছিল। জারাস আমার পিছু পিছু আসছিল। আমি একপাশে সরে তাকে জায়গা করে দিতেই সে তলোয়ার দিয়ে খুঁচিয়ে তালাটা খুলে এক লাথি মেরে দরজাটা খুললো।

ব্রাকেট থেকে একটা তেলের প্রদীপ নিয়ে আমি মালখানায় ঢুকলাম। মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত রূপার বাক্সগুলো সাজানো রয়েছে। অবশ্য মাঝখানে একটা বড় ফাঁক দেখা যাচ্ছে। মনে মনে একটা হিসাব কষে বুঝলাম ক্রিটানরা প্রায় একশোটা বাক্স এখান থেকে দুর্গে নিয়ে গেছে।

একবার ভাবলাম, এই বিশাল ধনভাণ্ডারের এই সামান্য অংশটুকু ফেলে রেখে তিনটি জাহাজে আর যা আছে তা নিয়ে চলে যাই। তারপর ভাবনাটা সরিয়ে দিলাম। মনে মনে ভাবলাম, দেবতা মৃদু হেসেছেন তায়তা, এখন এর পুরোপুরি সুযোগ নাও, কখন আবার দেবতা ভ্রুকুটি করে কে জানে। তারপর জারাসের দিকে ফিরে বললাম, এসো আমার সাথে। তোমার কাছে যতলোক আছে, সেখান থেকে যতজন পার নিয়ে এসো।

এবার কোথায় যাব?

আমি সারিবদ্ধ করে রাখা রূপার বাক্সগুলোর মাঝখানের ফাঁকটা দেখিয়ে বললাম, দুর্গে গিয়ে আমরা খুঁজে বের করবো বাদবাকি রূপার পেটিগুলো ক্রিটানরা কোথায় লুকিয়ে রেখেছে। ওখানে যত রূপা আছে তা দিয়ে একটা পুরো সেনাবাহিনীকে সজ্জিত করে যুদ্ধক্ষেত্রে নামানো যায়। যে করেই হোক বিওনের হাতে যেন এটা না পড়ে তা আমাদের নিশ্চিত করতে হবে।

এরপর আমরা দ্রুত ডেকে ফিরে গেলাম। সিঁড়ি বেয়ে জেটিতে নামলাম, জারাসও তার দশজন লোক নিয়ে আমাকে অনুসরণ করলো। সাথে সে বন্দী ক্রিটান নাবিকদেরও নিয়ে এলো। ওদের পরনের সমস্ত পোশাক খুলে প্রায় নগ্ন করেছে। দুর্গের ফটকের ভেতরে আমরা দিলবার আর তার ত্রিশজন লোকের দেখা পেলাম। তীরে যেসব শত্রুদেরকে ওরা বন্দী করেছিল তাদেরকে পাহারা দিয়ে রেখেছে।

আমি দিলবারকে নির্দেশ দিলাম তার অধীনস্থ বন্দীদেরও পোশাক খুলে নিতে। ক্রিটান সৈন্যদের পোশাক আর বর্ম যতবেশি পাওয়া যায় তা আমাদের প্রয়োজন হবে। মিনোয়ান সেনা কর্মকর্তারা রূপা, সোনা আর মূল্যবান পাথরের নেকলেশ, আংটি, বাজুবন্ধ, বালা পরেছিল।

আমি দিলবারকে নির্দেশ দিলাম ওগুলোও খুলে নিতে। সেখান থেকে দুটো অসাধারণ ধরনের অলংকার তুলে নিয়ে আমি আমার চামড়ার থলেতে ভরে নিলাম। বেশিরভাগ মেয়েদের মতো আমার দুই ছোট রাজকুমারিও সুন্দর আর চকচকে ছোটখাট গহনা পছন্দ করে।

তারপর নজর ফেরালাম শিকলে বাঁধা বন্দীর সারির দিকে। ওরা  সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছে। এক নজর দেখেই বুঝলাম এখানে বিভিন্ন জাতের মানুষ রয়েছে, যার মাঝে লিবিয়, হুরিয়, সুমেরিয় আছে। তবে বেশিরভাগই মিসরী। সম্ভবত হাইকসোরা এদের বন্দী করেছিল, তারপর এই দুর্গ নির্মাণ করার কাজে সাহায্য করার জন্য ওরা এদেরকে ক্রিস্টানদের হাতে তুলে দিয়েছিল। এদের মধ্যে একজন আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করলো। লোকটির বুদ্ধিদীপ্ত চেহারা দেখে মনে হচ্ছে সে এখনও হতাশায় ভেঙে পড়েনি।

দিলবারকে বললাম, এই লোকটাকে পাশের কামরায় নিয়ে যাও। সে লোকটাকে জাপটে ধরে টানতে টানতে পাশের ছোট কামরায় নিয়ে গেল। সেখানে গিয়ে আমি তাকে বললাম আমাদের দুজনকে একা রেখে কামরা ছেড়ে চলে যেতে। তারপর কিছুক্ষণ নিরবে ক্রীতদাসটির দিকে তাকিয়ে রইলাম। হাল ছেড়ে দেওয়ার মতো আচরণ করলেও তার চোখে একটু অবাধ্য ভাব  আছে যা সে লুকাতে চেষ্টা করছিল।

ভালো! আমি ভাবলাম, তার মানে সে এখনও মানুষ আছে।

তারপর আমি আমাদের নিজেদের সুমিষ্টভাষায় নরম সুরে তাকে বললাম, তুমি একজন মিসরী। কথাটা শুনেই সে চমকে উঠল, বুঝলাম সে আমার কথা বুঝেছে। তারপর জিজ্ঞেস করলাম, কোন পল্টন? কিন্তু কোনো উত্তর না দিয়ে সে শুধু কাঁধ ঝাঁকালো। এমন ভান করলো যেন আমার কথা বুঝতে পারেনি, তারপর নিচে তার পায়ের দিকে তাকিয়ে রইল।

এবার তাকে হুকুমের সুরে বললাম, তাকাও আমার দিকে! একথা বলে শিরস্ত্রাণ খুলে মুখের নিচের অংশ ঢাকতে যে হলুদ কাপড়টা পেঁচিয়ে রেখেছিলাম, সেটা খুলে ফেললাম। তারপর আবার বললাম, তাকাও আমার দিকে!

লোকটি মাথা তুলে আমার দিকে তাকিয়েই চমকে উঠল।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, আমি কে?

সে অবাক বিস্ময়ে ফিসফিস করে বললো, আপনি তায়তা। ছোটবেলায় আমি আপনাকে লুক্সরের হাথোর মন্দিরে দেখেছিলাম। বাবা বলেছিলেন জীবিত মিসরীয়দের মধ্যে আপনি অন্যতম শ্রেষ্ঠ। তারপর সে আমার পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়লো। আমার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাবার এই ধরন দেখে আমি অভিভূত হলাম। তারপরও কণ্ঠস্বর যথাসম্ভব স্থির রেখে বললাম,

হ্যাঁ সৈনিক, আমি তায়তা। তুমি কে?

আমি ছাব্বিশতম রথবাহিনীর রহিম। পাঁচবছর আগে হাইকসো কুকুরগুলো আমাকে বন্দী করে।

আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কি আমাদের প্রিয় মিসরে ফিরে যেতে চাও? উত্তরে সে মৃদু হাসতেই দেখা গেল তার একটা দাঁত নেই আর মারের চোটে মুখে কালশিটে দাগ পড়েছে। প্রচুর মার খেলেও সে একজন মিসরীয় যোদ্ধা, দৃঢ়ভাবে উত্তর দিল, যতক্ষণ প্রাণ থাকে ততক্ষণ আমি আপনার লোক!

গতকাল ক্রিটানরা জাহাজ থেকে যে সিন্দুকগুলো তোমাদেরকে দিয়ে নামিয়ে এনেছে সেগুলো কোথায় রেখেছে?

সিঁড়ির নিচে ইস্পাতের ভারি দরজাওয়ালা একটা গোপন কুঠরিতে রেখেছে। তবে দরজায় তালা দেওয়া আছে।

চাবি কার কাছে?

কাঁধে সবুজ পট্টি দেওয়া মোটা লোকটার কাছে। সে ক্রীতদাসদের তত্ত্বাবধায়ক।

লোকটাকে আমি অন্যান্য বন্দীদের সাথে হাঁটু গেড়ে বসে থাকতে দেখেছি। তার কাছে কি তোমাদের শিকলের তালার চাবি আছে, রহিম? এগুলো তোমাদের দরকার পড়বে, কারণ এখন থেকে তুমি আবার মুক্ত মানুষ। কথাটা মনে করে সে দাঁত বের করে হাসলো।

সমস্ত চাবি সে তার কোমরে একটা শিকলে ঝুলিয়ে রাখে। তার পোশাকের নিচে চাবির গোছাটা লুকিয়ে রাখে।

রহিমের কাছ থেকে জানতে পারলাম আশিজনেরও বেশি মিসরীয় তিরন্দাজ আর রথীসেনা ওরা বন্দী করেছে। ওদের পায়ের শিকল খুলে দিতেই ওরা খুশিমনে রূপার বাক্সগুলো দুর্গ থেকে জারাসের জাহাজের খোলে বয়ে নিয়ে চললো।

রূপার বাক্সগুলো যখন স্থানান্তর করা হচ্ছিল তখন রহিম আমাকে দুর্গের অস্ত্রভাণ্ডারে নিয়ে গেল। দরজা ভেঙে ভিতরে ঢুকে থরে থরে সাজানো সামরিক উর্দি, বর্ম আর বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র দেখে আমার আনন্দ হল।

সবকিছু জাহাজে নিয়ে গিয়ে মূল ডেকে রাখার নির্দেশ দিলাম যাতে প্রয়োজনে সহজেই হাতের নাগালে পাওয়া যায়।

সবশেষে বন্দী ক্রিটানদের তাদের নিজেদের ক্রীতদাস ব্যারাকে তালা বন্ধ করে রেখে আমরা অপেক্ষামান তিনটি তিনতলা জাহাজে চড়লাম।

.

সমস্ত লোকজনকে আমি তিনটি জাহাজে সমানভাবে ভাগ করে দিয়েছিলাম, যাতে সবগুলো বৈঠা চালানো যায়। আমার নিদের্শে নিচের ডেকে শিকলে বাঁধা ক্রীতদাসদেরকে শক্ত রুটি, শুকনো মাছ আর বিয়ার খেতে দেওয়া হল। এগুলো আমরা দুর্গের ভাঁড়ার ঘরে পেয়েছিলাম। ময়লা কড়াপরা হাত দিয়ে ওদের গোগ্রাসে খাওয়ার দৃশ্যটা খুবই করুণ ছিল। খাবার আর ভালো ব্যবহার ওদেরকে পুনরুজ্জীবিত করেছে। আমি জানি ওরা খুশিমনে আমার কাজে লাগবে।

পুবআকাশে ভোরের আলো দেখা দিতেই আমাদের যাত্রার সময় হল। সবচেয়ে আগের জাহাজের হালে জারাসের পাশে আমি আমার জায়গা করে নিলাম। মাথায় হাইকসো শিরস্ত্রাণ পরলাম আর সিল্কের হলুদ স্কার্ফটা দিয়ে মুখের নিচের অংশ ঢাকলাম।

জারাস নোঙর তুলে ফেলার নির্দেশ দিতেই প্রত্যেক দাঁড় বাওয়া ডেকে ঢাক পেটানো শুরু হল। ঢাক পেটানোর তালে তালে লম্বা দাঁড়গুলো পানিতে একবার ডুবিয়ে আবার তুললো, এভাবেই দাঁড় বাওয়া শুরু হল। একটু পরই আমরা নদীর মূল ধারায় এলাম। বাকি দুটো জাহাজও আমাদের অনুসরণ করলো। আমরা সোজা দক্ষিণদিকে হাইকসো রাজধানীর দিকে ভেসে চললাম, এরপরই সামনে দুশো লিগ নদীপথ শত্রুর অধীনে রয়েছে।

এদিকে আগুনে জ্বলতে থাকা নৌকাগুলো থেকে বয়ে আসা ঘন ধুয়া নদীর উপর দিয়ে দুরে ক্রিটান সেনাশিবির ঢেকে ফেলছিল। তবে উত্তর দিক থেকে বয়ে আসা বাতাসে ধুয়ার পর্দাটা সরে যেতেই আমরা হতবাক হয়ে দেখলাম যেসব ক্রিস্টান সৈন্য পন্টুন সেতুর ধ্বংসের হাত থেকে বেঁচেছিল, ওরা সবাই নদীর তীরে যুদ্ধসাজে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে।

ওদের সেনাপতিরা সৈন্য নিয়ে নদীর তীর ঘেঁষে অবস্থান নিয়েছিল। তীরন্দাজরা উদ্যত তীর-ধনুক নিয়ে নদীর তীরের কাছাকাছি দাঁড়িয়ে রয়েছে। আমরা উত্তর দিকে খোলা সাগরের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করলেই ওরা বিপদের ঝুঁকি নিয়ে আমাদেরকে আক্রমণ করার জন্য প্রস্তুত হয়ে রয়েছে। প্রত্যেক তীরন্দাজের ধনুকের ছিলা টান টান হয়ে আছে আর ধনুকে তীর জোতা রয়েছে। ওরা কেবল তীর ছুঁড়ার জন্য অপেক্ষা করছে।

ওদের উচ্চপদস্থ চারজন সেনানায়কের শিরস্ত্রাণে লম্বা পুচ্ছ আর বুকে কাঁধে অনেক পদক চকচক করছে। তীরন্দাজদের সারির পেছনে ঘোড়ার পিঠে বসে ওরা আক্রমণের নির্দেশ দেবার জন্য অপেক্ষা করছে।

তবে ওরা হতবাক হয়ে গেল, যখন দেখলো আমরা দক্ষিণ দিকের খালের দিকে মোড় ঘুরে ওদের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। প্রথমে ওদের তরফ থেকে কোন প্রতিক্রিয়া দেখা গেল না। তারপর যখন দিলবারের অধীনে দ্বিতীয় তিনতলা জাহাজটিও মোড় ঘুরে আমাদের জাহাজকে অনুসরণ করতে শুরু করলো, তখন ওরা আক্রমণে এলো। এরপর বহরের শেষ জাহাজটি আকেমির অধীনে খালের মোড় ঘুরতেই ক্রিটান সেনানায়কদের নিদেশের রাগি চিৎকার শোনা গেল। তীর ঘেঁষে ঘোড়া ছুটিয়ে ওরা আমাদের পিছু নিল। দৃশ্যটা দেখে আমার হাসি পেল।

ক্রিটান সৈন্যরা শৃঙ্খলা ভেঙে ছত্রভঙ্গ হয়ে তাদের সেনানায়কদের পিছু পিছু ছুটতে শুরু করলো। কিন্তু যখন দেখলো আমরা কিছু না বলে চলে যাচ্ছি, তখন ওরা থেমে দাঁড়িয়ে আমাদের দিকে একনাগাড়ে উঁচু করে তীর ছুঁড়তে শুরু করলো। তবে কোনটাই আমাদের কাছে পৌঁছাতে পারলো না।

অশ্বারোহী সেনানায়করা অবশ্য হাল ছেড়ে দিল না, ওরা ঘোড়া ছুটিয়ে আমাদের নৌবহরকে ধরার চেষ্টা করতে লাগলো। যখন আকেমির জাহাজ বরাবর এলো তখন ওরা তলোয়ার কোষমুক্ত করলো। তারপর ঘোড়ার পাদানির উপর দাঁড়িয়ে অজস্র গালিগালাজ করতে করতে আকেমির লোকজনের উদ্দেশ্যে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়তে শুরু করলো।

আকেমির প্রতি আমার কঠোর নির্দেশ ছিল মিনোয়ানদের লক্ষ্য করে তীর না ছোঁড়ার। তিনতলা জাহাজের উপরের ডেক থেকে ওরা আকেমির তীরন্দাজদের সহজ লক্ষ্য ছিল, কিন্তু ওরা তাদেরকে পুরোপুরি উপেক্ষা করলো। এতে মিনোয়ানরা আরও ক্রদ্ধ হল। ওরা নদীর তীর দিয়ে আরও দ্রুত ঘোড়া ছুটিয়ে প্রথমে আকেমি তারপর দিলবারের জাহাজ পার হয়ে আমার জাহাজের কাছাকাছি এলো।

আমার নির্দেশ মোতাবেক আমার লোকজন লুকোবার কোনো চেষ্টাই করলো না। আমাদের জাহাজের সাথে তাল মিলিয়ে নদীর তীর ঘেঁষে ঘোড়া ছুটতে ছুটাতে সেই চার সেনানায়ক মাত্র একশো পা দূরত্ব থেকে আমাদের পরনে আসল হাইকসো সামরিক উর্দি আর সাজসরঞ্জাম পরিষ্কার দেখতে পেল।

আমাদের অনুসরণ করে ইতোমধ্যে ওরা প্রায় তিনলিগ দূরত্ব চলে এসেছে। ঘোড়াগুলোও পরিশ্রান্ত হয়ে পড়েছে। এরপর তীর থেকে জোর বাতাস বইতেই আমাদের জাহাজগুলো ওদের কাছ থেকে দ্রুত সরে পড়লো। নদীর তীর এবার জলাভূমিতে পরিণত হয়েছে। কালো কাদায় ঘোড়াগুলোর পা দেবে যেতেই ওরা ঘোড়ার রাশ টেনে থামাতে বাধ্য হল। আর আমরা বেশ দ্রুত ওদের কাছ থেকে ভেসে চললাম ভোলা সাগরের দিকে।

পুরো ঘটনাটা যেভাবে ঘটলো, তা দেখে আমি বেশ খুশি হলাম। মিনোয়ান সেনানায়করা দেখেছে, যা আমি ওদের দেখাতে চেয়েছিলাম–অর্থাৎ হাইকসো জলদস্যুরা তিন জাহাজ ভর্তি সর্বাধিরাজ মিনোজের পাঁচ লাখ রূপার বাঁট নিয়ে দক্ষিণ দিকের নদী হয়ে রাজা বিওনের রাজধানী মেমফিসের দিকে ভেসে চলেছে।

২. পরবর্তী ভূমিকা

 

এখন আমাদের পরবর্তী ভূমিকা পালন করার সময় হয়েছে। তামিয়াত দুর্গ থেকে ক্রিটানদের যেসব সামরিক উর্দি আর অস্ত্রশস্ত্র উদ্ধার করেছি, সেগুলো ডেকে এনে রাখার নির্দেশ দিলাম। তারপর হাসি তামাশার মধ্য দিয়ে আমাদের লোকেরা হাইকসো উর্দি খুলে মিনোয়ান সামরিক উর্দি পরলো। ওদের চকচকে শিরস্ত্রাণ আর কারুকাজ করা তলোয়ার থেকে শুরু করে হাঁটু পর্যন্ত লম্বা পাতলা নরম চামড়ার বুট জুতা পরলো।

আকেমি আর দিলবার উভয়ের উপর আমার কড়া নির্দেশ ছিল, ওদের লোকেরা যেন হাইকসো উর্দি আর সাজসরঞ্জামের একটা টুকরাও নদীতে ছুঁড়ে

ফেলে। স্রোতে ভাসতে ভাসতে এগুলোর কোনো একটি টুকরাও যদি তামিয়াত দুর্গের মিনোয়ান সেনাদের হাতে পড়ে তাহলে আমার সব কৌশল ফাঁস হয়ে যাবে।

ক্রিটানরা সহজেই বুঝতে পারবে কীভাবে তাদের বোকা বানানো হয়েছে। কাজেই খুলে ফেলা সমস্ত হাইকসো সামরিক উর্দি আর অন্যান্য সাজসরঞ্জাম বোঁচকা বেঁধে নিচের ডেকে লুকিয়ে রাখা হল।

পেছন থেকে অনুকুল বাতাস পেয়ে আমাদের পালগুলো ফুলে উঠেছে, সারিবদ্ধ দাঁড় চালিয়ে বেশ দ্রুত আমরা দক্ষিণদিকে ভেসে চললাম। মিনোয়ানদের এই জাহাজ তিনটি ছিল সমুদ্রের বুকে সবচেয়ে দ্রুতগামী জাহাজ। এতো মানুষ আর রূপার বিশাল ওজন সত্ত্বেও জাহাজগুলো বেশ দ্রুত চলছিল।

বদ্বীপ আর অসংখ্য শাখানদী পেছনে ফেলে শেষ পর্যন্ত আমাদের জাহাজ তিনটি মূল নদীতে চলে এলো। তিনটি জাহাজ একটি অন্যটির সাথে পাল্লা দিয়ে ভেসে চললো। এক জাহাজের নাবিকেরা অন্য জাহাজের নাবিকদের উদ্দেশ্যে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে মারতে লাগলো আর রসিকতা করতে লাগলো।

নোঙর করা মাছধরা নৌকা আর মালামাল বোঝাই ছোট ছোট নৌকার পাশ কাটিয়ে আমরা সামনে এগিয়ে চললাম। নৌকাগুলো পাশ কাটিয়ে যাবার সময় আমি উপরের ডেক থেকে নিচে নৌকাগুলো দেখতে পাচ্ছিলাম। মাঝিমাল্লাদের মধ্যে হতবাক চেহারার কয়েকটা মিসরীয় মুখ চোখে পড়লেও বেশিরভাগই ছিল হাইকসো।

এই দুই জাতির পার্থক্য আমি সহজেই ধরতে পারি। আমার মিসরীয় ভাইদের সুন্দর বুদ্ধিদীপ্ত মুখ, উঁচু কপাল, বড় বড় চোখ আর নিখুঁত চেহারা। অর্থাৎ একবার তাকালেই বুঝা যায় এরা উচ্চ জাতি।

আর হাইকসোদের মধ্যে এই ধরনের চেহারা খুব কম দেখা যায়। অবশ্য আমি শুধু শুধু পক্ষপাতিত্ব করে ওদের বিরুদ্ধাচরণ করছি না। তবে ওদেরকে ঘৃণা করার আমার অনেক কারণ আছে। ওরা সবাই চোর-ডাকাত। নিষ্ঠুরতা আর অত্যাচার করাতেই ওদের আনন্দ। ওদের নিকৃষ্টমানের আর অশ্লীল ভাষা শুনলে যেকোনো সভ্য মানুষের কানে শ্রুতিকটু মনে হবে। ওরা সবচেয়ে বিশ্রী দেবতা শেঠের পূজা করে। আমাদের দেশ দখল করে ওরা আমাদের দেশের মানুষদের ক্রীতদাস বানিয়েছে।

তবে আমার মধ্যে কোনো গোঁড়ামি নেই। যাদের তা আছে তেমন লোকদের আমি ঘৃণা করি। আসলে আমি অনেক চেষ্টা করেও হাইকসো জাতির মধ্যে প্রশংসনীয় কোনো চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য খুঁজে পাই নি। দেবতারা জানেন এটা আমার দোষ নয় যে, আমি তেমন কিছু ওদের মাঝে খুঁজে পাইনি।

এই জাতির মানুষগুলোর দিকে তাকাতে তাকাতে আমার মনে একটা ভাবনা জাগলো যে, ভবিষ্যতে কোনো এক সময় ওদের প্রতি আমার বিরাগ ভাবটি আরও সঠিক আর দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রকাশ করাটাই সঠিক হবে। কিছু একটা করে ওদেরকে এমন শিক্ষা দিতে হবে যাতে রাজা বিওনও বুঝতে পারবে কাজটা সঠিক হয়েছে।

সেই দিনটি হবে সকল মিসরীয়দের জন্য একটি খুশির দিন। কথাটা ভাবতেই আমার ঠোঁটে মৃদু হাসি খেলে গেল। চিন্তাটায় আরেকটু শান দিয়ে ভাবলাম আর দেরি করে লাভ কি? পুরো পরিকল্পনার ছকটা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আমার মনে ভেসে উঠলো।

নিচের ডেকে ক্যাপ্টেনের কেবিনে একটা লেখার টেবিল আর কিছু পাকানো প্যাপিরাস কাগজ দেখেছিলাম। ক্রিটানরা শিক্ষিত জাতি। ওরা কীলককার হস্তলিপি পদ্ধতি ব্যবহার করে যা সুমেরিয়দের সাথে মিলে না। এই সঙ্কেতগুলো আমি পড়তে আর চিনতে পারলেও সেসময়ে মিনোয়ানদের ভাষার সাথে পরিচিত ছিলাম না।

জানা কথা হাইকসোরা পুরোপুরি অশিক্ষিত। তবে আমার গুপ্তচরেরা আমাকে জানিয়েছিল ওরা কয়েকজন মিসরীয় লেখককে বন্দী করে ক্রীতদাস বানিয়ে, তাদেরকে দিয়ে আমাদের লিপি পড়ে, লিখে আর অনুবাদ করিয়েছে।

আমি আরও জেনেছি ওরা এই লিপিকারদের কাছ থেকেই শিখেছে, কীভাবে পাখির সাহায্যে অনেক দূরে বার্তা পাঠানো যায়। বানরের মতো হাইকলোরাও নকল করতে পটু। কোনো উদ্ভাবনী চিন্তা দিয়ে ওরা কোনো সমস্যার সমাধান করতে পারে না। অন্য লোকের মহৎ ভাবনাকে ওরা নিজেদের বলে চালিয়ে দেয়।

জারাসের সাথে কথা শেষ করে আমি দ্রুত মূল ডেকের নিচে কেবিনে গেলাম। লেখার সরঞ্জামগুলো আমি যেখানে দেখে গিয়েছিলাম সেখানেই রয়েছে। সুন্দর কারুকাজ করা একটা কাসকেটের মধ্যে এগুলো রাখা ছিল। কাসকেটের উপরে আইবিস পাখির মাথাওয়ালা লেখার দেবতা থথের একটা ছোট চিত্র আঁকা রয়েছে।

আমি ডেকে আসন গেড়ে বসে লেখার বাক্সটা খুললাম। খুশি হয়ে দেখলাম, ভেতরে বিভিন্ন আকারের প্যাপিরাস কাগজ ছাড়াও বেশ কয়েকটি তুলি আর কালির ব্লক রয়েছে। এছাড়া ঘোড়ার কেশর বুনে তৈরি করা চারটে ছোট ছোট গুটলিও বাক্সটায় রয়েছে। খাওয়ার জন্য আমরা যে-ধরনের সাধারণ কবুতর পালন করি তার পায়ে এই গুটলিগুলো বাঁধা যায়। এই কবুতরগুলোর আশ্চর্য ধরনের একটি অভ্যাস আছে, যে-জায়গায় ওরা ডিম ফুটে বের হয় সেখানে ওরা ফিরে যেতে পারে। আর পায়ে ছোট্ট বার্তাবহনকারী গুটলি বেঁধে দিলে তাও বহন করে নিয়ে যায়।

আমি দ্রুত হাতে কবুতরের পায়ের বার্তাবহনকারী গুটলিতে বাধার মত ছোট একটা প্যাপিরাসের টুকরা নিলাম। তারপর একটা সরু তুলি আর লেখার কালি গুড়া করে নিলাম।

লেখার বিষয়টিবস্তু আমার মনেই ছিল, তাই নতুন করে ভাবনা চিন্তা করার দরকার পড়েনি। খুব ছোট ছোট অক্ষরে পরিষ্কার লেখার হাত ছিল আমার।

শুরু করলাম যথারীতি সম্ভাষণ দিয়ে, উচ্চ ও নিচের মিসরের ফারাও হে, মহাপরাক্রমশালী বিওন। যদিও সে এই ধরনের কিছু নয়, তবুও এই ধরনের পদমর্যাদার প্রতীক সে পছন্দ করে। আমি, ক্রিটের সর্বাধিরাজ মিনোজ আপনাকে সম্ভাষণ জানাচ্ছি। আমাদের বন্ধুত্বের নিদর্শন স্বরূপ আমি মহামান্যের জন্য রূপাভর্তি তিনটি বিশাল জাহাজ পাঠাচ্ছি। এপিফি মাসের দ্বিতীয় দিনে নীল নদের বদ্বীপে তামিয়াতে আমার ঘাঁটি থেকে জাহাজগুলো রওয়ানা দেবে। আশা করি একই মাসের পঞ্চম দিনে মেমফিসে আপনার রাজধানীতে এগুলো পৌঁছে যাবে। এই ঘটনার খবর আপনার নজরে আসার আগে যাতে কোনো দুষ্ট লোকের হাতে না পড়ে সেজন্য শেষ মুহূর্তে খবরটি বিলম্বিত করা হয়েছে। আমার বিশ্বাস যে সম্মান প্রদর্শন করে এই উপহারসামগ্রীগুলো আপনার বরাবর পাঠানো হয়েছে, তা আপনি যথাযথ আগ্রহের মনোভাব নিয়ে গ্রহণ করবেন।

কালি শুকাবার সাথে সাথে কাগজটা পাকিয়ে কবুতরের পায়ে বাঁধার গুটলিতে রেখে এরাবিক আঠা দিয়ে সিল করলাম। তারপর কেবিন থেকে বের হয়ে নিচের ডেকে নেমে মালামাল রাখার খোলের দরজায় কাছে গেলাম।

জারাস লাথি মেরে দরজার তালা ভেঙে ফেলার পর আর মেরামত করা হয়নি। হাতে ঠেলতেই দরজাটা খুলে গেল। পেছন ফিরে দরজাটা বন্ধ করলাম। যে সিন্দুকটা খুলে ভেতরের মালামাল দেখছিলাম, সেটার ডালা তখনও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। আমার ড্যাগার দিয়ে চাড় দিয়ে ডালাটা খুললাম। তারপর সিন্দুকটার পাশে হাঁটু গেড়ে বসে ভেতর থেকে একটা রূপার বাঁট বের করলাম। ভারি বঁটটা আমার কোমরবন্ধের সাথে বাঁধা ছোট থলের ভেতরে ঢুকিয়ে রাখলাম। তারপর উপরে ডেকে গিয়ে জারাসের পাশে আমার জায়গায় পৌঁছলাম। চুপিচুপি তার সাথে কথা বললাম যাতে কেউ না শুনতে পারে।

এক ঘন্টার মধ্যেই আমরা কুনটুস নদীবন্দরে পৌঁছে যাবো। সেখানে বিওনের শুল্ক ফাঁড়ির লোকেরা চলাচলকারী সমস্ত জাহাজ থেকে শুল্ক আদায় করে

জারাস আমার কথা থামিয়ে দিয়ে বললো, এসব নিয়ে আপনি চিন্তা করবেন না প্রভু তায়তা। আমাদের ওরা দেরি করাতে পারবে না। আমরা মশা তাড়াবার মতো ওদেরকে তাড়িয়ে দেব

না, জারাস। তুমি তোমার বৈঠা আর পাল গুটিয়ে রাখবে। আর শুল্কদপ্তরের নৌকা কাছে আসতে স্বাগত জানাবে। ওরা কাছে এলে যথাযথ সম্মান দেখাবে। শুল্ক কর্তাকে বায়না দিয়ে রাখতে হবে। কেননা তার সহযোগিতা প্রয়োজন পড়বে। তারপর জারাসকে কোনো প্রশ্ন করার সুযোগ না দিয়ে আমি জাহাজের অন্যপাশে সরে গেলাম। আসলে আমি নিজেও নিশ্চিত নই কুনটুসে পৌঁছার পর কী হতে পারে।

নদীতে ভাসমান সমস্ত নৌকা পাশ কাটিয়ে আমরা দ্রুত এগিয়ে চললাম। এই নীল নদীর বুকে আমরাই সবচেয়ে দ্রুতগামি জলযান ছিলাম। আশেপাশের সমস্ত নৌকা আমাদের জন্য পথ ছেড়ে দিয়ে সরে পড়লো। ওরা কেউ জানেনা আমরা কে, তারপরও তখনকার অস্থিতিশীল অবস্থায় যে কোনো শান্তিপ্রিয় মানুষ কোনো ধরনের ঝুঁকি নিতে চাইবে না।

নদীর আরেকটা চওড়া বাঁক পেরোতেই সামনে পূর্বদিকের তীরে কুনটুস নদীবন্দর দেখা গেল। শহরের উপরে একটা পাহাড়ে উঁচু পাথরের পাহারা একটা চৌকি টাওয়ার দেখেই আমি চিনতে পারলাম। টাওয়ারের মাথায় বড় এটা কালো পতাকা উড়ছে। এটা হচ্ছে শুল্কদপ্তরের প্রতীক। আমি জানি টাওয়ারের উপরে নজরদারি লোক থাকবে লক্ষ্য রাখতে যেন কোনো জলযান শুল্ক না দিয়ে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে না পারে।

আমরা বন্দরের কাছাকাছি হতেই বন্দরের পাথরের জেটি থেকে কালো পতাকা উড়িয়ে একটা শুল্ক নৌকা আমাদের পথ আটকাতে এগিয়ে এলো। আমি জারাসকে নির্দেশ দিলাম পাল আর বৈঠা গুটিয়ে নিচে নামিয়ে রাখতে যাতে ওরা আমাদের কাছে পৌঁছতে পারে। শুল্ক নৌকার ডেকে ভারী অস্ত্রে সজ্জিত কয়েকজন হাইকসো সেনা দাঁড়িয়েছিল। নৌকাটা জাহাজের কাছে ভিড়তেই জারাস একপাশে ঝুঁকে চিৎকার করে ওদের একজনের সাথে আলাপ শুরু করে জানতে পারলো, লোকটার নাম গ্রাল–সে প্রাদেশিক শুল্ক কর্মকর্তা।

আলাপচারিতা হাইকসো ভাষায় হতে দেখে আমি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। গ্রাল নামে এই লোকটি মিনোয়ান ভাষায় কথা বললে, আমরা কীভাবে ওদেরকে বুঝাতাম যে একটি মিনোয়ান জাহাজে কেন কেউ তাদের ভাষায় কথা বলতে পারছে না। ঠিক তখনই আমি সিদ্ধান্ত নিলাম প্রথম সুযোগেই এই ভাষা শিখে নেবো। বিদেশি ভাষা শেখার ব্যাপারে আমার বিশেষ দক্ষতা রয়েছে। আমি স্থির নিশ্চিত যে, কয়েকমাসের মধ্যেই ক্রিটের অধিবাসীদের মতোই ওদের ভাষায় আমি কথা বলতে পারবো।

শুল্ক নৌকার ডেক থেকে রাজা বিওনের নামে গ্রাল দাবি করলো, তাকে যেন আমাদের জাহাজে উঠার অনুমতি দেওয়া হয়। আমার শেখা মতো জারাস কোনো আপত্তি না করে নাবিকদের নির্দেশ দিল একটা দড়ির মই নামিয়ে দিতে যাতে গ্রাল জাহাজে উঠতে পারে। ছোটখাট লোকটি একটা বানরের মতো ক্ষিপ্রগতিতে দড়ির মই বেয়ে উঠতে লাগলো।

জারাসকে সে জিজ্ঞেস করলো, আপনিই কি এই জাহাজের ক্যাপ্টেন? আমার দায়িত্ব আপনাদের মালামালের তালিকা পরীক্ষা করা।

জারাস সম্মতি জানিয়ে বললো, অবশ্যই স্যার। তবে এর আগে দয়া করে আমার কেবিনে এসে আমাদের চমৎকার মিনোয়ান ওয়াইনের স্বাদ নিন, তারপর আপনার কাজ শুরু করুন। তারপর সে বন্ধুসুলভভাবে ছোটখাট লোকটির বাহু ধরে তাকে সিঁড়ি বেয়ে নিচে মাস্টারের কেবিনে নিয়ে চললো।

এ পর্যন্ত আমি নিজেকে ওদের কাছ থেকে আড়ালে রেখেছিলাম। নিচে কেবিনের দরজা বন্ধ হওয়ার জোরে শব্দ পাওয়ার পর আমি সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামলাম।

জারাস আর আমি এই সাক্ষাতকারের ব্যাপারে আগেই পরিকল্পনা করেছিলাম। কেবিনের দেয়ালে একটা ছিদ্র করেছিলাম, যাতে ভেতরে কী কথাবার্তা হয় তা দেখা আর শোনা যায়। এখন দেখলাম আমার উঁকি দেবার ছিদ্রটার দিকে মুখ করে জারাস লোকটিকে বসিয়েছে। লোকটির সারা মুখে আঁচিল। জারাসের দেওয়া ওয়াইন মুখ ভরে পান শুরু করতেই তার গলা এমনভাবে ফুলে গেল যেন একটি বিশাল ব্যাঙ তার প্রিয় খাবার, জল-ইঁদুর গিলে খাচ্ছে। এই দৃশ্যটি দেখে আমি হতবাক হয়ে গেলাম।

জারাস অত্যন্ত ভদ্রতা দেখিয়ে তাকে বললো, আপনি নিশ্চয়ই জানেন রাজা বিওন আমাদের জাহাজের চলাচলের জন্য শুল্ক মওকুফ করেছেন।

গ্রাল তার মদের গ্লাস নামিয়ে বললো, সেটা আমি বিবেচনা করবো, ক্যাপ্টেন। তবে সেক্ষেত্রেও আমি আমার খরচ দাবি করবো। তারপর একটা ধূর্ত হাসি দিয়ে বললো, অবশ্য পরিমাণটা নগণ্য, এব্যাপারে আমি আপনাকে নিশ্চয়তা দিচ্ছি।

জারাস ঘাড় নেড়ে সায় দিয়ে বললো, অবশ্যই। আমাদের সকলকে বাঁচতে হবে। তবে আপনার সাথে একান্তে আলাপ করার সুযোগ পেয়ে আমি সত্যি কৃতজ্ঞ। আমাদের আসার খবর দিয়ে মেমফিসে রাজা বিওনের কাছে আমার একটা বার্তা পাঠানো দরকার। তাকে জানাতে হবে সর্বাধিরাজ মিনোজের কাছ থেকে আমি উপহার হিসেবে বিপুল পরিমাণে রূপার বাট নিয়ে যাচ্ছি। একথা বলে জারাস টেবিলের নিচ থেকে একটা রূপার বাঁট বের করলো। এটা আমি তাকে আগেই দিয়ে রেখেছিলাম। টেবিলের উপর বাঁটটা রেখে সে বললো, এটা তার একটা নমুনা।

গ্রাল ধীরে ধীরে হাতের মগটা টেবিলে রেখে রূপার বাটটির দিকে একদৃষ্টিতে তাকালো। তার চোখদুটো মনে হচ্ছে কোটর বের হয়ে আসছে। মুখ হা করতেই তার চোয়াল ঝুলে পড়লো। খোঁচা খোঁচা দাড়ি বেয়ে মুখ থেকে মদ চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়তে লাগলো। মনে হল সে কথা বলার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। সম্ভবত জীবনে কখনও সে এ-ধরনের সম্পদ চোখে দেখেনি।

জারাস বলে চললো, এখানে কুনটুসে কি আপনার কাছে বার্তাবহনকারী কবুতর আছে? যে পাখি মেমফিসে উড়ে গিয়ে রাজা বিওনের কাছে আমার আগমন সংবাদ নিয়ে যেতে পারবে?

গ্রাল ঘোৎ ঘোৎ করে মাথা নাড়লো। তার উত্তর দেবার মতো অবস্থা ছিল না আর চকচকে রূপারপিণ্ডটি থেকে সে চোখও সরাতে পারছিল না।

জারাস রূপারপিণ্ডটি আরেকটু তার দিকে ঠেলে দিয়ে বললো, এই পিণ্ডরূপাটিকে আপনার অমূল্য সেবার পারিশ্রমিক হিসেবে ধরে নিতে পারেন। আমাদের মহান দুই জাতির মধ্যে যে মতৈক্য রয়েছে এটা তার একটি নিদর্শন। তারপর সে আমার পত্রসহ পায়রার পায়ে বাধার গুটলিটা পিণ্ডরূপার পাশে রাখলো। এই বার্তাটি দয়া করে রাজা বিওনের কাছে পাঠাবার ব্যবস্থা করুন।

একটা বড় মাকড়সার মতো হাত বাড়িয়ে সে টেবিলের উপর থেকে পিণ্ডটা তুলে নিয়ে তার দাগেভরা চামড়ার জ্যাকেটের সামনে দিয়ে ভেতরে গলিয়ে দিল, তারপর কোমরের দড়িটা কষে বাঁধলো। প্রচণ্ড আবেগে তার হাত কাঁপছিল। পিণ্ডরূপারটার কারণে জ্যাকেটের পেটের নিচের দিকটা ফুলে রইল, তবে সে এক হাত দিয়ে সেটা বুকের কাছে আঁকড়ে ধরে রইল।

টলমলে পায়ে কোনো মতে উঠে দাঁড়াল আর অন্য হাতে আমার পত্রটা নিল। জারাসের দিকে ঝুঁকে অভিবাদন করে বললো, এবার আমি বুঝতে পেরেছি মহামান্য, আপনি উচ্চপর্যায়ের রাষ্ট্রিয় কর্মকাণ্ডে জড়িত আছেন। আমার এই অনধিকার চর্চার জন্য ক্ষমা করুন। তবে এই পত্রটি আমার একটি বার্তাবহনকারী পাখির মাধ্যমে রাজা বিওনের কাছে পাঠাবার সুযোগ পেয়ে আমি নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করছি। আজ সূর্যাস্তের আগেই এটি রাজার হাতে পৌঁছে যাবে। আর আপনাদের এই চমৎকার জাহাজেও আপনারা পরশুর আগে মেমফিস পৌঁছতে পারবেন না।

আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ। আসুন আপনাকে নিরাপদে আপনার নৌকায় ফিরিয়ে নিয়ে যাই। এই কথা বলে জারাস তার দিকে হাত বাড়াবার আগেই সে সিঁড়ি বেয়ে উপরের ডেকের দিকে চলতে শুরু করলো।

জারাস আর আমি লক্ষ করলাম নৌকাটা কুনটুসের দিকে চলেছে। আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে দেখলাম গ্রাল তার নৌকা থেকে নেমে গ্রামের দিকে হাঁটতে শুরু করেছে। এরপর আমি জারাসকে ইশারা করতেই সে পাল তুলে বৈঠা হাতে নিয়ে মাল্লাদের দক্ষিণের পথে যাবার জন্য তৈরি হতে বললো।

আমি পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখলাম কুনটুসের দালান কোঠার মধ্য দিয়ে একজন ঘোড়সওয়ার উপরে পর্যবেক্ষণ টাওয়ারের দিকে ছুটে চলেছে। আমি চোখে হাত দিয়ে রোদ আড়াল করে দেখলাম সে টাওয়ারের নিচে অপেক্ষামান সহিসের হাতে ঘোড়ার রাশটা দিয়ে উঁচু ভবনের ভেতরে অদৃশ্য হল।

একটু পরই একই লোককে দেখা গেল ভবনের চূড়ায় প্লাটফর্মে। সে দুই হাত উপরের দিকে তুলতেই তার হাত থেকে একটা বেগুনি রঙের পায়রা ডানা পতপত করতে করতে আকাশে উড়ে গেল।

তিনবার টাওয়ারটি চক্কর দিয়ে পাখিটি দক্ষিণমুখি উড়তে শুরু করলো। উপরের দিকে দ্রুত উড়তে উড়তে নদীর মাঝখানে এল। আমাদের একটা জাহাজের ঠিক উপর দিয়ে যাওয়ার সময় আমার মনে হল এর একটি পায়ে সেই পত্রসহ গুটলির আকৃতির কিছু একটা বাঁধা রয়েছে।

.

সারাবিকেল আমরা দক্ষিণমুখি চলতে লাগলাম। তারপর পশ্চিমতীরের পাহাড়গুলোর পেছনে সূর্য ডুবে যেতেই একটা নিরাপদ জায়গায় রাতের জন্য জাহাজ নোঙর করতে জারাসকে নির্দেশ দিলাম। সে একটা বাঁক পেরিয়ে নদীর একটা অগভীর জায়গা খুঁজে নিল।

আমি জানতাম গ্রাল ঠিকই হিসেব করে বলেছিল। মেমফিস থেকে আমরা এখনও প্রায় দেড়দিনের দূরত্বে রয়েছি। নোঙরের দিকে লক্ষ্য রাখতে জারাস প্রতি জাহাজে একজন করে লোক বসাল আর রাতের আঁধারে যাতে কোনো দস্যুদল হামলা করতে না পারে সেজন্য তীরেও পাহারা বসাল।

রাতে অগ্নিকুণ্ডের চারপাশে বসে খাবার খেতে খেতে আমি আমার তিন অধিনায়কের সাথে কীভাবে আমাদের জাহাজের মাথায় স্থাপিত ব্রোঞ্জের তীক্ষ্ণ ঠোঁট দিয়ে শত্রুর একটা জাহাজ গুঁতা মেরে ফুটো করা যায়, সেই কৌশল নিয়ে আলোচনা করলাম। নৌযুদ্ধের কলাকৌশল সম্পর্কে আমার রচিত বিখ্যাত গবেষণামূলক প্রবন্ধ রচনার সময় আমি এই কৌশলটি নিয়ে গবেষণা করেছিলাম। আমি তাদেরকে বিশদ ভাবে ব্যাখ্যা করলাম, কীভাবে নিজেদের জাহাজ আর লোকজনের ক্ষতি না করে শত্রুর জাহাজের ব্যাপক ক্ষতি করা যায়। আরও বললাম, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হচ্ছে সংঘর্ষের আগে নিজেদের লোকদেরকে আত্মরক্ষার কৌশল শেখাতে হবে।

কোনোধরনের অঘটন ছাড়াই শান্তিতে রাত কেটে গেল। ভোরের আলো ফোঁটার আগেই আমার প্রস্তুতি নিতে শুরু করলাম আর ভোর হতেই নোঙ্গর তুলে পাল তুলে আবার নদীতে ভাসলাম। আগের রাতে উত্তর পূর্ব থেকে জোর বাতাস বইতে শুরু করেছিল, সেই বাতাসের তোড়ে আমাদের জাহাজ আরও দ্রুতবেগে চলতে লাগলো। আমাদের লোকদের মাঝে প্রবল উৎসাহ জেগে উঠলো। এমনকি শিকলে বাধা ক্রীতদাসেরাও ভালো খাবার আর থিবসে পৌঁছার পর মুক্তি পাওয়ার আশ্বাসে দ্বিগুণ উৎসাহে দাঁড় বাইতে লাগলো। জাহাজের হালে দাঁড়িয়ে আমিও শুনতে পেলাম ওরা গান গাইছে।

আমার মনে হল জাহাজে একমাত্র আমার মনেই আমাদের এই দুঃসাহসিক উদ্যোগের ব্যাপারে কিছু সন্দেহ ছিল। থিবস ছেড়ে আসার পর সবকিছু এত মসৃণভাবে হয়ে চলেছিল যে, সবাই ভাবতে শুরু করেছিল আমি সকল ভুলভ্রান্তির উর্ধ্বে আর ওরাও অপরাজেয়। আমি জানতাম দুটি ধারণাই মিথ্যা। এমনকি আমিও জানিনা মেমফিস পৌঁছে কি দেখবো। মনে মনে অনুতপ্ত হয়ে ভাবতে শুরু করলাম, কেন বিওনকে আমাদের আসার আগাম খবর দেওয়ার মতো দুঃসাহস দেখালাম। হয়তো এটাই ভালো হতো যদি চুপি চুপি রাতের অন্ধকারে নিঃশব্দে দাঁড় বেয়ে তার রাজধানীতে পৌঁছাতে পারতাম। জাহাজের একপাশে দাঁড়িয়ে বিষয়টা নিয়ে চিন্তায় এতো মগ্ন ছিলাম যে জারাস পাশে এসে আমার পিঠে জোরে একটা চাপড় দিতেই চমকে উঠলাম।

আপনার সম্পর্কে অনেক কিছু শুনেছি তায়তা, কিন্তু কখনও বুঝতে পারিনি যে আপনি এতো বেপরোয়া। আমি জানি আপনি ছাড়া আর কেউ এই ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ দুঃসাহসিক কাজ করার কথা কল্পনাও করতে পারবে না। আপনার এই বীরত্বপূর্ণ কর্মকাণ্ড উদযাপন করার জন্য আপনার একটা বীরত্ব। গাঁথা রচনা করা উচিত। আর আপনি না করলে আপনার হয়ে আমি তা করবো। এই কথাটি শেষ করে সে আবার আমার পিঠ চাপড়ালো।

এই জায়গাটা মিসরীয় এলাকা হলেও অনেক বছর আগে শত্রুরা এটা দখল করে নিয়েছিল। ছোটবেলার পর আর কখনও আমি এখানে আসিনি। তাই সবকিছু আমার কাছে অচেনা মনে হচ্ছিল, আর বাকি সবাইও তাই ভাবছিল কেবল একজন ছাড়া।

সে ছিল ছাব্বিশতম রথীবাহিনীর মিসরীয় ক্রীতদাস রহিম, যাকে আমি তামিয়াত দুর্গেই মুক্তি দিয়েছিলাম। পাঁচ বছর আগে হাইকসোরা তাকে বন্দী করেছিল আর তারপর বাকি সময়ের অর্ধেক সে শেকলে বাঁধা অবস্থায় এই এলাকায় নৌকায় দাঁড় বাইতো।

আমার আর জারাসের পাশে দাঁড়িয়ে সে আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে চললো। নদীপথের প্রতিটি বাঁক আর পানির নিচে লুকানো প্রতিবন্ধকতা সে আমাদেরকে দেখিয়ে নিয়ে চললো।

রাত হতেই আবার আমরা নোঙ্গর ফেলে সেখানেই থামলাম। তবে পরদিন সূর্য উঠার সাথে সাথেই আবার পাল তুলে নীল নদী বেয়ে এগিয়ে চললাম। আজ এপিফি মাসের পঞ্চম দিন, আমাদের আসার খবর দিয়ে এদিনটির কথাই আমি বিওনকে আগাম জানিয়েছিলাম।

ঘন্টা চারেক চলার পর উঁচু দুই তীরের মধ্যে একটা সরু বাঁকের ভেতরে ঢুকলাম। এর ভেতর থেকে বের হয়ে সামনে দুই লিগ পর্যন্ত বয়ে যাওয়া শান্ত প্রণালীরপানির প্রবাহের মধ্যে চলে এলাম।

রহিম বললো, মেমফিস পৌঁছার এটাই শেষ পর্ব। নদীর বামদিকের বাকের পর সামনের দুই তীর জুড়ে মেমফিস নগর ছড়িয়ে রয়েছে।

আমি জারাসকে নির্দেশ দিলাম, জাহাজ থামাও। যারা বৈঠা বাইছে তাদেরকে বল, সামনের বাঁকে পৌঁছা পর্যন্ত বিশ্রাম নিতে আর একটু পানি খেয়ে নিতে। এরপর আমি যখন গোত্তা মারার জন্য জোরে বাইতে বলবো তখন ওরা প্রস্তুত হবে। বাকি দুটি জাহাজও আমাদের নির্দেশ অনুসরণ করলো। তিনটি জাহাজই এখন প্রণালীর মধ্য দিয়ে কেবল পালের সাহায্যে ভেসে চলেছে।

নদীতে বিভিন্ন ধরনের জলযান দেখা যাচ্ছে। ছোট ডিঙি থেকে শুরু করে চেটালো একতলা পাল-তোলা জাহাজ, চারকোণা পালের জাহাজ আর এর সাথে বাধা বড় নৌকা পর্যন্ত। এর আগে নদীতে যেসব নৌকা আমরা পাশ কাটিয়ে এসেছি, তা থেকে এদের ব্যবহারর সম্পূর্ণ অন্যরকম মনে হচ্ছে। যদিও সম্মান দেখিয়ে আমাদের পথ ছেড়ে দিচ্ছে, তবে ভয়ে পালিয়ে যাচ্ছে না। আমাদের দেখে এই নৌকাগুলোর মাঝিমাল্লারা হাত উঠিয়ে স্বাগত জানালো।

আমি জারাসকে বললাম, আমাদের আগমন ওদের কাছে প্রত্যাশিত ছিল। মনে হয় কবুতরটি ঠিকই পথ চিনে ফিরে এসেছে।

জারাস আমার দিকে হতবাক হয়ে তাকিয়ে বললো, এটাই তো আপনি পরিকল্পনা করেছিলেন তাই না? অন্য কিছু তো আপনি আশা করেননি, প্রভু? তার কথা শুনে আমি মাথা নেড়ে অন্যদিকে তাকালাম। আমি জানি অধিকাংশ মানুষের তুলনায় আমি অনেক বিচক্ষণ আর কূটবুদ্ধিসম্পন্ন, তবে বুদ্ধির চেয়ে ভাগ্য আমার কাছে পছন্দনীয়, তবে ভাগ্যদেবী খুবই চঞ্চল। কখন কাকে ছেড়ে ভাগ্যদেবী চলে যান কেউ তা জানে না।

আমি নিচে দাঁড়ীদের বসার বেঞ্চের দিকে নামলাম। ওরা সবাই আমার দিকে হাসি মুখে তাকালো। কেউ কেউ দুএকটা হাসিখুশি মন্তব্য করলো, আমিও প্রত্যুত্তরে মৃদু হাসলাম। তবে এখানে আসার মূল লক্ষ্য ছিল বেঞ্চের নিচে লুকানো ধনুকগুলোতে গুণ লাগান আছে কি না আর তূণভর্তি তীর আছে কি না তা দেখা।

পেছন দিক থেকে বয়ে আসা জোর বাতাসের তোড়ে আমরা নদীর বুক চিরে দ্রুত এগিয়ে চললাম আর এদিকে সামনের বাঁকও দ্রুত এগিয়ে আসছে। কোনো ধরনের অস্থিরতা না দেখিয়ে সবার সাথে হাসিমুখে কথা বলতে বলতে আবার জাহাজের হালে আমার জায়গায় ফিরে গেলাম।

দুপাশে তাকিয়ে নিশ্চিত হলাম আকেমি আর দিলবার আমাদের জাহাজের পেছনে দুইপাশে একটা তীরের ফলার মতো আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে রয়েছে। ওরা দুজনেই হাত তুলে আমাকে সম্মান জানাল আর সংকেত দিল যে আক্রমণের জন্য ওরা প্রস্তুত রয়েছে।

বাঁকে পৌঁছার সাথে সাথেই আমি জারাসের দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে নির্দেশ দিলাম, বৈঠা হাতে নাও!।

সাথে সাথে আমাদের দুই পাশে রূপালি ডানা গজাল-বৈঠার পাতলা ডগাগুলো পানির উপরে চকচক করে উঠলো।

তারপর নির্দেশ দিলাম, বাওয়া শুরু কর! বলার সাথে সাথে একসাথে সমস্ত বৈঠা পানিতে নামলো আর বৈঠা টানা শুরু হল দ্বিগুণ বেগে। ঢাক বাদকরা বৈঠা বাওয়ার তালে তালে দ্রুতলয়ে ঢাক বাজিয়ে চললো।

হঠাৎ বাঁক পার হয়ে নদীর দুই তীরে বিস্তৃত মেমফিস নগরীর মুখোমুখি হলাম। মার্বেল পাথরের দেয়াল আর সুউচ্চ দালানের ছাদ থেকে সূর্য কিরণ ঠিকরে পড়ছে।

জাঁকালো রাজপ্রাসাদ আর মন্দিরগুলো দেখে মনে হল আমাদের প্রিয় থিবসের মতোই জমকালো একটি নগরী।

নদীর উভয় তীরেই তিন থেকে চার সারি নৌযান দেখা যাচ্ছে। আর প্রতিটি নৌযানে মানুষ দেখা যাচ্ছে। বেশিরভাগ নৌযান সাদা আর লাল পতাকা দিয়ে সাজানো। আমি জানতাম এটা হচ্ছে হাইকসোদের আনন্দ আর উৎসবের প্রতীক। উৎফুল্ল জনতা পামপাতা নেড়ে আমাদের স্বাগত জানাচ্ছে। সবার কণ্ঠে উজ্জ্বলতা আর উম্মাতাল গানে ভরপুর।

তবে আমাদের জাহাজ সামনে এগোবার জন্য নীল নদীর মাঝ বরাবর জায়গাটি সম্পূর্ণ খালি রাখা হয়েছে। জলপথের শেষ মাথায় সুসজ্জিত আর রং করা বেশ কয়েকটি বজরা আর ছোট ছোট নৌকা নোঙর করা রয়েছে। আর মাঝখানে রয়েছে সবচেয়ে বড় রাজকীয় বজরা। তবে এটিও আমাদের তিন জাহাজের তুলনায় ছোট।

জনতার কোলাহলের মাঝে আমি চিৎকার করে জারাসকে বললাম, আঘাত করার জন্য আরও জোরে বৈঠা বাইতে বল। মাঝখানের লাল বজরাটি বিওনেরই, এটা লক্ষ্য করে জাহাজ চালাও।

দুইহাত তুলে আমি রেশমি কাপড়ের টুকরাটি দিয়ে চোখের নিচ পর্যন্ত মুখ ঢেকে ব্রোঞ্জের শিরস্ত্রাণটা মাথায় পরলাম। আমি পুরোপুরি নিশ্চিত হতে চাই। যেন অসতর্ক কোনো মুহূর্তে বিওনের রাজদরবারের কেউ আমাকে চিনতে না পারে।

আমাদের জাহাজের হাল ধরে রাখা দুই নাবিক জাহাজের ব্রোঞ্জের ডগাটা রাজা বিওনের রাজকীয় বজরা বরাবর লক্ষ্য স্থির করে রয়েছে। পেছনে বাকি দুই জাহাজ অর্ধেক জাহাজ দূরত্বে রয়েছে যেন আমরাই প্রথম আঘাত হানতে পারি। বাদকরা ঢাকের ছন্দ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে আর আমি অনুভব করলাম ঢাকের তালে তালে আমার হৃৎস্পন্দনও চলেছে।

আমাদের সাথে লাল বজরার দূরত্ব দ্রুত গতিতে চারশো থেকে দুইশো কদম কমে এসেছে। আমি দেখতে পেলাম বজরারি চওড়া দিকটা নদীর স্রোত বরাবর রেখে নোঙর করা। উপরের ডেকে উঁচু ধাপের একটা পিরামিডের চারপাশে তাঁবুর মতো শামিয়ানা টানানো হয়েছে। শামিয়ানার নিচে একটা সিংহাসন আর তার উপর বসা একটা মানুষের মূর্তি দেখতে পেলাম। তবে এতদূর থেকে সবকিছু পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে না।

সিংহাসনের চতুর্দিকে বর্শাধারী পাইক-বরকন্দাজ দাঁড়িয়ে রয়েছে। সবাই বর্ম আর অস্ত্রসজ্জিত। তাদের শিরস্ত্রাণ আর বুকের বর্ম দেখে মনে হচ্ছে রণসাজে সজ্জিত হয়ে প্রদর্শনী করছে।

রাজকীয় বজরার দুই পাশে আরও কিছু ছোট জলযান সারিবদ্ধভাবে নোঙর করা রয়েছে। এগুলোতে বিওনের সভাসদরা ভীড় করে রয়েছে। মনে হচ্ছে কয়েকশো হবে, তবে এত গাদাগাদি করে রয়েছে যে, প্রকৃত সংখ্যা গণনা করার কোনো উপায় নেই। মেয়েরা বেশিরভাগ দীর্ঘদেহী পুরুষের পেছনে ঢাকা পড়ে গেছে। সবাই হাসিখুশিতে মত্ত আর উল্লাসে হাত নাড়ছিল। কিছু কিছু পুরুষ উৎসব উপযোগী বর্ম আর ধাতব শিরস্ত্রাণ পরে রয়েছে। আর অন্যদের পরনে বিভিন্ন ধরনের রঙিন পোশাক।

বিশাল রাজকীয় তরীর পাশেই একটি ছোট জলযানে বাদকদল বর্বর ধরনের হাইকসো সুর বাজিয়ে চলেছে। ঢোলক, বীণা, ক্লারিওনেট, পশুর শিং, তুর্য, কাঠের বাঁশি সবমিলিয়ে বেসুরো আর বিকট আওয়াজ করে চলেছে।

আমরা এতো দ্রুত রাজকীয় তরীর দিকে ছুটে চলছিলাম যে, কাছাকাছি আসার পর এখন প্রায় সবকিছু পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছিলাম। পিরামিড আকৃতির মঞ্চের উপর রঙিন শামিয়ানার নিচে পেটানো রূপার সিংহাসনে বিওন বসে রয়েছে। তার পিতা রাজা সালিটিসের মৃত্যুর পর সে এই সিংহাসন দখল করেছে।

দেখার সাথে সাথেই আমি তাকে চিনতে পারলাম। এর আগে থিবসের যুদ্ধক্ষেত্রে তাকে আমি দেখেছিলাম। সে ছিল হাইকসো সেনাবাহিনীর বামবাহু, তার অধীনে চল্লিশ হাজার পদাতিক আর তিরন্দাজ ছিল। এমন লোককে সহজে ভোলো যায় না।

বিশালদেহী লোকটির বিরাট ভূড়ি জুড়ে বিপুলায়তন সাদা আল্লাখাল্লাটা একটা তাঁবুর মতো ফুলে রয়েছে। বেণি পাকানো কালো দাড়ি লম্বা হয়ে কোমর পর্যন্ত নেমে গেছে। বেণি পাকানো দাড়িতে উজ্জ্বল রূপা আর সোনার অলংকার লাগানো রয়েছে। সে একটা উঁচু মুকুটসহ পলিশ করা রূপার শিরস্ত্রাণ পরে রয়েছে, যাতে বিভিন্ন ধরনের উজ্জ্বল রত্ন লাগানো আছে। তাকে দেখতে একজন দেবতার মতো মনে হচ্ছিল। হাইকসোদের সবকিছু ঘৃণা করলেও তার সাজসজ্জা দেখে আমিও অবাক হলাম।

রাজা বিওন একহাত উঁচু করে হাতের তালু সামনের দিকে মেলে সম্ভবত আমাদের স্বাগত কিংবা আশীর্বাদ জানাচ্ছে। সঠিক বুঝা মুশকিল, তবে সে মৃদু হাসছিল।

আমি জারাসকে সংক্ষেপে কয়েকটা শব্দে রাজকীয় বজরার সবচেয়ে দুর্বল দিকটা দেখালাম। সেটা ছিল উঁচু মঞ্চের একটু সামনে।

ঐ জায়গাটা লক্ষ্য করে আঘাত হানবে।

এখন আমরা এতো কাছে এসে পড়েছি যে, এবার দেখতে পেলাম রাজা বিওনের মুখে আর হাসি নেই। মুখ হা করাতে তার চোয়াল নিচের দিকে ঝুলে পড়েছে, বাদামি ছোপ ছোপ ময়লা সামনের দাঁত দেখা যাচ্ছে। তারপর হঠাৎ সে মুখ বন্ধ করলো। শেষ মুহূর্তে সে আমাদের বৈরী মনোভাব টের পেয়েছে। লোমশ দুই থাবা সিংহাসনের হাতলে ঠেস দিয়ে উঠতে চেষ্টা করলো। কিন্তু সে খুব ধীরে উঠছিল।

রাজকীয় তরীর দুইপাশে নৌকাগুলোর উপর ভীড় করে থাকা সভাসদরা হঠাৎ তাদের দিকে ছুটে আসা জাহাজগুলোর ধাক্কার বিপদ সম্পর্কে সচেতন হল। মেয়েদের ভয়ার্ত চিৎকার আমাদের কানে ভেসে এলো। কিছু কিছু পুরুষ বজরার কিনারায় যাওয়ার জন্য ঠেলাঠেলি করতে করতে তরবারি কোষমুক্ত করে আমাদের উদ্দেশ্যে রণহুঙ্কার দিতে শুরু করলো। যারা সামনে ছিল তারা পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়লো। তাদের এই বিশৃঙ্খল অবস্থার মাঝে পর্বতের তুষারধ্বসের মতো আমরা তাদের উপর এসে পড়লাম।

হাইকসোদের সমস্ত চিৎকার আর হট্টগোল ছাপিয়ে জারাসের নির্দেশ শোনা গেল, বৈঠা সামলাও! আমাদের জাহাজের দুইপাশের দাড়ীরা পানি থেকে বৈঠা তুলে খাড়া করে জায়গামত সামলে রাখলো যাতে জাহাজের সংঘর্ষে এগুলো ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। নদীর শেষ কয়েকগজ খোলা জায়গা আমরা একই গতিতে পার হলাম।

আমি জারাসকে যে জায়গাটা দেখিয়েছিলাম ঠিক সেই জায়গাটি লক্ষ্য করে আমরা রাজকীয় বজরায় আঘাত হানলাম। বিকট মচমচ আওয়াজ তুলে ব্রোঞ্জের বিশাল ডগাটা সামনের বজরাটির কাঠ ভেদ করে ভেতরে ঢুকে পড়লো। সংঘর্ষের সাথে সাথেই দাড়ী বেঞ্চে বসা আমাদের বেশিরভাগ লোক ডেকে ছিটকে পড়লো। আমি শক্ত কাঠের বেঞ্চ ধরে নিজেকে সামলালাম। আমার চারদিকে কী ঘটছে সব আমি দেখতে পেলাম।

লক্ষ্য করলাম আমাদের জাহাজের পুরো শক্তি আর ওজন রাজকীয় বজরার এক পাশে ছোট একটি জায়গায় কেন্দ্রিভূত হয়ে আঘাত করেছে। একটা ভারি কুড়ালের ফলা যেমন এবটি কাঠের গুঁড়ি ফেড়ে ফেলে সেরকমভাবে আমরা এটা ফেড়ে ফেললাম। আমাদের জাহাজের ডগা বজরাটি চাপা দিতেই এর হালের কয়েক টুকরা আমাদের জাহাজের সামনের অংশের নিচে তলিয়ে গেল।

আমাদের জাহাজ ওদের উপর চড়াও হতেই আমি দেখলাম, শীতকালের ঝড়ো বাতাসের তোড়ে যেমন চিনার গাছের উঁচু ডাল থেকে পাতা ঝরে পড়ে, ঠিক তেমনি হাইকসো প্রহরীদলের সদস্যরা রাজকীয় পিরামিডের সিঁড়ির ধাপ থেকে ছিটকে পড়লো। আর রাজা বিওন সবচেয়ে উঁচু থেকে পড়লো। তার বিশাল দেহজুড়ে আলখাল্লাটা ফুলে গেল আর জটপাকানো দাড়ির বেণিগুলো মুখে আছড়ে পড়তে লাগলো। শূন্যে হাত পা ছুঁড়তে ছুঁড়তে সে নদীতে পড়লো। আমাদের থেকে ত্রিশ কদম সামনে সে পানিতে ভাসছিল, পানি আটকে থাকায় তার আলআল্লাটা ফুলে গিয়ে তাকে ভাসিয়ে রেখেছিল।

আমার দুই পাশে বাকি দুটি জাহাজও হাইকসোদের অন্যান্য ছোট ছোট বজরাগুলোর গায়ে ধাক্কা মেরেছে। ওরা বেশ সহজেই বজরাগুলোর কাঠ চিড়ে ফেললো, বজরার উপরের যাত্রীরা আতঙ্কে চিৎকার করে ডেক থেকে পানিতে পড়ে গেল।

রাজকীয় বজরার ভাঙা অংশগুলো আমাদের তিনতলা জাহাজের দুইপাশ দিয়ে ছড়িয়ে পড়লো। পাল ঘেঁড়ার প্রচণ্ড চড়চড় শব্দ, দড়ি ছিঁড়ে ফট ফট শব্দ, কাঠ ফেটে যাওয়ার শব্দ আর জাহাজের হালের ধাক্কায় পিষে যাওয়া মানুষের আতঙ্কিত চিৎকার শোনা যাচ্ছে। আমাদের জাহাজের ডেকও একপাশে হেলে যাওয়ায় মানুষজন আর ডেকের উপরের বিভিন্ন জিনিসপত্র একদিকে সরে গেল।

তারপর আমাদের সুন্দর জাহাজটি ভাঙা বজরার ভাঙা অংশগুলো থেকে ছাড়া পেয়ে আবার ভারসাম্য ফিরে পেল এবং পানির উপর সোজা হয়ে দাঁড়াল।

জারাস আবার চিৎকার করে উঠলো, বৈঠা হাতে নাও! আমাদের লোকেরা আবার বেঁধে রাখা বৈঠাগুলো তুলে নিয়ে বাওয়ার জন্য আংটায় বসালো। জারাস আবার বলে উঠলো, পেছনে বাইতে শুরু কর! কেবল পেছনের বেঞ্চিতে বসা দাঁড়িরা বৈঠা পানিতে পৌঁছাতে পারছিল। সামনের বেঞ্চিতে বসা দাঁড়িরা রাজকীয় বজরার ভাঙা অংশগুলোর কারণে দাঁড় বাইতে পারছিল না।

যারা দাঁড় বাইতে পারছিল, তারা জোরে জোরে কয়েকবার বৈঠা চালিয়ে আমাদেরকে আটকে থাকা ভাঙা বজরার অংশ থেকে ছাড়িয়ে আনলো। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ভাঙা টুকরাগুলো পানিতে তলিয়ে গেল।

আমি অন্য তিনতলা জাহাজ দুটোর দিকে তাকালাম। দিলবার আর আকেমি তাদের অধীনস্থ লোকদের উদ্দেশ্যে চিৎকার করে নির্দেশ দিচ্ছিল। ওদের জাহাজের নাবিকরাও ঢাক পেটানোর তালে তালে দ্রুত বৈঠা চালিয়ে জাহাজদুটোকে জায়গামত ফিরিয়ে নিয়ে আসছিল।

নদীর পানিতে হাবুডুবু খেতে থাকা মানুষের মাথা দেখা যাচ্ছে, বাঁচার জন্য আপ্রাণ চেষ্টারত মানুষ আর ভাঙা টুকরায় নদী ভরে রয়েছে। ডুবন্ত নারী পুরুষের মরণপণ চিৎকার আর আর্তনাদ চারপাশে এক করুণ পরিবেশ সৃষ্টি করেছে।

দীর্ঘ এক মিনিট আতঙ্কিত হয়ে আমি এই বিভিষিকাময় হত্যাযজ্ঞ লক্ষ্য করলাম। অপরাধবোধ আর অনুতাপে আমি প্রায় বিধ্বস্ত হয়ে পড়ছিলাম। বিপর্যস্ত এই প্রাণীগুলোর দিকে শুধু হাইকসো পশু মনে করে আর তাদের দিকে তাকাতে পারছিলাম না। এরাও মানুষ, যারা নিজেদের জীবন বাঁচাবার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছে।

তারপর রাজা বিওনের দিকে নজর পড়ার সাথে সাথেই আমার এই অনুভূতি বদলে গেল। মনে পড়ে গেল নাকুয়াদার যুদ্ধে হাইকসো পশুরা যখন আমাদের চমৎকার আর সাহসী দুইশো তিরন্দাজকে বন্দী করেছিল তখন বিওন তাদের সাথে কী আচরণ করেছিল। যুদ্ধক্ষেত্রের উপরে শেঠ দেবতার মন্দিরের ভেতরে ওদেরকে আটকে রেখে জীবন্ত আগুনে পুড়িয়ে সেই দানবীয় দেবতার উদ্দেশ্যে অর্ঘ্য নিবেদন করেছিল।

এখন বিওন রাজকীয় বজরার একটা কাঠের তক্তা একহাতে ধরে রেখেছে আর অন্য হাতে তার রত্নখচিত তলোয়ার নিয়ে তার হেরেমের যে সব নারী কাঠের টুকরাটিতে আশ্রয় নিতে চেষ্টা করছিল তাদের মাথায় কোপ মারছিল। নির্দয়ভাবে সে তাদেরকে তাড়াচ্ছিল, কাউকেই সেই কাঠের খণ্ডটি ধরে ভেসে থাকার সুযোগ দিতে রাজি নয়। আমি লক্ষ্য করলাম সে আমার আদরের বেকাথার সমবয়সি একটি শিশুর মতো মেয়ের উপর তলোয়ার দিয়ে আঘাত করলো। তলোয়ারের ধারাল ফলার আঘাতে পাকা ডালিমের মতো মেয়েটির মাথা কেটে গেল। দরদর রক্ত ঝরতে লাগলো, তারপরও বিওন অশ্লীল ভাষায় মেয়েটিকে গালি দিয়ে আবার তলোয়ার দিয়ে কোপ মারলো।

আমি দ্রুত নিচু হয়ে সামনের বেঞ্চির নিচে রাখা গুন লাগান ধনুকটি তুলে নিলাম। তীরগুলো তূণ থেকে মাটিতে ছড়িয়ে পড়েছিল, একটা তীর নিয়ে ধনুকের ছিলায় লাগিয়ে ছিলাটা টেনে টান টান করলাম, তারপর সোজা হয়ে পূর্ণশক্তিতে তীর ছুঁড়লাম। যেকোনো নিপুণ তিরন্দাজের মতো ধনুকের ছিলা আমার ঠোঁট ছুঁতেই সেটা ঢিল করে দিতাম। কিন্তু আজ প্রচণ্ড রাগে আমার হাত কাঁপছিল, তাই তীরটা ছুঁড়ার সময় বাঁকা হয়ে ছুটলো।

লক্ষভ্রষ্ট হয়ে তীরটা বিওনের গলার বদলে কাঠের টুকরাটা ধরে রাখা হাতে বিধলো।

জারাস আর অন্যান্য যারা এটা লক্ষ করছিল, তারা উল্লাসে চেঁচিয়ে উঠলো। ওরা ভেবেছিল আমি ইচ্ছা করে বিওনের হাতটা কাঠে বিধিয়েছি। এবার আরেকটা তীর তুলে নিয়ে ওদেরকে দেখাবার জন্য লক্ষ্য স্থির করে বিওনের অন্য হাতটাও কাঠের খণ্ডটার গায়ে বিধলাম। ক্রুশবিদ্ধ হবার মতো অবস্থা হয়ে সে একটা নেকড়ের মতো চিৎকার করে উঠলো।

মুলত আমার স্বভাব করুণাময়, তাই তাকে আর কষ্ট না দিয়ে তৃতীয় তীরটা ছুঁড়তেই তার গলা ভেদ করে চলে গেল।

আমার জাহাজের নাবিকেরাও আমাকে অনুসরণ করলো। ওরাও ধনুকে তীর জুড়ে জাহাজের পাশে দাঁড়িয়ে নিচে পানিতে শক্রর উদ্দেশ্যে বৃষ্টির মতো তীর ছুঁড়তে শুরু করলো।

যা ঘটছিল তা থামাবার মতো শক্তি আমার ছিল না। আমার লোকদের অনেকে এই জঘন্য হাইকসোদের হাতে তাদের বাপ আর অনেকে ভাই হারিয়েছে। তাদের মা বোনদের এরা বলাৎকার করেছিল।

কাজেই কিছুক্ষণ হাইকসো অভিজাতদের এই দুর্দশা তাকিয়ে দেখলাম, তারপর তীরবিদ্ধ শেষ মৃতদেহটা স্রোতে ভেসে যাওয়ার পর আমি আমার লোকদের থামতে বললাম।

অনুতপ্ত না হয়ে আমার লোকেরা উল্লাসে চিৎকার করতে করতে আবার দাঁড় হাতে নিল। হাইকসোদেরকে তাদের জঘন্য শেঠ দেবতার করুণায় ছেড়ে দিয়ে আমরা দক্ষিণদিকে থিবসে আমাদের আসল মিসর রাজ্যের দিকে এগিয়ে চললাম।

.

আমাদের বর্তমান মিসর রাজ্য আর হাইকসো গোত্র আমাদের দেশের যে এলাকা দখল করেছিল তার মাঝে কোনো পরিষ্কার সীমানাচিহ্নিত করা ছিল না। প্রায় প্রতিদিন সীমান্তে দুই পক্ষের মাঝে আক্রমণ, প্রতিআক্রমণ আর লড়াই হতো।

পেয়াইনি মাসের পঞ্চম দিনে আমরা থিবস ছেড়ে এসেছিলাম। এর মধ্যে সেনাপতি ক্রাটাস হাইকসো হামলাকারীদেরকে শেখ আবাদা নগরী থেকে বিশ লিগ দূরত্বে হটিয়ে দিয়েছিলেন। যাইহোক এখন এপিফি মাস চলছে, আমাদের অবর্তমানে অনেক পরিবর্তন নিশ্চয়ই ঘটেছে। তারপরও ওদেরকে অবাক করে দেবার মতো ব্যাপার আমরা ঘটিয়েছি।

হাইকসোদের সামনের সারির সৈন্য কিংবা সেনাপতি ক্রাটাসের অধীনে যুদ্ধরত আমাদের সৈন্যদের কেউ আশা করবে না যে মধ্যসাগরের তীর থেকে চারশো লিগ নদীপথ পাড়ি দিয়ে একটি মিনোয়ান রণ-নৌবহর হঠাৎ এসে হাজির হবে। তাই পরিচিত এলাকায় পৌঁছার পর তিনতলা জাহাজগুলোর মাস্তুলের ডগায় হাতে বানানো ফারাও ত্যামোজের নীল পতাকা উড়িয়ে দিলাম।

নীল নদীর দক্ষিণপ্রান্তে আমাদের তিনতলা জাহাজগুলোর মোকাবেলা করার মতো হাইকসো কিংবা মিসরীয় কোনো জাহাজই নেই। আমরা প্রমাণ করেছি যে, কেউ আমাদেরকে থামাতে পারবে না। অবশ্য হাইকসোরা পায়রা উড়িয়ে খবর পাঠিয়ে আমাদের আর মিসরের মাঝে অবস্থান করা তাদের সেনাবাহিনীকে সাবধান করে দিতে পারে। তবে পায়রা শুধুমাত্র তাদের ডিম থেকে ফোঁটার স্থানেই ফিরে যেতে পছন্দ করে, অন্য কোথাও কেউ পাঠাতে চাইলে তারা সেখানে যাবে না।

.

হাইকসসারা যখন আমাদেরকে নিজ ভূমি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিল তার আগে আমাদের শাসক ছিলেন ফারাও ম্যামোজ। সে-সময়ে আমি, তায়তা ছিলাম প্রধান উজির ইনতেফের ক্রীতদাস। তিনি ছিলেন কারনাক মন্দিরের নোমার্ক বা প্রধান তত্ত্বাবধায়ক এবং উচ্চ মিসরের সকল বাইশটি নোম বা প্রদেশের প্রধান উজির। এছাড়াও তিনি নেক্রোপলিস এবং রাজকীয় সমাধিসৌধের রক্ষণাবেক্ষণের প্রশাসক ছিলেন।

জীবিত এবং মৃত সকল ফারাওয়ের সমাধি দেখাশোনার দায়িত্ব তার উপর ছিল। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল তিনি ফারাও ম্যামোজের সমাধিরও সরকারি স্থপতি ছিলেন।

তবে প্রভু ইনতেফের জন্মগত কোনো সৃষ্টিশীল প্রতিভা ছিল না। তিনি বরং ধ্বংসাত্বক কাজে পটু ছিলেন। তিনি একটি গরুবাছুরের খোয়াড় কিংবা কবুতরের খোপও তৈরি করতে পারতেন কিনা আমার সন্দেহ। তিনি শুধু রাজকীয় সেবায় সময় কাটাতেন আর কঠিন যে কাজগুলো নিজে করতে পারতেন না সেগুলো আমার কাঁধে চাপিয়ে দিতেন।

প্রভু ইনতেফের সাথে আমার তেমন সুখকর স্মৃতি ছিল না। তার অধীনস্থ লোকদের একজন গোলাম আমার উপর খোঁজা করার ছুরিটা চালিয়েছিল। সে ছিল একজন নিষ্ঠুর, নির্দয় মানুষ। তবে শেষপর্যন্ত অবশ্য আমি তার সাথে শেষ বোঝাঁপড়াটা করতে পেরেছি।

তবে সেই খুশির দিনটির অনেক আগে আমিই ফারাও ম্যামোজের চমৎকার সমাধিসৌধের সমস্ত কক্ষ, গুহাপথ আর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া ঘরের নকশা করেছিলাম। তারপর এই বিশাল সৌধ নির্মাণ কাজে শ্রম দেওয়ার জন্য যেসব নির্মাতা, রাজমিস্ত্রি, শিল্পী আর কারিগরদের ডাকা হয়েছিল, তাদের সকলের কাজ আমি তত্ত্বাবধান করেছিলাম।

ফারাও ম্যামোজের বিশালাকায় পাথরের শবাধারটি একটি মাত্র গ্রানাইট পাথরখণ্ড কেটে তৈরি করা হয়েছিল। এর ভেতরে অনায়াসে একটির মাঝে আরেকটি, এভাবে মোট সাতটি রূপার কফিন রাখার জায়গা ছিল। সবচেয়ে মাঝখানের কফিনে ফারাওয়ের মমিকরা দেহটি রাখার কথা ছিল। এতে পুরো জিনিসটা অনেক ভারি আর বড় হয়ে যেত। এই জিনিসটি যথাযথ শ্রদ্ধার সাথে নীল নদীর তীরে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া মন্দির থেকে দুইশো গজ দূরত্বে রাজার উপত্যকার পাদদেশে সমাধিসৌধে নেওয়ার কথা ছিল।

এই স্থানান্তরের কাজটি করার জন্য আমি নীল নদীর তীর থেকে কালো মাটির সমতল জমির উপর দিয়ে তীরের মতো সোজা একটা খাল খনন করেছিলাম। ফারাওয়ের বজরা চলার মত খালটা যথেষ্ট চওড়া আর গভীর করা হয়েছিল।

দুর্ভাগ্যবশত হাইকসোরা আমাদেরকে আমাদের দেশ থেকে বিতাড়িত করার আগে ফারাও ম্যামোজ একদিনের জন্যও তার সমাধিতে শুয়ে থাকতে পারেন নি। যখন আমরা দেশ ত্যাগ করে দীর্ঘ যাত্রা শুরু করেছিলাম, তখন তার স্ত্রী রানি লসট্রিস আমাদেরকে ফারাওয়ের মমিকরা দেহটি সাথে নিয়ে যেতে নির্দেশ দিয়েছিলেন।

এর অনেক বছর পর রানি লসট্রিস আরও দক্ষিণে কয়েক হাজার লিগ দূরে জঙ্গল এলাকা নুবিয়ানে আরেকটি সমাধিসৌধ নির্মাণের নকশা বানাতে নির্দেশ দিলেন। এখন সেখানেই ম্যামোজ শায়িত রয়েছেন।

এতোবছর যাবত রাজার উপত্যকায় মূল সমাধিসৌধটি শূন্য পড়ে রয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হল, আমার নকশা অনুযায়ী নীল নদীর তীরে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া মন্দির থেকে রাজকীয় সমাধি পর্যন্ত যে খালটা আমি খনন করিয়েছিলাম, তা এখনও চমৎকার অবস্থায় রয়েছে। আমি এটা জানতাম, কেননা মাত্র কিছুদিন আগে আমি আমার ছোট্ট দুই রাজকুমারিকে তাদের বাবার শূন্য সমাধি দেখাবার জন্য নদীর তীরে বেড়াতে নিয়ে গিয়েছিলাম।

এতোগুলো বছর কেটে যাবার পরও আমি ম্যামোজের শবাধারবাহী বজরার সঠিক আয়তন মনে করতে পেরেছি। আমার স্মৃতিশক্তি অত্যন্ত প্রখর। আমি কখনও কোনো বিষয়, সংখ্যা কিংবা মুখ ভুলি না।

এবার আমি মিনোয়ান সম্পদবাহী তিনতলা জাহাজ তিনটির আয়তন পরিমাপ করলাম। তারপর জারাসকে বললাম জাহাজগুলো শান্ত পানিতে নোঙর করতে। এরপর সাঁতার কেটে জাহাজের তলায় গিয়ে অনুমান করলাম খোলে মূল্যবান সম্পদের ওজনসহ জাহাজটির কতটুকু পানি প্রয়োজন পড়বে। এই পরিমাপটি এক জাহাজ থেকে অন্য জাহাজে একেক রকম হল।

সবকিছু দেখার পর খুশিমনে পানির উপরে ভেসে উঠলাম। এখন আমি ফারাও ম্যামোজের শববাহী বজরার সাথে আমাদের জাহাজের আয়তন মেলাতে পারবো। এই খালে আমাদের সবচেয়ে বড় জাহাজটি চলাচলের সময় দুই পাশে দশ কিউবিট জায়গা আর তলদেশে পনেরো কিউবিট জায়গা খালি রাখতে পারবে। আরও স্বস্তিদায়ক ব্যাপারটা হল এতো বছর ধরে আমি খালের দুইপাশে গ্র্যানাইট পাথরখণ্ড লাগিয়েছিলাম আর খালে সবসময় নীল নদীর পানি প্রবাহ নিশ্চিত করার জন্য একধরনের জলকপাট আর পানি উত্তোলনের জন্য সেচযন্ত্র-শাডুফ তৈরি করেছিলাম।

আমার অভিজ্ঞতা থেকে আমি জেনেছি, যদি তুমি পরিপূর্ণ শ্রদ্ধার সাথে দেবতাকে সম্মান করে তার কাছে কিছু আশা কর, তাহলে তুমি নিশ্চয়ই তার প্রতিদান পেতে পার। যদিও দেবতারা অনেকসময় খামখেয়ালি হন, তবে এবার তারা ঠিকই আমাকে মনে রেখেছেন।

ঠিক করলাম সূর্যাস্তের পর খালে ঢুকবো। অন্ধকারে ফারাও ম্যামোজের অন্ত্যেষ্টি মন্দিরের নিচে পাথরের জেটিতে জাহাজ বেঁধে রাখলাম। অবশ্য ম্যামোজ এখন একজন দেবতা আর তার নিজের মন্দিরও নীল নদীর তীরে রয়েছে। এখান থেকে হেঁটেই জেটিতে পৌঁছা যায়।

মন্দিরটা বেশি বড় নয়। যখন আমরা থিবসের যুদ্ধে হাইকসোদের পরাজিত করে ফিরে এসেছিলাম তখন রানি লসট্রিস তার প্রয়াত স্বামীর স্মৃতির সম্মানে একটি মন্দির নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন। তার উদ্দেশ্য ছিল তার স্বামীর প্রতি সম্মান দেখান আর নির্বাসন থেকে দেশে ফেরার জন্য দেবতার প্রতি ধন্যবাদ জ্ঞাপন করা।

নিশ্চিতভাবে আমাকেই তিনি এই মন্দির নির্মাণের আহ্বান জানালেন। তার ইচ্ছা ছিল এমন একটি বিশাল আর জমকালো মন্দির নির্মাণ করা, যা মিসরের আর সবকিছুকে ম্লান করে দেবে। তিনি চেয়েছিলেন মন্দিরটিতে চারশো পুরোহিত থাকবে, তবে আমি অনেক বলে তাকে সংখ্যাটি কেবল চারজন পুরোহিতে নামিয়ে এনেছিলাম।

এখন আমি আর জারাস কাউকে না জানিয়ে নদী থেকে মন্দিরের পেছন দিক দিয়ে চক্রনাভি বা মূল অংশে ঢুকলাম। সেখানে পৌঁছে আমরা আবিষ্কার করলাম সেই চার পুরোহিত পাম থেকে তৈরি সস্তা মদ পান করে একটু মাতাল হয়ে আছেন। ওদের সাথে আরও দুইজন অল্পবয়সী নারীও ছিলেন। ওরা সবাই নগ্ন হয়ে একসাথে কাদামাটির ইটের তৈরি মেঝেতে গোল হয়ে হাঁটছিলেন আর পুরোহিতরা হাততালি দিয়ে জোরে জোরে কিছু মন্ত্রোচ্চারণের মতো চিৎকার করছিলেন।

আমরা পৌঁছার কিছুক্ষণ পর তারা আমাদের উপস্থিতি টের পেলেন, মেয়েদুটো দ্রুত দেবতা ম্যামোজের মূর্তির পেছনের গোপন দরজা দিয়ে ছুটে অদৃশ্য হয়ে গেল। এরপর আর তাদের আমরা দেখিনি।

ম্যামাজের এই চার পুরোহিতের আমার প্রতি যথেষ্ট ভক্তি রয়েছে। রানি লসট্রিসের মৃত্যুর আমি তাদের মাসিক মাসোহারা নিশ্চিত রেখেছিলাম। ওরা চারজনই আমার সামনে হাঁটুগেড়ে বসে আমাকে ভক্তিশ্রদ্ধা জানিয়ে দেবতার নামে আমার মাথায় আশীর্বাদ বর্ষণ করলো।

ওদের হাঁটু গেড়ে বসে থাকা অবস্থায় আমি রাজকীয় বাজপাখির সিলমোহরটা বের করে ওদের দেখালাম। এটা দেখে ওদের মুখে আর কথা জোগাল না। প্রধান পুরোহিত হামাগুড়ি দিয়ে সামনে এগিয়ে আমার পায়ে চুমু খাওয়ার চেষ্টা করলো। আমি পিছিয়ে গেলাম আর জারাস তাকে আর সামনে এগোতে দিল না।

তারপর আমি ঐ চার পুরোহিতকে সংক্ষিপ্তভাবে আর কঠোরভাবে বললাম ফারাও ত্যামোস ছাড়া আর কাউকেই যেন ঘুণাক্ষরেও এই তিনতলা ট্রাইরেম জাহাজ সম্পর্কে কিছু না বলা হয়। এছাড়া সারা দিনরাত মন্দিরে, শূন্য সমাধিসৌধ আর খালের দুইপাশে সশস্ত্র প্রহরা থাকবে। এরপর থেকে এই পবিত্র স্থানে কেবল ক্যাপ্টেন জারাসের অধীনস্থ লোকেরা ঢুকতে পারবে। আর একই প্রহরীরা নিশ্চিত করবে যেন এই চার পুরোহিত এই জায়গার মধ্যেই নিজেদেরকে অবরুদ্ধ করে রাখে।

পরিশেষে আমি প্রধান পুরোহিতকে সমাধি আর অন্যান্য স্থাপনায় ঢোকবার সমস্ত চাবির গোছা আমার হাতে দিতে নির্দেশ দিলাম। তারপর আমি আর জারাস জাহাজে ফিরে গেলাম।

রাজার উপত্যকার প্রবেশ পথ থেকে নদীর তীর পর্যন্ত জায়গাটি বিশ হাত ঢালু ছিল। তবে আমাদের প্রত্যেকটা জাহাজ এই উচ্চতায় তুলতে চারটি আলাদা জলকপাট বা গ্লুইস গেট প্রয়োজন। তারপরই এগুলোকে সমাধিসৌধে আনা যাবে। আমরা প্রথম জাহাজটি দাঁড় বেয়ে মন্দিরের নিচে জলকপাটের মধ্যে এনে এর দরজাটা বন্ধ করে দিলাম। এই জলাধারের মধ্যে পানির উচ্চতা বাইরের খালের চেয়ে পাঁচ হাত নিচু ছিল।

আমি আমার তিন জাহাজের অধিনায়কদের দেখালাম কীভাবে মাটির কপাটটি খুলতে হয়। উপরের খাল থেকে নিচের জলাধারে পানি নেমে ধীরে ধীরে বিশাল জাহাজটিকে উপরের জলাধারের সমান উচ্চতায় তুলে আনলো। কপাটটি বন্ধ হয়ে যাবার পর গুণ টেনে জাহাজটিকে পরবর্তী জলাধার পর্যন্ত নিয়ে যাবার জন্য আমাদের পঞ্চাশজন মানুষ অপেক্ষা করছিল। এর পেছনে দ্বিতীয় জাহাজটি উপরে তোলার জন্য একই প্রক্রিয়ায় কাজ শুরু হল।

এ-ধরনের কোনোকিছু আমার লোকেরা কখনও দেখেনি, অবশ্য এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই, কেননা এই পদ্ধতি আমিই আবিষ্কার করেছিলাম। সারা পৃথিবীতে এরকম পদ্ধতি আরেকটিও নেই। ওরা এতো অবাক হয়ে গিয়েছিল যে, ওদের মনে হয়েছিল এটা একধরনের জাদুকরী ব্যাপার।

সৌভাগ্যবশত এই কাজের জন্য আমার কাছে দুইশো মানুষ ছিল। মিনোয়ানরা যে ক্রীতদাসদের শিকলে বেধে নিচের ডেকে রেখেছিল ওরাও ছিল এদের মধ্যে। অবশ্য ওরা এখন মুক্ত মানুষ, তবে ওরা কৃতজ্ঞতাবশত সব কাজ করে যাচ্ছিল।

জাহাজটি উপরে তোলার জন্য উপরের জলাধার থেকে যে পানি সরানো হয়েছিল তা আবার ভর্তি করার প্রয়োজন ছিল। কয়েকটা সেচ করার শাদুফ যন্ত্র দিয়ে আমি নদী থেকে নতুন পানি পাম্প করে তোলার ব্যবস্থা করলাম। এগুলো ছিল দুই বিপরীত প্রান্তে ওজন রাখা বাকেট শিকল বা কপিকল, যা দুইজন মানুষ চালাতে পারে। এটি একটি পরিশ্রম সাধ্য কাজ যা, প্রত্যেক জাহাজের জন্য চারবার করে করতে হয়েছিল।

প্রথম জলকপাটের মধ্যে তোলার আগে প্রত্যেক জাহাজের পাল আর মাস্তুল উপরের ডেকে সমান করে বিছিয়ে রাখা হয়েছিল। তারপর জাহাজটি নলখাগড়া দিয়ে বুনা মাদুর দিয়ে ঢেকে ফেলা হয়েছিল, যাতে দেখে মনে হচ্ছিল এটা একটি আকৃতিহীন ময়লার স্তূপ। পরদিন সকালে থিবসের লোকজন ঘুম থেকে উঠে নদীর এপারে তাকালে অস্বাভাবিক তেমন কিছু দেখতে পাবে না। তিনটি তিনতলা জাহাজই অদৃশ্য হয়ে গেছে, যেন কখনও এগুলোর অস্তিত্ব ছিল না।

পরদিন সূর্যোদয়ের সময় আমরা সমতল ভূমির উপর দিয়ে জাহাজগুলো টেনে নিয়ে ম্যামোজের সমাধিসৌধের প্রবেশ পথের কাছে এসে বাঁধলাম। লোকগুলো এত পরিশ্রমের পর ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল, তাই আমি জারাসকে নির্দেশ দিলাম ওদের সবার খাবারের পরিমাণ বাড়িয়ে দিয়ে আরও কিছু শুকনো মাছ, বিয়ার আর রুটি দিতে আর দিনের বাকি গরম সময়টা বিশ্রাম নিতে বললাম।

পায়ে চলার পথ দিয়ে হেঁটে আমি মন্দিরে ঢুকলাম। মনে হল পুরোহিতরা গত সন্ধ্যার কষ্টসাধ্য যাবতীয় ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানের ধকল কাটিয়ে উঠেছে। মন্দিরের ডিঙিতে করে ওরা আমাকে নদীর উপর দিয়ে নিয়ে চললো। আমার অভিযানের সফলতার খবর দেবার জন্য আমি ফারাওয়ের কাছে যাচ্ছি।

এই দায়িত্বটি আমি খুবই পছন্দ করি। ফারাওয়ের প্রতি আমার পরম ভক্তি ছিল, তবে এর চেয়েও বেশি ছিল তার মা লসট্রিসের প্রতি। তবে এইটুকুই শুধু বলবো যে, রাজপরিবারের সকল সদস্যের প্রতি আমার ভক্তি ছিল।

আমার অনুগত পুরোহিতরা আমাকে শহরের বাজারের কাছে নদীর তীরে সিঁড়ির কাছে নামিয়ে দিল। সকাল হলেও বাজারে লোক সমাগম যথেষ্ট ছিল। সরু গলি দিয়ে প্রাসাদের ফটকের দিকে হেঁটে চললাম। ভাঙাচোরা শিরস্ত্রাণ আর মুখ ঢাকা ময়লা মুখোশের কারণে কেউ আমাকে চিনতে পারেনি।

প্রাসাদের ফটকে পৌঁছার পর মুখ থেকে ছদ্মবেশ সরাতেই প্রাসাদ রক্ষীদলের অধিনায়ক সাথে সাথে আমাকে চিনতে পেরে শ্রদ্ধার সাথে অভিবাদন জানালো।

আমি তাকে বললাম, আমাকে এখনি ফারাওয়ের সাথে দেখা করতে হবে। একজন বার্তাবাহক পাঠিয়ে তাকে জানাও আমি তার সাথে দেখা করার জন্য আনন্দের সাথে অপেক্ষা করছি।

ক্ষমা করুণ প্রভু তায়তা। ফারাও থিবসে নেই। খুব শিগ্রি ফিরে আসবেন বলে মনে হয় না।

আমি মাথা নাড়লাম। একটু হতাশ হলেও খুব একটা অবাক হই নি। জানতাম ফারাও অধিকাংশ সময় উত্তরে হাইকসোদের বিরুদ্ধে অন্তহীন অভিযানে সময় আর শ্রম ব্যয় করেন। তাহলে আমাকে প্রাসাদ সরকার প্রভু এটনের কাছে নিয়ে চল।

এটনের কামরার দরজায় পৌঁছতেই সে ছুটে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলো। তারপর বললো, কী খবর বন্ধু? তোমার অভিযান কেমন হয়েছে?

আমি মুখ অন্ধকার করে বললাম, খবর বেশ গুরুতর। তামিয়াত দুর্গে সর্বাধিরাজ মিনোজের ধনভাণ্ডার লুট হয়েছে। আর রাজা বিওনকে হত্যা করা হয়েছে।

সে আমাকে দুই হাতে ধরে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বললো, তুমি আমার সাথে মজা করছো, তায়তা। যেকোন সৎলোক এটা শুনলেই কেঁদে ফেলবে! এমন জঘন্য কাজটা কে করলো?

আমি একটি হাত তার মুখের সামনে তুলে ধরে বললাম, হায়! একই হাত দুটো কাজই করেছে, এটন। যে হাতটি দেখলে তুমি চিনতে পারবে। সে

ধোকা খাওয়ার মত ভান করে হাতটার দিকে অবাক হয়ে তাকালো। এতোকাল। প্রাসাদ সরকার পদে টিকে থাকতে গেলে একজনকে অবশ্যই পাকা অভিনেতা হতে হয়।

তারপর সে মাথা নাড়তে নাড়তে প্রথমে মৃদুভাবে চুকচুক করলো, তারপর তার খুশির মাত্রা বেড়ে যেতেই হাসিতে ফেটে পড়লো। তার ভুড়ি থেকে শুরু করে শরীরের প্রতিটা অঙ্গ হাসির দমকে কাঁপতে শুরু করলো। তারপর হঠাৎ হাসি থামিয়ে পাশের প্রস্রাবখানায় ঢুকলো। প্রথমে একটু নীরবতা, তারপর জলপ্রপাত থেকে নীলনদের উপর পানির প্রবাহ পড়ার মতো শব্দ শুরু হল। বেশ কিছুক্ষণ এরকম চলার পর এটন ফিরে এলো।

তোমার ভাগ্য ভালো বন্ধু যে, আমি সময়মত প্রস্রাবখানায় পৌঁছতে পেরেছিলাম, আর নয়তো রাজা বিওনের মত তুমিও ডুবে মরতে।

তুমি কীভাবে জানলে যে, বিওন পানিতে ডুবে মরেছে?

তুমি সামনে যা দেখছো, তা ছাড়াও আমার অন্য কান আর চোখ আছে।

এতোই যদি জানো তবে মিনোজের সম্পদ সম্পর্কে কিছু বল?

সে অনুতপ্তভাবে মাথা নেড়ে বললো, এ-সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না। তুমি হয়তো জানো।

আমি শুধু জানি যে, তুমি ভুল বলেছিলে।

কী ধরনের ভুল সেটা?

তুমি বলেছিলে এই সম্পদের পরিমাণ এক লাখ হবে, তাই না? সে মাথা নেড়ে সায় দিল।

পরিমাণটা দুঃখজনকভাবে ভুল বলেছিলে।

সে বললো, একথা প্রমাণ করতে পারবে?

আমি তাকে নিশ্চয়তা দিয়ে বললাম, এর চেয়েও ভালো কিছু বলতে পিরবো, এটন। আমি তোমাকে এটি ওজন করতে দেবো। যাইহোক প্রাসাদ ছেড়ে যাওয়ার আগে আমি ফারাওকে একটা বার্তা পাঠাতে চাই।

কামরায় এককোণে রাখা লেখার সরঞ্জামের দিকে দেখিয়ে এটন বললো, তুমি তোমার বার্তাটা লিখে ফেল, সন্ধ্যার আগেই ফারাও তার হাতে এটা পাবেন।

আমার বার্তাটি ছিল ছোট আর সাংকেতিক ভাষায় লেখা। এটনের হাতে বার্তাটা দিয়ে তাকে বললাম, কিছু মনে করো না। প্রায় দুই সপ্তাহ যাবত আমি স্নান করিনি আর পোশাক বদলাইনি। আমাকে এখনি নিজের ঘরে একটু পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হতে হবে।

নিজের ঘরে পৌঁছাবার সাথে সাথে আমি একজন ক্রীতদাসকে রাজকীয় জেনানা মহলে পাঠালাম রাজকুমারিদের কাছে একটা বার্তা পৌঁছাতে।

মাত্র আমি উষ্ণ পানির চৌবাচ্চায় পা দেব, ঠিক তখনই দুই রাজকুমারি মরুর খামসিন ঝড়ের বেগে এসে পৌঁছাল। এই পৃথিবীতে একমাত্র তাদের সামনেই আমি পোশাক না পরা অবস্থায় দাঁড়াই। আর আমার ক্রীতদাসদের সামনে, ওরা অবশ্য আমার মতোই খোঁজা।

এখন তেহুতি আর বেকাথা আমার মার্বেল পাথরের স্নানের চৌবাচ্চার কিনারায় পা ঝুলিয়ে বসলো। বেকাথা তার ছোট্ট সুন্দর পাদুটো দোলাতে দোলাতে অনুযোগ করলো, তুমি যাওয়ার পর সবকিছু একেঘেয়ে লাগছিল। কী এমন তুমি করছিলে যে এতো দেরি হল ফিরতে তোমার? এখন কথা দাও, এরপর কোথাও গেলে আমাদের সাথে নিয়ে যাবে। এই কঠিন প্রতিজ্ঞা এড়াতে আমি গরম পানি মাথায় ঢালতে শুরু করলাম।

এবার তেহুতি কথা শুরু করলো, আমাদের জন্য কোনো উপহার এনেছো তায়তা? নাকি আমাদের কথা ভুলে গিয়েছিলে? বড়বোন হিসেবে খাঁটি জিনিসের মূল্য সে ঠিকই বুঝে।

আমি উত্তর দিলাম, অবশ্যই এনেছি। কী করে আমি আমার ছোট্ট দুই রাজকুমারির কথা ভুলে যেতে পারি। আমার কথা শুনে দুজনেই খুশিতে হাততালি দিয়ে উঠলো।

বিকাথা কিচমিচ করে বললো, দেখাও।

যাও পাশের কামরায় কৌচের উপর থেকে আমার ব্যাগটা নিয়ে এসো। বেকাথা একছুটে চলে গেল, তারপর নাচতে নাচতে চামড়ার ব্যাগটা হাতে ঝুলাতে বুলাতে ফিরে এলো।

তারপর ব্যাগটা কোলে নিয়ে মার্বেলের মেঝেতে আসন গেড়ে বসলো।

আমি বললাম, খোল! আমার রাজকুমারিদের কথা মনে রেখেই আমি তামিয়াত দুর্গে বন্দী মিনোয়ান সেনাকর্মকর্তাদের কাছ থেকে পাওয়া অলংকার থেকে দুটি অলংকার বেছে নিয়েছিলাম।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, দেখোত লাল কাপড়ে মোড়া একটা জিনিস আছে কি না?

হ্যাঁ, আছে তায়তা, এটা কি আমার? লালটা কি আমার জন্য এনেছ?

হ্যাঁ, অবশ্যই তোমার জন্য।

ছোট কাপড়ের পুটলিটা খুলতে গিয়ে উত্তেজনায় ওর হাত কাঁপছিল। সোনালি হারটা তুলে ধরতেই তার চোখ খুশিতে ঝিকমিক করে উঠলো। ফিসফিস করে সে বলে উঠলো, এতো সুন্দর জিনিস আমি কখনও দেখিনি।

হারটি থেকে ছোট ছোট দুটি মূর্তি ঝুলছে। ছোট হলেও মূর্তিদুটোর খুঁটিনাটি সবকিছু পরিষ্কার বুঝা যাচ্ছে। বড়টি ছিল একটি আক্ৰমণদ্যোত ষাঁড়ের মূর্তি। শিং দুটো বাঁকা করে আক্রমণের ভঙ্গিতে মাথা নোয়ান। সবুজ পাথরের ছোট ছোট দুটো চোখ। বঁড়টি একটি সুন্দর মেয়ের মূর্তিকে আক্রমণ করছিল। ভয়ংকর শিংদুটোর আওতার বাইরে মেয়েটি নাচছে। মাথায় ফুলের মালা আর বুকে দুটো লাল রুবি। মাথা পেছনে হেলিয়ে মেয়েটি হাসছিল।

হারটা দুই হাতে দোলাতে দোলাতে বেকাথা বললো, মেয়েটি এতো দ্রুত ছুটছে যে ষাঁড়টি কখনও তাকে ধরতে পারবে না।

ঠিক বলেছ তুমি। ভয়ঙ্কর বিপদের বিপরীতে মেয়েটি হল সৌন্দৰ্য্য। তুমি এটা পরলে বিপদ তোমাকে ছুঁতে পারবে না। এটা তোমাকে সবধরনের বিপদ থেকে রক্ষা করবে। ওর হাত থেকে হারটা নিয়ে ওর গলায় পরিয়ে পেছনের হুকটা লাগিয়ে দিলাম। সে নিচের দিকে তাকিয়ে কাঁধে ঝাঁকুনি দিতেই মূর্তিদুটো নেচে উঠলো। হেসে উঠতেই তাকে আরও সুন্দর দেখালো।

তেহুতি এতোক্ষণ ধৈর্য ধরে চুপ করে বসেছিল। আমি একটু অপরাধবোধ করে তার দিকে ফিরে বললাম, রাজকুমারি, তোমার উপহারটা ঐ নীল কাপড়ে মোড়ানো আছে।

সাবধানে কাপড়ের ভাঁজটা খুলতেই একটা আংটি ঝিকমিক করে উঠলো। সে দম আটকে চেঁচিয়ে উঠলো। এতো উজ্জ্বল জিনিস আমি কখনও দেখিনি।

আমি বললাম, এটা তোমার মধ্যমায় পর।

এটা খুব বড়। খুলে যায়।

তার কারণ এটা একটা বিশেষ ধরনের পাথর। তুমি এটা কোনো পুরুষকে দেখাবে না, শুধু...

শুধু কি?

শুধু যদি তুমি চাও সে তোমার প্রেমে পড়ক। আর নয়তো এটা তোমার হাতের তালুতে লুকিয়ে রাখবে। মনে রেখো এর জাদু শুধু একবারই কাজে আসবে। কাজেই খুব সাবধানে এটা কাউকে দেখাবে।

সে আঙুল দিয়ে আংটিটা শক্ত করে চেপে ধরে রাখলো। তারপর দৃঢ়কণ্ঠে উত্তর দিল, আমি চাই না কোনো পুরুষ আমাকে ভালোবাসুক।

কেন?

কারণ, ওরা শরীরে একটা বাচ্চা ঢুকিয়ে দিতে চেষ্টা করে। আর একবার বাচ্চাটা ভেতরে ঢুকলে আর বের হতে চায় না। আমি হেরেমে অনেক মহিলাকে চিৎকার করে আর্তনাদ করতে শুনেছি। আমি এরকম করতে চাই না।

আমি মৃদু হেসে বললাম, একদিন তুমি তোমার মত বদলাবে। তবে এই পাথরের আরও কিছু গুণের কারণে এটা বিশেষ ধরনের হয়েছে। বেকাথা বলে উঠলো, বল, কী এমন বিশেষ গুণ আছে এটার তায়তা?

একটা গুণ হল এটা পৃথিবীর সবচেয়ে শক্ত জিনিস। কোনো কিছু দিয়ে এটা কাটা যায় না, আর সবচেয়ে ধারালো ব্রোঞ্জের ড্যাগার দিয়েও এটার গায়ে আঁচড় কাটা যায় না। এজন্য এটাকে বলা হয় হীরা–সবচেয়ে কঠিন জিনিস। পানিতে ভিজে না। তবে যে মেয়ে এটা পরবে তার গায়ে এটা জাদুর মতো লেগে থাকবে।

সন্দেহের সুরে তেহুতি বললো, তোমার কথা আমি বিশ্বাস করি না তায়তা। এটা তোমার বানানো আরেকটা গল্প।

ঠিক আছে, দেখো আমার কথা ঠিক হয় কি না। তবে মনে রেখো, যদি তুমি কাউকে সত্যিকার ভালোবাস আর চাও যে সেও তোমাকে সারাজীবন ভালোবাসুক, তাকে ছাড়া আর কোনো পুরুষকে এটা দেখাবে না। জানি না কেন তাকে একথা বললাম, তবে মেয়েদুটো আমার কাছে গল্প শুনতে পছন্দ করে আর আমি কখনও তাদের হতাশ করি না।

টাব থেকে উঠে গা মুছার জন্য আমার প্রধান দাস রুস্তিকে ডেকে একটা তোয়ালে আনতে বললাম।

এবার তেহুতি অনুযোগ করে বললো, তুমি আবার চলে যাচ্ছো তায়তা। এখন সে বেশ বড় হয়েছে আর একজন সাবালিকার মতোই ভেবেচিন্তে কথা বলতে শিখেছে। মাত্র এক ঘন্টার জন্য এসে আবার চলে যাচ্ছ। এবার হয়তো চিরদিনের জন্য চলে যাচ্ছ। তার চোখে পানি চলে এসেছে।

আমি তোয়ালেটা ফেলে তাকে জড়িয়ে ধরে বললাম, না! না! এটা সত্য নয়। আমি শুধু পূর্ব তীরে তোমার বাবার শূন্য সমাধি পর্যন্ত যাচ্ছি।

বেকাথা বললো, যদি এ কথা সত্যি হয়ে থাকে, তাহলে আমাদেরকেও সাথে নিয়ে চল।

কথাটা শুনে ভেবে দেখলাম প্রস্তাবটা মন্দ নয়। ওদের মতো আমারও ভালো লাগবে।

ছদ্ম অনিচ্ছা দেখিয়ে বলো, একটা সমস্যা আছে। আমরা খুব গোপন একটা কাজ করতে যাচ্ছি। তোমাদেরকে কথা দিতে হবে যা দেখবে তা কাউকে বলতে পারবে না।

কথাটা শুনে বেকাথার দুচোখ জ্বলজ্বল করে উঠলো, সে বললো, গোপন ব্যাপার! সমস্ত দেবতার নামে আমি শপথ করছি তায়তা, কাউকে কিছু বলবো না।

.

দুই রাজকুমারি, এটন আর আমি যখন ফারাও ম্যামোজের সমাধির ফটকের কাছে পৌঁছলাম, তখনও রত্নবোঝাই জাহাজ তিনটি এর কাছেই জেটিতে বাঁধা ছিল।

আমার অনুপস্থিতিতে জারাস ওর লোকজন নিয়ে কাজ করে চলছিল। আশেপাশের পাহাড়গুলো থেকে যেন আমাদেরকে না দেখা যায়, সেজন্য ওরা সমাধির চারপাশ ঘিরে নলখাগড়ার বেড়ার পর্দা দিয়ে ঢেকে রেখেছিল। আমার ইচ্ছা ছিল রাত জেগে সমস্ত জাহাজগুলো থেকে রতুগুলো নামিয়ে ফেলা। রাতের অন্ধকারের আড়ালে হাইকসো গুপ্তচরেরা এসে উঁকিঝুঁকি দিতে পারে। তাছাড়া আমাদেরকে মশাল জ্বালিয়ে কাজ করতে হবে, কাজেই গোপনীয়তা রক্ষার জন্য পর্দা খুবই জরুরী।

তামিয়াতে আমি যে অভিজ্ঞতা লাভ করেছিলাম, তা কাজে লাগিয়ে এখনকার মাল খালাসের বিষয়টা পরিকল্পনা করলাম। দিলবার আর তার লোকজনকে প্রথম জাহাজের ডেক থেকে কাঠের তক্তা খুলে বারকোশের মত কাঠামো বানাতে বললাম। আট হাত চওড়া এই কাঠামোটি জাহাজের খোলের মুখে এঁটে যাবে। তারপর প্রতিটি জাহাজের খোলের মুখের ঠিক উপরের ডেকে তেপায়া টুল আর কপিকল স্থাপন করলাম। সেখান থেকে আমার লোকেরা ভারি কাঠের বারকোশগুলো নিচে নামিয়ে জাহাজের খোলে ঢুকালো। আর খোলের ভেতরে থাকা অন্য দল সিন্দুকগুলো কাঠের বারকোশের উপর সাজিয়ে রাখলো।

বিশটা করে সিন্দুক এভাবে খোল থেকে বের করে উপরে ডেকে তোলা হল, তারপর সেখান থেকে ঝুলিয়ে জেটিতে নামিয়ে রাখা হল।

তেহুতি জিজ্ঞেস করলো, এই সিন্দুকগুলোতে কী আছে তায়তা? আমি নাকে হাত রেখে খুব গোপনীয়তার ভাব দেখিয়ে বললাম, এটাই সবচেয়ে বড় রহস্য। তবে শিঘ্রই আমি তোমাদেরকে দেখাবো কী আছে এগুলোর ভেতরে। আর একটু ধৈর্য ধরে অপেক্ষা কর।

বেকাথা আমাকে মনে করিয়ে দিল, আমি কিন্তু বেশিক্ষণ ধৈর্য ধরতে পারবো না।

সার বেঁধে থাকা অনেক মানুষ সিন্দুকগুলো বারকোশ থেকে তুলে নিল। জেটি থেকে শুরু করে মানুষের সারি সমাধির প্রবেশ পথ দিয়ে চারধাপ সিঁড়ি নেমে রং করা সুসজ্জিত সুড়ঙ্গে ঢুকলো, তারপর বিশাল তিনটি কামরা পার হয়ে চারটি ধনাগারে পৌঁছলো। ফারাওয়ের শূন্য সমাধির চারপাশ ঘিরে ধনাগারগুলো স্থাপন করা হয়েছিল। বিশাল একটি পাহাড় কেটে আমি বিশ বছর ধরে দুই হাজার শ্রমিক লাগিয়ে এই প্রশস্ত দালানটি নির্মাণ করেছিলাম। কাজটি করতে পেরেছি বলে আমি এখনও গর্ববোধ করি।

দুই রাজকুমারিকে উদ্দেশ্য করে আমি বললাম, এই যে মেয়েরা, তোমরা আমাকে আর এটন চাচাকে সাহায্য করতে পারো। তোমরা দুজনেই গুণতে আর লিখতে পারো, যা এই বোকা লোকগুলোর একশো জনের মধ্যে একজনও পারে কি না সন্দেহ। কথাটা বলে আমি মাথা ঝাঁকিয়ে কাজ করা সারিবদ্ধ অর্ধনগ্ন লোকগুলোর দিকে দেখালাম।

এবার দুই বালিকাই হিসাব রক্ষকের কাজে লেগে পড়লো, যেন এটা একটা খেলা।

আমার নির্দেশ অনুযায়ী জারাস প্রথম ধনাগারে দুটো ভারী দাড়িপাল্লা স্থাপন করেছিল। আমি আর এটন এই দুটো পাল্লার ব্যবস্থাপনায় বসলাম। একটা একটা সিন্দুক পাল্লায় ঝুলাতেই আমি ওজনটা উচ্চারণ করতেই মেয়েরা লিখে রাখতে শুরু করলো। বেকাথা এটনের সাথে আর তেহুতি আমার সহকারী হিসেবে কাজ করতে লাগলো। ওরা একটা একটা সিন্দুকের ওজন একটা লম্বা প্যাপিরাস কাগজে লিখতে লাগলো আর দশটা সিন্দুকের ওজন হতেই সবগুলোর ওজন যোগ করে লিখতে লাগলো।

প্রথম কোষাগারে মোট ২৩৩ লাখ খাঁটি রূপা রাখা হল। এরপর আমি লোকজনদের একঘন্টা বিশ্রাম নিয়ে খাওয়াদাওয়া সেরে নিতে উপরে পাঠিয়ে দিলাম। আমরা একা হবার পর আমি আমার প্রতিজ্ঞামতো মেয়েদেরকে সিন্দুকের ভেতরে যে ধনরত্ন আছে তা দেখালাম। একটা সিন্দুকের ঢাকনা খুলে একটা রূপার পিণ্ড দেখার জন্য ওদের হাতে তুলে দিলাম।

বেকাথা ওরা গলার হারটায় হাত বুলাতে বুলাতে বললো, এটা আমার গলার হারের মত সুন্দর নয়।

চারপাশের সিন্দুকগুলোর দিকে তাকিয়ে তেহুতি জিজ্ঞেস করলো, এগুলো সব তোমার তায়তা?

আমি গম্ভীরভাবে উত্তর দিলাম, এগুলো সব ফারাওয়ের। আমার কথা শুনে সে মাথা নাড়লো। তারপর চারপাশে চোখ বুলিয়ে পরিমাণটা আন্দাজ করতে লাগলো। গণনা শেষ হওয়ার পর তার ঠোঁটে মৃদ হাসি দেখা গেল। তারপর সে বললো, আমরা তোমার কাজে খুবই খুশি তায়তা!

.

লোকজন আবার ফিরে এলে আবার ওদেরকে কাজে লাগালাম। ওরা

দাঁড়িপাল্লাটা দ্বিতীয় কোষাগারে নিয়ে চললো। এটা আগেরটার চেয়ে একটু ছোট, এতে আমরা আরও ২১৬ লাখ রূপা রাখলাম।

এমন সময় জারাস জেটি থেকে ফিরে এসে জানাল প্রথম দুটি তিনতলা ট্রাইরেম জাহাজের মাল সম্পূর্ণ খালাস করা হয়ে গেছে। এখন কেবল শেষ জাহাজে কিছু রূপা রয়ে গেছে।

সে একটু সতর্কসুরে বললো, ভোর হয়ে আসছে তায়তা। লোকজন সবাই ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। আসলে কাজ করতে করতে আমার খেয়ালই ছিল না যে কখন রাত শেষ হয়ে এসেছে। আমিও ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম, তবে অধিকাংশ লোকের তুলনায় আমার কর্মক্ষমতা অনেক বেশি ছিল।

তোমরা সবাই বেশ ভালো কাজ করেছ জারাস। তবে আমি তোমাদেরকে আরেকটু থাকতে বলবো। এখন জেটিতে গিয়ে দেখতে চাই আর কতটুকু কাজ বাকি আছে।

আর তখনই আমি একটা মারাত্মক ভুল করে ফেললাম।

পেছন ফিরে দেখলাম তেহুতি টুলে বসে মাথা নুইয়ে প্যাপিরাস কাগজ নিয়ে হিসেবের কাজ করছিল। একমাথা সোনালি চুল ঢেউয়ের মত নিচে নেমে তার মুখ ঢেকে ফেলেছিল। কাজের চাপে সে চুল আঁচড়াবারও সময় পায় নি।

তাকে বললাম, তেহুতি, তুমি একজন ক্রীতদাসির মতো অনেক পরিশ্রম করেছ। এখন আমার সাথে উপরে চল। রাতের শীতল বাতাসে একটু সতেজ হয়ে নেবে।

তেহুতি উঠে দাঁড়াল। মাথা ঝাঁকিয়ে মুখ থেকে চুল সরিয়ে জারাসের দিকে তাকাল। জারাসও তার দিকে তাকাল।

মশালের আলোয় আমি দেখলাম তেহুতির সবুজ চোখের মনিদুটো বড় হয়ে উঠেছে। আর একই সাথে শুনতে পেলাম অন্ধকারের দেবতার হাসি।

ওরা একজোড়া মার্বেল পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল।

আমি তেতির চোখ দিয়ে জারাসের দিকে তাকালাম। যদিও আমি পুরুষের চেয়ে একজন নারীর সৌন্দর্য্যের সঠিক পরিমাপ করতে পারি, তবে আজ প্রথম লক্ষ্য করলাম যে, জারাস সাধারণের চেয়ে অনন্য। তার বংশ পরিচয় তেমন আহামরি না হলেও তার চতুর্দিক ঘিরে একধরনের কর্তৃত্বব্যঞ্জক আভা রয়েছে। তার ভাবভঙ্গি এবং আচরণ অভিজাত শ্রেণীর।

আমি জানি তার বাবা থিবসের একজন বণিক, নিজ প্রচেষ্টায় বিশাল ভাগ্য গড়ে তুলেছেন। ছেলেকে মানুষ করতে যথাসাধ্য করেছেন। জারাস বুদ্ধিমান। এবং রসজ্ঞান সম্পন্ন। একজন ভালো সৈনিক। তারপরও তার বংশ পরিচয়ের কারণে সে ত্যামোস রাজবংশের একজন রাজকুমারির সমকক্ষ হতে পারে না। যাইহোক ফারাও সিদ্ধান্ত নেবেন কে হবে রাজকুমারির উপযুক্ত পাত্র, তবে

আমার কাছ থেকে অবশ্যই এ বিষয়ে উপদেশ নেবেন।

অতিদ্রুত আমি ওদের দুজনের মাঝে দাঁড়িয়ে তাদের চোখাচোখি হওয়ার সুযোগটা ভেঙে দিলাম। তেহুতি এমনভাবে আমার দিকে তাকাল যেন আমি একজন আগন্তুক, যাকে সে আগে কখনও দেখেনি। তার হাত ছুঁতেই সে কেঁপে উঠে এবার আমার চোখে চোখ রাখলো।

আমি বললাম, এসো আমার সাথে তেহুতি। তারপর তার মুখের দিকে লক্ষ্য করলাম, সে অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে আমাকে বললো,

হ্যাঁ, অবশ্যই যাবো তায়তা। ক্ষমা কর, আমি একটু অন্যমনষ্ক হয়ে পড়েছিলাম। চল যাই।

আমি পথ দেখিয়ে তাকে কোষাগার থেকে বের করে আনলাম, জারাসও অনুসরণ করলো। তার প্রতিটি পদক্ষেপে মনে হচ্ছিল যেন, সে একটা ঘোরের মধ্যে রয়েছে। আমি তাকে ভালোকরেই জানতাম, তবে তার এরকম অবস্থা কখনও দেখিনি।

আবার আমি সেই তরুণ যুগলের মাঝখানে বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে বললাম, তুমি নয় ক্যাপ্টেন জারাস। তুমি দাঁড়িপাল্লাটা পরের কামরায় নেবার ব্যবস্থা কর। তারপর তোমার লোকজন একটু বিশ্রাম নিতে পারে।

কেবল এখন বুঝতে পারলাম এদের দুজনের এর আগে কখনও দেখা হয়নি। তেহুতি রাজপ্রাসাদের হেরেমের ছোট্ট পৃথিবীতে বিচরণ করতো। সেখান থেকে সে উপযুক্ত সহচরী পরিবেষ্টিত হয়ে বাইরের জগতে পা রাখতো। সম্ভবত আমিই ছিলাম সেই প্রতিরক্ষামূলক শৃঙ্খলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

একজন সুন্দরী হিসেবে তার কুমারীত্ব রাজা এবং রাজ্যের জন্য অমূল্য। হয়তো কোন রাজকীয় অনুষ্ঠানের সময় দূর থেকে জারাস তাকে দেখেছে। তবে সে কখনও রাজপ্রাসাদের রক্ষীবাহিনীর দায়িত্বে ছিল না। তার সমস্ত সামরিক জীবন কেটেছে দূর রণাঙ্গণে কিংবা সামরিক প্রশিক্ষণে। আমি নিশ্চিত আজকের আগে এতো কাছ থেকে রাজকুমারির অসামান্য সৌন্দর্য্য দেখার সুযোগ তার কখনও হয়নি।

আমি তাকে দ্রুত নির্দেশ দিলাম, তোমার লোকজনদের খাওয়া দাওয়া করতে বল আর প্রত্যেককে অতিরিক্ত এক মগ বিয়ার দাও। আমি আবার নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ওদেরকে বিশ্রাম নিতে বল। একথা বলে আমি দুই রাজকুমারিকে নিয়ে উপরে চললাম। জারাস পেছন থেকে আমাদের দিকে তাকিয়ে রইল।

.

সমাধিগর্ভের ফটক থেকে বের হয়ে একটু থেমে পূর্বদিকে তাকিয়ে দেখতে পেলাম, ভোরের গোলাপি লাল আভা পুব আকাশে ফুটে উঠেছে। তারপর নিচে তাকিয়ে দেখলাম জারাস ঠিকই বলেছিল, সমস্ত লোকজন পরিশ্রান্ত হয়ে পড়েছে।

দ্রুত পায়ে তৃতীয় জাহাজটির সিঁড়ি বেয়ে ডেকে উঠতেই নদীর ওপার থেকে তুর্যধ্বনী শোনা গেল, আর সেই সাথে দ্রুতবেগে এগিয়ে আসা রথের চাকার শব্দও শোনা গেল। আমি জাহাজের রেলিং ধরে সামনে অন্ধকার নদীর তীরের দিকে তাকালাম।

অগুণতি মশালের আলো আর হট্টগোল থেকে বুঝা গেল ফারাও ফিরে এসেছেন। আমার বার্তা পেয়ে তিনি থিবসে ফিরেছেন। রাজার কাছাকাছি হলেই আমার বুক খুশিতে নেচে উঠে। আমি দ্রুত জাহাজের কাঠের সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে নামতে আরও মশাল জ্বালতে আর রাজকীয় সম্মানের জন্য সৈন্যদের প্রস্তুত হতে নির্দেশ দিলাম।

একটুপরই অনুচরদের অনেক পেছনে ফেলে অন্ধকার ভেদ করে ফারাও নিজে রথ চালিয়ে উপস্থিত হলেন। আমাকে দেখার সাথে সাথে উল্লাসে চিৎকার করে আমাকে সম্ভাষণ জানিয়ে রথের রাশে হেলান দিলেন।

রাশটা তার সহকারীর হাতে ছুঁড়ে দিয়ে চাকা চলন্ত অবস্থায় রথ থেকে একলাফ দিয়ে মাটিতে নেমে বললেন, খুব ভালো লাগছে তায়তা তোমাকে দেখে। অনেক দিন দেখা হয় নি তোমার সাথে। তারপর একজন দক্ষ রথীর মতো মাটিতে পা ফেলে দ্রুত কয়েক পদক্ষেপে আমার কাছে পৌঁছালেন। সমস্ত লোকজনের সামনেই আমাকে বুকে জাপটে ধরে শূন্যে তুললেন। তার ছেলেমি দেখে আমার হাসি পেল।

একেবারে সত্যি কথা মহামান্য। অনেক দিন হয়ে গেল। এক ঘন্টা আপনি না থাকলে মনে হয় এক সপ্তাহ সূর্য উঠেনি।

এবার তিনি আমাকে মাটিতে নামিয়ে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালেন। দেখলাম তার সারা দেহ ধূলিধূসরিত আর ময়লায় মাখামাখি হয়ে রয়েছে। বুঝা যাচ্ছে কষ্টকর একটি অভিযান থেকে সদ্য এসেছেন। তবে তার মাঝেও ফারাওয়ের মর্যাদা পরিস্ফুট হয়ে রয়েছে। পাশেই অপেক্ষারত বোনদের দেখে একের পর এক দুজনকেই বুকে জড়িয়ে আদর করার পর আবার আমার কাছে এলেন।

জেটিতে বাঁধা বিশাল তিনতলা জাহাজ তিনটে দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, এগুলো কি জাহাজ? মাস্তুল আর দাঁড় ছাড়াই এগুলো আমার দেখা যে কোনো জাহাজের চেয়ে দ্বিগুণ বড় মনে হচ্ছে। এগুলো কোথায় পেলে তায়তা? তাকে আমি যে বার্তা পাঠিয়েছিলাম তা ছিল সাংকেতিক আর সেখানে বিশদ বর্ণনা ছিল না। যাইহোক আমার উত্তরের জন্য অপেক্ষা না করে সাথে সাথে আবার বললেন, ষণ্ডা-গুণ্ডার মতো চেহারার ওই লোকগুলোর পরিচয় কী? আমি তোমার সাথে মাত্র কয়েকজন লোক দিয়েছিলাম, আর এদিকে তুমি দেখছি তোমার নিজস্ব ছোট্ট একটা সেনাবাহিনী নিয়ে ফিরে এসেছ তায়তা।

তিনি জেটি থেকে সমাধির ফটক পর্যন্ত সারিবদ্ধ দাঁড়িয়ে থাকা লোকগুলোর দিকে তাকালেন। তার কাছাকাছি যারা ছিল তারা কাঁধের বোঝা মাটিতে নামিয়ে নতজানু হয়ে তার প্রতি সম্মান দেখাতে শুরু করলো।

এদের চেহারা দেখে ভুল বুঝবেন না, মহামান্য। এরা ষণ্ডা-গুণ্ডা নয়। এরা মিসরের সাহসী তোক আর প্রকৃত যোদ্ধা।

আবার জাহাজ তিনটির দিকে তাকিয়ে বললেন, কিন্তু এই জাহাজগুলোর বিষয়টা কী? এগুলো সম্পর্কে কী বলবে?

আমি তাকে অনুরোধ জানিয়ে বললাম, দয়া করে আমার সাথে আসুন, নিরালায় বসে সবকিছু খুলে বলছি।

ঠিক আছে তায়তা। তুমিতো আবার সবসময় গোপনীয়তা পছন্দ কর, তাই না? তারপর তিনি সমাধির প্রবেশপথের দিকে এগিয়ে চললেন। আমিও ফারাও ত্যামোসকে অনুসরণ করে তার বাবার অনুমিত সমাধির দিকে এগোলাম।

প্রথম কোষাগারে ঢুকে কামরাভর্তি সারি সারি সাজানো কাঠের বাক্সগুলোর দিকে তাকালেন। তবে কোনো মন্তব্য করলেন না।

দ্বিতীয় কামরায় যাওয়ার আগে কেবল বললেন, আশ্চর্য, সমস্ত বাক্সের গায়ে সর্বাধিরাজ মিনোজের মার্কা মারা রয়েছে দেখছি। তৃতীয় কামরায় পৌঁছতেই এটন তাকে দেখে হাঁটুগেড়ে সম্মান জানাল।

আরও অবাক লাগছে তায়তা, আমার রাজপ্রসাদের পরিচালকও দেখছি তোমার এই গোপন ক্রিয়াকলাপের সাথে নিজেকে জড়িয়েছেন। তারপর ফারাও একটা কাঠের বাক্সের উপর বসে দুপা সামনে ছড়িয়ে দিয়ে বললেন, এবার বল তায়তা। সবকিছু খুলে বল।

আমি বললাম, তার চেয়ে ভালো হবে জিনিসটা আপনাকে দেখালে। তারপর আমি একটা বাক্সের ডালা খুলে চকচকে রূপার একটা পিণ্ড বের করে এক হাঁটু গেড়ে বসে রূপার পিন্ডটা তার হাতে তুলে দিলাম। তিনি জিনিসটা আমার হাত থেকে নিয়ে আস্তে আস্তে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখলেন। আঙুলের ডগা দিয়ে ধাতুর উপর ছাপমারা চিহ্নটার উপর বুলিয়ে দেখলেন। ক্রিটের প্রতীক আক্রমণোদ্যত ষাঁড়ের মূর্তি আঁকা রয়েছে।

তারপর মৃদু কণ্ঠে বললেন, জিনিসটার চেহারা আর ওজন দেখেতো মনে হচ্ছে আসল রূপা। আসলেই কি তাই?

অবশ্যই এটা তাই ফারাও। এখানে আপনি যে-কটি সিন্দুক দেখছেন তার সবকটি এই রূপার বাটে ভরা।

আবার বেশ কিছু সময় চুপ করে রইলেন। তার ধূলিধূসরিত মুখের নিচে আমি দেখতে পেলাম প্রচণ্ড আবেগ। তারপর রুদ্ধকণ্ঠে বললেন।

এখানে কতটুকু আছে তাতা? এবার তিনি আমার সেই ছোটবেলাকার পুরোনো নাম ব্যবহার করলেন। যখনই আমার প্রতি ভালোবাসা আর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতেন তখন এই নামে ডাকতেন।

আমিও আবার তার শিশুকালের নামে ডেকে বললাম, প্রত্যেকটা সিন্দুক ভরা, মেম। আমি ছাড়া আর কারও এই নামে ডাকার অধিকার নেই।

এসব কথা ছেড়ে আসল কথা বল তায়তা। বল কতটুকু রূপা তুমি আমার জন্য এনেছ? তার গলায় বিস্ময়ের সুর।

আমি উত্তর দিলাম, এটন আর আমি দুজনে মিলে এর বেশিরভাগ অংশ ওজন করেছি।

এতে আমার কথার উত্তর পাওয়া গেল না তাতা।

আমরা প্রথম দুটি জাহাজের পুরো অংশ আর তৃতীয়টার কিছু অংশ ওজন দিয়েছি। হিসেব করে মোট চার শো ঊনপঞ্চাশ লাখ পাওয়া গেছে। সম্ভবত আরও এক লাখের ওজন নিতে হবে। অবশ্য দেড়লাখও হতে পারে।

আবার তিনি চুপ করে মাথা নেড়ে ভ্ৰ কুঁচকালেন। তারপর বললেন, প্রায় ছয়শো লাখ। এতে থিবসের চেয়ে দ্বিগুণ বড় একটা নগরী গড়ে তোলা যাবে এর সমস্ত মন্দির আর প্রাসাদসহ।

একমত হয়ে আমিও মৃদুকণ্ঠে বললাম, আর দশ হাজার জাহাজ নির্মাণ করার পরও বেশ কয়েকটা যুদ্ধের খরচ যোগানোর মতো যথেষ্ট রূপা রয়ে যাবে মহামান্য ফারাও। এই পরিমাণ সম্পদ দিয়ে আপনি বর্বর হাইকসোদের কবল থেকে মিসরকে ফিরিয়ে আনতে পারবেন।

বিষয়টা উপলব্ধি করতে পেরে ফারাও একমত হলেন, আবেগে তার কণ্ঠস্বর উঠানামা করতে লাগলো, তুমি আমাকে প্রয়োজনীয় অর্থ দিয়েছ, যা দিয়ে আমি বিওন আর তার পুরো শক্তি ধ্বংস করতে পারবো।

এটন উঠে আমাকে আড়াল করে ফারাওয়ের সামনে দাঁড়িয়ে বললো, আপনি অনেক দেরি করে ফেলেছেন ফারাও। হাইকসোর বিওন ইতোমধ্যেই পানিতে ডুবে মরেছে। তারপর এক পাশে সরে গিয়ে আমার দিকে আঙুল তুলে বললো, তায়তা তাকে মেরে ফেলেছে।

এবার ফারাও আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, এটন যা বললো তা সত্যি? দেশের জন্য এতোকিছু করার পর তুমি বিওনকেও মেরে ফেলেছে?

আমি মাথা ঝুঁকে সায় দিলাম। গর্ব করাটা আমি ঘৃণা করি, বিশেষত আমার নিজের মধ্যে তা নেই।

সবকিছু খুলে বল তায়তা। ঐ দানবকে কীভাবে মারলে তার সবকিছু আমি জানতে চাই।

আমি উত্তর দেবার আগেই এটন মাঝখান থেকে বলে উঠলো, দয়া করে আর একবার আমার কথা শুনুন ফারাও। তারপর সে রাজার সামনে মাথা ঝুঁকিয়ে বললো, এই কাহিনী আপনার পুরো রাজদরবারের সবার শোনা উচিত। জালিম হাইকসোদের উপর পূর্ণ বিজয়ের পর এটা আমাদের গৌরবময় সামরিক ইতিহাসের একটি অংশ হয়ে থাকবে। পরবর্তী প্রজন্ম তাদের সন্তানদের এই কাহিনী শোনাবে। আপনি যদি আমাকে অনুমতি দেন তাহলে আজ বিকেলে একটা বিজয়োৎসবের আয়োজন করবো। এতে রাজ্যের সমস্ত সভাসদ আর রাজপরিবারের সমস্ত সদস্য উপস্থিত থাকবেন। আর এই বিজয়োৎসব আমাদের ইতিহাসের এমন একটি সামরিক বিজয়কে সম্মান জানাবে যা আর কখনও হয়নি।

আপনি ঠিক বলেছেন এটন। তায়তা আমার জন্য এমন একটি কাজ করেছে যার প্রতি যথাযথ সম্মান দেখাতে হবে। এই অভূতপূর্ব সৌভাগ্যের কথা আমি এখুনি আমার সভাসদদেরকে জানাবো। আটজন সভাসদ এখন থিবসেই আছেন। সেনাপতি ক্রাটাস শিঘ্রই উত্তর থেকে আসছেন। আর আপনারা দুজনেই আছেন। আশা করি তিন চার ঘন্টার মধ্যেই রাজদরবারের সমস্ত সদস্যকে একত্রিত করতে পারবো।

ফারাওয়ের পোশাকের বিধ্বস্ত অবস্থা দেখে আমি বললাম, এই সময়ের মধ্যে মাহামান্য ফারাও স্নান সেরে একটু বিশ্রাম নিয়ে নিতে পারবেন।

ঠিক বলেছ তায়তা। তবে গায়ের এই ময়লা কিন্তু পরিশ্রম আর হাইকসোদের রক্তের মূল্যে হয়েছে। যাইহোক দাসদের বল স্নানের পানি গরম করতে।

.

মিসরের পুরো রাজদরবার এক হওয়ার আগেই তৃতীয় তিনতলা জাহাজটি থেকে সমস্ত রূপার বাঁট নামিয়ে এনে দাঁড়িপাল্লায় ওজন করা হয়েছে। বিজয়োৎসবের প্রস্তুতি শেষ করার সাথে সাথে সূর্য অস্ত গেল।

আমি ফারাওকে খবরটা দিতে এলাম যে, অনুষ্ঠানের সমস্ত আয়োজন প্রস্তুত। প্রাসাদে ফিরে যাবার কষ্ট লাঘব করার জন্য আমি তার বাবার সমাধি কক্ষেই তার থাকার জন্য একটি অস্থায়ী ব্যবস্থা করেছিলাম। এই কক্ষে কখনও কোনো মৃতদেহ আনা হয়নি, তাই এখানে মৃত্যুর গন্ধও নেই। শীতল এই জায়গাটি বেশ নীরব আর আরামদায়ক। তার দাসেরা তার জন্য বিছানা আর বহনযোগ্য কিছু আসবাবপত্রের ব্যবস্থা করেছিল।

তবে কোনো ধরনের বিশ্রাম না নিয়ে তিনি কামরায় পায়চারি করছিলেন আর তার তিনজন সচিবকে পত্রের তলিপি করছিলেন। পরিষ্কার পোশাকের উপর বুকে পোলিশ করা ব্রোঞ্জের বর্ম পরেছেন। এর উপরে সোনার কাজ করা। পরিষ্কার আর আঁচড়ানো কোঁকড়ানো চুল দেখে তাকে তার মায়ের মতোই সুন্দর দেখাচ্ছিল।

আমি নতজানু হতেই আমার কাঁধে এক হাত রেখে বাধা দিয়ে বললেন, না তায়তা। আমার একান্ত ইচ্ছা তোমাকে একজন মহান সদস্য করে আমার ভেতরের সভাসদদের একজন করে নেওয়া। তুমি আর আমার সামনে নতজানু হবে না।

আমি আমার নিজস্ব ভূমিকা নিয়ে বললাম, ফারাও অত্যন্ত দয়াশীল। আমি এমন সম্মানের যোগ্য নই।

তিনি একমত হয়ে বললেন, অবশ্যই তুমি তা নও। তবে আমি শুধু আমার সামনে তোমার এই নিচু হওয়াটা বন্ধ করতে চাই। শেঠের দিব্যি দিয়ে বলছি, তোমার এই কাজ দেখলে আমার মাথা ঝিম ঝিম করে। সোজা হয়ে দাঁড়াও তারপর বল মোট কত রূপা আমার জন্য এনেছ।

আমি আপনাকে বলেছিলাম ৬০০ লাখ ফারাও। তবে গণনার পর এই পরিমাণ থেকে বিশ লাখ কম পাওয়া গেছে।

আমার রাজ্য ফিরে পাবার জন্য আর তোমার মাথা উঁচু করার জন্য এটা অনেক বেশি। দরবারের সবাই কি এসেছেন?

সেনাপতি ক্রাটাসসহ সকলেই এসেছেন। তিনি এক ঘন্টা আগে থিবসে পৌঁছেছেন।

আমাকে সেখানে নিয়ে চল।।

সমাধিক্ষেত্রের ফটক থেকে বের হতেই আমি বুঝতে পারলাম এটন আমার সম্মানে কী বিশাল আয়োজন করেছে। উৎসবের পোশাক পরা রাজকীয় রক্ষিবাহিনীর মধ্য দিয়ে ফারাও আমাকে নিয়ে খালের তীরে স্থাপন করা বিশাল তাঁবুর দিকে এগিয়ে চললেন।

সেখানে পৌঁছেই দেখলাম রাজদরবারের সকল সদস্য সেখানে আমাদেরকে স্বাগত জানাতে উপস্থিত রয়েছেন। সেখানে পুরো রাজপরিবার ছিল: তার দুই বোন, তার বাইশজন স্ত্রী আর ১১২ জন উপপত্নী। এছাড়া আরও ছিল অভিজাত সভাসদগণ, সেনাপতি, রাজ্য সদস্য আর অন্যান্য উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারি।

আমরা ঢুকতেই সবাই উঠে দাঁড়াল আর পুরুষরা তাদের তরবারি উঁচু করে আমার আর ফারাওয়ের যাওয়ার পথে একটা খিলান রচনা করলো। একইসাথে তাঁবুর বাইরে বাদকদল বীণা আর বাঁশির সমন্বয়ে একটি বিজয় সঙ্গীতের সুর বাজাতে শুরু করলো।

নির্দিষ্ট আসনে গিয়ে বসতে আমাদের বেশ সময় লাগলো। সমবেত প্রত্যেকে চাচ্ছিল আমাকে স্পর্শ করতে, আমার হাত ধরতে আর আমাকে অভিনন্দন জানাতে।

তাঁবুর ভেতরের দেয়ালের চারপাশে একটু পর পর এক মানুষ সমান উঁচু বিরাট মদের পাত্র সাজানো রয়েছে। সবাই যার যার আসনে বসার পর ভৃত্যরা লম্বা জার থেকে বড় বড় গ্লাসে লাল মদ ভরে দিল। একটা বড় মদ ভর্তি গ্লাস ফারাওয়ের সামে রাখতেই তিনি হাত দিয়ে সেটা ঠেলে সরিয়ে দিয়ে বললেন।

এখানে আমরা তায়তাকে সম্বর্ধনা জানাতে এসেছি। তাকে ভালো লালমদ পরিবেশন কর, আজ গ্লাসে সেই প্রথম চুমুক দেবে।

আমি উঠে দাঁড়িয়ে গ্লাস হাতে নিয়ে ফারাওয়ের উদ্দেশ্যে তুলতেই বিশাল তাঁবুর মাঝে সবার চোখ তখন আমার দিকে ফিরলো।

সকল প্রশংসা ফারাওয়ের। তিনিই আমাদের মিসর। ফারাও আর মিসর ছাড়া আমরা কেবল ধূলোবালু। এছাড়া কোনো কিছুই সুন্দর নয়। তারপর গ্লাসটা ঠোঁটের কাছে নিয়ে বড় একটি চুমুক দিলাম। সমবেত নারীপুরুষ সবাই দাঁড়িয়ে আমার নামে হর্ষধ্বনি দিল। এমনকি ফারাও মৃদু হাসলেন।

আমি অনুভব করলাম আমি যত কম বলবো ওরা ততই আমাকে ভালোবাসবে, কাজেই আমি ফারাওয়ের উদ্দেশ্যে মাথা নুইয়ে সম্মান জানিয়ে আমার আসনে বসে পড়লাম।

ফারাও উঠে দাঁড়িয়ে ডান হাত আমার কাঁধে রেখে পরিষ্কার দৃপ্ত কণ্ঠে তার বক্তব্য শুরু করলেন।

তিনি কেবল বললেন, সম্মানিত রাজ-সদস্য তায়তা আমাকে অনুগ্রহ করেছেন। তিনি আমার এবং মিসরের জন্য বিরাট একটি কাজ করেছেন, এতো বড় কাজ তার আগে আর কেউ করেনি। আমিসহ প্রত্যেক জীবিত মিসরীয় আর পরবর্তী প্রজন্ম জন্ম গ্রহণ করবে তাদের সবার উচিত তাকে সম্মান জানানো।

আমি তাকে রাজকীয় উচ্চমর্যাদাপূর্ণ আসন দিয়েছি। এখন থেকে তিনি মেসিরের জমিদার তায়তা নামে পরিচিত হবেন। একথা বলার পর ফারাও একটু থামলেন। সবাই ভদ্রভাবে নীরব হয়ে রয়েছে। মেসির হচ্ছে নীল নদীর পুবতীরে একটি গ্রাম। থিবস থেকে ৩০ লিগ দক্ষিণে। কতগুলো মাটির কুঁড়েঘর আর সাধারণ কিছু মানুষ সেখানে বসবাস করছে। ফারাও এই ধাঁধাটা নিয়ে সবাইকে কিছুক্ষণ ভাবতে দিলেন।

এছাড়া আমি তাকে চিরকালের জন্য নীলনদের পূর্বতীর আর থিবসের দক্ষিণ দেয়ালের মাঝে যত রাজকীয় জমিদারি আছে সব কিছুর মালিকানা তাকে দিলাম।

এটা শোনার পর সমবেত সবাই অবাক হল আর সকলের মধ্য থেকে একটা গুঞ্জন উঠলো। মেসিরের নদীর তীর থেকে থিবস পর্যন্ত ত্রিশ লিগ জমি হচ্ছে পুরো রাজকীয় জমিদারির মধ্যে সবচেয়ে উর্বর।

তার এই মহৎ কর্ম দেখে আমি হতবাক হলাম। যাইহোক তার ডান হাতে চুম্বন দেবার সময় আমার মনে একটা দুষ্ট চিন্তা জাগলো যে, যেহেতু আমি তাকে পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী রাজা বানিয়েছি কাজেই আমার প্রতি এই অনুগ্রহ দেখিয়ে তিনি কোনো মন্দ কাজ করেননি।

এবার ফারাও রূপার মদের গ্লাসটি হাতে তুলে নিয়ে সমবেত সবার উদ্দেশ্যে বললেন, আমার রানি, আমার রাজকুমার আর রাজকুমারি, সম্মানিত সভাসদ এবং ভদ্রমহিলাগণ, আমি তায়তার প্রতি কৃতজ্ঞতা। তার প্রতি সম্মান দেখিয়ে আর তার দীর্ঘ জীবন কামনা করে এই সুরা পান করছি।

সবাই উঠে দাঁড়িয়ে পেয়ালা হাতে নিয়ে সমস্বরে বলে উঠলো, প্রভু তায়তার প্রতি কৃতজ্ঞতা, সম্মান আর দীর্ঘজীবন কামনা করছি।

মিসরের ইতিহাসে এটা সম্ভবত প্রথম কোন ঘটনা যে, মিসরীয় একজন ফারাও তার এক প্রজাকে সম্মান দেখিয়ে পান করলেন। তারপর তিনি নিজ আসনে বসে সকলকে বসার ইঙ্গিত করলেন।

খ্যাতি সবসময় সবার জন্য আসে না। এটন ভালো তবে শ্রেষ্ঠ নয়। নীল নদের পার্চ মাছের যে কাটাহিন পেটি পরিবেশন করা হয়েছিল, তাতে লবণ কম ছিল। আর মরুভূমির পাখির মাংসের কাবাব বেশি পুড়িয়ে ফেলা হয়েছিল। তাছাড়া রাজকীয় পাঁচককে সে বাহারাত মশলা খুব বেশি ব্যবহার করার অনুমতি দিয়েছিল। আমি হলে কাজটা আরও ভালো হত, যাই হোক মদটি মোটামুটি ভালো হওয়ায় খুব একটা অসুবিধা হয়নি।

ভোজের পর যখন সবাই ফুরফুরে মেজাজে রয়েছে তখন চারণকবির নাম ঘোষণা করার জন্য এটন উঠে দাঁড়াল। আমি মনে মনে ভাবতে লাগলাম এ জায়গায় আমি হলে কোন কবির নাম বলতাম। যেহেতু কবিতার বিষয়বস্তুই আমি নিজে, সুতরাং কবি পছন্দ করার কাজটা স্বভাবতই আমার করার কথা নয়। কাজেই আমি ধারণা করলাম রেজা কিংবা থোইয়াককেই এটন এই সম্মানসুচক কাজের জন্য বেছে নেবে।

কিন্তু সে সকলকে হতবাক করে দিল। প্রথমে সে মিসরের প্রখ্যাত চারণিকদের প্রশংসা করলো, তারপর বললো সে এমন একজনকে বেছে নিয়েছে যে আসল ঘটনার একজন চাক্ষুস সাক্ষী। অবশ্যই এটি একটি উদ্ভট চিন্তা। কখন এই ঘটনার বিবরণ একটা ভালো কাহিনীর উপাদান হিসেবে গুরুত্ব লাভ করেছে?

মহান ফারাও এবং উপস্থিত রাজপরিবারের সম্মানিত নারী সদস্যগণ, অনুগ্রহ করে সামনে এগিয়ে আসুন আর নীল কুমির রক্ষীবাহিনীর একজন সাহসী সেনাকর্মকর্তার কথা শুনুন, যিনি প্রভু তায়তার সাথে সাগরপাড়ি দিয়েছিলেন। তারপর সে একটু থেমে নাটকীয় ভঙ্গিতে বললো, এবার আসছেন ক্যাপ্টেন জারাস।

তাঁবুর পর্দা সরিয়ে জারাস ভেতরে ঢুকে ফারাওয়ের সামনে এসে নতজানু হল। সমবেত সকলেই নিশ্চুপ হয়ে তাকিয়ে রইল, এমনকি অন্যান্যদের মতো ফারাও নিজেও অবাক হলেন। আমি ভেবেছিলাম সমবেত সবার মাঝে একমাত্র আমিই নীল কুমির রক্ষীবাহিনীর ক্যাপ্টেন জারাসকে চিনতাম। তারপর হঠাৎ বিদ্যুৎচমকের মতো একটা কথা আমার মনে এলো।

আমি দ্রুত রাজকুমারী তেহুতির দিকে তাকালাম। সে সেনাপতি ক্রাটাস আর ফারাওয়ের কোষাধ্যক্ষ ম্যাডালেকের মাঝে বসেছিল। এখন সে টুলে বসে একটু সামনের দিকে ঝুঁকে অত্যন্ত আগ্রহসহকারে আর উজ্জ্বল চেহারা নিয়ে জারাসের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। সে এমন বোকা নয় যে, হাততালি দিয়ে বা তেমন কিছু করে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করবে যাতে বুঝা যায় যে, এটনের এই পছন্দে তার হাত আছে। তবে আমি ঠিকই বুঝতে পারলাম এটা তারই কাজ। যে কোনোভাবেই হোক সে এটনকে বাধ্য করেছে এই অদ্ভুত সিদ্ধান্ত নিতে।

আমি কখনও আমার দুই রাজকুমারির কূটনৈতিক দক্ষতাকে ছোট করে দেখিনি, কিন্তু এটা তো রীতিমতো ডাকিনীবিদ্যা। বেকাথার দিকে দৃষ্টি ফিরাবার সাথে সাথে বুঝতে পারলাম সেও এতে জড়িত রয়েছে।

ভোজ টেবিলের উল্টোদিকে বসে সে চোখ ঘুরিয়ে আর নানারকম অঙ্গভঙ্গি করে তার বড়বোনের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করছিল। কিন্তু তেহুতি তাকে পুরোপুরি উপেক্ষা করে চলেছে।

আমার বেশ রাগ হল। আবার জারাসের জন্য করুণাও হল। সে একজন চমৎকার যুবক, ভালো সৈনিক আর বাবা যেমন একজন ছেলেকে ভালোবাসে তেমনি তাকে আমি ভালোবাসতাম। আর এখন সে পুরো দুনিয়ার সামনে নিজেকে হাস্যাস্পদ করে তুলতে যাচ্ছে। হৃদয়হীনা দুই রাজকীয় শৃগালী এই ভয়ঙ্কর নিষ্ঠুর ফন্দী এঁটেছে।

জারাসের দিকে ফিরে তাকালাম। যে ভয়ঙ্কর বিপদে সে পড়তে যাচ্ছে সে সম্পর্কে তাকে উদাসীন মনে হল। সৈনিকের সাজ পরে সে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। বেশ সুন্দর লাগছে দেখতে। আমার ইচ্ছা হচ্ছিল কিছু একটা করে তাকে এই বিপদ থেকে বাঁচাই, কিন্তু আমি অসহায়। হয়তো একটা স্কুল ছাত্রের মতো হোঁচট খেতে খেতে সে আবৃত্তি করে যাবে, তবে তার সমস্ত প্রচেষ্টা এই কঠিন বিচারক কিংবা সমজদাররা রেজা কিংবা থোইয়াকের সাথে তুলনা করবে।

তারপর হঠাৎ আমি সচেতন হলাম মেয়েলি কণ্ঠের গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে, যেন আমার বাগানে বসন্তের ফুলের কেয়ারির উপর মৌমাছির ঝাঁক মধু আহরণ করতে করতে গুণগুণ করছে। ফিরে তাকিয়ে দেখলাম শুধু তেতি নয়, আরও অনেক বয়স্ক মহিলাও খোলাখুলি তার প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছে। হাতপাখার আড়ালে ওরা মৃদু হাসছিল আর ফিসফিস করছিল। জারাস কখনও রাজদরবারে আসেনি, তাই ওরা কখনও ওদের কামুক নজর তার উপর ফেলতে পারেনি।

তারপর জারাস একবার কেশে প্রস্তুত হওয়ার ইঙ্গিত করতেই তাঁবুর মাঝে সবাই নিশ্চুপ হল। আমি দূরে মরুভূমি থেকে একটা শেয়ালের ডাক শুনতে পেলাম।

জারাস বলতে শুরু করলো। আমি জারাসকে যুদ্ধক্ষেত্রে তার অধীনস্থ লোকদেরকে নির্দেশ দিতে শুনেছি, কিন্তু কখনও তার কণ্ঠস্বরের গভীরতা কিংবা সুরেলা বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে কোনোকিছু বুঝতে পারিনি। তার কণ্ঠস্বর একটা ঘন্টাধ্বনির মতো আর মরুভূমির বালুর ঢিবির উপর উড়ে বেড়ানো পাখির মতো ভেসে উঠলো। সমুদ্রতীরের পাথরের গায়ে ঝড়ের মতো আছড়ে পড়লো, আর উঁচু সিডার গাছের শাখায় হাওয়ার ঝাঁপটার মতো শোনাল।

প্রথম কয়েকটা স্তবক বলেই সে সকলকে মোহাবিষ্ট করে ফেললো।

তার শব্দচয়ন ছিল অপূর্ব। এমনকি আমি নিজেও হয়তো তেমন করতে পারতাম না। তার সময়জ্ঞান আর বর্ণনা ছিল দুর্নিবার। জলদগম্ভীর স্বরে সে নীলনদের বন্যার পানির মতো সবকিছু ধুয়েমুছে নিয়ে চলেছে।

যখন আমি হাইকসো ভণ্ড বিওনকে তিনটি তীর ছুঁড়ে মেরে ফেড়ে ফেলেছিলাম, সেই তিনটি তীর ছোঁড়ার ঘটনার বর্ণনা দেবার সময় মিসরের সমস্ত সভাসদ আসন ছেড়ে লাফিয়ে উঠে উল্লাসে হর্ষধ্বনি দিয়ে উঠলেন। আর ফারাও এমন জোরে আমার বাহু চেপে ধরলেন যে, এরপর অনেকদিন তার দাগ রয়ে গিয়েছিল।

বাকি সবার সাথে আমি নিজেও হাসি আর কান্নার মাঝে রইলাম আর সবশেষে উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি দিলাম।

সমাপ্তিতে পৌঁছার সময় সে বিশাল প্রবেশ পথের দিকে ঘুরে দুই হাত দুই দিকে মেলে ধরে বলতে লাগলো।

তারপর মহান তায়তা মিসরের সমস্ত দেবতা আর ফারাও ত্যামোসের উদ্দেশ্যে চিৎকার করে কেঁদে বলতে শুরু করলেন, এটা কেবল সামান্য একটি নমুনা আমি আপনার জন্য অর্জন করেছি। সেই সম্পদের কেবল এক হাজার ভাগের একভাগ আমি আপনার সামনে হাজির করেছি। হে ফারাও ত্যামোস, আপনার প্রতি আমার ভালোবাসা আর কর্তব্যের এটি একটি প্রমাণ।

বাইরে মরুভূমিতে একটি মাত্র ঢাক বাজতে শুরু করলো আর তাঁবুর প্রবেশ পথ দিয়ে শিরস্ত্রাণ আর বর্মপরা দশজন সৈন্য ভেতরে ঢুকলো। ওরা একটা কাঠের তক্তা বহন করে নিয়ে এলো, যার উপর কতগুলো চকচকে রূপার বাট পিরামিড আকারে সাজিয়ে রাখা হয়েছে।

সবাই একযোগে উঠে দাঁড়িয়ে প্রশংসা আর হর্ষধ্বনি করতে লাগলো।

ওরা চিৎকার করে বলে উঠলো, জয় হোক ফারাও রাজার! সকল প্রশংসা তায়তার!

জারাসের বলা শেষ হওয়ার পর তাকে ওরা যেতে দিচ্ছিল না। ফারাও কয়েকমিনিট তার সাথে কথা বললেন। পুরুষেরা তার সাথে হাত মেলালো আর কেউ কেউ তার পিঠ চাপড়ালো। আর কয়েকজন মহিলা যারা মদ পান করেছিল তারা ফিক ফিক করে হেসে তার গায়ের সাথে বেড়ালের মতো নিজেদের গা ঘসতে লাগলো।

যখন সে আমার সামনে এলো, আমি তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে তার প্রশংসা করে বললাম, খুব ভালো লিখেছ আর চমৎকার বলেছো, জারাস। তুমি একজন যোদ্ধা আবার একজন কবিও বটে।

সে উত্তরে বললো, আপনার মতো একজন বিখ্যাত কবির কাছ থেকে একথা শুনে আমার খুবই আনন্দ হচ্ছে। আন্তরিকভাবে তার এই কথা বলাটা আমার মন ছুঁয়ে গেল। তারপর সে সমবেত দর্শকশ্রোতার মধ্য দিয়ে এগিয়ে চললল। সবশেষে রাজকুমারি তেহুতির সামনে এসে মাথা ঝুঁকিয়ে দাঁড়াল।

ওরা তাঁবুর অন্য প্রান্তে আমার কাছ থেকে বেশ দূরে ছিল। তবে কারও ঠোঁট নাড়া দেখে আমি তার কথা বুঝতে পারি, যেরকম একটা প্যাপিরাস থেকে পড়তে পারি।

তেহুতির প্রথম কথাটা ছিল, ধিক আপনাকে ক্যাপ্টেন জারাস! আপনার কবিতা শুনে আমার কান্না পেয়েছিল। তার এই কথার সাথে সাথে জারাস তার সামনে হাঁটুগেড়ে বসে পড়লো। তার মুখ আমি দেখতে পাচ্ছিলাম না, তাই তার কথাও বুঝতে পারিনি। তবে তার কথা শুনে তেহুতি হেসে উঠলো।

আপনি একজন বীর, ক্যাপ্টেন। তবে এক শর্তে আমি আপনাকে ক্ষমা করতে পারি। তাহল, কথা দিতে হবে যে আরেকদিন আপনি আমাদেরকে গান গেয়ে শোনাবেন। একথার উত্তরে জারাস হয়তো সম্মতি জানিয়েছিল, তাই তেহুতি আবার বললো, তাহলে এই কথাই রইল। এরপর জারাস উঠে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত সম্মান দেখিয়ে পেছন দিকে হটলো।

হায় ঈশ্বর! আমি ভাবলাম! হায় রে বোকা ছেলে, ফিরে এসো ওখান থেকে। তুমি ওদের সমকক্ষ নও। যুদ্ধের ময়দান থেকেও ভয়ঙ্কর বিপদে তুমি এখন পড়েছ। কিন্তু তেহুতি আবার তাকে থামাল।

আমি ওর ঠোঁট নাড়া দেখে কথাগুলো বুঝতে পারলাম, কী ঝামেলা হল। আমার আংটিটা মনে হয় মাটিতে পড়ে গেছে। একটু আগেই এটা আমার আঙুলে ছিল। দয়া করে একটু খুঁজে দেখুন না ক্যাপ্টেন জারাস?

একাজ করার জন্য সে এক পায়ে খাড়া ছিল। তেতির সামনে আবার মাটিতে ঝুঁকে সে আংটিটা খুঁজতে শুরু করলো আর প্রায় সাথে সাথে ওটা পেয়ে উঠে দাঁড়িয়ে এক হাত সামনে বাড়িয়ে ধরে বললো, এটাই কি আপনার হারানো সেই আংটি, মহামান্য? এবার সে আমার দিকে একটু ঘুরে দাঁড়াতে আমি তার ঠোঁট নাড়া পড়তে পারছিলাম।

হ্যাঁ, এটাই তো। একজন বিশেষ মানুষ আমাকে এটা উপহার দিয়েছেন। যার প্রশংসা আজ সন্ধ্যায় আপনি করেছেন। তবে সে সাথে সাথে আংটিটা জারাসের হাত থেকে ফেরত নিল না।

আপনি প্রভু তায়তার কথা বলছেন?

সে মাথা নেড়ে সায় দিয়ে বললো, অবশ্যই! আপনার হাতে ধরা আংটিটার পাথরটার দিকে তাকিয়ে দেখুন তো। দেখুন কী স্বচ্ছ।

কাছাকাছি একটা মশালের কাছে আংটিটা নিয়ে সে সায় দিয়ে বললো, পানির মতো পরিষ্কার। তেহুতি তাকে বাধ্য করলো আংটিটা খুঁটিয়ে দেখতে, তারপর সে হাত বাড়িয়ে বললো।

ধন্যবাদ, ক্যাপ্টেন জারাস। তারপর জারাস আংটিটা তেহুতির বাড়ানো হাতে তুলে দিতেই তেহুতি তার মুঠো বন্ধ করলো।

আমি মনে মনে ভাবলাম, আংটিটার মধ্যে কোনো যাদু না থাকলেও, রাজকুমারি তেহুতি, তোমার হাসিতে যে জাদু আছে তাতে মেমফিস আর থিবসের দেয়াল দুপাশ থেকে চেপে পিষ্ট করে ফেলতে পারবে। জারাসের মতো একজন অপরিপক্ক যুবক কী করে তোমার ছলনা ঠেকাতে পারবে?

.

এখন সবচেয়ে প্রথম আর জরুরী কাজটি হল, কোনো ধরনের চিহ্ন না রেখে এই বিশাল তিনটি ক্রেটান তিনতলা জাহাজ গায়েব করে ফেলা। সর্বাধিরাজ মিনোজের মনে যেন বিন্দুমাত্র সন্দেহ না থাকে যে, হাইকসো বিওনই তার রত্নভাণ্ডারসহ জাহাজগুলো চুরি করেছে। ক্রোধে সে উম্মুক্ত হয়ে যাবে যখন জানবে যে, তার কথিত মিত্ৰই আসল অপরাধী।

প্রথমে ভাবলাম জাহাজ তিনটা পুড়িয়ে ছাইগুলো নীলনদে ভাসিয়ে দিই। যাতে এগুলো অদৃশ্য হওয়ার রহস্যটা চিরকালের জন্য মুছে যায়। তারপর আবার বিপুল পরিমাণে কাঠ বিনষ্ট হওয়ার বিষয়টা বিবেচনা করলাম।

মিসরে বনাঞ্চল খুব বেশি নেই। আমাদের কাছে কাঠ, সোনা রূপার মতোই মূল্যবান। এই বিপুল পরিমাণ কাঠ থেকে কতগুলো যুদ্ধ জাহাজ আর রথ তৈরি করা যাবে, এই বিষয়টা ভাবতেই এরকম দামি জিনিস পুড়িয়ে ফেলার চিন্তা থেকে নিজেকে বিরত রাখলাম।

বিষয়টা নিয়ে ফারাও আর আমাদের সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়ক প্রভু কাটাসের সাথে আলোচনা করলাম।

ক্রাটাস বললো, কিন্তু তায়তা, মিসরের কোথায় তুমি এতো কাঠ লুকিয়ে রাখবে? এই কথাটা কি ভেবে দেখেছো?

ফারাও আমার পক্ষ নিয়ে বললেন, একটা বিষয় আপনি নিশ্চিত থাকতে পারেন, ক্রাটাস। সেটা হল তায়তা নিশ্চয়ই তা ভেবে রেখেছে। তায়তা সবসময় সবকিছু ভেবে নিয়ে বলে।

আমি বিড়বিড় করে বললাম ফারাও আমার প্রতি অতি দয়াশীল। তবে আমি যথাসাধ্য বিনীতভাবে চেষ্টা করি। একথা শুনে ক্রাটাস হাসিতে ফেটে পড়লো।

ফারাও ঠিক বলেছেন। এ-বিষয়টা নিয়ে আমার কিছু চিন্তাভাবনা আছে। তবে আসল কথা হচ্ছে রূপারর্বাটগুলো পাহারা দেবার জন্য আপনার দেবত্বপ্রাপ্ত বাবা প্রয়াত ফারাও ম্যামোজের শূন্য সমাধিতে পুরো এক পল্টন সৈন্য রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। আর এই সৈন্যদেরকে দুই কাজে ব্যবহার করা যাবে।

এবার ক্রাটাসও মনোযোগ দিয়ে আমার কথা শুনতে লাগলো।

ফারাও বললেন, বলে যাও।

দেখুন, আমি সমাধিকক্ষের পাশের কামরাগুলোর আয়তন আবার মেপে দেখেছি।

তিনতলা জাহাজগুলো ভেঙে যে কাঠের তক্তা পাওয়া যাবে সেগুলো সবই এই মাটির নিচের কুঠরিগুলোতে লুকিয়ে রাখা যাবে। তারপর সুবিধামতো যুদ্ধের প্রয়োজনে এগুলো আবার ব্যবহার করা যাবে। তারপর আমি ক্রাটাসের দিকে তাকিয়ে একটু টিটকারির সুরে বললাম, হয়তো প্রভু ক্রাটাসের এ-বিষয়ে আরও ভালো কোনো প্রস্তাব থাকতে পারে। তিনি হয়তো কাঠের তক্তাগুলো শুধু তার মুখের কথার ভারে লোহিত সাগরের নিচে ডুবিয়ে রাখতে পারবেন।

কিন্তু ক্রাটাস হাসতে হাসতে গর্জন করে বললো, তায়তা, তুমি আমার সাথে ভালোই রসিকতা করলে।

অর্ধেক পল্টন সৈন্যের কয়েক সপ্তাহ খাটুনির পর জাহাজগুলোর সমস্ত তক্তা খুলে প্রতিটার গায়ে সংখ্যা দেওয়ার পর মাটির নিচের কামরাগুলোয় সাজিয়ে রাখা হল। শেষপর্যন্ত আমার কৌশল কাজে লেগে গেল, বিশাল জাহাজগুলো সম্পূর্ণরূপে গায়েব হয়ে গেল।

এতে অবশ্য অতিরিক্ত একটা ঝামেলা এড়ানোর কাজের সুবিধা পেলাম। ফারাওকে দিয়ে আমি জারাসকে এই জাহাজ ভাঙার কাজের নেতৃত্বের ভার দিয়েছিলাম। কড়া নির্দেশ ছিল সম্পূর্ণ কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকে এই সমাধি এলাকার মধ্যেই থাকতে হবে। কাজেই যখন দুই রাজকুমারি, তেহুতি আর বেকাথা তার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলো তখন আমি ভালোমানুষের মতো বলতে পারলাম যে, ফারাও তাকে একটি গোপন সামরিক অভিযানে পাঠিয়েছেন। তার ফিরতেও আরও বেশ কিছুদিন লাগবে।

হাইকসো যুদ্ধক্ষেত্রের চেয়েও থিবসের রাজপ্রাসাদ জারাসের জন্য অনেক ভয়ঙ্কর। আমি রাতে শুয়ে আমার অনুগ্রহভাজন এই ছেলেটির কথা ভেবে আতঙ্কে ঘামতে লাগলাম। তাকে আমি একজন বিশ্বস্ত বন্ধু ভাবতাম, যে আমার প্রাণ বাঁচিয়েছে, এছাড়াও সে ছিল একজন অকুতোভয় সেনানায়ক, একজন শিক্ষিত মানুষ আর এখন নিজেকে একজন কবি হিসেবে পরিচিত করেছে। আমাদের দুজনের মধ্যে অনেক মিল রয়েছে। তবে তার সমবয়সী অন্যান্য যুবকের মতো তার মধ্যেও কিছু দুর্বলতা রয়েছে যা সে এড়াতে পারে না।

আমি এটাও জানতাম একজন যুবতি মেয়ের কামনা তাকে কী রকম নির্মম আর বেপরোয়া করে ফেলে। তাকে প্রথম দেখার সাথে সাথে আমার আদরের তেহুতির দেহ-মনে আগুন জ্বেলেছে। এই আগুন নেভাবার আর কোনো পথ আমি ভেবে পেলাম না।

৩. একের পর এক পরিস্থিতি

 

থিবিসে ফেরার এরপরের দিনগুলোতে পর একের পর এক পরিস্থিতিতে আমি নিজেকে জড়িয়ে খুব ব্যস্ত হয়ে পড়লাম।

হাইকসো আর সর্বাধিরাজ মিনোজের মধ্যে যে রাজনৈতিক ঝড় বয়ে যাচ্ছে, তা নিয়ে আলোচনা করার জন্য ফারাও সর্বক্ষণ আমাকে তার কাছে থাকতে বাধ্য করলেন।

পরিস্থিতির গুরুত্ব আর বিপদ বিবেচনা করে এটন আর আমি একমত হলাম যে, আমাদের সমস্ত গোয়েন্দা অঙ্গপ্রতিষ্ঠানগুলোর এখন নিজেদের মধ্যে যুদ্ধবিরতী ঘোষণা করে সাময়িকভাবে একে অন্যের সহযোগিতা করতে হবে। নিজেদের বাঁচামরা আর মিসরের অস্তিত্ব রাখার প্রয়োজনে আমাদের এটা করতে হবে।

উত্তর দিক থেকে তথ্য আর খবরাখবর বয়ে নিয়ে আসা নাম না জানা বিভিন্ন নারী পুরুষ সারারাত আমাদের আলাদা আলাদা দরজা দিয়ে ঢুকে আবার অন্য দরজা দিয়ে বের হয়ে যেতে লাগলো। এছাড়া সংবাদবাহক কবুতরও সংবাদ নিয়ে আসতে লাগলো।

এটন আর আমি গোয়েন্দাদের কাছ থেকে পাওয়া প্রতিটা তথ্য সাবধানে পরীক্ষানিরীক্ষা করার পর ফারাও আর তার নিজস্ব কর্মকর্তাদের কাছে পাঠাতাম।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল রাজা বিওনের শবদাহ করার খবরটি। আমি তীর ছুঁড়ে তাকে মেমফিসের একটু আগে নীল নদীতে মেরে ফেলেছিলাম। বর্বর হাইকমোরা তাদের নিহত বীরদের দেহ আগুনে পুড়িয়ে ছাই করে ফেলতো, ওরা আমাদের মতো উন্নত আর সভ্য জাতির মত মৃতদেহ মমি করতো না।

আর একই সাথে ওরা তাদের দানবীয় দেবতা শেঠকে খুশি করার জন্য নরবলিও দিত। এটন আর আমি জানতে পারলাম ওরা একশো বন্দী মিসরীয় যোদ্ধাকে জীবন্ত অবস্থায় রাজা বিওনের চিতায় ছুঁড়ে পুড়িয়ে মেরেছে। তারপর বিওনের পরবর্তী জীবনের আনন্দের সঙ্গী হিসেবে আরও একশো কুমারীকেও একই চিতায় পুড়িয়ে মেরেছে।

থিবসে একমাত্র আমিই প্রথম খবর পেলাম যে বিওনের শবদাহ সম্পন্ন করার পর তার ভাই গোরাব হাইকসোদের নতুন রাজা হয়েছে।

গোরাবের প্রথম চিন্তা ছিল তার বড়ভাইয়ের মৃত্যু প্রতিশোধ নেওয়া। শেখ আবাদা আর আসিউতের মাঝের সীমান্তে মিসরীয় বাহিনীর মুখোমুখি অবস্থান করা তার প্রথম সারির সেনাবাহিনী থেকে সে দশ হাজার সৈন্য প্রত্যাহার করে নিল। গোরাবের এই সিদ্ধান্ত মিসরের জন্য আনন্দের বিষয় ছিল। সম্পূর্ণ সীমান্তে ফারাওকে সবসময় ব্যস্ত থাকতে হয়েছিল। এখন পর্যন্ত বিওনের প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হলেও মিসরীয় পক্ষেও কম প্রাণহানি হয়নি।

এখন ফারাওয়ের উপর থেকে চাপটা কমে যাওয়াতে তিনি তার অবস্থান সুসংহত করার সুযোগ পেলেন আর এদিকে গোরাব তার একচতুর্থাংশ সেনাকে উত্তরে তামিয়াতে আমার ফেলে আসা অক্ষত ক্রেটান সেনাবাহিনীর উপর আক্রমণ করার নির্দেশ দিল।

গোরাব তার ভাইয়ের হত্যাকাণ্ডের সাক্ষী ছিল। সেসময়ে সে রাজকীয় বজরায় রক্ষীবাহিনীর অধিনায়ক ছিল। সে দেখেছে কীভাবে ক্রিটের তিনটি তিনতলা জাহাজ তাদের উপর চড়াও হয়েছিল আর সে এও লক্ষ্য করেছিল মিনোয়ান সেনাবাহিনীর পোশাক পরা সেনাকর্মকর্তা আর সৈন্যরা সেই অকারণ আর বিশ্বাসঘাতক হামলা চালিয়েছিল।

গোরাব দেখেছে যখন তার বড়ভাই পানিতে ডুবে যাওয়া থেকে বাঁচার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছিল, তখন একজন ক্রেটান তিরন্দাজ তার নিরস্ত্র ভাইকে তিনটি তীর ছুঁড়ে মেড়েছিল। তারপর সে তীরবিদ্ধ রাজা বিওনের মৃতদেহ পানি থেকে তুলে এনে চিতায় মশাল দিয়ে আগুন দেবার সময় কাঁদছিল। এরপর সে নিজহাতে হাইকসো রাজমুকুট মাথায় পরে ক্রিটের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল।

ক্রিটের বিরুদ্ধে গোরাবের যুদ্ধ ঘোষণা করার কথা শুনে এটন আর আমি উল্লসিত হলাম। গুপ্তচরদের কাছ থেকে আমরা জানতে পারলাম, আমি যে ছোট জাহাজটি তামিয়াতে রেখে এসেছিলাম, তাতে করে ক্রিটের উচ্চপদস্থ কয়েকজন সেনাকর্মকর্তা ক্রিটে ফিরে গিয়েছে। ছোট জাহাজটিতে চল্লিশজনের বেশি মানুষের জায়গা না হওয়ায় বাকিরা তামিয়াতেই রয়ে গিয়েছিল। জাহাজটি ক্রিটে পৌঁছার পর তাদের অধিনায়ক তামিয়াত দুর্গে হাইকসোদের অতর্কিত হামলা আর পুরো সম্পদসহ তিনটি বিশাল জাহাজ লুট করে নিয়ে যাওয়ার কথা সর্বাধিরাজ মিনোজের কাছে সবিস্তারে খুলে বললো। সে আরও জানালো জলদস্যুরা তাদের পরিচয় গোপন করার কোনো চেষ্টাই করেনি। তারা পুরোপুরি হাইকসো সেনা-পোশাক পরেছিল আর সে তাদেরকে হাইকসো ভাষায় কথা বলতে শুনেছে।

সর্বাধিরাজ মিনোজ সাথে সাথে তামিয়াতে আটকে পড়া বাদবাকি দুই হাজার ক্রেটান সৈন্য উদ্ধার করতে একটি রণতরী-বহর তামিয়াতে পাঠালেন। তবে জাহাজগুলো অনেক দেরিতে সেখানে পৌঁছালো।

তার আগেই রাজা গোরাব তার দশ হাজার সৈন্য নিয়ে সেখানে পৌঁছে গিয়েছিল। ক্রেটানরা প্রাণপণ চেষ্টা করলো বাধা দিতে, কিন্তু গোরাব অধিকাংশ ক্রেটান সেনা হত্যা করলো। যারা বেঁচে ছিল তারা আত্মসমর্পণ করলো, গোরাব তাদের সবার মাথা কেটে নিয়ে কাটা মুণ্ডগুলো দিয়ে একটা পিরামিড বানিয়ে দুর্গের নিচে জেটিতে সাজিয়ে রাখলো। গোরাব চলে যাবার পর ক্রেটান রণতরীগুলো সেখানে পৌঁছে দেখতে পেল পিকৃত মানুষের মাথাগুলো রোদে পঁচছে আর শকুন সেগুলো ঠোকড়াচ্ছে। ওরা ফিরে গিয়ে সর্বাধিরাজ মিনোজকে সংবাদটি জানাল।

সর্বাধিরাজ মিনোজ তার দেবতার বেদিতে দাঁড়িয়ে এর প্রতিশোধ নেবার প্রতিজ্ঞা করলেন। তারপর যুদ্ধ জাহাজ পাঠিয়ে পুরো উত্তর আফ্রিকার উপকূল জুড়ে সমস্ত হাইকসো বন্দর আর নৌঘাটির উপর হামলা চালিয়ে সবকিছু তছনছ করতে লাগলেন।

এদিকে রাজা বিওনও উত্তর মিসরে তার অধীনস্থ এলাকায় বসবাস করা সকল মিনোয়ানদের উপর হামলা চালিয়ে প্রতিশোধ নিতে শুরু করলো। মিনোয়ানরা পরিশ্রমী এবং বুদ্ধিমান জাতি। এরা সবধরনের শিল্পকর্ম আর ব্যবসা বাণিজ্যে পটু ছিল। তবে ওরা অন্যান্য ব্যবসায়ীদের চেয়ে অনেক উন্নত ছিল। যেখানেই কোনো লাভের সুযোগ সেখানেই ওরা এসে হাজির হত।

এছাড়া আর কীভাবে ক্রিটের মতো ছোট্ট একটি দ্বীপের অধিবাসীরা মধ্য সাগরের চতুর্দিকের স্থানগুলোতে প্রধান শক্তি হতে পেরেছিল?

উত্তর মিসরে কয়েক হাজার মিনোয়ান বসবাস করতো। রাজা গোরাব সমস্ত শক্তি আর নিষ্ঠুরতা নিয়ে স্থানীয় অধিবাসীদের উপর চড়াও হল। ওরা মিনোয়ানদের ঘর থেকে টেনে বের করে আনলো। নারী আর এমনকি কমবয়সী মেয়েদেরকেও ধর্ষণ করলো। তারপর নারী, পুরুষ, শিশু নির্বিশেষে সকলকে মিনোয়ান মন্দিরে আটকে রেখে আগুনে পুড়িয়ে মারলো।

কেউ কেউ দেশ থেকে পালাতে চেষ্টা করেছিল, কিন্তু খুব কমসংখ্যক মিনোয়ান সফল হল। যারা মধ্য সাগরের উপকূলের কাছাকাছি শহর আর বন্দরগুলোতে বসবাস করতো, তাদের মধ্যে সৌভাগ্যবান কিছু মিনোয়ানকে সর্বাধিরাজ মিনোজের জাহাজ উদ্ধার করলো। অন্যান্য যারা বেশি ভেতরে থাকতো তারা আরও ভেতরে মিসরের চারপাশের মরুভূমিতে পালিয়ে গেল। সেখানে পিপাসায় কাতর হয়ে আর নৃশংস বেদুঈনদের হামলায় ওরাও মারা গেল।

যাইহোক কয়েকশো মিনোয়ান পরিবার দক্ষিণের মেমফিস আর আসিউত থেকে পালিয়ে হাইকসো রথ এড়িয়ে আমাদের যুদ্ধ সীমান্তরেখা পর্যন্ত পৌঁছলো। সেখানে সেনাপতি ক্রাটাসের নির্দেশে আমাদের লোকজন শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়ে সদয় ব্যবহার করলো।

এই খবর শোনার সাথে সাথে আমি ঘোড়ায় চড়ে যত দ্রুত সম্ভব হাইকসোদের মুখোমুখি আমাদের সীমান্ত বাহিনীর কাছে গেলাম।

এই বাহিনীর কয়েকজন পদস্থ সেনাকর্মকর্তাকে আমি অনেক আগে থেকে চিনতাম। ওরা আমার কাছেই বিজ্ঞান, যুদ্ধবিদ্যা শিখেছিল আর আমার সুপারিশেই ওরা বর্তমান সামরিক পদবী লাভ করতে পেরেছিল।

এদের মধ্যে সেনাপতি রেমরেমকে থিবসের যুদ্ধ ক্ষেত্রেই ফারাও সম্মানিত করেছিলেন আর এখন সে সর্বাধিনায়ক জেনারেল ক্রাটাসের অধীনে একটি পল্টনের অধীনায়কত্ব করছে।

আমি যখন হুইকে পাকড়াও করি তখন সে ছিল একজন অপরাধী আর এখন সে পাঁচশো রথীর এক ঊর্ধ্বতন অধিনায়ক। পুরোনো এইসব বন্ধু আর পরিচিতরা আমাকে তাদের শিবিরে পেয়ে খুব খুশি হল, এমনকি সেই তিরষ্কারযোগ্য অত্যন্ত দুশ্চরিত্র বুড়ো সর্বাধিনায়ক ক্রাটাসও। সন্ধ্যায় জেনারেল ক্রাটাস আমাকে মদ খাইয়ে মাতাল করার চেষ্টা করলো। পরে আমিই তাকে কোলে করে তার বিছানায় নিয়ে গেলাম আর যখন সে বমি করে সব বের করছিল তখন আমিই তার মাথা ধরে রেখেছিলাম।

পরদিন সকালে সে আমাকে ধন্যবাদ জানিয়ে তার অধীনস্থ এক কর্মকর্তাকে নির্দেশ দিল যেসব শরণার্থী রাজা গোরাবের কবল থেকে বেঁচে পালিয়ে এসেছে, তাদেরকে আমার সামনে হাজির করার জন্য।

হতভাগ্য এই চল্লিশজন মানুষ কোনোমতে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে এসেছে, সাথে কিছুই আনতে পারেনি। তাদের পরিবারের কাউকে না কাউকে হাইকসোরা হত্যা করেছে।

সারিবদ্ধ লোকগুলোকে পর্যবেক্ষণ করলাম, সম্মান দেখিয়ে মাঝে মাঝে দুএকটা প্রশ্ন করলাম।

সারির একেবারে শেষ মাথায় তিনজনের একটি পরিবার জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়েছিল। পরিবারটির কর্তা আমিথায়ন থেমে থেমে মিসরীয় ভাষায় কথা বললো। তিন সপ্তাহ আগে সে মেমফিসে শস্য, মদ আর চামড়ার ব্যবসা করতো। সফল এই ব্যবসায়ীর নাম আমিও এতদুর থেকে আমার লোকজনের কাছে শুনেছিলাম। হাইকমোরা তার বাড়িঘর আর গুদাম পুড়িয়ে ফেলে আর তার স্ত্রীকে তার চোখের সামনেই ধর্ষণ করেছিল। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মহিলাটি সেখানেই মারা যায়।

তার উনিশ বছর বয়সি ছেলেটির নাম ইকারিওন। তাকে দেখার সাথে সাথেই আমার ভালো লাগলো। লম্বাচওড়া বলিষ্ঠ গড়ন। ঘন কালো কোঁকড়ানো চুল আর সুন্দর মুখ। এতে ঘটনার পর তার বাবার মতো সে এতোটা ভেঙে পড়েনি।

আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি নিশ্চয়ই তোমার নিজের হাতে বানানো ডানায় ভর করে উড়ে এসেছো?

ইকারিওন হেসে উত্তর দিল, অবশ্যই। তবে আমি সূর্য থেকে অনেক দূরে ছিলাম প্রভু। তার নাম নিয়ে আমার রসিকতা করাটা সে ঠিকই বুঝেছিল।

তুমি কি লেখাপড়া জান ইকারিওন?

হ্যাঁ জানি। তবে আমার বোনের মত তেমন পছন্দ করি না।

আমি মেয়েটির মুখের দিকে তাকালাম, সে তার বাপভাইয়ের পেছনে দাঁড়িয়েছিল। মেয়েটি দেখতে বেশ সুন্দর। লম্বা কালো চুল আর বুদ্ধিদীপ্ত উজ্জ্বল মুখ। তবে আমার রাজকুমারিদের মতো সুন্দর নয়। অবশ্য সুন্দর চেহারা আজকাল খুব একটা দেখা যায় না।

প্রায় তেহুতির সমবয়সী মেয়েটি বললো, আমার নাম লক্সিয়াস, বয়স পনেরো। পরিষ্কার মিসরী ভাষায় সে কথাগুলো বললো, যেন সে জন্মসুত্রে একজন মিসরী।

তুমি কি লিখতে পার লক্সিয়াস?

হ্যাঁ পারি প্রভু। প্রাচীন পারসিক কুনিলিপি, মিসরীয় গূঢ়লিপি আর মিনোয়ন লিপি–তিন পদ্ধতিতেই লিখতে পারি।

তার বাবা আমিথায়ন মাঝখান থেকে বলে উঠলো, সে আমার ব্যবসার হিসাবপত্র আর চিঠিপত্র লেখার কাজ করতো। খুবই বুদ্ধিমতি।

আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি আমাকে মিনোয়ান ভাষা শেখাতে পারবে?

কয়েকমুহূর্ত ভেবে সে বললো, পিরবো, তবে এটা নির্ভর করবে আপনার শেখার ক্ষমতার উপর প্রভু তায়তা। মিনোয়ান সহজ ভাষা নয়। আমি লক্ষ্য করলাম সে আমার পুরো নাম আর উপাধি ব্যবহার করেছে। এতে বোঝা গেল মেয়েটি আসলেই বুদ্ধিমতি।

আমি তাকে আহ্বান জানিয়ে বললাম, একবার আমাকে পরীক্ষা করে দেখো। মিনোয়ান ভাষায় কিছু একটা বল।

সে রাজি হয়ে বললো, ঠিক আছে। তারপর সে মিনোয়ান ভাষায় দীর্ঘ একটা বাক্য উচ্চারণ করলো।

আমি তা পুনরুক্তি করলাম। শব্দ শুনে মনে রাখার আমার একজন। সংগীতশিল্পির মতো কান ছিল। যেকোনো মানুষের কথা শুনলে আমি তা সহজেই নকল করে বলতে পারি। এই ক্ষেত্রে আমি কী বলছি সে সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা ছিল না তবে যা আমি বলেছিলাম তা সঠিকভাবেই বলেছিলাম। ওরা তিনজনেই আমার দিকে হতবাক হয়ে তাকাল আর লক্সিয়াসের মুখ বিরক্তিতে লাল হল।

সে আমাকে বললো, আপনি আমার সাথে তামাসা করছেন প্রভু তায়তা। আমার আপনাকে শেখাবার প্রয়োজন নেই। আপনি আমার মতোই বলতে পারেন। কোথায় শিখেছেন এই ভাষা? আমি কোনো উত্তর না দিয়ে একটা রহস্যময় হাসি হেসে চলে এলাম।

হুইয়ের কাছ থেকে চারটি ঘোড়া ধার নিয়ে আমরা চারজন সেদিনই দক্ষিণে থিবসের পথে রওয়ানা দিলাম। ছোট এই পরিবারটির জন্য আমি শহরের দেয়ালের বাইরে মেশির নামে যে নতুন ভূ-সম্পত্তি লাভ করেছি তার একটি ছোট গ্রামে থাকার ব্যবস্থা করে দিলাম।

প্রতিদিন কয়েকঘন্টা লক্সিয়াসের কাছে মিনোয়ান ভাষা শেখা শুরু করলাম। কয়েক মাসের মধ্যেই লক্সিয়াস বললো, আমাকে আর শেখাবার। মতো তার কাছে আর কিছু নেই।

ছাত্র তার শিক্ষকের চেয়ে বেশি জেনেছে। আমার মনে হয় আপনি বরং আমাকে কিছু শেখাতে পারেন প্রভু তায়তা।

আমার দুই রাজকুমারী আমার মতো এতো আগ্রহী ছাত্রী ছিল না। প্রথমে ওরা দুজনেই গোঁ ধরে জানাল, মিনোয়ান ভাষার মতো এমন একটি নীরস আর গেঁয়ো ভাষার প্রতি তাদের কোনো আগ্রহ নেই। তাছাড়া একটা মিনোয়ান চাষির মেয়ের সাথেও তাদের কোনো কাজ-কারবার নেই। ওরা জানাল এটাই ওদের দুজনের শেষ কথা। তেহুতি বলে চললো আর বেকাথা পাশে দাঁড়িয়ে মাথা নেড়ে সায় দিয়ে চললো।

আমি ওদের বড় ভাই ফারাও ত্যামোসের সাথে এ-বিষয়ে কথা বলতে গেলাম। আমি তাকে জানালাম আমাদের মিসরীদেরকে ক্রিটের সাথে সদ্য বেড়ে ওঠা সম্পর্ক থেকে সুবিধা নিতে হবে। আর এর অনেক কিছুই নির্ভর করছে আমাদের দুই রাজকুমারীর সর্বাধিরাজ মিনোজ আর তার রাজদরবারের সদস্যদের সাথে যোগাযোগ করার উপর। তারপর তাকে জানালাম তার বোনদের বিষয়ে আমি কী পরিকল্পনা করেছি।

ফারাও তার দুই বিদ্রোহী ছোট বোনকে ডেকে অনেকক্ষণ তাদের সাথে বিতর্ক করলেন। অবশ্য এই একতরফা বিতর্ক এমন কড়াভাবে করলেন আর এমন ভয় দেখালেন যে আমি দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলাম যে তিনি হয়তো আসলেই তা করবেন। রাজকুমারীরা এরপর তাদের শেষ সিদ্ধান্ত পাল্টালো। তবে এরপর বেশ কিছুদিন আমার সাথে মুখভার করে রইল।

তবে বেশিদিন এই মুখভার রইল না, যখন আমি ওদের জন্য একটা পুরষ্কার ঘোষণা করলাম। প্রতি সপ্তাহ শেষে তাদের নতুন ভাষা শিক্ষক লক্সিয়াসের মতে যে বেশি উন্নতি করবে তাকে এই পুরষ্কার দেওয়া হবে। পুরষ্কারগুলো ছিল মেয়েদের কাছে আকর্ষণীয় জিনিস। এমিথায়ন শহরের বাজার থেকে আমার জন্য এগুলো খুঁজে আনতো।

কিছুদিনের মধ্যেই ওরা পরিষ্কার মিনোয়ান ভাষায় বক বক আর তর্কবিতর্ক শুরু করলো। আর লক্সিয়াস ওদেরকে সরাইখানা আর বস্তির উপযোগী কথ্য ভাষা শেখাল। কয়েক মাস পর এই তিনকন্যা এই সমস্ত কথা শব্দ উচ্চারণ করে আমাকে অবাক করে দিতে শুরু করলো।

এরপর ঐ ত্রিমূর্তি পরস্পরের এমন ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠলো যে ওদের সাথে থাকার জন্য রাজকুমারীরা লক্সিয়াসকে রাজকীয় হেরেমে নিয়ে এলো।

.

মেশির জমিদারির মালিকানার পাওয়ার পর মাঝে মাঝে আমি রাজপ্রাসাদ  থেকে মুক্তি নিয়ে ঘোড়ায় চড়ে ইচ্ছামত ঘুরে বেড়াতাম। সাথে দুই রাজকুমারী আর তাদের সর্বক্ষণের সঙ্গী লক্সিয়াসও থাকতো। আমি ওদেরকে দুই পা দুইদিকে ঝুলিয়ে ঘোড়ায় চড়া শেখালাম। এটা যেকোনো মিসরী নারী পুরুষের জন্য একটা কৃতিত্বপূর্ণ কাজ, বিশেষত ফারাওয়ের বোনদের জন্যতো বটেই।

এছাড়া আমি তিনকন্যার জন্য ওদের সামর্থ্য অনুযায়ী ধনুক বানিয়ে দিলাম। তীর ছোঁড়া শিখে নেবার পর ওরা ধনুকের ছিলা ঠোঁট পর্যন্ত টেনে আনতে পারতো আর একশো পা দূরত্বে ওদের জন্য যে লক্ষ্য আমি স্থির করে দিয়েছিলাম, সেই লক্ষ্যে তিনটির মধ্যে দুটো তীর লাগাতে পারতো। তীর ছোঁড়ার খেলায় আমি ওদের উৎসাহ যোগাতাম আর দিনের শেষে সবচেয়ে চৌকশ নারী তিরন্দাজের জন্য ভালো পুরস্কারের ব্যবস্থা করলাম।

আমার লোকেরা যখন জমিতে ফসলের বীজ বুনতো তখন ঝাঁকে ঝাঁকে বন্য পাখি এসে বীজগুলো খেয়ে ফেলতো। তীর ছুঁড়ে শিকারের জন্য প্রতিটি পাখি বাবদ আমি মেয়েদেরকে অতিরিক্ত উপহার দিতে শুরু করলাম। শিঘ্রই ওরা প্রত্যেকে দক্ষ শিকারীতে পরিণত হল।

আমি জানতাম ঘোড়ায় চড়া আর তীর ছোঁড়ার দক্ষতা পরবর্তী জীবনে ওদের খুব কাজে আসবে।

যথাসাধ্য চেষ্টা করলাম আমার দুই রাজকুমারীর সাথে ভালো সময় কাটাতে কেননা একবার রাজপ্রাসাদে ফিরে গেলে ফারাওয়ের কাজে আমাকে খুব ব্যস্ত থাকতে হত। এমন কোনো দিন ছিল না যে কোনো না কোনো সমস্যা সমাধানে কিংবা কোনো বিষয়ে তাকে আমার উপদেশ কিংবা মতামত না দিতে হত। আমার কোনো মতামত তিনি প্রত্যাখান করলে আমি কিছুই মনে করতাম না, কেননা আমি জানি একটু পরেই একই বিষয়ে আমার মতকেই তিনি তার নিজের মত হিসেবে চালাবেন।

.

এসময়ে আমি আরেকটি সমস্যার সম্মুখিন হলাম। তামিয়াত দুর্গ থেকে ফারাও ত্যামোসের জন্য যে সম্পদ এনেছিলাম তার যথাযথ ব্যবহার কীভাবে করা যায় সে বিষয়ে চিন্তা করে এখনও কোনো উপায় বের করতে পারিনি।

ফারাও অবশ্য এই সম্পদ তার প্রজাদের কল্যাণে ব্যবহারের জন্য উগ্রীব ছিলেন। তবে আমি ক্রিটের সর্বাধিরাজ মিনোজের ছাপ মারা রূপার বাঁট দিয়ে জাতীয় ঋণ পরিশোধ করা থেকে তাকে বিরত রেখেছিলাম।

আমি তাকে বললাম, হে মহান ফারাও, আপনি আর আমি দুজনেই জানি মিনোয়ান গুপ্তচরেরা আমাদের মিসরের প্রত্যেক নগরে রয়েছে। ওদের যে কারও খুব বেশি সময় লাগবে না ক্রিটে খবর পাঠাতে যে থিবসের প্রতিটি দোকান আর সরাইখানায় ক্রিটের ষাঁড়ের প্রতাঁকের ছাপমারা রূপার বাঁটে ছেয়ে গেছে।

ফারাও আঙুল তুলে তার বাবার সমাধিক্ষেত্রের দিকে নির্দেশ করে তিক্ত স্বরে বললেন, তাহলে তুমি বলতে চাচ্ছ যদি কোনোভাবে মিনোয়ানরা এই সম্পদের কথা জেনে ফেলে সেক্ষেত্রে এই কোষাগারের সম্পদ আমি কখনও খরচ করতে পারবো না?

আমাকে মার্জনা করুন মহামান্য মিসর অধিপতি। আপনি মিসরীয় জাতির পিতা। এই সম্পদ আপনার, যেভাবে ইচ্ছা আপনি এটা খরচ করতে পারেন। তবে তার আগে এর চেহারা এমনভাবে বদলে নিতে হবে যেন, জীবিত কোনো মানুষ বিশেষত সর্বাধিরাজ মিনোজ যেন এটা চিনতে না পারে।

এবার তিনি একটু সুর নরম করে বললেন, সেটা কীভাবে সম্ভব তায়তা?

আমাদেরকে প্রতিটা রূপার বাট ভেঙে অর্ধেক ডেবেন সমান ওজনের ছোট ছোট মুদ্রার টুকরা তৈরি করতে হবে। তারপর প্রতি টুকরা মুদ্রার উপর আপনার মুখের ছবির ছাপ মারতে হবে।

এবার ফারাও বিড়বিড় করে বললেন, হুমম! তাহলে তা আমার এই রূপার নতুন মুদ্রার নাম কী হবে? আমি জানতাম তার নিজের ছবি রূপার ছোট টুকরাগুলোর উপর থাকার কথা শুনে ফারাও খুশি হবেন।

ফারাও অবশ্যই একটি নতুন নামের কথা ভেবে থাকবেন। তবে আমার একটা ধারণা এই মুদ্রাগুলোর নাম রূপার মেম দেওয়া যেতে পারে।

এবার তিনি খুশি হয়ে মৃদু হেসে বললেন, আমার মনে হয় এটাই সঠিক হবে তাতা। আর নতুন এই রূপার মুদ্রায় অপর পিঠে কী ছবি থাকবে?

আমি মাথা ঝুঁকিয়ে বললাম, অবশ্যই ফারাও সে সিদ্ধান্ত নেবেন।

তিনি একমত হয়ে বললেন, অবশ্যই আমি তা নেব, তবুও তোমারও একটা মতামত আছে, তাই না?

আমি কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললাম, আপনার জন্মক্ষণ থেকে আমি আপনার সাথে আছি তাই না মহামান্য?

হ্যাঁ, দেবতা হোরাস জানেন তুমি কতবার একথা আমাকে শুনিয়েছ। যখনই তুমি বর্ণনা কর প্রথম যে কাজটি আমি করেছিলাম, তা হল আমি তোমার উপর পেচ্ছাব করে দিয়েছিলাম, তখন ভাবি কেন আমি তখন আরও জোরে আর অনেকক্ষণ ধরে পেচ্ছাবটা করলাম না।

আমি তার কথার শেষাংশটা না শোনার ভান করে বললাম, আমি সবসময় আপনার কাছাকাছি আর পেছনে বিশ্বাসী এবং অনুগত ছিলাম। আমার মনে হয় এই ঐতিহ্য বজায় রাখাই মঙ্গলজনক। একথা বলে আমি থামলাম কিন্তু ফারাও আমাকে কথাটা শেষ করতে বলে বললেন, বলে যাও। তবে আমি মনে হয় বুঝতে পারছি তুমি কোন দিকে যাচ্ছ।

আমি অত্যন্ত বিনীতভাবে বলছি, হয়তো সবদিক বিবেচনা করে ফারাও রূপার মেম মুদ্রার পেছনে আহত বাজপাখির ছবি লাগাবার নির্দেশ দিতে পারেন। আমার কথা শেষ হতেই ফারাও জোরে হেসে উঠলেন।

সত্যি তুমি কখনও আমাকে হতাশ করোনা তাতা। তুমি প্রথম থেকেই সবকিছু ভেবে রেখেছিলে! একটিা ভাঙা ডানাসহ বাজপাখির ছবি আমার ব্যক্তিগত গূঢ়লিপি।

রাজানুকূল্যে আর কঠোর গোপনীয়তা বজায় রেখে আমি ম্যামোজের সমাধিক্ষেত্র এলাকায় একটি টাকশাল বসালাম। এই রূপার টুকরাগুলো বর্ণনা করার জন্য আমি মুদ্রা নামে একটি নতুন শব্দ ঠিক করলাম। ফারাও সাথে সাথে এর অনুমোদন দিলেন।

এই মুদ্রা ব্যবস্থাটি ছিল আমার আরেকটি অর্জন যা আমাদের মিসরের উন্নতি আর অগ্রগতির জন্য অসাধারণ একটি সহায়তা হিসেবে প্রমাণিত হল। একটি সুষম মুদ্রানীতি আজকাল সরকার পরিচালনা আর ব্যবসা-বাণিজ্যের অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি হাতিয়ার। এটা ছিল মিসরের প্রতি আমার অন্যতম একটি উপহার আর এটিই অন্যতম প্রধান একটি কারণ যেজন্য আমরা সবসময় পৃথিবীর সবচেয়ে অগ্রগণ্য জাতি হয়ে থাকবো। অবশ্য এরপর থেকে অন্যান্য জাতিও আমাদের অনুকরণ করেছে আর রূপার মেম এখন এমন একটি মুদ্রা যা পৃথিবীর সব দেশে স্বীকৃত এবং সানন্দে গৃহীত হয়েছে।

আমার কনুইয়ের মৃদুস্পর্শ পেয়ে ফারাও তার পিতার সমাধিক্ষেত্রের নাম পরিবর্তন করে রাজকীয় টাকশাল নাম দিলেন। এরপর ফারাও আমাকে এই প্রতিষ্ঠানের প্রশাসক নিযুক্ত করলেন। এটা আমার অন্যান্য দায়িত্বের বাইরে বাড়তি আরেকটি দায়িত্ব। তবে যে কোনো দায়িত্ব পালনে আমি কখনও অনুযোগ করি না।

প্রশাসক পদে আসীন হওয়ার পর আমার প্রথম কাজটি ছিল জারাসকে রাজকীয় টাকশালের অভিভাবক ও কোষাধ্যক্ষ নিযুক্ত করা। এ দায়িত্ব পালনে সহায়তার জন্য জারাসকে অধিনায়ক করে তার অধীনে এক পল্টন সেনা দিতে আমি ফারাওকে অনুরোধ জানালাম। অবশ্য এতে জারাস পুরোপুরি আমার অধীনে চলে আসবে।

রাজকুমারী তেহুতি কৌশল করে জারাসকে তার হীরার আংটিটি পরীক্ষা করতে বাধ্য করেছিল আর এতে তার উদ্দেশ্য আমার কাছে পরিষ্কার হয়েছিল। তাই আমি অত্যন্ত সাবধানে তাকে নীলনদের পশ্চিম তীরে পৃথক করে রাখার ব্যবস্থা করেছিলাম। আমি জানি আমার আদরের রাজকুমারী যখন কোনোকিছু করতে মনস্থির করে তখন সেখান থেকে তাকে সরানো খুব কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।

আমার শুধু একটাই চিন্তা ছিল যতক্ষণ তার যথোপযুক্ত নিয়তি নির্ধারণ করতে না পারি ততক্ষণ রাজকুমারী তেহুতি আর জারাসের মাঝে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রাখতে হবে। এটা পরিষ্কার, তার নিয়তি হচ্ছে একজন রানি এবং পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক ব্যক্তির সঙ্গিনী হওয়া। একজন সাধারণ সৈন্য সে যতই সুন্দর আর ভালো হোক না কেন, তেহুতি তার খেলার সাথী আর তাঁবুর সহগামি হতে পারে না।

একটা বিষয় আমি জানতাম যে, রাজরক্তের সুন্দরী নারীর প্রতি সর্বাধিরাজ মিনোজের বিশেষ অনুরাগ আছে। তবে সত্যি বলতে কী কথাটা প্রমাণিত সত্য নয়। এটা আসলে একটা গুজব যা বার বার রটানোর ফলে সত্যে পরিণত হয়েছে।

তবে আমার বিশ্বাস ছিল যে, এই অসীম শক্তিশালী ব্যক্তিত্ব আমার দুই রাজকুমারীর অপ্রতিরোধ্য আকর্ষণ নিশ্চয়ই এড়াতে পারবেন না। আর এর মাধ্যমে আমি মিনোয়ানদেরকে আমার আর মিসরের মঙ্গলের কাজে লাগাত পারবো। নিজেকে এই বলে সান্ত্বনা দিলাম যে, রাজসিংহাসনে আসীন হওয়া আর এই বর্বর হাইকসোদের হাত থেকে আমাদের প্রিয় মিসরকে রক্ষা করার চেয়ে অধিক সম্মানিয় আর উচ্চতর আর কোনোকিছুই তেহুতি আশা করতে পারে না। এটা যখন সে বুঝতে পারবে তখন জারাসের মতো সাধারণ মানুষের প্রতি তার আকর্ষণ হারিয়ে ফেলবে।

তবে ইতোমধ্যে এই চমৎকার যুবকটিকে রাজকীয় টাকশালের কাজে সমাধিক্ষেত্রের এলাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ করে রাখতে হবে যাতে সে নদী পার হয়ে রাজকীয় হেরেমের চারপাশে ঘুর ঘুর করার কোনো সুযোগ না পায়।

.

এ যাবত ফারাও আর রাজপরিষদের সমস্ত সদস্য সর্বাধিরাজ মিনোজ আর হাইকসো রাজা গোরাবের মাঝে বেড়ে উঠা সংঘর্ষের প্রতি খুবই আগ্রহ নিয়ে পর্যবেক্ষণ করছিলাম। আর যতদূর সম্ভব তাদের দুজনের মাঝে এই শত্রুতায় ইন্ধন যুগিয়ে যাচ্ছিলাম। দুর্ভাগ্যবশত তা যথেষ্ট ছিল না। ক্রিট অনেক দূরে অবস্থিত আর এর শাসকের সাথে আমাদের কোনো যোগাযোগ ছিল না।

তেহুতি আর বেকাথাকে এই কাজে লাগাবার যথোপযুক্ত সময়ের জন্য অপেক্ষা করার সময় আমি ক্রিট আর সর্বাধিরাজ মিনোজ সম্পর্কে খোঁজখবর নিতে চেষ্টা করলাম। একাজে এমিথাওন আর তার মেয়ে লক্সিয়াস আমাকে ঐ দ্বীপরাষ্ট্রের ইতিহাস, জনগণ, প্রাকৃতিক সম্পদ আর বিশেষত এর শাসকদের সম্পর্কে অত্যন্ত মূল্যবান তথ্য জানিয়ে সহায়তা করলো।

ক্রিটের রাজা ছিল চারজন, আর সর্বাধিরাজ মিনোজ তার পদবী অনুযায়ী অন্য তিন রাজার উপর কর্তৃত্ব করতেন। তারা আলাদা আলাদা প্রাসাদে থাকতেন তবে এগুলো কুনুসসে প্রধান রাজপ্রাসাদের সাথে মার্বেল পাথরে ছাওয়া রাস্তার মাধ্যমে সংযুক্ত ছিল। মিসরে আমরা এদেরকে সাতরাপ কিংবা গভর্নর বলতাম, রাজা বলা হত না।

আমার প্রশ্নের উত্তরে এমিথাওন জানাল সর্বাধিরাজ মিনোজের নগরদুর্গ কুনুসসের দেয়ালের বাইরে তিনলিগ দূরে একটি গ্রামে তার জন্ম হয়েছিল। তার বাবা রাজপ্রাসাদের একজন কর্মকর্তা ছিলেন আর ছোটবেলায় সে মিনোজের বিভিন্ন উৎসব আর শোভাযাত্রা দেখেছে। এ-যাবত যাদের সাথে আমি এ-বিষয়ে কথা বলেছি তাদের মধ্যে সেই প্রথম ব্যক্তি যে মিনোজকে সচক্ষে দেখেছে।

এমিথাওন জানাল তিনি একজন জাঁকজমকপূর্ণ ব্যক্তিত্ব, যিনি জনসমক্ষে বের হবার সময় মুখোশ পরে থাকতেন। ষাড়ের মাথার আকৃতিতে তৈরি মুখোশটি ছিল খাঁটি রূপার। প্রজারা কখনও তার মুখ দেখেনি।

এমিথাওন জানাল, তিনি অমর। সেই আদিকালে যখন এই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তখন থেকেই তিনি শাসন করে আসছেন।

আমি মাথা নেড়ে ভাবলাম, তার প্রজারা কেউ যদি তার মুখ নাই দেখে থাকে তাহলে কীভাবে ওরা জানবে যে, একই ব্যক্তি এতোকাল শাসন করেছেন? আমার মনে হল দায়িত্বে থাকা একজন সর্বাধিরাজ মিনোজ মারা যাবার পর তার উত্তরাধিকারী রূপার ষাঁড়ের মুখোশটি পরে শাসনকাজ চালায়।

এমিথাওন বলে চললো, তার একশো স্ত্রী রয়েছে। কথাটা শুনে আমি অবাক হবার ভান করলাম। সে আবার বলতে শুরু করলো, এজিয়ান সাগরের বিভিন্ন দ্বীপে অবস্থিত নগর রাষ্ট্রগুলো থেকে সর্বাধিরাজ মিনোজ স্ত্রী পেয়ে থাকেন। বছরে চারবার ঋতু পরিবর্তনের সময় যে উৎসব হয়, তখন উপঢৌকন হিসেবে এদের পাঠানো হয়।

সর্বাধিরাজ মিনোজের কয়টি করদ রাজ্য আছে এমিথাওন?

সে বললো, হে প্রভু, তিনি একজন পরাক্রমশালী শাসক। ক্রিট দ্বীপের তিনটিসহ তার অধীনে মোট ছাব্বিশটি করদ রাজ্য আছে।

ক্রিট দ্বীপের ভৌগলিক বিবরণ আর এর লোকসংখ্যা সম্পর্কে এমিথাওন আমাকে অনেক কিছু জানাল। আমার কাছে এই দ্বীপের বেশ কয়েকটা মানচিত্র ছিল, কিন্তু প্রত্যেকটি ছিল ভিন্ন ভিন্ন। এমিথাওন এই মানচিত্রগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলো, তারপর বিভিন্ন ভুল বিবরণ সংশোধন করে সঠিক একটি মানচিত্র বানাতে সহায়তা করলো। পূর্ণাঙ্গ এই মানচিত্রটিতে বিভিন্ন নগর, গ্রাম, বন্দর, জেটি, রাস্তাঘাট আর ক্রিটের পর্বতের মাঝ দিয়ে চলে যাওয়া গিরিপথগুলো দেখান ছিল।

পারিবারিক সম্পর্ক থাকার কারণে এমিথাওন আমাকে মিনোয়ান সেনা আর নৌবাহিনী সম্পর্কে বিশ্বাসযোগ্য পরিসংখ্যান জানাতে পারলো।

পদাতিক সৈন্য ছিল প্রচুর। তবে এদের বেশিরভাগই ছিল অন্যান্য হেলেনিয় দ্বীপ, মেডেস এবং পূর্ব এশিয়ার ভাড়াটে আর্য সৈন্য। সে জানাল ক্রিট দ্বীপটি পার্বত্য এলাকা হওয়ার কারণে হাইকসো কিংবা মিসরের ফারাওয়ের তুলনায় মিনোয়ানদের রথের সংখ্যা খুব বেশি নয়।

মনে হচ্ছে এই অভাব মেটাবার জন্য সর্বাধিরাজ মিনোজ একটি শক্তিশালী নৌবাহিনী গড়ে তুলেন যা, মধ্য সাগরের যেকোনো নৌবাহিনীর তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী ছিল। এমিথাওন এই নৌবাহিনীর বিভিন্ন ধরনের জাহাজের সংখ্যা আমাকে জানাতে পারলো।

তবে এমিথাওন জাহাজের সংখ্যাটি এতো বেশি বলেছিল যে, আমার মনে হল সে অনেক বাড়িয়ে বলেছে। আবার ভাবলাম যদি আমার ভুল হয়ে থাকে আর এমিথাওনের কথিত সংখ্যাটিই সঠিক হয়, তাহলে বুঝতে হবে আসলেই সর্বাধিরাজ মিনোজ অত্যন্ত শক্তিশালী একজন শাসক।

.

এইসব খবরা-খবর সংগ্রহ করার পর আমি ভাবলাম এখন আমাদের সময় হয়েছে, মিনোয়ন আর হাইকসোদের মধ্যেকার এই লড়াইয়ে ক্রিটের পক্ষে সক্রিয় অংশগ্রহণ করা। আর এতে হয়তো আমরা যথেষ্ট চাপ প্রয়োেগ করে বর্বর হাইকসোদেরকে পরাস্ত করে আমাদের মাতৃভূমি থেকে তাদেরকে বিতাড়িত করতে পারবো।

এটন আর আমি যেসব তথ্য আমাদের গুপ্তচরদের কাছ থেকে সংগ্রহ করেছিলাম তা সমস্ত একত্রিত করে পরীক্ষানিরীক্ষা করলাম। আমার গবেষণা কর্মের বিশালতা দেখে সে খুবই অভিভূত হল, কেননা তার নিজেরগুলোর চেয়ে আমার তথ্য অনেক বেশি ছিল।

অনেক তর্কবিতর্কের পর আমরা সবাই একমত হলাম যে, এখন সবচেয়ে ভালো হবে মিনোয়ানদের সাথে সরাসরি বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা। আর ওদের সাথে একটি কার্যকর মৈত্রি চুক্তি করার দিকে এগিয়ে যাওয়া যাতে, এই

দুই জাতি মিলে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী একটি শক্তিতে পরিণত হয়, যে শক্তিকে হাইকসোরা কখনও চ্যালেঞ্জ করার আশা করবে না।

ঠিক তখনই উৎসাহের আতিশয্যে আমি একটা ভুল করে ফেললাম। এটনকে বললাম, আমার যদূর মনে পড়ে হাইকমোরা আকস্মিকভাবে মিসরে : হামলা করার আগে আমরা সবসময় ক্রিটের সাথে মোটামুটি একটি কূটনৈতিক সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলেছিলাম। যাইহোক হাইকসোরা উচ্চ মিসর দখল করে নেওয়ার পর আমাদের দেশের দক্ষিণাংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এতে ক্রিটের সাথে আর যোগাযোগ বজায় রাখা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। হাইকসোরা আমাদের মাঝখানে ঢুকে দুটি দেশকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে।

আমার কথা শুনে এটন কিছুক্ষণ আমার মুখের দিকে অবাক হয়ে তাকাল। আমি থামার পরও সে কোনো কথা না বলে চুপ করে রইল। আমি বাধ্য হয়ে তাকে বললাম, তোমার কী মতামত এটন? আমার কথাটি কি তোমার মনঃপুত হয়নি?

সে আমার প্রশ্নের কোনো সরাসরি উত্তর না দিয়ে বরং আমার প্রথম কথাটায় ফিরে গিয়ে বললো, আমি কি ঠিক শুনেছি তায়তা? তুমি কি আসলেই একথা বলেছে যে, হাইকসোদের মিসর আক্রমণের আগের কথা তোমার মনে আছে?

আমার বয়স নিয়ে আমি সাধারণত খুবই সাবধানতা অবলম্বন করি। এমনকি এটনের মতো যারা আমার কাছের মানুষ তারাও আমার আসল বয়সের চেয়ে অনেক কম জানে। যদি আসল বয়সটা ওদের জানাতাম, তাহলে ওরা আমাকে একজন পাগল মানুষ কিংবা খুব বেশি হলে একজন মিথ্যাবাদী মনে করতো। হাইকমোরা প্রায় নব্বই বছর আগে মিসর আক্রমণ করেছিল আর ঘটনাটা আমার স্পষ্ট মনে আছে। কিন্তু এখন ভুলটা আমাকে শোধরাতে হবে।

প্রশ্নটা উড়িয়ে দিয়ে বললাম, কথাটা বলতে গিয়ে আমি একটু ঘোট পাকিয়ে ফেলেছিলাম। আসলে আমি বলতে চাচ্ছিলাম যতটুকু আমি পড়েছি আর শুনেছি, হাইকমোরা মিসর আক্রমণ করার আগে ক্রিটের সাথে আমাদের বন্ধুত্বমূলক সম্পর্ক ছিল। তারপর তাড়াতাড়ি বললাম, এখন যদি আবার তাদের সাথে বন্ধুত্বমূলক সম্পর্ক ফিরিয়ে আনতে চাই কিংবা কোনো ধরনের পারস্পরিক প্রতিরক্ষামূলক চুক্তি করার উদ্যোগ নিতে চাই, তাহলে তা সরাসরি করাটা খুবই শক্ত হবে। তুমি কি এতে একমত এটন?

সে সাথে সাথে কোনো উত্তর দিল না। কেবল অদ্ভুতভাবে আমার দিকে তাকিয়ে আমার গলা থেকে নিয়ে লেখার টেবিলের উপর রাখা দুইহাত খুটিয়ে খুটিয়ে দেখতে লাগলো। এটন জানে বয়সের রেখা একজন মানুষের এই দুই জায়গার উপর বেশি পড়ে।

তবে এ-বিষয়ে আমি ব্যতিক্রম। থুতনিতে এখনও দাড়ি উঠেনি এমন একজন বালকের মতো আমার সারাদেহের চামড়া মসৃণ আর দাগহীন। সেখানে এটন আমার আসল বয়সের কোনো আলামত খুঁজে পেল না। সে চিন্তিত ভাবে মাথা নাড়তে নাড়তে আবার আমাদের পূর্বের আলাপের বিষয়ে ফিরে এলো।

এবার গলার সুর নরম করে সে বললো, বর্তমান পরিস্থিতির বিষয়ে তুমি যা বলছে তা একেবারে সঠিক তায়তা। এখন সরাসরি মিনোজের সাথে যোগাযোগ করা প্রায় অসম্ভব। সমস্যাটা তুমি ঠিকই ধরেছো, এখন বল সমাধান কীভাবে করা যাবে।

তুমি নিশ্চয়ই জানো আক্কাদ আর সুমের-এর রাজা নিমরদের রাজধানী ব্যবিলনে সর্বাধিরাজ মিনোজের একটা দুতাবাস আছে।

এটন সায় দিয়ে বললো, অবশ্যই জানি। কিন্তু ব্যবিলনে ক্রিট রাষ্ট্রদূতের সাথে যোগোযোগ করার জন্য আমাদের দূত পাঠাতে চাইলেও, সেই সফরও তোমার সেই তামিয়াত দুর্গ আক্রমণ করার চেয়েও অনেক দুর্গম হবে।

ঠিকই বলেছ এটন। এর দূরত্ব প্রায় দ্বিগুণ আর খুবই বিপজ্জনক আর অনিশ্চিত হবে। আমাদের দূতকে পূর্বদিকে লোহিতসাগর উপকূলের দিকে যেতে হবে। তারপর সাগর পার হয়ে বিশাল আর দুর্গম আরব মরুভূমি পাড়ি দিতে হবে। এটি এমন একটি জায়গা যা সমস্ত দয়ালু দেবতারা ত্যাগ করেছেন, এখানে বৈরী বেদুঈন গোষ্ঠিরা ঘুরে বেড়ায় আর বিচারের হাত এড়িয়ে চলা গলাকাটা দস্যু আর সমাজতাড়িত লোকজনদের বিচরণ রয়েছে। থিবস থেকে ব্যবিলনের দূরত্ব দেড় হাজার লিগেরও বেশি। আর সমস্যার এখানেই শেষ নয়।

কেন নয় তায়তা? আমরাতো জানি ব্যবিলনে মিনোজের একটি দুতাবাস আছে?

হ্যাঁ, তা আছে। তবে ক্রিট আর থিবসের মধ্যে একটা মৈত্রী চুক্তি করার মতো আলাপ আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা সেই রাজদূতের থাকার কথা নয়। সে বড়জোর একটা বার্তাসহ আমাদের দূতকে ক্রিটে সর্বাধিরাজ মিনোজের রাজদরবারে পাঠিয়ে দিতে পারবে। সেক্ষেত্রে আমাদের দূতকে মধ্য সাগরের একেবারে পুবপ্রান্তে গিয়ে টায়ার কিংবা সিডন বন্দরে গিয়ে একটা জাহাজ খুঁজতে হবে। তারপর সেই জাহাজের ক্যাপ্টেন নিতে রাজি হলেও তাকে শীতকালীন ঝড়, জলদস্যু আর হাইকসো যুদ্ধ জাহাজ এড়িয়ে মধ্য সাগরের অর্ধেক পর্যন্ত যেতে হবে। তারপরই সে ক্রিট দ্বীপের কুনুসসে সর্বাধিরাজ মিনোজের দুর্গে পৌঁছতে পারবে।

এতে কত সময় লাগতে পারে বলে তোমার ধারণা তায়তা?

ভাগ্য ভালো হলে আর দেবতা সহায় হলে প্রায় একবছর লাগবে আর নয়তো এর দ্বিগুণ সময় লাগবে।

এটন একটু চিন্তা করে বললো, দুই বছরে অনেককিছু ঘটে যেতে পারে।

আমি বললাম, এখানেই শেষ নয়। ফারাওয়ের কাছ থেকে বার্তা পাওয়ার পর সর্বাধিরাজ মিনোজ তার মন্ত্রণাপরিষদের সাথে বিষয়টা নিয়ে পরামর্শ করবেন, তারপর তার উত্তর নিয়ে একই পথে দূতকে থিবস ফিরতে হবে। পুরো সফরটা শেষ করতে প্রায় তিনচার বছর লেগে যাবে।

এটন বললো, না! এতোদিন আমরা অপেক্ষা করতে পারি না। এর মধ্যে তো রাজা গোরাব তার এক লক্ষ হত্যাকারী দস্যু সৈন্য নিয়ে থিবস আক্রমণ করে বসবে। অন্য কোনো সমাধান খুঁজে বের করতে হবে।

তুমি ঠিক বলেছ প্রিয় বন্ধু এটন। এ-বিষয়ে তোমার মনে আর কোনো ভাবনা আছে? আমি সমস্যাটা আবার তার কাছে ফিরিয়ে দিলাম।

বোকার মতো মুখ করে সে মৃদু হেসে বললো, তোমার মতো এই সমস্যাটা নিয়ে আমি ভাবিনি। আমার মনে হয় তোমার মনে কোনো পরিকল্পনা আছে, তাই না?

আচ্ছা ধর, ফারাও একজন মিসরীয় রাষ্ট্রদূতকে নিয়োগ দিয়ে তার সাথে এমন একটি বিশাল বাহিনী দিলেন যা তাকে দ্রুত লোহিত সাগর আর এরপরের মরুভূমির দস্যুদল আর বেদুঈন গোষ্ঠীদের এড়িয়ে নিরাপদে সফর করতে সহায়তা করবে। আর যদি এই রাষ্ট্রদূতকে যথেষ্ট পরিমাণ রূপা দেওয়া হয়, যা দিয়ে সে টায়ার বন্দর থেকে বেশ বড় আর দ্রুতগামি একটা জাহাজ ভাড়া করতে পারবে। তারপর এই দ্রুতগামি জাহাজে সাগর পাড়ি দিয়ে জলদস্যু আর হাইকসো যুদ্ধ জাহাজকে এড়াতে পারে, তাহলে কেমন হয়?

এবার এটনের চোখ উজ্জ্বল হল, সে বললো, হ্যাঁ ঠিক!

আর এই চমৎকার জাহাজটি যদি সোজা ক্রিটের কুনুসসে পৌঁছাতে পারে? আর এই রাষ্ট্রদূতের কাছে যদি এমন উপঢৌকন থাকে যা সর্বাধিরাজ মিনোজ খুবই পছন্দ করেন? তারপর একদিকে মাথা হেলিয়ে চোখ সরু করে বললাম, তোমার কী কোনো ধারণা আছে কী ধরনের উপহার মিনোজের সবচেয়ে পছন্দ?

এবার এটন হেসে বললো, মনে হয়, আছে বন্ধু। আমি যতদুর শুনেছি মিনোজের এমন এক জোড়া অণ্ডকোষ আছে যা আমাদের দুজনের মিলিয়ে নেই। অর্থাৎ যা থেকে আমরা বঞ্চিত হয়েছি তার চেয়ে ওগুলো কয়েকগুণ বেশি ওজনে ভারি। আর যে জিনিস নিয়ে আমরা মাথা ঘামাই না তার প্রতি তার তৃপ্তিহীন ক্ষুধা রয়েছে।

তার কথা শুনে আমিও হাসলাম, যেন হাসা দরকার তাই। তবে আমার এই দৈহিক অসম্পূর্ণতার বিষয়টি আমার কাছে খুব একটা রসিকতা করার মতো বিষয় মনে হয় না।

কিন্তু তায়তা এতে আমাদের কী লাভ বল? রাজা গোরাবের বিরুদ্ধে যুদ্ধে এটা আমাদের কি কাজে আসবে? মিসরের সেনাবাহিনীর কর্তৃত্ব থিবসে ফারাওয়ের হাতেই থাকবে। তার প্রতিটা নির্দেশ এতো দূরে জানাতে হবে, যে কথা আমরা দুজনে এতোক্ষণ আলোচনা করলাম।

আমি তার কথার উত্তরে মন্তব্য করলাম, আবারো তুমি সমস্যাটির ঠিক আসল জায়গায় হাত দিয়েছ। যাইহোক এ-বিষয়েও আমার কিছু চিন্তা আছে। যদি ফারাওয়ের এই রাষ্ট্রদূত রাজকীয় সীলমোহর বহন করে, তাহলে সে সময় নষ্ট না করে ক্রিটে মিনোজ আর তার সভাসদদের সাথে মিলে যুদ্ধে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত প্রায়ই যুদ্ধে জয় এনে দেয়।

এটন খুব জোরে জোরে মাথা নাড়তে নাড়তে বললো, কখনও না! যাকে তিনি সন্দেহাতীতভাবে বিশ্বাস করেন, তাকে ছাড়া আর কারও হাতে ফারাও সেনাবাহিনীর কর্তৃত্ব আর যুদ্ধ পরিচালনা করার ক্ষমতা তুলে দেবেন না।

আচ্ছা বলতো এটন! তোমার কি মনে হয় মিসরে কি এমন কেউ নেই যাকে ফারাও ত্যামোস নিঃসন্দেহে বিশ্বাস করেন?

না, আমার বিশ্বাস তেমন কেউ নেই। তারপর হঠাৎ কথা থামিয়ে সে আমার দিকে অবজ্ঞাভরে তাকিয়ে বললো, এই তায়তা! তুমি নিশ্চয়ই একথা বলছো না যে রাজকীয় সীলমোহরসহ ফারাও তোমার হাতেই মিসরীয় সেনাবাহিনীর উত্তরাঞ্চলের পুরো কর্তৃত্ব তুলে দেবেন? তুমি তো একজন সৈনিক নও তায়তা! যুদ্ধের কী জান তুমি?

তুমি যদি আমার লেখা যুদ্ধের কলাকৌশল গ্রন্থটি না পড়ে থাক তাহলে এ-বিষয়ে আমার যোগ্যতা নিয়ে তোমার কিছু বলার অধিকার নিয়ে আমি প্রশ্ন তুলতে পারি। সেনা মহাবিদ্যালয়ের প্রতিটি ছাত্রকে এ-বিষয়ে সর্বশেষ জ্ঞান হিসেবে এই গ্রন্থটি পড়ানো হয়।

আমি স্বীকার করছি এটা আমি কখনও পড়িনি। তোমার এই বিখ্যাত গ্রন্থটি খুব বেশি বড় আর এই বিষয়ে আমার তেমন আগ্রহও নেই; কেননা আমার মনে হয় না আমাকে কখনও কোনো সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব দিতে হবে। তবে আমি যা বলছি, তাহল পার্চমেন্ট কাগজে কিছু হিজিবিজি লেখা আর প্রকৃত যুদ্ধক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেওয়াটা একরকম ব্যাপার নয়। তোমার কি কোনো সেনাবাহিনীকে সরাসরি নির্দেশ দেবার অভিজ্ঞতা আছে?

এবার আমি গলার স্বর নরম করে বললাম, বেচারি এটন, তুমি আমার সম্পর্কে কত কম জান। এ-বিষয়ে কথা শেষ করার আগে আমি তোমাকে শুধু জানাচ্ছি আমাদের সেনাবাহিনীর প্রথম রথটি আমিই বানিয়েছিলাম। আর থিবসের যুদ্ধে ফারাও ত্যামোসের রথের চালকও ছিলাম আমি। আর যুদ্ধ চলাকালে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেবার সময় ফারাও আমার পরামর্শের উপর নির্ভর করতেন। যুদ্ধে আমার বিশেষ অবদানের জন্য ফারাও আমাকে সাহসিকতা আর প্রশংসার সোনার পদক দিয়েছিলেন। সেদিন তার জীবন রক্ষার দায়িত্ব তিনি আমার হাতে তুলে দিয়েছিলেন। আবারও তা করতে পারেন।

আমি এতোকিছু জানতাম না তায়তা। আমার ধৃষ্টতা ক্ষমা করো বন্ধু। তুমি সত্যি অনেক গুণের আঁধার।

আমি অনেক সময় বিভিন্ন বিষয়ে এটনের নিজের অবস্থানটা তাকে মনে করিয়ে দেওয়াটা প্রয়োজনবোধ করতাম। তবে ক্রিট অভিযানের বিষয় নিয়ে ফারাওয়ের কাছে পেশ করার জন্য যে প্রতিবেদন তৈরি করতে যাচ্ছিলাম সে বিষয়ে তার সাহায্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। একবার সঠিক পথটা জানিয়ে দিলে সে খুঁটিনাটি সবকিছু খুব ভালো বুঝতে পারে।

.

এটনের মতো ফারাও আমার যোগ্যতা সম্পর্কে কোনো অবজ্ঞা দেখালেন না। বিশেষত তামিয়াত দুর্গে আমার সাম্প্রতিক সাফল্যের পর তিনি বরং ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আমার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনলেন। পুরো দুই দিন মিনোজের সাথে আমার যোগাযোগের পরিকল্পনাটির বিভিন্ন দিক নিয়ে আমার সাথে কথা বললেন। মাঝে মাঝে দুএকটা বিষয়ে প্রশ্ন তুললেন, তারপর আলোচনা শেষে বললেন, আমি তো তোমার পরিকল্পনায় কোনো খুঁত দেখতে পাচ্ছি না তাতা। তবে আমার মনে হয় জেনারেল ক্রাটাস আর তার সহকর্মীরা কোনো কোনো বিষয়ে আপত্তি করতে পারে।

ফারাও আর তার পূর্ণ সভাসদদের উপস্থিতিতে আমি জেনারেল ক্রাটাসের সামনে আমার পরিকল্পনা তুলে ধরলাম। আমার কথা শোনার পর ক্রাটাস রেগেমেগে মুখ লাল করে লাফ দিয়ে উঠে পুরো রাজদরবারে দাপাদাপি করে বেড়াতে লাগলো। আমার নাকের সামনে আঙুল নেড়ে টেবিলের উপর ঘুসি মেরে চিৎকার করে সমস্ত দেবতাদের উদ্দেশ্যে সে ভবিষ্যৎ বিপদাশঙ্কা আর সর্বনাশের সতর্কবাণী উচ্চারণ করতে লাগলো। প্রকৃতিগতভাবে ক্রাটাস একজন নিষ্ঠুর ব্যক্তি হলেও সে একজন ভালো যোদ্ধা।

চিৎকার, দাপাদাপি, দেবতাদের উদ্দেশ্যে শপথ ইত্যাদি করতে করতে মুখে ফেনা তুলে যখন সে আর কথা বলতে পারছিল না, ততক্ষণ আমি অপেক্ষা করলাম। তারপর আমি শান্তকণ্ঠে বললাম, একটা কথা আমি বলতে ভুলে গিয়েছিলাম জেনারেল ক্রাটাস। হুই আর রেমরেমকে আমি আমার সাথে ক্রিটে নিয়ে যেতে চাই। আমার দৃঢ় বিশ্বাস আপনি তাদের বদলি উপযুক্ত সেনাকর্মকর্তা খুঁজে নিতে পারবেন।

ক্রাটাস বাকরুদ্ধ হয়ে কিছুক্ষণ আমার দিকে রইল, তারপর হঠাৎ সে হাসতে শুরু করলো। হাসির দমকে তার সারা শরীর কেঁপে উঠলো, টলতে টলতে পিছু হটে তার বিশাল বপু নিয়ে সে ধপাস করে চেয়ারে বসে পড়লো। এই চেয়ারটা বিশেষ করে তার জন্যই তৈরি করা হয়েছে আর সে যেখানেই যায় এটা সাথে নিয়ে যায়। কিন্তু এখন তার ওজনের ভারে চেয়ারের জোড়গুলো শব্দ করে প্রায় আলগা হয়ে যাবার জোগাড় হয়েছে।

যেভাবে সে হঠাৎ হাসতে শুরু করেছিল, ঠিক সেরকমভাবে হঠাৎ হাসি থামিয়ে নিচু হয়ে পোশাকের ঘের উঠিয়ে মুখ মুছতে লাগলো। এতে তার পুরুষাঙ্গ পুরোপুরি অনাবৃত হয়ে সবার চোখের সামনে উন্মুক্ত হয়ে পড়লো। এরপর টিউনিকের ঘের হাঁটুর কাছে নামিয়ে দিয়ে সে স্বাভাবিক কণ্ঠে ফারাওকে উদ্দেশ্যে করে বলতে শুরু করলো, মহামান্য, তায়তার পরিকল্পনায় কিছু ভালো দিক দেখা যাচ্ছে। একমাত্র সে এই পরিকল্পনার কথা ভাবতে পারে এবং সভাসদদের সামনে তুলে ধরার মতো বুকের পাটা একমাত্র তারই আছে। তারপর সে গভীর অনুশোচনার ভান করে নিজের কপাল খামচে ধরে গভীরভাবে বললো, আমাকে ক্ষমা করুন ভদ্রমহোদয়গণ, আমি হয়তো ভুল রূপক ব্যবহার করে ফেলেছি। তারপর আবার সে হাসিতে ফেটে পড়লো।

আমার বিশেষ অঙ্গটির অভাবের দিকে ইঙ্গিত করে তার রসিকতা করা সত্ত্বেও আমি ভাবলেশহীন চেহারা করার চেষ্টা করে বললাম, তাহলে আমি মনে করতে পারি যে, হুই আর রেমরেম আমার সাথে ক্রিট যাচ্ছে?

নিয়ে যাও তায়তা। সামরিক যশ অর্জনের প্রতি তোমার উচ্চাভিলাষ প্রশংসার যোগ্য। আমার আশীর্বাদসহ আমার সর্বশ্রেষ্ঠ লোকদুজনকে নিয়ে যাও। হয়তো তোমাকে তোমার হাত থেকে ওরা রক্ষা করতে পারবে। যদিও আমার সন্দেহ কেউ হয়তো তা পারবে না।

.

ব্যবিলন যাত্রার প্রস্তুতি শেষ করতে প্রায় দুইমাস লেগে গেল।

আমার বেশি দুশ্চিন্তা ছিল দুই রাজকুমারী আর তাদের সফরসঙ্গীদের স্বাচ্ছন্দ্য আর নিরাপত্তা নিয়ে। তাদের নিত্যকার প্রয়োজন মেটাবার জন্য ক্রীতদাস আর ভৃত্যের ৮৩ জনের একটি দল ছিল। এদের মধ্যে ছিল পাঁচক, রান্নাঘরের দাসী, শয়ন কক্ষের পরিচারিকা, পোশাকভাণ্ডারের কত্রী, প্রসাধন ও কেশপরিচর্যাকারী, শরীর মালিশকারী, বাদকদল এবং অন্যান্য পেশাদার আনন্দদানকারী। এছাড়া একজন গণক আর তাদের আধ্যাত্মিক প্রয়োজন মেটাবার জন্য মেয়েরা আনন্দ, ভালোবাসা আর মাতৃত্বের দেবী হাথোরের তিনজন নারী পুরোহিত নেবার জন্য বায়না ধরলো। আমার আপত্তি সত্ত্বেও ওদের বড়ভাই তাদের কোনো আবদারই বিফলে যেতে দিলেন না।

ফারাওয়ের ধনভাণ্ডার এখন উপচে পড়ছে আর তিনি অকৃপণভাবে টাকা ঢালতে লাগলেন। এতোবছর হিসেব করে চলার পর এখন ইচ্ছামতো খরচ করতে পেরে তার বোনদের চেয়েও তিনি বেশি উপভোগ করছেন।

এতে মেয়েরা উৎসাহিত হয়ে তাদের পোষা বেড়াল, বানর, পাখি আর শিকারী কুকুরের পরিচর‍্যা করার জন্য আলাদা লোক নিল। এগুলো ছিল রাজকীয় আস্তাবল থেকে যে বিশটি ঘোড়া বেছে নেওয়া হয়েছিল তার সহিস আর অন্যান্য লোকবলের অতিরিক্ত।

আমি চেয়েছিলাম মেয়েদের পোশাকপরিচ্ছদ যেন সবচেয়ে উৎকৃষ্ট মানের হয়, যাতে ক্রিটে পৌঁছাবার পর সর্বাধিরাজ মিনোজ আর তার রাজদরবারের অমাত্যদের সামনে ওদের খুবই সুন্দর দেখায়। এ-বিষয়ে ফারাও আমাদের সাথে পরামর্শ করলেন, তারপর আমি দুই রাজকন্যার প্রত্যেকের জন্য যে চমৎকার পোশাকগুলো নকশা করেছিলাম, সেগুলো কাটা আর সেলাই করার জন্য মিসরের সর্বশ্রেষ্ঠ দর্জিদের নিয়োগ দেওয়া হল।

মেয়েদেরকে সাথে নিয়ে আমি থিবসের বাজারের বিভিন্ন দোকান ঘুরে। প্রচুর চোখধাঁধানো গহনা কিনে নিয়ে এলাম। এগুলো দেখলে মিনোজ আর তার সভাসদরা আমাদের রাজ্যের সম্পদ আর গুরুত্ব বুঝতে পারবে। থিবস থেকে যাত্রা শুরু করার এক সপ্তাহ আগে তেহুতি আর বেকাথা একে একে সমস্ত পোশাক আর গহনা পরে ফারাও আর আমার সামনে এসে দাঁড়াল। আমি ওদের দেখে সন্তুষ্ট হয়ে ভাবলাম, যে কোনো মানুষ, সে রাজা হোক আর সাধারণ মানুষ হোক এদের দুজনের সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ না হয়ে পারবে না।

সফরের প্রস্তুতির এ-পর্যায়ে এসে মেয়েদুটোর উৎসাহ উদ্দীপনা বেড়ে গেল। তাছাড়া লক্সিয়াস যখন ওদেরকে ক্রিট দ্বীপের বর্ণনা দিল তখন ওরা আরও উত্তেজিত হয়ে পড়লো। ওরা জীবনে কখনও সমুদ্র দেখেনি আর সমুদ্র পাড়িও দেয়নি। উঁচু পর্বত কিংবা উঁচু গাছের ঘন জঙ্গলও দেখেনি। ওরা কখনও সেই পর্বত দেখেনি যার মুখ দিয়ে ধূঁয়া আর আগুন বের হয়। ওরা আমাকে আর লক্সিয়াসকে এসব বিষয়ে রাতজেগে একের পর এক প্রশ্ন করে যেতে লাগলো।

পশ্চিমতীরে অবস্থিত রাজকীয় টাকশাল রাত দিন কাজ করে একশো বড় ক্রেটান রূপার বাট ভেঙে কয়েকগাড়ি রূপার মেম মুদ্রা তৈরি করা হলো। এগুলো দিয়ে আমাদের সফর আর ক্রিট আর বিদেশের অন্যান্য জায়গায় অবস্থানের খরচ জোগানো হবে।

ব্যবিলন পর্যন্ত আমাদের কাফেলা পাহারা দিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য নীল কুমির রক্ষীদলের দুটো অশ্বারোহী পল্টন গঠন করা হল। এটি ছিল মিসরীয় সেনাবাহিনীর সবচেয়ে চৌকশ পল্টন। ফারাও প্রত্যেক সৈন্যকে বর্মসহ নতুন সমরসাজ, উঁচু চূড়াওয়ালা শিরস্ত্রাণ আর ঘোড়াসহ হাঁটুতে পরারও বর্ম দিলেন। এছাড়া অস্ত্র হিসেবে ওরা নিল বাঁকা ধনুক, তৃণ, তরবারি এবং ঢাল। এসব অস্ত্র আর বর্ম তৈরির খরচ পড়লো দুই হাজার রূপার ডেবেনেরও বেশি। যাইহোক এই জাঁকালো অস্ত্রশস্ত্র ইত্যাদি দেখার পর যে কেউ চমকে যাবে।

আমি খরচের কথাটা বলার পর ফারাও বললেন, আমাদের মিসরের অস্তিত্বের খাতিরে এটি সামান্য খরচ। এ-বিষয়ে আমার সাথে এখন অভিযোগ তুলে লাভ নেই। এগুলো সব তোমার পরিকল্পনা তায়তা। এরপর আমি আর কোনো কথা বলতে পারলাম না।

সফরের প্রস্তুতি এতো সুন্দরভাবে চলছিল যে, আমি বিন্দুমাত্র টের পাইনি যে রাজকুমারী তেহুতি এতে গভীরভাবে নিজেকে জড়িয়েছিল আর সেকারণেই সবকিছু এতো সুন্দরভাবে হচ্ছিল।

.

এপিফি মাসের শেষ দিনে আমি থিবস থেকে যাত্রা শুরু করতে চেয়েছিলাম, কেননা এই মাসটি সবসময় আমার জন্য শুভ ছিল। যাইহোক মল ত্যাগ করার পর সদ্য ত্যাগ করা মলের সামান্য নমুনা যখন আমি একটি পাত্রে আমার পছন্দের ভবিষ্যদ্বক্তার কাছে দিলাম, তিনি এটি পরীক্ষা করে সাবধান বাণী উচ্চারণ করে বললেন যে, এই তারিখটি শুভ নয়। এটা এড়াতেই হবে।

তিনি আমাকে মেসোর মাসের প্রথম দিন পর্যন্ত যাত্রা বিলম্বিত করতে উপদেশ দিলেন। এ-যাবত তার ভবিষ্যদ্বাণী সবসময় বিশ্বাসযোগ্য ছিল। তাই আমি তার উপদেশ মতো আমার দুই রাজকুমারীসহ কাফেলার সকলকে সফর পিছিয়ে দেয়ার কথা জানিয়ে দিলাম।

কোনো খবর না দিয়েই এক ঘন্টার মধ্যেই দুই রাজকুমারী ঝড়ের বেগে প্রাসাদে আমার বাসস্থানে এসে হাজির হল। দলনেতা ছিল তেহুতি আর সবসময়ের মতো বেকাথা একনিষ্ঠভাবে তার বড়বোনের অনুগামি হিসেবে হাজির হল।

তুমি কথা দিয়েছিল তাতা! আর এখন কীরকম নিষ্ঠুরভাবে আমাদের আনন্দ মাটি করতে পারলে তাতা? কত যুগ ধরে আমরা এই দিনটির জন্য অপেক্ষা করেছিলাম। তুমি কি আমাদেরকে আর ভালোবাসো না?

আমি দুর্বলচিত্ত নই, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আমি ইস্পাত কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে পারি, তবে আমার দুই রাজকুমারীর ক্ষেত্রে অবশ্যই নয়। ওরা যখন একত্রে আক্রমণ করে, তখন কোনো মানুষের পক্ষে তা প্রতিহত করা সম্ভব নয়, এমনকি আমিও পারি না।

পরদিন ভোর হতেই আমি নীলনদ পার হয়ে ঘোড়ায় চড়ে রাজকীয় টাকশালের দিকে চললাম। রাজকুমারীদের দাবীমতো আমি সেখানে যাচ্ছিলাম সফরের পেছানো তারিখটা জারাসকে জানাতে আর তাকে বলতে যে সফর শুরুর আগেই যেন সে শেষ দশ বস্তা রূপার মেম মুদ্রা রাজপ্রাসাদের রাজকীয় ভাণ্ডারে জমা দেয়।

সফরের জন্য আমরা দশ লাখের বেশি রূপা নিয়ে যাচ্ছিলাম। এপরিমাণ রূপা দিয়ে একটি রণতরী-বহর আর ভাড়াটে সেনার পুরো একটি বাহিনী গড়ে তোলা যায়।

টাকশালে ঢোকার পর দেখলাম একটা কামারশালার মতো ভেতরে ভীষণ গরম আর প্রচণ্ড শব্দ হচ্ছে। কামারের হাপরের আগুনের শিখার গর্জন আর হাতুড়ির শব্দে কানে তালা লেগে যাচ্ছে।

জারাসকে মেঝেতে দেখতে পেলাম। খালি গায়ে সে মাথার উপর একটা ব্রোঞ্জের হাতুড়ি তুলে ঘুরাচ্ছে। পেশিবহুল বাহু ঘামে চকচক করছে আর মুখ গাল বেয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে। এই ছেলেটি এমন চরিত্রের যে, কোনো কাজ থাকলে তা না করে অলস বসে থাকতে পারে না। একজন উচ্চ পদস্থ সামরিক পদধারী হওয়া সত্ত্বেও সে টাকশালের একজন সাধারণ শ্রমিকের মতো মনেপ্রাণে পরিশ্রম করছে।

তাকে দেখে আমি খুশি হলাম। বেশ কয়েক সপ্তাহ তার সাথে দেখা হয়নি আর আমি প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম যে, তামিয়াতে অভিযানে একসাথে থাকার সময় আমি তার কতটা ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়েছিলাম। হঠাৎ আমার মনে দুঃখ হল যে ব্যবিলন আর কুনুসসের দীর্ঘ অভিযানে তাকে আমার ডান হাত হিসেবে নিতে সাহস পাচ্ছি না।

জারাস আমাকে দেখেই আমার দিকে তাকাল। তারপর হাতুড়িটা পাথরের মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলে হাত উঁচিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে দাঁত বের করে হাসলো।

দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব থাকা সত্ত্বেও আমাকে তার স্বাগত জানাবার আন্তরিক ভঙ্গি দেখে আমি অবাক হলাম। সে সামনে এগিয়ে এসে বললো, আমি ভেবেছিলাম তুমি আমাকে ভূলে গিয়েছ আর এখানে পঁচতে ফেলে রেখে গেছ। তবে আমার জানা উচিত ছিল যে, তোমার মতো একজন মানুষ কখনও তার বন্ধুকে ভুলে যেতে পারে না। আমি আমার বর্ম পলিশ করে রেখেছি আর তরবারিও ধার দিয়ে রেখেছি। এখন তুমি হুকুম করলেই আমি যাওয়ার জন্য প্রস্তুত।

আমি হতবুদ্ধি হয়ে পড়লাম আর অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে তাকে সাথে না নেওয়ার কথাটা সরাসরি বলতে পারলাম না।

একটু হাসার চেষ্টা করে বরলাম, আমিও তোমাকে কম আশা করিনি। কিন্তু তুমি কী করে জানলে আর কোনো কথা বলতে পারলাম না, কেননা আমার নিজেরই কোনো ধারণা নেই সে কি বলতে চাচ্ছে।

আজ সকালেই যুদ্ধ পরিষদ থেকে আর্দালি নির্দেশটা নিয়ে এসেছিল। তবে আমি জানতাম তুমি নিশ্চয়ই আমাকে নেবার কথা বলেছে। তারপর একটু হেসে আবার বললো, উপরের মহলে তুমি ছাড়া আমারতো আর কোনো বন্ধু নেই।

নির্দেশে কার সীলমোহর ছিল জারাস?

নামটা জোরে উচ্চারণ করতে সাহস পাচ্ছি না, তবে তারপর চারপাশে তাকিয়ে বেশ গোপনীয়তা নিয়ে সে তার কোমরের পেছনে ঝুলানো থলিটা থেকে সাবধানে একটা ছোট প্যাপিরাস কাগজ বের করলো। তারপর খুব যত্ন আর সম্মানের সাথে কাগজটা আমার হাতে দিল।

কাগজটার উপর সীমাহরটা দেখেই চিনতে পেরে আমি চমকে উঠলাম। ফারাও? আমি অবাক হলাম যে এতে সামান্য বিষয়ে ফারাও নিজেকে জড়িত করেছেন।

আর কে? এই কথা বলে জারাস আমার দিকে তাকাল, আমি কাগজটির ভাঁজ খুলে পড়লাম। পরিষ্কার আর বেশ ছোট একটি নির্দেশ।

এখনি প্রভু তায়তার সরাসরি অধীনে নিজেকে উপস্থিত কর। এরপর থেকে তিনি তোমাকে যেসব নির্দেশ দেবেন, শেষ নিঃশ্বাস থাকা পর্যন্ত তা নিসংকোচে পালন করবে।

এবার জারাস গলা নামিয়ে প্রায় ফিসফিস করে বললো, এবার আমরা কোথায় যাচ্ছি তায়তা? আর সেখানে গিয়ে কী করবো আমরা। নিশ্চয়ই জোর লড়াই হবে তাই না?

আমি দৃঢ়ভাবে মাথা নেড়ে বললাম, সময় হলেই এই প্রশ্নের উত্তর দেব। এমুহূর্তে এর বেশি কিছু বলতে পারবো না। তবে প্রস্তুত থেক।

সে হাতমুঠো করে আমাকে অভিবাদন করলো। তবে দাঁত বের করা হাসিটা থামালেও চোখদুটো চকচক করছিল।

মুদ্রা সরবরাহের বিষয়ের আলাপটা শেষ করার পর দ্রুত প্রাসাদে ফিরে গেলাম। আমাকে এখুনি ফারাওয়ের সাথে দেখা করে জারাসকে দেওয়া তার নির্দেশটা বাতিল করাতে হবে। তবে আগাম খবর না দিয়ে আমিও সরাসরি রাজার সামনে যেতে পারি না। যেকোনো লোকের ফারাওয়ের সাথে সাক্ষাত করার একটি কঠোর নিয়ম পালন করা হয়।

রাজপ্রাসাদে ফারাওয়ের প্রাসাদকক্ষের পাশের একটি কামরায় বেশ কয়েকজন লেখক মাটিতে বসে তুলি দিয়ে ঈজেলের উপর বিভিন্ন রাজকীয় বার্তা আর নির্দেশ লিখছিল। প্রধান লেখক আমাকে দেখেই চিনতে পেরে

এগিয়ে এলো, তবে সে কোনো সাহায্য করতে পারলো না।

ফারাও ভোরেই প্রাসাদ থেকে বের হয়ে গেছেন। কখন ফিরবেন কেউ জানেনা। আমি জানি এখানে থাকলে তিনি অবশ্যই আপনার সাথে কথা বলতেন প্রভু তায়তা। আমার মনে হয় আপনি একটু অপেক্ষা করে দেখতে পারেন।

একথার উত্তরে কিছু বলার আগেই করিডোরের শেষ প্রান্ত থেকে ফারাওয়ের কণ্ঠস্বর শোনা গেল। পেছনে একদল রাজকর্মকর্তা আর অমাত্য নিয়ে ফারাও দৃঢ়পদক্ষেপে লেখার কামরায় ঢুকলেন। আমাকে দেখেই কাছে এসে আমার কাঁধে এক হাত রেখে বললেন, তোমাকে এখানে পেয়ে ভালোই হল। আবার তুমি আমার মনের কথা টের পেয়েই এসেছ তাতা। আমি নিজেই অবশ্য তোমাকে আসার জন্য খবর পাঠাতাম। এসো আমার সাথে। কাঁধে হাত রেখেই তিনি আমাকে ভেতরের কামরায় নিয়ে গিয়ে কতগুলো জটিল বিষয় নিয়ে আলাপ শুরু করলেন। তারপর হঠাৎ আমার সাথে কথা শেষ করার পর তার সামনে নিচু একটি টেবিলের উপর রাখা কতগুলো কাগজের দিকে মনোযোগ ফেরালেন।

আমি আপনার সাথে একমুহূর্ত কথা বলতে চাই মেম। তিনি কাগজ থেকে মাথা তুলে আমার দিকে তাকালেন। ক্যাপ্টেন জারাস আর তার প্রতি নির্দেশের বিষয়টা

ফারাও একটু হতবুদ্ধি হয়ে তাকিয়ে বললেন, কে? কিসের নির্দেশ?

ক্যাপ্টেন জারাস, যে আমার সাথে তামিয়াত গিয়েছিল।

এবার তিনি উত্তর দিলেন, ওহ, সেই লোক! হ্যাঁ, যাকে তুমি ক্রিটে তোমার সাথে নিয়ে যেতে চেয়েছ। আমি বুঝলাম না তাকে সাথে নেবার জন্য আমার অনুমতির কি প্রয়োজন আর তুমি নিজেই বা কেন এ-ব্যাপারে আমার সাথে সরাসরি কথা বললে না। আমার বোনদেরকে কোনো বিষয়ে মধ্যস্থতা করার জন্য বলাতে তোমার চরিত্র নয়। তারপর আবার কাগজের দিকে নজর ফিরিয়ে দিয়ে বললেন, যাইহোক কাজটা হয়ে গেছে। আশা করি তাতা তুমি সন্তুষ্ট হয়েছ, তাই না?

আমি অবশ্যই সন্দেহ করেছিলাম এই নির্দেশের পেছনে কে আছে, তবে আমার রাজকুমারীদের বুদ্ধিমত্তা আর কূটকৌশল নিয়ে বেশি মাথা ঘামায় নি। এবারই সে প্রথম সামরিক নির্দেশের শৃঙ্খলায় সরাসরি হস্তক্ষেপ করেছে। এখন আমাকে তড়িৎ যে কোনো একটি সিদ্ধান্ত নিতে হবে, হয় কাপুরুষের মতো আত্মসমর্পণ করতে হবে আর নয়তো রাজকুমারী তেহুতির সাথে বিরোধে জড়িয়ে পড়তে হবে, যে কোনোদিন নিজ স্বার্থে তার উচ্চ রাজকীয় ক্ষমতা ব্যবহার করেনি। কাজেই আমি মাথা নোয়ালাম।

যা অনিবার্য তা মেনে নিয়ে বললাম, আপনি সত্যি মহান, হে মিসরাধিপতি, আমি সত্যি কৃতজ্ঞ।

.

সমস্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়ে যাবার পর কাফেলা থিবসে থেকে যাত্রা শুরু করার জন্য প্রস্তুত হতেই আমি এটনকে একটা বার্তাবহ কবুতর ছাড়তে বললাম। এটি এর জন্মস্থান ব্যবিলনে মিসরীয় দূতাবাসের উদ্দেশ্যে উড়ে যাবে। এতে আমি আমাদের রাষ্ট্রদূতকে অনুরোধ জানিয়ে বার্তা পাঠালাম, যেন তিনি আক্কাদ আর সুমেরের রাজা নিমরদকে খবর দেন যে, রাজকুমারীরা একটি কূটনৈতিক সফরে তার রাজধানীর উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়েছেন। আর ফারাও ত্যামোস অত্যন্ত খুশি হবেন যদি মহামান্য রাজা নিমরদ রাজকুমারীদেরকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান।

চারদিন পর আরেকটি কবুতর ব্যবিলন থেকে রাজা নিমরদের বার্তা নিয়ে থিবসে ফিরে এলো।

দুই দেশের মাঝে সুসম্পর্কের কথা মনে করিয়ে দিয়ে রাজা জানিয়েছেন তিনি অবশ্যই রাজকুমারীদের সাদর অভ্যর্থনা জানাবেন এবং আশা করছেন যে, রাজকুমারীরা নিশ্চয়ই এখানে তাদের অবস্থান উপভোগ করবেন।

এই বার্তা পাওয়ার সাথে সাথে আমি জারাসকে একটি শক্তিশালী অগ্রগামী দল নিয়ে থিবস থেকে লোহিত সাগরের সবচেয়ে কাছের উপকূল পর্যন্ত পথটি নিষ্কন্টক করার জন্য পাঠালাম। অজুহাত দেখালাম যেন আমাদের পথে কোনো দস্যুদল হামলা করার জন্য ওঁত পেতে নেই তা নিশ্চিত করতে যাচ্ছে। তবে আসল উদ্দেশ্যে ছিল তাকে আমার প্রিয় তেহুতির কাছ থেকে দূরে সরিয়ে রাখা।

আমি বুঝতে পারলাম না তেহুতি কী করে আমার সব পরিকল্পনা জেনে ফেলে। সবজায়গায় তার গুপ্তচর আছে আর হারেম হচ্ছে ষড়যন্ত্র আর গুজবের একটি উর্বর ক্ষেত্র।

অগ্রগামী দল নিয়ে যাবার জন্য জারাসকে সকালেই নির্দেশ দিয়ে আমি বাগানে বসে এককাপ চা খেতে খেতে গতকালের বিভিন্ন কাজের খতিয়ান নিয়ে ভাবছিলাম। ঠিক তখনই একটা ছায়ার মতো নীরবে সে আমার পেছন দিয়ে এসে দুই ঠাণ্ডা হাত দিয়ে আমার চোখ ঢেকে কানের কাছে ফিসফিস করে বললো, কে বলতো?

আমি বলতে পারবো না কে এটা মহামান্য।

ওহহ! তুমি নিশ্চয়ই উঁকি দিয়ে দেখেছ! সে প্রতিবাদ করে উঠলো তারপর আমার কোলে বসে দুই হাত দিয়ে আমার গলা জড়িয়ে ধরে বললো, আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি তায়তা। তুমি যা বল তাই আমি করতে পারি। এবার আমার একটা কথা রাখবে?

অবশ্যই রাখবো, রাজকুমারী। যে কাজে তোমার নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয় আর মিসরের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হয়, সে কাজ ছাড়া আর যেকোনো কাজ আমি করতে রাজি।

আমার এ-ধরনের কথা শুনে সে আতঙ্কিত হয়ে বললো, না না, এরকম কোনো ধরনের অনুরোধ আমি কখনও করবো না। যাইহোক এই ভয়ঙ্কর মরুভূমি উপর দিয়ে সুমের আর আক্কাদ যেতে অনেক সময় লাগবে। কোনো ধরনের আনন্দ না পেয়ে আমার বোন আর আমার খুবই একঘেয়ে লাগবে। তবে খুব মজা হতো যদি একজন কবি সাথে থেকে আমাদের গান আর কবিতা শোনাতো।

এজন্যই কি তুমি ক্যাপ্টেন জারাসকে এই অভিযানে নেবার জন্য তোমার ভাই ফারাও ত্যামোসকে বলেছিলে?

সে চোখ বড় বড় করে অবাক হয়ে বললো, ক্যাপ্টেন জারাস! তিনিও কি আমাদের সাথে যাচ্ছেন? কি চমৎকার তাই না? তিনি তো একজন জন্মগত কবি আর কী চমৎকার তার গানের গলা। আমি জানি তুমি তাকে পছন্দ কর। তিনি তো আমার আর বেকাথার সাথে দিনের বেলা ঘোড়ায় চড়ে যেতে যেতে আমাদের গান আর কবিতা শোনাতে পারেন, তাই না?

প্রথম কথা হল ক্যাপ্টেন জারাস একজন প্রথম সারির সেনাকর্মকর্তা এবং যোদ্ধা, কোনো ভ্রাম্যমাণ চারণ কবি নন। আমাদের কাফেলায় একদল পেশাদার গায়ক-বাদক, অভিনেতা-অভিনেত্রী, ভাড়, যাদুকর, আর একটি ভল্লুকসহ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অন্যান্য পশুও আছে। জারাস আমাদের কাফেলার আগে আগে অগ্রগামী দলের দায়িত্বে থাকবে। সে আমাদের সবার নিরাপত্তার স্বার্থে সামনের পথে কোনো বাধা বিপত্তি থাকলে তা দূর করবে। বিশেষত তোমার আর তোমার ছোট বোনের নিরাপত্তার স্বার্থেই তা করবে।

এবার তেহুতির ঠোঁট থেকে মন গলানো হাসিটা মুছে গেল। সে একটু পেছনে হেলে শীতল দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে বললো, কেন এমন করছো আমার সাথে তায়তা? আমি তো সামান্য একটা আবদার করেছি।

আমি তার ডান হাতটি উপুড় করে ধরে হিরার আংটিটার দিকে দেখিয়ে বললাম, এটাই আমার কারণ, রাজকুমারী।

সে এক ঝটকা মেরে হাতটা সরিয়ে নিয়ে পেছনে লুকাল। আমরা পরস্পরের দিকে তাকিয়ে রইলাম।

বুঝা গেল সে যুদ্ধের সীমানা মেলে ধরেছে আর তার রূপক ছুরিও বের করেছে। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে একবারও পেছন না ফিরে চলে গেল।

.

মেসোর মাসের প্রথম দিনে জারাস অগ্রগামী দলটি নিয়ে লোহিত সাগরের তীরে সাগাফা বন্দরে পৌঁছলো। সেখানে পৌঁছেই সে একটা কবুতর উড়িয়ে দিয়ে খবর পাঠাল যে, সাগরের তীরে ধাউ আর বজরার একটি বহর সে খুঁজে পেয়েছে। এগুলো আমাদের পুরো কাফেলাটি সাগর পার করে দেবার জন্য প্রস্তুত হয়ে রয়েছে। এই খবর পাওয়ার সাথে সাথে আমি সামনে এগোবার নির্দেশ দিলাম।

কাফেলার একেবারে সামনে থেকে ফারাও ঘোড়ায় চড়ে আমাদের সাথে চললেন। নীল নদীর কাছে পাহাড়টির কাছে পৌঁছেই সবাই ঘোড়া থেকে নেমে পড়লো।

ফারাওয়ের দুই পাশে কুশন লাগানো টুলে দুই রাজকন্যা বসলেন। সভাসদ আর উচ্চপদস্থ রাজকর্মকর্তারা এই তিনজনকে ঘিরে একটি বৃত্ত তৈরি করলো। তারপর ফারাও আমাকে ডাকতেই আমি তার কাছে এসে হাঁটুগেড়ে বসলাম। তিনি আমার সামনে দাঁড়িয়ে সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললেন।

আমি আমার সকল প্রিয় এবং অনুগত প্রজাদেরকে এই অনুষ্ঠানের সাক্ষী হতে আহ্বান জানাচ্ছি।

তেহুতি আর বেকাথাসহ সকলে বলে উঠলো, ফারাওয়ের জয় হোক! তার ইচ্ছাকে সম্মানিত আর মান্য করা হোক!

ফারাও দুই হাত দিয়ে শিকারী বাজপাখির ছোট্ট একটি সোনার মূর্তি মাথার উপর তুলে ধরলেন।

এটা আমার বাজপাখির সীলমোহর আর আমার প্রতীক। এর বহনকারী ঈশ্বর-প্রদত্ত আমার সকল অধিকার নিয়ে কথা বলবে। উপস্থিত সকলে এটি লক্ষ্য করুন আর আমার ক্ষমতা আর আমার ভয়ানক রোষ সম্পর্কে সতর্ক হোন।

তখনও হাঁটু গেড়ে বসা অবস্থায় থেকে আমি দুই হাত পেতে সামনে ধরতেই ফারাও ঝুঁকে বাজপাখির সীলমোহরটা আমার হাতে দিলেন।

বিচক্ষণতার সাথে এটা ব্যবহার করুন সম্মানিত তায়তা। আবার পরবর্তী সাক্ষাতের সময় এটা আমাকে ফেরত দিন।

আমি পরিষ্কার কণ্ঠে চেঁচিয়ে বললাম, হে মিসরাধিপতি, আপনার আদেশ শিরোধার্য।

তিনি আমাকে ধরে দাঁড় করিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন, হোরাস এবং মিসরের অন্যান্য সকল দেবতার শুভ দৃষ্টি আপনার উপর বর্ষিত হোক।

তারপর তিনি ঘুরে তার বোনদেরকে বিদায় জানালেন। এরপর তিনি ঘোড়ায় চড়তেই দেহরক্ষীর দল তাকে ঘিরে দাঁড়াল। তারপর ঢাল বেয়ে নেমে দ্রুত দলবলসহ নীলনদের তীরে থিবসের দেয়ালের দিকে চললেন। কাফেলার শেষ অংশটুকু পার হয়ে দূরে অদৃশ্য হয়ে গেলেন।

টিলার উপরে ক্রীতদাসেরা আমাদের বসার জন্য উটের লোমের তৈরি আসন বিছাল আর রোদ থেকে ছায়া দেবার জন্য মাথার উপর চাঁদোয়া টাঙাল। আমরা নিচে দূরে ফারাও আর তার সভাসদদের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলাম। ইতোমধ্যে কাফেলার অগ্রভাগ আমাদের কাছে এসে পাশ কাটিয়ে সামনে এগিয়ে চললো।

প্রথমে ছিল কুমির রক্ষীদলের একটি পল্টন। তাদের ঠিক পেছন পেছন চলেছে পঞ্চাশটি উট আর এগুলোর আরব চালক। প্রতিটা উটের পিঠের কুঁজের দুই পাশে দুটো করে চারটি পানিভরা বিশাল চামড়ার মশক ঝুলছে। এগুলোর উপর নির্ভর করেই আমাদেরকে আরবের বিশাল মরুভূমি পাড়ি দিতে হবে।

পানির মশকবহনকারী উটের সারির পেছনেই ঘোড়ায় চড়ে চলেছে কুমির রক্ষীবাহিনীর আরেকটি পল্টন। এরা পানির সরবরাহটি রক্ষা করবে আর যদি আমাদের উপর কোনো শত্রুর হামলা হয় তখন প্রয়োজন পড়লে পেছনে রাজকুমারীদের নিরাপত্তার কাজে সহায়তা করবে।

যদিও আমি সিনাই উপদ্বীপ থেকে অনেক দূরে দক্ষিণ আর পূর্ব দিকে দিয়ে আমাদের যাত্রাপথ পরিকল্পনা করেছিলাম, তারপরও আমি কোনো ঝুঁকি নিতে রাজি নই। হাইকসোরা এই জায়গাটি তাদের অধীনস্থ এলাকা মনে করে আর গোরাব কোনোভাবে আমাদের পরিকল্পনা জানতে পারলে তার রথিবাহিনী পাঠিয়ে আমাদের যাত্রায় বাধা দিতে পারে।

এই দুই রক্ষীবাহিনীর পেছনে আরও পঞ্চাশটি উট তাঁবু, আসবাবপত্র আর অন্যান্য সরঞ্জাম বয়ে নিয়ে চলেছে। যাত্রাপথে প্রতিটি বিশ্রাম নেবার জায়গায় তাবু গাড়তে এগুলো প্রয়োজন হবে।

এর পেছনে পায়ে হেঁটে চলেছে তবু অনুসরণকারী, ভৃত্য আর ক্রীতদাসের দল। কাফেলার পরের অংশে রয়েছে আরও বিশটি এক কুঁজওয়ালা উট। এগুলো রূপার মুদ্রার ভারী বস্তাগুলো বহন করছে।

সবার শেষে ছিল কাফেলাকে পাহারা দিয়ে নিয়ে যাওয়া কুমির রক্ষীবাহিনীর তৃতীয় পল্টন, অতিরিক্ত ঘোড়া, উট আর মালবাহী গাড়ি। আমরা যেখানে বসেছিলাম তার সমান সমান এগুলো আসতেই আমি আমাদের তবু গুটিয়ে নিতে নির্দেশ দিলাম।

ঘোড়ায় চড়ে সামনে এগিয়ে আমরা মরুভূমির উপর দিয়ে চলা এক লিগ দীর্ঘ এই মিছিলের ঠিক মধ্যখানে আমাদের নির্দিষ্ট জায়গায় এসে পৌঁছলাম। বেয়াড়া রকম আকৃতির আর ধীর গতিতে চলা মানুষ আর পশুর এই দীর্ঘ মিছিলটি দশ দিন পর লোহিত সাগরের পশ্চিম তীরে পৌঁছল।

.

সাগাফা বন্দর থেকে ঘোড়া ছুটিয়ে এসে জারাস আমাদের সাথে দেখা করলো। সে আর তার প্রহরী ঘোড়ায় চড়ে কাফেলার পেছন দিকে একটু পিছিয়ে রাজকীয় দলের কাছে পৌঁছতেই দুই রাজকুমারীকে দেখতে পেয়ে ঘোড়া থেকে নামলো।

তেহুতির সামনে এক হাঁটুগেড়ে বসে সে এক হাত মুষ্টিবদ্ধ করে তাকে অভিবাদন জানাল। প্রত্যুত্তরে তেহুতিও তার দিকে তাকিয়ে একটি প্রাণোচ্ছল হাসি দিল।

ক্যাপ্টেন জারাস, আমি খুবই খুশি যে, ব্যবিলন পর্যন্ত সফরে আপনাকে আমরা পাবো। তামিয়াত দুর্গ থেকে আপনি আর প্রভু তায়তা ফেরার পর, আবৃত্তির ঢঙে সেখানে অভিযানের যে চমৎকার ধারা বর্ণনা আপনি দিয়েছিলেন, তা আমার ভালো মনে আছে। আমি খুব খুশি হবো যদি আপনি আমাদের সাথে আজ নৈশভোজে অংশ নেন আর কবিতা আবৃত্তি করে শোনান। আর ব্যবিলন পর্যন্ত সফরের বাকি অংশের বিষয়ে আমার ইচ্ছা এবং নির্দেশ যে, আপনি কাফেলা পাহারা দলের নেতৃত্বের দায়িত্ব অন্য কর্মকর্তার হাতে দিয়ে সরাসরি আমার বোন আমার নিরাপত্তার দায়িত্ব নেবেন।

আমি তাকে শোনাবার জন্য বেশ জোরে একটা নিঃশ্বাস নিলাম কিন্তু সে আমার চাপা প্রতিবাদ পুরোপুরি উপেক্ষা করে সমস্ত মনোযোগ জারাসের দিকে দিল। জারাসকে বেশ অপ্রস্তুত দেখাচ্ছিল আর উত্তর দিতে গিয়ে সে একটু তোতলাতে লাগলো। এই প্রথম তাকে এরকম করতে দেখলাম।

মহামান্য রাজকুমারী, আপনার নির্দেশ শোনা মানেই তা পালন করা। তবে অনুগ্রহ করে আমাকে ক্ষমা করবেন। আমাকে এখুনি প্রভু তায়তার কাছে হাজির হতে হবে, যার হাতে ফারাও এই কাফেলার নেতৃত্ব দিয়েছেন আর যাকে রাজকীয় বাজপাখির সীল মোহর দিয়ে বিশ্বাস করেছেন।

আমার প্রতি জারাসের বিশ্বস্ততা আর কার হাতে পূর্ণ কর্তৃত্ব রয়েছে, তা তেহুতিকে মনে করিয়ে দেবার চেষ্টা করতে দেখে আমি খুশি হলাম। সে বেচারা এখন তেহুতির কাছ থেকে পালিয়ে আসার জন্য ছটফট করছে।

তার মাথার উপর আঘাত হানা এই রাজকীয় ঝড়ের তাণ্ডব থেকে তাকে উদ্ধার করার চেষ্টা থেকে আমি নিজেকে বিরত রাখলাম। তার কোনো নির্দেশ অমান্য হোক, তেহুতি তা মোটেই সহ্য করে না। তবে সে আবার আমাকে অবাক করলো। জারাসকে থামিয়ে না দিয়ে সে বরং মৃদৃ হেসে মাথা নেড়ে বললো, অবশ্যই তাই করুন ক্যাপ্টেন জারাস। একজন সৈনিক হিসেবে আপনার দায়িত্ব আর সবকিছুর ঊর্ধ্বে।

জারাস আমার পাশে আসতেই আমি একটু পিছিয়ে রাজকুমারীদের কাছ থেকে একটু দূরে সরে এলাম, যাতে ওরা আমাদের কথা শুনতে না পারে। টিলার নিচেই সাগরের তীরে সাগাফার দালানকোঠাগুলো দেখা যাচ্ছে।

আমার ইঙ্গিত পেয়ে জারাস গলা নামিয়ে জানাল যে, আমাদের জন্য অপেক্ষা করার সময় সে সুযোগ পেয়ে একটি দ্রুতগামি ধাউ নিয়ে দূরের সাগর সৈকতে এলো–কুম জেলে পল্লীতে গিয়েছিল। সেখানে গিয়ে সে নিশ্চিত হতে চাচ্ছিল যে, আমাদের বেদুঈন পথপ্রদর্শক আমাদের নির্দেশ পেয়ে তার লোকজন নিয়ে আমাদেরকে আরব মরুভূমি পার করাবার জন্য অপেক্ষা করছে কি না।

সে একই লোক আল-নামজু, যে আমাদেরকে সিনাই উপদ্বীপ পার করে মধ্য সাগরের তীর আর তামিয়াত দুর্গে নিয়ে গিয়েছিল।

জারাস খুশি হয়ে বললো, আপনি জেনে খুশি হবেন যে, আমাদের আসার খবর পাওয়ার পর গত দুই মাস ধরে আল-নামজু এখানে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। তার সাথে তার দুই ছেলেও রয়েছে। তবে সে তাদেরকে সামনে কাফেলা চলার পথে পানির উৎস আর মরুদ্যানগুলো দেখতে পাঠিয়েছে।

আমি তাকে বললাম, শুনে আস্বস্ত হলাম। তারপর এক পাশে তাকিয়ে আবার বললাম, বলে যাও জারাস। মনে হয় তোমার আরও কিছু বলার আছে। সে একটু চমকে তাকাল।

তারপর বললো, আপনি কী করে জানলেন তার কথা থামিয়ে দিয়ে আমি বললাম, আমি কীভাবে জানলাম? আমি এজন্য জেনেছি যে, আমি জানি তুমি কোনো কথা লুকিয়ে রাখতে পারো না। এটাকে একটা দোষের চেয়ে বরং আমি গুণ বলবো।

সে মাথা নেড়ে বললো, আমরা অনেকদিন ধরে বিচ্ছিন্ন হয়ে আছি প্রভু। আমি ভুলে গিয়েছিলাম কীভাবে আপনি মানুষের মনের ভাবনা পড়তে পারেন। তবে আপনার কথাই ঠিক। আমি আরেকটি বিষয় আপনাকে বলতে যাচ্ছিলাম, তবে ভয়ও পাচ্ছিলাম, হয়তো আপনি মনে করতে পারেন যে, আমি শুধু শুধু আতঙ্কে ভূগছি।

আমি তাকে নিশ্চিত করে বললাম, তোমার কোনো কথাই আমাকে এ ধরনের ধারণা করতে দেবে না।

তাহলে বলছি শুনুন, যখন আমরা আল-নামজুর শিবিরে ছিলাম, তখন তিনজন শরণার্থীকে মরুভূমি থেকে সেখানে নিয়ে আসা হয়েছিল। ভীষণ আহত আর পিপাসায় কাতর লোকগুলো খুবই দুর্দশাগ্রস্ত ছিল। সত্যি বলতে কী আল-নামজুর তাঁবুতে আনার কিছুক্ষণের মধ্যেই একজন মারা গেল, আর আরেকজন কথা বলতে পারছিল না।

আমি বললাম, কেন? কী হয়েছিল ওদের?

প্রথমজনের সারা শরীরে গরম তলোয়ারের হ্যাঁকার দাগ ছিল। তার সারা শরীর পুড়ে গিয়েছিল। মরতে পেরে বরং সে দারুণ কষ্ট থেকে মুক্তি পেয়েছে। অন্য লোকটির জীব কেটে ফেলা হয়েছিল, সে একটা পশুর মতো গোঙাছিল।

আমি জারাসকে বললাম, দয়াশীল হোরাসের দিব্যি, কী হয়েছিল ওদের?

তৃতীয় লোকটির তেমন যখম হয়নি। সে জানাল, সে ছিল একটি কাফেলার প্রধান ব্যক্তি। পঞ্চাশটি উট আর সমসংখ্যক নারীপুরুষসহ সে তুরক নগর থেকে লবণ আর তামা নিয়ে আসছিল। পথে দস্যু জাবের আল-হাওয়াসাঈ তাদের উপর হামলা করে। এই লোকটি শেয়াল নামেই পরিচিত।

আমি বললাম, আমি তার কথা শুনেছি। আরবের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর লোক সে।

তাকে ভয় করার অনেক কারণ আছে। শুধু খেলাচ্ছলে সে কাফেলার অন্যান্য নারীপুরুষদের খাসী করে আর নাড়িভুড়ি বের করে ফেলে। অবশ্য এই শেয়াল আর তার লোকেরা বন্দীদেরকে হত্যা করার আগে নারীপুরুষ সবার। উপর যৌন নির্যাতন চালায়।

এই শেয়াল এখন কোথায়? এই লোক কী জানে সে কোথায় গেছে?

না। সে আবার মরুভূমির বুকে হারিয়ে গেছে। তবে একটা বিষয় নিশ্চিত যে, সে কাফেলার পথে ওঁৎ পেতে থাকবে।

ঠিক সেই মুহূর্তে তেহুতি ঘোড়ায় চড়ে সেখানে উপস্থিত হয়ে জিনে বসে ঘুরে আমাদের দিকে তাকিয়ে বললো, এতো মনোযোগ দিয়ে তোমরা দুজন কী আলাপ করছো? এখানে এসে আমার আর বেকাথার পাশাপাশি চল। আর যদি তুমি জারাসকে গল্প শুনিয়ে থাক তবে আমরাও তা শুনবো।

তার কথা আমিও দুবার না মেনে পারি না।

আমরা দুজনেই ঘোড়া নিয়ে দুই রাজকুমারীর পাশাপাশি চলতে শুরু করলাম। বেশ কৌশল করে তেহুতি আমার আর জারাসের মাঝে তার ঘোড়াটা নিয়ে এলো, যাতে আমরা তাকে না শুনিয়ে কোনো আলোচনা করতে না পারি। সেই মুহূর্তে এবড়োথেবড়ো পাথুরে পথটি একটি পাহাড়ের চূড়ায় এসে শেষ হতেই তেহুতি ঘোড়ার রাশ টেনে ধরে খুশিতে চেঁচিয়ে উঠলো।

দেখো! ঐ যে তাকিয়ে দেখো! এতো চওড়া আর এতো নীল কোনো নদী কখনও দেখেছ? শিংওয়ালা দেবতা হোরাসের দিব্যি, এটা আমাদের নীলনদের চেয়ে একশো গুণ বেশি চওড়া হবে। আমি তো এর অন্য পারও দেখতে পাচ্ছি না।

জারাস তাকে জানাল, এটা নদী নয় মহামান্য। এটি লোহিত সাগর।

তেহুতি সোৎসাহে বললো, কী বিশাল। জারাস তাকে ভালোভাবে চেনে, সে বুঝতে পারেনি যে তেহুতি না জানার ভান করছে। এটি নিশ্চয়ই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সাগর?

জারাস তার ভুল সংশোধন করে অত্যন্ত সম্মানের সাথে বললো, না রাজকুমারী। এটা সমস্ত সাগরের মধ্যে সবচেয়ে ছোট। মধ্যসাগর সবচেয়ে বড় আর জ্ঞানী ব্যক্তিরা অনুমান করে বলেছেন, বিশাল অন্ধকার মহাসাগর, যার উপর পৃথিবী ভাসছে তা আরও বড়।

তেহুতি চোখ বড় বড় করে প্রশংসার দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে, ক্যাপ্টেন জারাস, আপনি তো অনেক কিছু জানেন, প্রায় প্রভু তায়তার মতো। আপনাকে প্রতিদিন কয়েক ঘন্টা বেকাথা আর আমার সাথে ঘোড়ায় চড়ে এসব বিষয় জানাতে হবে।

তেহুতিকে এতো সহজে তার মত থেকে ফেরানো সম্ভব নয়।

.

আরব মরুভূমি পাড়ি দেওয়া গত বছরের তামিয়াত দুর্গের অভিযানের চেয়ে অনেক কষ্টকর আর দুর্গম প্রমাণিত হল। সেবারের অভিযানে দুশো জনের চেয়ে কম লোক নিয়ে দ্রুত কম লটবহর নিয়ে গিয়েছিলাম। মিসর আর সিনাই উপদ্বীপের মাঝে কেবল সুয়েজ উপসাগর পার হতে হয়েছিল। সেটা পঞ্চাশ লিগের চেয়ে কম চওড়া ছিল।

এবার আমাদেরকে সিনাই উপদ্বীপে না ঢুকে যতদূর সম্ভব দক্ষিণ দিক দিয়ে যেতে হচ্ছে। সিনাই উপদ্বীপে ঢুকলে গোরাব তার রথি বাহিনী পাঠিয়ে আমাদেরকে বাধা দিতে পারতো।

বাধ্য হয়েই আমাদেরকে লোহিত সাগরের মূল অংশের সবচেয়ে চওড়া জায়গা দিয়ে পার হতে হচ্ছে। পঞ্চাশটি ভোলা ধাউয়ে এক হাজারের বেশি মানুষ আর পশু নিয়ে প্রায় দুশো লিগের চেয়ে বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে হবে। ছোট নৌকাগুলোতে এক সাথে কেবল দশটা উটের জায়গা হয়। এতে বেশ কয়েকবার পারাপার করতে হবে।

সমস্তু কিছু বিবেচনা করে আমি ধারণা করেছিলাম পুরো কাফেলা আরবে নিতে আমাদের কমপক্ষে দুইমাস লাগবে।

রাজপরিবারকে মিসরীয় তীরে রেখে কাফেলার মূল অংশ সাগর পার হতে শুরু করলো। অভিজ্ঞতা থেকে আমি জানতাম রাজকুমারীদেরকে যাতে একঘেয়েমিতে পেয়ে না বসে সেদিকে দৃষ্টি দিতে হবে, কিংবা ওদের হাতে বেশি অবসর সময়ও দেওয়া যাবে না।

রাজপরিবারকে কাফেলার বাদবাকি অংশ থেকে আলাদা করে রাখা হয়েছিল। আমাদের কাফেলাটি আকারে একটি ছোট গ্রামের মত হলেও এখানে একটি বড় শহরের সবধরনের সুবিধা আর আরাম আয়েশ ছিল।

কয়েকদিন পর পর রাজকুমারীদের নিয়ে আমি শিকারে যেতাম। আমরা মরুভূমির চ্যাপ্টা পায়ের ছোট হরিণ শিকার করতাম কিংবা পাহাড়ে উঠতাম, যেখানে দীর্ঘ বাঁকানো শিংয়ের পাহাড়ি বুনো ছাগলের বিচরণ ছিল। এগুলোতে বিরক্তি ধরে গেলে মেয়েরা সাগরতীরে ঝাঁক বেঁধে থাকা অসংখ্য বুনো হাস আর রাজহংসির উদ্দেশ্যে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিকারি বাজ উড়িয়ে দিত।

অনেকসময় ছোট দ্বীপে বনভোজনের আয়োজন করতাম। মেয়েরা সেখানে সাঁতার কাটতে কিংবা পানির নিচে প্রবাল জঙ্গলে তলোয়ার মাছ আর বড় সামুদ্রিক মাছের উপর বর্শা ছুঁড়ে শিকার করতো।

তবে সকালে আমি ওদেরকে পড়াশুনা করতে বাধ্য করতাম। কাফেলার সাথে দুজন পণ্ডিত নিয়ে এসেছিলাম, যারা ওদেরকে লেখা, গণিত আর জ্যামিতি শেখাত। শ্রেণীকক্ষের কঠিন অধ্যয়নের ফাঁকে ফাঁকে আমোদ ফুর্তি আর মেয়েলি হাসি ঠাট্টাও চলতো। সারাদিনে এটাই ছিল আমার সবচেয়ে প্রিয় সময়। ওরা লক্সিয়াসের সাথে মিনোয়ান ভাষায় আড্ডা দিত। আমাকে বাদ দিত যেন আমি এই ভাষার একটি শব্দও বুঝি না। তিন জনের মধ্যে বয়সে লক্সিয়াস সবচেয়ে বড় হওয়ায় সে ওদের মেয়েলি নিষিদ্ধ আলাপগুলোতে সবজান্তা ভূমিকা পালন করতো। তবে পরিষ্কার বোঝা যেত তার সমস্ত বিদ্যা ছিল পুঁথিগত, তাই বিশদ বিবরণগুলো সে বানিয়ে বানিয়ে বলতো।

এইসব আলোচনার মধ্য দিয়ে আমি ওদের মনে কী ভাবনা চলছে তা জানতে পারতাম।

ওরা ওদের ভালোবাসার গল্প বলতো। লক্সিয়াস রেমরেমকে পছন্দ করতো। তবে তার সামনে হাজির হলে সে একেবারে পাথরের মূর্তির মতো হয়ে যেত। চোখ নামিয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে লজ্জায় লাল হয়ে যেত, মুখে কোনো কথা যোগাত না। আমার মনে হয় রেমরেম রাজকীয় পরিষদের একজন সম্মানিত-সদস্য আর সে নিজে একজন সাধারণ মানুষ এবং বিদেশি, এই সত্যটুকু তার মনে সম্ভ্রম মিশ্রিত ভয় জাগিয়ে তুলতো। তবে রেমরেম যে বয়সে তার চেয়ে দ্বিগুণ বড়, তিনটে বউ আছে আর তার অস্তিত্ব সম্পর্কে সম্পূর্ণ উদাসিন এতে সে কিছু মনে করতো না।

এদিকে বেকাথা বিখ্যাত ঘোড়সওয়ার আর রথি হুইয়ের প্রতি আকৃষ্ট ছিল। সে মোটেই জানতো না যে, যখন তাকে আমি বন্দী করেছিলাম, তখন সে কুখ্যাত অপরাধি বস্তির রক্তের সম্পর্কের ভাই ছিল। আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করে তাকে সভ্য করে তুলেছিলাম। কিন্তু তারপরও অনেক সময় সে বর্বরোচিত আচরণ করতো, বিশেষত কৌতুক করার সময়। বেকাথা তার সাথে রথে চড়তে ভালোবাসতো। যখন সে এবড়োথেবড়ো জমির উপর দিয়ে রথ চালিয়ে নিয়ে যেত, তখন সে দুহাত দিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে প্রচণ্ড জোরে চিৎকার করতো। ওরা অনেক সময় বিভিন্ন ধরনের অর্থহীন রসিকতা করে হাসতে হাসতে লুটিয়ে পড়তো। আর অনেক সময় ভোজ টেবিলে বসে খাওয়ার সময় বেকাথা তার দিকে রুটির টুকরা কিংবা ফল ছুঁড়ে মারতো।

তেহুতি এসমস্ত থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখতো আর কেউ এ বিষয়ে তাকে চাপাচাপি করতো না।

সন্ধ্যায় আমরা বিভিন্ন রকম ধাঁধা, কবিতা, গান গেয়ে আর বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে সময় কাটাতাম।

এভাবেই আমার তত্ত্বাবধানে থাকা এই তিন বালিকাকে আমি বিপজ্জনক কোনো কিছু করা থেকে বিরত রেখেছিলাম। শেষ পর্যন্ত মূল কাফেলা সাগর পার হওয়ার পর আমাদের যাওয়ার সময় এলো।

আথির মাসের পনেরোতম দিনে সূর্য উঠার আগে আমরা সাগর সৈকতে সমবেত হলাম। তেহুতি আর বেকাথার সাহায্যে তিন নারী-পুরোহিত হাথোর দেবীর উদ্দেশ্যে একটি সাদা ভেড়া বলি দিল।

দেবীর কাছে আমরা প্রার্থনা করলাম–যদি তিনি আমাদের প্রতি সদয় হোন এবং নিরাপদে সাগর পার করে দেন তাহলে আমরা তার উদ্দেশ্যে একটি উট বলি দেবো। এই মানতের পর আমরা ধাউয়ে চড়ে রওয়ানা হলাম।

দেবী নিশ্চয়ই আমাদের প্রার্থনা শুনেছেন মিসরের দিক থেকে একটি দমকা হাওয়া পালে লেগে আমাদের নৌবহরকে দ্রুত ভাসিয়ে নিয়ে চললো। সূর্য অস্ত যাওয়ার আগেই আফ্রিকা আমাদের পেছনে ঢেউয়ের নিচে মিলিয়ে গেল।

অন্ধকার হতেই প্রতিটি জাহাজের মাস্তুলের ডগায় একটা করে তেলের প্রদীপ জ্বালিয়ে দেওয়া হল, যাতে একে অপরকে দেখতে পারি। আকাশের তারা দেখে পথ ঠিক রেখে আমরা পুবমুখি চলতে লাগলাম। ভোর হতেই দূরে পরিষ্কার নীল আকাশের বিপরীতে আরবের তটরেখা নজরে পড়লো। সারাদিন দাঁড় বেয়ে চলার পর যখন সূর্য পশ্চিম দিগন্তের এক হাত উপরে এসে দাঁড়িয়েছে, তখন কুমিররক্ষীবাহিনীর পঞ্চাশজন সদস্য হাঁটু পানিতে নেমে ধাউগুলো টেনে সৈকতের শুকনো বালুভূমিতে নিয়ে তুললো। মেয়েরা তাদের সুন্দর ছোট ছোট পা না ভিজিয়ে এশিয়ার মাটিতে পা রাখতে পারলো। আমাদের অভ্যর্থনা জানাবার জন্য আমার পূর্বনির্দেশ মতো রাজকীয় শিবির উঁচুভূমিতে স্থাপন করা হয়েছিল।

তবে এখানে বেশি দেরি করলাম না, কেননা প্রতিদিন প্রচুর মূল্যবান সুপেয় পানি খরচ হচ্ছিল।

মূল কাফেলাটি আর মালপত্র বেশ কয়েকদিন আগেই চলে গেছে। ইতোমধ্যে ওরা নিশ্চয়ই একশো লিগেরও বেশি দূরত্ব পার হয়েছে। আরবভূমিতে নামার পরদিন আমরা ঘোড়া আর উটে চড়ে রওয়ানা দিলাম।

.

সাগর থেকে যতই দূরে এগিয়ে চললাম, ততই সূর্য মাথার উপর প্রচণ্ড তাপ ছড়াতে শুরু করলো। দূপুরের রোদে চলা খুবই কষ্টকর হয়ে দাঁড়াল। এরপর থেকে আমরা শেষ বিকেলের দিকে যখন সূর্যের তাপ কমে আসে তখন চলতে লাগলাম। সারারাত চলার পর ঘোড়া আর উটগুলোকে পানি দেওয়ার জন্য মধ্যরাতে কেবল এক ঘন্টা থামলাম। মূল কাফেলা থেকে পথের পাশে এগুলো আমাদের জন্য রেখে দেওয়া হয়েছিল। তারপর আবার ভোরে সূর্য ওঠার পর চলতে লাগলাম। এরপর যখন দুপুরের দিকে সূর্যের তাপ অসহনীয় হয়ে উঠলো, তখন আবার সেখানেই তাঁবু গেড়ে ছায়ার নিচে শুয়ে ঘামতে লাগলাম। সূর্য অস্তাচলে নামতেই আবার যাত্রা শুরু করতাম। এভাবেই চক্রাকারে চলতে লাগলো।

পনেরো দিন আর রাত এভাবে চলার পর, শেষ পর্যন্ত মূল কাফেলার কাছে এসে পৌঁছলাম। ইতোমধ্যে চামড়ার পানির মশকগুলো অর্ধেকেরও বেশি খালি হয়ে এসেছে। শুধু তলানিতে কয়েক গ্যালন সবুজ রঙের কটু স্বাদের পানি পড়ে রয়েছে। আমি জনপ্রতি প্রতিদিন বাধ্যতামূলক চার মগ পানি বরাদ্দ করলাম।

এবার আমরা আসল মরুভূমিতে ঢুকেছি। সামনে একের পর এক অসংখ্য বালিয়াড়ি যতদূর দেখা যায় চলে গেছে। আমাদের ঘোড়াগুলোর মধ্যে নিদারুণ যন্ত্রণার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। পিঠে খুব হালকা ভার নিলেও নরম বালিতে পা ডেবে গিয়ে ঘোড়াগুলোর চলতে খুব কষ্ট হচ্ছে। আমি ঘোড়াগুলো আরোহী মুক্ত করে অন্যান্য মুক্ত ঘোড়ার দলের সাথে কাফেলার সামনের দিকে পাঠিয়ে দিলাম। আর কয়েকটি শক্তিশালী উট বেছে নিয়ে মেয়েদেরকে আর দলের অন্যান্যদেরকে তাতে চড়তে বললাম।

আল-নামজু আমাকে নিশ্চিত করলো সামনের পানির উৎসটি আর মাত্র কয়েকদিনের পথ। কাজেই আমি মেয়েদেরকে নিয়ে জারাস আর তার দলের লোকদের সাথে নিয়ে পানির কাছে পৌঁছাবার জন্য মূল কাফেলা ছেড়ে আগে আগে চলতে শুরু করলাম।

আমাদেরকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবার জন্য আল-নামজু তার বড় ছেলে হারুনকে সাথে দিয়েছিল। মূল কাফেলা থেকে দ্রুত এগিয়ে আমরা সারারাত চললাম, তারপর ভোরের প্রথম আলো দেখা দিতেই হারুন বিশাল একটি লাল ইট রঙা বালিয়াড়ির উপরে এসে থেমে দাঁড়াল। তারপর সামনের দিকে হাত তুলে দেখাল।

সামনেই একটা পাহাড়ের চূড়া দেখা গেল। লম্বা লম্বা দাগযুক্ত পাহাড়টির অনুভূমিক স্তরগুলো ছিল বিভিন্ন রংয়ের, সোনালি থেকে শুরু করে চকের মতো সাদা তারপর লাল, নীল আর কালো। কয়েকটি স্তর বাতাসে ক্ষয়ে গিয়ে অন্যান্য স্তর থেকে আরও গাঢ় রং ধরেছে। এগুলো কতগুলো ঝুল বারান্দা আর গভীর দীর্ঘ গুহা তৈরি করেছে, যা দেখে মনে হচ্ছে যেন একজন উন্মাদ স্থপতি এগুলো তৈরি করেছে।

হারুন জানাল, এর নাম ময়াগুহা। আরবি এই নামটি অনুবাদ করে আমি বুঝলাম এর নাম, পানির গুহা।

হারুন আমাদেরকে এই খাড়া পাথুরে দেয়ালের নিচে নিয়ে গেল। একেবারে গোড়ায় এক পাশে একটা নিচু ছাদওয়ালা ফাটল চলে গেছে। একজন লম্বা মানুষ বাঁকা না হয়েও ঢুকতে পারবে, তবে একশো কদমের বেশি চওড়া আর গভীর। আর এমন অন্ধকার যে, আমি উপর থেকে দেখে বুঝতে পারলাম না এটা কতদূর পর্যন্ত চলে গেছে।

হারুন বললো, এই গুহার নিচে পানি রয়েছে। রাজকুমারীরা আর লক্সিয়াস তাদের উটগুলোকে হাঁটু গেড়ে বসিয়ে কাঠের বাকা জিন থেকে লাফ দিয়ে নিচে নামলো। আমি ওদেরকে গুহামুখ দিয়ে ভেতরে নিয়ে চললাম। আর জারাস তার লোকজনসহ বাইরেই অপেক্ষামান থাকলো।

আমাদের পায়ের নিচে পাথরের মেঝেটি ক্রমান্বয়ে ঢালু হয়ে নেমে গেছে, আর যতই আমরা নিচে নামলাম ততই দিনের আলো কমতে লাগলো আর বাতাস ঠাণ্ডা হয়ে এল। একসময় বাইরের সূর্যের তাপের তুলনায় তাপমাত্রা এমন কমে গেল যে আমরা কেঁপে উঠলাম।

এবার আমি পানির গন্ধ অনুভব করলাম, আর পানি পড়ার ঝির ঝির শব্দও শুনতে পেলাম। আমার গলা পিপাসায় কাঠ হয়ে রয়েছে, ঢোক গিলতে পারছিলাম না। মুখে কোনো লালা নেই। মেয়েরা আমার হাত ধরে টেনে আমাকে নিচের দিকে নিয়ে চললো।

সামনেই বিরাট একটা জলাধার দেখা গেল। গুহা মুখ থেকে আসা আলো পানির উপর পড়ে প্রতিবিম্ব সৃষ্টি করেছে। সেই আলোর কারণে মনে হল পানির রং একদম কালো। আর ইস্ততত না করে কাপড়চোপড় আর স্যান্ডেলসহ আমরা সবাই পানির উপর ঝাঁপিয়ে পড়লাম। আমি হাঁটু গেড়ে বসে পানির কাছে চিবুক নামিয়ে নিজের প্রতিবিম্ব দেখতে পেলাম আর দেখলাম পানির রং কালো তো নয়ই বরং তেহুতিকে যে হীরাটি দিয়েছিলাম, সেই হীরার মতো টলটলে পরিষ্কার। মুখ ভরে পানি নিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস নিলাম।

মেয়েরা জলাধারের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আমার আর ওদের পরস্পরের গায়ে পানি ছিটিয়ে উল্লাসে আর ঠাণ্ডায় চেঁচিয়ে উঠলাম। ওদের চেঁচামেচি শুনে জারাস ওর লোকজনসহ ঢালু মেঝে বেয়ে নিচে নেমে এলো। চিৎকার করে হাসতে হাসতে ওরাও অন্ধকার পানিতে নেমে পড়লো।

পেটপুরে পানি খাওয়ার পর জারাসের লোকেরা সাথে যে পানির মশক নিয়ে এসেছিল, সেগুলো ভরে বাইরে উটের জন্য নিয়ে গেল।

.

হারুন হিসাব করে আমার সাথে একমত হল যে, মূল কাফেলার এখানে আসতে আরও তিনদিন লাগবে। এতে আমি খুব একটা উদ্বিগ্ন হলাম না, কেননা ক্লান্ত মেয়েরা একটু বিশ্রাম নিয়ে শক্তি সঞ্চয় করতে পারবে।

তবে আমার আসল দুশ্চিন্তা ছিল এই জায়গাটির অরক্ষিত অবস্থানটি নিয়ে। চারপাশের একশা লিগের মধ্যে যেসব বেদুঈন গোষ্ঠি রয়েছে তাদের সবার নিশ্চয়ই এই পানির গুহার অবস্থান জানা আছে। আমাদের দলটি ছোট হলেও, সাথের পশু, অস্ত্রশস্ত্র আর বর্মগুলো বেদুঈন গোষ্ঠিদের কাছে খুবই দামী, বিশেষত দস্যুদের কাছে অবশ্যই আকর্ষণীয়। ওরা যদি জানতে পারে আমরা এই পানির গুহার কাছে রয়েছি আর আমাদের দলটি ছোট, তাহলে বেশ বিপদের সম্ভাবনা আছে। আমাদেরকে খুবই সতর্ক থাকতে হবে যেন কেউ অতর্কিতে আক্রমণ করে বসতে না পারে।

জারাস তার লোকজনসহ পানি থেকে উঠে এলে আমি চতুর্দিকে পাহারা বসালাম।

তারপর জারাস আর হারুনকে নিয়ে চারপাশে সম্প্রতি কোনো মানুষজনের আনাগোনা হয়েছিল কিনা তার চিহ্ন দেখতে বের হলাম।

আমরা তিনজনেই অস্ত্র নিলাম। আমি এক কাঁধে আমার লম্বা ধনুকটি আর অন্য কাঁধে ত্রিশটি তীরভর্তি তূণ ঝুলিয়ে নিলাম। আর ডান কোমরের খাপে ব্রোঞ্জের তরবারিটাও নিলাম।

সবচেয়ে কাছের বালিয়াড়ির মাথায় পৌঁছে আমরা আলাদা হলাম। তবে ঠিক করলাম, এক ঘন্টা পর সূর্য যখন মধ্য গগনে আসবে তখন আবার সবাই ময়াগুহায় ফিরে আসবো। জারাসকে উত্তরদিকে চক্রাকারে ঘুরে আসতে পাঠালাম। হারুন গেল উপত্যকার নিচে যে কাফেলা পথটি রয়েছে সেটা পরীক্ষা করতে। আর আমি দক্ষিণে উঁচু বালিয়াড়িগুলোর দিকে চললাম।

চারদিক খোলা, লুকাবার কোনো জায়গা নেই। তারপরও আমি চেষ্টা করলাম এমনভাবে চলতে যাতে দূর থেকে কোনো শত্রু দেখতে না পায়।

চারপাশের দৃশ্য দেখে আমি মুগ্ধ হলাম, রুক্ষ হলেও প্রকৃতি খুবই সুন্দর। শান্ত সাগরের বোবা ঢেউয়ের মতো একের পর অন্তহীন বালিয়াড়ি চলে গেছে। বাতাসের ঝাঁপটায় বালুর ঢেউয়ের এই চূড়াগুলো ক্ষয় হয়ে আমার চোখের সামনেই আকৃতির পরিবর্তন ঘটছে। কোনো মানুষের পায়ের ছাপ কিংবা পশুর ক্ষুরের চিহ্ন থাকলে দ্রুত মুছে যাবে।

বেশ কিছুক্ষণ ঘুরেও সাম্প্রতিক কোনো মানুষ কিংবা পশুর আসার চিহ্ন এই অন্য জগতে দেখতে পেলাম না। হঠাৎ পায়ের কাছে চোখে পড়লো বালুর ভেতর থেকে রোদেপোড়া একটা হাড়ের টুকরা চকচক করছে। নিচু হয়ে হাড়টা বালু থেকে বের করে দেখলাম সোয়োলোর মতো একটা রাতের পাখির মাথার খুলি আর হা করা ঠোঁট। বাতাস নিশ্চয়ই অনেক দূর থেকে উড়িয়ে নিয়ে এসেছে।

আমি আবার ঘুরে বালিয়াড়ির একপাশ দিয়ে গড়িয়ে নামলাম। নিচে নেমে ভূগর্ভস্থ পানির গুহাটির কাছাকাছি আসতেই ভেতর থেকে মেয়েলি গলার হাসাহাসির চিৎকার শুনতে পেলাম।

জারাস আমার আগেই ফিরে এসেছে। সে আর তার লোকজন উটের পিঠ থেকে নেমে পশুগুলোকে গুহামুখের কাছেই প্রাকৃতিক ঝুলবারান্দার নিচে ছায়ায় বেঁধে রাখলো। তারপর ওরা উটগুলোকে দানাপানি দিতে শুরু করলো। আমি জারাসকে ডেকে জিজ্ঞেস করলাম,

কিছু পেলে?

না, কিছুই নেই।

হারুণ কোথায়? সে এখনও ফেরেনি?

সে উত্তর দিল, এখনও আসেনি। শিঘ্রই হয়তো এসে যাবে। আমি গুহামুখটার কাছে দাঁড়িয়ে একটু ইতস্তত করলাম। সবকিছু একেবারে স্বাভাবিক আর মনে হচ্ছে ঠিক আছে। তারপরও বুঝতে পারলাম না কী কারণে আমার মন অস্থির হয়ে উঠেছে, আর কোনোমতেই এই উদ্বেগের ভাবনাটা মন থেকে ঝেড়ে ফেলতে পারছিলাম না।

গুহায় না ঢুকে পাহাড়ের একপাশ দিয়ে ঘুরে বিপরীত দিকে চললাম। গুহা মুখের কাছ থেকে সরে আমি পেছন দিকে এমন একটা জায়গায় এলাম যেখানে খাড়া পাহাড়ের গায়ে আরেকটি ফাটল দেখা গেল। এই ফাটলটা আগে দেখিনি। এক মুহূর্ত এটা পরীক্ষা করে ভাবলাম পাহাড়ের চূড়ায় উঠে দেখা যাক অন্য পাশে কী আছে। হাত বাড়িয়ে সামনে পাহাড়ের গায়ে হাত রাখলাম।

সূর্যের তাপে পাহাড়ের পাথর এতো গরম হয়ে রয়েছে যে, মনে হল জ্বলন্ত কয়লার উপর হাত রেখেছি। তাড়াতাড়ি ছ্যাকা লাগা হাতটা সরিয়ে নিতেই হাত থেকে পাখির মাথার খুলিটা নিচে পড়ে গেল। ছ্যাকা লাগা আঙুলটা চুষতে চুষতে পাখির মাথার খুলিটা নেবার জন্য হাত বাড়িয়েই থেমে গেলাম।

একটা পায়ের ছাপ, তবে আমার মেয়েদের কারও পায়ের ছাপ নয়। মসৃণ চামড়ার তলিওয়ালা স্যান্ডেল পরা একজন বড় পুরুষ মানুষের পায়ের ছাপ। এখনও পেছন থেকে মেয়েলি গলার আওয়াজ আর হাসিঠাট্টা আর জারাস আর তার লোকজনের কথা বলার অস্পষ্ট শব্দ শোনা যাচ্ছে। ঘুরে দাঁড়িয়ে এমন একটি জায়গায় দাঁড়ালাম, যেখান থেকে গুহামুখের সামনে দাঁড়ান আমাদের লোকদের দেখা যায়। এক ঝলক তাকিয়েই যা জানতে চেয়েছিলাম, তা নিশ্চিত হলাম। আমাদের সব লোকেরা সামরিক বিধিসম্মত পিতলের গজালখচিত তলিওয়ালা স্যান্ডেল পরে রয়েছে।

তার মানে আমাদের মাঝে একজন আগন্তুক রয়েছে।

আমার পরবর্তী চিন্তা হল মেয়েদের নিরাপত্তা নিয়ে। ঘাড় ফিরিয়ে গুহার ভেতর থেকে মেয়েদের কথা বলার আওয়াজ শুনতে চেষ্টা করলাম। দুটো কণ্ঠ সাথে সাথে চেনা গেল, তবে তৃতীয়টি চিনতে পারলাম না। লোকদেরকে কিছু বুঝতে না দিয়ে ওদের পাশ কাটিয়ে গুহায় ঢুকলাম। পিছল পাথরের মেঝে বেয়ে দ্রুত জলাধারের কাছে পৌঁছলাম। অন্ধকার সয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য একটু অপেক্ষা করে তাকিয়ে দুটো মেয়ের ফ্যাকাশে রমণীয় শরীর আবছা দেখতে পেলাম। ওরা পানি নিয়ে খেলছে। তবে শুধু দুজনকে দেখা গেল।

আমি চিৎকার করে উঠলাম, বেকাথা! তেহুতি কোথায়?

পানি থেকে মাথা তুলে সে বললো, সে শেঠ দেবতার কাছে অর্ঘ্য দিতে গিয়েছে, তাতা! লাল-সোনালি চুলগুলো তার মুখে লেপ্টে রয়েছে।

দৈহিক নিত্যকার ক্রিয়াকর্ম অর্থাৎ মলমুত্র ত্যাগ করার কথা বলতে গিয়ে ওরা এ-ধরনের মেয়েলি ভাষা ব্যবহার করতো।

কোন দিকে গিয়েছে?

আমি দেখিনি। সে শুধু জানাল সে এটা করতে বাইরে যাচ্ছে।

তেহুতি একটু খুঁতখুঁতে স্বভাবের মেয়ে। আমি জানি এ-ধরনের শারীরিক ক্রিয়াকর্ম করার জন্য সে গোপন জায়গায় যাবে। এজন্য নিশ্চয়ই তার গুহার ভেতরে থাকার কথা নয়। নিশ্চয়ই বাইরে মরুভূমিতে গিয়েছে। আমি গুহামুখের কাছে ছুটে গেলাম। জারাস তার লোকজনসহ গুহামুখের বামদিকে জটলাবেঁধে দাঁড়িয়ে রয়েছে। বাইরে পৌঁছেই আমি চিৎকার করে তাকে জিজ্ঞেস করলাম, রাজকুমারী তেহুতিকে গুহা থেকে বের হতে দেখেছ?

না, প্রভু।

আর কেউ দেখেছে? তোমরা কেউ তাকে দেখেছ? সবাই মাথা নাড়লো।

তেহুতি হয়তো ওদেরকে এড়িয়ে গেছে, মনে মনে ভাবলাম। ঘুরে পেছন দিকে যেখানে নতুন পায়ের ছাপটা দেখেছিলাম সেদিকে ছুটলাম।

মিনতিভরে দেবতার কাছে প্রার্থনা করলাম, হে হোরাস, দয়া কর আমাকে! তারপর মনপ্রাণ দিয়ে দেবতার কাছে প্রার্থনা করতে শুরু করলাম, আমার চোখ খুলে দাও, হে হোরাস। আমাকে দেখিয়ে দাও। হে আমার প্রিয় দেবতা, আমাকে দেখতে দাও!

কয়েকটি মুহূর্ত শক্ত করে চোখ বন্ধ করে রইলাম। তারপর যখন চোখ খুললাম, আমার দৃষ্টিশক্তি উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। মহান দেবতা হোরাস আমার প্রার্থনা শুনেছেন। আমি আমার অন্তর্চক্ষু দিয়ে দেখতে লাগলাম। চারপাশের রঙ আরও পরিষ্কার হল, আকৃতিগুলো আরও ধারালো হয়ে উঠলো।

পাহাড়ের দেয়ালের নিচের দিকে তাকিয়েই আমি তাকে দেখতে পেলাম। এটা তেহুতি নয়, তবে একটু আগে যেখানে সে ছিল এটা তার স্মৃতি। অনেকটা তার নিজের প্রতিধ্বনি কিংবা ছায়া। উজ্জ্বলতার পাশে একটু ময়লা দাগ, ধরা-ছোঁয়া যায় না এমন একটি ছোট মেঘ। এমনকি একজন মানুষের আকৃতিও নয়, কিন্তু আমি জানি এটা সে। নেচে নেচে দূরে চলে যাচ্ছে।

হঠাৎ আমার মনে হল তাকে কেউ তাড়া করছে, আর সে বিপদ থেকে বাঁচার জন্য চেষ্টা করছে। আমার বুকের মাঝে তার আতঙ্ক আমি অনুভব করতে পারলাম।

গর্জে উঠলাম, জারাস, অস্ত্র হাতে নাও! পাঁচজনকে বেকাথা আর লক্সিয়াসের পাহারায় রেখে বাকিদের নিয়ে ঘোড়ায় চড়ে আমার পিছু পিছু এস!

জানি জারাস আমার কথা শুনেছে, তাই আর পেছন দিকে না তাকিয়ে সোজা তেহুতির যে ছায়া অনুভব করেছিলাম, সেদিকে ছুটলাম।

হঠাৎ আমার দুই পায়ে যেন পাখনা গজাল। আমি দ্রুত থেকে দ্রুততর বেগে ছুটতে লাগলাম। কিন্তু ছোট্ট মেঘটিও আমার দৌড়ের সাথে পাল্লা দিয়ে আমাকে এর পথে গ্রাস করে নিয়ে চলেছে। হঠাৎ সামনে যেখানে রেখাঙ্কিত দেয়ালটা ঘুরেছে সেখানে এটা অদৃশ্য হয়ে গেল।

উজ্জ্বল দীপ্তিটা আমার চোখ থেকে অদৃশ্য হয়ে গেল। আমার পা ভারী হয়ে চলার গতি কমে এলো। যে জায়গাটি থেকে সে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল খুব চেষ্টা করে সেখানে পৌঁছলাম। সেখানে পৌঁছেই দম নিতে লাগলাম।

পাগলের মতো চারপাশে তাকিয়ে কিছুই দেখতে পেলাম না।

তারপর নিচে মাটির দিকে তাকাতেই বালুর উপর তার খালি পায়ের ছাপ চোখে পড়লো। দেয়ালঘেরা জায়গায় বাতাস পায়ের ছাপটি উড়িয়ে নিতে পারেনি। ছাপটা অনুসরণ করে সামনে তাকাতেই দেখলাম আরেকটু সামনে এগিয়েই ছাপটা আবার মুছে গেছে, তবে এবার বাতাসে মুছে যায় নি। বালুর উপর পুরুষ মানুষের স্যান্ডেলের মসৃণ তলির একাধিক ছাপ তার উপর পড়ে ছাপটা মুছেছে। বুঝা গেল না কতজন লোক, তবে মনে হল ১০/১২ জনেরও বেশি। এটা পরিষ্কার যে, এই লোকগুলো তেহুতিকে তাড়া করছে। যখন ওরা তাকে ধরবার চেষ্টা করেছিল, তখন সে নিশ্চয়ই লড়াই করেছিল। রেগে গেলে তেহুতি বন্য বেড়ালির মতো হয়ে যায়, তবে শেষ পর্যন্ত ওরা নিশ্চয়ই তাকে কাবু করে ফেলেছিল।

তাকে টেনে পাহাড়ের এই প্রান্ত পর্যন্ত নিয়ে আসে। এখানে পাহাড়ের চূড়ার গায়ে আরেকটা ফাটল দেখা গেল, তবে এটা আগেরটার মতো বেশি চওড়া কিংবা এতো খাড়াও নয়।

এটা অনেকটা একটা সিঁড়ির মতো, চিমনির মতো নয়। আমি সহজেই এটা বেয়ে উঠতে পারবো, তবে চূড়ায় উঠতে হলে উটের অন্য পথ খুঁজতে হবে। পেছনে তাকিয়ে দেখলাম জারাস প্রথম উটে চড়ে আমার কাছাকাছি এসে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে চিৎকার করলো, কী হয়েছে তায়তা? আমাদের কী করতে হবে?

তেহুতিকে ধরে নিয়ে গেছে। ওরা হয়তো এখানে ওৎ পেতে ছিল। তেহুতি বাইরে ঘোরাফেরা করতেই ওরা তাকে তুলে নিয়ে যায়। তারপর উপরের দিকে চূড়ার ফাটলটার দিকে দেখিয়ে বলো, ঐখানে টেনে নিয়ে গেছে, আমাদের উটগুলো ওখানে উঠতে পারবে না।

এরা কারা? কোথা থেকে এসেছে?

জানি না জারাস। নিরর্থক প্রশ্ন করো না। পাহাড়ের নিচ দিয়ে গিয়ে উপরে উঠার একটা পথ খুঁজে বের করো। আমি এদিক দিয়ে সোজাসুজি ওদের পেছনে যাচ্ছি।

আমি আমার অর্ধেক লোক আপনার পিছু পিছু পাঠাব। আর অন্যদেরকে নিয়ে বিকল্প পথ দিয়ে উপরে উঠে আপনার সাথে দেখা করবো।

তার কথার কোনো উত্তর না দিয়ে আমি উপরে উঠতে শুরু করলাম। শুনতে পেলাম পেছনে জারাসের লোকেরা আসছে। ওরা আমার চেয়ে বয়সে তরুণ হলেও আমি ওদের আগে আগে চলতে লাগলাম।

দেয়ালটি অর্ধেক চড়ার পর উপর থেকে মানুষের গলার আওয়াজ শোনা গেল। কয়েক সেকেন্ড থেমে শুনতে চেষ্টা করলাম। আরবি ভালো বলতে না পারলেও, কী বলছে তার সারাংশ বুঝতে পারি।

উপরের লোকগুলো বেদুঈন, ওরা দ্রুত চলার জন্য একজন আরেকজনকে তাড়া দিচ্ছে। তারপর তেহুতির অস্ফুট অর্তনাদ শুনতে পেলাম। যে কোনো পরিস্থিতিতে এই কণ্ঠস্বর আমি চিনতে পারি। : আমি চিৎকার করে উঠলাম, তেহুতি, ভয় পেওনা! আমি আসছি, জারাসও তার লোকজনসহ আসছে।

তার গলার আওয়াজ আমাকে তাড়না যোগাল। পূর্ণশক্তিতে আমি উপরের দিকে উঠতে শুরু করলাম। তারপর উপর থেকে ঘোড়ার জেষা ধ্বনি, মাটিতে খুরের শব্দ আর লাগামের টুংটাং শব্দ শুনতে পেলাম। লোকগুলো তাকে ঘোড়ার পিঠে চড়াচ্ছে।

তেহুতি আবার চিৎকার করে উঠলো, তবে আরবদের চেঁচামেচিতে তার কথা বুঝা গেল না। তারপর ঘোড়ার পিঠে চাবুক মারার শব্দ শোনা গেল। ঘোড়ার ফোঁস ফোঁস নিঃশ্বাস আর নরম বালুতে খুরের থপথপ শব্দ শোনা গেল।

বুঝতে পারলাম দস্যুরা এখানেই তাদের ঘোড়াগুলো বেঁধে রেখে গিয়েছিল। ওরা জানতে এখানে ওরা দ্রুত ফিরে আসতে পারবে, অথচ উটে চড়ে অন্য পথ দিয়ে আসতে আমাদের অনেক সময় লাগবে।

শেষ কয়েক গজ হুমড়ি খেয়ে চললাম, তারপর চূড়ার কিনারায় পৌঁছে। একটু থেমে পরিস্থিতিটা বুঝার চেষ্টা করলাম।

আমার সামনেই রোদে পোড়া ধূলিময় পোশাক আর মাথায় কেফায়া পরা ত্রিশ চল্লিশ জন আরব বেদুঈন দাঁড়িয়ে রয়েছে। বেশিরভাগই ইতোমধ্যে ঘোড়ায় চড়ে বসেছে আর অন্যান্যরা ছুটে চলেছে। বন্য চিৎকারে ওরা একে অন্যকে বিজয়ীর সুরে তাড়া দিচ্ছে।

একজন দস্যু তখনও তেহুতির সাথে ধস্তাধস্তি করছিল। সে তেহুতিকে ঘোড়ার জিনের সামনে উপুড় করে শুইয়ে নিজে তার পেছনে উঠেছে। শক্তিশালী দেহের অধিকারী লোকটির কালো কোঁকড়ানো দাড়ি। শেয়াল ওরফে ডাকাত আল-হাওয়াসাঈর চেহারার যে বর্ণনা আল-নামজুর কাছ থেকে শুনেছিলাম, তার সাথে এর চেহারা বেশ মিলে যায়। তবে আমি নিশ্চিত হতে পারলাম না, এই সেই লোক কি না।

তেহুতি দুই পা ছুঁড়ে চিৎকার করছিল, তবে লোকটি বেশ সহজেই এক হাত দিয়ে তার দুই হাত ঘোড়ার জিনের উপর চেপে রেখেছে। দেখলাম তার। পোশাক আর চুল তখনও জলাধারের পানিতে ভেজা।

পেছনে তাকিয়ে সে চূড়ার কিনারায় আমাকে দেখতে পেল আর সাথে সাথে আশায় তার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। আমি তার ঠোঁট নাড়া দেখে বুঝতে পারলাম সে আমার নাম উচ্চারণ করছে।

তাতা! আমাকে বাঁচাও!

মুক্ত হাতে ঘোড়ার লাগাম ধরে দস্যুটি ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে পেটে গুঁতো দিয়ে ঘোড়াটিকে পাথুরে পথের উপর দিয়ে ছুটাতে শুরু করলো। একবার পেছন ফিরে আমার দিকে তাকিয়ে দাঁত বের করে বিজয়ীর হাসি দিল। এখন আমি নিশ্চিত হলাম এই লোকই শেয়াল। আমার কেন জানি মনে হল সে আগে থেকে জানতো যে, আমরা ময়াগুহায় আসবো।

তার দলটি চতুর্দিক দিক থেকে ঘিরে তাকে অনুসরণ করলো। আমি গুণতে পারলাম না ওরা কজন। এভাবে ওদেরকে চলে যেতে দেখে রাগে আমার সারা শরীর জ্বলে উঠলো।

দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে কাঁধ থেকে লম্বা ধনুকটা নামিয়ে হাতে নিলাম। তিনটি দ্রুত প্রক্রিয়ায় ধনুকের গুণ টেনে সোজা করে তূণীর থেকে একটা তীর বের করে নেবার জন্য পেছনে হাত বাড়ালাম।

লক্ষ বস্তুটি দ্রুত সরে যাচ্ছিল। আমি জানি আর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে তেহুতি আর দস্যুটি ধনুকের তীরের আওতার বাইরে চলে যাবে। বাম কাঁধ সামনে এগিয়ে লক্ষ্য স্থির করে, তীর ছোঁড়ার জন্য সঠিক ভঙ্গি নিয়ে প্রস্তুত হলাম। দিগন্তের উপরের দিকে চোখ তুলে আন্দাজ করতে চেষ্টা করলাম, তীরটি কতটুকু উঁচু করে ছুঁড়লে শেয়াল দস্যুর কাছে পৌঁছবে।

বুঝতে পারলাম তেহুতি আর আমার মাঝে শেয়ালের দেহটি তেহুতিকে আড়াল করে রেখেছে। অর্থাৎ তার অজান্তে তীরের আঘাত থেকে বাঁচার জন্য সে তার দেহটিকে তেহুতির জন্য ঢাল করে রেখেছে। এবার আমি নির্ভয়ে তেহুতিকে আঘাত না করে তীর ছুঁড়তে পারবো। গুণ টেনে ঠোঁটে ছোঁয়ালাম। আমার বাহু আর দেহের উপরের প্রতিটি পেশি গুণটানা ধনুকের প্রচণ্ড ওজনের ভারে টান টান হয়ে রয়েছে। খুব কম লোকই আমার ধনুকটি পুরোপুরি টানতে পারে। এটা শুধু পাশবিক শক্তির বিষয় নয়। এর জন্য দরকার সুনির্দিষ্ট ভঙ্গি, সঠিক ভারসাম্য আর ধনুকের সাথে একাত্ম হওয়ার মতো অনুভূতি অর্জন করা।

যখন আমি ধনুকের গুণ ধরে থাকা তিনটি আঙুল ছেড়ে দিলাম, এটা ঝটকা মেরে পেছন দিকে আমার বাহুর ভেতরের দিকে কেটে বসলো। সাথে সাথে ক্ষত স্থানটি থেকে রক্ত ঝরতে শুরু করলো। আমি আঘাত থেকে রক্ষা পাবার জন্য চামড়ার হাতবন্ধনী লাগাবার সুযোগ পাইনি।

কোনো ব্যথা অনুভব করলাম না। বরং উড়ে যাওয়া তীরের পিছু পিছু আমার হৃদয়ও ছুটে চললো। বুঝলাম নিখুঁতভাবে তীরটি ছুঁড়েছি। আমি জানি যে কুকুরটি তেহুতিকে অপহরণ করে নিয়ে যাচ্ছে সে এখুনি মরবে।

তারপর হঠাৎ হতাশ হয়ে প্রচণ্ড আক্রোশে চিৎকার করে উঠলাম। লক্ষ্য করলাম লক্ষ্যবস্তুর ঠিক পেছন পেছন ছুটে চলা ঘোড়সওয়ারটি হঠাৎ লাইন থেকে সরে গেল। দেবতা হোরাস জানেন কেন সে এটা করলো, সম্ভবত পথে কোনো গর্ত এড়াবার জন্য সে এটা করেছে। কারণ যাই হোক সে আমার লক্ষ্যবস্তুকে আড়াল করে দিয়েছে। তাকিয়ে দেখলাম আমার তীরটা একটা ছো মারা বাজপাখির মতো তার পিঠের উপরের অংশে আঘাত করলো। সে পেছন দিকে মাথা ঘুরিয়ে যন্ত্রণায় ছটফট করে উঠলো। হাত বাড়িয়ে তীরের ফলাটা ধরবার চেষ্টা করতে লাগলো। তবে এখনও সে আমার লক্ষ্যবস্তুকে আড়াল করে রেখেছে।

আরেকটি তীর ছুঁড়লাম এই আশায় যে, হয়তো আহত লোকটি ঘোড়া থেকে পড়ে যাবে আর আলহাওয়াসাঈর দেহ উড়ন্ত তীরের আওতায় এসে যাবে। তবে আহত আরব লোকটি লাগাম আঁকড়ে ধরে ঘোড়ার পিঠেই বসে রইল। তারপর দ্বিতীয় তীরটি তার ঘাড়ের পেছনে আঘাত করার পর তার নিশ্চল দেহ ঘোড়ার পিঠ থেকে মাটিতে পড়ে ধূলায় গড়াগড়ি খেতে লাগলো।

ইতোমধ্যে আল-হাওয়াসাঈ তীরের আওতার বাইরে চলে গেছে। আমি তার দিকে আরেকটি তীর ছুঁড়লাম, যদিও জানি এটা তাকে স্পর্শ করার সুযোগ পাবে না। নিজেকে আর সমস্ত অন্ধকারের দেবতাদের অভিসম্পাত করতে শুরু করলাম, যারা আল-হাওয়াসাঈকে আমার তীরের লক্ষ্য থেকে বাঁচিয়েছে। তীরটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে তার ঘোড়ার বিশ কদম পেছনে মাটিতে পড়ে গেল।

আমার দুটো তীর বেঁধা মাটিতে পড়ে থাকা লোকটির দিকে আমি দৌড়ে গেলাম। সে মরার আগে তাকে দুএক ঘা দিয়ে তার কাছ থেকে তথ্য বের করতে হবে। কপাল ভালো থাকলে হয়তো যে লোকটি তেহুতিকে অপহরণ করেছে তার আসল পরিচয় আর কোথায় তাকে খুঁজে পাবো তা জানা যাবে।

তবে তা হল না। আমি পৌঁছার আগেই নামহীন লোকটি মারা গেল। একটা চোখ উল্টে শুধু সাদা অংশটা দেখা যাচ্ছে, আর অন্য চোখটি প্রচণ্ড আক্রোশে আমার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। তারপরও আমি দুইতিনবার লাথি কষালাম। তারপর লোকটির পাশে বসে হাথোর, ওসিরিস আর হোরাস দেবতার কাছে আকুল প্রার্থনা করতে লাগলাম যেন, আমি পৌঁছা পর্যন্ত তেহুতি নিরাপদ থাকে।

দেবতাদের বিষয়ে যে জিনিসটা আমি অপছন্দ করি তা হল যখন তাদের খুব প্রয়াজন হয় তখন তাদেরকে হাতের কাছে পাওয়া যায় না।

সেখানে বসে জারাসের জন্য অপেক্ষা করতে করতে মৃত দস্যুটির দেহ থেকে আমার তীরটি কেটে বের করলাম। পুরো মিসরে আমার তীরের ফলার মতো আর কোনটি নেই।

.

প্রায় এক ঘন্টা পর জারাস পৌঁছল। বেদুঈন দস্যুদলটি ইতোমধ্যে দিগন্তের ওপারে অদৃশ্য হয়ে গেছে। সাধারণত যে কোনো বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে আমি আমার আবেগ সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারি। এটা বলতে আমি বুঝাচ্ছি কোনো শহরকে ধ্বংস করা, শত্রু সেনাদলকে নিশ্চিহ্ন করা এ-ধরনের পরিস্থিতি ইত্যাদি। তবে তেহুতিকে হারিয়ে আমি ভীষণভাবে রেগে রয়েছি, আমার সারা শরীর কাঁপছিল। যত দেরি হচ্ছে ততই আমার আবেগ উথলে উঠে টগবগ করে ফেটে পড়ছে।

আমার সম্পূর্ণ রাগ জারাসের লোকদের উপর ঝাড়তে লাগলাম। ওরা ভিতু, কাপুরুষ, প্রয়োজনের সময়ে কোনো সাহায্য করতে পারলো না, এসব বলে চিৎকার করলাম।

তারপর দূরে জারাসের উটগুলো আসতে দেখে আর দেরি না করে ছুটে তার দিকে গিয়ে চিৎকার করে তাকে দ্রুত আসতে তাগাদা দিলাম।

সে কাছে আসতেই তিক্তকণ্ঠে তাকে তাড়াতাড়ি করতে বললাম, আবার সেও সমানভাবে চিৎকার করে তেহুতি কোথায় আছে, বেঁচে আছে কি না জানতে চাইল।

ঠিক তখনই আমি বুঝতে পারলাম এই দুই তরুণ হৃদয়ের মাঝে যা চলছে, তা সাময়িক কোনো ধরনের মোহ নয় এটা অন্য কিছু। এটি সেই একই ধরনের আবেগ আর ভালোবাসা যা আমি তেতির মা রানি লস্ট্রিসের ক্ষেত্রে অনুভব করতাম। আমি দেখলাম তেহুতিকে হারিয়ে জারাস যে-রকম শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়েছে, সে রকম আমিও এককালে তার মায়ের জন্য শোকাগ্রস্ত হয়েছিলাম।

ঠিক সেই মুহূর্তে আমি বুঝলাম আমাদের তিনজনের জন্য এই পৃথিবী বদলে গেছে।

 ৪. শক্তিশালী উটগুলো

জারাস আর তার লোকজন শক্তিশালী উটগুলো নিয়ে আমার কাছে এলো। অল্পদূরত্বে বেদুঈনের ঘোড়াগুলো আমাদের উটগুলো থেকে এগিয়ে থাকলেও দুই তিন ঘন্টার বেশি তা পারবে না। তাছাড়া আমাদের উটগুলো সারাদিন বালুর উপর চলতে পারে। উটগুলো মাত্র পানি খেয়েছে। কাজেই আরও দশ কিংবা তার চেয়েও বেশি দিন পানি ছাড়া চলতে পারবে। এই পরিস্থিতিতে পানির পিপাসা, গরম আর পিঠে আরোহি নিয়ে বালুর উপর দিয়ে চলতে গিয়ে ঘোড়াগুলো কাল ভোরের আগেই নেতিয়ে পড়বে। অথচ উটগুলো আরও এক সপ্তাহ ছুটতে পারবে।

জারাস আসতেই তাকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিলাম। অস্ত্রসহ উট থেকে নেমে তার অর্ধেক লোককে হেঁটে গুহায় ফিরে যেতে বললাম। ওরা সেখানে বাকি দুই মেয়েদেরকে পাহারা দেবে।

জারাস বুদ্ধি করে প্রত্যেক উটের পিঠে পানি ভর্তি মশক নিয়ে এসেছিল। এর জন্যই তার আসতে দেরি হয়েছিল। এখন আমাদের অর্ধেক উট সওয়ারিহীন হল। এতে সুবিধামতো উটগুলোকে বিশ্রাম দেওয়া যাবে। জারাস আমাদের প্রধান পথ প্রদর্শক আল-নামজুকে সাথে নিয়ে আসায় আমি খুশি হলাম। তার চেয়ে ভালো কেউ এই পথ চিনতে পারবে না।

সবাই যার যার উটে চড়ে পেছন পেছন একটি করে খালি উট দড়ি দিয়ে বেঁধে নিয়ে রওয়ানা দিলাম। অতিরিক্ত পানির মশকগুলো থাকায় আমি একটু নিশ্চিন্ত হলাম।

সূর্যের অবস্থান দেখে সময় আন্দাজ করলাম। আর তিন ঘন্টা পর দেখলাম খুব একটা বেশি এগোতে পারিনি। একটু থেমে উট বদল করলাম আর প্রত্যেককে দুই মগ পানি খেতে দিলাম। তারপর আবার স্বাভাবিক গতিতে চলতে শুরু করলাম।

আরও দুই ঘন্টা চলার পর প্রমাণ পাওয়া গেল যে, আমরা পলাতকদের তুলনায় দ্রুতই চলছি। পথের পাশে দেখলাম দস্যু-শেয়ালের পরিত্যক্ত একটি ঘোড়া খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে। আমাদের অগ্রগতি দেখে খুশি হলাম আর জারাসকে বললাম আশা করি রাতের আগেই ওদেরকে ধরে ফেলতে পারবো।

তবে আমার আন্দাজ সঠিক হল না। এটা বলার এক ঘন্টা পর আমরা দস্যুরা যেখানে দুটি অংশে ভাগ হয়েছে সেখানে পৌঁছলাম। জারাসকে বললাম, লোকদেরকে বল এবার একটু থেমে জিরিয়ে নিতে। প্রত্যেককে দুই মগ করে পানি দাও। তবে সাবধানে পিছিয়ে বসতে বল যেন পায়ের ছাপগুলো নষ্ট না হয়। আমি ওগুলো পরীক্ষা করবো।

অনুসরণ করার সময় সমান দুই ভাগে ভাগ হয়ে চলা বেদুঈনদের একটি পুরোনো কৌশল। এরপর দুটি দল আলাদা হয়ে দুই দিকে যাবে। এতে আমাদের বুঝা অসম্ভব হবে কোন দলটির সাথে তেহুতি রয়েছে। তাদের দুই দলের পিছু নিতে গিয়ে আমাদেরকেও বিভক্ত হতে হবে।

উট থেকে নেমে লাগামটি জারাসের হাতে দিয়ে হেঁটে সামনে এগোলাম। কিছুদুর যাওয়ার পর খুঁজে পেলাম, কোন জায়গায় ওরা দুই দলে আলাদা হয়েছে। দেখলাম ওরা ঘোড়া থেকে নামেনি। কাজেই তেহুতির পায়ের ছাপ খুঁজে পেলাম না। আমি আবার মাটিতে বসে দেবতার শরণাপন্ন হলাম।

হে মহান হোরাস, আমাকে দেখিয়ে দাও। এই দুর্বল অন্ধ চোখদুটো খুলে দিয়ে আমাকে পথ দেখাও। মিনতি করছি আমার দুচোখ খুলে দাও হে দেবী হাথোর। তোমার নামে আমি একটি বলি দেব।

চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ নিজের হৃৎস্পন্দন শোনার পর চোখ খুললাম। চারপাশে সাবধানে তাকালাম। কোনো স্বচ্ছ আলো এসে বালুকে আলোকিত করলো না, কোনো ছায়া নেচে নেচে এসে আমাকে পথ দেখাল না।

তারপর একটা গলার আওয়াজ শুনে কান খাড়া করলাম। তবে এটা ছিল বালিয়াড়ির মধ্য দিয়ে যাওয়া বাতাসের শন শন শব্দ। ধীরে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে বাতাসটাকে কানের পাশ দিয়ে যেতে দিলাম। তারপর মৃদু পরিষ্কার কণ্ঠস্বরটি শুনতে পেলাম।

তেহুতির কণ্ঠস্বর, হাথোর তোমাকে পথ দেখাবে। দ্রুত চতুর্দিকে তাকালাম, তবে তাকে দেখতে পেলাম না। চোখ বুজে অলৌকিক কিছু ঘটার জন্য অপেক্ষা করে রইলাম। নিঃশব্দে মাথা নত করে হাথোর দেবীর কাছে প্রার্থনা করতে লাগলাম।

হে দেবী হাথোর, তোমাকে এখন চাই। আমার আর তেহুতির দুজনেরই এখন তোমাকে প্রয়োজন।

অনেক বছর আগের একটি ঘটনার কথা মনে পড়ে গেল। একদিন তেহুতি আর আমি নলখাগড়ার নৌকায় চড়ে পবিত্র নীল নদীর বুকে ভেসে বেড়াচ্ছিলাম। তার প্রথম রজঃদর্শনের দিনটিতে আমি তাকে যে উপহারটি দিয়েছিলাম, সেটা পেয়ে হাতে ধরে খুশিতে সে মৃদু হাসছিল। এটি ছিল একটি চমকার রত্ন যাতে আমি আমার সমস্ত ভালোবাসা আর কারিগরি ঢেলে দিয়েছিলাম। একটা চিকন হারের মাথা থেকে ভালোবাসা ও কুমারীত্বের দেবী হাথোরের ছোট্ট একটি শিংওয়ালা সোনালি মাথা ঝুলছে।

মৃদু মৃদু হেসে তেহুতি হারটা গলায় পরলো। তার বুকের মাঝখানে সোনালি মাথাটা ঝুলছিল আর দেবীর মাথাটাও আমার দিকে তাকিয়ে হেঁয়ালীপূর্ণ হাসি দিচ্ছিল।

তেহুতির কথাগুলো আমার মনে পড়লো, আমি এটা সবসময় পরে থাকবো তায়তা। যখনই এটা আমার চামড়ার সাথে লেগে থাকবে তখনই তোমার আর তোমার ভালোবাসার কথা আমার মনে পড়বে। আর তোমার প্রতিও আমার ভালোবাসা দিন দিন বেড়ে যাবে। সে কথা রেখেছিল। কয়েকদিন দেখা না হওয়ার পর যখন দেখা হত তখনই হারের মাথায় ঝুলন্ত লকেটটা দেখাত, তারপর ঠোঁটে ছোঁয়াত।

এমন একটি সঙ্কটময় মুহূর্তে এই কথাটা কেন এখন আমার মনে পড়লো, বুঝে উঠতে পারলাম না। মন থেকে চিন্তাটা ঠেলে সরিয়ে দিতে চেষ্টা করলাম। তারপরও স্মৃতিটা জেগে রইল। হঠাৎ একটি উত্তেজিত ভাবনা মনে জেগে উঠলো, এই রত্নটিই এখন তেহুতিকে পাইয়ে দেবে। তারপর বাতাসে ভেসে আসা একটি কণ্ঠস্বর আমি যা মনে মনে ভেবেছিলাম তা নিশ্চিত করলো।

হাথোরকে খুঁজো, তাহলে আমাকে পাবে।

এক লাফ দিয়েই দেখলাম, দস্যুরা যেখান থেকে দুদলে আলাদা হয়েছিল সেখানে তখনও আমি দাঁড়িয়ে রয়েছি। এবার লক্ষ্য করে দেখলাম একটি দল উত্তরদিকে ঘুরে গেছে। আমি প্রথমে এইদিকেই যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। ঘোড়ার খুরের ছাপের একপাশ দিয়ে ধীরে ধীরে চলতে শুরু করলাম।

তেহুতি কিংবা হাথোরের কাছ থেকে পথ নির্দেশ পাওয়ার জন্য আমি আমার মনের ভেতরের অনুভূতি মেলে ধরলাম। তবে কিছুই অনুভব করলাম না। প্রতিটি পদক্ষেপের সাথে সাথে হতাশা আর একাকীত্ব আমাকে গ্রাস করতে শুরু করলো।

ঘুরে আবার যেখান থেকে হাঁটা শুরু করেছিলাম সেদিকে চললাম। সাথে সাথে অপ্রীতিকর ভাবনাটা মন থেকে সরে যেতে লাগলো, যখন আগের জায়গায় পৌঁছলাম তখন খারাপ ভাবনাটা উবে গেল।

দস্যুদের দ্বিতীয় দলটি দক্ষিণদিকে গিয়েছিল, এবার সেই পথ ধরলাম।

প্রায় সাথে সাথে মনে একটি ইতিবাচক ভাবনা জেগে উঠলো। প্রতিটি পদক্ষেপের সাথে সাথে মন হালকা হতে লাগলো আর অনুভব করলাম যেন একটি ছোট্ট উষ্ণ হাত আমার হাতের মুঠো চেপে ধরেছে। নিচের দিকে তাকিয়ে দেখলাম কিছুই নেই, কিন্তু আমার মনে স্থির বিশ্বাস ছিল, কেউ আমার পাশে থেকে আমাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে চলেছে।

দৌড়ে সামনের দিকে একশো পা যাওয়ার পর দেখলাম সামনে মাটিতে কিছু একটা চক চক করছে। অর্ধেকটা হলুদ বালুতে চাপা পড়ে আছে, দেখেই সাথে সাথে জিনিসটা চিনতে পারলাম। হাঁটু গেড়ে বসে হাত দিয়ে আলগা বালু এক পাশে সরালাম। তারপর ছোট হলুদ সোনার টুকরাটি তুলে ঠোঁটে ছোঁয়ালাম।

ঘুরে জারাসের দিকে তাকালাম। সে তার উটের পাশে দাঁড়িয়ে আমাকে লক্ষ্য করছিল। এক হাত উঠিয়ে তাকে ডাকলাম। সাথে সাথে সে উটে চড়ে এক হাতে রশি ধরে আমার উটটা নিয়ে আসতে শুরু করলো।

উটের রশি আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে সে বললো, আপনি কী করে নিশ্চিত হলেন যে, তেহুতি এই পথ দিয়েই গেছে?

তুমি এই ছোট্ট অলঙ্কারটা চেনো? তারপর হাতের মুঠো খুলে হাতের তালুতে দেবীর মাথাটা দেখালাম। সে নিঃশব্দে মাথা নাড়লো।

সে চিহ্ন হিসেবে এটা আমার জন্য রেখে গেছে।

সে শ্রদ্ধামিশ্রিত কণ্ঠে বললো, তিনি কী অপূর্ব মানুষ। এই পৃথিবীতে তার সাথে তুলনা দেবার মতো আর কোনো নারী নেই।

এরপর আমরা দুই ঘন্টা চলার পর বেদুঈনদের আরেকটা অচল ঘোড়া পথে পেলাম। মাথা নিচের দিকে ঝুলিয়ে ঘোড়াটা দাঁড়িয়ে রয়েছে, এক পাও চলতে পারছে না। পরিত্যক্ত করে ফেলে যাবার আগে এর আরোহী নির্দয়ভাবে এর পিঠে চাবুক মেরেছে। ঘোড়াটার পাছায় চাবুকের দাগ দেখা যাচ্ছে, আর ক্ষতস্থানগুলোতে রক্ত জমাট বেঁধে কালো হয়ে চকচক করছে।

আমি বললাম, এটাকে পানি দাও। জারাস নিজে নেমে একটা চামড়ার বালতিতে পানি ভরে সামনে এলো। একই সাথে আমিও নেমে পশুটির কাঁধের পেছনে অবস্থান নিয়ে দাঁড়ালাম। তারপর তলোয়ার বের করলাম। জারাস পানির পাত্রটি পশুটির মুখের কাছে ধরতেই এটি মুখ নামিয়ে দিল। কয়েক চুমুক পানি খেতে দিলাম, তারপর আমি দুইহাতে তলোয়ারটা ধরে মাথার উপর তুললাম। পশুটি তখনও পানি পানরত অবস্থায় সমস্ত শক্তি দিয়ে প্রচণ্ড জোরে তলোয়ার তুলে একটা কোপ মারলাম।

কাটা মাথাটা দেহ থেকে আলাদা হয়ে মাটিতে পড়ে গেল। তারপর হাঁটু ভেঙে দেহটাও মাটিতে লুটিয়ে পড়লো।

তলোয়ারের ধারালো পাতটার রক্ত ঘোড়ার কাঁধে মুছে নিয়ে জারাসকে বললাম, বাকি পানিটা নষ্ট করো না।

লক্ষ্য করলাম জারাস বাকি পানিটা মশকে ঢেলে রাখলো। নিজেকে ঠিক করে নিতে আমার কয়েকটি মুহূর্ত দরকার। আমার নির্দয় আঘাতের আগে ঘোড়াটি যে যন্ত্রণা ভোগ করছিল ঠিক একই রকম মানসিক যন্ত্রণা আমিও ভোগ করছিলাম। বিনা কারণে নিষ্ঠুরতা আর কাউকে যন্ত্রণা দেওয়াটা আমি অপছন্দ করি। যাইহোক বর্তমান পরিস্থিতিতে মনের এই ভাব চেপে রাখলাম।

সূর্য দিগন্ত ছুঁতেই আমরা পথে আরও তিনটা অচল ঘোড়া পার হলাম। আর বালুতে খুরের গভীর ছাপ দেখে বুঝতে পারলাম, কিছু আরব দস্যু এক ঘোড়ার পিঠে দুজন করে সওয়ার হয়েছে। অন্যরা হেঁটে চলেছে।

প্রতি ঘন্টায় আমরা আরও দ্রুত ওঁদের কাছাকাছি হচ্ছিলাম। সূর্যাস্তের পরও আমি অনুসরণ চালিয়ে গেলাম। পরিশেষে পূর্ণচন্দ্র এসে আমাদের পথ আলোকিত করলো। উজ্জ্বল রূপালি আলোয় আরবদের ফেলে যাওয়া খুরের ছাপ পরিষ্কার দেখা গেল। এবার আরও দ্রুত চলতে শুরু করলাম।

এরপর পথের ধারে আরও দুটো বিধ্বস্ত ঘোড়া পেলাম। তবে এবার আর ওগুলোর পেছনে সময় নষ্ট করলাম না। তারপর পথের মাঝখানে একটা মানুষের দেহ পড়ে রয়েছে দেখতে পেলাম। লোকটাকে দেখে পরিচিত মনে হচ্ছিল। আমি উট থামিয়ে নিচু হয়ে লক্ষ্য করলাম।

জারাস উদ্বিগ্ন কন্ঠে চেঁচিয়ে উঠলো, সাবধান তায়তা, এটা একটা ফাঁদ হতে পারে। হয়তো সে মারা যাবার অভিনয় করছে। সম্ভবত হাতে একটা ছুরি ধরে রয়েছে।

আমি তার সাবধান বাণী উপেক্ষা করে তলোয়ার বের করলাম। লোকটার কাছাকাছি আসতেই সে নড়ে উঠলো আর মাথা তুলে অসহায় দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাল। ঠিক তখনই আমি তাকে চিনতে পারলাম।

তার দিকে তাকিয়ে আমি এতো হতবাক হলাম যে, আমার মুখ থেকে কোনো কথা বের হচ্ছিল না।

জারাস চিৎকার করে উঠলো, কী হয়েছে তায়তা? আপনি এতো চিন্তিত কেন? লোকটাকে চেনেন নাকি? সাথে সাথে তার প্রশ্নের কোনো উত্তর দিলাম না।

জারাসের দিকে না তাকিয়ে বললাম, আল-নামজুকে আমার কাছে পাঠাও। পায়ের কাছে পড়ে থাকা লোকটি আমার দিকে তাকিয়ে আতঙ্কে থরথর করে কাঁপছিল। তারপর সে ছেঁড়া কেফায়ার একটি অংশ দিয়ে মুখের নিচের অংশ ঢেকে মুখটা অন্য দিকে ফেরাল।

জারাস আল-নামজুকে ডাকতেই সে উট নিয়ে আমার পেছনে এসে দাঁড়াল।

আমি কঠিন কণ্ঠে বললাম, আমার কাছে এসো। সে আমার কাছে এসে দাঁড়াতেই পেছনে বালুতে তার পায়ের মচমচ শব্দ শোনা গেল। আমি ফিরে তাকালাম না।

মৃদুকণ্ঠে সে বললো, আমি এখানে প্রভু।

স্যান্ডেলের বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে মাটিতে পড়ে থাকা লোকটাকে স্পর্শ করে বললাম, এই লোকটাকে চেন?

না প্রভু, লোকটির মুখ দেখতে পাচ্ছি না সে বিড়বিড় করে বললো, তবে তার গলা কেঁপে গেল, বুঝলাম সে মিথ্যা বলছে। আমি নিচু হয়ে কেফায়ার এক প্রান্ত ধরে টান দিয়ে লোকটার মুখ থেকে তুলে নিলাম। আল নামজু আঁতকে উঠলো।

এবার আমি বললাম, এবার মুখটা দেখতে পাচ্ছো? কে সে?

কিছুক্ষণ নীরবতা, তারপর লোকটি হাত দিয়ে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করলো। আমাদের দিকে আর তাকাতে পারছিল না।

বল আল-নামজু, এই শুওরের মলটি কে? আমার রাগ আর তিক্ততার পরিমাণ বুঝাতে আমি ইচ্ছা করেই এই শব্দটা ব্যবহার করলাম।

বুড়ো লোকটি ফিসফিস করে বললো, সে আমার ছেলে হারুন।

সে কেন কাঁদছে, আল-নামজু?

আমি যে বিশ্বাস তার উপর রেখেছিলাম তা সে ভঙ্গ করেছে তাই কাঁদছে।

কীভাবে সে বিশ্বাসঘাতকতা করলো? সে শেয়াল আল-হাওয়াসাঈকে জানিয়ে দেয় কোথায় আমাদেরকে পাওয়া যাবে। তারপর ওদেরকে পথ দেখিয়ে পানির গুহার কাছে নিয়ে আসে।

এই বিশ্বাসঘাতকতার উপযুক্ত শাস্তি কী হওয়া উচিত আল-নামজু?

তার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। আপনি হারুনকে মেরে ফেলুন প্রভু।

আমি তলোয়ারটা বের করে বললাম, না বুড়ো। আমি তাকে মারবো না। সে তোমার সন্তান। তুমিই তাকে হত্যা করবে।

সে ভয়ে পিছিয়ে গিয়ে বললো, আমি আমার নিজের ছেলেকে মারতে পারবো না প্রভু। এটা হবে অচিন্তনীয় খারাপ এবং ঘৃণ্য একটি কাজ। আমি আর আমার ছেলে অনন্তকাল শেঠের অন্ধকার নিম্ন জগতে দণ্ডিত হয়ে পড়ে থাকবো।

তুমি তাকে মেরে ফেল, তারপর আমি তোমার আত্মার জন্য প্রার্থনা করবো। তুমি তো জান আমার ক্ষমতা আছে। তুমি জানো দেবতাদের সাথে মধ্যস্থতা করার ক্ষমতা আমার আছে। হয়তো ওরা আমার প্রার্থনা শুনবেন। এই সুযোগটা তোমাকে নিতে হবে।

এবার সে নিঃশব্দে কাঁদতে কাঁদতে বললো, হে প্রভু, অনুগ্রহ করে এই ভয়ঙ্কর দায়িত্ব থেকে আমাকে রেহাই দিন। তার দাড়ি বেয়ে চোখের পানি গড়িয়ে পড়তে লাগলো। মাটিতে লুটিয়ে পড়ে সে আমার পায়ে চুমু খেল।

কিন্তু তার অনুনয় বিনয়ে আমার মন গললো না। আমি বললাম, পিতার হাতে মৃত্যুই তার উপযুক্ত শাস্তি। ওঠো আল-নামজু। তাকে মেরে ফেল, আর নয়তো আমি প্রথমে তোমার ঘোট দুই ছেলে তালাল আর মুসাকে মারবো। তারপর হারুন আর সবশেষে তোমাকেও হত্যা করবো। তোমার বাড়িতে আর কোনো পুরুষ থাকবে না। তোমাদের জন্য প্রার্থনা করার মতো কেউ বেঁচে থাকবে না।

সে কাঁপতে কাঁপতে উঠে দাঁড়াল, আমি তার হাতে আমার তরবারিটা ধরিয়ে দিলাম। সে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে দেখলো আমি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এরপর আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে চোখ নিচের দিকে নামাল।

আমি আবার জোর দিয়ে বললাম, চালাও এটা! সে দুই হাত দিয়ে মুখ থেকে চোখের পানি মুছলো। মন শক্ত করে চিবুক উঁচু করলো। তারপর আমার হাত থেকে তলোয়ার নিয়ে শক্ত হাতে বাঁটটা ধরলো। আমাকে পাশ কাটিয়ে হারুনের উপর এসে দাঁড়াল।

আবার আমি বললাম, চালাও! সে তলোয়ারটা উঁচু করলো তারপর আঘাত করলো একবার, দুবার এবং তিনবার। তারপর তলোয়ারটা মাটিতে ফেলে দিয়ে তার বড়ছেলের মৃতদেহের উপর লুটিয়ে পড়লো। ছিন্ন মুণ্ডটা বুকে চেপে ধরে ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করলো।

তলোয়ারটা তুলে আমি রক্তের দাগ লাশের দেহে মুছলাম। তারপর আমার উটের কাছে ফিরে গিয়ে উটের পিঠে চড়ে বসলাম। আল-নামজুকে তার পুত্র শোক করার সুযোগ দিয়ে আবার দস্যু শেয়ালের পেছনে ছুটার জন্য তৈরি হলাম।

আমার সমবেদনার অনুভূতি সমগ্র মানজাতিকে ঘিরে নেই। আর যারা আমার বিরুদ্ধে অপরাধ করে তাদের সব অপরাধের প্রতি আমি মহানুভবতা দেখাতে পারি না।

.

ভোরের প্রথম আলো দেখা দিতেই আমরা সেই জায়গায় পৌঁছলাম যেখানে দস্যু আল-হাওয়াসাঈ দ্বিতীয়বার তার দলকে বিভক্ত করেছিল। এবার সে মরিয়া হয়ে উঠেছে। ইতোমধ্যে সে নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছে প্রথমবার দুদলে বিভক্ত হওয়ার পরও আমি তার পিছু ছাড়িনি।

মাটিতে নেমে বেদুঈনদের সংখ্যাটা আন্দাজ করার চেষ্টা করলাম।

এবার এক দলে ছয়টি ঘোড়া আর অন্য দলে চারটি ঘোড়া রয়েছে। প্রতিটি ঘোড়ার পিঠে দুজন করে সওয়ারি ছিল। তার মানে মোট বিশজন লোক। এছাড়া পাঁচজন লোক হেঁটে চলছিল।

উত্তর দিকে যে বড় দলটি মোড় নিয়েছিল আমি সেটার পথরেখা পরীক্ষা করলাম। তারপর আমার মন নেচে উঠলো যখন দেখলাম একটি ছোট সুন্দর পায়ের ছাপ তাদেরকে অনুসরণ করছে। এরাই তেহুতিকে তাদের সাথে নিয়েছে।

অবশ্য এবার ওরা তাকে মাটিতে নামিয়ে হাঁটাচ্ছে আর চিহ্নগুলো দেখে। আমি বুঝতে পারলাম দুজন আরব জোর করে তাকে টেনে নিয়ে চলেছে। দৌড়ে সামনে এগিয়ে কাছ থেকে তার পায়ের ছাপগুলো পরীক্ষা করলাম। রেগে ফেটে পড়লাম যখন দেখলাম একটা খালি পা থেকে রক্ত ঝরছিল। বালুতে ছোট ছোট পাথরের ধারাল টুকরায় তার পা কেটে গেছে।

পায়ের ছাপগুলো পরিষ্কার। আর কোনো সন্দেহ নেই যে উত্তরমুখি দলটির সাথেই তেহুতি গিয়েছে। তারপরও আমি ভাবলাম রাগের বশে হয়তো আমি ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলতে পারি। আমাকে ভালোভাবে নিশ্চিত হতে হবে।

জারাসকে ডেকে বললাম, আমি ডাকা পর্যন্ত এখানে অপেক্ষা করো। তাকে সেখানে রেখে পায়ের ছাপগুলো অনুসরণ করে সামনে এগিয়ে চললাম। একশোবিশ পা যাওয়ার পর তেহুতির পায়ের ছাপ আর দেখা গেল না। তবে এনিয়ে আমি বেশি কাতর হলাম না।

বুঝতে পারলাম সম্ভবত আল-হাওয়াসাঈ কিংবা অন্য কোনো আরব তাকে ঘোড়ার পিঠে তুলে নিয়েছে। শুধু পায়ের ছাপগুলোই যে পরিষ্কার তা নয়, আমার ডান হাতে ধরা হাথরের সোনার মাথা থেকে যে অলৌকিক আভা বের হচ্ছে সেটিও এতে সমর্থন দিচ্ছে।

পেছন ফিরে জারাসকে কাছে আসতে ইশারা করলাম। সে আমার উট নিয়ে এলো। উটের পিঠে চড়ে আমি তেহুতিকে নিয়ে উত্তরমুখি চলা আরবদের ফেলে যাওয়া পায়ের ছাপ অনুসরণ করে এগিয়ে চললাম।

মরুভূমির সামান্য উঁচুনিচু জমির উপর দিয়ে কিছুদূর যাওয়ার পর পরবর্তী বালিয়াড়ির উপর উঠার পর অনুভব করলাম, তেহুতির সোনার অলঙ্কারটির আভার বিচ্ছুরণ কমে এসেছে। সাথে সাথে লাগাম টেনে ধরে উটটি থামালাম। ধীরে ধীরে চারপাশের বিশাল বালিয়াড়িগুলোর দিকে তাকালাম।

জারাস কাছে এসে জিজ্ঞেস করলো, কী হয়েছে প্রভু?

তেহুতি এপথে আসেনি। শেয়াল আমাদের সাথে চালাকি করেছে।

সে বললো, এটা কী করে সম্ভব তায়তা? আমিও তার পায়ের ছাপ দেখেছি। এতে কোনো সন্দেহ নেই।

উটের মুখ ফিরিয়ে আমি বললাম, অনেক সময় মিথ্যা পরিষ্কার দেখা যায় আর সত্য লুকিয়ে থাকে।

বুঝতে পারলাম না, প্রভু।

আমি বললাম, আমি ভালোভাবেই বুঝেছি জারাস। অনেক বিষয় আছে। যা তুমি কখনও বুঝতে পারবে না। কাজেই এ-বিষয়ে তোমার কাছে ব্যাখ্যা দিয়ে সময় নষ্ট করবো না।

আমার লোকেরা বিরক্ত হলেও কোনো কথা না বলে পেছনে ঘুরলো।

যে জায়গায় তেহুতির খালি পায়ের ছাপটি হারিয়ে গিয়েছিল সেই জায়গায় আবার ফিরে এলাম। উটের পিঠ থেকে নেমে লাগাম একজনের হাতে তুলে দিলাম।

আমি জানি কিছু একটা আমার নজর এড়িয়ে গেছে। কিন্তু সেটা কি তা ধরতে পারছি না।

আরও পিছিয়ে যেখানে বেদুঈনরা দুইদলে ভাগ হয়েছিল সেখানে পৌঁছে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে শুরু করলাম। উল্টো দিকে যাওয়া কোনো পথরেখা কি দেখা যাচ্ছে? একটু থেমে ভাবলাম। উত্তর হল, না নেই। এই জায়গাটি থেকে ওরা দুই দলে ভাগ হয়ে দুই দিকে সোজাসুজি চলে গেছে; কেউ আর পেছন ফিরে আসেনি।

যাইহোক এই অস্বাভাবিকতার উত্তর খুঁজার চেষ্টা করেও ঠিক ধরতে পারছিলাম না।

মনে মনে বললাম, সে নিশ্চয়ই ফিরে গেছে। দ্বিতীয় দলটির সাথে সামনের দিকে আর যায় নি, তার মানে সে নিশ্চয়ই পেছন দিকে গিয়েছে।

আবার একটু থামলাম, আচ্ছা আমি, পেছন দিকে গিয়েছে এই কথাটা কেন ব্যবহার করলাম? এই পরিস্থিতিতে এই কথাটা ঠিক নয় আর আমি তো সাধারণত ভুল বাক্য ব্যবহার করি না।

সমাধানটির খুব কাছাকাছি পৌঁছার পর এবার জোরে জোরে বলে উঠলাম, একজন মানুষ পেছন দিকে যায় না। হয় পেছন দিকে ঘুরে কিংবা পেছন পেছন হাঁটে আবার থামলাম। হুঁ, আচ্ছা! এবার বুঝেছি!

যেখানে তেতির খালি পায়ের ছাপটি শেষ হয়েছিল সেইজায়গায় আবার ছুটে গেলাম।

এবার আমি ঠিক বুঝতে পেরেছি কী খুঁজতে হবে। সাথে সাথে তা পেয়েও গেলাম। এখানে আরেক জোড়া পুরুষ মানুষের পায়ের ছাপ ছিল যা আপাত দৃষ্টিতে দলটির অন্যান্যদের মতো উত্তরদিকেই যাচ্ছিল। তবে এখানে কিছু পার্থক্য ধরা পড়লো।

তেহুতির পায়ের ছাপ যেখানে শেষ হয়েছিল, ঠিক সেই জায়গা থেকেই এই একটি পুরুষ মানুষের পায়ের ছাপ শুরু হয়েছে। পায়ের এই ছাপজোড়া অন্য সব পায়ের ছাপ মাড়িয়ে চলেছে। যে লোকের এই পায়ের ছাপ, সে ভারি কোনো ওজন বহন করছিল। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল প্রতি পদক্ষেপে এই লোকটির স্যান্ডেলের পেছনে গোড়ালির দিকে ধুলা উড়িয়ে চলছিলঅথচ সামনের দিকে হাঁটলে স্যান্ডেলের বুড়ো আঙুলের সামনের দিকে ধূলা উড়ার কথা।

মনে মনে ভাবলাম, সম্ভবত শেয়ালই এই পায়ের ছাপ ফেলেছিল। প্রথমে যেখানে দলটি দুই ভাগ হয় সেখানে সে তেহুতিকে মাটিতে নামিয়ে দেয়। তারপর উত্তরমুখি দলটির ঘোড়াগুলোর সামনে তাকে জোর করে কয়েক পা হাঁটায়। দুইশো পা যাওয়ার পর সে ঘোড়া থেকে নেমে পড়ে। তার ঘোড়াটি উত্তর দিকে যাওয়া দলটির সাথে পাঠিয়ে দেয়। তারপর মাটি থেকে তেহুতিকে তুলে নিয়ে যেখানে প্রথম দলটি তার জন্য পেছনে অপেক্ষা করছিল সেখানে ফিরে যায়। তবে এক্ষেত্রে সে তেহুতিকে কাঁধে তুলে পেছন দিকে হেঁটে চলে। প্রথম দলটি তার আর তেহুতির জন্য আরেকটি ঘোড়া নিয়ে অপেক্ষা করছিল। এইখানে এসে সে তেহুতিকে নিয়ে দক্ষিণমুখি দলটির সাথে চলে যায়। আর আমাদেরকে উত্তরমুখি দলটির অনুসরণ করতে বাধ্য করে। অত্যন্ত শয়তানি বুদ্ধির জটিল একটি ধূর্তামি। আমি মৃদু হাসলাম।

তারপর খুশি হয়ে বেশ জোরে বলে উঠলাম। তবে অতো চালাক নয়।

জারাস আর তার লোকজন হতবুদ্ধি হয়ে আমাকে লক্ষ্য করছিল, ওরা আরও অবাক হয়ে গেল যখন আমি তেতির খালি পায়ের ছাপগুলো পেছনে ফেলে উল্টো দিকে বেদুঈনরা দুই দলে ভাগ হয়ে যে জায়গা থেকে দুই দিকে যেতে শুরু করেছিল সেদিকে ফিরে চললাম।

দিক বদল করে দক্ষিণ দিকে যাওয়া শুরু করার পর জারাস কিংবা তার লোকজন কোনো ধরনের প্রতিবাদ করতে সাহস পেল না। এদিকে প্রতি লিগ দূরত্ব পার হওয়ার সাথে সাথে আমার হাতে ধরা দেবীর মাথার সোনার অলঙ্কারটি থেকে বিচ্ছুরিত উষ্ণ আভা আরও শক্তিশালী হতে লাগলো।

.

আমি জানি তেহুতি এখন কীরকম দুর্দশায় আছে। দস্যুরা যখন তাকে অপহরণ করেছিল তখন তার পরনে কেবল একটি সুতির জামা ছিল। উটের পিঠের কাঠের জীনের উপর বসা কিংবা উপরে প্রখর রোদের তাপে এই পোশাক কোনো কাজে আসবে না। যখন সে খালি পায়ে হাঁটছিল তখন তার পা কেটে যে রক্ত ঝরছিল তা আমি দেখেছি। একজন মিসরীয় রাজকুমারীর পা একটি কৃষক কন্যার পায়ের চেয়ে অনেক নাজুক।

আমার মনে শুধু এইটুকু সান্ত্বনা ছিল যে, শেয়াল তার দস্যুদলের কাউকেই তেহুতির গায়ে হাত তুলতে অনুমতি দেবে না। একটি কুমারী মেয়ে হিসেবে তার মূল্য অনেক বেশি। এতোটুকু বুদ্ধি তার নিশ্চয়ই আছে যে, তেহুতির দামে সে দশ হাজার সুন্দরী ক্রীতদাসী কিনতে পারবে। ইচ্ছা হচ্ছিল উটগুলোকে আরও জোরে চালিয়ে নিয়ে মেয়েটিকে উদ্ধার করে একদুই ঘন্টা কষ্ট পাওয়া থেকে রেহাই দেই।

তবে ভাবলাম শেয়াল নিশ্চয়ই আরও কিছু চালাকি করার চেষ্টা করবে আর সেক্ষেত্রে আমাকে তা সামলাবার জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। কাজেই স্বাভাবিক গতিতেই উট চালিয়ে নিয়ে চললাম। তবে পানি খাওয়ার জন্য কোথাও না থেমে সারা সকাল চললাম।

একঘন্টা পর দুপুরের সূর্য যখন মাথার উপর, তখন আমি একটা বেলেপাথরের পাহাড়ের চূড়ায় উঠলাম। নিচের দিকে তাকিয়ে বেশ চওড়া কয়েক লিগ দীর্ঘ একটি খাড়ি দেখতে পেলাম। পুরো উপত্যকাটি জুড়ে বহুকাল থেকে বাতাসের আঘাতে দৈত্যাকৃতির প্রাকৃতিক স্থাপত্য গড়ে উঠেছে। লাল বেলে পাথরের সুউচ্চ চূড়াগুলো যেন নীল আকাশের পেট ছুঁয়ে রয়েছে। তবে গোড়ারদিকে বাতাসে ক্ষয়ে যাওয়ায় সরু স্তম্ভগুলোর উপর বিশাল মাথাগুলো ভারসাম্য বজায় রেখে দাঁড়িয়ে রয়েছে।

দলের মধ্যে আমি সবচেয়ে বয়স্ক হলেও আমার দৃষ্টিশক্তি সবচেয়ে তীক্ষ্ণ ছিল। সবার আগে আমিই পলাতকদের দেখতে পেলাম। বেলেপাথরের দৈত্যাকৃতির একশিলা স্তম্ভগুলোর গোড়ার ছায়ায় মানুষগুলোকে আমিই প্রথম জারাস আর তার লোকজনদের দেখালেও প্রথমে ওরা ঠিক বুঝে উঠতে পারেনি। রোদে পোড়া পাথরগুলো থেকে গরম বাষ্প উঠে মরীচিকা হয়ে কেঁপে কেঁপে উঠছিল আর এতে ওদের দৃষ্টিবিভ্রম হচ্ছিল।

তারপর একটি বর্শা বা তলোয়ালের পাতে রোদ প্রতিফলিত হয়ে ঝিকমিক করে উঠতেই ওদের চোখে পড়লো। আমার পেছন থেকে দলের সবাই উল্লাসে চেঁচিয়ে উঠলো। তবে আমি জানি আরও খারাপ ঘটনা ঘটার বাকি আছে। এখন আমরা মরিয়া হয়ে ওঠা এক লোকের মুখোমুখি হতে যাচ্ছি আর শেয়াল তাকে ধরে নিয়ে যাওয়ার পর তেহুতি এখন আরও বিপদের মধ্যে রয়েছে।

সবাইকে চুপ করতে বলে নিঃশব্দে পাহাড়ের পেছন দিক দিয়ে নামতে শুরু করলাম। বেদুঈনদের গতিবিধির প্রতি নজর রাখার জন্য দুজন লোকসহ একজন বিশ্বাসী সার্জেন্টকে পাহাড় চূড়ায় রাখলাম। তারপর অন্যদেরকে নিয়ে নিচে নামার পর একটু বিশ্রাম নিয়ে অস্ত্রশস্ত্রসহ প্রস্তুত হতে বললাম।

উটের পিঠে বেধে রাখা আমার পোটলাটা থেকে চামড়ার ব্যাগে রাখা যুদ্ধের ধনুক আর তূণীর বের করে আনলাম। জারাসকে সাথে নিয়ে একটা পাথরের উপর বসে তাকেও পাশে বসতে বললাম।

তারপর তাকে নির্দেশ দিতে শুরু করলাম, ওদের ঘোড়াগুলো পরিশ্রান্ত হয়ে পড়েছে, আর চলতে পারবে না। এবার শেয়াল শেষ লড়াই চালাবার জন্য অবস্থান নিয়েছে। তারপর তাকে বুঝিয়ে বললাম শেয়ালের কবল থেকে তেহুতিকে আহত না করে উদ্ধার করতে হলে আমাদেরকে কী করতে হবে। একবার বলার পর তাকে বললাম পুরো পরিকল্পনাটা আমাকে শুনাতে যাতে কোনো ধরনের ভুল বোঝাবুঝির অবকাশ না থাকে।

কথা বলতে বলতে আমি আমার ধনুকের ছিলা টেনে পরীক্ষা করছিলাম। তূণীর থেকে সবচেয়ে ভালো তিনটি তীর বেছে নিলাম। হাতের তেলোতে গড়িয়ে নিয়ে দেখে নিলাম কোনো ধরনের অমৃসণতা আছে কিনা। খুব ভালোভাবে পরীক্ষা করার পর তীর তিনটি কোমরবন্ধে খুঁজে নিলাম। বাদবাকি তীরগুলো তূণীরে ঢুকিয়ে কাঁধে বেঁধে নিলাম। হয়তো একবারের বেশি তীর ছুঁড়ার সুযোগ পাবো না, তাও আবার এতো দূরের নিশানায়। আর যদি দ্বিতীয় সুযোগ আসে তখন তীর বাছাই করতে গিয়ে একটি মুহূর্তও নষ্ট করতে চাই না।

উঠে দাঁড়িয়ে জারাসের পিঠে একটা চাপর দিয়ে বললাম, আমি প্রস্তুত জারাস। তুমি তৈরিতো?

সে একলাফে উঠে দাঁড়িয়ে বললো, হ্যাঁ তায়তা! রাজকুমারীর জন্য আমি প্রাণ দিতে প্রস্তুত। নাটুকেপনা হলেও তার কথাটির মধ্যে যথেষ্ট আন্তরিকতা ছিল। তরুণ হৃদয়ের ভালোবাসার নিজস্ব একধরনের চমৎকারিত্ব রয়েছে।

আমি শুষ্ক মন্তব্য করলাম, আমার মনে হয় রাজকুমারী তেহুতি আর আমি দুজনেই তোমার জীবিত থাকাটাই শ্রেয় মনে করবো।

জারাস তার লোকজনদেরকে যথারীতি নির্দেশ দিতে শুরু করলো। আর আমি একটা কুমিরের চামড়ার বর্ম আর ব্রোঞ্জের শিরস্ত্রাণ পরে নিলাম যাতে আমার বিশেষ আলখাল্লা আর লম্বা চুল ঢাকা পড়ে। আমি আমার লোকজনের মাঝে নিজেকে আলাদা করে দেখাতে চাই না।

সবধরনের প্রস্তুতি নেওয়ার পর আমরা উটের পিঠ থেকে নেমে উটগুলোকে টেনে নিয়ে পাহাড়ের পেছন দিকে গেলাম। তারপর নিচে বেলেপাথরের একশিলা স্তম্ভের উপত্যকায় নামতে শুরু করলাম। শেয়াল তার দস্যুদের নিয়ে সেখানেই আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল।

এবার আমার বামবাহুতে চামড়ার বাহুবন্ধনীটিা লাগিয়ে নিলাম, যাতে ধনুকের ছিলার আঘাতে গতবারের মতো কেটে না যায়।

দলের নেতৃত্ব দিচ্ছিল জারাস। তার বিশ পা পেছনে অন্যান্যরা একজোট হয়ে চলেছে। এবার আমি জারাসের পাশাপাশি নেই।

কুমিরের বর্ম পরে আমি দ্বিতীয় সারির বামদিকে একেবারে শেষ প্রান্তে রয়ে গেলাম। ধনুকটা উটের গদির কাপড়ের মাঝে লুকালাম, যাতে একেবারে শেষ মুহূর্তে যখন এটা তুলবো, তার আগে শত্রুপক্ষের কারও চোখে না পড়ে।

আমাদের অবস্থান থেকে জারাস খানিকটা সামনে এগিয়ে গেল, যাতে তার উপর শেয়ালের নজর পড়ে। সে তলোয়ারটা উল্টো করে তলোয়ারের হাতল মাথার উপরে উঁচু করে রেখেছে। এটা ছিল সাময়িক যুদ্ধবিরতীর সর্বজনীন প্রতীক।

আমি জানতাম শেয়াল এটাকে শর্তসাপেক্ষে আলোচনার একটা আমন্ত্রণ হিসেবে ধরে নেবে, কেননা আমরা সবাই ইতোমধ্যেই অচলাবস্থায় আটকে পড়েছি। সে পালাতে পারছে না, কেননা তার ঘোড়াগুলো অচল হয়ে পড়েছে, আর তার লোকদেরও খেলা সাঙ্গ হয়েছে।

আবার আমরাও সরাসরি আক্রমণ করে ব্যাপারটা নিষ্পত্তি করতে পারছি না, কেননা সে তেহুতির গলায় একটা ছুরি ধরে রেখেছে।

আমি জারাসের উপর নির্ভর করছিলাম, যাতে সে শেয়ালকে আমার তীরের পাল্লার মধ্যে নিয়ে আসে। আরেকটু কাছাকাছি হতেই, আমি পরিস্থিতিটা আরও ভালোভাবে নিরীক্ষণ করলাম।

পায়ের ছাপ থেকে আমি জানতে পেরেছিলাম, দুই দলে ভাগ হয়ে আর মরুভূমির বিরূপ প্রতিক্রিয়ার কারণে আল-হাওয়াসাঈর দস্যুদের সংখ্যা এখন পনেরোতে নেমে এসেছে। আর এদিকে জারাসসহ আমার রয়েছে ছাপান্নজন রক্ষী। ওরা সবাই এখন সতেজ আর লড়াই করার জন্য উন্মুখ হয়ে রয়েছে।

শেয়াল বেশ সর্তকতার সাথেই বেলেপাথরের বিশাল একশিলা স্তম্ভটির নিচে তার শেষ অবস্থানটি বেছে নিয়েছিল। শিলাটি দুই দিক দিয়ে তাকে আড়াল করে রেখেছে। তারপরও এটি তাকে অতিরিক্ত সুবিধা দিয়েছে। তার মাথার উপরে সামনের দিকে ছড়ানো একটি তাকের মতো বেলেপাথরের ছাদটি আমার তীর ছোঁড়ার পাল্লাকে সীমাবদ্ধ করেছে। এই দূরত্ব থেকে উঁচু করে তীর ছুঁড়লে সেটা শেয়ালের গায়ে বেঁধার আগে তার মাথার উপরে ছাদের পাথরে লেগে যেতে পারে। আমাকে আরেকটু এগিয়ে ক্ষেপণাস্ত্রের মতো বাঁকা পথে তীর ছুঁড়তে হবে যা ছাদ এড়িয়ে তার গায়ে বিঁধতে পারে।

তবে পাহাড়টি শেয়ালের জন্য একটি কারাগারের দেয়ালও হয়েছে। তার পালাবার আর কোনো পথ নেই। তাকে আমাদের সাথে একটা বোঝাঁপড়ায় আসতেই হবে: তার নিজের আর লোকজনের জীবনের বদলে আমাদের রাজকুমারীর জীবন অদলবদল করতে হবে।

জারাসকে অনুসরণ করে আমরা ধীরে ধীরে যেখানে শেয়াল অপেক্ষা করছে সেদিকে এগোতে লাগলাম।

এবার আমি দেখলাম বেদুঈন সর্দারের ঘোড়াগুলো পিপাসায় কাতর হয়ে আর অতিরিক্ত পরিশ্রমের কারণে মারা পড়েছে। আরবরা কয়েকটি ঘোড়ার মৃতদেহ সামনের দিকে টেনে এনে অর্ধচন্দ্রাকার দেয়ালের মতো সাজিয়ে রেখেছে। এর আড়ালে ওরা হামাগুড়ি দিয়ে অবস্থান নিয়েছে। লোকগুলোর শুধু মাথার উপরের অংশ, বর্শার ডগা আর বাকা তলোয়ারের কিছু অংশ দেখা যাচ্ছে।

আরেকটু কাছে এগিয়ে আমি লক্ষ্য করলাম যে, অন্তত তিনজন আরব ধনুকে তীর জুড়ে আমাদের দিকে ছুঁড়বার জন্য প্রস্তুত হয়ে রয়েছে। তবে বেদুঈনরা ভালো তীরন্দাজ নয়। এগুলোর পাল্লা অত্যন্ত দুর্বল, আমার হাঁটুর কাছে উটের গদীর কাপড়ের নিচে যে শক্তিশালী বাঁকা যুদ্ধের ধনুকটি রয়েছে তার তুলনায় এর পাল্লা অর্ধেক হবে।

এখন সবকিছু নির্ভর করছে আল-হাওয়াসাঈ আমাদেরকে থামতে বলার আগে জারাস কতোটুকু দুরত্ব কমাতে পারবে। উটের প্রতিটি পদক্ষেপের সাথে আমি কমে আসা দূরত্বের পাল্লাটা পরিমাপ করছিলাম।

তারপর আমরা ঠিক মোক্ষম জায়গায় পৌঁছলাম, যেখান থেকে আমার ধারণায় উপরের দিকে বাঁকা করে তীর ছুঁড়লে তীরটি নিচু হয়ে ওদের মাথার উপরের ছাদে না লেগে যে কোনো একজন আরবের কাছে পৌঁছাবে। এবার একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। এরপর সামনের দিকের এগিয়ে যাওয়া প্রতিটি পদক্ষেপ আমাকে আরও ভালো অবস্থানে নিয়ে চলেছে।

আমার সামনে যে রক্ষীরা ছিল, ওরা আমাকে আড়াল করে রেখেছিল। আমি নিচু হয়ে ধনুকটা ধরলাম। তারপর নিচের দিকে না তাকিয়ে অন্য হাত দিয়ে কোমরবন্ধ থেকে একটা তীর বেছে নিলাম। ধনুকটা যেখানে হাতে ধরেছিলাম তার উপর তীরের মাথা রেখে বাম হাতের তর্জনী দিয়ে তীরটা চেপে ধরে রাখলাম।

আমার উটটি আমাকে নিয়ে ধীরে ধীরে আরও পাঁচ পা সামনে এগোল। ঠিক তখনই বেদুঈনদের সারি থেকে একজন লোক উঠে দাঁড়িয়ে আমাদের মুখোমুখি হল। সে মুখটাকা কাপড়টি সরিয়ে আরবীতে গর্জে উঠলো।

থামো! আর কাছে এগোবে না! তার কণ্ঠস্বর মাথার উপরের ছাদে প্রতিধ্বনিত্ব হয়ে গমগম করে উঠলো।

কালো দাড়িওয়ালা শয়তান লোকটাকে দেখেই আমি চিনতে পারলাম। তিনদিন আগে তেহুতিকে ঘোড়ার পিঠে ফেলে পালিয়ে যাওয়ার সময় সে আমার দিকে তাকিয়ে দাঁত বের করে হাসছিল। সে চিৎকার করে বলে উঠলো,

আমি আল-হাওয়াসাঈ, বেদুঈন সর্দার। সবাই আমাকে ভয় পায়!

তারপর সে নিচু হয়ে ঘোড়ার মৃতদেহগুলোর পেছনে যেখানে তেহুতিকে লুকিয়ে রেখেছিল, সেখান থেকে তাকে টেনে দাঁড় করাল।

সে এমনভাবে তেহুতিকে ধরে রাখলো যেন আমরা তার মুখ দেখে তাকে চিনতে পারি। একহাত দিয়ে সে তেহুতির গলা শক্ত করে পেঁচিয়ে ধরে রেখেছে, যাতে সে নড়াচড়া বা চিৎকার করতে না পারে। তার ডান হাতে একটা নাঙ্গা তলোয়ার ধরা রয়েছে। তেহুতির দেহ দিয়ে সে নিজের দেহ আড়াল করে রেখেছে।

আল-হাওয়াসাঈ তেহুতির পরনের সমস্ত পোশাক খুলে ফেলেছে। আমি জানি সে এটা করেছে তাকে অপমান করার জন্য আর দেখাতে যে সে সম্পূর্ণভাবে তার উপর কর্তৃত্ব খাঁটিয়েছে। তার গলা পেঁচিয়ে ধরা দস্যুর বিশাল লোমশ হাতের তুলনায় তেহুতির অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো কীরকম কমনীয় আর শিশুর মতো দেখাচ্ছে। ভয়ে তার চোখদুটো বড় বড় হয়ে রয়েছে।

জারাস এক লাফে উটের পিঠ থেকে নামলো। তখনও উল্টো করে ধরা তলোয়ারটা হাতে নিয়ে সে আল-হাওয়াসাঈয়ের দিকে ধীরে ধীরে হাঁটতে শুরু করলো। আল-হাওয়াসাঈসের মতো সেও তার শিরস্ত্রাণের মুখের ঢাকনা খুলে নিজের চেহারা প্রকাশ করে রেখেছে।

জারাসকে চেনার সাথে সাথে তেহুতির মুখ থেকে আতঙ্ক সরে গিয়ে আশার আলো জেগেছে আর তার সাহস ফিরে এসেছে। জারাসের নাম নিতে চেষ্টা করে তার ঠোঁট নড়ে উঠলো, তবে দস্যু শেয়াল শক্তহাতে তার গলা পেঁচিয়ে ধরায় কোনো শব্দ বের হল না।

তার জন্য আমি গর্ব বোধ করলাম, যেরকম তার মায়ের জন্যও করতাম। তবে এখন এসব ভাবনা থেকে আমার মন সরিয়ে নিলাম। দুই চোখ দিয়ে দূরত্বটা মেপে আমার উড়ন্ত তীরের উচ্চতা আর তারপর নিচু হয়ে লক্ষ্যের দিকে যাওয়ার গতিপথটি মনে মনে পরিমাপ করলাম।

অনুভব করলাম বাম কাঁধের পাশ দিয়ে মৃদু হাওয়া বয়ে যাচ্ছে, তবে দেখলাম যেখানে আল-হাওয়াসাঈ দাঁড়িয়ে রয়েছে সে স্থানটি বড় একটি পাথরের টুকরা দিয়ে আড়াল করা রয়েছে। শুধু মাত্র একজন ওস্তাদ তীরন্দাজই এখানে তার লক্ষ্য সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারবে। প্রথমে হাওয়ায় ডান দিকে মোড় নেবে, তারপর বাতাসহীন জায়গাটিতে গিয়ে তীরটি নিচের দিকে শেষ কয়েক কিউবিট নিচে নেমে লক্ষ্যে আঘাত হানবে।

আল-হাওয়াসাঈ প্রচণ্ড আক্রোশে জারাসের উদ্দেশ্যে গালি দিতে দিতে তাকে সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকতে বলছিল আর সামনে না এগোতে সাবধান করছিল। ডান হাতে ধরা ছোট তরোয়ালের ব্রোঞ্জের ধারাল পাতটি সে তেহুতির চিবুকের নিচে নরম গলার সাথে চেপে ধরে রেখেছিল।

সে চিৎকার করে জারাসকে বললো, ওখানেই থাম আর নয়তো আমি এই কুত্তির গলা কেটে পুরো দেহ টুকরো টুকরো করে ফেলবো।

জারাস শান্ত কণ্ঠে বললো, কারও মারা যাবার প্রয়োজন নেই। আমরা কথা বলতে পারি। সে আরও এগোতে লাগলো। জারাস আমাকে মূল্যবান সুবিধা দিচ্ছিল। প্রতিটি পদক্ষেপে আমার তীরের পাল্লা আরও সুবিধাজনক জায়গায় পৌঁছাচ্ছে।

আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তার মুখোমুখি হতে গিয়ে আল-হাওয়াসাঈ একটু সরে গিয়ে আমার তীরের লক্ষ্য আরও উন্মুক্ত করে দিচ্ছিল।

এখন শুধু দরকার শেয়ালের মনোযোগ কয়েক মুহূর্তের জন্য অন্য দিকে সরানো যাতে সেই ফাঁকে আমি ধনুকে তীর লাগিয়ে গুণ টেনে তীরটি ছুঁড়তে পারি।

মাথা না সরিয়ে আমি একটি শিকারী বাজপাখির মতো তীক্ষ্ণ কণ্ঠে ডেকে উঠলাম। আমার জীবনের প্রতীক হচ্ছে আহত বাজপাখি আর আমি এই ডাকটি নিপুণভাবে আয়ত্ব করেছিলাম। এমনকি সবচেয়ে অভিজ্ঞ বাজপাখির শিকারীও আমার ডাক আর আসল পাখির ডাকের মধ্যে পার্থক্য বের করতে পারবে না। চতুর্দিকে পাথরের দেয়ালে প্রতিধ্বনিতৃ হয়ে শব্দটি আরও জোড়ালো হয়ে উঠলো।

সমস্ত বেদুঈন বাজপাখি খুব পছন্দ করে। আর আল-হাওয়াসাঈও এই স্মৃতি জাগানিয়া ডাকটি শুনে নিজেকে সামলাতে পারলো না। গালাগালি থামিয়ে সে উপরের দিকে তাকিয়ে খুঁজতে লাগলো কোথা থেকে এই ডাকটি এসেছে। মুহূর্তের জন্য সে মনোযোগ অন্য দিকে সরিয়েছিল, তবে সেটাই আমার জন্য যথেষ্ট ছিল।

আমি ধনুক আর ভালো তীরটি এক সাথে করে ছোঁড়ার জন্য প্রস্তুত হলাম। ধনুকের গুণ টেনে ছেড়ে দিতেই তীরটা উড়ে গেল। লক্ষ্য করলাম তীরটা উপরের দিকে উঠে এর সর্বোচ্চ মাত্রায় পৌঁছলো। শেয়ালের মাথার উপরের পাথরের ছাদটি না ছুঁয়ে এর উপর দিয়ে পার হল, তারপর নিচের দিকে পড়তে শুরু করলো।

আমার মনে হচ্ছিল যেন এটি একটি রাজকীয় ভঙ্গিতে চলছে, তবে আমি জানি কেবল আমার মতো তীক্ষ্ণ দৃষ্টি সম্পন্ন লোকই তা জানতে পারে।

তারপর আমি লক্ষ্য করলাম শেয়ালের দুই চোখ তার কোটরে ঝির ঝির করে কেঁপে উঠলো। অসম্ভব ব্যাপার, হয় সে এটা সে দেখেছে কিংবা একটি বন্য পশুর মতো অনুভব করেছে যে, আমার ছোঁড়া তীরটা তাকে আঘাত করতে যাচ্ছে। সে মাথাটা সামান্য ঝাঁকি দিল আর তার শরীরটি ঘুরতে শুরু করলো। তারপর আমার তীরটি তার বুকের উপরের অংশের এক পাশে বিধলো। আমার লক্ষ্যভ্রষ্ট করার জন্য সে একটু নড়েছে, আমি বুঝতে পারলাম তীরটি তার হৃৎপিণ্ডে লাগেনি।

তবে যাই হোক তীরের ধাক্কায় সে পেছনের দিকে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল। সাথে সাথে দুই হাত উপরের দিকে তুলে ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করলো। তারপর তার পা দুটো ভেঙে পড়তেই সে মাটিতে পড়ে গেল।

তেহুতি তার হাত থেকে ফসকে ঘুরে পড়ে গিয়েছিল। আমি দেখলাম সে হাওয়ার মাঝে এক পাক ঘুরে একটি বিড়ালের মতো ক্ষিপ্রগতিতে মাটিতে দুপা রেখে দাঁড়াল। তাৎক্ষণিক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মুহূর্তের জন্য একটু হকচকিয়ে গেলেও নিজেকে সামলিয়ে নগ্ন দেহে সুন্দর মেয়েটি একটি মোহনীয় ভঙ্গিতে দাঁড়াল।

আমাদের আগেকার পরিকল্পনা মোতাবেক জারাস বাজপাখির ডাকটির জন্য অপেক্ষা করছিল। আমি পাখির ডাক শুরু করার সাথে সাথে সে যেখানে তেহুতি দাঁড়িয়েছিল সেদিকে ঝাঁপ দিল।

শিকারী চিতার মতো ক্ষিপ্র গতিতে সে লাফ দিয়েছিল। তেহুতির কাছে পৌঁছাবার জন্য তাকে মাটিতে পড়ে থাকা শেয়ালের দেহ পার হতে হচ্ছিল। সে দেখতে পেল আমার তীরটি শেয়ালের বুকের উপরের অংশে বিধে রয়েছে, তাই সে মনে করলো দস্যুটি মরে গেছে। তাই সে তার দিকে আর মনোযোগ দিল না। কী ঘটছে, অন্য বেদুঈনরা তা বুঝে উঠার আগেই সে তেহুতির কাছে পৌঁছে গেল। তেহুতিকে জাপটে ধরে পেছনে ঠেলে নিয়ে তার সামনে নিজের দেহ দিয়ে তাকে আড়াল করে দাঁড়াল। সাথে সাথে উল্টো করা তলোয়ারটা শূন্যে ছুঁড়ে আবার মাটিতে পড়ার আগেই তলোয়ারের বাট ডান হাতে ধরে তেহুতির সামনে প্রহরীর মতো দাঁড়াল। সামনের দিকে থেকে আরবরা আক্রমণ করলে তাদের মোকাবেলার করার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলো।

ওদেরকে রক্ষা করার জন্য আমি রক্ষীদের উদ্দেশ্যে চিৎকার করে উঠলাম, এগিয়ে যাও! আক্রমণ কর! উট নিয়ে সামনের দিকে এগোতে এগাতে আমি ধনুকে আরেকটা তীর জুড়লাম। লক্ষ্য করলাম একজন আরব তীরন্দাজ জারাসের দিকে তীর ছুঁড়ার জন্য তার ধনুক উঁচু করেছে।

আরব লোকটির আগেই আমি তীর ছুঁড়লাম। ঠিক সময়ে আমার তীরটা তার গলায় বিঁধলো। তার তীরটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে পড়ে যেতেই সে হাঁটু ভেঙে মাটিতে পড়ে দুই হাত দিয়ে গলায় বেঁধা আমার তীরটা আঁকড়ে ধরলো। মুখ থেকে গল গল করে লাল টকটকে রক্ত বের হতে লাগলো।

আরেকজন আরব জারাসের দিকে ছুটে গিয়ে মাথার উপর তলোয়ার তুলে জারাসকে আঘাত করতে উদ্যত হল। জারাস এক ধাক্কায় লোকটির তলোয়ারটা একপাশে সরিয়ে দিয়ে তার নিজের তলোয়ার দিয়ে লোকটির তলোয়ার ধরা হাতটা এক কোপে বিচ্ছিন্ন করে দিল। আরব লোকটি আর্তচিৎকার করে কাটা হাতের মুড়োটি অন্য হাতে ধরে পেছনের দিকে পড়ে গেল। সে গলায় তীর বেঁধা অন্য আরবটির গায়ের উপর উল্টে পড়লো।

আমি তৃতীয় তীরটি ছুঁড়ে আরেকজন বেদুঈন দস্যুকে ঘায়েল করলাম। জারাস আমার দিকে ফিরে দাঁত বের করে তাকিয়ে হাসতে লাগলো। মনে হল বোকা ছেলেটি এই লড়াই বেশ উপভোগ করছে।

আমি চিৎকার করে তাকে বললাম, তেহুতিকে নিয়ে এখানে চলে এসো!

সে দুহাত দিয়ে তেহুতিকে ছোট্ট একটি শিশুর মতো মাটি থেকে তুলে তার বাম কাঁধে ফেলে নিয়ে চললো।

তেহুতি পা ছুঁড়তে ছুঁড়তে চিৎকার করতে লাগলো, আমাকে নামিয়ে দাও! জারাস তার প্রতিবাদে কোনো কান না দিয়ে তাকে কাঁধে নিয়ে আমার কাছে আসতে শুরু করলো। আমরাও তার দিকে এগোতে লাগলাম।

আল-হাওয়াসাঈ তখনও তীর বেঁধা অবস্থায় একই জায়গায় মাটিতে পড়েছিল। তার দিকে কোনো খেয়াল না করে আমরা আক্রমণরত অন্যান্য বেদুঈনদের সামলাতে ব্যস্ত ছিলাম। অন্যান্যদের মতো আমিও সমান দোষী। আমি জানতাম আমার তীরটি শেয়ালের হৃদপিণ্ডে আঘাত করেনি, হয়তো সে এখনও জীবিত আছে। তবে আমি ভেবেছিলাম তাকে আমি পঙ্গু করে ফেলায় তার তরফ থেকে কোনো বিপদের আশঙ্কা নেই। হাতপা দুই দিকে ছড়িয়ে সে মাটিতে পড়েছিল আর তার তলোয়ারটিও তার দেহের নিচে আটকা পড়েছিল।

তাকে পার হয়েই জারাসকে তেহুতির কাছে পৌঁছতে হয়েছিল। এখন সে আবার পিছিয়ে তার দিকেই আসছিল। জারাসের সমস্ত মনোযোগ ছিল তার চারপাশ ঘিরে থাকা অন্যান্য আরবদের দিকে।

হঠাৎ আল-হাওয়াসাঈ মাটিতে এক গড়ান দিয়ে ঘুরে বসলো। ডান হাতে তলোয়ারটি ধরা রয়েছে, তবে তার উঠে দাঁড়াবার শক্তি নেই।

আমি চিৎকার করে উঠলাম, সাবধান জারাস! পেছনে দেখো জারাস! শেয়াল তোমার পেছনে!

লড়াইয়ের কোলাহলে হয়তো সে আমার চিৎকার শুনতে পায় নি কিংবা আমার সাবধান বাণীর অর্থও ঠিকমতো বুঝতে পারেনি। তাই সে আরেক কদম পিছোতেই আল-হাওয়াসাঈয়ের তলোয়ারের আওতায় চলে এলো।

হতাশায় অসংলগ্ন এক চিৎকার করে শেয়াল তাকে আঘাত করলো। আঘাতটা এলো নিচে আর পেছন দিক থেকে। আঘাতটি সেরকম জোরদার না। হলেও তলোয়ারের ধারাল ডগাটি জারাসের চামড়ার পোশাক ভেদ করে তার দুই পায়ের মাঝখানে ঢুকে গেল।

আল-হাওয়াসাঈ দুর্বল হাতে তলোয়ারটি জারাসের শরীর থেকে টেনে বের করতে চেষ্টা করলো, কিন্তু টেনে বের করার মতো শক্তি তার ছিল না। সে পেছন দিকে হেলে এক কনুইয়ের উপর ভর দিয়ে বসলো। তারপর নিঃশ্বাস নেবার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করতেই বুকে বেঁধা তীরটি ঠিক তখনই এক হ্যাঁচকা টানের চোটে তার নিঃশ্বাস বন্ধ করে দিল। মুখের এক পাশ দিয়ে রক্তের ধারা গড়িয়ে পড়তে লাগলো।

এদিকে জারাসের পুরো দেহ বেঁকে উঠে তারপর শক্ত হয়ে দাঁড়াল। তার ডান হাত থেকে তলোয়ারটা মাটিতে খসে পড়লো। তেহুতি তার বাম হাতের বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে মাটিতে পা রেখে দাঁড়াল।

যন্ত্রণার মাঝে সে কোনোরকমে তেহুতিকে বললো, তায়তার কাছে চলে যান। আমি মারা যাচ্ছি। তায়তা আপনাকে রক্ষা করবে। তারপর সে বাঁকা হয়ে তলপেটের যে জায়গায় তলোয়ারের ডগাটা বিঁধেছে তা অনুভব করলো।

তেহুতি তার উপদেশ সম্পূর্ণ উপেক্ষা করলো। সে জারাসের পাশে অবশ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর নিচের দিকে তাকিয়ে দেখলো জারাসের পোশাকের নিচ দিয়ে তলোয়ারের ডগাটা বের হয়ে রয়েছে আর দুই পায়ের মাঝখান দিয়ে টপটপ করে রক্ত ঝরছে।

জারাস হাঁটু ভেঙে সামনের দিকে পড়ে গেল। মাথা নিচু করে কপাল মাটিতে ঠেকাল।

তার সামনে দাঁড়িয়ে তেতির মুখ রাগে কাঁপছিল, সে আল হাওয়াসাঈর উদ্দেশ্যে চিৎকার করে বলতে লাগলো, তুমি জারাসকে মেরে ফেলেছ! তুমি আমার মানুষকে মেরে ফেলেছ! সে মাটি থেকে জারাসের তলোয়ারটা তুলে নিল। তারপর এমন প্রচণ্ড শক্তিতে শেয়ালের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো, যা তার কমনীয় দেহের তুলনায় সম্পূর্ণ অসম্ভব বলা চলে। তলোয়ারের ডগাটি সোজা শেয়ালের কণ্ঠনালীর মধ্য দিয়ে ঢুকিয়ে দিল।

শেয়ালের গলা থেকে হিশশ করে নিঃশ্বাস বের হল, সে দুই হাতে তলোয়ারের ধারাল ফলাটা ধরে থামাতে ব্যর্থ চেষ্টা করে চললো। পাগলের মতো শক্তিতে তেহুতি তলোয়ারটি তার গলা থেকে টান দিয়ে বের করতেই, ধারাল ফলায় শেয়ালের হাড় শুদ্ধ দুটো আঙুল কেটে গেল।

তারপর শেয়ালের দেহের উপর দাঁড়িয়ে তেহুতি একের পর এক তলোয়ারের কোপ মেরে চললো বুকে, পাঁজরের মাঝে আর অন্যান্য জায়গায়।

আমার লোকেরা তেহুতিকে পাশ কাটিয়ে সামনে এগিয়ে বাদবাকি জীবিত বেদুঈনদেরকে তাদের বর্শা দিয়ে বিদ্ধ করতে লাগলো।

আমি তাদেরকে ছেড়ে দিয়ে তেহুতির পাশে এসে উটের পিঠ থেকে নামলাম। তাকে বুকে জড়িয়ে চেপে ধরে রাখলাম যতক্ষণ না সে শান্ত হয়, তারপর হাত থেকে তলোয়ারটা নিলাম।

তাকে বললাম, তুমি তাকে দশবার মেরে ফেলেছ। এখন জারাসের আমাদের সাহায্য দরকার। আমি জানি তার নামটি তার রাগ শান্ত করবে আর মনকে স্থির করতে সাহায্য করবে।

.

আমি জারাসকে নড়াচড়া করতে চাচ্ছিলাম না, কেননা তার যখমের যে অবস্থা, এতে অবস্থার আরও অবনতি হতে পারে। লোকজনের সাহায্যে সে যেখানে শুয়েছিল তার উপরে একটা আচ্ছাদন তৈরি করলাম।

তারপর রক্ষীবাহিনীর সার্জেন্টকে বললাম মৃত আরবদের শরীর থেকে পরিষ্কার আর খুব কম রক্তমাখা আলখাল্লাগুলো খুলে নিয়ে আসতে। এগুলো দিয়ে তেহুতির জন্য সূর্যের প্রচণ্ড তাপ আর আমার লোকদের নজর থেকে রক্ষা পাবার জন্য একটা মোটামুটি আলখাল্লার মতো তৈরি করে দিলাম।

তারপর মৃত ঘোড়া আর শেয়ালসহ আরবদের দেহগুলো টেনে নিয়ে একলিগ দূরে মরুভূমিতে ফেলে আসতে বললাম। প্রচণ্ড তাপে এক ঘন্টার মধ্যেই এগুলোতে পচন ধরবে।

আমি আমার জিনিসপত্রের সাথে চিকিৎসার সাজসরঞ্জাম, সামান্য পরিমাণ ভেষজ আর ওষুধ নিয়ে এসেছিলাম। এগুলো সবসময় আমি যেখানে যাই সেখানে আমার সাথেই থাকে, যেন এগুলো আমার দেহের একটি অংশ। তবে জারাসের ক্ষতটি পরীক্ষা শুরু করার আগেই আমি বুঝতে পারলাম, যে কঠিন কাজ আমার হাতে রয়েছে তার জন্য ওষুধের এই পরিমাণ যথেষ্ট নয়।

এখানে কেবল তেহুতির উপর আমার আস্থা আছে। আহত ঘোড়া আর অন্যান্য গৃহপালিত পশুর চিকিৎসার সময় সে আমাকে সাহায্য করেছিল। তারপরও তাকে আমি নিতান্ত শিশুই মনে করি। জারাসের মৃত্যু হবে আর আমি চাই না যে সে তা তাকিয়ে দেখুক। তবে আমার হাতে কোনো উপায় ছিল না।

লাল শেপ্পেন (আফিম) ফুলের এক ঢোক রস বানাতে বানাতে আমি তাকে বললাম, রাজকুমারী, আমাকে তোমার সাহায্য করতে হবে। শক্তিশালী এই রসটি একটি ষাঁড়কেও অচেতন করে ফেলতে পারে।

অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে সে উত্তর দিল, পিরবো। শুধু বল কী করতে হবে।

একটা তামার পেয়ালায় মাদক তরলটি তার হাতে তুলে দিয়ে বললাম, প্রথমে এই রস পুরোটা তাকে খাওয়াতে হবে। সে জারাসের মাথা তার কোলে তুলে নিল। পাত্রটি তার ঠোঁটের কাছে ধরে তার নাক চেপে ধরলো যাতে সে পুরো তরলটা গিলে ফেলে। এদিকে আমি অস্ত্রোপচারের যন্ত্রপাতি সাজালাম।

জারাসের দুই চোখ বুজে এলো আর শক্তিশালী মাদকের প্রভাবে সে প্রায় অসাড় হয়ে পড়তেই আমরা তার গায়ের বর্ম আর কোমর থেকে হাঁটু পর্যন্ত পরনের আঁটোসাট চোগাটা খুলে ফেললাম। মাটিতে ঘোড়ার জিনের কম্বলের একটা বিছানা পেতে তাকে সম্পূর্ণ নগ্ন করে উপুড় করে শুইয়ে দিলাম। আমি আগেও জারাসকে নগ্নদেহে দেখেছি, তবে সবসময়ের মতো এবারও তার চমৎকার দেহসৌষ্ঠব দেখে মুগ্ধ হলাম। তবে মনে দুঃখ পেলাম ভেবে যে, এতো শিগগরই প্রকৃতির এই অপূর্ব সুন্দর কীর্তিটিকে আবার মাটিতেই শুইয়ে দিতে হবে।

আমি তার দুই পা ফাঁক করলাম, যাতে শেয়ালের তলোয়ারের ডগাটি যেখান দিয়ে ঢুকেছে সে পর্যন্ত পৌঁছতে পারি। তলোয়ারের ডগাটি তখনও ক্ষতস্থানের মুখে রয়েছে। আমি জানি শল্যচিকিৎসক দাবীদার অনেকেই কোনো কিছু না ভেবে এই অবস্থায় তলোয়ারের ডগাটি টেনে খুলে ফেলবে। এটা করার সাথে সাথে ওরা রোগীর ভাগ্য নির্ধারণ করে ফেলবে।

তলোয়ারের ডগাটির ঢোকার মুখে এর কোণ আর গভীরতা পরীক্ষা করতে করতে আমি দেখলাম তলোয়ারটি তার পুরুষাঙ্গকে সম্পূর্ণভাবে এড়িয়ে গেছে। এই বিষয়টি নিয়ে আমার মিশ্র অনুভূতি হল।

জারাস আর তেহুতির জন্য মনে আনন্দ হল। তবে আমার নিজের সম্পর্কে আমি পুরোপুরি নিশ্চিত নই। ভালোই হতো যদি জারাসের এই অঙ্গটি তলোয়ারের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হতো, তাহলে অনেক বিষয়ে আমার দুশ্চিন্তা দূর হয়ে যেত। তবে এই অশুভ চিন্তাকে মন থেকে দূর করে দিয়ে ক্ষতস্থানটি থেকে তলোয়ারের ডগাটি বের করার দিকে মনোযোগ দিলাম।

এটি তার বাম নিতম্বের পাশ দিয়ে চলে গেছে। মেরুদণ্ডের নীচের অংশে শ্রোণীর ভারী অস্থিকাঠামোতে আঘাত করলে হয়তো ডগাটি বেশি দূর যেতে পারতো না।

তবে তা হয়নি। একটা পথ করে নিয়ে ডগাটি জারাসের নাড়িভূঁড়ি পাকস্থলীর যে অস্থি-গামলায় থাকে সেখানে ঢুকেছে। আমার শত শত মানব শবদেহ ব্যবচ্ছেদ করে পরীক্ষা করার সুযোগ হয়েছিল। আমি জানি আমরা যে খাবার গ্রহণ করি তা কীভাবে, এই মোটা বা মাংসল নলের ভেতর দিয়ে ঢুকে নিচের দিকে যায়। তারপর নিতম্বের মাঝে স্থাপন করা ভিত্তিগত বহির্মুখ দিয়ে বর্জ্য ত্যাগ করে খালি হয়।

এবার আমি আতঙ্কিত হলাম। শেয়ালের তলোয়ারটি যদি জারাসের নাড়িভূঁড়ির এই নলগুলির কোনো একটি ছিদ্র করে থাকে, তাহলে বর্জ্যগুলো তার পাকস্থলিতে ঢুকে পড়তে পারে। এই বর্জ্য যাকে আমরা সাধারণত পশুর মল বলে থাকি, এতে বিশেষ ধরনের দুর্গন্ধময় দূষিত রস বা ধাতু থাকে। এই রসটি মারাত্মক বিষাক্ত, দেহে ছড়িয়ে পড়লে জখম স্থানের মাংসে পচন ধরে গ্যাংগ্রিন হয়। পরিণতিতে মৃত্যু অবধারিত।

তলোয়ারটি এক টানে বের করতে হবে। আমি ছয়জন শক্তিশালী লোককে ডেকে আনলাম, কেননা তার যে যন্ত্রণা হবে তাতে আমি যে শক্তিশালী আফিম খাইয়েছিলাম তাও অকার্যকর হয়ে পড়বে।

তেহুতি তার মাথা কোলে নিয়ে বসলো। সে জারাসের চুলে হাত বুলাতে বুলাতে একজন মা যেমন তার শিশুকে গুণগুণ করে গান শোনায় সেরকম করতে লাগলো। অন্যরা বিভিন্ন জায়গায় অবস্থান নিয়ে তার হাত পা মাটিতে চেপে ধরলো। আমি তার দুই পায়ের মাঝে হাঁটুগেড়ে বসে শক্ত করে দুই হাতে তলোয়ারের হাতলটা ধরলাম।

আমি নির্দেশ দিলাম, ধরে থাক! তারপর একটু পেছনে হেলে শরীরের সমস্ত ভার আর শক্তি প্রয়োগ করলাম। তলোয়ারের পাতটা যখমের মুখে একটু বাঁকা করে রাখলাম যাতে মাংসপেশিতে আর ভেতরে কোনোধরনের ক্ষতি না হয়।

জারাসের পুরো দেহ শক্ত হল। তার সমস্ত মাংসপেশি মার্বেলের মতো শক্ত হল আর প্রচণ্ড যন্ত্রণায় সে একটা আহত ষাঁড়ের মতো চেঁচিয়ে উঠলো। ছয়জন বলশালী মানুষও তাকে চেপে ধরে রাখতে পারছিল না। দীর্ঘ একটি মুহূর্ত কিছুই হল না। ব্রোঞ্জের তলোয়ারের পাতটি ভেতরের মাংসপেশিতে আটকে রয়েছে। তারপর হঠাৎ ঝটকা মেরে তলোয়ারটি বের হয়ে আসতেই আমি পেছন দিকে উল্টে পড়লাম।

কাঁপতে কাঁপতে জারাস শেষ আরেকবার গোঙানী দিয়ে জ্ঞান হারাল। আমি একটা ভেড়ার লোমের পট্টি বানিয়ে রেখেছিলাম। এবার পট্টিটা ক্ষতস্থানের উপর রেখে তেহুতিকে নির্দেশ দিলাম, সমস্ত শক্তি দিয়ে এটা এজায়গায় চেপে ধরে রাখ, যেন রক্ত বের না হয়। তারপর জারাসকে ধরে রাখা লোকদেরকে বললাম, এবার ছেড়ে দাও ওকে।

তারপর হাতে ধরা তলোয়ারটার দিকে তাকিয়ে পরিমাপ করলাম ডগাটা কতটুকু ভেতরে ঢুকেছিল।

পরিমাপটি আন্দাজ করার পর বললাম, দেড় হাত পর্যন্ত ভেতরে ঢুকেছিল। বেশ গভীরই মনে হচ্ছে।

ক্ষতস্থানে তেহুতি যে পট্টিটা ধরে রেখেছিল সেটা তুলে নিচু হয়ে জখমটা পরীক্ষা করলাম।

বেশ মোটা হয়ে কেটেছে। পট্টি সরাতেই রক্তের চিকন ধারা গড়িয়ে পড়লো। দেখে মনে হচ্ছে পরিষ্কার আর স্বাস্থ্যকর রক্ত। একটু কাছে মুখ নিয়ে শুকলাম। কোনো পুঁজের গন্ধ নেই।

এবার একটু ক্ষীণ আশার আলো অনুভব করলাম। হয়তো তলোয়ারের ধারাল ফলাটি কোনো নাড়িভূড়ি কাটে নি।

তেহুতি জিজ্ঞেস করলো, কী দেখছো?

দেখছি কতটুকু আশা আছে।

ভেড়ার লোমের পট্টিটা জখমের উপর রেখে একটা শক্ত বাঁধন দিলাম আর বদ রস প্রতিরোধ করতে সামান্য কয়েকফোঁটা মদ ছড়িয়ে দিলাম। এরপর জারাসের পেছন দিকে গিয়ে দুই নিতম্বের উপর হাত রাখলাম। তারপর শরীর শক্ত করে নিতম্ব দুদিকে টেনে ফাঁক করলাম। একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। মলদ্বার পরিষ্কার আর এঁটে রয়েছে।

আরেকটি পরীক্ষা করতে হবে। ওর পেছনে হাত রেখে নিচের দিকে জোরে চাপ দিলাম। অন্ত্র থেকে ফুত ফুত শব্দ করে বায়ু বের হল, তারপর মলদ্বার থেকে ফিনকি দিয়ে তরল বিষ্ঠা আর তাজা রক্ত বের হল। দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়তেই আমি আর তেহুতি দুজনেরই মুখ কুঁচকে উঠলো।

এবার আমি নিশ্চিত হলাম তলোয়ারটি আসলেই অন্ত্রে আঘাত করেছে। এতে বেশ হতাশা অনুভব করলাম। জারাসের আর কোনো আশা নেই। পৃথিবীর কোনো শল্যচিকিৎসক, এমনকি আমিও তাকে বাঁচাতে পারবো না। সে এখন দেবতা শেঠের হয়ে গেছে।

তেহুতির দিকে না তাকালেও অনুভব করছিলাম, সে ঠিকই আমার দিকে তাকিয়ে রয়েছে।

ফিসফিস করে সে বললো, তায়তা দয়া কর। তুমি কি তার প্রাণ বাঁচাতে পারো না? আমার জন্য কি জারাসকে বাঁচাতে পারো না? একটা উত্তর তাকে আমার দিতে হবে। এভাবে তাকে আর যন্ত্রণা দেওয়া যায় না।

মাথা তুলে ওর দিকে তাকালাম। তার চেহারায় এমন দুঃখ বেদনা কখনও দেখিনি।

মনে আর ঠোঁটের ডগায় না বলার জন্য প্রস্তুতি নিলাম, এমনকি মাথাও নাড়লাম। তবে না শব্দটি আর উচ্চারণ করা হল না। এই দুই তরুণ-তরুণীকে পরিত্যাগ করতে পারলাম না।

হ্যাঁ! তোমার জন্য আমি তাকে বাঁচাতে পারবো তেহুতি। জানি একথা বলাটা অত্যন্ত নিষ্ঠুরতা। মিথ্যা আশ্বাসের চেয়ে চূড়ান্ত অবস্থা অবশ্যই ভালো। তবে আমি তার দুঃখ সহ্য করতে পারছিলাম না।

তাই মিথ্যা বলার জন্য নীরবে ভালো দেবতার কাছে ক্ষমা চাইলাম। তারপর জারাসের আত্মার জন্য শেঠের সাথে লড়াই শুরু করলাম।

.

এটুকু আমি নিশ্চিত জানতাম যে, আমাকে খুব দ্রুত কাজ করতে হবে। কোনো মানবদেহই দীর্ঘক্ষণ নিদারুণ যন্ত্রণা সহ্য করে টিকে থাকতে পারে। কীভাবে কি করতে হবে তার কোনো নির্দেশনামা আমার কাছে নেই। আমি এখন যা করতে যাচ্ছি পৃথিবীর আর কোনো শল্যচিকিৎসক তা কখনও করতে সাহস করেনি।

আর যে এক পাত্র লাল শ্যাপ্পেন আছে তা দিয়ে জারাসকে বড়জোর এক ঘন্টা অজ্ঞান রাখা যাবে। এর পুরোটাই এখন লাগবে।

তলপেট কেটে দেখতে হবে জারাসের নাড়িভূঁড়ির কোনো জায়গায় কেটেছে। তারপর তলোয়ার কাটা অংশটিতে সেলাই করতে হবে। আর অন্ত্র থেকে পেটে যে বদ রসটি ঢুকেছে তা ধুয়ে পরিষ্কার করতে হবে।

সৌভাগ্যবশত ময়াগুহা থেকে বের হবার সময় অন্য সবার মতো জারাসও কম খাবার খেয়ে বের হয়েছিল। খাবার কম থাকায় সবার খাবারের পরিমান কমিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছিলাম। তার অন্ত্রে খুব বেশি বর্জ্য থাকার কথা নয়। আমার কাছে উইলো গাছের ছাল আর সেডার গাছের নির্যাসের মিশ্রণ ছিল, তবে বিষ ধুয়ে ফেলার মতো যথেষ্ট পরিমাণে ছিল না। তবে সবচেয়ে ফলপ্রসু ছিল চোলাই করা মদের পাতন। কেবল ছোট একটি চামড়ার মশক ভর্তি চোলাইকরা মদ ছিল। মূল্যবান এই তরল একটি ছোট বাটিতে ঢেলে আমি আর তেহুতি হাত ধুয়ে নিলাম।

আমি অনেক আগে আবিষ্কার করেছিলাম তাপে জীবদেহ নিঃসৃত রস ধ্বংস না হলেও পরিমাণে কমে যায়। আমার নির্দেশে দুজন লোক বড় একটি পাত্র আগুনে চড়াল। পানি যখন টগবগ করে ফুটতে শুরু করলো তখন আমি আমার ব্রোঞ্জের শল্য কাঁচি, সুচ আর যন্ত্রপাতি আর ক্ষতস্থান সেলাইয়ের সুতা ফুটন্ত পানিতে ডুবালাম।

বড় আরেক মাত্রা লাল শ্যাপ্পেন ফুলের রস জারাসের গলা দিয়ে জোর করে ঢুকালাম। আর এদিকে তেহুতি চোলাই মদ দিয়ে তার পেট স্পঞ্জ করতে শুরু করলো।

তারপর রক্ষীরা আবার জারাসকে শক্ত করে মাটিতে শুইয়ে ধরলো। তার দাঁতের ফাঁকে দুই স্তর চামড়ার ফালি রাখলাম, যাতে প্রচণ্ড বেদনা উঠলে তার দাঁত কপাটি লেগে দাঁত ভেঙে না যায়। সবকিছুই প্রায় প্রস্তুত হয়েছে, আর দেরি করার কোনো কারণ নেই।

প্রথমে নাভির ঠিক নিচে থেকে শুরু করে তলপেটের নিচের হাড় পর্যন্ত লম্বা করে কাটলাম। চামড়ার ফালির মধ্য দিয়ে জারাস গোঙাতে শুরু করলো আর মাথা এপাশওপাশ করতে লাগলো।

তেহুতিকে দেখালাম কীভাবে লম্বা কাচির দুই প্রান্তে আঙ্গুল ঢুকিয়ে ক্ষতস্থানের মুখটা টেনে খুলে রাখতে হবে। এবার আমি কব্জিসহ দুই হাত তার পেটের ভেতরে ঢুকালাম। তলোয়ারের ফলাটি কোন পথ দিয়ে ঢুকেছিল, তার একটা ছবি আমি মনে মনে এঁকেছিলাম। এখন সেই পথে হাত চালিয়ে কাজ শুরু করলাম।

প্রায় সাথে সাথেই অন্ত্রের পিচ্ছিল দড়ির মতো অংশে আমার কড়ে আঙুলের সমান একটি ছিদ্র খুঁজে পেলাম। ছিদ্রটা দিয়ে তীব্র কটু গন্ধ ছড়ানো পরিপাক করা খাদ্যকণা বের হয়ে আসছিল।

বাঁকা ব্রোঞ্জের উঁচ আর শল্যসুতা দিয়ে কয়েকটা সেলাই দিয়ে কাটা অংশটা বন্ধ করলাম। আর কোনো ছিদ্র রয়ে গেল কি না তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য রাবারের সাপের মতো অন্ত্রটা দুই হাতের মাঝে ধরে চিপলাম। আমার সেলাই পানি নিরোধক হলেও চাপের ফলে অন্ত্রের আরও গভীরে তিনটি কাটা জায়গা থেকে বাদামি রংয়ের ঘোলা ময়লা চুঁইয়ে বের হতে লাগলো।

এই ছোট কাটা জায়গাগুলোতেও দ্রুত সেলাই করে ছিদ্রগুলো বন্ধ করলাম। আমি দেখতে পেলাম এই কঠিন শল্য চিকিৎসার চাপে জারাস ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে আসছে।

যখন আমি সন্তুষ্ট হলাম যে, তলোয়ারের আর কোনো জখম নেই তখন আমার আর তেহুতির উভয়েরই বিষ্ঠার দুর্গন্ধ সয়ে এসেছে। তবে এতে সচেতন হলাম যে, কাটা পেট আবার সেলাই করে বন্ধ করার আগে তার দেহ থেকে সমস্ত দূষিত রস ধুয়ে পরিষ্কার করতে হবে। এরকম দুর্গন্ধময় রস নিশ্চয় খারাপই হবে।

তেহুতি তখনও তার পেট ফাঁক করে ধরে থাকা অবস্থায় আমি মুখভর্তি চোলাই মদ নিয়ে তার অন্ত্রের গর্ত আর কুণ্ডলীগুলোর মধ্যে কুলি করে ফেললাম। তারপর তাকে একপাশে কাত করে তরলটি পেট থেকে বের করে দিলাম।

তারপর পানি ফুটিয়ে শরীরের তাপমাত্রার সমমাত্রায় ঠাণ্ডা করার পর সেই পানি দিয়ে আমরা তার নাড়িভূড়ি ধুয়ে পানিটা আবার পেট থেকে বের করে দিলাম।

সবশেষে আমরা আমাদের প্রস্রাব দিয়ে তার পেটের ভেতরটা ধুয়ে দিলাম। দেহনিঃসৃত রসের জন্য এটি সবচেয়ে কার্যকর একটি ঔষধ। তবে প্রস্রাবটি টাটকা হতে হবে এবং অন্য কোনো তরল অথবা শরীরের অন্য কোনো বস্তুর মিশ্রণ দিয়ে দূষিত হওয়া চলবে না। সবচেয়ে ভালো হয়, যদি এটি একটি সুস্থ মুত্রথলি থেকে আসে আর দাতার দেহের বাইরের যৌনাঙ্গ: অর্থাৎ পুরুষের লিঙ্গ এবং লিঙ্গের অগ্রভাগের আবরক তৃক কিংবা নারীর ওষ্ঠ্যের সাথে স্পর্শ না হয়।

আমার জন্য তেমন সমস্যা হল না। তবে তেহুতি প্রথমে একটা পশমের পট্টি চোলাই করা মদে ভিজিয়ে সেটা দিয়ে তার গোপনাঙ্গ ধুয়ে নিল। তারপর আমি অন্যপাশে সরে দাঁড়ালে সে জারাসের উপর বসে তার ভোলা পেটের ভেতরে প্রস্রাব করলো। তারপর তৃতীয়বারের মতো আবার জারাসের অচেতন দেহটি এক পাশে কাত করে শেষবারের মতো তার পেট থেকে তরলটি বের করে দিলাম।

এবার পেট সেলাই করে বন্ধ করলাম, প্রতিটা সেলাই করার সময় তার জখম শুকাবার জন্য প্রার্থনা করলাম।

হে অশুভ বিষয়ের দেবতা শেঠ, আমি তোমার নিষ্ঠুর রক্ত লাল মুখ বন্ধ করে দিলাম! এ স্থান থেকে চলে যাও। আমি আদেশ দিচ্ছি যাও!

কবরের দেবতা শেয়ালমাথাওয়ালা আনুবিস, আমার কাছ থেকে সরে যাও। একে বাঁচতে দাও।

হে দয়ালু হৃদয় হাথোর, এর জন্য কাঁদো। এর প্রতি দয়া দেখাও আর তার যন্ত্রণার উপশম কর। একে বাঁচতে দাও!

সবশেষে আমার লিনেনের আলখাল্লা ছিঁড়ে সেই টুকরা দিয়ে তার পেট বাঁধার পর তাকে বহন করার জন্য একটা পালকির মতো বানিয়ে তার উপর তাকে শোয়াতে শোয়াতে অন্ধকার হয়ে এলো। তেহুতি আর আমি তার দুই পাশে বসে থাকলাম, তাকে আরাম দিতে কিংবা যদি কোনো প্রয়োজন হয়।

জ্বরের প্রকোপে জারাস যখন প্রলাপ বকতে লাগলো আর তার শয্যার চতুর্দিকে কল্পিত আর আসল দানবের সাথে লড়াই করতে শুরু করলো, তখন তেহুতি তার পাশে শুয়ে তাকে দুই হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে থাকলো। সে তাকে শক্ত করে ধরে ঘুম পাড়ানি গান শুনাতে লাগলো।

আমি গানটি চিনতে পারলাম। এটি সেই ঘুম পাড়ানি গান যা গেয়ে রানি লসট্রিস ছোটবেলায় তেহুতিকে ঘুম পাড়াতেন। ধীরে ধীরে জারাস শান্ত হল।

আমাদের আশ্রয় শিবির ঘিরে জারাসের লোকেরা আগুন জ্বেলে তার চতুর্দিকে গোল হয়ে বসলো। আমার মনে হল ওরাও আমাদের মত তার জন্য প্রার্থনা করছে। সারাত রাত আমি ওদের গুণগুণ করা শুনলাম।

ভোরের দিকে আমি ঘুমিয়ে পড়লাম।

.

ছোট্ট গরম একটি হাত আমার কাঁধ ধরে টানাটানি করতেই ঘুম ভেঙে গেল। আমাদের অস্থায়ী আশ্রয়ের ছাদের ফাঁক দিয়ে দেখলাম ভোর হতে আর বেশি দেরি নেই। মাত্র কিছুক্ষণ ঘুমিয়েছি, তারপরও অপরাধবোধে মন ছেয়ে গেল; মনে হল যেন আমি একটা খুন করেছি।

বহুকষ্টে কান্না থামিয়ে তেহুতি আমাকে বললো, তায়তা ওঠো। আমাকে সাহায্য কর।

কী হয়েছে রাজকুমারী?

ওর সারা শরীর আগুনের মতো গরম। মনে হচ্ছে ভেতরটা পুড়ে যাচ্ছে। এমন গরম যে গায়ে হাত দেওয়া যাচ্ছে না।

চুঙির মতো একদিকে সরু হয়ে যাওয়া একটা সেডার কাঠের টুকরা আমার কাছে ছিল। এর ডগাটা নিভু নিভু আগুনের কাঠকয়লার উপর ঠেসে ধরে ফুঁ দিলাম। আগুন ধরতেই বিছানার মাথার কাছে একটা তেলের প্রদীপ জ্বেলে জারাসের উপর কুঁকলাম।

সারা মুখ ঘামে চকচক হয়ে আছে। চোখ খোলা তবে জ্বরের ঘোরে আচ্ছন্ন। হয়ে কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। আমরা তাকে ধরে স্থির করার চেষ্টা করতেই সে এক ঝটকা মেরে আমাদেরকে সরিয়ে দিল। মাথা এপাশ ওপাশ করতে করতে চিৎকার করে আমাদেরকে অভিশাপ দিতে লাগলো।

আমি এটা আশা করেছিলাম। আমি ভালোভাবেই জানতাম খারাপ রসে আক্রান্ত হওয়ার কারণে জ্বর খুব বেড়ে যেতে পারে। এরকম আরও কয়েকটি ঘটনা আমি আগে দেখেছিলাম। সব ক্ষেত্রেই রোগী শেষ পর্যন্ত মারা গিয়েছিল। তবে এর জন্য প্রাথমিক প্রস্তুতি আমি আগে থেকেই নিয়ে রেখেছিলাম।

আবার ছয়জন বলিষ্ঠ রক্ষীকে ডেকে সবাই মিলে জারাসকে ঘোড়ার কম্বলগুলো দিয়ে পেচিয়ে জোরে চেপে ধরলাম যেন সে মাথা ছাড়া আর কিছু নড়াচড়া করতে না পারে। তারপর বালতি দিয়ে পানি ঢেলে কম্বলগুলো ভেজালাম আর হাওয়া দিতে থাকলাম যাতে পানি শুকিয়ে যায়। এতে জারাসের গায়ের তাপ কমতে কমতে এক পর্যায়ে সে ঠাণ্ডায় কাঁপতে শুরু করলো।

এভাবে সারা সকাল করে চললাম, তবে দুপুরের দিকে তার শক্তি কমে এল। এর আগে আমার এ-ধরনের রোগীদের যা হয়েছিল সেসব লক্ষণ তার মাঝে ফুটে উঠলো। আমি যে চিকিৎসা পদ্ধতি তার উপর জোর করে চাপিয়ে দিচ্ছিলাম তা সহ্য করার ক্ষমতা সে হারিয়ে ফেলেছে।

মুখ দিয়ে কোনো শব্দ না বললেও সে দাঁতে দাঁত লেগে কিড়মিড় করছিল। গায়ের চামড়া বিবর্ণ নীল হয়ে যাচ্ছিল।

গা থেকে কম্বল সরিয়ে দেবার পর তেহুতি আবার তাকে জড়িয়ে ধরলো। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বললো, তুমি বলেছিলে তাকে বাঁচিয়ে তুলবে তায়তা। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে তা হয়তো পারবে না।

তার হতাশার গভীরতা আমাকে ছুরির মতো বিদ্ধ করলো।

হাইকসোদের মিসর আক্রমণের মুখে দেশ ছেড়ে পালাবার সময় আমরা আফ্রিকার দূরতম প্রদেশের মধ্য দিয়ে পাড়ি দিয়েছিলাম। অনেক বছর ধরে আমরা গহীন জঙ্গলে ঘুরে বেড়িয়েছি। তারপর আবার শক্তি সঞ্চয় করে নিজভূমিতে অধিকার রক্ষায় ফিরে এসেছিলাম। সে সময়ে আমি কালো উপজাতিদের সাথে মিশে ওদেরকে জানতে আর শিখতে পেরেছিলাম। তাদের শক্তি আর বিশেষ দক্ষতা দেখে আমার ঈর্ষা হত। বিশেষত আমি শিলুক উপজাতির প্রতি আকৃষ্ট হয়ে তাদের অনেকের সাথে বন্ধুত্বমূলক সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলাম।

এদের মধ্যে উমতাগ্নাস নামে প্রাচীন এক ওঝা ছিল। আমাদের দলের লোকেরা তাকে একজন আদিম ডাকিনীবিদ্যা চর্চাকারী ওঝা মনে করতো যে প্রেত সাধনা করতো। তাকে ওরা বন্য পশুর চেয়ে এক ধাপ উঁচু মনে করতো। এ-ধরনের লোক দূর দক্ষিণাঞ্চলে অনেক রয়েছে। তবে আমি বুঝতে পেরেছিলাম সে ছিল একজন জ্ঞানীলোক যার অনেক বিষয়ের জ্ঞান রয়েছে, যা উত্তর থেকে আসা আমাদের নজর এড়িয়ে গেছে। সে আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছিল।

বয়সের ভারে ন্যুজ হয়ে যখন সে মৃত্যুর কাছাকাছি হয়েছিল তখন সে। আমার হাতে একটা চামড়ার থলে গুঁজে দিয়েছিল। এতে রোদে শুকানো একধরনের কালো ব্যাঙের ছাতা ছিল যা, আমি এর আগে কখনও দেখিনি। এটি গাঢ় মোটা সবুজ ছত্রাক জাতীয় বস্তু দিয়ে মোড়ান ছিল। সে আমাকে সতর্ক করে বলেছিল উপরের আবরণটি যেন না সরানো হয়, কেননা এটি এই ওষুধের রোগ নিরাময় ক্ষমতার একটি অতি প্রয়োজনীয় উপাদান। তারপর সে আমাকে শেখালো এই ছত্রাক দিয়ে কীভাবে এক ফোঁটা তরল তৈরি করা যায়। আরও সাবধান করে জানাল যতটা না রোগ নিরাময় করা যায় তার চেয়ে বেশি এই তরলটি বরং মানুষের প্রাণহানি করতে পারে। এটি তখনই ব্যবহার করা যাবে যখন রোগী আর শূন্যতার মাঝে আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।

মিসরে ফেরার পর এত বছরে আমি কেবল সাতবার এই ঔষধটি ব্যবহার করেছিলাম। প্রতিটি ক্ষেত্রে আমার রোগী মরণোন্মুখ ছিল। আরেকটু হলেই শেষ হয়ে যেত। ঠোঁটের ফাঁক গলে এক ফোঁটা তরল যাওয়ার প্রায় সাথে সাথে পাঁচজন মারা যায়। ষষ্ঠজন দশ দিন মরণাপন্ন অবস্থায় থাকার পর ধীরে ধীরে অবস্থার উন্নতি হতে থাকে, তারপর হঠাৎ একসময় সে মারা যায়।

ফুসফুঁসে তীর বেঁধা সপ্তম রোগীটি কেবল বেঁচে উঠে। সে আবার সুস্থ এবং শক্তিশালী হয়ে উঠে। এখন থিবসে রয়েছে। প্রতিবছর তার আরোগ্য হওয়ার এই অলৌকিক দিনটিতে সে তার সমস্ত নাতিনাতনিসহ আমার সাথে দেখা করতে আসে।

আমি জানি সাতজনের মধ্যে একজন রোগী ভালো হওয়ার পরিসংখ্যান গর্ব করার মতো বিষয় নয়। তবে আমি দেখতে পাচ্ছি জারাসের জীবনের আয়ু আর মাত্র এক ঘন্টা রয়েছে আর তেহুতি আমার দিকে ভর্ৎসনার দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে।

হরিণের চামড়ার থলেটিতে আর একমুঠো মাত্র ছত্রাক রয়েছে। একটা তামার পাত্রে পানি নিয়ে তাতে ছত্রাকটি ফুটাতে শুরু করলাম। নির্যাসটা একেবারে কালো আর থকথকে হওয়া পর্যন্ত ফুটালাম। তারপর ঠাণ্ডা হতে দিলাম। এর আগে জারাসের চোয়ালের ফাঁকে একটা কাঠের গেজ দিয়ে মুখটা খোলা রেখে তারপর চামচ দিয়ে নির্যাসটা তার মুখের ভেতরে ঢেলে দিলাম। এর আগে একবার এই মহৌষধের এক ফোঁটা আমি স্বাদ নিয়েছিলাম। এটি ছিল একটি পরীক্ষা তবে আর দ্বিতীয়বার এটা করার ইচ্ছা আমার নেই।

আরকটা মুখে দেওয়ার পর জারাসের প্রতিক্রিয়া আমার মতোই হল। সে এমন ছটফট করতে শুরু করলো যে, ছয়জন শক্তিশালী মানুষ আর তেহুতি মিলেও তাকে ধরে রাখতে পারছিল না। জোর করে যতটুকু গেলান হয়েছিল তার অর্ধেকের বেশি আরক সে বমি করে মুখ থেকে ফেলে দিল। ফেলে দেওয়া অংশটুকু কাচিয়ে নিয়ে আমি দ্বিতীয়বার তার মুখে ঢেলে দিলাম। তারপর চোয়ালের মধ্য থেকে কাঠের গোঁজটা বের করে তার মুখ বন্ধ করে ধরে রাখলাম যাতে দ্রবণটা গলা দিয়ে নিচে চলে যায়। তবে সে বেশ কয়েকবার ছটফট করে বমি করার চেষ্টা করলো।

তারপর তেহুতি আর আমি দুজনে তাকে কম্বল দিয়ে মুড়িয়ে দিয়ে অন্যদেরকে সরে যেতে বললাম। আমরা দুজনে তার দুই পাশে বসে তার মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম।

ভোরের দিকে তার অবস্থা প্রায় মৃতপ্রায় হল। কম্বল মুড়ি দেওয়া সত্ত্বেও তার তাপমাত্রা নেমে এল আর জালে আটকানো একটা কই মাছের মতো সে ছটফট করতে লাগলো। নিঃশ্বাসের শব্দ প্রায় শোনাই যাচ্ছে না। আমরা দুজনেই একজন একজন করে তার মুখের কাছে কান রেখে তার নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে চেষ্টা করছিলাম।

মাঝরাতের একটু পর যখন চাঁদ ডুবে গেল, তখন তেহুতি আমাকে বললো, তার শরীর একটা মরা মানুষের মতো ঠাণ্ডা হয়ে গেছে, তার শরীর গরম রাখতে হলে আমাকে তার সাথে শুতে হবে। সে তার পোশাকটা খুলে জারাসের পাশে কম্বলের ভেতরে ঢুকে পড়লো।

গত তিনদিন আমরা ঘুমাইনি, তবে এখনও ঘুমালাম না আর কোনো কথাও। বললাম না। বলার মতো আর কিছু নেই। সমস্ত আশা ছেড়ে দিয়েছি।

সমাধিক্ষেত্রের সময় এলো: রাতের সবচেয়ে অন্ধকার সময়। আমাদের মাথার উপর দুটো কম্বল জোড়া দিয়ে যে আচ্ছাদন তৈরি করা হয়েছিল তার মাঝে একটা ছিদ্র ছিল। উপরের দিকে তাকিয়ে আমি বিশাল লাল তারা দেখতে পেলাম–আমি জানি এটা শেঠের চোখ।

অশুভের দেবতা আমাদের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। আমার মনে ভয় এলো। আমি জানি জারাস লড়াইয়ে হেরে গেছে আর শেঠ তাকে নিতে আসছে।

তারপর একটি আজব এবং চমৎকার ঘটনা ঘটলো। হঠাৎ তারার আলোটা নিভে গেল। আমার বুক ধক করে উঠলো। ঠিক বুঝতে পারলাম না এটা কি, তবে বুঝলাম যে এটা শুভ কিছু। নিঃশব্দে উঠে দাঁড়ালাম। তেহুতিকে না জাগিয়ে কম্বলের আচ্ছাদনের নিচ থেকে বাইরে এসে উপরে রাতের আকাশের দিকে তাকালাম।

সমস্ত আকাশে অসংখ্য তারা জ্বল জ্বল করছে-কেবল ঠিক আমার মাথার উপরে যেখানে আমি দেবতা শেঠের লাল চোখটি দেখেছিলাম সেই স্থানটি ছাড়া। এখন সেই চোখটি অস্পষ্ট হয়ে এসেছে।

ছোট্ট কালো একটি মেঘ একে ঢেকে ফেলেছে। পুরো আকাশে এটিই একমাত্র মেঘ। আমার হাতের মুঠোর চেয়ে বড় হবে না, তবে এটিই এই ক্ষতিকর শেঠের চোখ অন্ধ করে দিয়েছে।

তারপর একটা গলার আওয়াজ শুনতে পেলাম। উপরের তারাভরা আকাশ থেকে নয়, শব্দটা আসছে নিচে কম্বলের আচ্ছাদনের ভেতর থেকে।

জারাস ফিস ফিস করছে, আমি কোথায়? আমার পেটে কেন এতো ব্যথা করছে?

তারপর আমার অত্যন্ত পরিচিত কণ্ঠস্বরটি সাথে সাথে উত্তর দিল, দাঁড়াতে চেষ্টা করো না বোকা জারাস। চুপ করে শুয়ে থাকো। তোমার খুব বড়ধরনের জখম হয়েছে।

জারাসের কণ্ঠস্বর সচকিত আর হতবাক শোনাল, রাজকুমারী তেহুতি! আপনি আমার বিছানায়। আর আপনার গায়ে কোনো পোশাক নেই। তায়তা এঅবস্থায় আমাদেরকে দেখতে পেলে দুজনকেই মেরে ফেলবে।

খুশিতে নাচতে নাচতে আমি আবার কম্বলের ছাউনির নিচে ঢুকে তার বিছানার পাশে হাঁটু গেড়ে বসে তাকে আস্বস্ত করে বললাম, এবার নয় জারাস। তবে এরপর হলে কিন্তু ছেড়ে দেবো না।

.

দিনের আলোয় জারাসকে আবার ভালোমত পরীক্ষা করলাম। তাপমাত্রা কমে যাওয়ায় তার শরীর আমার হাতের মতো ঠাণ্ডা হয়ে এসেছে। পেটের বিরাট ক্ষতের উপরে যে সেলাইটা আমি দিয়েছিলাম সেখান থেকে ফুলে ওঠা কমে এসেছে। গন্ধ শুঁকে দেখলাম, পরিষ্কার মনে হল।

জারাসের খুব পানি পিপাসা পেয়েছিল, তেহুতি ওর জন্য বড় একজগ পানি নিয়ে এলো। সে পুরোটা খেয়ে শেষ করে আরও পানি চাইলো। আমি স্বস্তিবোধ করলাম। এটা একটা নিশ্চিত লক্ষণ যে তার অবস্থা উন্নতি লাভের পথে রয়েছে। তবে সেই সাথে মনে পড়ে গেল পানির বোতলগুলো প্রায় খালি আর সবচেয়ে কাছে পানি রয়েছে কেবল গুহায়, যেখানে বেকাথা আর অন্যান্যদের ফেলে এসেছি।

জারাস প্রতিবাদ করা সত্ত্বেও আমরা তাকে হাঁটতে বা উটে চড়তে দিলাম না। ওর জন্য একটা ঠেলাগাড়ির মতো বিছানা তৈরি করলাম। দুটো লম্বা বর্শার মাঝে ঘোড়ার কম্বল দিয়ে এটা তৈরি করলাম। একটা উটের হাওদার দুইপাশে পেছন দিকে বর্শাদুটার ডগা আটকিয়ে ঝুলিয়ে দিলাম। জারাসকে এই ঠেলার বিছানায় শোয়ালাম।

তেহুতি সেই উটে চড়ে বসলো। সে পেছনদিকে মুখ করে বসলো, যাতে জারাসের প্রতি নজর রাখতে পারে। উঁচুনিচু কিংবা পাথুরে জায়গা এলেই সে উটের পিঠ থেকে লাফিয়ে নেমে জারাসের পাশে এসে তাকে ধরে রাখলো যাতে তার বেশি ঝাঁকুনি না লাগে।

সারাপথ সে জারাসকে ধমকে চললো তাকে সাবধান হওয়ার জন্য।

তৃতীয়দিন বিকেলে জারাস জোর করে বিছানা থেকে নেমে কিছুক্ষণ হাঁটার চেষ্টা করলো। দু-দুবার হোঁচট খাওয়ার পর একজন বুড়ো মানুষের মতো হাঁটতে লাগলো। ঠেলার গায়ে একহাত আর অন্য হাত তেহুতির কাঁধে রেখে সে চলার চেষ্টা করলো। তেহুতি নানারকম উৎসাহব্যঞ্জক কথা বলে তাকে চাঙ্গা করার চেষ্টা করলো। হাসি উঠলেই সে থেমে দুইহাতে পেট চেপে ধরলো, তবে সেজন্য হাসি থামাল না।

আবার বিশ্রামের জন্য থামতেই আমি আবার উদ্বিগ্ন হয়ে তার ক্ষত পরীক্ষা করে দেখলাম, না ঠিক আছে। শেষ একঢোক আফিমের যে আরকটা ছিল সেটা তাক খাইয়ে দিতেই সে একটা শিশুর মতো ঘুমাল।

পরদিন আরও শক্তিসঞ্চয় করে বেশ দ্রুত অনেকদুর হাঁটলো। আমি জানতাম তেতির সঙ্গ তাকে যথেষ্ট শক্তি যোগাচ্ছে, তাই আমি সামনে এগিয়ে দলের মাথায় গিয়ে হাঁটতে শুরু করলাম। ওদের কথা শুনতে না পেলেও বুঝতে পারছিলাম কি নিয়ে ওরা কথা বলছে।

ওরা জানতো না যে আমি খুব ভালোভাবে ঠোঁট নাড়া দেখে কথা বুঝতে পারি। কাজেই ওরা মনখুলে কথা বলছিল। মাঝে মাঝে তাদের রসিকতা এমন পর্যায়ে পৌচ্ছাছিল যা তার মতো একজন উচ্চবংশীয় মেয়ের জন্য মানানসই। ছিল না। তবে এ-মুহূর্তটা ওদেরকে উপভোগ করতে দিলাম, কেননা আর হয়তো এরকম সুযোগ নাও আসতে পারে।

জারাসের অবস্থার কারণে আমাদের ময়াগুহায় ফিরতে দেরি হচ্ছিল। পঞ্চম দিনেও আমরা সেখানে পৌঁছতে পারিনি। পানি আনার জন্য পাঁচটি উট আমি আগেই পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু সেগুলো এখনও ফিরে আসেনি অথচ এদিকে আমাদের পানিও প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। আমি সবার পানি আর খাবার কমিয়ে দিয়ে প্রতিদিন ছোট মগে তিন মগ পানি আর অর্ধেক রুটি বরাদ্দ করলাম। অবশ্য রাজকুমারীর জন্য নয়। সে যত ইচ্ছা খেতে পারবে। শুধুমাত্র তার জন্য আমি আধা টুকরা পনির আর সামান্য শুকনো লোনা গরুর মাংস বাঁচিয়ে রেখেছিলাম। কিন্তু সে এই সুবিধা প্রত্যাখ্যান করে সবার মতো সমানভাবে খেতে লাগলো।

চতুর্থদিন সন্ধ্যায় আমি লক্ষ্য করলাম তেহুতি সবার নজর এড়িয়ে একটুকরা শক্ত পনির আর কিছু গরুর শুকনো মাংস তার আলখাল্লার হাতা থেকে বের করে জারাসকে খেতে সাধলো।

তুমি অসুস্থ জারাস। তোমার শক্তি সঞ্চয়ের জন্য এগুলো দরকার।

সে প্রতিবাদ করে বললো, আমি একজন সাধারণ সৈনিক, রাজকুমারী। আপনি আমার প্রতি অশেষ দয়া দেখিয়েছেন। আমি সত্যি কৃতজ্ঞ আপনার দয়ার জন্য, তবে আমার মোটেই ক্ষিদে পায়নি।

সে খুব মৃদুকণ্ঠে বললো, বীর জারাস, তুমি আমার প্রাণ বাঁচাতে গিয়ে নিজের প্রাণ বিসর্জন দিয়ে ফেলতে যাচ্ছিলে। তুমি যা চাও আমি খুশি মনে তা দিতে চাই।

আমার মন নরম হয়ে এল। ওদের অঙ্কুরিত ভালোবাসা দেখতে খুব চমৎকার মনে হচ্ছিল। জানি কিছুকাল পরই কঠিন দায়িত্বের কারণে তা ভেঙে চুরমার করে ফেলা হবে।

.

শেষ পর্যন্ত আমরা ময়াগুহায় এসে পৌঁছলাম। আমাদের দলের যারা  আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল সবাই ছুটে এলো আমাদের স্বাগত জানাতে। উল্লাসে চিৎকার করতে করতে চারপাশ থেকে আমাদেরকে ঘিরে ধরলো, তারপর রাজকুমারী তেহুতির পায়ের কাছে মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে তাকে শ্রদ্ধা জানাল। তারপর ওরা তাকে কাঁধে উঠিয়ে তার বোন বেকাথা, সেনাপতি রেমরেম আর কর্নেল হুই যেখানে তার জন্য অপেক্ষা করছিল সেখানে নিয়ে চললো।

পর পর তিনরাত ভোজ চললো। তিনটি বাচ্চা উট জবাই করে সুস্বাদু মাংসগুলো পঞ্চাশটা অগ্নিকুণ্ড জ্বেলে তাতে ঝলসানো হল। প্রতি সন্ধ্যায় রাজকুমারী তেহুতি পনেরোটি বিয়ারের বড় পিপা খুলে সবার মধ্যে বিতরণ করতে নির্দেশ দিলেন। আমার কাছে এটা একটু বেশি বাড়াবাড়ি মনে হলেও, কিছু বললাম না। বরং আমি নিজেও দুএক মগ খেলাম। তবে ফারাওয়ের প্রাসাদের মাটির নিচের ভাণ্ডার থেকে আনা মদের ব্যাপারে আমি যত্নবান ছিলাম। কেননা আমি জানি এই অমৃত সুধা সাধারণ সৈন্যদেরকে দেওয়া মানে শুধু শুধু অপচয় করা।

রাজদরবারের যন্ত্রীরা আমাদের জন্য যন্ত্রসংগীত পরিবেশন করলো আর সবাই আগুনের চারপাশে নেচে গেয়ে কাটাল। রাজকুমারীরা আমাকে গান গাইতে অনুরোধ করতেই আমি জারাসকে ডেকে নিলাম। এর আগে যখনই সুযোগ পেতাম তখনই আমি তাকে গানের তালিম দিতাম। গান গাওয়ার তার যে স্বাভাবিক প্রতিভা ছিল, আমি তা ঘসে মেজে আরও পরিশীলিত করে তুলেছিলাম। যখন আমরা যুগলবন্দী গান গাইতে শুরু করলাম তখন শ্রোতারা বাকরুদ্ধ হয়ে শুনতে লাগলো। ওরা নিঃশ্বাস নিতেও ভুলে গিয়েছিল পাছে গানের একটা কলিও বাদ না যায়।

.

বেশ খুশিমনে আমি ঘুমাতে গেলাম। প্রায় সাথে সাথেই ঘুমিয়ে পড়লাম। সাধারণত আমার গভীর ঘুম হয় না। যেহেতু আমার মন সবসময় কর্মতৎপর আর সতর্ক থাকে তাই গভীর ঘুম হওয়ার মতো বিলাসিতা আমার পোষায় না।

একটু পরই ঘুম ভেঙে যেতেই বুঝতে পারলাম কেউ চুপিচুপি আমার তাঁবুতে ঢুকেছে। ঘুটঘুঁটে অন্ধকারের মধ্যে সে আমার বিছানার উপর ঝুঁকে রয়েছে। আমি তার নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম। দরজার পাহারা এড়িয়ে যে লোক রাজকীয় তাবুর মধ্যে ঢুকতে পেরেছে সে নিশ্চয়ই সাংঘাতিক লোক এবং তার উদ্দেশ্য ভালো হওয়ার কথা নয়।

কোনো ধরনের শব্দ কিংবা নড়াচড়া না করে আমার বিছানার মাথার কাছে সবসময় বিশেষ খাপে যে ড্যাগারটা ঝুলছে তার দিকে হাত বাড়ালাম।

তাঁবুর কাপড়ের মধ্য দিয়ে তারার আলো ভেতরে ঢুকেছে আর রাতের বেলা আমার দৃষ্টিশক্তি অত্যন্ত প্রখর হওয়ায় আমি আততায়ীর মাথার অবয়ব আন্দাজ করতে পারলাম। ডানহাতে ড্যাগারটা খাপ থেকে টেনে বের করার সাথে সাথে বাম হাত দিয়ে আততায়ীর গলা শক্ত করে পেঁচিয়ে ধরলাম।

আমি তাকে সাবধান করে বললাম, নড়াচড়ার চেষ্টা করলেই আমি তোমাকে মেরে ফেলবো। আগুন্তুক একটি ছোট মেয়ের মতো গুঙিয়ে উঠলো। সেই সাথে তার নিঃশ্বাসের মিষ্টি গন্ধ আর বুকের স্ফিতি অনুভব করলাম।

আমাকে মেরো না তায়তা। আমি বেকাথা! আমি এমনিতেই মরে যাচ্ছিলাম। তোমার কাছে এসেছি যাতে তুমি আমাকে বাঁচাও। রক্তপাত হয়ে আমি মরে যাচ্ছি। দয়া করে আমাকে মরতে দিও না।

সাথে সাথে তাকে ছেড়ে লাফ দিয়ে বিছানা থেকে নামলাম। একমিনিটের মধ্যে তেলের প্রদীপটা জ্বালালাম। বেকাথা ইতোমধ্যে আমার বিছানায় কুঁকড়ে শুয়ে তলপেট চেপে ধরে কাতরাতে শুরু করেছে। খুব ব্যথা করছে তায়তা। দয়াকরে ব্যথাটা ভালো করে দাও।

আমি তাকে দুইহাতের মধ্যে যত্ন করে ধরে জিজ্ঞেস করলাম, কোথায় রক্ত ঝরছে বল?

আমার দুপায়ের মাঝখানে রক্ত ঝরছে। এটা বন্ধ করে দাও। আমি মরতে চাই না।

এবার আমি মনেমনে গুঙিয়ে উঠলাম। তাহলে এবার আমাকে একজনের জায়গায় দুজন রজঃস্বলা চঞ্চলা স্বাস্থ্যবতী বালিকাকে সামলাতে হবে।

তার মানে খুব শিগগিরই খাবার টেবিলের ওপার থেকে ছুঁড়ে মারা রুটির টুকরা আর খেজুরের বদলে কর্নেল হুইকে অন্য কিছু নিয়ে উদ্বিগ্ন হতে হবে।

.

জারাসের জখম পুরোপুরি নিরাময় হওয়া পর্যন্ত আমি ময়াগুহায় অপেক্ষা করলাম। সে সুস্থ হলে দুই নদীর দেশ আর ব্যবিলনের পথে শেষ যাত্রাটি শুরু হবে। আমাদের সফরের এই অংশটুকু হবে সবচেয়ে দীর্ঘ আর কষ্টকর, তাই আমি তার শরীরের অবস্থা নিয়ে কোনোরকম ঝুঁকি নিতে চাইনি।

আমি অনেক সময় অবাক হতাম দেখে যে, একটি তরুণ শরীর কতটুকু কষ্ট সহ্য করতে পারে আর কত তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠতে পারে। মাত্র কয়েকদিন আগে শেয়াল তার নিতম্ব বরাবর তরবারি চালিয়ে দিয়েছিল, তারপর আমি তার পেট ফেঁড়ে নাড়িভূঁড়ি বের করে আবার সেলাই করে দিয়েছিলাম, অথচ তা সত্ত্বেও জারাস এমন ভাব দেখাচ্ছে যেন সে থিবসে ফসল কাটার উৎসবে ফারাও যে বাৎসরিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন করেন তাতে অংশগ্রহণের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে।

প্রথম প্রথম সে তেহুতিকে সাথে নিয়ে পাহাড়ের চারপাশ ঘিরে হাঁটতো। পঞ্চাশ পদক্ষেপ যাওয়ার পরই পেট চেপে ধরে থামতে বাধ্য হত। তেহুতি সাহায্য করার জন্য হাত বাড়ালেও সরিয়ে দিত। আমি বার বার সাবধান করা সত্ত্বেও সে প্রতিদিন হাঁটার মাত্রা বাড়িয়ে দিত। কিছুদিন পর পুরো বর্ম পরে কাঁধে বেলেপাথরের একটি বড় টুকরা নিয়ে হাঁটতে শুরু করলো।

প্রতিদিন আমি তাকে পুরোপুরি নগ্ন করে তার ক্ষতের অবস্থা পরীক্ষা করতাম। মনে হল ক্ষতটা শুকিয়ে একটা হালকা দাগের মতো হয়ে যাচ্ছে। শারীরিক যন্ত্রণা সহ্য করার অসম্ভব ক্ষমতা ছিল তার। জোর করে সে তার আহত পেশিগুলো সঞ্চালন করতো, এতে আরও দ্রুত সে আরোগ্যলাভ করে উঠতে লাগলো।

জারাসের প্রতি আমার এক ধরনের সহজাত স্নেহ জেগে উঠছিল আর সে আমার রোগ নিরাময় ক্ষমতার একটি প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তার শারীরিক দুর্বলতার কারণে আমি ভাবলাম ওরা আমার পরিকল্পনা বানচাল করার আগেই আমি এই সুযোগে তাকে রাজকুমারী তেহুতির কাছ থেকে আলাদা করে নিতে পারবো। অর্থাৎ মিসরের অস্তিত্বের স্বার্থে ক্রিটের সর্বাধিরাজ মিনোজ আর ফারাও ত্যামোসের মাঝে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য সযত্নে যে পরিকল্পনা করেছিলাম মাঝ পথে এসে তা যেন আবার ভেস্তে না যায়।

সুতরাং ময়াগুহায় পুনরায় ফেরার পঞ্চম দিনে আমি সেনাপতি রেমরেম আর কর্নেল হুইকে আমার নতুন নির্দেশ জানাবার জন্য আমার তাঁবুতে ডেকে পাঠালাম। জারাসকেও সভায় উপস্থিত হতে বললাম। স্বভাবতই আমার উদ্দেশ্য ছিল যে, সে আর হুই কেবল শ্রোতা হিসেবে থাকবে, কোনো গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় অংশ নিতে পারবে না।

আমরা চারজন সবেমাত্র আলোচনার টেবিলে বসে চমৎকার মদের গ্লাসে চুমুক দিতে যাবো, ঠিক তখনই আমি অনুভব করলাম কেউ আমার পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে। পেছন ফিরে দেখলাম রাজকুমারী তেহুতি তার বিশেষ সুগন্ধী গায়ে মেখে যেন ভাসতে ভাসতে তাবুর দরজা দিয়ে ঢুকেছে।

আমার কারণে আপনাদের আলোচনা থামাবেন না। আমাকে পুরোপুরি উপেক্ষা করে আপনাদের আলোচনা চালিয়ে যান। আমি একটি কথাও বলবো না। চুপ করে বসে থাকবো, আপনারা টেরও পাবেন না যে আমি এখানে রয়েছি।

সে একটি চমৎকার সোনালি রঙের মিহি রেশমী পোশাক পরে রয়েছে। এটা আমি অনেক দাম দিয়ে থিবসের বাজার থেকে তার জন্য কিনেছিলাম। তখন সে নিজেই আমাকে বলেছিল ক্রিটে পৌঁছার পর যখন তাকে সর্বাধিরাজ মিনোজের সামনে প্রথম হাজির করা হবে, তখন সে এই পোশাকটি পরবে। হয়তো আমাদের মধ্যেকার সেই চুক্তিটি সে ভুলে গেছে।

তার পায়ে রূপার স্যান্ডেল। গলায় ঝুলছে একটি হাথোরের হার আর অন্য আরেকটি উজ্জ্বল চকচকে, সম্ভবত নীলকান্ত মণি আর পান্নার হার। সুন্দর পরিপাটি চুল আর মুখে চমৎকার হাসি।

এরকম সুন্দর তাকে আমি আর কখনও দেখিনি।

সোনালি পোশাকের ঘের উড়িয়ে সে আমার পায়ের কাছে বসলো। দুই কনুই হাঁটুতে রেখে চিবুক দুই হাতের মাঝে রাখলো, যাতে আমি যে হীরার আংটিটা দিয়েছিলাম তার উপর আলো ঠিকরে পড়ে জ্বলজ্বল করে উঠলো। তারপর এক পাশে জারাসের দিকে এক ঝলক তাকিয়ে নিরীহ চেহারা নিয়ে মৃদু হাসলো।

বুঝি না মেয়েরা কীভাবে সবকিছু আগেভাগে জেনে ফেলে? এই সভা সম্পর্কে আমি তাকে জানাইনি; সত্যি বলতে কী সভার মাত্র এক ঘন্টা আগে অন্যদের ডেকেছিলাম। আর কী আলোচনা হবে তাও বিন্দু বিসর্গ কাউকেই জানাইনি। সে নিশ্চয়ই জানতো না এখানে কী হতে যাচ্ছে। তারপরও সে এখানে যুদ্ধের সাজে সেজে এসেছে আর তার চোখের দৃঢ় দৃষ্টি দেখে আমার তাই মনে হল।

তোমাদের যা আলোচনা চালিয়ে যাও তায়তা। আমি কথা দিচ্ছি মাঝখানে কিছু বলবো না।

আমি ইতস্তত করে বললাম, ধন্যবাদ, মহামান্য রাজকুমারী। ভাবলাম তার সাথে মুখোমুখি সংঘর্ষ এড়াবার কি কোনো উপায় আছে? অবশ্যই আছে। আমি ফারাওয়ের সিলমোহর বহন করছি। আমি একজন রাজার কন্ঠ হয়ে কথা বলছি। কেউ আমার বিরুদ্ধাচরণ করার সাহস করবে না? কাজেই সাহস সঞ্চয় করলাম।

ভদ্রমহোদয়গণ, আমি আমাদের পথপ্রদর্শক আল-নামজু আর রাজকীয় আস্তাবলের প্রধান রক্ষকের সাথে কথা বলেছি। ওরা সবাই আমার সাথে একমত হয়েছে যে আমাদের এই বিশাল দলটি আর বেশিদিন ময়াগুহায় থাকতে পারবে না। মনে রাখবেন আমাদের সমস্ত লোকজন আর রাজকুমারীরা ছাড়াও তিনশোর বেশি ঘোড়া আর উট রয়েছে। প্রতিদিন যে হারে আমরা এই পানি ব্যবহার করছি তাতে আর কিছু দিন পরই এই কুপের পানি সম্পূর্ণ শেষ হয়ে যাবে। বুঝতেই পারছেন এর কী ভয়াবহ পরিণতি হবে।

দাড়িতে হাত বুলাতে বুলাতে রেমরেম বললো, অবশ্যই! এ-বিষয়ে কোনো প্রশ্ন নেই, আমাদের এগোতেই হবে। তার দাড়ি রূপালি ধূসর রঙের হলেও আমি জানি তার আসল বয়স লুকোতে সে মেহেদি কলপ ব্যবহার করে উজ্জ্বল আদা রঙ করে রেখেছে। সে একজন মহান ব্যক্তি। একজন কুশলী আর সাহসী যোদ্ধা। একজন ভাইয়ের মতো তাকে আমি ভালোবাসি।

আমি তার দিকে তাকিয়ে সায় দিয়ে মাথা নেড়ে বলে চললাম, তবে ব্যাপারটা এতো সহজ নয় সেনাপতি রেমরেম। আল-নামজু আমাকে জানিয়েছে এর পরবর্তী মরুদ্যানের নাম হল জয়নাব অর্থাৎ দামী রত্ন। এটা আমাদের দুইশো লিগ সামনে রয়েছে। এই দূরত্ব যেতে দশদিন লাগবে। তার মানে যখন আমরা সেখানে পৌঁছাবো তখন আমাদের পশুগুলো পথশ্রমে ক্লান্ত আর তৃষ্ণায় কাতর হয়ে বিধ্বস্ত হয়ে পড়বে। ফলে তাদেরকে আবার যাত্রার উপযোগী করতে অন্তত দুই সপ্তাহ জয়নাব মরুদ্যানে বিশ্রাম দিতে হবে। কিন্তু জয়নাব একটি ছোট মরুদ্যান। ওতে যে পরিমাণ পানি আছে তা দিয়ে আমাদের মতো একটি বিশাল কাফেলার কয়েকদিনের বেশি চলবে না। কথাটা বলে এই কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থার একটি যৌক্তিক সমাধান বাতলাবার জন্য আমি রেমরেমের প্রতি তাকালাম। এতে হয়তো কিছুটা দোষ আমি অন্যের ঘাড়ে চপাতে পারবো, যখন রাজকুমারী তেহুতি আমার পরিকল্পনার সবদিক আঁচ করতে পেরে তুমুল হট্টগোল শুরু করবে। তবে সবাই নিশ্চুপ থাকায় বাধ্য হয়ে আমাকে সমস্ত দায়দায়িত্ব নিজ ঘাড়ে নিয়ে বিষয়টা খোলসা করতে হল।

এর একমাত্র সমাধান হল আমাদের দলকে দুই ভাগ করে অর্ধেক মানুষ আর পশুর দলটিকে আগেই জয়নাব পাঠিয়ে দেওয়া। অন্যদলটি এখানে আরও দুই সপ্তাহ থেকে আগের দলকে তৈরি হওয়ার সুযোগ দেবে। সফরের অবশিষ্ট অংশে আমাদেরকে এই বিভক্তি চালিয়ে যেতে হবে। দুই নদীর দেশে পৌঁছাবার পর আমরা আবার একত্রিত হব। এই উপায়ে আমরা কখনও পরিশ্রান্ত হয়ে পড়বো না আর পুরো দলকে একটি মাত্র মরুদ্যানে গিয়ে পানি নিয়েও কোনো সমস্যায় পড়তে হবে না।

আবার সবাই চুপ থেকে বিষয়টা নিয়ে ভাবলো। শেষ পর্যন্ত রেমরেম তার ভারী গলায় বললো, আপনার পরিকল্পনাটা বেশ ভালো তায়তা। আর আমার বিশ্বাস আপনি নিশ্চয়ই দলকে বিভক্ত করার পরিকল্পনাটাও ঠিক করে ফেলেছেন। আমি মৃদু হেসে মাথা নেড়ে সায় দিলাম।

সেনাপতি রেমরেম, আপনি অগ্রবর্তী দলের অধিনায়কত্ব নিয়ে যাবেন। এই দলে অর্ধেক মানুষ আর উটগুলো থাকবে। এছাড়া রাজকুমারী তেহুতি আর বেকাথাও আপনার সাথে যাবেন। ক্রেটান মেয়েটি-লক্সিয়াসও ওদের সাথে যাবে।

রেমরেম গদগদ কণ্ঠে বললো, আমি সত্যি আপনার প্রতি কৃতজ্ঞ মহান তায়তা। আমার প্রতি আস্থা স্থাপন করে আপনি আমাকে বাধিত করেছেন।

তারপর আমি একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে আবার বললাম, দুই সপ্তাহ পর ঘোড়াগুলো নিয়ে আমি আপনাদের অনুসরণ করবো। দ্বিতীয় দলে আমার সাথে ক্যাপ্টেন জারাস আর কর্নেল হুই থাকবেন। ঘোড়াগুলো সামলাতে আমার হুইকে প্রয়োজন হবে। তার দিকে তাকাতেই সে ঘাড় কাত করে সায় দিল। তার প্রিয় ঘোড়াগুলো থেকে আলাদা হওয়াটা তার সহ্য হবে না। তারপর জারাসের দিকে তাকিয়ে বললাম, আর এখন থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে আশা করি নিরাপদ সফরের জন্য তোমার ক্ষত ভালোভাবে সেরে উঠবে।

আর এটাই ছিল আমার পরিকল্পনার ভেতরের বৈশিষ্ট্য। রাজকুমারীরা রেমরেমের সাথে আগেই চলে যাবে। আর আমি দ্বিতীয় দলে আমার সাথে ক্যাপ্টেন জারাস আর কর্নেল হুইকে রাখবো। এক চালে আমি মেয়েদেরকে ছেলেদের কাছে থেকে আলাদা করলাম আর সেই সাথে জারাস আর সমস্ত পশু সঠিক পরিমাণে পানি পান করে ভালো অবস্থায় ব্যবিলন পৌঁছাবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল আমার রাজকুমারীও গায়ে কারোও স্পর্শ না নিয়ে সেখানে পৌঁছাবে।

আমি তেহুতির দিকে তাকাতে চাচ্ছিলাম না। আশা করছিলাম এখানে সে কোনো ধরনের চালাকি খাটাতে পারবে না।

তবে পরিষ্কার কণ্ঠে সে বললল, না। আমার মনে হয় এটা মোটেই ভালো পরিকল্পনা হল না তায়তা। আবার সে আমাকে তাতা না বলে তায়তা বলে সম্বোধন করলো।

আমি জামার হাতার ভেতর থেকে রাজকীয় বাজপাখির সীলমোহরটা বের করলাম। এটা সবসময় আমার সাথেই রাখি। যখনই প্রয়োজন তখনই সর্বোচ্চ ক্ষমতাটি দেখাতে হবে।

কথাটা শুনে দুঃখিত হলাম রাজকুমারী। আমি নিশ্চিত ছিলাম যে, সেনাপতি রেমরেমের মতো আপনিও এই ব্যবস্থা গ্রহণের গুরুত্বটি বুঝতে পারবেন। এই কথাটি বলার সময় বাজপাখির সীলমোহরটা হাতের দুই আঙুলের মাঝে নিয়ে ঘষতে লাগলাম।

ওহো, তুমি এই বাচ্চাদের খেলনাটা আমাকে দিতে চাচ্ছো? আমার উত্তরের জন্য অপেক্ষা না করেই সে হাত বাড়িয়ে ছোঁ মেরে সীলমোহরটা আমার হাত থেকে নিয়ে নিল। হঠাৎ এই কাণ্ডে আমি এততাই হতচকিত হয়ে গিয়েছিলাম যে কোনো বাধা দেওয়ার আগেই জিনিসটা আমার হাতছাড়া হয়ে গেল।

এটার সম্পর্কে লোকে যা বলে তা কি সত্যি তায়তা?

লোকে কী বলে রাজকুমারী?

ওরা বলে এটা যার হাতে থাকে সে ফারাওয়ের কণ্ঠস্বরে কথা বলে।

হ্যাঁ, রাজকুমারী, কথাটা সত্যি।

তাহলে দেখো, এটা এখন কার হাতে আছে তায়তা।

ইতোমধ্যে তাঁবুর মাঝে থাকা অন্য তিনজনও বুঝতে পারলো যে এখানে একটা ইচ্ছাশক্তির লড়াই চলছে। ওরা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। তারপর আমিও বুঝতে পারলাম আমাকে কীরকম হাস্যকর দেখাচ্ছে। অনুভব করলাম আমার ভ্রু কুঁচকাতে শুরু করছে, সাথে সাথে নিজেকে সামলে নিয়ে কপাল মসৃণ করে তেহুতির দিকে মাথা নত করে বললাম, আমি আপনার কাছ থেকে মহান ফারাওয়ের কণ্ঠস্বর শোনার জন্য অপেক্ষা করছি রাজকুমারী। রসিকতার সুরে কথাটা বলার চেষ্টা করলেও তা খুব একটা কাজে এলো না। এবার তেহুতির মুখের হাসি মুছে গিয়ে দুচোখ ভরে পানিতে টলটল করে উঠলো।

সে ফিস ফিস করে প্রায় বাষ্পরুদ্ধকণ্ঠে বললো, ওহো, তায়তা। আমার প্রতি এমন নিষ্ঠুর হয়ো না। তোমাকেই আমি আমার বাবা হিসেবে জানি। দয়া করে এভাবে আমাকে ফিরিয়ে দিও না। তুমি আমার ভাই আর আমার মাকে কথা দিয়েছিলে যে, সবসময় আমার দিকে খেয়াল রাখবে। তুমিই একমাত্র মানুষ যাকে আমি ভালোবাসি আর বিশ্বাস করি। তারপর সীলমোহরটা আমার হাতে ফিরিয়ে দিয়ে ফুপাতে ফুপাতে, নাও এটা ধর! দরকার মনে হলে আমাকে দূরে পাঠিয়ে দাও। তুমি যা আদেশ করবে তাই আমি পালন করবো।

ৎসুক্য নিয়ে তাকিয়ে থাকা উপস্থিত শ্রোতাদের মুখের হাসি মুছে গেল। এবার ওদের চেহারায় হতাশার অনুভূতি আর আতঙ্ক দেখা গেল। সবাই একযোগে পাল্টা অভিযোগের দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাল। হঠাৎ আমি একজন দুর্জন ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছি।

অবশ্য ওরা কেউ ধারণাই করতে পারেনি যে, আসলে সে কি নিখুঁত একজন অভিনেত্রী। আমাকে পুরোপুরি একজন কাপুরুষ বানিয়ে ছেড়েছে। মুহূর্তের মধ্যে আমি প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে পড়েছি।

আমাকে ক্ষমা করো তেহুতি। বল তুমি কী চাও, আমি তাই দেবো তোমাকে।

সে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বললো, বেকাথা আর আমি আমাদের আসল বাবা, শুধু তোমার সাথে থাকতে চাই। ব্যস এই। তবে সে জানে সে জিতেছে। যে লোককে নিয়ে আসল দ্বন্দ্ব চলছে, তার নাম উচ্চারণ না করেই সে তার কার্যোদ্ধার করতে পেরেছে।

.

চারদিন পর বিকেলে সেনাপতি রেমরেম দলের অর্ধেক মানুষ আর পশু নিয়ে দুইশো লিগ উত্তরে জয়নাব মরুদ্যানের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিল। তেহুতিকে সাথে নিয়ে আমি পাঁচ লিগ পর্যন্ত রেমরেমকে এগিয়ে দিলাম। তারপর তাকে বিদায় জানিয়ে আমরা দুজন ময়াগুহার দিকে ফিরে চললাম। একটু পেছনে আমাদের দেহরক্ষী দল-নীল কুমির বাহিনীর বিশজন সদস্য আমাদের অনুসরণ করছে।

ময়াগুহা ছেড়ে বের হওয়ার সময় আমি বেকাথাকেও আমাদের সাথে ঘোড়ায় চড়ে যেতে বলেছিলাম। কিন্তু আমাকে অবাক করে সে এই আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছিল, আমি তাকে যে প্রাচীন মিসরীয় লিপির লেখ্যপট দিয়েছিলাম, সে তা নিয়ে কাজ করতে চাচ্ছে। বেকাথা খুব একটা মনোযোগী কিংবা পরিশ্রমী ছাত্রী নয়, তাই তার একথায় বেশ অবাক হয়েছিলাম। অবশ্য এখন আমি জানতে পেরেছি কে তাকে হঠাৎ লেখার দিকে মনোযোগ দিতে আগ্রহী করেছে।

প্রথম লিগ আমি আর তেহুতি পাশাপাশি নীরবে ঘোড়ায় চড়ে চলতে লাগলাম। তারপর হঠাৎ সে জিজ্ঞেস করলো, তুমি আমার বাবাকে খুব ভালো করে জানো তাই না? অথচ আমি কিছুই জানি না। তুমি এর আগে কখনও তার সম্পর্কে কিছুই বলে নি। এখন বল না তায়তা।

মিসরের সবাই তোমার বাবা সম্পর্কে ভালো করেই জানে। তিনি ছিলেন স্বর্গীয় দেবতা ফারাও ম্যামোস। বংশধারার অষ্টম পুরুষ। তিনি ছিলেন সাম্রাজ্যের স্তম্ভ, ন্যায়পরায়ণ, মহান, সর্বদ্রষ্টা, দয়ালু

সে সরাসরি অস্বীকার করে বললো, না, তিনি তা ছিলেন না। দয়া করে। আমাকে মিথ্যা বলো না তায়তা। হঠাৎ এই অভিযোগে আমি হতবুদ্ধি হয়ে তার দিকে ঘুরে তাকালাম।

হেসে বিষয়টার পরিসমাপ্তি করার চেষ্টা করে বললাম, তাহলে আমি হয়তো ভুল জেনেছি! ফারাও না হলে তোমার মতো একজন মেয়ের পিতা তাহলে কে সেই সৌভাগ্যবান লোক। আমার সত্যি তাকে হিংসা হচ্ছে।

আমার আসল বাবা ছিলেন মহান তানুস। আর তার বাবা ছিলেন পিয়াংকি, প্রভু হারাব। তার মা ছিলেন একজন মুক্ত তেহেনু ক্রীতদাসী। যার কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে আমি সোনালি চুল আর নীল চোখ পেয়েছি। লোকে বলে তিনি খুবই সুন্দরী ছিলেন। আমার বাবাও তার মায়ের কাছ থেকে অপরূপ দৈহিক সৌন্দৰ্য্য পেয়েছিলেন। সবাই বলে তিনি ছিলেন মিসরের সবচেয়ে সুন্দর পুরুষ।

আমি বললাম, কে তোমাকে এসব আজেবাজে কথা বলেছে?

আমার নিজের মা লসট্রিস বলেছেন। এখন বল তিনিও মিথ্যা বলেছেন।

আমি হতভম্ব হয়ে পড়লাম। ফারাওয়ের সিংহাসন আর মিসরের অস্তিত্বের ভিত্তি পর্যন্ত কেঁপে উঠতে শুরু করেছে। আর আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়তে যাচ্ছে। এমন বিপজ্জনক কথা আমি কখনও শুনিনি।

হা করে তার দিকে তাকিয়ে বললাম, একথা আর কাকে বলেছে?

কাউকেই না; শুধু তোমাকেই বললাম।

তুমি কি জানো একথা আর কাউকে বললে কি পরিণতি হতে পারে?

ঘোড়ার জিন থেকে ঝুঁকে এক হাত বাড়িয়ে আমার হাত ধরে সে সান্ত্বনার সুরে দিয়ে বললো, প্রিয় তায়তা। আমি এতো বোকা না।

এবার আমি বেশ জোরে বললাম, তুমি কি নিশ্চিত যে, তোমার ভাইকে একথা বলনি? ফারাও কি একথা জানেন? আর বেকাথা? তাকে বলেছো?

এবার সে শান্ত কণ্ঠে আমাকে আস্বস্ত করে বললো, না। বেকাথা এখনও ছোট্ট একটি মেয়ে। আর মেমতো মরেই যাবেন, যদি তিনি জানতে পারেন যে তিনি সত্যিকার ফারাও নন।

এবার আমি সত্যি আতঙ্কিত হলাম। তার হাত ধরে জোরে জোরে নাড়তে নাড়তে বললাম, একথাও তোমার মা তোমাকে বলেছিলেন? তিনি তোমাকে

সবকিছু বলেছিলেন? দয়া করে বল আমি তোমার কথা ভুল শুনছি, তাই না?

তুমি আমার কথা ঠিকই বুঝেছো। আমার মা আমাকে বলেছেন যে, আমরা তিনজনই ফারাও ম্যামোসের নয়–মহান তানুসের সন্তান। আমরা তিনজনই অবৈধ সন্তান।

এসব কথা এখন আমাকে কেন শোনাচ্ছো তেহুতিঃ

কেননা আমিও শিঘ্রই একই অবস্থায় পড়তে যাচ্ছি যাতে আমার মা ধরা পড়ে গিয়েছিলেন। আর তুমি তাকে বাঁচিয়েছিলে। সে আমার দিকে তাকাতেই আমি অস্বীকৃতি জানিয়ে মাথা নাড়লাম।

সে আমার দিকে তাকিয়ে হেসে বললো, এভাবে আমার দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ো না তায়তা। তুমি আমার মাকে বাঁচিয়েছিলে, এবার একই কাজ আমার জন্যও করবে।

এতোটুকু আসলে সত্যি। রানি লসট্রিস ছিলেন আমার জীবনের একমাত্র সত্যিকার ভালোবাসা। তবে এখন তিনি আর নেই আর তার জায়গায় তেহুতি রয়েছে। তার কোনো অনুরোধই ফেলতে পারবো না। তবে এক্ষেত্রে অন্তত আমার নিজের মতো শর্ত আরোপ করতে পারবো। নিশ্চিত তার মায়ের মতোই সে তা উড়িয়ে দেবে। তবে আমাকে অন্তত চেষ্টা করতে হবে।

বল আমার কাছ থেকে তুমি ঠিক কি চাও তেহুতি? আমার মার একজন রাজার সাথে বিয়ে হয়েছিল, তবে তার নিজের পছন্দমতো স্বামী ছিল। রাজার নয়, তিনি তার সন্তান গর্ভে ধারণ করেছিলেন। তবে তার নিজের পক্ষে তা করা সম্ভব ছিল না। তুমিই তাকে এসব করতে সাহায্য করেছিলে। তাই না?

আমি স্বীকার করলাম, হ্যাঁ তাই হয়েছিল। একথা বলা ছাড়া আর কোনো পথ আমার জন্য ভোলা ছিল না।

তেহুতি বলে চললো, জীবনের বেশিরভাগ সময় আমি আমার ভাইয়ের হেরেমে কাটিয়েছি। তার দুইশো জন স্ত্রী রয়েছেন, অথচ তিনি কেবল একজনকে ভালোবাসেন। মাসারা ছিলেন তাদের মধ্যে প্রথম স্ত্রী। তিনি তাকে তিনটি পুত্রসন্তান দিয়েছেন। তিনি যা পেয়েছেন সেরকম পেলে আমিও সন্তুষ্ট থাকতাম। তবে আমি অন্যান্য স্ত্রীদের দূরবস্থা দেখেছি। ওরা স্ত্রী হওয়ার পর বেশির ভাগের ক্ষেত্রে সারা জীবনে ভাই একবার কি দুবার তাদের কাছে গিয়েছেন। তুমি জান ওরা কী করে, তায়তা? একথা জিজ্ঞেস করতেই আমি মাথা নেড়ে না করলাম। ওরা নিজেদের মধ্যে খেলা করে। নিজেদের সন্তুষ্টির জন্য একজন পুরুষ না পেয়ে জঘন্য কাজকারবার করে। তার গা শিউরে উঠলো। তারপর সে বললো, কী দুঃখজনক। আমি ওদের মতো হতে চাই না।

আমি দেখলাম দুঃখে আর হতাশায় তার চেহারা বদলে যাচ্ছে। লক্ষ্য করলাম হঠাৎ তার চোখের কোনে পানি টলটল করে উঠছে। এখন আর সে অভিনয় করছে না।

আমি জানি তুমি আমাকে অচেনা বিদেশে নিয়ে যাচ্ছে। সেখানে একজন বৃদ্ধলোকের হাতে আমাকে তুলে দেবে, যার সারা শরীরের চামড়া কুঁচকানো আর বিবর্ণ; হাতগুলো ঠাণ্ডা। আর তার নিঃশ্বাসের দুর্গন্ধে বমিতে আমার পেট গুলিয়ে উঠবে। সে আমার সাথে নোংরা কাজ করবে আবার কান্নার দমক থামিয়ে বলে চললো, এগুলো ঘটার আগে আমার মাকে তুমি যা দিয়েছিল তা আমি একবারের জন্য চাই। আমি এমন একটি মানুষকে চাই, যে আমার মুখে হাসি এনে দেয় আর যার কারণে আমার হৃৎস্পন্দন দ্রুত হয়। আমি এমন একজন মানুষকে চাই যে আমাকে সত্যিকার ভালোবাসে আর যাকে আমিও সত্যিকার ভালোবাসি।

আমি মৃদু কণ্ঠে বললাম, তুমি জারাসকে চাও। সে চিবুক তুলে সজল চোখে আমার দিকে তাকাল।

হ্যাঁ আমি জারাসকে চাই। শুধু একবার ভালোবেসে সেই মূল্যবান বস্তুটিকে বুকে চেপে ধরে রাখতে চাই। আমি জারাসকে আমার স্বামী হিসেবে চাই। শুধু সামান্য সময়ের জন্য যদি তুমি এটুকু আমাকে দাও, তাহলে আমি সানন্দে গিয়ে ফারাও, মিসর আর তোমার জন্য আমার অতি প্রিয় তায়তার জন্য যেকোনো দায়িত্ব পালন করবো।

তাহলে প্রতিজ্ঞা কর তেহুতি। একথা কখনও কাউকে বলবে না, এমনকি তোমার নিজ সন্তানদেরও বলবে না।

সে শুরু করলো, কিন্তু আমার মা কিন্তু আমি তাকে থামিয়ে দিয়ে বললাম, তোমার মায়ের বেলায় ভিন্ন পরিস্থিতি ছিল। তোমার বেলায় তা হবার নয়। তোমাকে কথা দিতে হবে।

তারপর সে রাজি হয়ে বললো, ঠিক আছে আমি কথা দিচ্ছি। তার কথা আমার বিশ্বাসযোগ্য মনে হল।

তবে তোমাকে বুঝতে হবে তুমি কোনোদিন জারাসের সন্তান গর্ভে নিতে পারবে না।

এরকম না হলে ভালো হত তায়তা। ছোট্ট একটি নিজের জারাস পেলে আমি খুবই খুশি হতাম। কিন্তু আমি জানি তা হবার নয়।

প্রত্যেক মাসে যখন তোমার নারীত্বের লাল ফুলটি ফোঁটার সময় হবে, তখন আমি তোমাকে একটি নির্যাস খেতে দেবো। শিশুটি তখন তোমার রক্তস্রাবের সাথে বের হয়ে আসবে।

একথা ভেবে আমি কাঁদবো।

সর্বাধিরাজ মিনোজের স্ত্রী হওয়ার পর জারাসকে সারাজীবনের জন্য ভুলে যেতে হবে। তুমি ক্রিটের রাজকীয় হেরেমে থাকবে। জারাস মিসরে যাবে। তুমি আর কখনও তার দেখা পাবে না। বুঝতে পেরেছ তেহুতি? সে ঘাড় নেড়ে সায় দিল।

আমি আদেশের সুরে বললাম, উচ্চারণ করে বল, যে আমার কথা বুঝেছ।

সে পরিষ্কার কণ্ঠে বললো, হ্যাঁ বুঝেছি।

মিনোজের সাথে বিয়ের রাতে আমি ভেড়ার রক্ত ভরে একটা রবারের ব্যাগ তোমাকে দেবো। সে যখন তোমাকে বিছানায় নেবে তখন এটা ফেটে যাবে। এটা তাকে তোমার কুমারীত্ব সম্পর্কে নিঃসন্দেহ করবে।

সে ফিসফিস করে বললো, বুঝতে পেরেছি।

আমি জোর দিয়ে বললাম, কাউকে একথা বলো না। বিশেষ করে বেকাথাকে অবশ্যই বলবে না। তার ছোট বোনটি সারাদিন গল্প করে বেড়ায় আর কোনো কথা গোপন রাখতে পারে না।

সে বললো, ঠিক আছে, কাউকে একথা জানাবো না। এমনকি আমার ছোট বোন বেকাথাকেও না।

তুমি কি জানো কি বিপদের মধ্যে তুমি পড়তে যাচ্ছো তেহুতি? তোমার জীবন মরণ তখন মিনোজের হাতে থাকবে। একজন রাজার সাথে প্রতারণা করা খুবই হঠকারিকতাপূর্ণ ব্যাপার। তোমাকে খুব সাবধানে থাকতে হবে যাতে ব্যাপারটা কোনোদিন জানাজানি হয়।

আমি বুঝতে পেরেছি। আমি জানি তুমিও আমার মতো একই ঝুঁকি নিচ্ছ। আর তাই আমি তোমাকে আরও ভালোবাসি।

অবশ্যই এই কাজটা একটা পাগলামি, তবে জীবনে আমি অনেক পাগলামো করেছি। শুধু একটি সান্ত্বনা যে এখনও হাতে প্রস্তুতি নেওয়ার কিছু সময় আছে। জারাসের জখম এতে একটি বাধা হয়ে আছে। ভালোবাসার এই উন্মাদনার কর্মকাণ্ডে ঝাঁপিয়ে পড়ার মতো সুস্থ সে এখনও হয়নি। তবে যাইহোক সে দ্রুত আরোগ্যের পথে রয়েছে।

 ৫. কথা বলার অনুমতি

দুইদিন পর জারাস আমার কাছে এসে কিছু কথা বলার অনুমতি চাইল।

কখন থেকে তোমার আবার কথা বলার জন্য অনুমতির দরকার পড়লো? এর আগে তো অনুমতির কারণে আমার সাথে কথা বলা বন্ধ থাকেনি? এবার তাকে একটু বিব্রত মনে হল।

রাজকুমারী তেহুতি আমার কাছ থেকে অস্ত্র চালনার নিয়ম-কানুন আর তরবারি চালানো শিখতে চাচ্ছেন। আমি তাকে বলেছি এর জন্য আমাকে আপনার কাছ থেকে অনুমতি নিতে হবে।

এটা খুব একটা বুদ্ধিমানের কাজ হলো না জারাস। মহামান্য রাজকুমারী যা চান, তা তিনি পান।

সে আমাকে নিশ্চয়তা দিয়ে তাড়াতাড়ি বললো, আমি তাকে কোনো অসম্মান করার জন্য একথা বলছি না। তার অবস্থা দেখে আমার হাসি পেল।

আমি বললাম, রাজকুমারী অত্যন্ত দক্ষ একজন তীরন্দাজ। খুব দ্রুত তীর ছুঁড়তে পারেন। তার দৃষ্টিশক্তি প্রখর আর বাহুতেও খুব জোর আছে। আমি নিঃসন্দেহ তিনি শিঘ্রই খুব ভালোভাবে তলোয়ার চালানো শিখতে পারবেন। আর এই দক্ষতা তার ভবিষ্যৎ জীবনে কোনো না কোনো সময় অবশ্যই কাজে আসবে। কে জানে? এটা হয়তো এক সময় তার জীবন বাঁচাতে পারে। আমি জানিনা কেন একথাটা বললাম। তবে ঘটনা যেভাবে গড়াচ্ছে তাতে মনে হয় আমার এই কথাটাই আমার জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উক্তি হয়ে দাঁড়াতে পারে।

তার এই অনুরোধ রাখতে তোমার কি কোনো অসুবিধা আছে জারাস?।

জারাস আবার আমাকে নিশ্চয়তা দিয়ে বললো, না, না মোটেই না। কোনো অসুবিধা নেই প্রভু। বরং এটাকে আমি বিরাট একটি সম্মান আর বিশেষ অনুগ্রহ মনে করবো।

তাহলে শুরু করে দাও। আমার খুব কৌতূহল হচ্ছে জানতে যে, তুমি তাকে দিয়ে কি করতে যাচ্ছ। এনিয়ে আর চিন্তা করার দরকার নেই, তবে কথাটা আক্ষরিক অর্থে ঠিক ছিল না। বরং এটা ছাড়া অন্য বিষয়ে খুব কম চিন্তা করেছি। পরবর্তী সপ্তাহগুলোতে জারাস আর তেহুতিকে নিয়ে খুবই দুশ্চিন্তায় কাটালাম।

জারাস প্রতিদিন আরও শক্তিসঞ্চয় করতে লাগলো।

রোজ সকালে সূর্য উঠার সময় থেকে শুরু করে দুপুর পর্যন্ত তার লোকদেরকে নিয়ে উঁচুনিচু ময়দানে দৌড়াত। আমিও ওদের সাথে দৌড়াতাম। আমার অসাধারণ শক্তি এবং সহিষ্ণুতা ছিল আর আমি আমার চেয়ে বয়সে অর্ধেক লোকদের সাথে প্রতিযোগীতা করতে পারতাম।

প্রথম প্রথম আমি দেখতাম সে কি পরিমাণ কষ্ট সহ্য করছে আর অবাক হলাম লক্ষ করে যে, আমি ছাড়া আর সবার কাছ থেকে সে তার কষ্ট লুকিয়ে রাখতে পেরেছে। তবে কিছুদিন পরই আমার কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আর তার পল্টনের লোকদেরকে নেতৃত্ব দিয়ে গান গাইতে গাইতে দৌড়াতে লাগলো। অনেক সময় আমার রসিকতায় মনখুলে হাসতেও লাগলো।

তার অধ্যবসায় আর আত্ম-উন্নতির ক্রমাগত প্রচেষ্টাকে সমর্থন করলাম। তবে সবকিছুরই একটা পরিমিতি বোধ থাকা দরকার। সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে যে আচরণ স্বাভাবিক, তা আমাদের মতো সমাজের উপরের স্তরের মানুষের জন্য শোভনীয় নয়।

যখন আমার সাথে পরামর্শ না করে সে সিদ্ধান্ত নিল যে, এখন থেকে প্রতিদিন সকালে সবাই পিঠে একটা করে বালুর বস্তা নিয়ে দৌড়াবে, তখন আমি বুঝতে পারলাম অন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব আমি অবহেলা করে চলেছি। মরুভূমির মধ্য দিয়ে নির্বোধের মতো ছুটাছুটি করে কতগুলো তরুণ ষণ্ডার সাথে প্রতিযোগীতা করার চেষ্টা না করে, আমাকে রাজকুমারীদেরকে গণিতের বিজ্ঞান আর জ্যোতিষতত্ত্ব শিক্ষা দিতে হবে। এছাড়া দেবতাদের বংশবৃত্তান্ত নিয়ে রচিত গবেষণাকর্মটির শেষ অধ্যায়গুলো রচনার কাজটিও সমাপ্ত করা দরকার।

তাছাড়া আমি মনে করি পেশিশক্তির চেয়ে মনকে সবসময় প্রাধান্য দেওয়া উচিত।

.

সেনাপতি রেমরেম জয়নাব মরুদ্যানের উদ্দেশ্যে চলে যাওয়ার পর, ময়াগুহায় অপেক্ষা করার সময় আমি পড়াশুনা আর ব্যবিলনে পৌঁছার আগে সমস্ত পরিকল্পনা সেরে নিচ্ছিলাম। সময় সুন্দরভাবে দ্রুত বয়ে যাচ্ছিল।

তবে এসময়ে আমাদের দলের মধ্যে বেশ উল্লেখযোগ্য আর বিস্ফারোন্মুখ কিছু ঘটনা ঘটে চলেছিল। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল রাজকুমারী বেকাথা আর কর্নেল হুইয়ের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের অবসান।

বেকাথার অনুরোধে কর্নেল হুই রোজ বিকেলে তাকে অশ্বক্রীড়ার বিভিন্ন কলাকৌশল শেখাচ্ছিল। তার প্রশিক্ষণে বেকাথা দ্রুত একজন অসমসাহসিক অশ্বারোহীতে পরিণত হচ্ছিল। সে সবসময় নির্ভীক ছিল। ভারসাম্য বজায় রাখা আর ঘোড়ার জিনে বসা, এই সবদিকে দিয়ে সে হুইয়ের সেনাদের থেকে অনেক পারদর্শীতা অর্জন করেছিল। এরা বেশিরভাগ ছিল রথের চালক, তাই ঘোড়ার পিঠে চড়ার চেয়ে বরং ঘোড়ার পেছনে থাকতেই পছন্দ করতো।

অন্যদিকে বেকথা ঘোড়ায় চড়ার সময় দাঁড়িয়ে থাকতে পছন্দ করতো। এটা আমিই তাকে শিখিয়েছিলাম। ঘোড়ার চড়ার সময় সে সবসময় তার দক্ষতা দেখাতে পছন্দ করতো আর কোনো দর্শক থাকলে, তার কলাকৌশলগুলোও দেখাতে ভালোবাসতো।

এক বিকেলে হুই তাকে একটা গোলক নিয়ে খেলা শেখাচ্ছিল। গোলকটি ছিল ওজনে ভারী আর কাঁচা চামড়ার ফালি দিয়ে বানানো একটা বড় বল। এই খেলায় দুই দলে চারজন করে ঘোড়সওয়ার থাকে আর দুজন ঘোড়সওয়ার ডগা বাঁকানো একটি লাঠির ডগায় গোলকটা ধরে মাঠের শেষ প্রান্তে একটি চিহ্নিত করা জায়গায় নিয়ে যাবে। আর ওদের প্রতিদ্বন্দ্বিরা ওদেরকে বাধা দেবে। এটি ছিল হৈচৈ আর জোর জবরদস্তি করে খেলার মতো একটি প্রতিযোগীতা। অনেক দর্শকের চিৎকার আর হৈ হুল্লোড়ের মধ্যে এটা চলতো।

সেদিন বিকেলে হুই বেকাথাকে শেখাচ্ছিল কীভাবে ঘোড়ার পিঠ থেকে নিচু হয়ে বালুতে গড়ানো বলটা তুলে নেওয়া যায়। রোজকার মতো গোটা পঞ্চাশেক সৈন্য আর শিবিরের অলস কিছু লোক মাঠের দুইধারে সারবেঁধে দাঁড়িয়ে খেলাটা উপভোগ করছিল।

বেকাথার ঘোড়া টগবগিয়ে মাঠে ঢুকলো। তার দুই হাত মুক্ত ছিল আর সে হাঁটুর গুঁতো দিয়ে ঘোড়াকে সামলাচ্ছিল।

হুই মাঠের একপাশে দাঁড়িয়ে গোলকটা নিয়ে অপেক্ষা করছিল। বেকাথা মাঠে ঢুকতেই সে গোলকটা তার সামনে মাটিতে ছুঁড়ে মারলো। বেকাথা ঘোড়ার গদি থেকে একদিকে ঝুঁকে নিচু হয়ে গোলকটা তুলতে চেষ্টা করলো; তার দেহের সমস্ত ওজন জিনের একপাশের রেকাবের উপর ছিল। আমার মতে এটা ছিল অতি চমৎকার একটি ক্রীড়াশৈলী। সমস্ত দর্শক চিৎকার করে তাকে উৎসাহ দিয়ে চললো, আমিও তাদের সাথে যোগ দিলাম।

বিশাল ঘোড়াটির পিঠে বেকাথাকে দেখতে ডাইনিসুলভ মনে হলেও সে অনায়াসে নিচের দিকে ঝুঁকে মাটিতে গড়ানো গোলকটির চারটি পালকের হাতলের একটি ধরে ফেললো। খুশিতে আত্মহারা হয়ে সে বলটি তুলতে শুরু করলো।

তারপর হঠাৎ তার জিনের রেকাবের চামড়া ছিঁড়ে গেল আর সে ঘোড়ার জিন থেকে শূন্যে ছিটকে পড়লো। তবে সে মাটিতে পড়ার আগেই আমি তার দিকে ছুটে গেলাম। ভাবলাম হয় সে মরেই গেছে আর নয়তো সাংঘাতিকভাবে আহত হয়েছে। অন্যদিকে হুই আমার আগেই দ্রুত তার দিকে ছুটে গেল।

তারপর আমি স্বস্তি পেলাম যখন দেখলাম বেকাথা মাটিতে দুপায়ের উপর দাঁড়িয়ে রয়েছে আর প্রচণ্ড রাগে আর লজ্জায় কাঁপছে। আসলে সে মাটিতে এক জায়গায় স্তূপ করা ঘোড়ার বিষ্ঠার উপর পড়েছিল। একারণে ছুটন্ত ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়লেও তার হাতপা ভাঙেনি আর সম্ভবত এজন্যই তার জীবন রক্ষা পেয়েছে। তবে ঘোড়ার নাদি মাখামাখি হয়ে তার চেহারা বিশ্রী হয়ে এক অপমানকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।

তার পা থেকে মাথার লাল চুল পর্যন্ত ঘোড়ার সবুজ নাদিতে মাখামাখি হয়ে রয়েছে। হুই ছুটে তার কাছে পৌঁছাবার পর কেবল তার দিকে তাকিয়ে রইল। সে বুঝে উঠতে পারছিল না এ পরিস্থিতিতে তার কী করা দরকার। আর বেকাথাকে সান্ত্বনা দেবার জন্য আমি তার কাছে পৌঁছার আগেই, হুই এমন একটি কাজ করলো যাতে বিষয়টা জটিল হয়ে দাঁড়াল। সে বেকাথার অবস্থা দেখে হেসে ফেললো।

সাথে সাথে বেকাথা তার স্বভাবসুলভ প্রতিক্রিয়া দেখাল। প্রচণ্ড রাগে সে প্রায় উন্মাদ হয়ে গেল। তখনও তার ডান হাতে গোলকটা ধরা ছিল। সে সোজা এটা হুইয়ের মাথা লক্ষ্য করে ছুঁড়ে মারলো। হুই হঠাৎ এ-ধরনের আক্রমণ আশা করেনি, তাই সে নিজেকে বাঁচাতে পারলো না। ভারী গোলকটার চামড়া রোদে শুকিয়ে হাড়ের মতো শক্ত হয়ে ছিল। এটা তার চওড়া নাকের বাঁশির উপর আঘাত হানতেই ফিনকি দিয়ে রক্ত ঝরতে শুরু করলো। এতেও বেকাথা ক্ষান্ত হলো না।

সে যে ঘোড়ার বিষ্ঠার গাদার উপর দাঁড়িয়েছিল সেখান থেকে নিচু হয়ে দুই হাত ভরে নাদি তুলে নিয়ে হুইয়ের দিকে ছুটে গিয়ে তার ভাঙা নাকের উপর ঘসে দিল।

তারপর শীতল কণ্ঠে বললো, তুমি যদি মনে কর আমাকে দেখে তোমার হাসি পাচ্ছে, তাহলে এবার নিজের চেহারাটা দেখো কর্নেল হুই। তারপর সে ঘুরে মাঠ থেকে বের হয়ে সোজা রাজকীয় শিবিরের দিকে হেঁটে চললো। দর্শকদের মধ্যে কেউ আর হাসার সাহস করলো না, এমনকি আমিও না।

হুইকে আর কখনও রাজকীয় খাবার টেবিলে আমন্ত্রণ করা হয়নি আর রাজকুমারীদের ঘোড়ায় চড়া শেখানোর জন্য ডাকা হয়নি।

এর কয়েকদিন পর যখন বেকাথা আর লক্সিয়াস নিজেদের মধ্যে কথা বলছিল তখন আড়াল থেকে আমি তাদের কথা শুনে ফেললাম। রাজকুমারীদের লেখাপড়ার জন্য শ্রেণিকক্ষ হিসেবে একটা তাঁবু আলাদা করে রাখা হয়েছিল। ওরা সেখানে মিনোয়ান ভাষায় কথা বলছিল। আমি এই তাবুর পেছনে দাঁড়িয়ে বাইরে পাহাড়চূড়াগুলোর বিভিন্ন রঙের দৃশ্য উপভোগ করছিলাম। অবশ্যই আমি আমার ছাত্রীদের কথোপকথন আড়ি পেতে শুনছিলাম না। তবে তাঁবুতে ঢোকার মুখে এই জায়গায় এসে একটু থামতেই ওদের কিছু কথা অসাবধানতাবশত আমার কানে এলো।

লক্সিয়াস বেকাথাকে জিজ্ঞেস করলো, তুমি কি এখনও কর্নেল হুইকে ক্ষমা করোনি?

বেকাথা উগ্রকণ্ঠে উত্তর দিল, আমি কোনোদিনই তাকে ক্ষমা করবো না। সে একজন অসভ্য গেয়ো ভূত। যখন আমি ক্রিটের রানি হব তখন তার মাথা কেটে ফেলার নির্দেশ দেবো।

ইস কী মজা হবে। আমাকে দেখতে দেবে?

এটা ঠাট্টা নয় লক্সিয়াস। আমি সত্যিই বলছি।

কিন্তু তুমি তো আমাকে আর তেহুতিকে বলেছিলে যে এই পৃথিবীতে সেই তোমার উপযুক্ত একমাত্র লোক?

এবার বেকাথার গলায় অহঙ্কারের সুর, আমি মত পাল্টেছি। তার মতো একজন বয়স্ক লোক দেখতে বিশ্রী, যে আচার ব্যবহার জানে না তার সাথে। আমার কী? যার আবার চল্লিশটা বিশ্রী চেহারা বউ আছে।

সে তেমন বয়ষ্ক নয় বেকাথা আর সে দেখতেও বেশ সুন্দর। আমি যদুর জানি থিবসে তার কেবল পাঁচজন বউ আছে আর ওরা দেখতেও বেশ সুন্দর।

বেকাথা দৃঢ়কণ্ঠে বললো, সে খুবই বুড়ো, এমনকি তায়তার চেয়েও বুড়ো। ভাঙা নাক আর মুখে ঘোড়ার নাদিসহ তাকে আমার মোটেই সুন্দর মনে হয় না। তার পাঁচ বউ তাকে নিয়ে থাকুক। আমার আর তাকে দরকার নেই।

বেকাথার এ-ধরনের রুঢ় শব্দ চয়ন আর আমার বয়স নিয়ে মানহানিকর মন্তব্য করাটা আমি ক্ষমা করলাম। এবার অন্তত একটা সমস্যার সমাধান হয়েছে। এখন থেকে তার বড় বোনের সাথে সাথে তারও কুমারীত্ব রক্ষা করতে আমাকে আর পাহারা দিতে হবে না।

আমি একটু গলা খাঁকারি দিতেই ওদের কথা থেমে গেল। তাবুর দরজা দিয়ে মাথা নিচু করে ঢুকে দেখলাম দুজনেই টেবিলে মাথা ঝুঁকে খুব মনোযোগ দিয়ে কিছু লিখছে। আমি ওদেরকে প্যাপিরাসে লেখা মিসরের ইতিহাসের কয়েকটি অধ্যায় দিয়েছিলাম, সেগুলো ওরা ক্রেটান ভাষায় অনুবাদ করছে। আমি পাশে এসে দাঁড়ালেও বেকাথা মাথা তুলে আমার দিকে তাকাল না।

তোমার অধ্যবসায় আর প্রাচীন মিসরীয় লিপিতে চমৎকার হাতের লেখা দেখে আমি সত্যি খুশি হয়েছি রাজকুমারী। তবে তোমার বোন তোমার সাথে নেই কেন?

সে তার তুলিটি সামনের দিকে তুলে বললো, সে ওদিকে খুব ব্যস্ত রয়েছে। আমাকে বললো একটু পরেই এখানে আসবে। একথা বলেই সে আবার তার লেখার কাজে মনোনিবেশ করলো।

শিবিরের শেষ প্রান্তে কুচকাওয়াজের ময়দান থেকে রক্ষীদের গুঞ্জন আমি শুনছিলাম, তবে খুব একটা খেয়াল করিনি। এবার বেকাথার কথা শুনে আমার একটু কৌতূহল জাগতেই বিষয়টা কি জানার জন্য তাঁবু থেকে বের হয়ে সেদিকে চললাম। কুচকাওয়াজের ময়দানের চারপাশ ঘিরে বেশ কয়েকজন ঘোড়ার সহিস, পেশাদার চিত্তবিনোদনকারী, চাকরবাকর, ক্রীতদাস আর অন্যান্য অসামরিক লোক দল বেধে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ওরা এমন মগ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছিল যে, আমার লোকজন কনুই দিয়ে ধাক্কা মেরে ভীড় সরিয়ে আমার এগোবার জন্য পথ করে দিল। ময়দানের কিনারায় দাঁড়িয়ে আমি চারদিকে তাকিয়ে সাথে সাথে তেহুতিকে দেখতে পেলাম না।

সেখানে জারাস তার অধীনস্থ লোকদের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিল। ওরা সবাই অর্ধেক বর্ম পরেছিল, তবে শিরস্ত্রাণের মুখের ঢাকনি উপরের দিকে উঠানো থাকায় সবার মুখ দেখা যাচ্ছিল। তলোয়ার খাড়া করে ঠোঁটে চুঁইয়ে ওরা সবাই ঋজু আর স্থির হয়ে অভিবাদনের ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রয়েছে।

জারাস গর্জে উঠলো, লড়াই শুরু! সামনের বারোজন তলোয়ার হাতে দ্রুত সামনে বামদিকে ঝুঁকে পড়। এক

লোকগুলো সমস্বরে চিৎকার করে উঠলো, এক! তারপর নিখুঁতভাবে সকলে তলোয়ার বাগিয়ে একযোগে সামনে বামদিকে শরীর বাঁকিয়ে ঝুঁকে পড়লো, তারপর আবার আগেকার অবস্থানে ফিরে এলো। রোদে তলোয়ারের পাতগুলো সোনার মত চকচক করে উঠলো।

তারপর হঠাৎ সামনের সারির মধ্যখানে একটি ছোটখাট মানুষের দিকে আমার নজর পড়লো। প্রথমে আমার বিশ্বাস হচ্ছিল না আমি কী দেখছি। তারপর বুঝলাম না ঠিকই দেখেছি, এটা তেহুতি। সে রক্ষীবাহিনীর আঁটোসাটো পোশাক পরে রয়েছে। তার নুবিয় উপজাতীয় পরিচারিকাদের মধ্যে অন্তত তিনজন সূচিশিল্পে পটু ছিল, ওরা নিশ্চয়ই এক বেলাতেই পোশাকটা সেলাই করে দিয়েছে। আর সেনাবাহিনীর সাথে থাকা কামার তার হালকা পাতলা গড়নের সাথে খাপ খাইয়ে বর্মটি তৈরি করে দিয়েছে। সেনাবাহিনীর নিয়মিত একটি ভারী তলোয়ার হাতে ধরে রয়েছে, যা বিশেষত তার জন্যই তৈরি করা হয়েছে।

মুখে রক্তিমাভা, ঘামে ভেজা চুল লেপ্টে রয়েছে আর গায়ে সেঁটে থাকা আঁটো জামাটাও ঘামে ভেজা। আমি আতঙ্কিত হলাম। তাকে দেখে মনে হচ্ছিল একটি চাষার মেয়ে, যে সারাদিন তার স্বামীর ক্ষেতে কাস্তে হাতে ফসল কেটেছে কিংবা নিড়ানি দিয়েছে। তাকে ঘিরে রয়েছে একদল রুক্ষ চেহারার সৈন্য। আর সে এমন আচরণ করছিল যেন, তার চেহারা বা রাজকীয় পদমর্যাদা নিয়ে এদের মাঝে থেকে সে মোটেই লজ্জিত নয়।

আমি অবশ্য তাকে জারাসের কাছ থেকে তলোয়ার চালানো শিখতে বলেছিলাম। এমনকি এই পরিকল্পনায় উৎসাহও জুগিয়েছিলাম। তবে আমার ধারণা ছিল সাধারণ মানুষের চোখের আড়ালে নিভৃতে এই প্রশিক্ষণ চলবে আর কেউ তা দেখতে পাবে না।

দেবতারা সাক্ষী দেবেন যে, সাধারণ মানুষদের আমি অবজ্ঞার চোখে দেখি না। কিন্তু তাই বলে এতো উচ্চ মর্যাদার আসন থেকে নিচে নেমে সাধারণ মানুষের কাতারে এসে তাদের প্রতি সৌজন্য দেখানোরও একটা সীমা আছে।

আমার প্রথমে ইচ্ছা হচ্ছিল কুচকাওয়াজের ময়দানের মধ্য দিয়ে ছুটে গিয়ে তেহুতির ঘাড় ধরে টেনে রাজকীয় শিবিরের ভেতরে নিয়ে যাই। আর তাকে ধমক দিয়ে বলি যেন সে যথাযথ পোশাক পরে আর জনসাধারণের মাঝে গেলে তার আচরণ যেন আরও শোভন হয়।

তারপর আমার মাঝে সুবুদ্ধির উদয় হল। আমি জানি পুরো পল্টনের মাঝেও আমার কথা অমান্য করতে সে মোটেই ইতস্তত করবে না, যার ফলে ওরা যে সম্মানের চোখে আমাকে দেখতো তা ম্লান হয়ে যাবে।

আমি লক্ষ করলাম অস্ত্রধারীদের মধ্য দিয়ে সে এমন সাবলিল আর নিপুণতার সাথে মসৃণভাবে এগিয়ে চলেছে যে, তার চারপাশের শক্তিশালী যোদ্ধাদেরকে মনে হচ্ছিল হেঁচড়িয়ে চলা হাল চাষ করা কৃষক। সে একবারও ভুল পদক্ষেপ ফেলেনি কিংবা ছন্দ হারায়নি। সাবলীলভাবে তলোয়ারটি এক হাত থেকে অন্য হাতে নিচ্ছে আর লাফ মেরে অত্যন্ত নির্ভুলভাবে দ্রুত তলোয়ার চালাচ্ছে। বাম আর ডান, দুই হাতেই সমানতালে তলোয়ার চালাচ্ছে। তার চোখেমুখে পূর্ণ মনোযোগ এবং দৃঢ় সংকল্প ফুটে উঠেছে। সে অত্যন্ত চমৎকার এবং উচ্চপর্যায়ের দক্ষতা প্রদর্শন করছিল। ভারী তলোয়ার ধরা সরু হাতে যে প্রচণ্ড শক্তি আছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। তলোয়ার ঘুরাবার সময় বাতাসে সাঁই সাঁই শব্দ উঠছে। সবশেষে সে তলোয়ারটি এমনভাবে সামনে বাড়িয়ে ধরলো, যেন এটি পালকের মতো হালকা, ভারী কোনো ধাতু নয়। তারপর একটি হাতির দাঁতের মূর্তির মতো স্থির হয়ে দাঁড়াল।

জারাস নির্দেশ দিল, আরামে দাঁড়াও! সাথে সাথে দর্শকরা খুশিতে ফেটে পড়ে একযোগে হাততালি দিয়ে আর পা মাটিতে দাপিয়ে আনন্দ প্রকাশ করতে লাগলো। তারপর একটি কণ্ঠ তার নামের প্রতিটি অক্ষর আলাদা আলাদাভাবে উচ্চারণ করলো:

তে-হুঁ-তি! সাথে সাথে আর সবাই তার সাথে গলা মিলিয়ে ডেকে উঠলো, তে-হুঁ-তি!

তারপর শুরু হল সম্মিলিত কণ্ঠে স্তব। আমিও এই বীর বন্দনায় সামিল হলাম। তে-হুঁ-তি।

প্রশান্ত গাম্ভীর্য আর পদমর্যাদা ভুলে গিয়ে আমিও ওদের সাথে গলা মিলিয়ে স্তব শুরু করলাম।

.

পরিশেষে উত্তর থেকে একজন বার্তাবাহক উটে চড়ে ময়াগুহায় এলো। সে সেনাপতি রেমরেমের কাছ থেকে বার্তা নিয়ে এসেছে যে, দুই সপ্তাহ বিশ্রাম নেওয়ার পর তার অগ্রবর্তী দলটি জয়নাব মরুদ্যান থেকে সামনের দিকে যাত্রা শুরু করার জন্য প্রস্তুত হয়েছে।

সে জানিয়েছে সবকিছু ঠিক আছে। তার দলের কারও কোন ক্ষতি হয়নি কেবল একটি উট সে হারিয়েছে। সে আমাকে তাড়াতাড়ি জয়নাব মরুদ্যানের দিকে রওয়ানা হওয়ার জন্য আহ্বান জানিয়ে বলেছে মরুদ্যানটি এখন খালি এবং এর মাটির নিচের ঝরণা থেকে প্রচুর পানি এসে জলাধারটি পূর্ণ হয়েছে।

যথারীতি আমি জারাসকে নির্দেশ দিলাম, তবে শিবির উঠিয়ে সমস্ত মালামাল ভারবাহি পশুর উপর তুলতে দুইদিন লেগে গেল। এর ফাঁকে জারাসকে আমার তাঁবুতে ডেকে পোশাক খুলে তার ক্ষতটা পরীক্ষা করলাম। দেখলাম সে শারীরিকভাবে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়েছে। যে জায়গায় অস্ত্রোপচার করা হয়েছিল সেজায়গাটি ঘন কালো লোমে ঢাকা পড়ে অদৃশ্য হয়ে গেছে। সে আমাকে আশ্বস্ত করলো যে পেটের ভেতরে ক্ষত সৃষ্টি হলেও এখন তার পাকস্থলী ঠিক আগের মতো কাজ করছে। সেদিন সকালেই আমি দেখেছিলাম সে পুরো বর্ম পরে আর কাঁধে একটি বালুর বস্তা নিয়ে দশ লিগ লম্বা একটি দৌড় থেকে সবার আগে ফিরে এসেছিল।

বিকেলে সূর্যের তাপ কমে আসার পর আমরা ময়াগুহা থেকে যাত্রা শুরু করলাম। ক্ষয়িষ্ণ চাঁদের আলোয় পথ দেখে সারারাত চললাম। তারপর সকালে রোদের তাপ বেড়ে যাওয়ার পর আবার তাঁবু খাটালাম। ইতোমধ্যে বিশ লিগ দূরত্ব অতিক্রম করে এসেছি। মন প্রফুল্ল হল। নিজে বিশ্রাম নেবার আগে পুরো শিবিরের সবকিছু ঠিকঠাক আছে কিনা ঘুরে দেখলাম। আমি সবসময় অবাক হতাম শুধু দুএকটা ভালো কথায় কীভাবে দলের সবচেয়ে নিম্নস্তরের সদস্যও কি-রকম খুশি হয়। একজন মানুষ অনেক সময় ভুলে যায় যে, তার চেয়ে কম বুদ্ধিমান লোক তাকে কীরকম সম্মান করে।

কিন্তু রাজকীয় শিবিরে ফিরে আসার সাথে সাথে মনের সমস্ত প্রশান্তি ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। আসলে একটু দূর থেকেই আমি শোরগোল আর চিৎকার চেঁচামেচি শুনতে পাচ্ছিলাম। অবিরাম ক্রন্দন, কিছু হারাবার বিলাপ সবকিছু পরিষ্কার মরুর বাতাসে ভেসে আসছিল। সাথে সাথে ছুটতে শুরু করলাম, না জানি কী অঘটন ঘটেছে। নিশ্চয় কোন মৃত্যু কিংবা তেমন কোনো বিয়োগান্তক ঘটনা ঘটেছে।

রাজকীয় শিবির এলাকায় ঢুকে দেখলাম সমস্ত দাসদাসি আতঙ্কে হতভম্ব হয়ে রয়েছে। তারা আমার প্রশ্নের কোনো উত্তর দিতে পারলো না। ওদের বোকামী দেখে অধৈর্য হয়ে একজন নুবিয় পরিচারিকার কাধ ধরে ঝাঁকুনি দিয়ে তার স্বন্বিত ফেরাবার চেষ্টা করলাম, কিন্তু এতে কোনো কাজ হলো না। বরং চারপাশের হট্টগোল এখন একটি পাগলাগারদে পরিণত হল।

তাড়াতাড়ি আমি মেয়েটিকে ছেড়ে দিয়ে তাকে আশ্বস্ত করলাম যে, আমি তার সতীত্ব হানি করতে যাচ্ছি না, তারপর দ্রুত তেহুতির তাবুর দিকে গেলাম। তাঁবুর ঢোকার মুখে উচ্চস্বরে বিলাপরত বেশ কয়েকজন মেয়েকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে রাজকুমারীর কাছে পৌঁছলাম। সে তার বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে রয়েছে। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্নার দমকে তার পুরো শরীর কেঁপে উঠছিল।

আমার গলার আওয়াজ শোনার সাথে সাথে সে লাফ দিয়ে বিছানা থেকে উঠে আমার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়লো।

কী হয়েছে বাছা? কে মরেছে? এমন কী হয়েছে যে, তুমি কাঁদছো?

আমার আংটি! আমি আংটিটা হারিয়ে ফেলেছিনিশ্চয়ই কেউ এটা চুরি করেছে।

প্রথমে আমি তার কথা বুঝতে না পেরে বললাম, কোন আংটি?

আড়ষ্টভাবে আঙুলগুলো ছড়িয়ে বামহাত সামনে বাড়িয়ে বললো, আমার আংটিটা নেই। যেটা তুমি আমাকে দিয়েছিলে। সেই জাদুর হীরার আংটিটা, যেটা তুমি তামিয়াত দুর্গ থেকে আমার জন্য এনেছিলে।

সমস্যাটি তেমন গুরুত্ব নয় বুঝতে পেরে আমি বললাম, ঠিক আছে তুমি শান্ত হও। আমরা এটা খুঁজে বের করবো।

কিন্তু যদি খুঁজে না পাও? এটাই একমাত্র জিনিস যা আমি পৃথিবীতে সবচেয়ে ভালোবাসি। এটা হারিয়ে গেলে আমি আত্মহত্যা করবো।

প্রথমে এই মেয়েগুলোকে এখান থেকে তাড়াতে হবে, তারপর আমরা শান্তভাবে নিজেদের মধ্যে বিষয়টা নিয়ে কথা বলতে পারবো। হাতের ছড়ি আর মুখের সুন্দর ভাষা ব্যবহার করে ওদের সবাইকে তাবু থেকে বের করলাম। তারপর বিছানায় তেহুতির পাশে বসে ওর এক হাত ধরে বললাম,

এখন বল কখন, কোথায় এটা শেষ দেখেছ। আমার প্রশ্নটা শুনে সে একটু ভাবতে লাগলো। আমি তার মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলাম, এতো কান্নাকাটি, ফুপানো আর আত্মহত্যার হুমকি ইত্যাদি সত্ত্বেও তার সুন্দর চোখদুটো পানি শূন্য। এখন আমরা দুজন একা হওয়ার পর তাকে বেশ নিরুদ্বেগ মনে হচ্ছে। এমনকি মনে হচ্ছে যেন বিষয়টা সে বেশ উপভোগ করছে। সাথে সাথে আমার মনে সন্দেহ জাগলো।

বেশ নাটকীয় ভঙ্গিতে তার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠতেই সে বললো, হ্যাঁ, এবার ঠিক মনে পড়েছে! কোথায় হারিয়েছে এবার মনে পড়েছে। কাল বিকেলে ময়াগুহা ছেড়ে আসার আগে লক্সিয়াস, বেকাথা আর আমি শেষবারের জন্য জলাধারে সাঁতার কাটতে গিয়েছিলাম। মনে পড়েছে পানিতে নামার আগে আমি আংটিটা খুলে যে পাথরটার উপর সবসময় রাখতাম তার উপরে রেখেছিলাম। নিশ্চয়ই সেখানেই আংটিটা ফেলে এসেছি।

তার গুল মারা আর কল্পনার সাথে তাল মিলিয়ে বেশ গম্ভীরভাবে আমি জিজ্ঞেস করলাম, ঠিক বলছো তো? অন্য কোথাও ফেলোনি তো?

সাথে সাথে সে আমাকে আস্বস্ত করে বললো, হ্যাঁ, আমি নিশ্চিত। অন্য কোথাও অবশ্যই পড়েনি।

এবার আমি তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললাম, তাহলে তো ব্যাপারটা বেশ সহজ হয়ে গেল। তোমার দুশ্চিন্তা শেষ তেহুতি। আমি কর্নেল হুইকে ময়াগুহায় পাঠাবো। সে তার সবচেয়ে দ্রুতগামী ঘোড়ায় চড়ে সেখানে গিয়ে কাল সকালের আগে ফিরে আসতে পারবে।

একথায় সে হঠাৎ হতচকিত হয়ে গেল। সঙ্কটে পড়ে হাত কচলাতে কচলাতে বললো, কিন্তুনা, তুমি হুইকে সেখানে পাঠাতে পারবে না।

আমি সরলভাবে বললাম, কিন্তু কেন? হুইতো ভালো লোক।

সে একটু ইতস্তত করে তারপর বললো, জিনিসটা কোথায় ফেলে এসেছি সেটা হুইকে ঠিকমতো বুঝিয়ে বলতে পারবো না। হুই একজন বিদেশী। সে ভালোভাবে মিসরীভাষা বলতে পারে না।

আমি তার দিকে একদৃষ্টিতে তাকালেও সে আমার চোখে চোখ রেখে কথা বলতে পারছিল না। উচ্চারণ বিদেশি ঢংয়ের হলেও একটি পল্টনকে নেতৃত্ব দেবার মতো মিসরি সে ভালোই বলতে পারে। সে যে ওজর দেখিয়েছে আমি তা খন্ডন করা সত্ত্বেও তেহুতি বললো, আমি হুইকে বিশ্বাস করি না। মনে নেই সে কীভাবে আমাদের ছোট্ট বেকাথাকে নাজেহাল করেছিল। সে আংটিটা চুরি করে ফেলতে পারে। তাকে কোন কিছু দিয়ে আমি বিশ্বাস করতে পারি না।

তাহলে তোমার নিজেকেই ঐ গুহায় গিয়ে আংটিটা খোঁজ করা উচিত।

এতক্ষণ নিজে যে কথাটা সে ভাবছিল সেটার দিকে আমাকে ঠেলে দিয়ে এবার সে বেশ উৎসাহ নিয়ে বললো, আরে একথাটা তো আমি আসলেই ভাবিনি! তুমি ঠিকই বলেছো তায়তা। আমারই যাওয়া উচিত।

কিন্তু তুমি তো একা যেতে পারো না। তোমার সাথে আমার কাউকে পাঠাতে হবে। হুই তো অবশ্যই নয়, কেননা তুমি তো আবার বিদেশিদেরকে বিশ্বাস করো না। তারপর বিষয়টা নিয়ে একটু চিন্তা করার ভান করে বললাম, সেনাপতি রেমরেমকে পাঠানো যেত, কিন্তু সে তো এখন এখানে নেই। অন্য সময় হলে আমি যেতাম, কিন্তু আমার পিঠ ব্যথা করছে আর আমার বিশ্রাম নেওয়া দরকার। একথাটা বলে আমি কোমরের পেছনের দিকে হাত রেখে ব্যথায় কঁকিয়ে উঠলাম।

সে আমার দিকে উদ্বিগ্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো, আহা, আমার তায়তা! আমি আর তোমাকে শরীরে কোনো ধরনের কষ্ট নিতে দেবো না।

আমি বললাম, পেয়েছি পেয়েছি! ক্যাপ্টেন জারাসকে তোমার সাথে পাঠাব।

কথাটা শোনার সাথে সাথে সে চোখ নামিয়ে নিল। বুঝতে পেরেছে। আমি তাকে পরীক্ষা করছিলাম। এবার সে আমার দিকে তাকিয়ে ভান করা ছেড়ে দিয়ে হেসে উঠলো, তারপর আমার গলা জড়িয়ে ধরে ফিসফিস করে বললো।

আমি তোমাকে ভালোবাসি, সত্যি সত্যিই তোমাকে ভালোবাসি তায়তা।

আমিও তাকে জড়িয়ে ধরে ফিসফিস করে বললাম, ব্যাপারটা আরও পরিষ্কার হয় যদি সেই দুষ্টু আংটিটা আমার কাছে রেখে যাও, কারণ এবার হয়তো সত্যিই এটা তোমার আঙুল থেকে পড়ে যেতে পারে।

সে তার আস্তিনে হাত ঢুকিয়ে যখন আবার বের করলো তখন হাতটা মুষ্টিবদ্ধ ছিল। তবে নিরাপদ দূরত্বে রেখে বললো, এটা ছাড়া আর সবকিছু দিয়ে আমি তোমাকে বিশ্বাস করতে পারি।

তারপর মুঠোটা খুলতেই সেই বিখ্যাত হীরার আংটিটা তার তালুতে দেখা গেল।

যখন আমি ফিরে আসবো তখন এটা আমার হাতের আঙুলে থাকবে আর কখনও আঙুল থেকে খুলবো না। এটা সবসময় জারাসের প্রতি ভালোবাসার চিহ্ন হয়ে থাকবে। এমনকি কর্তব্যের খাতিরে যদি তাকে চিরদিনের জন্য ত্যাগ করতে হয়, তারপরও এই আংটি তার স্মৃতি হয়ে আমার কাছে থাকবে।

ঘন্টাখানেকের মধ্যে সে আর জারাস দুটো ঘোড়ায় চড়ে দক্ষিণদিকে ছুটে চললো। তাদের দেহরক্ষীদলও একটু পর তাদের অনুসরণ করলো।

কর্তব্য থেকে এ-ধরনের গহিত বিচ্যুতি আমার মনে একটু অপরাধ বোধ জাগাল। তারপর যখন মনে পড়লো আমার অতি প্রিয় দুইজন তরুণ মানুষকে খুশি হওয়ার সামান্য সুযোগ দিতে পেরেছি তখন মন থেকে এই অপরাধবোধ ভাবটি ম্লান হয়ে গেল।

.

আমি আশা করিনি যে ওই দুইজন খুব শিঘ্রই ময়াগুহা থেকে ফিরে আসবে। তবে ওরা আমাকে হতাশ করেনি। জয়নাব মরুদ্যানে প্রায় এক সপ্তাহ অপেক্ষা করার আগেই ওরা ফিরে এল।

আমার তাঁবুর সামনে পৌঁছে ঘোড়া থেকে নামার সময় তেহুতি ফিসফিস করে জারাসকে বললো, তুমি এখানে অপেক্ষা কর। আমাকে তার সাথে একা কথা বলতে হবে।

ওরা রৌদ্রে দাঁড়িয়েছিল আর তাই আমি যে তাঁবুর ছায়া থেকে ওদের লক্ষ্য করছিলাম, তা ওরা দেখতে পায় নি। সেজন্য তেহুতির ঠোঁট নড়া দেখে আমি তার কথা বুঝতে পারছিলাম।

সে দৌড়ে তাবুতে ঢুকলো। আমি তার দিকে এগিয়ে যেতেই সে খুশিতে অস্ফুট চিৎকার করে আমার বাহুর মাঝে এলো। তাকে জড়িয়ে ধরার পর আমি বুঝতে পারলাম এই অল্প সময়ের মধ্যেই সে অলৌকিকভাবে শৈশব অবস্থা থেকে পূর্ণ নারীতে পরিণত হয়েছে, অপরিশোধিত ধাতু থেকে রাজকীয় স্বর্ণ হয়েছে।

তাকে চেপে ধরেই আমি জিজ্ঞেস করলাম, যা খুঁজতে গিয়েছিলে তা কি পেয়েছো?

ও হ্যাঁ, পেয়েছি। এই কথা বলে তার হাতের মুঠো আমার সামনে খুলে ধরলো। হীরাটা চমকাচ্ছে, তবে তার চোখের মতো উজ্জ্বল নয়। আমি এটা ভালোবাসি, তবে গুহায় অন্য যে সম্পদ পেয়েছি তা আরও ভালোবাসি।

তারপর সে অকপটভাবে বললো, আমি তোমাকে সবকিছু খুলে বলবো। যা যা হয়েছে সব বলবো।

তাঁবুর ফাঁক দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখলাম বেচারি জারাস তখনও সেখানে চাপা আর লজ্জিত মুখ নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ঠিক একটি ছোট্ট ছেলের মতো যে, আপেল বাগানে আপেল চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়েছে আর এখন মার খাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে। আমি এটা নিয়ে আর কথা না বাড়িয়ে তাকে যেতে দিলাম।

পুরো শিবিরটি হাসি ঠাট্টায় ভরে গিয়ে এখন একটি আনন্দের জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমি বেশ অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম যে, জারাস আর তেহুতি বেশ সতর্কতার সাথে তাদের রোমান্সের বিষয়টি লুকিয়ে রেখেছে। মনে হল আমি ছাড়া সম্ভবত আর কেউ তা জানেনা। এমনকি বেকাথাও নয়। মনে বেশ পরিতৃপ্তি অনুভব করলাম যে, এই দুজনের ভালোবাসার আমি অভিভাবক হয়েছি। মনে পড়লো অনেক আগে তেহুতির বাবা-মার ব্যাপারেও একই ভূমিকা আমি পালন করেছিলাম।

জয়নাব মরুদ্যানে আমাদের বেশিদিন থাকা হয়নি। আমরা এগিয়ে চললাম। বিশাল এই ধু-ধু প্রান্তরে রেমরেম আর দলবল আমাদের জন্য যে পথ নির্দেশনা রেখে গিয়েছিল তা অনুসরণ করে সপ্তাহের পর সপ্তাহ চলতে লাগলাম। মরুভূমিতে এমন এক সৌন্দর্য আর মহিমা আছে যা, পৃথিবীর অন্য কোথাও নই। এই স্থান উত্তেজিত মনে প্রশান্তি এনে দেয় আর দেবতার কাছাকাছি আসার সুযোগ করে দেয়। এটা ছিল আমার জীবনের অত্যন্ত স্মরণীয় আর তৃপ্তিদায়ক একটি সময়।

এভাবে উত্তরে যেতে যেতে একসময় আমরা রেমরেম আর দলের অন্য অংশের দেখা পেলাম। পূর্ব পরিকল্পনামতো ইউফ্রেটিস নদীর কেবল দশ লিগ দক্ষিণে আমাদের দুই দলের মিলন হল। অবশ্য এতো কাছে যে এরকম বিশাল একটি নদী রয়েছে তার কোনো চিহ্ন এখনও দেখা যাচ্ছে না। এখনও আমাদের চারপাশ ঘিরে রয়েছে রুক্ষ পাথরের পাহাড় আর ধূলিধূসর রোদে পোড়া উপত্যকা।

আমাদের এক চোখওয়ালা পথ নির্দেশক, আল-নামজু এবার আমাদেরকে শেষ মরুদ্যানে নিয়ে এলো। এই জায়গাটির নাম ধ্রুস। এখানে পনেরোটি কূপ রয়েছে, সবগুলোতে পরিষ্কার মিঠে পানি। এখান থেকে একটি জনবহুল গ্রাম, একটি খেজুর বাগান আর অন্যান্য কৃষিখামারে পানি সরবরাহ করা হয়। আমাদের এতো বড় একটি কাফেলার কয়েকদিনের প্রয়োজন মেটাবার মতো যথেষ্ট পরিমাণ পানি এখানে রয়েছে।

এখানে শিবির স্থাপন করার কিছুক্ষণ পর আল-নামজু আমার সামনে এসে নতমস্তকে দাঁড়াল।

তারপর বললো, পরম শ্রদ্ধেয় প্রভু তায়তা। এখান থেকে ইউফ্রেটিস নদীর তীরে শালদিসে উর নগরীর কাফেলা চলার পথটিতে প্রচুর লোকচলাচল হয় আর এপথে পরিষ্কার দিক নির্দেশনা রয়েছে। নদীও কাছে। এপথে যেতে আপনাদের তেমন অসুবিধা হবে না।

সেক্ষেত্রে চুক্তি মোতাবেক উর পর্যন্ত পথ দেখিয়ে নিয়ে যেতে তোমারতো কোনো অসুবিধা হবার কথা নয় আল-নামজু, তাই না?

হে মহান প্রভু তায়তা। আপনার উপলব্ধি আর অনুকম্পার মিনতি করছি। আমার উর নগরীতে ঢোকার সাহস নেই, সেখানে আমার শত্রু রয়েছে। এখানকার আক্কাদিয়রা ভীষণ প্রতিহিংসাপরায়ণ আর বিপজ্জনক লোক। আমি আপনার কাছে প্রার্থনা করছি দয়া করে আমাকে এখানেই ছেড়ে দিয়ে দক্ষিণে জুবায় ফিরে যাবার অনুমতি দিন। সেখানে আমার বড় ছেলে হারানোর শোক পালন করবো। একথা বলার পর তার শূন্য চোখের কোটর থেকে এক বিন্দু চোখের পানি মুছলো। দৃশ্যটা দেখতে বেশ বিসদৃশ।

আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তাহলে কি তুমি চুক্তি মোতাবেক পুরো পারিশ্রমিক দাবী করছো? একথা শোনার সাথে সাথে সে আমার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো।

আপনি আমার বাবা এবং প্রভু। যা আপনার মর্জি। আমি একজন গরীব মানুষ, আমাকে আমার ছেলে হারুন আর তার পুরো পরিবারের ভরণ-পোষণ করতে হবে। এটা আমার দুর্ভাগ্য।

তার দুঃখদুর্দশার ফিরিস্তি শুনতে শুনতে তার অনুরোধটি বিবেচনা করলাম। এটা সত্যি যে সে একজন বিশ্বাসঘাতক ছেলের বাবা আর একটি ছেলে তার জনকের মতো একই ছাঁচে হয়ে থাকে। অন্যদিকে তার নিজের ছেলেকে হত্যা করতে আমি তাকে বাধ্য করেছিলাম। এতেই কি তার ঋণ শোধ হয়নি? নিজেকে জিজ্ঞেস করলাম। মনে হয় সে যথেষ্ট ভুগেছে।

চরিত্রগতভাবে আমি একজন দয়ালু মানুষ, তবে এটা হয়তো গুণের চেয়ে একটা দোষই হবে। আমি তাকে বললাম, তুমি আমাদের জন্য অনেক ভালো কাজ করেছে আল-নামজু। আমার আশীর্বাদ নিয়ে তুমি এবার যেতে পার। তারপর আমার থলে থেকে দুটি রূপার মেম মুদ্রা নিয়ে তার বাড়ানো হাতে তুলে দিলাম। তারপর সে আমার পায়ে চুমু খেয়ে চলে গেল।

চারদিন পর আমি শালদিসের উর নগরীর উপরে নিচু পাহাড়ে দাঁড়িয়ে এই প্রথমবারের মতো নিচে নগর আর সবুজ ইউফ্রেটিস নদীর দিকে তাকালাম। এই নদীটি যে আমাদের মা নীল নদের চেয়েও চওড়া এই সত্যিটি উপলব্ধি করতে পেরে আমি একটু বিরক্তি বোধ করলাম। কেননা এর আগে আমি মনে করতাম নীল নদই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় নদী।

ইউফ্রেটিস নদীর দুই তীরে যতদূর চোখ যায় গভীর বনানী দেখা যাচ্ছে। বন কেটে বড় বড় কৃষি জমি তৈরি করা হয়েছে। রুক্ষ মরুভূমি পার হওয়ার পর প্রচুর গজিয়ে উঠা এই বিশাল শ্যামলিমা দেখে আমার মন ভরে গেল। আমি যেখানে দাঁড়িয়েছিলাম ঠিক তার নিচেই নদীর তীরে উর নগরীর অবস্থান। এর ঠিক কেন্দ্রস্থলে রয়েছে ইশতার দেবীর বিশাল মন্দির। ইনি সুমেরিয় আর আক্কাদিয়দের প্রধান দেবী। এটি একটি পিরামিড আকৃতির ইমারত। একটির উপর একটি পাঁচটি চত্বর ধাপে ধাপে উপরের দিকে ছোট হয়ে চলে গেছে। এটি শুধু একটি মন্দির নয়, বন্যার সময় যখন নদীর কূল ছাপিয়ে নগরী আর আশপাশের সবজায়গা প্লাবিত হয়ে যায় তখন মন্দিরের পুরোহিত আর যাজিকারা এখানে আশ্রয় নেন।

আমরা নগরীর দিকে রওয়ানা দিলাম। দলের সবার আগে রেমরেম আর রাজকুমারীদের নিয়ে আমি ঘোড়ায় চড়ে চললাম। পাহাড়ের পাদদেশে পৌঁছার আগেই লাল কাদামাটির ইটের তৈরি শহরের প্রধান ফটকের ভেতর থেকে একদল নারী পুরুষ পুরোহিত আমাদের অভ্যর্থনা জানাতে সামনে এগিয়ে এলো।

নদীর উজানে ব্যবিলন আর মাত্র একশো বিশ লিগ সামনে রয়েছে। সবেমাত্র বিশাল মরুভূমি পার হয়ে এসেছি, আর এখুনি রাজা নিমরদের রাজধানীতে পৌঁছাতে চাচ্ছিনা। আমি চাই আমাদের সম্পদ আর জাঁকজমক দেখিয়ে সুমেরিয়দের মাত করে দিতে। দীর্ঘ সফরের ক্লান্তির পর আমাদের চেহারার যে অবস্থা হয়েছে তাতে পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ এবং সম্পদশালী রাষ্ট্রের প্রতিনিধির বদলে আমাদেরকে মরুভূমির একটি বেদুঈন যাযাবরের দল মনে হচ্ছে।

শোভাযাত্রাটি কাছে আসতেই আমি সামনের সারিতে পুরোহিত আর যাজিকাদের মাঝে রাষ্ট্রদূত ফাট তুরকে দেখেই চিনতে পারলাম। ফাট তুর হচ্ছেন সুমেরিয়ায় মিসরের রাষ্ট্রদূত। তার বর্তমান পদে আসার অনেক আগে থেকে আমরা পরস্পরকে চিনতাম। একজন পরিশ্রমী আর বিশ্বস্ত রাজকর্মকর্তা। সুতরাং আমি নিশ্চিত হলাম যে, ব্যবিলনে আমাদের পৌঁছার জন্য সমস্ত বন্দোবস্ত ঠিক মতোই করা হয়েছে। তাকে স্বাগত জানাবার জন্য আমি ঘোড়ার পিঠ থেকে নামলাম। তারপর দুজনে একসাথে নগরীর ফটকের দিকে হাঁটতে হাঁটতে পুরোনো বন্ধুর মতো কথা বলে চললাম।

আপনার অনুরোধ মতো নদীপথে যাওয়ার জন্য আমি দশটি বড় আর আরামদায়ক বজরা ভাড়া করেছি। যাত্রার জন্য আপনি যখনই তৈরি হবেন তখনই এই বজরাগুলো রাজকুমারী আর আপনার প্রতিনিধি দলের বর্ষীয়ান সদস্যসহ আপনাকে নিয়ে নদীর উজানে ব্যবিলনের দিকে রওয়ানা দেবে। স্বভাবতঃ আমিও আপনাদের সাথে যাবো। তবে অত্যন্ত সম্মানের সাথে আমি আপনাকে জানাতে চাই, কাফেলার বড় অংশটির আগেই হাঁটাপথে ব্যবিলনে পৌঁছে সেখানে আপনার আগমনের জন্য অপেক্ষা করা উচিত।

ফাট তুর সেই বিশাল জিগুরাট অর্থাৎ সিঁড়ি-পিরামিড আকৃতির মন্দির এলাকায় আমাদের থাকার ব্যবস্থা করেছিল। সেখানে পৌঁছে সবাই স্থির হতে না হতেই সূর্যাস্তের সময় হল। থিবস থেকে যেসব সুন্দর পোশাক-আশাক, অলংকার ইত্যাদি সাজগোজের জিনিসগুলো আনা হয়েছে, আমি রাজকুমারী আর মেয়েদেরকে এবার সেগুলো বাক্স থেকে বের করতে বললাম। ব্যবিলনে রাজা নিমরদের দরবারে হাজির হওয়ার প্রস্তুতি হিসেবে ওরা এবার পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন আর ফিটফাট হওয়ার সুযোগে পেয়েছে।

রাজকুমারীদেরকে বুঝিয়ে বললাম, ওদের সাজসজ্জা আর সুন্দর চেহারা দিয়ে রাজা নিমরদ আর ক্রিটের রাষ্ট্রদূতকে মুগ্ধ করে দেওয়াটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। কেননা এই রাষ্ট্রদূতই আবার সমস্ত বিষয় তার প্রভু সর্বাধিরাজ মিনোজের কাছে তুলে ধরবে।

সুবিশাল মন্দির চত্বরে বসে তারাভরা আকাশের নিচে ফাট তুর আর রেমরেমের সাথে নৈশভোজ করলাম। সকালেই ইউফ্রেটিস নদী থেকে ধরা এক হাত লম্বা পার্চ মাছ দিয়ে উদর পূর্তি করলাম। সেই সাথে নদীর তীরবর্তী বাগানের আঙুর চোলাই করে তৈরি করা লাল মদ পান করলাম।

খাওয়াদাওয়ার পর আমাদের মূল উদ্দেশ্য–হাইকসোদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের পরিকল্পনার আলোচনায় মনোযোগ দিলাম।

আপনারা জান