ইথিওপিয়ার পরে ওকে আর অবজ্ঞা করার সাহস নেই কারো। পরের ফ্লাইটেই রামোনের কাছে পৌঁছে গেল নিকোলাস আর আদ্রা।
আইলুশিনের র্যাম্প বেয়ে ছেলেকে নেমে আসতে দেখে উদ্বেল হয়ে উঠল রামোনের বুক। মাথা উঁচু করে চোখ ভর্তি আগ্রহ নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নামছে, ওর ছেলে। বাবাকে দেখে দাঁড়িয়ে গেল।
সানগ্লাসের পেছনে চোখ লুকিয়ে সৈন্যদের ভিড়ে দাঁড়িয়ে থেকে বহুক্ষণ ধরে ছেলেকে দেখল রামোন। কিন্তু উদ্ধত মন কিছুতেই এই অনুভূতিকে স্বীকার করতে রাজি নয়। “ভালোবাসা” শব্দটা নিয়ে মোটেই কোনো আগ্রহ নেই তার।
এরপরই ওকে দেখতে পেল নিকোলাস। প্রথমে দৌড় শুরু করলেও খানিক পরেই থেমে গেল। ঢেকে ফেলল অনিন্দ্য সুন্দর মুখখানাতে ফুটে উঠা আনন্দ। ভাবলেশহীন মুখে হেঁটে এলো রামোনের জিপের কাছে।
“গুড ডে পাদ্রে,” নরম স্বরে বলে উঠল নিকোলাস, “কেমন কাটছে। তোমার দিন?”
হঠাৎ করেই ইচ্ছে হল বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরে ছেলেকে; কিন্তু নিশ্চল হয়ে বসে রইল রামোন। খানিক বাদে কেবল হাত মেলালো।
বাবার পাশের সিটে উঠে বসল নিকোলাস। গেরিলা ক্যাম্প পার হয়ে চলে এলো কম্পাউন্ডে। আগ্রহ নিয়ে সবকিছু দেখছে নিকোলাস। বেশ দ্বিধা নিয়ে বলে উঠল- প্রথম প্রশ্ন,
“এখানে এত মানুষ কেন? ওরাও কি আমাদের মতো বিপ্লবের পুত্র, পাছে?”
রামোন বিরক্ত না হওয়ায় সাহস পেয়ে গেল নিকি। এবারেও উত্তর পাওয়ায় বেশি সহজ হয়ে গেল ওর আচরণ।
জিপ থেকে রাস্তার সবাই স্যালুট করতেই নিজের সিটে শক্ত হয়ে গেল নিকোলাস; তারপর আবার সেও স্যালুট করে ফিরিয়ে দিল উত্তর। অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে হেসে ফেলল রামোন। হেসে ফেলল বাকিরাও।
কম্পাউন্ডে ফেরার পর দ্রুত কয়েকটা মেসেজের কিনারা করে আদ্রা আর নিকোলাসের জন্য বরাদ্দ করা কুঁড়েঘরে গেল রামোন। এতক্ষণ উত্তেজিত হয়ে গল্প করলেও ওকে দেখে থেমে গেল নিকি। সর্তক চোখে বাবার দিকে তাকিয়ে রইল। “তোমার বাথিং সুট এনেছ?” জানতে চাইল রামোন।
“হ্যাঁ, পাদ্রে।”
“গুড। চট করে পরে নাও। আমরা একসাথে সাঁতার কাটব।”
একসাথে সাঁতার কাটা শেষ করে পাথরের উপর উঠে বসল পিতা-পুত্র। গল্প করার ছলে খুব সাবধানে ছেলেটাকে পরখ করে দেখল রামোন। বয়সের তুলনায় যথেষ্ট লম্বা আর শক্তিশালী নিকির কথা বলার টঙ একেবারে পূর্ণবয়স্ক মানুষের মতন।
বারান্দাতে বসে একসাথে ডিনার করল দু’জনে। বহুদিন পর পেট পুরে খেল আদ্রা’র রান্না। পানি মিশিয়ে নিকোলসাকে হাফ গ্লাস ওয়াইনও দিল। বেশ বড় বড় ভাব নিয়ে চুমুক দিয়ে খেল নিকোলাস।
এবারে আদ্রা ঘুমাতে নিয়ে যাওয়ার জন্য আসলে বিনা বাক্য ব্যয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেও চলে এলো বাবার কাছে।
“এখানে এসে আমার অনেক ভাল লাগছে, পাদ্রে?” ফর্মালি হাত বাড়িয়ে দিল নিকি।
হাত বাড়িয়ে দিতেই বুকর ভিতর রীতিমতো ঝড় অনুভব করল রামোন।
সপ্তাহখানেকের ভেতর টার্মি ক্যাম্পের সবার আদর কেড়ে নিল নিকোলাস। কয়েকজন এএনসি প্রশিক্ষক পরিবার নিয়ে বাস করাতে তাদেরই একজনের স্ত্রী ক্যাম্পের বাচ্চাদের জন্য স্কুল খুলে বসল। নিকি’কেও পাঠিয়ে দিল রামোন।
সাথে সাথেই বোঝা গেল যে নিকোলাস নিজের চেয়েও তিন চার বছরের বড় বাচ্চাদের মতনই বুদ্ধিমান। ইংরেজি এখানে শেখানের ভাষা হওয়াতে দ্রুত রপ্ত করে নিল নিকোলাস। আর সাথে করে নিয়ে আসা সকার-বলটার কল্যাণে সঙ্গীদের মাঝে প্রেস্টিজও বেড়ে গেল। কর্নেল জেনারেল রামোন মাচাদোর নির্দেশে স্কুলেই তৈরি করা হলো ফুটবল খেলার জায়গা আর গোল পোস্ট। নিকোলাসের দক্ষতা দেখে ওকে পেলে পেলে ডাকতে শুরু করল সকলে আর রোজকার ম্যাচে তো প্রতিদিনের দৃশ্য হয়ে উঠল।
জেনারেলের পুত্র হিসেবে সবকিছুতে বাড়তি খাতির পায় নিকোলাস। অস্ত্র নাড়াচাড়া করতেও বাধা দেয় না প্রশিক্ষকের।
একে ‘৪৭ অ্যাসল্ট রাইফেল সম্পর্কে নতুনদেরকে শিক্ষা দেয় নিকি আর গর্বিত ভঙ্গিতে তাকিয়ে দেখে রামোন; কেমন করে বিশটার মাঝে বারো রাউন্ড নিশানা মতো লাগাতে পারে নিকোলাস।
রামোনের অজান্তেই নিকিকে জিপ চালানো শিখিয়েছে কিউবা ড্রাইভার জোসে। জানতে পারে যখন কুশনের উপর বসে জিপ চালিয়ে বাবাকে এয়ারস্ট্রিপে নিয়ে যায় নিকি।
তাদের গাড়ি দেখলেই “ভাইভা পেলে!” বলে চিৎকার জুড়ে দেয় দু’পাশের লোকেরা।
ক্যাম্পের টেইলার নিকোলাসকে ক্যামোফ্লেজ কমব্যাট পোশাক আর কিউবান স্টাইলের নরম টুপি বানিয়ে দিল। বাবার মতই এক চোখের উপর খানিকটা হেলিয়ে টুপি পরে নিকি। রামোনের আনঅফিসিয়াল ড্রাইভার নিকোলাস বাবার প্রতিটি হাবভাব যেন নকল করে;
মাঝে মাঝে বিকেল বেলা পঞ্চাশ হর্সপাওয়ার আউটবোর্ড মটরঅলা নৌকাটাকে নিয়ে চলে যায়, নীল আটলান্টিকের শৈলশিরায় মাছ ধরতে। হ্যান্ড লাইনস ব্যবহার করে কোরালের মাছ ধরে। ময়ূরকণ্ঠী নীল, সবুজ, হলুদ আর উজ্জ্বল লাল রঙা মাছগুলো মাঝে মাঝে এত বড় হয় যে পানি থেকে টেনে তুলতে নিকোলাসকে সাহায্য করে রামোন। কিন্তু কারো সহায়তা নিতে চায় না। নিকি। এমনকি বাবা’র সাহায্যও না আর দিন শেষ হয়ে গেলেও ওর মাছ ধরার নেশা যায় না। “আরেকটা পাত্রে জাস্ট একটা,” অবশেষে জোর করে বঁড়শি কেড়ে নেয় রামোন।
