“যাও।” ইশারায় দরজা দেখিয়ে দিতেই ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে মেঝের উপর হামাগুড়ি দিয়ে চলে গেল বাইরে।
কমব্যাট বুট পরিহিত পা দিয়ে দরজাটা আটকে দিল রামোন।
“নেগাস নেগাস্তি, রাজাদের রাজা রামোনের গলা শুনে নড়ে উঠল বিছানায় শুয়ে থাকা বৃদ্ধ।
কংকালসার এই দেহের সুস্থ চেতনা সম্পর্কে ভালই জানে রামোন। টলটল করছে পরনের সাদা আলখাল্লা। মোমের মতো দেহত্বক ভেদ করে দেখা যাচ্ছে প্রতিটা হাড়। প্লাটিনামের মতো জ্বলজ্বল করছে বহুদিনের নাকাটা চুল আর দাড়ি। উজ্জ্বলতা ছড়াচ্ছে নবিদের মতো বড় বড় ঘন কালো চোখ জোড়া।
“আমি তোমাকে চিনেছি।” মোলায়েম স্বরে জানালেন সম্রাট হালি সেসি।
“আমাদের কখনো দেখা হয়নি। শুধরে দিল রামোন।
“তারপরেও আমি জানি তুমি কে। আমি তোমার গন্ধ চিনি। তোমার চেহারার প্রতিটি রেখা, কণ্ঠস্বরের গভীরতা সব আমি জানি।”
“তাহলে বলুন, আমি কে?”
“তোমার নাম মৃত্যু।”
“আপনি তো বেশ জ্ঞানী” কথা বলতে বলতে বিছানার দিকে এগোল রামোন।
“আমার সাথে যা করেছ তার জন্য তোমাকে ক্ষমা করে দিলাম” জানালেন ইথিওপিয়ার সম্রাট হালি সেলসি, “কিন্তু আমার জনগণের সাথে যা করেছ তার জন্য কখনোই তোমাকে মাফ করব না।”
“ঈশ্বরের কাছে নিজেকে সঁপে দিন বুড়ো।” বিছানার উপর থেকে বালিশ তুলে নিল রামোন, “দুনিয়া আপনার জন্য নয়।”
বুড়োর মুখে বালিশ চেপে ধরল রামোন।
ফাঁদে আটকে পড়া পাখির মতো ছটফট শুরু করলেন হালি সেলসি। লাথি মারতে শুরু করতেই আলখাল্লা উঠে এলো হাঁটুর উপরে। আস্তে আস্তে দুর্বল হয়ে পড়ল শুকিয়ে যাওয়া সিগারেটের মতো দুটো পা।
তারপরেও আরো পাঁচ মিনিট পর্যন্ত বালিশের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয় রইল রামোন। ভেতরে ভেতরে অনুভব করল একধরনের ধর্মীয় পরমানন্দ। ঠিক যেন তার সিদ্ধিলাভ হয়েছে। এতটা সন্তুষ্টি আর কখনো কোনো কাজেই পায়নি আগে।
এইমাত্র একজন রাজাকে খুন করেছে।
সোজা হয়ে সরিয়ে ফেলল হাতের বালিশ। আলখাল্লাটাকে সুন্দর করে পা পর্যন্ত নামিয়ে দিয়ে ছোট্ট হাত দুটোকে বুকের উপর ভাজ করে বসিয়ে দিল। এরপর বুড়ো আঙুল দিয়ে স্পর্শ করে নামিয়ে দিল চোখের পাতা।
কী ভেবে যেন বহুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে দেখল মৃত সম্রাটের চেহারা। বুঝতে পারল এটা তার জীবনের অন্যতম সন্ধিক্ষণ। পৃথিবীতে যা যা কিছু ও ধ্বংস করতে চায় তার প্রতীক হলো এই কংকালসার দেহ।
তাই সারা জীবনের জন্য ধরে রাখতে চাইল এই স্মৃতিচিহ্ন।
***
সম্ভাব্য সকল বিরুদ্ধমতই ধ্বংস হয়ে গেছে। মৃত্যুবরণ করেছে ব্রুটাসের পুত্রেরা। বিপ্লব এখন তাই সম্পূর্ণ নিরাপদ।
এবারে আফ্রিকার অন্যান্য বিষয়ের দিকে মন দিতে হবে। তাই ইথিওপিয়া। সরকারের সামরিক পরামর্শকের পদটি হস্তান্তর করে দিল জার্মান ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিকের এক সিকিউরিটি পুলিশের হাতে; যে কিনা প্রায়ই রামোনের মতই দক্ষ হাতে সিধে করতে পরে অবাধ্য জনগণ।
আবিবি’কে জড়িয়ে ধরে আবারো আইনুশিনে চড়ে বসল রামোন। গন্তব্য টার্সিও বেস। নীল আটলান্টিকের বুকে সূর্য ডুবে যেতে না যেতেই পৌঁছে গেল রামোন।
এয়ারস্ট্রিপ থেকে হেডকোয়ার্টার পর্যন্ত যেতে যেতে তার অনুপস্থিতিতে ঘটে যাওয়া সব সংবাদ জানিয়ে দিল রালেই তাবাকা।
খড়ের ছাদঅলা রামোনের প্রাইভেট কোয়ার্টারটা দেখতে অত্যন্ত সুন্দর হয়েছে। মেঝে কার্পেট শূন্য হলেও স্থানীয় কাঠুরেদের তৈরি আসবাবগুলো বেশ আরামদায়ক। আধুনিক বলতে একমাত্র লাগানো হয়েছে ইলেকট্রনিক কম্যুনিকেশন ইকুমেন্ট। মস্কো, গুয়ান্ডা, লিসবন আর হাভানার সাথে সরাসরি স্যাটেলাইট লিঙ্ক স্থাপন করা হয়েছে।
ভেতরে পা দেবার সাথে সাথে মনে হলো আপন ঘরে পৌঁছে গেছে। রালেই তাবাকা চলে যাবার সাথে সাথেই কমব্যাট ইউনিফর্ম খুলে ফেলে মশারীর ভেতরে ঢুকে পড়ল রামোন। খোলা জানালা দিয়ে উষ্ণ বাতাস এসে পরশ বুলিয়ে দিল নগ্ন দেহে।
কঠিন একটা কাজ অত্যন্ত দক্ষতা আর সফলতার সাথে শেষ করলেও এখনো ঠিক যেন তৃপ্তি পাচ্ছে না। মোজার্ট কিংবা মাইকেল এনজেলো’কেও ছাড়িয়ে গেছে ওর সৃষ্টি। কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করেছে একটা দেশ আর এর জনগণ, পর্বত, উপত্যকা, নদী, লেক, সমভূমি আর হাজার হাজার মানুষ, রক্ত, ধোঁয়া আর গুলি থেকে গড়ে তুলেছে মাস্টারপিস। এই দুনিয়াকেই ঈশ্বর মানে রামোন। আর রামোন তাঁর দূত। কাজ তো সবে শুরু হয়েছে। প্রথমে একটা দেশ, তারপর আরেকটা, অন্য একটা; এভাবে পুরো মহাদেশ।
কিন্তু হঠাৎ করেই মনে এলো সম্পূর্ণ ভিন্ন এক প্রসঙ্গ। হতে পারে এটা কুঁড়ে ঘর, বাতাস কিংবা সমুদ্রের গর্জনের জন্য-যেটাই হোক না কেন; মনে পড়ে গেল নিকোলাসের কথা। ঘুমের মাঝে ছেলেকে স্বপ্নেও দেখল রামোন। লাজুক হাসি ওর কণ্ঠস্বর…জেগে উঠার পর তো মনে হল কিছুতেই আর তর সইছে না। খানিকক্ষণের জন্যে হাভানা আর মস্কো থেকে পাওয়া কোডেড মেসেজ নিয়ে ভুলে থাকলেও কাজ শেষে খোলা জানালা দিয়ে বাইরে তাকাতেই কল্পনায় ভেসে এলো রোদে পোড়া ছোট্ট একটা দেহ।
হতে পারে-আদ্দিস আবাবা’র রাস্তায় দেখা মৃতদেহ কিংবা আবুনা’র পুত্রদের নির্যাতনের চিত্র থেকেই জন্ম নিয়েছে এ অবসেশন। কিন্তু টার্সিও বেস ছেড়ে এখন নড়ার উপায় নেই। বল গড়াতে শুরু করেছে; হাতে প্রচুর কাজ বাকি। তাই হাভানাতে স্যাটেলাইট মেসেজ পাঠিয়ে দিল। ঘণ্টাখানেকের মাঝে উত্তরও চলে এলো।
