“তেষট্টি জন।”
“তাহলে বিপ্লবকে নিরাপদ করার জন্য এখনো বহু কিছু করতে হবে।”
রেডিও নিয়ে কর্নেল টাফুকে মেসেজ পাঠালো, আবিবি। নির্দেশ দিল যেন ডার্গের মেইন বিল্ডিংকে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলা হয়। সেনাবাহিনীর অন্যান্য অংশকে নির্দেশ দেয়া হলো সমস্ত বিদেশি দূতাবাস আর কনস্যুলেটগুলোকে বন্ধ করে দেয়ার জন্যে।
দেশের মাঝে অবস্থানরত সমস্ত বিদেশি বিশেষ করে সাংবাদিক আর টেলিভিশন পার্সোনেলদেরকে তৎক্ষণাৎ এয়ারপোর্টে নিয়ে যাওয়া হলো প্লেনে তুলে দেয়ার জন্য। যা ঘটবে তার কোনো প্রত্যক্ষদর্শী থাকা চলবে না।
আবিবি’র সবচেয়ে বিশ্বস্ত কয়েকজন সৈন্যের ছোট্ট একটা ইউনিট আর কিউবান প্যারটুপাররা মিলে ঢুকে পড়ল মিলিটারি কাউন্সিলে আর ডার্গের সেসব সদস্যদের বাড়িতে যারা আনদোমকে ভোট দিয়েছিল। হেঁটে হিঁচড়ে অপেক্ষমাণ ট্রাকে তুলে সকলকে নিয়ে আসা হলো মেইন অ্যাসেম্বলি চেম্বারের বিপ্লবী আদালতে। দালানের উঠানে ফায়ারিং স্কোয়াড একের পর এক নিশ্চিহ্ন করে দিল সকলকে।
সবকটি মৃতদেহের পা একসাথে করে বেঁধে টেনে নিয়ে ভোলা হলো ট্রাকের উপরে। তারপর রাস্তা ধরে ট্রাক চলে গেল শহরের বাইরের ডাস্টবিনে।
“জনগণকে বিপ্লবের ন্যায়বিচার আর অবাধ্যতার শাস্তি কিরূপ তা দেখাতে হবে।” এহেন প্রদর্শনীর প্রয়োজন বুঝিয়ে বলল রামোন।
মৃতদেহ না সরানোর পক্ষে এবং পরিবারের সদস্যদের কোনোপ্রকার শোক পালনের বিপক্ষে আদেশ জারি করল কোর্ট।
মাঝরাত পর্যন্ত চলল এই হত্যাযজ্ঞ। কিন্তু অসম্ভব পরিশ্রান্ত হওয়া সত্ত্বেও ঘুমোবার ফুরসৎ পেল না রামোন কিংবা ভবিষ্যৎ প্রেসিডেন্ট। রেডিওর পাশে বসে রিপোর্ট শুনতে শুনতে নিজের প্যাকের ভদকা আবিবি’কে এগিয়ে দিল রামোন।
সকাল নাগাদ এয়ারপোর্ট, রেলওয়ে স্টেশন, রেডিও-টেলিভিশন ব্রডকাস্টিং-স্টুডিও, মিলিটারি দুর্গ আর ব্যারাক সমস্ত কিছু নিজেদের দখলে নিয়ে নিল আবিবির বিশ্বস্ত অফিসারদের দল। এরপরই মাত্র কয়েক ঘণ্টা ঘুমালো দু’জনে। কিন্তু দুপুরের মাঝেই আবার ইউনিফর্ম পরে তৈরি হতে হল ডার্গের মিটিংএর জন্যে।
আবিবিকে কনগ্রাচুলেট করতে গিয়ে কর্নেল জেনারেল মাচাদো বলে উঠল, “যদি তুমি ব্রুটাসকে মেরে ফেলো তাহলে তার ছেলেদেরকেও মেরে ফেলতে হবে। ১৫১০ সালে নিকোলো মেকিয়াভেলী বলে গেলেও আজও এটা সমান তাৎপর্যপূর্ণ, মিঃ প্রেসিডেন্ট।”
“তার মানে এখনি শুরু করতে হবে।”
“হ্যাঁ।” একমত হল রামোন।”
“রেড টেরর’কে থামতে দেয়া যাবে না।”
***
“দ্য রেড টেরর শ্যাল ফ্লারিশ” শহরের প্রতিটি রাস্তার কোণায় কোণায় টাঙ্গিয়ে দেয়া হলো চার ভাষায় লেখা, তাড়াহুড়া করে প্রিন্ট করা শোস্টার।
“জানি কারা পরবর্তীতে খাঁটি মার্কসিজমকে অবজ্ঞা করে বসবে। তাই এখনই তাদেরকে উপরে ফেলতে হবে।” টুপি খুলে মাথার ঘন কালো কোকড়া চুলে আঙুল ঢুকিয়ে দিল রামোন মাচাদো। শারীরিক অবসাদ সত্ত্বেও একটুও দিশেহারা হয়নি ভয়ংকর সবুজ চোখ জোড়া। এই দৃঢ় প্রতিজ্ঞা দেখে মুগ্ধ হয়ে গেল আবিবি।
“শুধু বিরোধিতাকারীদেরকে নয়। বরঞ্চ বিরুদ্ধ মতকেও সমূল্যে উৎপাটন করে ফেলতে হবে। যেন আত্মমর্যাদার কোন বোধই-অবশিষ্ট না থাকে। আর তখনই-একদম নতুন করে দেশকে পুনর্নির্মাণ করে তোলা সম্ভব হবে।” রাস্তার মোড়ে মোড়ে জমে উঠল লাশের পাহাড়। এমনকি গলিতে খেলতে থাকা শিশুদেরকে তুলে নিয়েও বাবা-মায়ের সামনেই হত্যা করা হলো।
কয়েকজন বৃদ্ধ সৈনিক আর তাদের পরিবার-পার্বত্য অঞ্চলে লুকিয়ে পড়লেও এড়াতে পারল না ডেথ স্কোয়াড। পুরো গ্রাম ঘিরে ফেলল ট্যাংক। মাঠে নিয়ে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়তে বাধ্য করা হলো পুরুষদেরকে। গায়ের উপর দিয়ে চলে গেল যান্ত্রিক দানব। খরা শুকিয়ে যাওয়া মাটিতে মিশে গেল মৃতদেহের পেস্ট।
“এবারে সময় হয়েছে ধর্ম প্রচারকদের মোকাবেলা করা।” ঘোষণা করল রামোন।
“রাজতন্ত্রকে উৎখাতের ব্যাপারেও কাজ করেছে এরাই।” মনে করিয়ে দিল আবিবি।
অমানুষিক নির্যাতন করে মেরে ফেলা হলো এদের পুত্র-কন্যাদেরকে।
“ব্রুটাসের সমস্ত ছেলেরাই মৃত্যুবরণ করেছে।” রামোনকে জানাল আবিবি।
“না, সবাই নয়।” রামোনের কথা শুনে হা করে তাকিয়ে রইল নতুন প্রেসিডেন্ট।
“এখন আর ফিরে আসার কোনো পথ নেই; ঠিক যেমনটা হয়েছিল রাশান সেলারে, জার-নিকোলাস আর তার পরিবারের সাথে কেবল তখনই নিরাপদ হবে বিপ্লব।”
“কে করবে?” কোনো দ্বিধা ছাড়াই উত্তর দিল রামোন, “আমি।”
“এটাই সবচেয়ে ভাল হবে। নিজের স্বস্তি লুকাতে অন্যদিকে তাকাল আবিবি। “যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সেরে ফেলুন।”
একা একটা খোলা জিপ চালিয়ে শহরের পুরোন অংশে চলে এলো। রামোন। মৃতদেহ পচনের গন্ধে রাস্তা দিয়ে চলা দায়। মানুষ নয়, শহরের জীবন্ত প্রাণী হিসেবে কেবল কাক আর শকুন চিলদের দেখা মিলেছে।
সিল্কের স্কার্ফ মুখে, মাথায় পেঁচিয়ে ভাবলেশহীন মুখে এগিয়ে চলল বিজয়ী জেনারেল।
কুঁড়েঘরটার সদর দরজায় দাঁড়িয়ে আছে দু’জন গার্ড। রামোনকে দেখে চিনতে পেরে সাথে সাথে স্যালুট করল।
“আজকের মতো তোমাদের ডিউটি শেষ। এখন যাও।” আদেশ দিল রামোন।
দরজা খোলার আগে নিশ্চিত হয়ে নিল যে গলির শেষ মাথায় উধাও হয়ে গেছে গার্ড দু’জন। আলো আধারী মাখা রুমটাতে ঢুকে সানগ্লাস খুলে ফেলল রামোন। পুরো রুমে ছড়িয়ে আছে অসুস্থতার গন্ধ। বিছানার উপর ঝুলছে একটা রুপার কপাটিক ক্রস। মেঝেতে বসে থাকা এক নারী রামোনকে দেখে মাথায় কাপড় দিল।
