বানরের মতো দাড়ি বেয়ে উঠে সেকেন্ডের ভেতরেই জনা ত্রিশেক প্যারাট্রুপার নেমে গেল প্রাসাদের বাগানে। অটোমেটিক ফায়ার আর গ্রেনেড ফাটার আওয়াজ কানে আসার একটু পরেই খুলে গেল কাঠের দরজা। জিপ নিয়ে আগে বাড়ল রামোন।
আঙ্গিনাতে ছড়িয়ে আছে প্রাসাদের গার্ডদের মৃতদেহ। ড্রাইভারের সিটের উপর রাখা ৫০ ক্যালিবার ব্রাউনিং হেভিমেশিন গানের পিছনে গিয়ে দাঁড়ালো রামোন। শুইয়ে দিল ভুট্টা খেতে দৌড়াতে থাকা খরগোশদের মতো পলায়ন পর গার্ডদেরকে।
কিন্তু হঠাৎ করেই হাঁটু গেড়ে বসে আর পি জি ৭ রকেট লঞ্চার তুলে নিল এক গার্ড।
জিপের দিকে নিশানা করতেই ব্রাউনিং ঘুরিয়ে নিল রামোন। ঠিক সেসময় পড়ে থাকা মৃতদেহে আটকে গেল জিপের চাকা। ফলে এইম হারিয়ে ফেলল রামোন।
হুশ করে এগিয়ে এসে জিপের মাঝখানে রেডিয়েটরে ধাক্কা খেল রকেট। বিস্ফোরণের সাথে সাথে ঘুরে গেল পুরো জিপ।
রামোনেরা চারপাশে লাফিয়ে নামলেও প্রবেশ মুখে গিয়ে আটকে গেল জিপ। ফলে পিছোতে বাধ্য হল ট্রাক বহর।
এরই মাঝে ডিফেন্সে নেমে পড়ল প্রাসাদের বাহিনী। সমস্ত দরজা আর জানালা দিয়ে শুরু হয়ে গেল অটোমেটিক ফায়ার।
কিউবান সেনারা তাড়াহুড়া করে ট্রাক থেকে নেমে আগে বাড়ল। কিন্তু এগিয়ে এলো দ্বিতীয় রকেট। রামোনের মাথা থেকে মাত্র ইঞ্চি খানেক উপর দিয়ে উড়ে গিয়ে আঘাত করল ট্রাকের বনেটে। ডিজেল ফুয়েলের কালো ধোয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে গেল পুরো আঙিনা।
কোনো একটা জানালা থেকে শুরু হল ভারী মেশিন গানের গর্জন। গড়িয়ে গড়িয়ে সরাসরি জানালার মাটির দেয়ালের নিচে চলে এলো রামোন। মেশিন গানের শব্দে কানে তালা লাগার জোগাড়।
পকেট থেকে ছোঁ মেরে গ্রেনেড তুলে নিয়ে পিন টেনে ছুঁড়ে দিল জানালা দিয়ে; সাথে সাথে আবার উপুড় হয়ে কান ঢেকে বসে পড়ল।
উন্মত্ত একটা আর্তচিৎকারের সাথে সাথে নীরব হয়ে গেল মেশিন গান।
“তাড়াতাড়ি এসো।” চিৎকার করে আদেশ দিল রামোন। হাফ ডজন প্যারাট্রুপার নিয়ে ঢুকে পড়ল খোলা জানালার ভেতরে। মেশিন গানটা জায়গা মতো থাকলেও রক্তে থকথক করছে মেঝে।
শুরু হয় গেল এক রুম থেকে আরেক রুমে দৌড়ে দৌড়ে হাতাহাতি যুদ্ধ। কিন্তু ধীরে ধীরে ধৈর্য হারিয়ে ফেলছে রামোনের স্যৈরা। মনে মনে প্রমাদ শুনল রামোন। এখন যদি আরো সৈন্য সমাবেশ করে আনদোম তাহলে শেষ হয়ে যাবে ওর বিপ্লবের স্বপ্ন।
অন্যদিকে হতোদ্যম সৈন্যদেরকে উৎসাহিত করার চেষ্টা করে যাচ্ছে আবিবি। ধোয়া আর ধুলার মধ্য দিয়ে চিৎকার করে কথা বলছে সৈন্যদের সাথে। এমন সময় হামাগুড়ি দিয়ে ওর কাছে গেল রামোন।
“ব্লাডি ট্যাংকটা আর কতদূর?”
“আমি ফোন করেছি কতক্ষণ হয়ে গেল?”
“প্রায় ঘণ্টাখানেকেরও বেশি।” এত আগে! মনে হচ্ছে মাত্র মিনিট খানেক আগে শুরু হয়েছে আক্রমণ।
“রেডিওতে আবার খবর পাঠাও…”
ঠিক সেই মুহূর্তে দুজনেই শুনতে পেল যান্ত্রিক একটা শব্দ।
“কাম অন!” লাফ দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল রামোন। একসাথে দৌড় দিল দু’জনে। মাথার পাশ দিয়ে শিষ কেটে বেরিয়ে যাচ্ছে বুলেট।
আঙিনাতে এসে দেখতে পেল প্রবেশমুখে দাঁড়িয়ে থাকা ট্যাংক। ডান হাত উইন্ডমিলের মতো ঘুরিয়ে সামনে এগোবার নির্দেশ দিল রামোন।
কাছেরই একটা মাটির দেয়াল গুঁড়িয়ে দিয়ে এগোতে শুরু করল টি-৫৩। রামোন আর তার কয়েকজন সৈন্য ঢুকে পড়ল খোলা ব্রিচ দিয়ে ভেতরে। সামনে যা পেল দেয়াল, কাঠ, মানুষের শরীর সবকিছু মাটির সাথে মিশিয়ে দুমড়ে মুচড়ে এগোতে লাগল যান্ত্রিক দানব।
বন্দুক ছেড়ে এদিক সেদিক পালাতে লাগল আনদোম বাহিনী। ভাঙ্গা দালান ছেড়ে অনেকেই হাত তুলে আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রইল।
“আনদোম কই?” ধূলি-আর চিৎকারের চোটে খসখসে হয়ে উঠল রামোনের গলা, “ওকে পেতেই হবে; কিছুতেই পালাতে দেয়া যাবে না।”
সবার শেষে এসে আত্মসর্মপণ করলেন জেনারেল। মেইন হলের পুরু মাটির দেয়াল গুঁড়িয়ে দিল টি-৫৩; চারজন সিনিয়র অফিসারকে নিয়ে বেরিয়ে এলেন আনদোম। কপাল আর বাম চোখের উপর রক্তে ভেজা ব্যান্ডেজ। দাড়িতেও লেগে আছে রক্ত আর ধুলা।
কিন্তু ধকধক করে জ্বলছে অক্ষত চোখ। আহত সত্ত্বেও গমগমে স্বরে বলে উঠলেন,
“কর্নেল আবিবি, এটা বিদ্রোহ আর বিশ্বাসঘাতকতা। আমিই ইথিওপিয়ার প্রেসিডেন্ট-আজ সকালেই ডার্গ আমার নিয়োগকে বৈধতা দিয়েছে”।
প্যারাট্রুপারদের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল রামোন। তারা জেনারেলের বাহু ধরে হাঁট গেড়ে বসে পড়তে বাধ্য করল। নিজের হোলস্টার থেকে টোকারেভ পিস্তল নিয়ে আবিবি’র হাতে তুলে দিল রামোন।
বন্দির দু’চোখের মাঝখানে পিস্তল তাক করে ঠাণ্ডা স্বরে বলে উঠল আবিবি, প্রেসিডেন্ট আমান আনদোম, জনগণের বিপ্লবের নামে আমি তোমাকে পদত্যাগ করতে বলছি।” আর উড়িয়ে দিল জেনারেলের খুলি।
সামনের দিকে ঝাঁকি খেয়ে পড়ে গেল নিষ্প্রাণ দেহ; হলুদরঙা মগজ এসে ছিটকে পড়ল আবিবি’র পায়ে।
ধন্যবাদ কর্নেল-জেনারেল।” টোকারে আবার রামোনকে ফিরিয়ে দিল আবিবি।
“এই দায়িত্ব পালন করতে পেরে আমি সম্মানিত বোধ করছি।” আনুষ্ঠানিকভাবে মাথা নোয়ালে রামোন।
“আনদোম ডার্গের কতজন সদস্য ভোট দিয়েছিল?” সেনা বহর আবার ছুটে চলেছে আদ্দিস আবাবার দিকে।
