একে অন্যের সাথে হাত মিলিয়ে আকাশের দিকে তাকাতেই দেখতে পেল দ্বিতীয় আইলুশিন। একের পর এক মাটিতে নেমে এলো বিশাল চারটা এয়ারক্রাফট।
ইঞ্জিন বন্ধ হতেই আইলুশিনগুলোর গহ্বর হতে বেরিয়ে এলো চে গুয়েভারা রেজিমেন্টের সৈন্যদল।
“লেটেস্ট পজিশন কী?” সংক্ষেপে জানতে চাইল রামোন।
“ডার্গ আনদামের জন্য ভোট দিয়েছি।” আবিবি জানাতেই সিরিয়াস হয়ে গেল রামোন। জেনারেল আমান আনাদাম হলেন সেনাবাহিনী প্রধান। অত্যন্ত বুদ্ধিমান আর সৎ এই লোকটাকে সাধারণ মানুষও বেশ পছন্দ করে। তাই এতে আশ্চর্যের কিছু নেই যে তিনিই হবেন জাতির নতুন নেতা।
“তিনি এখন কোথায়?”
“উনার প্রাসাদে- এখান থেকে প্রায় পাঁচ মাইল দূর।”
“সাথে কতজন আছে?”
“পঞ্চাশ কিংবা ষাটজন দেহরক্ষী…”
নিজের প্যারাসুপারদের দিকে তাকালো রামোন।
“ডার্গের কতজন তোমার সমর্থন করে?”
ডজন খানেক নাম আউরে গেল আবিবি। সকলেই বাম ঘেষা তরুণ অফিসার।
“টাফু?” রামোন জানাতে চাইলে মাথা নাড়ল আবিবি। কর্নেল টাফু হচ্ছেন সেনাবাহিনীর সবচেয়ে আধুনিক ইউনিট আর রাশান টি-৫৩ ট্যাংক স্কোয়াড্রনের কমান্ডার।
“অল রাইট” মোলায়েম স্বরে বলে উঠল রামোন, “এটা আমাদের জন্য কোনো ব্যাপারই না-কিন্তু খুব দ্রুত এগোতে হবে।”
কিউবান প্যারাস্টপারদের কমান্ডারকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেয়ার পরপরই কাঁধে অস্ত্র নিয়ে সারি বেঁধে অপেক্ষারত ট্রাকের দিকে এগোল রামোনের বাহিনী।
আবিবি’র পাশে রামোন উঠে বসার পরপরই শহরের দিকে এগোল পুরো বহর।
শহরের বাইরে দেখা মিলল উট আর খচ্চরের ক্যারাভান। ভাবলেশহীন চোখে সেনাবাহিনীর দিকে তাকিয়ে রইল যাত্রীরা। সম্রাটের পতনের পর থেকেই রাস্তায় সেনাবাহিনী দেখা যেন নিত্যদিনের দৃশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আমহারিক ভাষায় দ্রুত রেডিওতে কথা বলে নিল আবিবি; তারপর রামোনকে অনুবাদ করে শোনাল।
“আমার লোকেরা আনদোমের প্রাসাদের উপর নজর রেখেছে। মনে হচ্ছে তিনি ডার্গের সমর্থনকারীদের মিটিং ডেকেছেন। সবাই এসে জড়ো হচ্ছে, প্রাসাদে।”
“গুড। সবকটা মুরগিকে একসাথে খাঁচায় পোরা হবে।”
শহর থেকে মোড় নিয়ে খোলা মাঠ দিয়ে ছুটল সেনা বহর। খরার প্রভাবে চারপাশে সবুজের কোনো অস্তিত্বই নেই। ধুলির মতো সাদা হয়ে আছে খটখটে মাটি।
“এই তো এসে গেছি।” সামনের দিকে তাকিয়ে ইশারা করল আবিবি।
লাল টেরাকোটার মোটা দেয়াল দিয়ে ঘেরা জেনারেলের প্রাসাদ দেখে এক নজরেই রামোন বুঝতে পারল এর ক্ষমতা। দেয়াল ভাঙ্গার জন্যে গোলন্দাজ বাহিনী লাগবে।
ওর মনের কথা পড়ে ফেলল আবিবি। “আমাদেরকে দেখে ওরা এমনিতেই ভড়কে যাবে। তাই গেইট দিয়ে ঢোকা হয়তো কঠিন হবে না…”
“না” বলে উঠল রামোন। “ওরা এয়ারক্রাফটগুলো আসতে দেখেছে। এ কারণেই হয়ত জরুরি সভা ডেকেছে আনদোম।”
ওদের সামনে দিয়েই প্রাসাদের দিকে দ্রুত গতিতে এগিয়ে গেল একটা স্টাফ কার।
“এখানেই থামো।” রামোনের নির্দেশে থেমে গেল পুরো বহর। খোলা জিপের পেছনের সিটে দাঁড়িয়ে বাইনোকুলার দিয়ে দূরের প্রাসাদের দিকে তাকাল রামোন।
“টাফু আর তার ট্যাংকগুলো কোথায়?”
“শহরের অন্য প্রান্তে ব্যারাকে।”
“এখানে আসতে কতক্ষণ লাগবে?”
“দুই ঘণ্টা।”
“প্রতিটি মিনিটই গুরুত্বপূর্ণ।”
বাইনোকুলার না নামিয়েই বলে উঠল রামোন, “যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ওর যুদ্ধযান নিয়ে আসতে বলে দাও টাফু’কে-কিন্তু আমাদেরও হাত গুটিয়ে বসে থাকা চলবে না।”
রেডিও নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল আবিবি। বুকে বাইনোকুলার ঝুলিয়ে জিপে থেকে নেমে এলো রামোন। প্যারাট্রুপারস কমান্ডার আর কোম্পানি লিডাররা ওর চারপাশে জড়ো হতেই জানিয়ে দিল বিভিন্ন নির্দেশ।
মাইক্রোফোন রেখে এগিয়ে এলো আবিবি, “শহরে সম্রাটের প্রাসাদ পাহারা দিচ্ছে একটা টি-৫৩। ওটা ঘন্টাখানেকের মধ্যে এখানে পৌঁছে যাবে। বাকি স্কোয়াড্রন নিয়ে রওনা হচ্ছেন কর্নেল টাফু।”
“ভেরি গুড।” মাথা নাড়ল রামোন।
“এখন আনদোমের প্রাসাদের নকশা বলো। ওকে কোথায় পাবো?”
ধুলার মাঝে স্কেচ এঁকে অভ্যন্তরের নকশা বুঝিয়ে দিল-আবিবি। রামোনের নির্দেশে আবারও এগোতে শুরু করল সেনা বহর। তবে এবারে কমান্ড জিপের উপর উড়তে লাগল সাদা পতাকা। স্ট্রপ ক্যারিয়ারের হুডের নিচে লুকিয়ে পড়ল প্যারাট্রুপার বাহিনী আর অস্ত্র-শস্ত্র।
প্রাসাদের কাছাকাছি হতেই গেইটের দেয়ালের উপর বেশ কয়েকটা মাথা দেখা গেলেও সাদা পতাকা থাকায় কোনো গুলি উড়ে এলো না এদিকে।
গেইটের সামনে জিপ পৌঁছাতেই এর শক্তি পরীক্ষা করে দেখল রামোন। এক ফুট মোটা কাঠের গায়ে রট আয়রন লাগানো গেইটে ট্রাক চালিয়ে দেয়া পাগলামি ছাড়া কিছু হবে না।
মাথার উপরে বিশ ফুট উঁচু দেয়াল থেকে চ্যালেঞ্জ করে বসল গার্ডদের ক্যাপ্টেন। নেমে এলো আবিবি। বেশ কয়েক মিনিট বাগবিতণ্ডা চললো দু’জনের মাঝে।
রামোন যখনি বুঝতে পারল যে সব গার্ডদের মনোযোগ কেবল জিপের দিকে নিবিষ্ট, তাড়াতাড়ি রেডিওতে নির্দেশ দিতেই ট্রাকগুলো গর্জন করে ছুটে এসে ডানে-বামে দাঁড়িয়ে গেল লাইন করে। ছাদে চড়ে বসল লুকিয়ে থাকা প্যারাট্রুপারদের দল। গ্রাপলিং হুক লাগানো দশ জন সশস্ত্র প্যারাট্রুপার দেয়াল বেয়ে উঠতে শুরু করল।
“ওপেন ফায়ার!” রামোন রেডিওতে চিৎকার করে উঠতেই শুরু হয়ে গেল গুলিবর্ষণ। সাথে সাথে সরে গেল গার্ডদের মাথা; তবে অন্তত একজনের গায়ে লাগল গুলি। বাতাসে গোত্তা খাওয়া হেলমেট দেখতে পেল রামোন।
