এর কিছুদিন পরেই নাইজেরিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে মেনে নিল সোভিয়েত সমর্থিত এমপিএলএ সরকার। ইউনাইটেড স্টেটসের সিনেটে আইওয়ার ডেমোক্র্যাটিক প্রতিনিধি ডিক ক্লার্ক সিআইএ’কে অভিযুক্ত করলেন অবৈধভাবে দক্ষিণ আফ্রিকাকে সহযোগিতা করার জন্য; ফলে মুখ ফিরিয়ে নিল কিসিঞ্জার আর সিআইএ। জয়েন্ট চিফ মেম্বারস এর পদত্যাগের হুমকির ফলে তুলে নেয়া হলো নেয়া হল সমস্ত আমেরিকান সাপোর্ট। ডিসেম্বরের মধ্যেই সিনেটে পাস হয়ে গেল ডিক ক্লার্ক এর সংশোধনী। ফলে অ্যাঙ্গোলাতে দক্ষিণ আফ্রিকার সামরিক সহায়তা বন্ধ হয়ে গেল। আর এসবই ঘটল ঠিক যেভাবে চেয়েছিলেন ক্যাস্ট্রো।
আরেকটি আফ্রিকান দেশ পেয়ে গেল সোভিয়েত ইউনিয়ন আর হাজার হাজার কৃষাঙ্গ অ্যাঙ্গোলানস্ বাধ্য হলো দশক জুড়ে গড়িয়ে চলা গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে। অর্ডার অব লেনিন অ্যাওয়ার্ড পেয়ে গেল কর্নেল জেনারেল রামোন মাচাদো। এদিকে আবার ছুটতে হল ইথিওপিয়ার উদ্দেশ্যে।
***
আদ্দিস আবাবা’তে নামার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে আইলুশিন। রাশান পাইলটের পেছনে বসে পার্বত্য অঞ্চল দিয়ে ঘেরা দেশটার দিকে তাকিয়ে আছে রামোন।
শত শত বছর ধরে রাজধানীর চারপাশে গাছগুলোকে কেটে ফেলতে পাহাড়গুলো হয়ে পড়েছে শূন্য। প্রাচীন এই ভূমিতেই একদা দাস, আইভরি আর অন্যান্য সম্পদের খোঁজে মিশরীয় ফারাওরা পাঠিয়েছিলেন তাদের প্রথম সেনাবাহিনী।
স্বভাবে উদ্ধত আর যোদ্ধা প্রকৃতির ইথিওপীয় জনগণকে ১৯৩০ সাল থেকে শাসন করে আসছেন সম্রাট হালি সেলসি। নিজের হাতে সর্বময় ক্ষমতা ধরে রাখলেও এই দয়ালু আর সহৃদয় একনায়ককে জনগণ ভালবাসে। ব্যক্তিগতভাবে অত্যন্ত সাদাসিধে জীবন যাপনে অভ্যস্ত সম্রাট সেলাসির একমাত্র চিন্তা ছিল নিজের জনগণের সমৃদ্ধি। সিংহাসনে আরোহণের পাঁচ বছরের মধ্যেই মুসোলিনি জেনারেলরা এসে তাঁর রাজ্যকে তছনছ করে দিলেও তাদেরকে রুখে দেয় ইথিওপিয়রা। ট্যাংক, হাল আমলের এয়ারক্রাফট আর বিষাক্ত গ্যাসের সাথে এরা লড়েছে রাইফেল, তরবারি কখনো বা শূন্য হাত দুটো নিয়ে।
অক্ষ শক্তির পরাজয়ের পর আবারো ইংল্যান্ড থেকে ফিরে এসে ইথিওপিয়া সিংহাসনে বসেন হালি সেলাসি। কিন্তু দেশকে আধুনিক করার বাসনা নিয়ে বিংশ শতাব্দীর সাথে তাল মেলাতে গিয়ে নিজের ছোট রাজ্যে ভাইরাস ঢোকার অনুমতি দিয়ে বসেন সম্রাট।
আদ্দিস আবাবা’তে স্থাপিত নতুন বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই শুরু হয়েছে ইনফেকশন। লম্বা চুলের বন্য দৃষ্টি মাথা ইউরোপীয়রা এসে তরুণ ছাত্রদেরকে শেখাতে থাকে সকল মানুষই সমান; রাজা কিংবা অভিজাতরা কোনো স্বর্গীয় অধিকার নিয়ে জন্মায়নি। এদিকে ফুরিয়ে আসতে থাকে বৃদ্ধ সম্রাটের শারীরিক শক্তি; অন্যদিকে মাথা চাড়া দিতে থাকে ষড়যন্ত্র। এরপর ইথিওপিয়াতে শুরু হয় প্রচণ্ড খরা আর দুর্ভিক্ষ। মাটি শুকিয়ে যায়, গবাদি পশু মারা যায়, মায়ের কোরে শুয়ে থাকে হাড় জিরজিরে শিশু; কঙ্কালসার দেহে ভেসে থাকে বড় বড় চোখ।
তারপরেও টনক নড়ে না সভ্য জগতের। অতঃপর টেলিভিশন ক্রু নিয়ে ইথিওপিয়াতে আসে বিবিসি’র রিচার্ড ডিম্বেলবি। তুলে ধরে গ্রামগুলোর ভয়াবহ দুর্দশার চিত্র। খুব সাবধানে দুর্ভিক্ষ আর মৃত্যুর ছবি প্রচার করা হয় রক্ত লাল আর সোনালি লেস লাগানো সাদা আলখাল্লা পরিহিত আনন্দে মত্ত অভিজাতদের ছবির পাশাপাশি; এবারে নড়েচড়ে বসতে বাধ্য হয় দুনিয়া। বিদ্রোহে ফেটে পড়ে আদ্দিস আবাবা’র শিক্ষার্থীরা। চার্চ আর মিশনারীরাও আওয়াজ তোলে একনায়কের বিরুদ্ধে।
এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের স্বার্থ হাসিল আর পুরাতন হিসাব মেলাতে বসে ডার্গ। একই সাথে আরবীয় তেল উৎপাদনকারীরাও বাড়িয়ে দেয় তেলের দাম। ইথিওপিয়াতে দুর্ভিক্ষের সাথে দেখা দেয় মুদ্রাস্ফীতি। অনাহারী উপোসী মানুষ শুরু করে লুটতরাজ।
আদ্দিস আবাবা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী বহু তরুণ অফিসারের নেতৃত্বে বিদ্রোহ করে বসে সেনাবাহিনী। এদের হাতে চলে যায় ডার্গের নিয়ন্ত্রণ।
প্রধানমন্ত্রী আর রাজপরিবারের সদস্যদেরকে বন্দি করে প্রাসাদে আলাদা করে ফেলা হয় সম্রাট সেলাসিকে। অর্থ আত্মসাতের গুজব ছড়িয়ে দেয়ায় জনগণ দাবি করে সম্রাটের পদত্যাগ ডার্গের মাধ্যমে সম্রাটকে গ্রেফতারের উদ্যোগ নেয় মিলিটারি কাউন্সিল।
প্রাসাদের সিঁড়ি দিয়ে নামিয়ে আনার সময় বলে উঠেন বৃদ্ধ সম্রাট; “তোমরা যা করছ তাতে যদি আমার জনগণের উপকার হয় তাহলে আমি সানন্দে চলে যাবো আর এও প্রার্থনা করব যেন তোমরা সফল হও।”
শহরের বাইরে ভাঙ্গাচোড়া একটা কুঁড়েঘরে বন্দি করে রাখা হয় সম্রাটকে কিন্তু ছোট্ট ঘরটার সামনে জড়ো হয় হাজার হাজার ইথিওপিয়। প্রকাশ করতে চায় নিজেদের বিশ্বস্ততা আর সমবেদনা।
বেয়নেট দেখিয়ে তাদেরকে ছঙ্গভঙ্গ করে দেয় মিলিটারি কাউন্সিল।
আদ্দিস আবাবা এয়ারেপোর্টের মাটিতে নেমে এলো আইলুশিন। বিশটা জিপ আর ইথিওপিয় সেনাবাহিনী বোঝাই ট্রাক এগিয়ে এলো এটিকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য।
লোডিং র্যাম্প দিয়ে এয়ারক্রাফট থেকে নেমে এলো রামোন।
“ওয়েলকাম কর্নেল জেনারেল জিপে থেকে নেমে এগিয়ে এলো কর্নেল গেটাশ আবিবি।
