প্রচণ্ড ক্লান্তি আর উত্তেজনা নিয়ে রামোনের দিন কাটছে। মহাদেশের দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ছে ওর নাম।
“এল জোরো” বিদেশেও সবাই ফিসফিস করে বলে,” এল জোরো পৌঁছে গেছে। বল এখন তাই দ্রুত গড়াতে থাকবে।”
ঠিক শিয়ালের মতই সারাক্ষণ দৌড়ের উপরে আছে রামোন। একই বিছানায় পরপর দু’রাত কখনোই ঘুমানো হয় না। কখনো কখনো তো বিছানাই থাকে না। ঘাসের কুড়ে ঘরের মাটির মেঝে; কিংবা হালকা কোনো এয়ারক্রাফটের দোমড়ানো সিট অথবা নোংরা কোনো নদীতীরেই ঘুমিয়ে পড়তে হয়।
অন্যদিনকে এল জোফের ধারণাই সঠিক। পশ্চিমাদের কোনো নড়চড় নেই। সাংবাদিকেরাও কোনো ধরনের প্রমাণ সংগ্রহ করতে পারেনি কোটিনহো’র কল্যাণে। সোরিমো কিংবা কঙ্গোর ব্রোজাভিলেতে অস্ত্র আর সৈন্য এনে পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থিত এম পি এল এ ক্যাডারদের হাতে।
তবে অ্যাঙ্গোলা হল রামোনের একগাদা দায়িত্বের একটি। এছাড়াও ইথিওপিয়া মোজাম্বিক, এজেন্টদের নেটওয়ার্ক, দক্ষিণ আফ্রিকাতে মুক্তিযোদ্ধাদের কো-অর্ডিনেশন সবকিছু নিয়েই তাকে মাথা ঘামাতে হয়। কিন্তু অ্যাঙ্গোলা’তেই-সোয়াপো আর এ এন সি’র ট্রেনিং ক্যাম্প বসিয়েছে রামোন।
দেশের পৃথক দুটি অংশে স্থাপন করা হয়েছে এই দুই সংগঠনের হেডকোয়াটার। তবে রামোন এএনসি’র ব্যাপারেই বেশি আগ্রহী। এক মুহূর্তের জন্যেও ভুলতে পারে না যে পুরো মহাদেশের প্রবেশ পথ হলো দক্ষিণ আফ্রিকা আর এএনসি তাদের মুক্তিযোদ্ধা। রালেই তাবাকা, তার পুরনো কমরেড এখন অ্যাঙ্গোলা’তে এএনসি লজিস্টিকস চিফ।
দুজনে মিলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা চষে বেরিয়েছে পুরো দেশ। তারপর খুঁজে পেয়েছে চিকাম্বা নদী তীরে অবস্থিত ছোট্ট জেলে গ্রাম। ঠিক হয়েছে এখানেই হবে তাদের বেস্।
যুদ্ধের সময় পরিত্যক্ত এই গ্রামটা দক্ষিণ আফ্রিকার সীমান্ত কিংবা যে কোনো বেস্ থেকেও বহুদূরে অবস্থিত। ইস্রায়েলীয়দের মতো দক্ষিণ আফ্রিকানরা’ও গেরিলাদের ধাওয়া করার জন্য কোনো আন্তর্জাতিক সীমানার পরোয়া করে না কিন্তু আউট অব রেঞ্জ হওয়াতে চিকাষাতে কোনো হেলিকপ্টার নামতে পারবে না। হাজার হাজার কি.মি. জঙ্গল আর পাহাড় পর্বতের বাধা পেরিয়ে স্থলবাহিনী পাঠানোও সম্ভব নয়। বেসের নাম রাখা হল টার্সিও।
প্রথম পাঁচশো এএনসি ক্যাডারকে নিয়ে টার্সিও’তে পৌঁছে গেলেন তাবাকা। শুরু হলো এয়ারস্ট্রিপ আর ট্রেনিং ক্যাম্পের কনস্ট্রাকশনের কাজ। দশ দিন পরেই এলো রামোন। ততদিনে প্রায় তৈরি হয়ে গেছে এয়ারস্ট্রিপ।
দ্বিতীয়বার পরিদর্শনে এসে পুরো এলাকাটা চক্কর দিয়ে মুগ্ধ হয়ে গেল রামোন। ঠিক করল নদীর মুখে তৈরি করবে আলাদা কম্পাউন্ড; আর এটাকে ব্যবহার করবে প্রাইভেট হেডকোয়াটার হিসেবে। সবসময় এরকম একটা নিরাপদ জায়গা চেয়েছিল যেখানে কেজিবি’র ট্রেনিং, প্ল্যানিং নির্বিঘ্নে সারা যাবে আর বন্দিদের ইন্টোরোগেশন আর হাপিশ করে ফেলাও কোন ব্যাপার হবে না। কেউ জানতেই পারবে না।
রালেই তাবাকা’র নির্মাণকর্মীদেরকে আদেশ দেয়ার কিছুদিনের মাঝেই এগিয়ে গেল কাজ।
হাভানাতে ফিরে গিয়ে প্রয়োজনীয় রেডিও আর ইলেকট্রনিক ইকুপমেন্টের ব্যবস্থা করে পাঠিয়ে দিল টার্সিও’র হেডকোয়ার্টারে।
***
হাভানা আর মস্কোতে দৌড়াদৌড়ি করলেও আফ্রিকা মহাদেশের নিজের আরো ডজনখানেক প্রজেক্টের কথাও ভুলে যায়নি রামান। এদের মাঝে বিশেষ একটি হলো লাল গোলাপ অপারেশন। লন্ডন আর স্পেনের দিনগুলোর দিকে তাকালে মনে হয় যে বুঝতেও পারেনি কোনো একদিন মেয়েটা কত মূল্যবান হয়ে উঠবে।
দক্ষিণ আফ্রিকার সিনেটে যোগ দেবার পর থেকে অসাধারণ সব গোয়েন্দা রিপোর্ট আর সুপারিশ ডেলিভারী দিয়েছে লাল-গোলাপ। এরপর ১৯৭৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে তো আফ্রিকান অ্যাফেয়াস এর সিনেট অ্যাডভাইজারি বোর্ডেরও সদস্য হয়ে গেছে। ওর মাধ্যমেই রামোন জেনে গেল যে দক্ষিণ অ্যাঙ্গোলাতে সাউথ আফ্রিকা সামরিক অভিযান চালালেও নাক গলাবে না প্রেসিডেন্ট ফোর্ড আর হেনরী কিসিঞ্জার। লুবিয়াঙ্কাতে সুপিরিয়রদেরকে জানিয়ে দিয়ে ক্যাস্ত্রোর সাথে পরামর্শ করার জন্যে হাভানাতে উড়ে এলো রামোন।
“আপনি ঠিকই ধরেছিলেন এল জোফ” প্রশংস ভঙ্গিতে বলে উঠল রামোন, “ইয়াংকি তাদের নোংরা ঘাটাবার জন্য বোয়াদেরকে পাঠাবে।”
“তাহলে আমরাও চাই ওরা ফাঁদে পা দিক।” হেসে ফেললেন কাস্ট্রো।” এখনি অ্যাঙ্গোলাতে ফিরে যাও, আমাদের বাহিনীকে তুলে এনে রাজধানীর দক্ষিণে নদীতীরে ডিফেন্সিভ পজিশনে বসাও। এগিয়ে আসতে দাও আংকেল স্যামের বাহিনীকে।”
অক্টোবার সাউথ আফ্রিকান অশ্বারোহী বাহিনী কুনিন নদী পার হয়ে দিন কয়েকের মাঝে রাজধানীর দেড়শ মাইলের ভিতরে চলে এলো। সুপ্রশিক্ষিত, তরুণ যোদ্ধারা অবশ্য নদীর ওপারে ভারী অস্ত্র-শস্ত্র আনতে ব্যর্থ হল।
এদিকে সিগন্যাল পাঠিয়ে দিল রামোন।
“এবারে, বলে উঠলেন কাস্ট্রো, “সময় হয়েছে আমাদের খেলা দেখাবার।”
নদীতীরে দক্ষিণ আফ্রিকার বাহিনীকে রুখে দিল রাশান টি-৫৪ ট্যাংক আর অ্যাসল্ট হেলিকপ্টার। পশ্চিমা গণমাধ্যমে দক্ষিণ আফ্রিকার উপস্থিতির কথা ছড়িয়ে দিল রামোন। আর সফল হলো কাস্ট্রোর ভবিষ্যৎ বাণী। শুরু হয়ে গেল ডিপ্লোম্যাটিক ঝড়।
