“যদি আমি এই সমর্থন দেবার প্রতিজ্ঞা করি তাহলে কি আপনাদের মিলিটারি বে ও এয়ারফিল্ডে সেনাবাহিনী আর সামরিক রসদ জড়ো করার অনুমতি দিতে প্রস্তুত আছেন?”
“এ ব্যাপারে নিশ্চিত থাকুন।” ডেস্কের ওপাশ থেকে হাত বাড়িয়ে দিল অ্যাডমিরাল। বিজয়ীর চোরা আনন্দ নিয়ে হাত মেলাল রামোন।
সোভিয়েতের হাতে দুই দুটো দেশকে তুলে দিল কয়েকদিনের ব্যবধানে। আফ্রিকাতে এতটা সফলতা আর কেউ পায়নি।
“এখান থেকে আমি সরাসরি হাভানা’তে চলে যাবো।” কোটিনহোকে নিশ্চয়তা দিয়েছে রামোন।” আশা করি কয়েকদিনের মাঝেই কিউবা আর মস্কোর উত্তর পেয়ে যাবো। এ মাসের শেষেই তা আপনাকে জানিয়ে দেব।”
উঠে দাঁড়াল কোটিনহো, “আপনার মতো মানুষ হয় না, কমরেড কর্নেল জেনারেল। সমস্যার, এতটা গভীরে যেতে আর দক্ষ সার্জনের মতো পদক্ষেপ নিতে আমি আর কাউকে দেখেনি।”
চাইকাতে প্রেসিডেন্ট ফিদের ক্যাস্ট্রোর-পাশে বসে এখন এগোচ্ছে রামোন।
মিউজিয়ামের গেইটে লাইনে দাঁড়ানো বিদেশি পর্যটকেরা তাকিয়ে আছে। তাদের মোটর শোভাযাত্রার দিকে। দ্বিতীয় গাড়িতে বসা ক্যাস্ট্রোকে চিনতে পেরেই কৌতূহলী হয়ে উঠল সকলে।
স্কোয়ার পার হয়ে মিনিস্টারস বিল্ডিং-এর সদর দরজায় এসে থামল গাড়ির বহর।
ডেপুটি মিনিস্টার আলেক্সেই ইউদিনিচ এগিয়ে এসে ক্যাস্ট্রোকে জড়িয়ে ধরলেন, তারপর নিয়ে গেলেন মিনিস্টারদের কাউন্সিলে। হল অব মিরর’য়ে লম্বা টেবিলের মাথায় নিজ আসনে বসে বক্তব্য শুরু করলেন কাস্ত্রো।
পরিষ্কারভাবে কথা বলে চললেন ক্যাস্ট্রো মাঝে মাঝে থেমে রাশান দোভাষীকে সুযোগ দিলেন। উপস্থিত সকলে তো বটেই এমনকি রামোন নিজেও মুগ্ধ হয়ে গেল তার আফ্রিকান জ্ঞান দেখে; বিস্তারিতভাবে তুলে ধরলেন সমস্ত সম্ভাব্য ঝুঁকি আর সফলতার ক্ষেত্র। বোঝাই যাচ্ছে রামোনের কথা তিনি কতটা আত্মস্থ করেছিলেন।
“পশ্চিম ইউরোপের কোনো মেরুদণ্ড নেই আর ন্যাটো তো সামরিকভাবে আমেরিকার উপরেই নির্ভরশীল তাই অ্যাঙ্গোলা’তে আমাদেরকে ঠেকানোর কেউ নেই।”
“কিন্তু আমেরিকা?” ভাবে জানতে চাইলেন ইউদিনিচ।
“ওদের ভিয়েতনাম ক্ষত এখনো শুকায়নি। তাই তাদের সিনেট কখনো সৈন্য পাঠাতে রাজি হবে না। তাই লেজ গুটিয়ে জিরিয়ে নিচ্ছে। তবে তো একটা ভয় রয়ে যায় যে, তারা হয়ত কোনো সারোগেট আর্মি বেছে নেবে ওদের হয়ে যুদ্ধ করার জন্যে।”
“দক্ষিণ আফ্রিকা।” ভবিষ্যৎ বাণী করে দিলেন ইউদিনিচ।
“ঠিক তাই। আফ্রিকাতে একমাত্র এরাই সবচেয়ে ভয়ংকর। কিসিঞ্জার হয়ত এদেরকে নিয়োগ করে অ্যাঙ্গোলা সীমান্তে পাঠিয়ে দিতে পারে।”
“দক্ষিণ আফ্রিকার সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে যাওয়াটা কী ঠিক হবে?” ওদের সৈন্যরা তো আফ্রিকার সবচেয়ে দক্ষ বুশ ফাইটার আর সাথে যদি পায় আমেরিকান অস্ত্র আর রসদ…”
“ওদের সাথে আমাদের যুদ্ধ করতে হবে না” প্রতিজ্ঞা করলেন ক্যাস্ট্রো।
“সীমান্ত আর দক্ষিণ আফ্রিকা কিউবা কিংবা সোভিয়েতের জোরে নয়, বর্ণবাদ নীতির কারণে।”
“ব্যাখ্যা করে বলুন মিঃ প্রেসিডেন্ট।”
“পশ্চিমে, আমেরিকান লিবারেল পার্টি আর ইউরোপে বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলন মুখিয়ে আছে দক্ষিণ আফ্রিকার শ্বেতাঙ্গ সরকারকে উৎখাত করার জন্য। তাই প্রথমজন দক্ষিণ আফ্রিকান সৈন্য সীমান্ত ক্রস করার সাথে সাথেই আমরা জিতে যাবো। আমেরিকান ডেমোক্র্যাটিক পার্টি আর ইউরোপ তথাকথিত গণতান্ত্রিকগণ এমন চিৎকার জুড়ে দেবে যে বিশ্বব্যাপী শুরু হয়ে যাবে প্রতিবাদ। দক্ষিণ আফ্রিকা নিজেই তখন সরে দাঁড়াবে। অ্যাঙ্গোলা হয়ে যাবে আমাদের।”
সবাই মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। রামোন আর একবার মুগ্ধ হল ক্যাস্ট্রোর সম্মোহন শক্তি দেখে। এ কারণেই তাঁকে মস্কোতে নিয়ে এসেছে সে। এমনভাবে বলার ক্ষমতা কাস্ট্রোর আর কোনো মিনিস্টার কিংবা জেনারেলের ছিল না।
“উনি আমাকে গোল্ডেন ফক্স ডাকেন।” আপন মনেই হাসল রামোন, “কিন্তু তিনিই হচ্ছেন সবচেয়ে বড় শিয়াল পণ্ডিত।”
যাই হোক এখনো শেষ করেননি ক্যাস্ট্রো। কোকড়ানো দাঁড়িতে হাত বুলাতে গিয়ে হাসলেন, “অ্যাঙ্গোলা আমাদেরই হবে; কিন্তু এটা তো কেবল সূচনা। এর পরের পালা খোদ দক্ষিণ আফ্রিকার।”
এতটা সাগ্রহে সবাই সামনে ঝুঁকে এলো যেন রক্তের গন্ধ পেয়েছে একদল নেকড়ে।
“একেবারে অ্যাঙ্গোলা হাতে এসে গেলেই কৃষাঙ্গ মুক্তিযোদ্ধাদের দিয়ে ঘিরে ফেলব দক্ষিণ আফ্রিকা। আফ্রিকা রত্ন ভাণ্ডার আর অর্থনৈতিক পাওয়ার হাউস দক্ষিণ আফ্রিকাকে কজা করতে পারলেই পদানত হবে পুরো মহাদেশ।”
বিশাল হাতের তালুদুটো টেবিলের উপর বিছিয়ে এবার সামনে ঝুঁকলেন ক্যাস্ট্রো নিজে।
“এ কাজের জন্য যত সৈন্য প্রয়োজন আপনি নিতে পারেন। আর অস্ত্রশস্ত্র ও ট্রান্সপোর্ট যদি দিতে পারেন তাহলে পাকা টসটসে ফল ঘরে তোলার সময় হয়েছে। রাজি আছেন কমরেড়স? তৈরি আছেন এই সাহসী পদক্ষেপ নেবার জন্যে?”
***
এই মিটিং এর মাত্র এক মাস পরেই পতুর্গিজ মিলিটারি অফিসারদের এক দল, সোরিমো’তে অবস্থিত মিলিটারি এয়ারফোর্স বেস কিউবান এয়ারফোর্সের লজিস্টিকস চিফের হাতে হস্তান্তর করে দেয়।
চব্বিশ ঘণ্টা পর সোরিমো’তে ল্যান্ড করে প্রথম আইলুশিন ক্যান্ডিড ট্রান্সপোর্ট। যাত্রী হিসেবে আসে পঞ্চাশজন কিউবান পরামর্শক আর মিলিটারি অস্ত্র-শস্ত্র ভর্তি বিশাল এক কার্গো। একই এয়ারক্রাফটে আসে রাশান মিলিটারি অবজার্ভার কর্নেল জেনারেল রামোন মাচাদো।
