গেইটের গার্ডদের সাথে কথা বলে ব্রিফকেস থেকে কয়েকটা ডকুমেন্ট দেখাল পল। কাগজগুলোকে পরীক্ষা করে টেলিফোনে সুপিরিয়রকে ফোন করল গার্ড কম্যান্ডার। তারপর পলকে আবার কাগজগুলো ফিরিয়ে দিয়ে গেইট খুলে দিল।
ক্যান্ডিডের রিফুয়েলিং-এর কাজ তদারকি করছে ওভারঅল পরিহিত দুই পাইলট। মেইন-হ্যাঙ্গারের পাশে গাড়ি পার্ক করে এগিয়ে গেল পল। পাইলটের সাথে কথা বলে বেলা’কে ইশারা করল এগিতে যেতে। অথচ স্যুটকেশ নিয়ে গলদৰ্ঘম ইসাবেলাকে সাহায্য করতে এগিয়ে এলো না একজন পাইলট’ও; বদলে পল জানাল,
“প্লেনে উঠে বসুন।”
লাগেজ? জানতে চাইল বেলা। কাঁধ ঝাঁকিয়ে ভারী স্বরে জানাল চিফ পাইলট, “ওখানেই থাক। আমি দেখব। আসুন।”
কার্গো দিয়ে ভর্তি হয়ে আছে প্লেনের পুরো হোল্ড। বিভিন্ন সাইজের ভারী ভারী সব কাঠের বাক্স। বিশাল কম্পার্টমেন্টের পাশের একটা সিঁড়ি দিয়ে বেলা’কে ফ্লাইট ডেকে নিয়ে এলো পাইলট।
“বসুন। ভাজ করে রাখা একটা ফোল্ডিং জাম্প সিট দেখিয়ে দিল বেলা’কে বসার জন্যে আর কোনো রকম ফর্মালিটি ছাড়াই ঘণ্টা খানেক পর আকাশে উঠে পড়ল ক্যান্ডিড।
নিজের আসনে বসেও পাইলটের কাঁধের উপর দিয়ে ইনস্ট্রমেন্ট প্যানেল স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে বেলা। ৩০০ ডিগ্রি কোর্স ধরে ত্রিশ হাজার ফুট উচ্চতায় লেভেল হয়ে আছে উড়োজাহাজ।
হাতঘড়িতে সময় দেখল বেলা। ঘন্টাখানেক পর মনে হল প্লেন জাম্বিয়া ছাড়িয়ে অ্যাঙ্গোলা পৌঁছে গেছে। খানিকটা কেঁপে উঠল বেলা। এখানে হলিডে কাটানোর কোনো ইচ্ছেই নেই তার। সিনেটের আফ্রিকান অ্যাফেয়ার্স কমিটির মেম্বার হওয়াতে অ্যাঙ্গোলা সম্পর্কে মিলিটারি গোয়েন্দাদের পাঠানো সব ধরনের রিপোর্টই পড়েছে বেলা। সমস্যা জর্জরিত দেশটার সবকিছুই তাই তার জানা আছে।
বহুকাল যাবৎ পর্তুগিজ সাম্রাজ্যের মুক্তো ছিল অ্যাঙ্গোলা। দক্ষিণ আফ্রিকার পরে এটাই হচ্ছে আফ্রিকার সবচেয়ে সুন্দর আর বিত্তবান দেশ।
মেরিন রিসোর্চে সমৃদ্ধিশালী দেশটাতে কদিন আগেই তেল আর প্রাকৃতিক গ্যাসের ভাণ্ডার খুঁজে পেয়েছে আমেরিকান অফশোর ড্রিলিং কোম্পানি। তেল ছাড়াও হীরা। সোনা আর আকরিক লোহা উৎপাদন করে অ্যাঙ্গালা। উর্বর সমভূমি আর উপত্যকায় রা দেশটাতে অসংখ্য নদী আর বনাঞ্চলও আছে।
প্রকৃতির এহেন আশির্বাদ সত্ত্বেও ভয়ংকর গৃহযুদ্ধ প্রায় দর্শক ধরে রক্তাক্ত হয়ে আছে অ্যাঙ্গোলা। পাঁচশো বছরের পুরাতন কলোনিয়াল শাসন ব্যবস্থা উপড়ে ফেলার জন্যে যুদ্ধ করেছে দেশটির জনগণ।
কিন্তু এক্ষেত্রেও একতার অভাব আছে। বিভিন্ন গালভরা নামধারী সেনাবাহিনী কেবল পতুগিজদের বিরুদ্ধে নয়; লড়াই করছে একে অন্যের সাথে। আছে এম পি এল, এফ এন এল এ, ইউনিট। এছাড়া আছে অসংখ্য প্রাইভেট আর্মি আর গেরিলা আন্দোলন।
এরপর হঠাৎ করেই পর্তুগালে সামরিক অভ্যুত্থান হওয়াতে অ্যাঙ্গোলা’কে স্বাধীনতা দেয়া হয়। নতুন সরকার ও সংবিধানের জন্য শুরু হয় নির্বাচন।
এখন নির্বাচনের নামে নতুন করে টালমাটাল হয়ে উঠেছে পুরো দেশ। ক্ষমতা পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছে বিভিন্ন অংশ। অন্যদিকে আফ্রিকার অন্যা দেশগুলোও নিজ নিজ সমর্থকের জন্য বিভিন্ন চাল চলছে। সামরিক গোয়েন্দাদের পাঠানো রিপোর্ট পড়ে বেলা’র তাই মনে হয়েছে পাহাড়-জঙ্গল দূরে থাক, খোদ রাজধানী লুয়ান্ডা’তে যে কী ঘটছে তা কেউই জানে না।
বর্তমানে এম পি এল এর রাজা কোটিনহো গর্ভনর জেনারেল হলেও আমেরিকান সি আই এ, চীন আর উত্তর কোরিয়া সকলেই এফ এন এ’র পক্ষে।
***
ক্রেমলিন দুর্গের গেইট দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়েছে ব্ল্যাক চাইকা’র মোটর শোভাযাত্রা।
একেবারে সামনের লিমুজিনে আছে দু’জন কিউবান জেনারেল। দ্বিতীয় গাড়িতে প্রেসিডেন্ট ফিদেল কাস্ট্রোর সাথে বসে আছে জেনারেল রামোন মাচাদো।
ইথিওপিয়াতে সফলভাবে রাজতন্ত্রের পতন ঘটিয়ে ফেরার সাথে সাথে পদোন্নতি পেয়েছে রামোন।
কেজিবি’র সবচেয়ে তরুণ জেনারেল এখন রামোন। ওর ইমিডিয়েট সিনিওয়ের বয়সও তিপান্ন। জন্মসূত্রে রাশান না হওয়াতে আরো বেশি তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে এ পদোন্নতি।
ইথিওপিয়ার সাফল্যের পরপরই অ্যাঙ্গোলাহো’ও নিজের দক্ষতা প্রমাণ করেছে রামোন। গর্ভনর জেনারেল রোজা কোটিনহো’র সাথে সখ্যতা গড়ে তোলার মাধ্যমে স্থাপন করেছে রাজনৈতিক বন্ধুত্ব।
“যে কোনো মূল্যে নির্বাচন ঠেকাতে হবে।” রামোনকে জানিয়েছে রোজা, “তাহলে প্রথম প্রেসিডেন্ট হিসেবে জয়ী হয়ে যাবে জোনাস সাভিষি; যেহেতু তার গোত্রই দেশটাতে সবচেয়ে বড়।”
“ঠিক তাই।” একমত হলো রামোন। অ্যাঙ্গোলার গেরিলা লিডারদের মাঝে সবচেয়ে সফল জোনাস। কিন্তু মার্কসিস্ট কিংবা সমাজতান্ত্রিক ভাবধারা অনুসরণ না করায় তাকে ক্ষমতায় বসানোর ঝুঁকি নিতে পারে না রামোন।
“এক্ষেত্রে সম্ভাব্য সমাধান হলো, ঘোষণা করে দিন যে অরাজকতা অব্যাহত থাকাতে এখন কোনোমতেই নির্বাচন সম্ভব নয়। এম পি এল এর সামর্থ্যকে তুলে ধরে লিসবনকে বাধ্য করুন অগাস্টিনহো নেটো’র হাতে ক্ষমতা অর্পণ করতে।”
বলা বাহুল্য যে, নেটো’কে নির্বাচন করেছে সোভিয়েত; কেননা দুর্বল আর শঠ চরিত্রের নেটোকে নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হবে; সাভিম্বি’কে নয়।
“আমি রাজি।” মাথা নাড়ল কোটিনহো।” কিন্তু রাশিয়া আর কিউবা থেকে সমর্থন পাবো তো?”
