টুপি খুলে হাত দিয়ে ভ্রু’র উপরে মুছলেন শাসা। কালাহারি মরুভূমির এ অংশে আজ বেশ গরম পড়েছে।
নিচু আর ছোট ছোট লাল বালিয়ারীগুলোকে দূর থেকে মনে হচ্ছে সমুদ্রের ঢেউ। শুকিয়ে রূপালি হয়ে আছে মরুভূমির ঘাস। সবচেয়ে কাছের গাছটাতে বাসা বেঁধেছে বাবুই পাখির দল। শত শত জোড়া মিলে তৈরি করেছে এ কলোনি। প্রতি জোড়ার জন্য আছে পৃথক খোপ আর সবাই মিলে প্রতিবছর এর রক্ষণাবেক্ষণও করে। অরেঞ্জ রিভারে উপিংটনের কাছে এরকমই একটা বাসায় শত বছর ধরে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরভাবে বাস করছে বাবুই পাখির ঝাঁক।”
কোর্টনি মিনারেল এক্সপ্লারেশন কোম্পানির মালিকানাধীন ১ লক্ষ ৫০ হাজার একর জমির পুরোটাতেই বেড়া দিয়ে ঘিরে পাহারা বসানো আছে। এখানেই চলছে ড্রিলিং-এর কাজ। কোম্পানির বাইরের কেউ কখনোই এখানে আসতে পারে না-যদি কেউ এসেও পড়ে….তাহলে শুরু হবে আরেকটা ড্রিলের কাজ।
আকাশের দিকে চোখ তুলে তাকালেন শাসা। মেঘের কোনো ছিটেফোঁটাও নেই। কালাহরির এই অংশ সংরক্ষিত সামরিক এলাকা হওয়াতে কর্মাশিয়াল কিংবা প্রাইভেট কোনো ধরনের এয়ারক্রাফটই উড়তে পারে না। দক্ষিণে মাত্র কয়েকশ মাইল দূরে অবস্থিত কিম্বার্লি আর্টিলারী আর ট্যাঙ্ক স্কুল প্রায়ই এখানে সামরিক মহড়া বসায়।
তারপরেও উদ্বেগে আছেন শাসা। ডি মাইনাস এইট। শনিবার সন্ধ্যায় বিজ্ঞানীদের দল আর রোমানকে নিয়ে ভারী কনভয় রওনা হয়ে যাবে পেলিনডাবা থেকে, পৌঁছবে রবিবার দুপুরে। তার আগেই গর্তটা তৈরি হওয়া চাই।
সোমবার সন্ধ্যার ভেতরে গর্তে বসানো হবে টেস্ট বোমা। কেপটাউন থেকে ডিফেন্স মিনিস্টার আর জেনারেল মালান ডি মাইনাস ওয়ানে ফ্লাই করবেন।
মাথা নাড়লেন শাসা। “নাহ, সবকিছু তো সুন্দর মতই এগোচ্ছে।”
চিফ ড্রিলিং ইঞ্জিনিয়ার গত বারো বছর ধরেই কাজ করছে ওরিয়নে। শাসা’কে মোবাইল কন্ট্রোল রুমের সিঁড়িতে দেখে উঠে দাঁড়িয়ে হাত বাড়িয়ে দিল লোকটা।
“সব কেমন চলছে মাইক?”।
“জবরদস্ত, মিঃ কোর্টনি!” খুশি খুশি গলায় জানাল চিফ ইঞ্জিনিয়ার, “আজ সকালে নয়টায় তিন হাজার মিটারের মার্ক ছুঁয়েছি আমরা।”
ডিসপ্লে স্ক্রিনে পুটটাকে ইশারায় দেখাল মাইক। বিস্ফোরণ গিলে খেতে সাহায্য করবে এই লাইন।
“আমি তোমাকে বিরক্ত করবনা।” লোকটার পাশে বসলেন শাসা, “তুমি কাজ করে যাও।”
আবারো, পূর্ণ মনোযোগে কন্ট্রোল কসসোল নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল মাইক।
চরুট ধরিয়ে নিলেন শাসা আর কল্পনার চোখে স্টিলের একটা কীটকে মাটির গভীর নেমে যেতে দেখলেন-একেবারে ম্যাগমা পর্যন্ত নেমে যাচ্ছে পোকাটা। যেখানে পৃথিবীর তাপমাত্রা বাসা বাড়িতে ব্যবহৃত ওভেনেরই সমান।
কন্ট্রোল রুমে ফোন বেজে উঠল, কিন্তু আপন কল্পনায় বুঁদ হয়ে আছেন শাসা। জুনিয়ার টেকনিশিয়ান তাই দু’বার ডাকার পর সাড়া দিলেন মিঃ কোর্টনি।
“কে জিজ্ঞাসা করে মেসেজ রেখে দাও।” খানিকটা বিরক্ত হলেন শাসা।
“মিঃ ভরসটার স্যার।”
“কোন মিঃ ভরসটার?”
“প্রধানমন্ত্রী স্যার; ব্যক্তিগত লাইনে আছেন।”
ছোঁ মেরে রিসিভার টেনে নিলেন শাসা। হঠাৎ করেই অমঙ্গলের আশংকায় কেঁপে উঠল বুক।
“জ্যা, ওম জন?”
“শাসা গত এক ঘণ্টায় নিজ নিজ সরকারের পক্ষে অভিযোগপত্র দাখিল করেছে ব্রিটেন, আমেরিকা আর ফরাসি কূটনীতিকগণ।”
“কেন?”
“আজ সকাল নয়টায় একটা আমেরিকান স্যাটেলাইট ড্রিল সাইটটার ছবি তুলে ফেলেছে। আমরা তো গভীর গাঁজায় পড়ে গেলাম! ওরা কোনো না কোনো ভাবে স্কাইলাইট সম্পর্কে জানতে পেরে দাবি করছে এখনি যেন এই টেস্ট বন্ধ করা হয়। কেপ টাউনে ফিরতে তোমার কতক্ষণ লাগবে?
“স্ট্রিপে আমার জেট পঁড়িয়ে আছে। চার ঘণ্টার ভেতরে আপনার অফিসে পৌঁছে যাবো।”
“ফুল কেবিনেট মিটিং ডেকেছি, তুমি ওদেরকে ব্রিফ করবে।”
“ঠিক আছে।”
জন ভরসটারকে আর কখনো এতটা উদ্বিগ্ন আর রেগে যেতে দেখেননি। শাসা। হাত মেলানোর সময় তো রীতিমতো গর্জন করে উঠলেন, “তোমার সাথে যখন কথা বলছি তখন নিরাপত্তা পরিষদে জরুরি সভা বসিয়েছে রাশানরা যদি টেস্ট অব্যাহত রাখি তাহলে জোরপূর্বক স্থগিতাদেশেরও হুকমি দিয়েছে।”
“আমেরিকান আর বিট্রিশরাও সতর্ক করে দিয়েছে যে টেস্ট করলে আমাদের হয়ে ভেটো দিতে পারবেনা।”
“আপনি কিছু স্বীকার করেননি তো মিঃ প্রাইম মিনিস্টার?”
“আরে নাহ মাথা খারাপ।” ঘেউ ঘেউ করে উঠলেন ভরসটার।
“কিন্তু ওরা সকলেই ড্রিল সাইট দেখতে চায়। তাদের কাছে এরিয়াল ফটোগ্রাফ আছে-এমনকি কোডনেইমটাও জানে স্কাইলাইট।”
“আমাদের কোড জানে?” হা হয়ে তাকিয়ে রইলেন শাসা। মাথা নাড়লেন ভরসটার।
“হ্যাঁ”
“আপনি বুঝতে পারছেন এর মানে কী? কেউ একজন বিশ্বাসঘাতকতা করেছে-একেবারে টপ লেভেলের কেউ।”
***
জাতিসংঘ তৃতীয় বিশ্ব আর জোট নিরপেক্ষ দেশগুলোর প্রতিনিধিরা একের পর এক উঠে দাঁড়িয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার নিন্দা জ্ঞাপন করল। অন্যদিকে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রধান মন্ত্রীর নিশ্চয়তা সত্ত্বেও গ্রেট ব্রিটেন আর ইউনাইটেড স্টেটস এর কূটনীতিকেরা ব্যক্তিগতভাবে দেখতে চাইল টেস্ট সাইট। তবে তারা পৌঁছানোর আগেই সরিয়ে ফেলা হয়েছে সব যন্ত্রাংশ।
“ড্রিলিং এর উদ্দেশ্য কী ছিল” এনিয়ে কয়েকবার শাসা’কে প্রশ্নটা করলেন ব্রিটিশ কূটনীতিক।
