লণ্ডনে বাড়তি দু’দিন কাটিয়েছে ব্রিটিশ মিউজিয়ামের রিডিং রুমে পড়াশুনা করে। ছাত্রাবস্থায় করা লাইব্রেরি কার্ড ব্যবহার করে জোনে গেছে বুদ্ধিমান মানুষের তৈরি সবচেয়ে ভয়ংকর অস্ত্র সম্পর্কে সবকিছু।
স্তূপের সবচেয়ে উপরের সবুজ ফাইলটাতে হাইয়েস্ট সিকিউরিটি ক্লিয়ারান্সের স্ট্যাম্প লাগানো হয়েছে। আটটা কপির মধ্যে এটা হলো চতুর্থ। ক্লিয়ার্যান্সের মাঝে ডিফেন্স মিনিস্টার, বিভিন্ন বিজ্ঞানি, অ্যারনসহ ওর বাবার নামও আছে।
সবুজ কাভারের উপরে কোড় নেইমের জায়গায় লেখা আছে, প্রজেক্ট স্কাইলাইট”। খুব সাবধানে ফাইলটাকে তুলে নিল বেলা; খেয়াল রাখল যেন সেইফের অন্য কোনো কিছুর ক্ষতি না হয়। নিজের থিসিসের ম্যাটেরিয়াল জোগাড় করার সময়েই দ্রুত পড়ার টেকনিক বের করে নিয়েছিল বেলা আর আজও কাজে লাগল সেই বিদ্যা।
বেশিরভাগ অংশই অবশ্য বেশ দুর্বোধ্য ঠেকল; যার কিছুই সে বুঝতে পারল না। তবে এটা বুঝতে পারল যে পোলিনড়াবা’র প্রগ্রেস সম্পর্কে এখানে সিরিজ আকারে রিপোর্ট লেখা হয়েছে।
কালানুক্রমিকভাবে সাজানো রিপোর্টগুলো পড়ে শেষ পৃষ্ঠায় যাবার আগেই জেনে গেল যে প্রায় তিন বছর আগেই সফলতা নিশ্চিত হয়ে গেছে আর এজন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে ইউরেনিয়াম ২৩৫ প্রস্তুত করা হয়েছে প্রায় ২০০ এক্সপ্লোসিভ ২০৬ ডিভাইস তৈরি করার জন্য যার প্রায় ৫০ কিলোটন ওজন হবে। এগুলোর বেশির ভাগই চলে যাবে ইস্রায়েলের কাছের। কেননা ইস্রায়েল টেকনিক্যাল সহায়তা ছাড়াও ইউরেনিয়াম উৎপাদনে সাহায্য করেছে। তথ্যটা হজম করতে খানিক সময় নিল বেলা। বিশ কিলোটনের হিরোশিমা বোমা এগুলোর কাছে। কিছুই না।
ফাইলটাকে একপাশে রেখে পরেরটাতে হাত দিল বেলা। ঠিকঠাক জায়গামতো ফাইলগুলোকে রাখতে গিয়ে রীতিমতো ঘাম ছুটে যাচ্ছে। প্রজেক্ট স্কাইলাইটের মূল উদ্দেশ্য হল এমন সব ট্যাকটিক্যাল নিউক্লিয়ার অস্ত্র বানানো যেন এয়ারক্রাফট কিংবা গ্রাউন্ড আর্টিলারি উভয় স্থান থেকেই সেগুলোকে নিক্ষেপ করা যায়। রিপোর্টে জিফাইভ ক্যাটাগরির নিউক্লিয়ার উইপন তৈরিতে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।
নিউক্লিয়ার উইপনের মূল নীতিটা তো সবারই জানা। তারপরেও রিপোর্ট গুলো পড়তে পড়তে উত্তেজিত হয়ে নোট নিতে লাগল ইসাবেলা। নিজেকে যেন এই ডেভেলপমেন্ট টিমেরই একজন মনে হচ্ছে। বেশ কয়েকবার এই বিশাল কাজের মাঝে খুঁজে পেল বাবা’র প্রভাব; যাতে চূড়ান্তভাবে সফল হতে চলেছে এহেন গুরুত্বপূর্ণ প্রজেক্ট।
ফাইলের শেষ রিপোর্টটাতে মাত্র পাঁচদিন আগের তারিখ দেয়া আছে। দ্রুত একবার পড়ে নিয়ে আবারো রিপোর্টটা পড়তে শুরু করল বেলা।
আজ থেকে দুই মাসেরও কম সময়ের মাঝে প্রথমবারের মতো পরীক্ষা করা হবে দক্ষিণ আফ্রিকার সর্বপ্রথম নিউক্লিয়ার অ্যাটোমিক বোমা।
“কিন্তু কোথায়?” মরিয়া হয়ে উত্তর খুঁজে চলেছে বেলা, পরের ফাইলটাতেই অবশ্য পেয়েও গেল।
ফাইলগুলোকে ঠিকঠাক জায়গা মতে রেখে দিয়ে সেলোটেপ আটকে কম্বিনেশনের সিকোয়েন্স ঠিক করে উঠে দাঁড়াল বেলা।
***
টেস্ট সাইট খুঁজতে গিয়ে পণ্ড হতে বসেছে মূল্যবান দুটো বছর। কিন্তু মাথায় রাখতে হবে যেন রেডিও অ্যাকটিভের কারণে কোনো ক্ষতি না হয়।
অ্যান্টর্কটিকার গাফ দ্বীপে দক্ষিণ আফ্রিকার আবহাওয়া অফিস থাকলেও ধোপে টিকল না এ আইডিয়া। কেননা অন্যেরা নাক গলাতে পারে। বিশেষ করে
অস্ট্রেলিয়া পৃথিবীর পাদদেশে অবস্থিত এই মহাদেশটাকে বেশ মায়া করে।
নিরাপত্তার খাতিরে তাই দক্ষিণ আফ্রিকার আকাশ সীমা কিংবা এর মাটিতেই যা করার করতে হবে। তবে এরিয়াল টেস্টের চিন্তাও বাদ দিতে হল। কেননা উপর থেকে ঝড়ে পড়া আবর্জনা আত্মহত্যার সামিল হবে।
অবশেষে সবাই একত্র হলো আন্ডারগ্রিউন্ড টেস্ট করতে। দক্ষিণ আফ্রিকার সোনার খনিগুলোই পৃথিবীর সবচেয়ে গভীরে অবস্থিত। ষাট বছর ধরে দক্ষিণ আফ্রিকানদেরকেই ডিপমাইনিং কৌশলের অগ্রদূত ধরা হয়। ডিপ ড্রিলিংকে তারা প্রায় শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছে।
ওরিয়ন এক্সপ্লোরেশন নামক ড্রিলিং কোম্পানির মালিক হলো কোর্টনি এন্টারপ্রাইজ। ওরিয়নের বুড়ো যাদুকরের দল মাটির নিচে দুই-মাইল পর্যন্ত গত করে তুলে আনতে পারে রাশি রাশি পাথর। গর্তকে সোজা কিংবা যে কোনো দিকে বাঁকাতেও এরা খুবই ওস্তাদ। অথবা দেড় মাইল গর্ত খুঁড়ে পয়তাল্লিশ ডিগ্রি বেঁকে যেতেও এদের জুড়ি মেলা ভার।
আজ, রৌদ্রস্নাত চমৎকার ঝকমকে দিনটাতে টেস্ট সাইটে দাঁড়িয়ে গভীর শ্রদ্ধা ভরে এই অবিশ্বাস্য দক্ষতার নিরীক্ষণ করছেন শাসা কোর্টনি।
আধুনিক কালের ফায়ার ইঞ্জিনের মতো দেখতে একটা ট্রাকে বসানো হয়েছে পুরো পাওয়ার প্ল্যান্ট। আরেকটা ট্রাকে কন্ট্রোল রুম আর ইলেকট্রনিক মনিটরিং ইকুপমেন্ট রাখা হয়েছে। তৃতীয়টাতে আছে সত্যিকারের ড্রিল আর বেসপ্লেট। চতুর্থটাতে হাইড্রলিক লিফট আর ক্রেন।
ড্রিল সাইটের চারপাশে জড়ো হয়েছে ক্যারাভ্যান আর সাপ্লাই ট্রাকের বহর। আশেপাশের বহু একর নিয়ে ছড়িয়ে রাখা হয়েছে রড। রাত হলে পুরো এলাকায় জ্বলে উঠে নীল সাদা-আলো। ঘড়ির কাটা ধরে এগিয়ে চলেছে পুরো কাজ। কাজটা শেষ হলে প্রায় বলা যায় পানিতেই ডুবে যাবে পুরো তিন কোটি ইউ এস ডলার।
