প্রতি শীতে, হান্টিং সিজন শুরু হবার আগে বার্ষিক স্প্রিংবক নিধন প্রতিযোগিতার জন্যে ড্রাগন’স ফাউন্টেনে পার্টি দেন শাসা। চার ইঞ্চি বৃষ্টিপাত হলেই কারু’তে বেড়ে যায় এদের সংখ্যা। তাই এগুলোর বংশবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করার জন্য বছরে অন্তত হাজার খানেককে মেরে ফেলতে হয়।
জোহানোবার্গ থেকে নিজের বন্ধু আর তাদের পরিবারকে নিয়ে আসে গ্যারি। নতুন লিয়ার জেট নামার মতো করে সম্প্রসারণ করা হয়েছে ল্যান্ডিং স্ট্রিপ। কেপ টাউন থেকে বাকি অতিথিদেরকে জোড়া ইঞ্জিনের কুইন এয়ারে করে নিয়ে আসেন শাসা।
সিনেটের অধিবেশন শেষ করে ঊনত্রিশতম জন্মদিনে বাবার কাছ থেকে পাওয়া ছাই রঙা পোরেশে’তে নানা’কে সাথে নিয়ে পৌঁছে গেল বেলা। লং ড্রাইভের লম্বা ঘন্টাগুলো কিভাবে যেন পার হয়ে যায় এই বুড়ীর গল্প শুনতে শুনতে। স্পিডমিটারের দিকে তেমন খেয়ালই করেন না নানা। তাই বুফোর্ট ওয়েস্ট আর র্যাঞ্চের মাঝখানের রাস্তায় গিয়ে গাড়ির স্পিড ১৬০ মাইল পর্যন্ত তুলে ফেলল বেলা।
ড্রাগনস ফাউন্টেনের রান্না ঘরের আঙ্গিনাতে যখন গাড়ি থামল তখন প্রায় মাঝদুপুর। ভৃত্য আর কুকুরদের দল এগিয়ে এলে তাদেরকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য। অবশেষে বেলা যখন নিজের রুমে যাবরার ফুরসৎ পেল ততক্ষণে তার তিনটা স্যুটকেস খুলে ফেলতে শুরু করেছে ন্যানি।
“গড ন্যানি, আমি শেষ। আগামী এক সপ্তাহ শুধু ঘুমাবো।”
“অকারণে তোমার প্রভুর নাম নিওনা।” সর্তক করে দিল ন্যানি।
“তুমি তো মুসলিম ন্যানি। এভাবে বলছ যে?”
“নিয়ম তো সবার জন্যই এক।” ঘোঘোৎ করে উঠল ন্যানি।
“পুরুষেরা সব কই?” বিছানায় ঝাঁপিয়ে পড়ল বেলা।
“শিকারে গেছে, আর কি!”
“সুদর্শন কেউ আছে নাকি?”
“হ্যাঁ, কিন্তু সকলেই বিবাহিত। তোমারটা তোমারই খোঁজা উচিত মিস বেলা।” থেমে গেল ন্যানি। “একজন আছে যার স্ত্রী নেই।” পরক্ষণে মাথা নেড়ে জানাল। “কিন্তু তুমি তাকে পছন্দ করবে না।”
“কেন?”
“ওর তালুতে একটাও চুল নেই।” হাসতে লাগল ন্যানি, “একেবারে ডিমের খোসার মতো টাক।”
“ঠিকই বলেছে ন্যানি। চোখ জোড়া আর চেহারাটা খানিক সহৃদয় হলেও মাথা একেবারে ন্যাড়া। পেছন দিকে ফ্রায়ার টাকের মতো কোকড়ানো।
ডিনারের আগে ককটেলের জন্য নিচে নেমে এসে বেশ ভাল বোধ করল বেলা। উষ্ণ জলে স্নান করে এরই মাঝে ঘণ্টাখানেক ঘুমিয়ে নিয়েছে। আর পরনের নীল সিল্কের ড্রেসটা’র কল্যাণে সৌন্দর্য যেন ফুটে বের হচ্ছে। বিবাহিত কিংবা অবিবাহিত সকলেই কাৎ।
প্রথমেই গ্যারি’র কাছে গেল বেলা। বহুমাস দু’জনের দেখা হয়নি। “মাই বিগ টেডি বিয়ার” ভাইকে জড়িয়ে ধরল বেলা।
বোনের কোমর ধরে টাকলুর সাথে পরিচয় করিয়ে দিল গ্যারি। “বেলা, উনি প্রফেসর অ্যারন ফ্রাইডম্যান। অ্যারন এ হচ্ছে আমার ছোট্ট বোন সিনেটর ডক্টর ইসাবেলা কোর্টনি।”
“ওহ, কাম অন গ্যারি!” ভাইকে মৃদু ভর্ৎসনা করে অরনের সাথে হাত মেলালো বেলা। পিয়ানিস্ট কিংবা সার্জনের মতো শক্ত হাত। জেরুসালেম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর অ্যারন এখন ছুটিতে আছেন।”
“ওহ, আই লাভ জেরুসালেম।” নম্রভাবে উত্তর দিল বেলা।” বলতে গেলে ইসরয়েলকেই ভালেবাসি।”
এরপর আরো মিনিট খানেক থেকে বাবার খোঁজে বারান্দার দিকে গেল বেলা। আগত অতিথি স্ত্রীদের মাঝে সবচেয়ে তিনজন ঘিরে ধরে আছে শাসা’কে।
“মাই বিউটিফুল ড্যাডি” বাবাকে কিস্ করল বেলা। এরপর বাবার হাত ধরে পাশে দাঁড়িয়ে গেল। আর সবসময়ে যেটা হয় ওদেরকে ঘিরে শুরু হয়ে গেল জটলা।
শ্যাম্পনে চুমুক দিতে দিতে হাসছে সকলে, গল্প করছে। বাইরে অস্তাচলে বসেছে কারুর সূর্য। মেঘের গায়ে যেন আগুন ধরে গেছে।
হঠাৎ করেই কে যেন বলে উঠল: “ড্রেস পরার সময় রেডিওতে শুনেছি ইথিওপিয়ানরা হালি সেলাসিকে সিংহাসন ত্যাগে বাধ্য করেছে।”
“আর যতসব ভক্কর-চক্কর; ডাকাতের দল।” বলে উঠল আরেকজন। “যুদ্ধের সময় সিক্সস ডিভিশনের সাথে ওখানে ছিলাম-পায়ে হেঁটে গেছি, আর শাসা তো হারিকেন নিয়ে ঘুরেছে।”
চোখের কালো পট্টিটা স্পর্শ করলেন শাসা, “তখন এর নাম ছিল আবিসিনিয়া।”
আবারো হাসতে শুরু করল সকলে, এরই মাঝে কেউ বলে উঠল : “হালি সেলাসি কিন্তু বুড়ো হলেও খারাপ ছিল না। এখন কী হবে কে জানেন!”
“কৃষাঙ্গ আফ্রিকার সর্বত্র তো একই অবস্থা-দ্বন্দ্ব, কম্যুনিজম, গুম, অরাজকতা, হত্যা আর মার্কসিজম।”
বিড়বিড় করে অনেকেই সম্মতি জানালেও সবাই এবারে মন দিল সূর্যাস্তের অনিন্দ্র সুন্দর দৃশ্য উপভোগ করার জন্য।
মঞ্চের পর্দা নামার মতো করে হঠাৎ করেই ঝুপ করে নেমে এলো রাত। এতক্ষণে ঠাণ্ডা এসে কাঁপিয়ে দিল সকলকে। ঠিক সময়ে বেজে উঠল ডিনারের মূৰ্ছনা। বারান্দার শেষ মাথায় নিজের আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন সেনটেইন, ফ্রেঞ্চ-উইনডো দিয়ে পথ দেখিয়ে সকলকে নিয়ে গেলেন লম্বা ডাইনিং রুমে; যেখানে সিলভার আর ক্রিস্টালের উপর মোমবাতির আলো পড়ে চমকাচ্ছে পলিশ করা অ্যান্টিক ওয়ালনাট টেবিল।
নিজের আসনের দু’পাশে গ্যারি আর অ্যারনকে পেল ইসাবেলা। বোঝাই যাচ্ছে এটা নানার চাল।
তাড়াহুড়ো করে এসে ওর চেয়ার টেনে দিল অ্যারন। ধুভ্যোরি। কিন্তু একটু পরেই অ্যারনের মজার সব কথা শুনে বিস্মিত বেলা ভুলেই গেল লোকটার টাকের কথা।
