হলভর্তি দর্শকেরা মুগ্ধ হয়ে গেল ইসাবেলা’র তারুণ্যমাখা সৌন্দর্যে। বক্তৃতার শেষে সকলে উঠে দাঁড়িয়ে সম্মান জানালো বেলা’কে; অন্যদিকে ওর পাশে দাঁড়িয়ে অনবরত হাততালি আর মাথা নেড়ে সমর্থন দিল লাল মুখো জনে ভরসটার।
পরের বুধবার সন্ধ্যাবেলা ইসাবেলা’র দু’পাশে পার্টি সাজে এসে দাঁড়িয়েছেন শাসা আর নানা। নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা করা হচ্ছে।
যেমন আশা ছিল তেমন হয়েছে। বিজয়ী দলের মূল্যবান বারোশ ভোটার কেড়ে নিয়েছে ইসাবেলা কোর্টনি, সমর্থকেরা ওর চেয়ার কাঁধে তুলে নাচতে শুরু করে দিল।
পরের সপ্তাহে পার্লামেন্টে বিল্ডিংয়ে নিজের অফিসে বেলা’কে মিটিং করতে ডাকলেন জন ভরসটার। বাবা যখন কেবিনেট মিনিস্টার ছিল, তখন থেকেই বিল্ডিংটা চেনে বেলা।
নিজের মেয়াদকালে মেয়েকে অফিসের দায়িত্ব দিয়েছিলেন শাসা। আর মধ্য কেপ টাউনে এলেই একে ক্লাব হিসেবে ব্যবহার করত বেলা। চওড়া করিডোর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মনে পড়ে গেল বহু স্মৃতি। টিন এজার থাকার সময়ে কখনো মাথা ঘামায়নি জমকালো দালানটার ইতিহাসের মহিমা নিয়ে।
মাত্র পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করিয়ে রাখলেন প্রধানমন্ত্রী। বেলা অফিসে ঢোকার পর ডেস্ক থেকে বের হয়ে এলেন ওকে অভিবাদন জানানোর জন্য।
“আমাকে ডেকে পাঠানোর জন্য ধন্যবাদ, ওওম জন।” বিশুদ্ধ আফ্রিবান ভাষায় কথা বলে উঠল বেলা। যাই হোক, ওওম অথবা আংকেল ডেকে বেশ সম্মান দেখানোয় মনে মনে মেয়েটার নার্ভের প্রশংসা করলেন জন।
“সী পয়েন্টে তোমার পারফরম্যান্সের জন্য কনগ্রাচুলেশন্স বেলা।” পেট নেইম ব্যবহার করায় নিশ্চিন্ত হল বেলা।
“এখন আমার কফি-ব্রেক চলছে।” সাইড টেবিলের উপর রাখা সিলভার আর পোর্সেলিন সার্ভিসের দিকে ইশারা করলেন প্রধানমন্ত্রী, “আমাদের দু’জনের জন্য কফি ঢেলে নেবে?”
কাপের উপর দিয়ে তাকালেন বেলার দিকে, “নাউ ইয়াং লেডি, এমপি তো হলে না, এখন কী করবে?”
“ওয়েল, ওওম জন, আমি বাবা’র হয়ে কাজ-”
“আমি জানি” বেলা’কে থামিয়ে দিলেন জন। “কিন্তু ফ্রেশ ইয়াং পলিটিক্যাল ট্যালেন্টকে’তো এমনই পড়ে থাকতে দিতে পারি না। সিনেটে একটা সিটের কথা কখনো ভেবেছ?”
“সিনেট?” হকচকিয়ে যাওয়ায় কফি’তে পুড়ে গেল ইসাবেলার জিহ্বা। “না, আমি কখনো এ ব্যাপারে ভাবিইনি। কেউ তো বলেওনি-”।
“ঠিক আছে। এখন বলছে। আগামী মাসেই-রিটায়ার করবেন বুড়ো ক্লেইনহান। উনার আসনের জন্যে কাউকে মনোনীত করতে হবে; তাই লোয়ার হাউজে তোমার জন্যে সেইফ সিট না পাওয়া পর্যন্ত এতে কাজ চালাতে হবে।”
রিপাবলিক অব সাউথ আফ্রিকার দুটো লেজিসলেটিভ হাউসের আপার লেভেল হল সিনেট। আপার হাউসের কয়েকটা সিট প্রধানমন্ত্রীর গিফট হিসেবে গণ্য করা হয়; যার একটা এখন বেলা’কে দেয়া হলো।
কফি কাপ নামিয়ে রেখে নির্বাক হয়ে প্রধানমন্ত্রীর দিকে তাকিয়ে রইল ইসাবেলা। সহসা এতটা উপরে যাবার সিঁড়ি পেয়ে মাথা যেন কাজ করতে চাইছে না। “তুমি রাজি…?” জানতে চাইলেন প্রধানমন্ত্রী।
এতটা শর্ট কাটের কথা নানা কিংবা শাসা’ও কখনো স্বপ্নেও ভাবেননি।
হেড্রিক ভারউড নিজে সিনেটে তাঁর পলিটিক্যাল ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন সিনেটের হিসেবে। মাত্র আটাশ বছর বয়সে বেলা’ই হতে যাচ্ছে আপার হাউজের সবচেয়ে তরুণ, বুদ্ধিমান আর আকর্ষণীয় সিনেটর।
ন্যাশনাল পার্টি থেকে কিছুদিনের মাঝেই ও হয়ে উঠবে প্রাইম ফেমিনিস্ট পলিটিক্যাল ফিগার। ক্ষমতার একেবারে ভেতরের অংশে, রাষ্ট্রের গোপন সব অলিগলিতে ওর বিচরণ কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না।
“এতটা সম্মানিত আর কখনো বোধ করিনি, মিঃ প্রাইম মিনিস্টার।” প্রায় ফিসফিস করে জানিয়ে দিল বেলা।
“জানি তুমি দেশের জন্য এরচেয়েও বেশি সম্মান বয়ে নিয়ে আসবে। হাত বাড়িয়ে দিলেন ভরসটার, কনগ্রাচুলেশন্স সিনেটর।”
প্রধানমন্ত্রীর হাত ধরতেই বেলা’র মেরুদণ্ড বেয়ে নেমে গেল অপরাধবোধের শীতল স্রোত; বিশ্বাসঘাতকতার বোধ। কিন্তু সাথে সাথে চিন্তার ঝড় বইতে লাগল মাথার মধ্যে; লাল গোলাপ এখন হয়ে উঠবে ওদের তুরুপের তাস। তাই শীঘিই ওর সব দাবি পূরণ করতে হবে ওদেরকেও।
নিকি আর রামোন। আর বেশি দিন দূরে নেই-সেদিন। আবার আমরা একসাথে হবো।
***
নিরাভরণ আর বিশাল কারু’কে কখনোই তেমন পছন্দ করত না বেলা। কিন্তু কৈশোরে ইভ পালমা’রের লেখা ‘দ্য প্লেইনস্ অব ক্যামডিবু পড়ার পর থেকে কারু’র বিস্ময়কর দুনিয়ার প্রেমে পড়ে যায়। ওর ছোট্ট বেলাতেই এই বিশাল র্যাঞ্চটাকে কিনে নিয়েছেন শাসা।
এখানেই বাবার সাথে খুঁজে বেরিয়েছে দানবীয় সরীসৃপদের ফসিল।
ভয়ংকর যেসব প্রাণীর স্মৃতির প্রতি সম্মান দেখিয়ে খামারবাড়ির নাম রাখা হয়েছে ড্রাগন’স ফাউন্টেন। এছাড়াও টেবিল টপড় মাউন্টনের নিচ থেকে বেরিয়ে আসে মিষ্টি পানির ঝরনা। এর পানি থেকেই পুষ্টি পায় প্রাসাদের সামনের বাগান আর সবুজ লন।
ষাট হাজার একরেরও বেশি জমি নিয়ে ছড়িয়ে আছে এই র্যাঞ্চ। এখানে একসাথে চড়ে বেড়ায় লম্বা পশম অলা ভেড়ার দল আর সুদৃশ্য ছোট ছোট স্প্রিংবক হরিণের পাল। দেখে মনে হয় বাতাসে ভেসে বেড়ানো ধূলিকণা। দারুচিনি রঙা শরীরে মিশে গেছে চকোলেট আর সাদা রঙ। চমৎকার প্যাটার্নের মাথা আর শিংয়ের কারণে ক্যামডিবুর সমভূমিতে চড়ে বেড়ানো অসংখ্য প্রাণের মধ্যে এগুলোই হয়ে উঠেছে। ইসাবেলার সবচেয়ে প্রিয়। আর মরুভূমির ছোট ছোট ঝোঁপ থেকে আহার খুঁজে নেয়ায় ভেড়া আর অ্যান্টিলোপগুলোর সুস্বাদু মাংসে পাওয়া যায় ভেষজ স্বাদ।
