আর হঠাৎ করেই মনে হল এ মেয়েটা নিকোলাসের মা, ভাবতেই কেমন আর্দ্র হল হৃদয়। কিন্তু একই সাথে এহেন অনুভূতি হওয়ায় রেগেও উঠল ভেতরে ভেতরে। আগে কখনো কোন সাবজেক্টের প্রতি এমনটা আর হয়নি। নিজের উপরের রাগ এবার গিয়ে পড়ল বেলার উপর। এই দুর্বলতার জন্য মেয়েটাই দায়ী। শীতের রাতে আগুনের তাপের উপর হাত মেলে দেয়ার মতো করে নিজের রাগকে দমিয়ে ফেলল রামোন।
অন্যদিকে নিচ থেকে তাকিয়ে ইসাবেলার মনে হলো বদ্ধ জানালার ওপাশে কারো অস্পষ্ট নাড়াচাড়া দেখা যাচ্ছে। যাই হোক ওর মনের ভুলও হতে পারে।
এসকর্ট করে নিয়ে আসা মেয়েটা ওর বাহুতে হাত রেখে বলল, “চলুন, ভেতরে যেতে হবে।”
বেল টাওয়ার থেকে চোখ নামিয়ে খোদাই করা কাঠের দরজার দিকে নজর দিল ইসাবেলা। দরজা খুলে যেতেই দেখা গেল আরেকটা মেয়ে ওদের জন্য অপেক্ষা করছে। নিজের ছাই রঙা বিজনেস স্যুটের বোম আটকে কাঁধ উঁচু করে এগিয়ে গেল ইসাবেলা।
শীতল অন্দরে বেশ মনমরা একটা ভাব। হঠাৎ করে থেমে যেতেই ছোট্ট একটা অ্যান্টিচেম্বারের দিকে পথ দেখিয়ে মেয়েটা বলল, “এইদিকে!” ইসাবেলার স্যুটকেস আর বড়সড় একটা পার্সেল সাথে বয়ে আনছে এসকর্ট মেয়েটা। ভারী ওক কাঠের টেবিলের উপর পার্সেল আর স্যুটকেশ রেখে দরজা বন্ধ করে দিল।
“চাবি” হাত বাড়িয়ে দিতেই হ্যান্ডব্যাগ খুঁজে পেতে চাবি বের করে মেয়েটার হাতে দিল বেলা।
দুটো মেয়ে মিলে আতিপাতি করে খুঁজে দেখল পুরো স্যুটকেস। বোঝাই যাচ্ছে এ কাজে তারা বেশ দক্ষ। প্রতিটি কাপড়ের লাইনিং, ক্রীম আর অয়েন্টেমেন্টে সুই ঢুকিয়ে চেক করে দেখল। একস্ট্রা জুতার হিল চেক করে ইলেকট্রিক শেভারের ব্যাটারি খুলে নিল। এরপর নজর দিল পার্সেলের দিকে। একজন আবার হাত বাড়াল হ্যান্ডব্যাগের দিকে।
“প্লিজ কাপড় খুলে ফেলুন। কাঁধ ঝাঁকিয়ে ড্রেস খুলে ফেলল ইসাবেলা। প্রতিটি আইটেম সহ জ্যাকেন্টের সোল্ডার-প্যাড পর্যন্ত চেক করে দেখল মেয়ে দুটো।
পুরোপুরি উলঙ্গ হবার পরে একজন আদেশ দিল : হাত তুলুন।
কথা মতো কাজ করেই প্রচণ্ড ভয় পেয়ে গেল বেলা। মেয়েদের একজন হাতে সার্জিক্যাল গ্লাভস্ পরে ভ্যাসলিনের পটের মধ্যে-দুটো আঙুল চুবিয়ে দিল।
“ওদিকে ঘুরুন।” আদেশ দিতেই মাথা নাড়ল বেলা, “না।”
“আপনি ছেলেটাকে দেখকে চান?” ভারী কণ্ঠে জিজ্ঞেস করতেই ভ্যাসলিন মাখা হাত তুলে ধরল মেয়েটা। “ঘুরে যান।”।
কাঁপতে কাঁপতে ইসবেলা টের পেল হাতের সব লোম দাঁড়িয়ে গেছে।
“ওদিকে ঘুরুন।” একটুও বদলায়নি মেয়েটার গলা। ধীরে ধীরে ওদিকে ফিরল বেলা।
“উপুড় হয়ে হাত টেবিলের উপর রাখুন।”
সামনে ঝুঁকে শক্ত করে টেবিলের কিনারা আঁকড়ে ধরল বেলা।
“পা দুটো আলগা করুন।”
বুঝতে পারল ইচ্ছে করেই তাকে অপমান করা হচ্ছে। জানে এসবই প্রক্রিয়াটার অংশ। মনটাকে জোর করে অন্যদিকে ঘোরাতে চাইলেও মেয়েটার হাত নিজের ভেতরে টের পেয়ে নড়াচড়া শুরু করে দিল।
“নড়বেন না।”
ঠোঁট কামড়ে চোখ বন্ধ করে ফেলল বেলা। বেশ খানিক সময় বাদে মেয়েটা পিছিয়ে দাঁড়াল,
“ঠিক আছে, কাপড় পরে নিন।”
গালের উপর কান্নার ফোঁটা টের পেল বেলা। জ্যাকেটের পকেট থেকে ক্লিনেক্স নিয়ে মুছে ফেলল। এগুলো আসলে ক্রোধের অশ্রু।
“এখানেই অপেক্ষা করুণ।” হাত থেকে গ্লাভস খুলে ওয়েস্টপেপার বিনে ছুঁড়ে মারল মেয়েটা।
দুজনেই দরজা আটকে চলে গেল। রয়ে গেল একা।
তাড়াতাড়ি কাপড় পরে বেঞ্চে বসে পড়ল ইসাবেলা। হাতগুলো এখনো। কাঁপছে। জ্যাকেটের পকেটে ঢুকিয়ে দিল মুষ্টিবদ্ধ হাত।
প্রায় একঘণ্টা অপেক্ষা করতে হলো।
***
রিমোট ভিডিও ক্যামেরাতে সার্চের পুরো অংশটুকু দেখল রামোন। ক্যামেরাটা এমনভাবে বসানো হয়েছিল যেন ইসাবেলার মুখটা স্পষ্ট দেখা যায়। কিন্তু যা দেখল তাতে খচখচ করছে মনের ভেতরে। ভেবেছিল হয়ত মেয়েটাকে বশে আনা গেছে; অথচ তার বদলে বেলার চোখে দেখেছে শীতল ক্রোধের আগুন; চোয়ালের শক্ত, একরোখা ভাবা। এই ক্রোধ কি হত্যা না আত্মহত্যা ডেকে আনবে? নিশ্চিত হতে পারেনি রামোন।
ঠিক সেই মুহূর্তে চোখ তুলে লুকানো ক্যামেরাতে সরাসরি রামোনের চোখের দিকে তাকাল বেলা। নিজেকে সামলে নিল। গাঢ় নীল চোখের উপর যেন পর্দা পড়ে ঢেকে গেল মেয়েটার অভিব্যক্তি।
সোজা হয়ে বসল রামোন। দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলল। যেমনটা ভেবেছিল তাই হলো, একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত কেবল ওকে রুখে রাখা যাবে। এসে গেছে সেই সময়। ভেঙে পড়ার সময় এসেছে মেয়েটার, ঠিক আছে, রামোনও কৌশল পরিবর্তন করতে জানে। এ পরিবর্তনটুকু ও’কে দ্বিধায় ফেলে দেবে। এসব রামোনের কাছে কোনো ব্যাপারই না।
পর্দা থেকে চোখ সরিয়ে মোলায়েম স্বরে আদেশ দিল : “বাচ্চাটাকে নিয়ে এসো।”
নিকোলাসের হাত ধরে পাশের রুম থেকে এদিকে এলো আদ্রা।
মায়ের মতো খুব সাবধানে ছেলের হাবভাবও লক্ষ করল রামোন। আজ সকালেই চুল ধুয়ে দিয়েছে আদ্রা। কপালের উপর লুটিয়ে পড়েছে উজ্জ্বল কোকড়ানো চুল। সাদাসিধা ড্রেস পরিয়ে দেয়ায় ফুটে উঠেছে শরীরের মসৃণ ভাব, গোলাপি ঠোঁট, বড় বড় চোখের উপরে বাকানো। যে কোনো মায়ের অন্তর বিগলিত করার জন্য যথেষ্ট।
“মনে আছে আমি কী বলেছি নিকোলাস?”
“হ্যাঁ পাদ্রে।”
