***
পুরাতন শহরের স্প্যানিশ কলোনিয়াল দালানগুলো একটাতে সাময়িক তানজানিয়ার দূতাবাস স্থাপন করা হয়েছে।
এখানেই ইথিওপিয়ার লোকেরা রামোনের জন্য অপেক্ষা করছিল। তিনজন তরুণই সম্রাট হালি সেলেসি’র রাজকীয় সেনা বাহিনীর অফিসার। এদের মাঝে একজনকে যথেষ্ট পছন্দ করে রামোন মাচাদো। ক্যাপ্টেন গেটাশ আবিবি’র সাথে এর আগেও কয়েকবার আদ্দিস আবাবা’তে দেখা হয়েছে।
ক্যাপ্টেন গেটাশ’র মাঝে ঐতিহ্যবাহী খাঁটি আফ্রিকান এভাবে পুরোপুরি ভাবে বিদ্যমান আদ্দিস আবাবা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ও লেকচারার হিসেবে। জো সিসেরো আমেরিকান এবং ব্রিটিশ মার্সিস্ট ভাবধারা ছড়িয়ে কিছু শিষ্য তৈরি করে গেছেন। যেসব প্রতিভাবান ছাত্রদের একজন গেটাশ আৰিবি হয়ে উঠেছে নিবেদিত প্রাণ মাকর্সিস্ট লেনিনিস্ট।
লোকটাকে নির্বাচন করার আগে বহু বছর ধরে তাকে পরখ করে দেখেছে রামোন। প্রমাণ পেয়েছে বুদ্ধিমান, নিষ্ঠুর আর কঠিন হৃদয়ের এক কর্মে বিশ্বাসী সৈনিককে।
‘গেটাশ’র বয়স ত্রিশের খানিকটা উপরে হলেও তাকেই ইথিওপিয়ার পরবর্তী নেতা হিসেবে পছন্দ করে রেখেছে রামোন।
তাই তানজানিয়া দূতাবাসের পেছন দিকে আবদ্ধ এক সিটিং রুমে হাত মেলানোর সময় চোখ পাকিয়ে ইশারা করে সাবধান করে দিল গেটাশ’ কে। দেয়ালে ঝোলানো আফ্রিকার উপজাতির মুখোশগুলোর যেকোনটাতে লুকিয়ে থাকতে পারে গোপন মাইক্রোফোন।
মাত্র আধ ঘন্টার সংক্ষিপ্ত আলোচনা শেষ করে বিদায়ক্ষণে আবারো হাত মেলাতে গিয়ে আবিবি’র কানে ফিসফিস করে মাত্র চারটা শব্দ বলে দিল রামোন-একটা জায়গা আর সময়।
এক ঘণ্টা পরে আবারো বোদোগিটা ডেল মিডিওতে দেখা করল দু’জনে। এটিই পুরাতন শহরের সবচেয়ে বিখ্যাত বার। দেয়ালে আঁকা গ্রাফিতির মাঝে দেখা গেল সাধারণ থেকে শুরু করে বহু বিখ্যাত মানুষের সিগনেচার : হেমিংওয়ে, স্পেনসার ট্রেসি অ্যান্ড এডওয়ার্ড, ডিউক অব উইন্ডসর সবাই এসেছিলেন এখানে ডিংক করতে। ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন লম্বা রুমটাতে কাস্টোমারদের চিৎকারের সাথে পাল্লা দিয়ে বাজছে “বেম্বে” ফোক মিউজিক। দুজনে একেবারে কোণার দিকে বসে মোজিতে অর্ডার করেছে। গ্লাসের গা বেয়ে পড়ে টেবিলের উপর গোলকার বৃত্ত রচনা করেছে।
কিন্তু কেউই ড্রিংক ছুঁয়েও দেখেনি।
“কমরেড সময় প্রায় হয়ে গেছে।” রামোনের কথা শুনে মাথা নাড়ল আবিবি।
“আমহারার’র সিংহের যথেষ্ট বয়স হয়েছে, দাঁত ও পড়ে গেছে; আর ছেলেটা তো মহাগাধা শত বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ আর ক্ষুধার জ্বালায় ধুকছে। সুতরাং এখনই উপযুক্ত সময়।”
“তবে দুটো ব্যাপার খেয়াল রাখতে হবে।” সাবধান করে দিল রামোন। “ প্রথমটা হচ্ছে সশস্ত্র বিপ্লব পরিহার করতে হবে। যদি সেনাবাহিনী এখনই ক্ষেপে গিয়ে সম্রাটকে মেরে ফেলে, তোমার কোনো লাভ হবে না। র্যাঙ্কিং এর দিক থেকে জুনিয়র হওয়াতে তোমাকে টপকে কোনো জেনারেল ক্ষমতায় বসে যাবে।’
“তাহলে?” জানাতে চাইল আবিবি, “এর সমাধান কী?”
“নিঃশব্দ বিপ্লব।” রামোনের মুখে উচ্চারিত শব্দদুটো জীবনে এই প্রথমবার শুনলো আবিবি।
“তাই নাকি!” বিড়বিড় করে উঠল আবিবি। অন্যদিকে রামোন ওকে বুঝিয়ে বলল,
“এখন যেটা করতে হবে তা হল, ডার্গ হালি সেলসি’কে জানিয়ে দেবে সিংহাসন ত্যাগ করার দাবি। তোমার কথা মত। বুড়ো সিংহ তার দাঁত হারিয়ে বাধ্য হবে এ দাবি মেনে নিতে। আর এপাশ থেকে তুমি ডার্গকে প্রভাবিত করবে অন্যপাশ থেকে আমি।”
বিভিন্ন গোত্র আর সেনাবাহিনী, সরকারের সব ধরনের ডিপার্টমেন্ট আর ধর্মীয় প্রধানদের নিয়ে গঠিত ডার্গ হচ্ছে ইথিওপিয় সংসদ। আদ্দিস আবাবা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কসিস্ট এসব সদস্যের বেশির ভাগ রামোনের চতুর্থ ডিরেকটরেটের কথায় উঠে আর বসে। গেটাশ আবিবিকেও সবাই নেতা হিসেবে মেনে নিয়েছে।
“এরপর প্রভিশনাল মিলিটারি বেসড জান্তা বসিয়ে কিউবা থেকে সৈন্য নিয়ে আসবো। যাতে করে শক্ত হবে তোমার অবস্থান। সবকিছু একবার খাপে খাপে বসে গেলেই শুরু হবে পরবর্তী পদক্ষেপ।”
“সেটা কী?” জানতে চাইল আবিবি।
“সম্রাটকে সরিয়ে দিতে হবে; নচেৎ রাজপরিবারের সমর্থকেরা মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে।”
“মেরে ফেলা?”
“এটা আসলে একটু বেশিই পাবলিক আর আবেগপ্রবণ হয়ে যায়।” মাথা নাড়ল রামোন।
“তারচেয়ে বৃদ্ধ হওয়াতে এমনিই মারা যাবে আর এরপর…”
“আর এরপর একটা নির্বাচন?” বাধা দেয়াতে আবিবি’র দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল রামোন। ইথিওপিয়াটার পুরু বেগুনি ঠোঁটে কৌতুকের হাসি দেখে কেবল নিজেও হাসল।
“তুমি তো আমাকে চমকে দিয়েছ কমরেড।” স্বীকার করল রামোন। “এক মুহূর্তের জন্য তো মনে হয়েছিল যে তুমি সত্যি সিরিয়াস। নতুন প্রেসিডেন্ট আর সরকার গঠন করার আগে এটাই হবে আমাদের শেষ কাজ। জনগণ নিজেদেরকে চালানো তো দূরের কথা ব্যক্তিটাকেও পছন্দ করতে পারে না। তাই তাদের হয়ে এ দায়িত্ব আমরাই পালন করব। এরও বহুদিন পরে তোমাকে মার্কসিস্ট সোশালিস্ট সরকার হিসেবে ঘোষণা করার পরেই নিয়ন্ত্রিত আর সুশৃঙ্খল নির্বাচন দেয়া হবে।”
“আদ্দিসে আপনাকে আমার দরকার, কমরেড।” আকুতি করল-আবিবি। “সামনের বিপদজনক দিনগুলোতে আপনার গাইডেন্স আর কিউবার ডান হাত প্রয়োজন আমার।”
