“রেজাল্ট তো ভাল পাচ্ছি।” আশ্বস্ত করল রামোন।
“চলো, জানালার পাশে বসি।”
ডেস্কের উপরে কোণার বাক্স থেকে দুটো সিগার পছন্দ করে এনে রামোনের হাতে দিলেন। রামোনকে সিগারেট জ্বালাতে সাহায্য করে নিজেরটাও ধরালেন; তারপর মুখের এক কোণায় জ্বলন্ত সিগারেট রেখে জানতে চাইলেন,
“তো মস্কোর কী-খবর?
ইউদিনিচের সাথে দেখা হয়েছে?”
“হ্যাঁ। আর মিটিংটাও ভাল হয়েছে…”।
নিজের রিপোর্ট সম্পর্কে খুলে বলল রামোন। দুজনের চরিত্রে বেশ কিছু মিল আছে। কেউই কোনো পদবী কিংবা সুবিধার জন্য লালায়িত নয়। রামোন জানে তার অবস্থান কোথায়। দুই ভাইয়ের মাঝে আছে রক্ত আর আত্মার সম্পর্ক।
হ্যাঁ, ক্যাস্ট্রো বদলে যেতে পারেন। যেমনটা হয়েছে চে গুয়েভারার ক্ষেত্রে; গ্রনমা থেকে আসা সেই হিরো; বিরাশি জনের মাঝে তিনিও একজন। কিন্তু ক্যাস্ট্রোর অর্থনৈতিক নীতির বিরোধিতা করায় দু’জনের আর বনিবনা হয়নি। কিন্তু রামোনের সাথে কখনো এমন কিছু হবে না।
‘রপ্তানি পরিকল্পনার নতুন অংশকে সহায়তা করতে রাজি হয়েছেন ইউদিনিচ।” রামোনের কথা শুনে মিটিমিটি হাসলেন ফিদেল ক্যাস্ট্রো।
তিনটি মাত্র শস্যের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে কিউবার সম্পদ; চিনি, কফি, তামাক। কিন্তু সামাজিক সমৃদ্ধি আর শহরায়ণের জন্যে ক্যাস্ট্রের উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণে যথেষ্ট অর্থের যোগান দিতে অক্ষম এসব সম্পদ।
বিপ্লবের পরের সময়ের চেয়ে এখনকার জনসংখ্যাও দ্বিগুণ। আগামী দশ বছর আরো বেড়ে যাবে। এসব সমস্যারই সমাধানের পরিকল্পনা করেছে রামোন। অর্থের পাশাপাশি বেকারত্ব দূর হবে।
“নতুন রপ্তানিযোগ্য এই পণ্য হলো মানুষ। নারী এবং পুরুষ যোদ্ধা। পৃথিবীর প্রতিটি কোণায় এদেরকে পাঠিয়ে দেয়া হবে ভাড়াটে সৈন্য হিসেবে বিপ্লবের বীজ বপনের জন্য। আর এভাবে দ্বীপের প্রায় দশ শতাংশ জনশক্তি রপ্তানি হয়ে যাবে। একবারের ধাক্কাতেই বেকারত্ব দূর হয়ে যাবে।
প্রথম যেদিন রামোনের মুখে এ পরিকল্পনা শুনেছেন সেদিন থেকেই তা পছন্দ করে ফেলেছেন ফিদেল ক্যাস্ট্রো। এ ধরনের অর্থনীতি তিনি সহজেই বোঝেন আর প্রশংসাও করেন।
“ইউদিনিচ। ব্রেজনেভকে জানাবেন” নিশ্চয়তা বিড়ালের গায়ে হাত বোলানোর মতো করে নিজের দাঁড়িতে হাত বোলালেন ফিদেল ক্যাস্ট্রো।
“যদি ইউদিনিচ সুপারিশ করেন, তাহলে আমাদের আর ভয় নেই।” হাঁটুর উপর হাত রেখে সামনে ঝুঁকলেন ক্যাস্ট্রো,
“আর আমরা তো জানিই যে তুমি ওদেরকে কোথায় পাঠাতে চাও।”
“আজ বিকেলে তানজানিয়ার অ্যামব্যাসিতে মিটিং করব” জানাল রামোন।
হাবানা’তে আফ্রিকার সতেরটি দেশের দূতাবাস আছে। এদের মধ্যে। সবচেয়ে বড় মার্কসিস্ট হলেন তানজানিয়ার জুলিয়াস নায়ারে।
আফ্রিকার অন্যান্য যেসব কলোনিয়াল স্বাধীনতার জন্যে লড়াই করছে, তাদেরকে সক্রিয় সহযোগিতা করে তানজানিয়াবাসী। পর্তুগিজ, অ্যাংগোলা, মোজাম্বিক, দক্ষিণ আফ্রিকা, ইথিওপিয়া সব দেশের মুক্তিযযাদ্ধারাই তানজানিয়াতে আশ্রয় পেয়েছে।
“ইথিওপিয়ার সেনাবাহিনীর সাথেও আমি মিটিং করেছি। মাকর্সিস্ট সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী এ সৈন্যরা রুখে দাঁড়াতে প্রস্তুত।”
“হ্যাঁ, মাথা নাড়লেন ক্যাস্ট্রো।”
“ইথিওপিয়া আমাদের বেশ কাজে লাগবে।”
নিজের সিগারের দিকে তাকিয়ে দেখল রামোন। ছাই প্রায় দুই ইঞ্চি লম্বা হয়ে গেছে। জানাল, “আমরা সবাই জানি যে ভাগ্য কী চাইছে? আফ্রিকা অপেক্ষা করছে আপনার জন্য।”
সন্তুষ্ট হয়ে চেয়ারে হেলান দিলেন ক্যাস্ট্রো, বলে চলল রামোন : “মাদার রাশিয়াকে আফ্রিকানরা অন্তর থেকে অবিশ্বাস করে। দুর্ভাগ্যের বিষয় হচ্ছে অসংখ্য-গুণ থাকা সত্ত্বেও রাশানরা বর্ণবাদী। বহু আফ্রিকান নেতা রাশিয়াতে পড়াশোনা করেছেন। আবার প্যাট্রিস লুমাম্বা ইউনিভার্সিটি করিডর দিয়ে হাঁটার সময় “বানর” খেতাবও শুনেছেন। শ্বেতাঙ্গ রাশানদেরকে তাই কোন মতেই বিশ্বাস করেনা আফ্রিকা।”
সিগারেটে টান দিয়ে চুপ করে গেল রামোন। নীরবতা ভাঙ্গলেন ক্যাস্ট্রো’ “তারপর”
“অন্যদিকে এল জেফে আপন হচ্ছেন আফ্রিকার পৌত্র….কিন্তু মাথা নাড়লেন ক্যাস্ট্রো।
“আমি স্প্যানিশ।” শুধরে দিলেন।
হেসে ফেলে রামোন বলে চলল, “যদি আপনি বলেন যে, আপনার পিতৃপুরুষকে হাভানা’তে দাস হিসেবে বিক্রি করা হয়েছিল, তাহলে কেই-বা, সন্দেহ করবে?” পরামর্শ দেবার মতো করে আরো যোগ করল, “আর তাহলে ভাবুন তো আফ্রিকার’র উপরে আপনার কতটা প্রভাব পড়বে?”
নিঃশব্দে পুরো ব্যাপারটা নিয়ে ভাবলেন ক্যাস্ট্রো। ওদিকে রামোন মোলায়েম স্বরে জানালো, “আমরা আপনার জন্যে একটা ট্যুরের ব্যবস্থা করব। মিশর থেকে শুরু করে এই বিজয়ে যাত্রা দক্ষিণ বিশটা দেশের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাবে, আর আপনি প্রচার করবেন আফ্রিকার জনগণ নিয়ে উদ্বেগ ও প্রত্যাশার কথা। এক্ষেত্রে নিজেকে যদি ওদের একজন হিসেবে তুলে ধরতে পারেন তাহলে দু’শ মিলিয়ন আফ্রিকান কতটা প্রভাবিত হবে, বলতে পারেন?” সামনে ঝুঁকে ক্যাস্ট্রোর কব্জি স্পর্শ করল রামোন। “আর নয় ছোট্ট একটা দ্বীপের রাষ্ট্রপ্রধান কিংবা আমেরিকার হাতের পুতুল, হয়ে উঠবেন মহান আর শক্তিশালী এক বিশ্বনেতা।”
“মাই গোল্ডেন ফক্স” মিষ্টি হেসে বলে উঠলেন, ক্যাষ্ট্রো, “কেন যে তোমাকে এত ভালোবাসি!”
