“গুড ডে, নিকোলাস।” ছেলের বাড়ানো হাত ধরে হ্যান্ডশেক করল রামোন।”
“পাদ্রে” শব্দটা নিশ্চয়ই আদ্রা শিখিয়েছে। এতদূর পর্যন্ত মেনে নেবে বলে কখনো ভাবেইনি রামোন। কিন্তু অবশেষে খুশিই হলো। যাই হোক এতটা সামাল দেবার মতো চারিত্রিক দৃঢ়তা তার আছে।
“এখানে বসো।” দেয়ালের উপর নিজের পাশে ছেলেকে জায়গা দেখিয়ে দিল রামোন। ছোট্ট পা ঝুলিয়ে বসে পড়ল নিকোলাস।
পিতা-পুত্র দু’জনেই খানিকক্ষণ চুপ করে থাকার পর রামোন জানতে চাইল,
“কী করেছিলে?”
প্রশ্নটাকে গভীরভাবে ভেবে নিকোলাস জানাল, “সারাদিন স্কুলে ছিলাম।”
“স্কুলে কী পড়ায়?”
ড্রিল শিখি আর বিপ্লবের গান।” খানিক ভেবে যোগ করল। “ছবিও আঁকি।”
আবারো চুপ হয়ে গেল বাপ-বেটা। একটু পরে নিকোলাসই আবার শুরু করল, “বিকেল-বেলা সাঁতার কাটি, ফুটবল খেলি। সন্ধ্যাবেলা আদ্রাকে ঘরের কাজে সাহায্য করি। এরপর দুজনে একসাথে টিভি দেখি।
ওর বয়স মাত্র তিন; নিজেকে মনে করিয়ে দিল রামোন। কোনো পশ্চিমা বাচ্চাকে একই প্রশ্ন করা হলে উত্তরে হয়ত বলত কিছুই না।” কিংবা “এমনিই’ অথচ নিকোলাস একেবারে বিজ্ঞের মতো ভেবে চিন্তে উত্তর দিচ্ছে। ছোট্ট একটা বুড়া।
“তোমার জন্য একটা উপহার এনেছি।” জানাল রামোন।
“ধন্যবাদ, পাদ্রে।
“জানতে চাও না, কী?”
“তুমি আমাকে দেখাবে, তাহলেই জেনে যাব।”
একে অ্যাসল্ট রাইফেলের প্লাস্টিক মডেল। মিনিয়েচার হলেও আসলের মতো বুলেট। ম্যাগাজিন সবকিছু আছে।
চকচক করে উঠল নিকোলাসের চোখ। কাঁধে তুলে সৈকতের দিকে নিশানা করল। রামোন আসার পর এতক্ষণে স্বতস্ফূর্তভাবে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করল ছেলেটা। ট্রিগার টিপতেই খেলনা রাইফেল যুদ্ধের মতো কটকট শব্দ করে উঠল। “বেশ সুন্দর। ধন্যবাদ, পাদ্রে।” খুশি হলো নিকোলাস।
“বিপ্লবের সন্তানের জন্য এটা সত্যিই ভাল একটা খেলনা।” জানাল রামোন।
“আমি সত্যিই বিপ্লবের সাহসী সন্তান?”
“একদিন হবে।”
“কমরেড কর্নেল, ওর গোসলের সময় হয়েছে।” এগিয়ে এলো আদ্রা।
নিকোলাসকে নিয়ে কটেজের ভেতর চলে গেল আদ্রা। ওদের সাথে যাবার ইচ্ছে করলেও বুর্জোয়া অনুভূতি ভেবে সে চিন্তা বাতিল করে দিল রামোন। তার বদলে বারান্দার কোণে রাখা টেবিলের উপর থেকে লাইম জুস আর বিশ্বসেরা হাভানা ক্লোব রাম নিল। সাথে মিগেল ফারনানদেজ সিগার। ওর পছন্দ জানে আদ্রা। সব জায়গামতই আছে।
বাথরুম থেকে ভেসে আসছে আদ্রা আর তার পুত্রের আনন্দোচ্ছল হুটোপুটির শব্দ। নিজেকে যোদ্ধা ভাবতেই ভালোবাসে রামোন। অথচ বাচ্চাটা থাকতে মনে হচ্ছে আপন গৃহে ফিরেছে।
খাবারে চিকেন সাথে ব্ল্যাকবিন আর হোয়াইট রাইস এনে দিল আদ্রা। ডিজি’এর মাধ্যমে রেশনের ব্যবস্থাও করেছে রামোন। যেন ছেলের বেড়ে উঠায় কোনো অভাব না থাকে।
“কদিন পরেই আমাদের সাথে বেড়াতে যাবে তুমি।” খেতে খেতে নিকোলাসকে জানাল রামোন, “সমুদ্রের ওপারে। তোমার ভাল লাগে ভ্রমণ?”
“আদ্রাও কি আমাদের সাথে আসবে?”
প্রশ্নটা শুনে খানিক বিরক্ত হয়ে গেল রামোন। বুঝতে পারল না যে এটি ঈর্ষা। সংক্ষেপে উত্তর দিল, “হ্যাঁ।”
“তাহলে ভাল লাগবে।” মাথা নাড়ল নিকোলাস, “কোথায় যাবো?”
“স্পেন। তোমার পূর্বপুরুষের ভূমি, তোমার জন্মস্থানে।”
ডিনারের পর নিকোলাসকে এক ঘণ্টা টিভি দেখার অনুমতি দেয়া হয়। তারপর চোখ ঢুলুঢুলু হয়ে গেলেই ওকে বিছানায় নিয়ে শুইয়ে দেয় আদ্রা।
এরপর লিভিং রুমে ফিরে এলো আদ্রা। রোমোনের কাছে জানতে চাইল, “আমাকে দরকার আজ রাতে?”
মাথা নাড়ল রামোন। আদ্রার বয়স চল্লিশেরও বেশি। কখনো সন্তানের মা না হওয়া এই নারী রামোনকে উত্তেজিত করে তোলার বিভিন্ন কৌশল জানে। আর মাঝে মাঝেই তা প্রয়োগও করে। এরকম সহজাত প্রেমিক স্বভাবের আর কাউকে দেখেনি রামোন-এছাড়াও সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো আদ্রা ও’কে ভয় পায়; যা দু’জনের আনন্দই বাড়িয়ে তোলে।
***
ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে স্রোতের বিপরীতে প্রায় দুই মাইল সাঁতার কেটে এলো রামোন।
ফিরে এসে দেখল, স্কুলের যাবার জন্য তৈরি হয়ে গেছে নিকোলাস। বাদামি প্যারাট্রুপারের পোশাক আর নরম টুপি পরে নিল রামোন। অপেক্ষারত জিপে গিয়ে গর্বিত ভঙ্গিতে বাবার পাশে বসল নিকোলাস। এরপর মেইন গেইটের পাশে নার্সারী স্কুল।
আখের ক্ষেত্রে কাজ চলাতে হাভানা’তে পৌঁছাতে প্রায় দুই ঘণ্টারও বেশি। লেগে গেল। পাহাড়ের উপর আকাশ ছেয়ে আছে আখের ধোয়ায়।
শহরে পৌঁছে বিশাল প্লাজা ডি লা রেভোলিউশন এর কোণায় রামোনকে নামিয়ে দিল ড্রাইভার। পাশেই আছে জনগণের হিরো জোসে মারতির ওবেলিস্ক।
ফিদেল ক্যাস্ট্রোর বক্তৃতা শোনার জন্য এ জায়গাতেই এসে জড়ো হয় হাজার হাজার কিউবান।
প্রেসিডেন্টের অফিসও এখানে। এই অফিসেই রামোনকে স্বাগত জানালেন, ফিদেল ক্যাস্ট্রো।
কাগজপত্র-আর রিপোর্ট দিয়ে ভর্তি বিশাল ডেস্কের ওপাশ থেকে উঠে এসে রামোনকে জড়িয়ে ধরলেন ক্যাস্ট্রো।
“মি জোরো ডোরাডো” খুশিতে হেসে উঠলেন ফিদের ক্যাস্ট্রো।” মাই গোল্ডেন ফক্স, অনেকদিন পর তোমাকে দেখে বেশ ভালো লাগছে।”
“ফিরে এসে আসলেই ভাল লাগছে এল জেফে। সত্যিকথাই বলল রামোন। সবার চেয়ে বেশি এই মানুষটাকেই সে ভালোবাসে, শ্রদ্ধা করে।
রামোনের চেহারাতে কী যেন দেখলেন ফিদেল ক্যাস্ট্রো, “তোমাকে বেশ ক্লান্ত দেখাচ্ছে কমরেড। বেশি বেশি পরিশ্রম করছ?”
