অন্যদের থেকে খানিকটা তফাতে দাঁড়িয়ে আছে নিকোলাস। ছেলেকে দেখতে পেল রামোন, বুকের ভেতরটা যেন কেমন করে উঠল। মাত্র গত বছর থেকে জন্ম নেয়া এই অনুভূতি এর আগে সীমাবদ্ধ ছিল “দ্য চাইল্ড” কিংবা “লাল গোলাপের সন্তান” নামে। এখন আমার ছেলে” ভাবলেও তা কোথায় উচ্চারণ করা কিংবা লিখে রাখা হয় না।
কটেজের বারান্দা থেকে নেমে সৈকতের দিকে এগিয়ে গেল রামোন। নিচু একটা দেয়ালের উপর বসে দেখতে লাগত ছেলের কাণ্ড কারখানা।
বয়স মাত্র তিন হলেও নিকোলাসকে এর চেয়েও বড় দেখায়। ইতিমধ্যেই বেশ লম্বা হয়ে উঠতে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়ানোর ভঙ্গিটা দেখে মনে পড়ে গেল মাইকেল অ্যাঞ্জোলর ‘ডেভিড”-এর কথা।
ছেলেটার অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা প্রকাশ পাবার পর থেকেই বেড়ে গেছে রামোনের আগ্রহ। ক্যাম্প নার্সারি স্কুলের টিচার রিপোর্টে লিখেছে, নিকোলাসের ড্রেয়িং আর কথা-বার্তা বড় বয়সী বাচ্চাদেরই মতন। এরপর থেকেই নিকোলাসের বেড়ে উঠা নিয়ে সচেতন হয়ে উঠেছে রামোন। হাভানা’র ডিজিএ’র মাধ্যমে আদ্রা আর নিকোলাসের জন্য এ জায়গার ব্যবস্থা করেছে।
স্টেট সিকিউরিটিতে এখন আদ্রার পদবী লেফটেন্যান্ট। এ ব্যবস্থাও রামোনেরই করা। নতুবা বুয়েনেভনতারার কটেজ কিংবা মিলিটারি নার্সারি স্কুলে নিকোলাসকে ভর্তি করা যেত না।
প্রথম দুই বছর বাচ্চাটাকে একবারও দেখেনি রামোন। কেবল লাল গোলাপকে পাঠানোর জন্য তৈরি করা মিলিটারি ক্লিনিক আর এডুকেশন ডিপার্টমেন্টের রিপোর্টগুলো পড়ত। ধীরে ধীরে এসব রিপোর্ট আর ছবি দেখে মনের মাঝে আগ্রহ জন্মে উঠে।
প্রথমবার, মনে হলো ওকে দেখার সাথে সাথে চিনে ফেলেছিল নিকোলাস। আদ্রা’র পায়ের ফাঁকে লুকিয়ে ভয়ার্ত চোখে তাকিয়ে ছিল রামোনের দিকে। বুয়েনেভেনতারা’র সামরিক ক্লিনিকের সাদা অপারেটিং রুমে শেষবার দেখেছিল পিতার মুখ। নিকোলাসকে তখন আংশিকভাবে ডুবিয়ে রাখার নাটক করা হয়েছিল লাল গোলাপকে বশে আনার জন্যে। মাত্র কয়েক সপ্তাহ বয়সের নিকোলাসের তো এ স্মৃতি মনে থাকার কথা নয়-তারপরেও রামোনকে দেখে ওর প্রতিক্রিয়া কাকতালীয় হতে পারে না।
বাচ্চাটার ভয়ার্ত চেহারা দেখে রামোন নিজেও অবাক হয়ে গিয়েছিল।
নিজের মা আর কাজিন ফিদেল ছাড়া আর কোনো মানুষের প্রতিই তার তেমন কোনো গভীর সহানুভূতি নেই। আর সবসময় এটাকে নিজের সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবেই ভেবে এসেছে। পুরোপুরি যুক্তি নির্ভর সিদ্ধান্ত নিতে তাই কোনো সমস্যাও হয় না। প্রয়োজন হলে সঙ্গী কমরেডকে বলি দিতেও দ্বিধা করে না। কোন রকম মায়া মমতার স্থান না দিয়ে নিজেকে ইস্পাত কঠিন হিসেবে গড়ে তোলার পরেও আজকাল হৃদয় ভরে উঠে আর্দ্র সব অনুভূতিতে।
রৌদ্রস্নাত উজ্জ্বল ক্যারিবীয় সৈকতে বসে ছেলেটাকে দেখে আপন মনেই হাসল রামোন। “তলোয়ারের গায়ে চুল সমান চিকন একটা ফাটল; কেননা ও আসলে আমারই অংশ। আমার রক্ত মাংস দিয়ে গড়া অমরত্বের প্রত্যাশা।”
আবারও মনে পড়ে গেল মিলিটারি ক্লিনিকের কথা। চোখের সামনে ভেসে উঠল ডাক্তারের হাতে ধরা ছটফট করতে থাকা ছোট্ট শরীর আর্ত চিৎকার করতে করতে ট্যাংকে ডুবে যাওয়া ছোট্ট একটা মাথা।
সে সময় আসলে সেটাই জরুরি ছিল; যা নিয়ে এখন মনস্তাপের কিছু নেই। আর বুদ্ধিমানরা তাই করে।
নিচু করে পায়ের কাছ থেকে ঝিনুকের খোসা কুড়িয়ে নিল নিকোলাস। হাতে নিয়ে মনোযোগ দিয়ে দেখল।
ঘন আর কালো কোকড়া চুলগুলোতে লেগে আছে সামুদ্রিক নোনা জল। মায়ের সাথে বেশ মিল দেখা যাচ্ছে ছেলেটার। ক্ল্যাসিক্যাল নাক আর চোয়ালের পরিষ্কার মিষ্টি রেখা এখান থেকে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে রামোন। কিন্তু সবুজ চোখগুলো ঠিক তার নিজের মত।
হঠাৎ করেই শান্ত জলে হাতের ঝিনুক ছুঁড়ে মারল নিকোলাস। এরপর ঘুরে দাঁড়িয়ে পানির কিনার দিয়ে একা একা হাঁটতে শুরু করল। ঠিক সেই মুহূর্তে ছেলে-মেয়েদের হট্টগোলের মাঝে থেকে চিৎকার শুরু হল। ছোট্ট একটা মেয়ে সাদা বালির উপর গড়িয়ে পড়ে গর্জন করে উঠল, “নিকোলাস!”
কিছুই হয়নি এমন ভঙ্গিতে কাছে গিয়ে মেয়েটাকে তুলে দাঁড় করালো নিকোলাস। ছোট্ট সুন্দরীর বিশাল কালো চোখ জোড়া থেকে গড়িয়ে পড়ছে অশ্রু, গালে বালি, গায়ের পোশাক খুলে হাঁটুর উপর নেমে এসেছে।
মেয়েটার বাথিং স্যুট ঠিক করে দিয়ে, হাত ধরে পানির কাছে নিয়ে গেল নিকোলাস। গাল থেকে বালি আর চোখ থেকে পানি ধুয়ে দিল। অবশেষে চিৎকার থামালো মেয়েটা।
নিকোলাসের হাত ধরে পাশাপাশি দৌড়ে দুজনে উঠে এলো সৈকতে।
“চলো তোমাকে তোমার মাম্মার কাছে দিয়ে আসি।” কথা বলতে বলতেই চোখ তুলে বাবাকে দেখে থেমে গেল নিকোলাস।
রামোন দেখল চোখে ভয়ের আভা তাড়াতাড়ি লুকিয়ে ফেলল ছেলেটা। চিবুকটাকে দৃপ্ত ভঙ্গিতে তুলে ধরে অভিব্যক্তি শূন্য হয়ে গেল চেহারা।
যা দেখল তাতে খুশিই হল রামোন। কেননা ছেলেটার ভয় থেকেই জন্ম নিবে শ্রদ্ধা আর বাধ্যতা। আবার এটাও ভালো যে নিজের ভয়কে সে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। নেতৃত্ব দিতে পারার প্রধান গুণগুলোর একটি হলো, ভয়কে নিয়ন্ত্রণ করতে পারা।
ও আমার ছেলে; ভাবতে ভাবতেই এক হাত উঁচু করে আদেশ দিল রামোন, “এখানে এসো।”
নিকোলাসের হাত ছাড়িয়ে সৈকতের দিকে চলে গেল ছোট্ট মেয়েটা। স্পষ্ট দেখা গেল শরীর শক্ত করে বাবার দিকে এগিয়ে এলো নিকোলাস; হাত বাড়িয়ে দিয়ে জানালো, “গুড ডে, পাত্রে।”
