কনফারেন্স রুমের সকলে চুপ হয়ে গেল। স্তব্ধ হয়ে অনুভব করতে চাইল পুরো পরিকল্পনার বিশালতু। নীরবতা ভাঙ্গলেন আলেক্সেই-ইউদিনিচ। কাশি দিয়ে জানতে চাইলেন, “কত খরচ পড়বে এতে?”
“বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার।” রামোন স্বীকার করতেই শক্ত হয়ে গেল ইউপিনিচের চেহারা।” ডেমোক্রেটিক পার্টি আমাদের হয়ে সুর বাজাবে; কিন্তু বংশীবাদকে পয়সা দেবে আমেরিকান জনগণ।”
সারা বিকেলে প্রথমবারের মতো হাসলেন মিনিস্টার ইউদিনিচ। আরো দুই ঘণ্টা আলোচনার পর বেল বাজিয়ে সহকারীকে ডাকলেন ইউরি বেরোদিন।
“ভদকা” অর্ডার করলেন ইউরি।
রূপার ট্রে’তে করে এলো ঠাণ্ডা বোতল।
আমেরিকার ডেমোক্রেটিক পার্টির নামে প্রথম টোস্ট করলেন আলেক্সেই হাসতে হাসতে একে অন্যের পিঠ চাপড়ে দিল সকলে।
আস্তে আস্তে রামোনের কাছে সরে এসে কাঁধে কাঁধ ঠেকিয়ে দাঁড়ালেন ডিরেক্টর বোরোদিন। মেধাবী এই সাব অর্ডিনেটের প্রতি যে অত্যন্ত খুশি হয়েছেন তা বলাই বাহুল্য।
***
শহরের সবচেয়ে সুন্দর অংশগুলোর একটাতে ক্যাটরিনার ফ্ল্যাট। জানালা দিয়ে দেখা যায় গোকিং পার্ক। লিফট না থাকায় সিঁড়ি বেয়ে ছয় নম্বর ফ্লোরে উঠে এলো রামোন। মাথা থেকে ভদকার নেশা কাটাতেও সাহায্য করেছে এই এক্সারসাইজ।
বাধা কপির সাইড ডিশ দিয়ে পোর্কের সসেজ বানিয়েছেন ক্যাটরিনার মা; পুরো অ্যাপার্টমেন্ট ব্লক বাধাকপি সেদ্ধর গন্ধে ম-ম করছে।
ক্যাটরিনার পিতা-মাতা রামোনকে তাদের মনিবের মতই সম্মান করে। প্রতিবেশীর অ্যাপার্টমেন্টে নাতাঁকে নিয়ে টেলিভিশন দেখতে চলে গেলেন বুড়ো-বুড়ী; যেন পরস্পরকে বিদায় জানাবার জন্যে অখণ্ড অবসর পায় ক্যাটরিনা আর রামোন।
“আপনাকে অনেক মিস করবো।”
ফিসফিস করে উঠল ক্যাটরিনা। পায়ের উপর খসে পড়ল টিউনিকের স্কার্ট। নিজের ছোট্ট রুমটার একমাত্র বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে আহলাদী স্বরে রামোনকে জানালো, “তাড়াতাড়ি ফিরে আসবেন, কিন্তু।”
এয়ারপোর্টে পৌঁছাতে এখনো ঘণ্টাখানেক বাকি আছে। নরম ভেলভেটের মতো মসৃণ দেহতুক স্পর্শ করে মেয়েটাকে উত্তেজিত করে তোলার জন্য তাই যথেষ্ট সময় পাওয়া গেল।
নিঃশেষিত অবসন্ন দেহে, মাথায় এলোমেলো চুল নিয়ে রামোনকে বিদায় জানালো ক্যাটরিনা, “আমার কাছে তাড়াতাড়ি ফিরে আসবেন, প্লিজ!”
রাস্তাতে ট্রাফিক জ্যাম না থাকাতে আধ ঘণ্টারও কম সময়ে এয়ারপোর্টে পৌঁছে গেল রামোন।
সবসময় এত ট্রাভেল করতে হয় যে জেট-ল্যাগ এখন আর টের পায় না। বললেই চলে। কিছুই না খাওয়া আর অ্যালকোহল স্পর্শ না করার নিয়মও মেনে চলে। এছাড়া যে কোনো পরিস্থিতিতেই ঘুমিয়ে পড়ার টেকনিক ও শিখে নিয়েছে। যে মানুষটা ইথিওপিয়ায় বেয়াল্লিশ ডিগ্রি গরমের মাঝে কিংবা মধ্য আমেরিকার রেইনফরেস্টে গায়ের উপর শুয়োপোকা নিয়ে ঘুমিয়ে পড়তে পারে, তার জন্যে ইলুশিন প্যাসেঞ্জার সিটের অত্যাচার কিছুই না।
হাভানা’র জোসে মারতি এয়ারপোর্টে নেমে পুরাতন ডাকোটা’তে চড়ে পৌঁছে গেল সিয়েনফুগোস। অতঃপর পুনরায় এয়ারপোর্টে নেমে ট্যাক্সি ড্রাইভারের সাথে বহুত দর-কষাকষির শেষে ডেট্রয়েট মডেলের ট্যাক্সিতে চড়ে বসল বুয়েনাভেনতারার মিলিটারি ক্যান্টনমেন্টের উদ্দেশ্যে।
পথে পার হয়ে এলো বাহিয়া ডি কোচিনোস্ আর বে অব পিস যুদ্ধের স্মৃতির উদ্দেশ্যে নির্মিত যাদুঘর। আমেরিকান বর্বরগুলোকে হঠানোর ক্ষেত্রে নিজের ভূমিকার কথা স্মরণ করে মনের মাঝে সবসময় সন্তুষ্টি বোধ করে। রামোন।
বিকেলের দিকে বুয়েনে ভেনতারা ক্যাম্পের কাছে এসে নামিয়ে দিল ট্যাক্সি। দিনের কাজ শেষ করে চেগুয়েভার প্যারাট্রুপার রেজিমেন্টের সৈন্যরা সার্চ করে ব্যারাকে ফিরে যাচ্ছে। হাভানা’তে পোলিত বুরোর শেষ মিটিং এর পর থেকে এদেরকে প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে আফ্রিকাতে পাঠানোর জন্য।
এরকম এক ইউনিট পাশ দিয়ে চলে যাবার সময় খানিক দাঁড়িয়ে তাকিয়ে দেখল রামোন। এসব তরুণ তরুণীর মুখে বিপ্লবের একটা গান শুনে মনে পড়ে গেল সিয়েরা মায়েস্ত্রা’র সেসব ভয়ংকর দিনগুলোর কথা। “ভূমিহীনের ভূমি” গানটার কথা শুনে এখনো গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠে। এরপর হেঁটে গিয়ে পাশ দেখলো ম্যারেড অফিসারদের কোয়ার্টারের গেইটে।
রামোন স্পোর্টস শার্ট আর পায়ে খোলা স্যান্ডাল পরে থাকলেও নাম আর। পদবী চিনতে পেরে স্যালুট করল গার্ড। বিরাশি জুন হিরো’র মাঝে একজন হলো এই রামোন মাচাদো। বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ থেকে শুরু করে গানের পাণ্ডুলিপি পর্যন্ত সর্বত্র উচ্চারিত হয় এসকল হিরোদের নাম।
সৈকতের উপরে পাম গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে আছে দুই বেডরুম অলা সারি সারি কর্টেজ। এরই একটাতে থাকে আদ্রা আর নিকি। পামের নিচে এসে আঁচড়ে পড়ে বে অব পিগ’র শান্ত জল।
রামোন একশ কদম দূরে থাকলেও সামনের বারান্দা থেকে চোখ তুলে ওকে ঠিকই দেখতে পেল আদ্রা অলিভারেস।
“ওয়েলকাম কমরেড কর্নেল” আস্তে করে রামোনকে স্বাগত জানালেও দৃষ্টি থেকে ভয় লুকাতে পারল না আদ্রা।
“নিকোলাস কোথায়?”
কংক্রীটের মেঝেতে ধপ করে নিজের কিট ব্যাগটা রেখেই জানতে চাইল রামোন। উত্তরে সৈকতের দিকে তাকাল আদ্রা।
পানির কিনারে খেলা করছে একদল ছেলে-মেয়ে, এতদূর থেকেও শোনা যাচ্ছে ওদের চিৎকার-চেঁচামেচি।
