আর প্রথম সিকিউরিটি চেক পার হল লাল গোলাপ। মেয়েটাকে এখন অনায়াসে ক্লাস থ্রি রেটিং দেয়া যায়। চার বছর ধরে নজরে রাখার পর এবারে ও’কে পুরস্কার দেয়ার সময় হয়েছে।
প্রাইভেট লাইনে ফোন করল ক্যাটরিনা। “কমরেড কর্নেল, ছয় মিনিটের মধ্যে আপনাকে টপ ফ্লোরে যেতে হবে।”
“ধন্যবাদ কমরেড। ডক্যুমেন্ট নষ্ট করা দেখার জন্য নেমে এসো।”
ক্যাটরিনা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখল কাগজ কাটার মেশিন দিয়ে প্রোটিয়া রিপোর্টকে কুচি কুচি করে ফেলল রামোন। তারপর ডে-বুকে কাউন্টার সাইন করে অ্যাটেস্টেড় করে দিল।
টিউনিকের বোম লাগিয়ে ছোট্ট ওয়াল-আয়নাতে নিজের মেডেলগুলো ঠিক করে নিল রামোন।
“গুডলাক্ কমরেড কর্নেল” মুখ উঁচু করে প্রত্যাশা নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল ক্যাটরিনা।
“থ্যাংক ইউ।” মেয়েটাকে না ছুঁয়েই বের হয়ে গেল রামোন। অফিসে কখনোই এমন কিছু করে না মিঃ মাচাদো।
***
দশ মিনিট ধরে উপর তলায় কনফারেন্স রুমে অপেক্ষা করছে রামোন। সাদা দেয়ালের কোথাও কোন প্যানেল নেই; যেন লুকানো মাইক্রোফোনের কোনো সম্ভাবনাই না থাকে। লম্বা কনফারেন্স টেবিলের সাথে ডজন খানেক লাগোয়া চেয়ার থাকলেও ঝাড়া দশ মিনিট ধরেই দাঁড়িয়ে আছে রামোন।
অবশেষে খুলে গেল ডিরেক্টরের সুইটের দরজা। কোর্থ ডিরেকটরেটের হেড জেনারেল ইউরি বোড়োদিনকে রামোন একই সাথে ভয় পায় এবং শ্রদ্ধা করে।
এর পরে যিনি কনফারেন্স রুমে এলেন তিনি আরো বেশি শ্রদ্ধা পাবার যোগ্য। বোয়োদিনের চেয়ে বয়সে ছোট এই লোকটা ডিপার্টমেন্টস অব ফরেন অ্যাফেয়ার্স’র ডেপুটি মিনিস্টার।
রামোনের রিপোর্ট শুনে যতটা আশা করেছিল তার চেয়েও বেশি প্রতিক্রিয়া দেখা গেল সকলের মাঝে। তাকে আমন্ত্রণ করা হয়েছে রাশিয়ার সবচেয়ে প্রভাবশালী একশ মানুষের একজনের সামনে নিজের থিসিস ডিফেন্ড করার জন্য।
আলেক্সেই ইউদিনিচ মানুষটা দেখতে ছোট-খাটো হলেও ভদ্রলোকের রহস্যময় অন্তর্ভেদী দৃষ্টি যেন বুকের ভেতরটাও দেখে নিতে পারে। বোরোদিন দু’জনের পরিচয় করিয়ে দেয়ার সময় রামোনের সাথে হ্যান্ডশেক করে মুহূর্ত খানেক একদৃষ্টিতে তাকিয়ে কী যেন দেখলেন আলেক্সেই। এরপর দু’পাশে সহকারীদেরকে নিয়ে বসে গেলেন টেবিলের একেবারে মাথায়।
“তোমার আইডিয়াগুলো বেশ মহৎ টাইপের, ইয়াংম্যান।” তারুণ্যকে এরা তেমন পাত্তা দেয় না বলেই তো জানে রামোন। “দক্ষিণ আফ্রিকার স্বাধীনতা আন্দোলনে আমাদের লং-স্ট্যান্ডিং সাপোর্টকে তুমি পরিত্যাগ করতে বলছ-শুরু করতে চাইছ স্বশস্ত্র আন্দোলন।
“উইদ রেসপেক্ট, কমরেড ডিরেকটু” খুব সাবধানে উত্তর দিল রোমোন, “এটি আসলে আমার অভিপ্রায় নয়।”
“তার মানে তোমার পেপার আমি ঠিক মতো পড়িনি। তুমি লেখোনি যে, আধুনিক ইতিহাসে এএনসি হলো সবেচেয় অনুৎপাদনশীল গেরিলা অর্গানাইজেশন?”
“আমি এর পেছনের কারণগুলো আর পূর্বের ভুলগুলোকে কিভাবে শোধরানো যায় যেসব পথও তুলে ধরেছি।”
সম্মতি জানিয়ে নিজের রিপোর্টের কপি উল্টালেন ইউদিনিচ, “বলে যাও ব্যাখ্যা করো। দক্ষিণ আফ্রিকাতে তে সশস্ত্র বিপ্লব কেন সফল হবে না, যেমনটা হয়েছে ধরো আলজেরিয়াতে।”
“মৌলিক কিছু পার্থক্য আছে মিনিস্টার। আলজেরিয়াতে বসতি স্থাপনকারীরা সকলেই ফরাসি’ চাইলে নৌকায় করে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ফ্রান্সে চলে যেতে পারে। কিন্তু শ্বেতাঙ্গ আফ্রিকানদের এমন কোনো পথ নেই। আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দেয়ার জন্যে-তাদেরকে যুদ্ধ করতে হবে। আফ্রিকাই তার মাতৃভূমি।”
“হ্যাঁ।” মাথা নাড়লেন ইউদিনিচ।
“বলে যাও।”
“এছাড়াও আলজেরিয়ার এফ.এল.এন গেরিলাদের ধর্ম আর ভাষা একই। জিহাদ করেছে একসাথে। কিন্তু কৃষাঙ্গ আফ্রিকানদের এমন কোনো সামঞ্জস্যতা নেই। তাদের মাঝে ভিন্ন ভিন্ন ভাষা আর গোত্রভিত্তিক শত্রুতা আছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়। এ এনসি’তে বিশেষভাবে ঝোসা উপজাতি আছে অথচ সংখ্যায় এদের চেয়ে বেশি জুলু’রা নেই।”
কোনো বাধা না দিয়েই পনের মিনিট চুপচাপ রামোনের কথা শুনলেন ইউদিনিচ। একবারের জন্যেও ওর মুখের উপর থেকে চোখ সরালেন না। অবশেষে নরম স্বরে জানতে চাইলেন, “তো বিকল্প হিসেবে তুমি কী ভাবছ?”
“বিকল্প নয়।” মাথা নাড়ল রামোন। “সশস্ত্র বিপ্লব চালিয়েই যেতে হবে। অনেক তরুণ আর মেধাবী-রাও এখন এগিয়ে আসছেন যেমন রালেই তাবাকা। এদের কাছ থেকেই ভবিষ্যতে দারুণ সফলতা আসবে। আমি যেটা প্রস্তাব করেছি তা হল লড়াইয়ের পাশাপাশি অর্থনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করা, বয়কট আর বিভিন্ন নীতি মেনে নীতে বাধ্য করা…।”
“দক্ষিণ আফ্রিকার সাথে আমাদের অর্থনৈতিক কোনো যোগাযোগ নেই।” তিরস্কার করে উঠলেন ইউদিনিচ। “আমার প্রস্তাব হলো, এই কাজটা আমাদের জাত-শত্রুরাই করে দিক না কেন। আমেরিকা আর পশ্চিম ইউরোপ দক্ষিণ আফ্রিকার অর্থনীতি ধ্বংস করার জন্য ক্যাম্পেইন করবে। বিপ্লবের বীজ ওরাই বুনে দেবে, আমরা কেবল ফসল তুলব।”
“এ ব্যাপারে তোমার পরামর্শ কী?”
“আপনি তো জানেন যে আমেরিকান ডেমোক্রেটিক পার্টির ভেতরে আমাদের লোক আছে। আমেরিকান মিডিয়াতেও একই অবস্থা। এনএএসিপি আর ট্রান্স আফ্রিকা ফাউন্ডেশনের মতো সংগঠনের উপরেও আমাদের প্রভাব বিশাল। আমরা যেটা করব দক্ষিণ আফ্রিকা আর বর্ণবাদের ইস্যু নিয়ে আমেরিকান বাম দলগুলোকে মাথা ঘামাতে বাধ্য করব। ফলে সেটা ইউনাইটেড স্টেটস অব আমেরিকার রাজনৈতিক ইস্যুই হয়ে যাবে। কৃষাঙ্গ আমেরিকানদের ভোট পাবার জন্য ডেমোক্রেটিক পার্টিও ওদের অনুসরণ করবে। ফলে বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা সাংশন চাপিয়ে দেয়া হলে দক্ষিণ আফ্রিকার অর্থনীতি আর সরকার উভয়েই ভেঙে পড়বে। আর তখন মঞ্চে প্রবেশ করে নিজের সরকারকে ক্ষমতায় বসাতে আমাদের আর কোনো বাধা থাকবে না।
