কাঁচ আর পলিশ করা ব্রোঞ্জেরও অ্যান্টিক লিফটে চড়ে সেকেন্ড ফ্লোরে উঠে এলো রামোন। বিপ্লবের আগে এ বিল্ডিংও ছিল বিদেশি অ্যামব্যাসী। সেখান থেকেই এসেছে লিফট আর ঝাড়বাতিগুলো।
অফিসে ঢুকতেই ডেস্কের পাশে দাঁড়িয়ে গেল সেক্রেটারি।
“গুড মর্নিং, কমরেড, কর্নেল।” দেখতে পেল সারা রাত জেগে চুল ঠিক করে শক্ত পোক্ত কোঁকড়া বানিয়ে ফেলেছে মেয়েটা। খোলা আর মসৃণ থাকলেই বরঞ্চ বেশি ভালোবাসে রামোন। এয়ারফোর্সের মৃত টেস্ট পাইলটের বিধবা পত্নী ক্যাটরিনার বয়স চব্বিশ।
ডেস্কের কোণায় থাকা কার্ডবোর্ডের বাস্কের দিকে নির্দেশ করে মেয়েটা জানতে চাইল, “এটা দিয়ে আমি কী করব কমরেড় কর্নেল?”
ঢাকনা খুলতেই রামোন ভেতরে উঁকি দিয়ে দেখল জেনারেল সিসোরো’র ব্যবহৃত কিছু জিনিস। ডেস্কের ড্রয়ার পরিষ্কার করে ফেলায় এবারে সবকিছু রামোন একাকী ভোগ করতে পারবে।
বক্সে একটা পার্কার বলপেন আর ওয়ালেট ছাড়া আর কোনো পার্সোনাল আইটেম নেই। ওয়ালেটটা তুলে নিল রামোন। খুলতেই দেখল ভেতরে আধ ডজন ছবি। বিখ্যাত আফ্রিকান লীডারদের সাথে পোজ দিয়েছেন জো সিসেরো।
বক্সে ওয়ালেটটা রাখতে গিয়ে ক্যাটরিনার নরম আঙুলের ছোঁয়া লেগে গেল রামোনের হাতে। খানিকটা কেঁপে উঠে নিঃশ্বাস বন্ধ করে বসে রইল মেয়েটা।
“এগুলো সব আর্কাইভে নিয়ে যাও। ওদের কাছ থেকে রশিদ নিয়ে আসবে।”
“এখনি যাচ্ছি” কমরেড কর্নেল।”
রামোন আর এই আকর্ষণীয় মেয়েটার সম্পর্ক মোটামুটি সবাই জানে। বুড়ো বাপ-মা আর তিন বছর বয়সী পুত্র সন্তান থাকলেও ক্যাটরিনার ফ্ল্যাটই ছিল মস্কোতে থাকাকালীন রামোনের আবাস স্থল।
“আপনার ডেস্কে একটা সবুজ রাঙা প্যাকেজও আছে কমরেড কর্নেল।” আজ রাতেই মস্কো ছেড়ে যেতে হবে বলে বিরক্ত হলো রামোন। দুই বছর হয়ে গেলেও ক্যাটরিনার আবেদন এখনো পুরোপুটি-অটুট, অক্ষত।
রামোনের মনের কথা নিশ্চয় টের পেয়ে গেছে মেয়েটা, তাই গলার স্বর নামিয়ে প্রায় ফিসফিস করে জানালো, “যাবার আগে আজ ফ্ল্যাটে খাবেন? মাম্মা বেশ ভালো একটা সসেজ আর ভদকা পেয়েছে।”
“ঠিক আছে; তবে সামান্য” নিজের অফিসে ঢুকে গেল রামোন।
নিজের টিউনিক খুলে ডেস্কে থাকা সবুজ রঙা বাক্সটার সিকিউরিটি সীল ছিঁড়ে ফেলল।
লাল গোলাপ কোড পড়তেই দ্রুত হয়ে গেল হৃদপিণ্ডের গতি। ব্যাপারটাতে নিজেই উপরই যারপরনাই বিরক্ত হলো।
তার নিয়ন্ত্রণে থাকা অন্য শত শত এজেন্টের মতই একজন লাল গোলাপ। কিন্তু বক্স থেকে কোল্ডার তুলতেই চোখের সামনে ভেসে উঠল স্প্যানিশ পাহাড়ি নদীর বুকে কালো পাথরের উপর শুয়ে থাকা এক অনাবৃত নারী দেহের ছবি। দশ্যটা এতটাই স্পষ্ট যে গভীর নীল চোখ জোড়া’ও দেখা যাচ্ছে।
ফাইল খুলতেই দেখা গেল সাউথ আফ্রিকান নেভাল রাডার চেইনের রিপোর্ট। লন্ডন অ্যামবাসী ব্যাগের মাধ্যমে এখানে এসেছে। সন্তুষ্ট চিত্তে মাথা নাড়ল রামোন। সামনে ল বুক খুলে ডিপার্টমেন্টাল ইন্টারকমের হ্যান্ডসেট তুলে ডায়াল করল।
“একটা প্রিন্টআউট। রেফারেন্স প্রোটিয়া, আইটেম নাম্বার-১১৭৮। খুব জরুরি।”
প্রিন্টআউটের জন্যে অপেক্ষা করতে করতে উঠে দাঁড়িয়ে জানালার কাছে গেল রামোন। বাইরের দৃশ্য অত্যন্ত নান্দনিক হলেও বারে বারে মনে পড়ে যাচ্ছে পুরনো স্মৃতি। একই সাথে চিন্তায় এলো মাঝ রাতে শেরিমেতইয়েভো এয়ারপোর্টে শুরু হওয়া ভ্রমণ আর তার শেষে অপেক্ষারত বাচ্চাটার কথা।
দুই মাস কেটে গেছে, নিকোলাসের সাথে ওর দেখা হয়নি। এতদিনে নিশ্চয় আরেকটু বড় হয়ে গেছে। এই বয়সেই ওর শব্দভাণ্ডার যথেষ্ট সমৃদ্ধ। পিতা সুলভ কোনো অনুভূতি মনের মাঝে স্থান দিতে চায় না রামোন। তাই জানালায় দাঁড়িয়ে দিবা-স্বপ্ন দেখারও কোনো মানে হয় না। হাতঘড়ির দিকে তাকাতেই মনে হলো আটচল্লিশ মিনিট পরের মিটিংটা হয়তো আগামী দশকের জন্য ওর ক্যারিয়ারটাকেই বদলে দেবে।
ডেস্কের কাছে ফিরে এসে উপরের ড্রয়ার থেকে মিটিং’র জন্য প্রস্তুত করে রাখা নোট বের করল।” পাতা উল্টাতে গিয়ে মনে হলো সময় নষ্ট হবে। কেননা প্রতি শব্দ এরই মাঝে আত্মস্থ হয়ে গেছে। বার বার রিভাইস দিলে বরঞ্চ স্বতস্ফূর্ততা নষ্ট হবে। একপাশে সরিয়ে রেখে দিল রির্পোট।
দরজায় নক হতে ঘুরে তাকাল রামোন। রেকর্ডস ক্লার্ককে নিয়ে এসেছে ক্যাটরিনা। রেডকস্ বুকে সাইন করে দিল রামোন। ক্যাটরিনা আর ক্লার্ক বের হয়ে যেতেই খাম ছিঁড়ে প্রিন্টআউট বের করে ডেস্কের উপর রাখল।
প্রোটিয়া নামে আরেক জন সাউথ আফ্রিকান এজেন্ট আছে। জার্মান নাগরিক এই প্রোটিয়ার আসল নাম ডায়েটার রিনহাউট। বার্লিন ওয়াল থেকে পশ্চিমে পালিয়ে আসার সময় প্রোটিয়াকে পুরো সাহায্য করেছেন জো সিসেরো। ১৯৬০ সালে সাউথ আফ্রিকাতে অভিবাসন হিসেবে ঢোকার কিছুদিন পর নাগরিক বনে যাওয়া ডায়েটার এখন সিলভার মাইন কমান্ড বাঙ্কারের চিফ অব সিগনলস।
ক্লার্কের এনে দেয়া প্রিন্টআউট ‘রা তিন সপ্তাহ আগে প্রোটিয়া পঠিয়েছে; রোডার চেইনের উপর আসা লাল গোলাপের রিপোর্ট নিয়ে এবারে দুটোর তুলনা করল রামোন। মিলিয়ে দেখল লাইনের পর লাইন। দশ মিনিট পরেই সন্তুষ্টির হাসি ফুটল চেহারাতে। ফাইল দুটি হুবহু একই রকম।
ক্লাস ওয়ান রেটেড প্রোটিয়ার বিশ্বস্ততা দশক আগে থেকেই বহুবার প্রমাণিত হয়েছে।
