***
উত্তুরে হাওয়া বইছে চারপাশে। ধূসর রঙা আকাশ থেকে ঝড়ে পড়ছে রুপালি তুষার কণা।
সমাধি ক্ষেত্রে ডজনখানেক পুরুষ দাঁড়িয়ে থাকলেও নেই কোনো নারী। এখনকার মতো বেঁচে থাকা কালীনও জো সিসেবোর জীবন ছিল নারীশূন্য। জো সিসেরোর কোনো বন্ধুও ছিল না। সবাই তাকে হয় ভয় পেত, নতুবা শ্রদ্ধা করত।
রাইফেল আকাশের দিকে তুলে মৃতদেহের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এগিয়ে এলো গার্ডের দল।
শোক প্রকাশের জন্য আসা অফিসাররা এতক্ষণ সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে ছিল। এবারে গার্ডের দল অস্ত্র কাঁধে নিয়ে ফিরে যেতেই একে অন্যের সাথে হ্যান্ডশেক করে গাড়িতে ফিরে গেল সকলে।
রয়ে গেল কেবল একজন। রামোন মাচাদো। কেজিবি কর্নেলের ফুল ইউনিফর্মের নিচে মাথায় ঘুরছে কয়েকটা লাইন, “এতদিনে তোমার খেলা ফুরোল বুড়ো শূয়োর, কিন্তু বড় দেরি করে ফেললে।” দুই বছর আগে থেকেই সেকশন হেড হলেও জো সিসেরো বেঁচে থাকাকালীন পদবীটা কখনোই পুরোপুরি উপভোগ করতে পারেনি রামোন।
বীরত্বের সাথে মারা গেছে বুড়োটা। বহু মাস ঠেকিয়ে রেখে ছিল ক্যান্সারকে। এমনকি শেষ দিনও অফিসে এসেছেন। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত জ্বালিয়ে গেছেন রামোনকে।
“গুডবাই জো সিসেরো। এবার শয়তান তোমাকে মজা দেখাবে।”
হেসে ফেলল রামোন। ঠাণ্ডায় ঠোঁট জোড়া মনে হল ফেটেই যাবে।
অপেক্ষমাণ শেষ গাড়িটাতে এসে চড়ে বসল রামোন। পদাধিকার বলে কালো চাইকা আর কর্পোরাল ড্রাইভারও পাচ্ছে। ড্রাইভার দরজা খুলে দিতেই ব্যাক সিটে বসে কাঁধ থেকে তুষার কণা ঝেড়ে ফেলল রামোন।
“ব্যাক টু দ্য অফিস।”
মস্কো’কে ভালবাসে রামোন। ভালবাসে জোসেফ স্ট্যালিনের বানানো চওড়া বুলেভাদগুলোকে। উত্তেজিত হয়ে উঠে সোভিয়েত বিশালতা দেখে।
কোথাও কোন ধরনের বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন নেই। কোকাকোলা, মার্লবোরো। ইনস্যুরেন্স কিংবা সান।
চাইকার ব্যাকসিট থেকে রাস্তায় রাশান জনগণকে দেখে একধরনের আত্মতৃপ্তি বোধ করল রামোন। এরা প্রত্যেকেই রাষ্ট্রের উন্নতির কথা ভাবে, ব্যক্তির কথা নয়। ধৈর্য ধরে বাধ্য হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে বাস স্টপে, খাবারের সারিতে।
মনে মনে এদের সাথে আমেরিকানদের তুলনা করে দেখল। সেখানে সারাক্ষণ একে অন্যের পেছনে লেগে থাকে। লালসা যেখানে সর্বশ্রেষ্ঠ গুণ আর ধৈর্য হল সর্বনিকৃষ্ট। ইতিহাসে আর কোনো জাতি কি আছে যারা গণতন্ত্রের আদর্শকে এমন এক জায়গায় নিয়ে গেছে যেখানে ব্যক্তির স্বাধীনতা আর অধিকার রক্ষা মানে হল বাকি সমাজকে অবজ্ঞা করা? এমন কোনো জাতি আছে যেখানে আছে বনি অ্যান্ডক্লাইড, আল-কাঁপোন, বিলি দ্য কিড, মাফিয়া আর ব্ল্যাক ড্রাগ লর্ডদের মতো অপরাধী?
ট্রাফিক লাইট দেখে থেমে গেল চাইকা।
দুটো পাবলিক বাস ব্যতীত এটাই রাস্তায় একমাত্র গাড়ি। প্রতিটি আমেরিকানের নিজস্ব অটোমোবাইল থাকে; কিন্তু রাশান সমাজে অর্থকে এভাবে খোলামকুচির মতো ছিটানো হয় না। গাড়ির সামনে দিয়ে সারিবদ্ধভাবে চলে যাওয়া পথচারীদের দিকে তাকাল রামোন, সুদর্শন আর বুদ্ধিদীপ্ত মুখগুলোতে ধৈর্য আর সহিষ্ণুতার ছাপ। পোশাক নিয়ে আমেরিকান রাস্তার মতো বন্য উন্মাদনা চোখে পড়ল না। মিলিটারি ইউনিফর্ম বিনা নারী-পুরুষ সকলেরই পোশাক বেশ মার্জিত আর রুচিসম্পন্ন।
এহেন শিক্ষিত আর বিদ্বানদের তুলনায় আমেরিকানগুলো তো অশিক্ষিত গোঁয়ার। রাশান খামারে কাজ করা যেসব শ্রমিক, তারাও পুশকিন থেকে উদ্ধৃতি দিতে পারবে। ব্ল্যাক মার্কেটে সবচেয়ে বেশি খোঁজা হয় এসব বস্তুগুলোর মাঝে ক্লাসিক বইও আছে। লেলিনগ্রাডের আলেকজান্ডার নেভস্কি সমাধিক্ষেত্রে গেলেই দেখা যায় দেস্তরভস্কি আর চাইকোভস্কির সমাধি সাধারণ মানুষের দেয়া তাজা ফুলে ছেয়ে আছে। এর তুলনায় আমেরিকানদের অর্ধেক গ্র্যাজুয়েট বিশেষ করে কালোরা ব্যাটমান কমিকু বুক’ই ভালো করে পড়তে পারে না।
এমনকি রাশান অর্থনীতিও পশ্চিমাদের চোখে ধোয়াশা ছাড়া আর কিছুই নয়। খাবারের সারিতে দীর্ঘ লাইন আর দানবীয় জি ইউ এম ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে কনস্যুমার গুডসের অভাব দেখে আমেরিকানরা ভাবে ব্যর্থ হয়ে পড়েছে পুরো সিস্টেম। অথচ তাদের চোখে পড়েনি-সামরিক উৎপাদন মেশিনের গোপন অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি। আমেরিকান পুঁজিবাদী প্রতিদ্বন্দ্বীকে যা বহু আগেই পিছনে ফেলে গেছে।
তেমনভাবে রামোন এও জানে যে রাশান সামারিক বাহিনীর উচ্চ পর্যায়ে প্রত্যাখ্যান হবার কিংবা “সমান অধিকারের” নামে শিফটিং হবার কোনো সুযোগ নেই। এখানে শুধু সর্বশ্রেষ্ঠরাই থাকে; সে নিজে যেমন একজন, সর্বশ্রেষ্ঠ একজন।
ঝরঝিনস্কি স্কোয়ারে চাইকা পৌঁছাতেই নিজের আসনে সিধে হয়ে বসল রামোন।
পাহাড়ি পথ বেয়ে লুবিয়াঙ্কা’র দিকে এগিয়ে চলল গাড়ি।
অন্যান্য কেজিবি ভেহিকেলগুলোর সারিতে নিজেদের জন্য বরাদ্দকৃত অংশে গাড়ি থামাল ড্রাইভার। দরজা খুলে দেয়ার জন্য অপেক্ষা করল রামোন। তারপর বিশাল কাস্ট আয়রনের গ্রিলের দরজা খুলে দালানের ভেতর ঢুকে গেল।
সামনের সিকিউরিটি ডেস্কে আরো দু’জন কেজিবি অফিসার আছে। অপেক্ষা করল ক্লিয়ারেন্সের জন্যে নিজের টার্ন আসার। সিকিউরিটি গার্ডের ক্যাপটেন ব্যাটা মহা শয়তান। রেজিস্টারে সাইন করতে দেয়ার আগে তিনবার রামোনের চেহারা মিলিয়ে দেখল আইডেনটিটি ডকুমেন্টের ছবি’র সাথে।
