বাবা’র পার্সোনাল সেফে রাখতে গিয়ে ফলস্ বুককেস সরিয়ে ফেলল বেলা। বুককেসের উপরে থাকা বাম্বের ব্রাকেটের সাথে লাগানো আছে এর হুড়কো। ব্রাকেটটা ঘোরাতেই ফলস বুককে খানিকটা সরে গেল।
শাসা নিজে ছাড়া এর কম্বিবেশন আর জানে একমাত্র বেলা; নানা কিংবা গ্যারি’ও জানে না।
কম্বিনেশন সেট করে ভারি স্টিলের দরজাটা খুলে ভেতরে পা রাখল বেলা। রুমটাকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য প্রায়ই বাবার সাথে চিৎকার করে। আর এখন তো দেখে হযবরল অবস্থা। দুটো সবুজ আর্মসকোর ফাইল স্তূপ হয়ে আছে মাঝখানের টেবিলের উপর। তাড়াতাড়ি সবকিছু গুছিয়ে সে হাউজ লক করে লেডিস ওয়াশরুম ঘুরে এলো বেলা।
এরপর মিনি’তে বসে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল, এত ক্লান্তিকর একটা দিন কাটালেও রক্ষে নেই। ডিনারের পর ইলেকশন মিটিং আছে। মাঝরাত পার হয়ে যাবে বিছানায় যেতে যেতে।
একবার ভাবল শর্টকাট ধরে ওয়েল্টেভ্রেদেনে ফিরে যাবে। কিন্তু গাড়িটা মনে হল কোনো এক অদৃশ্য শক্তির টানে চলে এলো ক্যাম্পস বে পোস্ট অফিসে।
প্রতিবারের মতো এবারেও পেটের মাঝে পা দিয়ে উঠল; বক্সের সামনে এসে দাঁড়াতেই মনে হল আজও শূন্যই দেখবে? কতদিন নিকি’র কোনো খবর পায় না।
কিন্তু বাক্সটা খুলতেই মনে হল বুকের ভেতর লাফ দিল হৃদপিণ্ড। চোরের মতো ছোঁ মেরে চিকন খামটা তুলে নিয়েই চালান করে দিল জ্যাকেটের পকেটে।
অভ্যাস মতো সৈকতের উপরে গাড়ি পার্ক করে খাম খুলে পড়ে ফেলল চার লাইনের টাইপ করা নির্দেশিকা।
নতুন কাজ দেয়া হয়েছে।
অর্ডার মুখস্থ করেই চিঠিটা পুড়ে ছাই বানিয়ে ফেলল বেলা।
***
লাল গোলাপের চিঠি পাবার তিন দিন পর শুক্রবার সকালবেলা ক্লেয়ারমেন্টের নতুন পি এন পে সুপারমার্কেটের সামনে মিনি পার্ক করল ইসাবেলা।
ড্রাইভারের দরজা বন্ধ করলেও নির্দেশ মতো ইঞ্চিখানেক ভোলা রাখল।
দ্রুত সামনের রাস্তা ধরে হেঁটে গিয়ে বাম দিকে মোড় দিল বেলা। ভিড় ঠেলে পৌঁছে গেল নতুন পোস্ট অফিসে।
বামদিকের প্রথম পাবলিক টেলিফোন বুথের কাঁচের কিউবিকলে কথা বলছে এক জোড়া কিশোরী।
ঘড়িতে সময় দেখল বেলা। এক ঘণ্টা হতে পাঁচ মিনিট বাকি। দুঃশ্চিন্তা হচ্ছে খুব।
কাঁচের দরজায় নক করল বেলা। অসম্ভব বিরক্ত হয়ে রিসিভার নামিয়ে রেখে বের হয়ে এলো মেয়ে দুটো। তাড়াহুড়া করে ভেতরে ঢুকে দরজা আটকে দিল বেলা।
রিসিভার না তুলেই পার্সের ভেতর কিছু খোঁজার ভান করল। চোখ কিন্তু হাতঘড়ির দিকে। বারোটার ঘরে কাটা যেতেই বেজে উঠল টেলিফোন।
“লাল গোলাপ” এক নিঃশ্বাসে ফিসফিস করতেই শুনতে পেল, “এখনি গাড়ির কাছে ফিরে যাও।” কেটে গেল কানেকশন। মানসিক এক অস্থিরতার মাঝেও, প্রায় তিন বছর আগে টেমস্ নদীর তীরে তাকে গাড়িতে তুলে নেয়া বিশালদেহী সেই নারীর ভারি কণ্ঠস্বর চিনতে পারল বেলা।
ক্রেডল রিসিভার রেখেই বুথ থেকে বেরিয়ে এলো বেলা। তিন মিনিটে পৌঁছে গেল কারপার্কে। চাবি ঢুকিয়ে গাড়ির দরজা খুলতেই দেখা গেল ড্রাইভারের সিটের উপর খাম পড়ে আছে।
কারপার্কের চারপাশে দ্রুত একবার চোখ বোলাল বেলা। নিশ্চিতভাবেই জানে যে, কেউ একজন তার উপর নজর রেখেছে। কিন্তু শপিং ট্রলি ঠেলতে থাকা ক্রেতার দল, ভিখারি আর স্কুল ফেরত অলস ছেলে-মেয়ের ভিড়ের মাঝে তাকে খুঁজে পাবার কোন উপায় নেই। তাই গাড়িতে উঠে সাবধানে ওয়েল্টেভ্রেদেনে ফিরে এলো বেলা। চিঠিটা নিশ্চয়ই এতটা গুরুত্পূর্ণ যে পোস্টাল সার্ভিসকেও ভরসা করা যায়নি। নিজের বেডরুমের নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তার মাঝে বসে খামটাকে খুলে ফেলল।
সবার প্রথমে চোখে পড়ল নিকির একেবারে লেটেস্ট রঙিন একটা ছবি। প্রায় তিন বছর বয়সী নিকি বাথিং ট্রাংকস্ পড়ে, পেছনে সমুদ্র নিয়ে দাঁড়িয়ে সৈকতের সাদা বালির উপর।
ছবির সাথে আসা চিঠির লেখাগুলো যেন দৈব বাণী :
“যত দ্রুত সম্ভব কেপ পোনিনসুলাতে সিলভার মাইন নেভাল হেডকোয়াটার’স এর উপর লাগানো সিমেন্স কম্পিউটার লিঙ্কড কোস্টাল রাডার সম্পর্কে জানার চেষ্টা করো।
পুরো পরিকল্পনা আমাদেরকে ডেলিভারী দেয়ার পরপরই ছেলের সাথে প্রথমবারের মতো দেখা করার সুযোগ পাবে।”
কোনো সিগনেচার নেই স্পষ্ট ভাষায় লেখা চিঠিতে।
বাথরুমের টয়লেটের বোলের ভেতরে চিঠিটা পুড়িয়ে ছাই ফেলে দিল বেলা। কাজ শেষ করে টয়লেট কাভারের উপর বসে তাকিয়ে রইল বিপরীত দিকের টাইলস করা দেয়ালের দিকে।
অবশেষে এলো সেই কাজ জানত যে কখনো না কখনো আসবেই। তিন বছর অপেক্ষার পর এবার এলো বিশ্বাসঘাতকতার পালা।
ফেরার আর কোনো পথ নেই। চাইলে এখনো পরিত্যাগ করতে পারে ছেলের আশা অথবা এগিয়ে যেতে পারে বিপদজনক অনিশ্চিতের দিকে।
“ওহ ঈশ্বর! আমাকে সাহায্য করো।” জোরে জোরে চিৎকার করে উঠল। বেলা, “এখন আমি কী করব?”
বুঝতে পারছে ভয়ংকর এক অপরাধবোধ সাপের মতো। ফেলছে; তারপরেও প্রশ্নের উত্তরটা ঠিকই জানে।
এই মুহূর্তে সেনটেইন হাউজের বাবা’র সেফ রুমে পড়ে আছে সিমেন্স রাডার ইনস্টলেশন রিপোর্টের কপি। সোমবারের মধ্যেই ফাইলটাকে পাঠিয়ে দেয়া হবে সিলভার মাইন মাউন্টেলের নিউক্লিয়ার প্রুফ বাঙ্কারে।
যাই হোক, আনন্দের সংবাদ হচ্ছে ছুটি কাটাতে বাবা ক্যামডি শীপ র্যাঞ্চে যাবে। কাজের কথা বলে এরই মাঝে এড়িয়ে গেছে বেলা। গ্যারি ইউরোপে আর নানা গান-ডগ ট্রায়ালনিয়ে ব্যস্ত। তাই সেনটেইন হাউজের পুরো টপ্ ফ্লোর বেলা’র জন্য খালি পড়ে থাকবে।
