“আপনাকে এক কাপ কফি দেব মিসেস কোর্টনি?” মহিলার ভুল ভাঙ্গালো না বেলা।
পনের মিনিট পরে মহিলার সাথে হ্যান্ডশেক করে বের হয়ে এলো ছোট্ট বাগান থেকে। নানা’র কথা মতই কাজ করেছে : “চাপ দেবে কিন্তু সংক্ষেপে।”।
মনে হচ্ছে, জিতে গেছে। প্রথমে “না” বললেও ধীরে ধীরে “হয়ত” তে নেমে এসেছে মহিলা।
রাস্তা পেরিয়ে এগারো নাম্বার দরজার কাছে আসতেই খুলে দিল ছোট্ট একটা ছেলে।
“তোমার মা বাসায় আছেন?”
জ্যাম লাগানো আধখানা পাউরুটি এক হাতে নিয়ে, ইসাবেলাকে দেখে লাজুক হাসি হাসল সোনালি কোঁকড়া চুলঅলা ছেলেটা।
নিকি’র কথা মনে পড়তেই শক্ত হয়ে গেল বেলা।
“আমি ইসাবেলা কোর্টনি, আগামী মাসের বাই ইলেকশনে ন্যাশনাল পাটি ক্যান্ডিডেট। এরই মাঝে দরজার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে বাচ্চাটার মা।
তিন নম্বর ঘর শেষ হবার পর অবাক হয়ে আপন মনেই নিজের আনন্দ অনুভব করল বেলা। বেশ মজা তো! জীবনের এমন একটা দিক দেখছে যার অস্তিত্ব সম্পর্কে তার কোনো ধারণাই ছিল না। সাধারণ সব কথাবার্তার মাধ্যমেই বুঝতে পারছে ওদের সমস্যা আর ভয়গুলো। কী করা যায় ভেবে এরই মাঝে চিন্তায় পড়ে গেছে।
বাবা প্রায়ই একটা কথা বলেন, “ক্ষমতাবানদের দায়িত্বও বেশি।” কথাটা বুঝতে পারলেও কখনো তেমন করে ভাবেনি বেলা। ব্যস্ত ছিল নিজের জগৎ, আশা-আকাঙ্ক্ষা নিয়ে।
আর এখন মেশার পর অনুভব করছে সত্যিকারের এক সহানুভূতি আর ওদের নিরাপত্তা দেয়ার এক আত্মিক টান।
মা হবার ফলেই হয়ত এ পরিবর্তন এসেছে; ভাবনাটা মাথায় আসতেই মনে হল সে এদেরকে সত্যিকার অর্থে সাহায্য করতে চায়।
খানিকটা বিরক্ত লাগল, যখন আট নম্বর ঘর ভিজিট করার পর হাত ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল নানার সাথে দেখা করার সময় হয়ে গেছে।
রাস্তার কোণায় নাতনীর জন্য অপেক্ষা করছিলেন নানা।
যে কোনো তরুণীর মতই সতেজ আর প্রাণশক্তিতে ভরপুর নানা বেলাকে দেখেই জানতে চাইলেন, “কেমন কাটল দিন? কয়টা সাড়া পেয়েছ?”
“আট।” সন্তুষ্ট চিত্তে উত্তর দিল বেলা।”দুটো-ইয়েস আর একটা-হয়ত। তোমার কী খবর?”
“চৌদ্দটার মাঝে পাঁচটাতে ইয়েস। হয়ত কিংবা হতে পারে’কে আমি কখনো গণনায় ধরি না।”
হলুদ ডেইমলার এগিয়ে এসে গতি ধীর করতেই গাড়িতে উঠে বসল দু’জনে।
“এবার কাজ হলো, ঘরে ফেরার পরেই প্রত্যেককে নিজ হাতে নোট লিখে পাঠিয়ে দেবে। বাচ্চাদের নাম, বয়স, কিছু ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য নোট করে এনেছ না?”
“প্রত্যেককেই লিখতে হবে?”
“হ্যাঁ, সবাইকে। হ্যাঁ, না, হয়ত, প্রত্যেককে। এরপর নির্বাচনের আগে আরেকবার মনে করিয়ে দেবে নোট পাঠিয়ে, ঠিক আছে?”
“এত কাজ করতে হবে, নানা?” প্রতিবাদ করতে চাইল বেলা।
“পরিশ্রম বিনা কিছুই অর্জন করতে পারবে না, ডিয়ার।” ক্রীম রঙা চামড়ায় সোফায় আরাম করে বসে আরও জানালেন, আজ সন্ধ্যায় মিটিং’র কথা মনে আছে না? বক্তৃতা লিখে ফেলেছ? কী বলবে সব ঠিক করে নাও। একসাথে যাবো দুজনে।”
“নানা, বাবা’র এখনো একগাদা কাজ জমে আছে আমার হাতে।”
“এসব বাতিল করে দাও।”
সেক্রেটারিকে দিয়ে প্রত্যেক ভোটারের জন্য নোট টাইপ করিয়ে নিজের হাতে চেক করে সাইন করে দিল বেলা।
***
সেনটেইন হাউজের কোণার একটা স্যুইট বেলা’কে অফিস হিসেবে ব্যবহারের জন্য দিয়েছেন শাসা। বেলা’র নতুন সেক্রেটারি গত বিশ বছর ধরে কোর্টনি এন্টারপ্রাইজে কাজ করছে। ইসাবেলা’র ইনার অফিস সাজানো হয়েছে দুইশ বছরের পুরাতন একটা বিল্ডিং থেকে খুলে আনা কাঠের প্যানেল দিয়ে। উজ্জ্বল মাখন রঙা কাঠের কাজ ছাড়াও শাসা মেয়েকে কানেকশন থেকে চারটা পেইন্টিংস দিয়েছেন। পিয়ারনিফ আর হুগো নড়ের আঁকা।
স্যুইটের জানালা দিয়ে তাকালেই চোখে পড়ে পার্ক আর সেন্ট জর্জ ক্যাথেড্রাল। বহুদূরের টেবল মাউন্টেনও অস্পষ্টভাবে দেখা যায়।
সবশেষ চিঠিটাতে সাইন করেই সেক্রেটারি’র অফিসে গেল বেলা। দেখা গেল শূন্য অফিসে কেউ নেই। হাত ঘড়িতে সময় দেখেই আঁতকে উঠল, “ওহ্ ঈশ্বর! এরই মাঝে পাঁচটার বেশি বাজে।”
নিকি’কে হারাবার পর থেকে এত দ্রুত সময় আর কখনো যায়নি। কঠোর পরিশ্রম করেই নিজের দুঃখ ভুলে থাকে বেলা।
ওয়েল্টেভ্রদেনে ডিনার হয় সাড়ে আটটায়, আধ ঘণ্টা আগে ককটেল। সময় আছে এখনো, তাই আবারো নিজের ডেস্কে ফিরে এসে দেখল ড্রাফট কফি রেখে গেছেন বাবা। উপরে নোট : “কাল সকালেই এটা ফেরৎ চাই। লাভ ইউ, বাবা।”
অ্যামব্যাসিতে থাকার সময় থেকেই বাবার লিখিত বক্তব্য কিংবা রিপোর্ট চেক করে দেয় বেলা। এ সাহায্যটুকু শাসা’র না হলেও চলে। তারপরও পিতা কন্যা দুজনেই আনন্দ পায় এ কাজটুকু করতে।
বারো পাতার রিপোর্টটা খুব সাবধানে চেক করে একটা মাত্র পরিবর্তনের সুপারিশ করে নোট লিখল বেলা : “আমার বাবা’টা কত বুদ্ধিমান!” জানে মেয়ের প্রশংসা বেশ উপভোগ করেন শাসা।
বাবা’র অফিস লক করা থাকলেও নিজের কাছে থাকা চাবি দিয়ে তালা খুলে ভেতরে ঢুকে পড়ল বেলা।
বাবার এই অফিস তার নিজের অফিসের চেয়েও চারগুণ বেশি বড় আর
ভার্সেইলেসের ডফিন অ্যাপার্টমেন্ট থেকে লিনামে কেনা ১৭৯১ সালের ডেস্কের উপর রিপোর্টটাকে রাখতে গিয়েও থেমে গেল বেলা। দেশের নিরাপত্তার সাথে জড়িত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এ ফাইলটা এভাবে ভোলা রাখা ঠিক হবে না।
