“ভুলে যাবেন না আমি একজন সাংবাদিক। প্রশ্ন আমার হাড়-মজ্জায় মিশে গেছে।” পরিবেশ হালকা করতে চাইল মাইকেল
“ঠিক আছে। যে নারীর সাথে এখন আপনার দেখা হবে তার জন্য এই বাড়ি বানিয়ে দিয়েছে ট্রান্স আফ্রিকা ফাউন্ডেশন অব আমেরিকা।”
“ট্রান্স আফ্রিকা-আমেরিকান সিভিল রাইটস গ্রুপ?” সবিস্ময়ে জানতে চাইল মাইকেল, “এটি কি শিকাগোর কৃষাঙ্গ ইভানজেলিস্ট ধর্মেপ্রচারক ডা. রোন্ডাল চালান?”– “আপনি তো সব খবরই রাখেন। মাইকেলের হাত ধরে খোলা আঙ্গিনাতে নিয়ে গেলেন তাবাকা।
“না হলেও এর মূল্য অর্ধ মিলিয়ন ডলারস।” মাইকেলের প্রশ্ন শুনে কাঁধ আঁকিয়ে প্রসঙ্গ বদল করলেন রালেই, “আমি আপনাকে বর্ণবাদের সন্তানদেরকে দেখানোর প্রতিজ্ঞা করেছিলাম মাইকেল; কিন্তু তার আগে চলুন জাতির মাতা’র সাথে দেখা করি।”
উজ্জ্বল রঙা মাশরুমের মতো চারপাশে ছড়িয়ে আছে বীচ আমবেলা। সাদা প্লাস্টিকের টেবিলের চারপাশে বসে কোকাকোলা খেতে খেতে ট্রানজিস্টর থেকে জ্যাজ মিউজিক শুনছে আট থেকে নয় বছর বয়সী ডজনখানেক কৃষাঙ্গ ছেলে। সকলেরই গায়ের হলুদ রঙা টি-শার্টের বুকে গামা অ্যাথলেটিক ক্লাব” লেখা। মাইকেলকে দেখে কেউই উঠে না দাঁড়ালেও কৌতূহলী দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে রইল।
মূল দালানের কাঁচের দরজা খুলে মাইকেলকে লিভিং রুমে নিয়ে গেলেন তাবাকা। দেয়ালে কারুকার্য করা কাঠের মুখোশ, পাথরের মেঝেতে পশুর চামড়া দিয়ে তৈরি কার্পেট।
“কোন ড্রিংক নেবেন মাইকেল? কফি অথবা চা?”
মাথা নাড়ল মাইকেল। “না; কিন্তু সিগারেট খেলে কিছু মনে করবেন?”
“আপনার অভ্যাস আমার মনে আছে।” হেসে ফেললেন তাবাকা। “ঠিক আছে; কিন্তু দুঃখিত কোনো দিয়াশলাই দিতে পারব না।”
হাতে লাইটার নিয়ে বড়সড় রুমটার উপরের দিকে তাকালো মাইকেল।
সিঁড়ি বেয়ে তাদের দিকে এগিয়ে আসছেন এক নারী। ঠোঁট থেকে সিগারেট নামিয়ে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল মাইকেল। খুব ভালো করেই চেনে এ মুখ। ব্ল্যাক ইভিটা, জাতির মাতা নামেই সকলে তাঁকে চেনে। যাই হোক এই নারীর দৈহিক সৌন্দর্য আর রাজকীয় উপস্থিতি ফুটিয়ে তোলার সাধ্য কোনো ফটোগ্রাফের নেই।
“ভিক্টোরিয়া গামা” পরিচয় করিয়ে দিলেন তাকা, “ইনি মাইকেল কোর্টনি, যার কথা তোমাকে বলেছিলাম।”
“ইয়েস” সায় দিলেন ভিকি গামা। “আমি মাইকেল কোর্টনিকে ভালোভাবেই চিনি।”
স্থির আত্মপ্রত্যয় নিয়ে মাইকেলের কাছে এগিয়ে এলেন ভিক্টোরিয়া। পরনে নিষিদ্ধ ঘোষিত আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসের উজ্জ্বল সবুজ, হলুদ আর কালো কাফতান; মাথায় জড়ানো পান্না সবুজ পাগড়ি; উনার ট্রেডমার্ক’ই হলো এই পাগড়ি আর কাফতান।
মাইকেলের দিকে বাড়িয়ে দিলেন গাঢ় বাদামি রঙা হাত, দেহত্বক ঠিক ভেলভেটের মতই মসৃণ।
“আপনার মা আমার স্বামীর দ্বিতীয় পত্নী ছিলেন।” নরম স্বরে মাইকেলকে জানালেন ভিকি। “আমার মতই তিনিও মোজেস গামা’কে পুত্র সন্তান উপহার দিয়েছেন। আপনার মা সত্যিই অসাধারণ, আমাদেরই একজন।”
“কেমন আছেন তারা?” মাইকেলকে সোফার কাছে নিয়ে যাবার পর বসতে বসতে জানতে চাইরৈন ভিকি গামা, “বহু বছর দেখা হয়নি উনার সাথে। এখনো ইংল্যান্ডেই আছেন? আর মোজেসের পুত্র-বেনজামিন?”
“হ্যাঁ, ওরা এখনো লন্ডনে থাকে।” জানাল মাইকেল। “এই তো কয়েকদিন আগেও আমার সাথে দেখা হয়েছিল। বেনজামিন তো বেশ বড় হয়ে গেছে। লিড বিশ্ববিদ্যালয়ে কেমিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে।
“ইস যদি কখনো আবার আফ্রিকাতে ফিরে আসত”? বেশ সহজ স্বাভাবিকভাবে খানিকক্ষণ গল্প করলেন দুজনে। অবশেষে জানতে চাইলেন,
“তো আপনি আমার সন্তানদেরকে দেখতে চেয়েছেন? বণর্বাদের সন্তানদেরকে?”
ভীষণ রকমভাবে কেঁপে উঠল মাইকেল। নিজের আটিকেলের জন্য ঠিক এই টাইটেলটাই ভেবে রেখেছে মনে মনে।
“ইয়েস, মিসেস গামা, আমি আপনার সন্তানদের সাথে দেখা করতে চাই।”
“প্লিজ আমাকে ভিকি নামে ডাকবেন। আমরা একই পরিবারের মাইকেল। আশা করছি আমাদের স্বপ্ন আর প্রত্যাশাগুলোও একই?”
“হ্যাঁ, অনেক বিষয়েই আমাদের বেশ মিল, ভিকি।”
আবারো মাইকেলকে সঙ্গে নিয়ে খোলা চত্বরে চলে এলেন ভিকি গামা। চারপাশের ছেলেদেরকে পরিচয় করিয়ে দিলেন মাইকেলের সাথে।
“উনি আমাদের বন্ধু। তাই সহজভাবে সবকিছু খুলে বলবে, যা যা জানতে চাইবেন সবকিছুর উত্তর দিবে।” সংক্ষিপ্ত নির্দেশও দিয়ে দিলেন ভিকি।
নিজের জ্যাকেট আর টাই ছুঁড়ে ফেলে একটা ছাতার নিচে বসে পড়ল মাইকেল। চারপাশ ঘিরে ধরল ছেলেরা। মাইকেলের মুখে নিজেদের ভাষা শুনে অভিভূত ছেলেগুলো কলকল স্বরে কথা বলতে লাগল; কোনো রকম নোটপ্যাড ব্যবহার করারও প্রয়োজন বোধ করল না মাইকেল জানে কখনোই ভুলবে না এসব শব্দ; তরুণ কণ্ঠ।
কারো কারো গল্প বেশ মজার। কারোটা ভয়াবহ বেদনার। শার্শভিলের সেই দিনে শিশু অবস্থায় মায়ের পিঠের সাথে বাধা ছিল একটা ছেলে। মায়ের বুক ভেদ করে চলে যাওয়া বুলেটটা ওর এক পাও গুঁড়িয়ে দিয়ে গেছে। অন্যরা ওকে “খোঁড়া পিট” বলে ক্ষ্যাপায়। শুনতে শুনতে মনে হল কেঁদে ফেলবে মাইকেল।
চোখের পলকে কেটে গেল পুরো বিকেল। ছেলেদের কেউ কেউ উলঙ্গ হয়ে পুলে নেমে গেল সাঁতার কাটতে।
ভিকি গামার পাশে বসে পুরো দৃশ্যই দেখলেন রালেই তাবাকা। মাইকেলের অবস্থা দেখে ভিকিকে জানালেন, “উনাকে আজ রাতে এখানেই রেখে দাও।” মাথা নাড়লেন ভিকি। রালেই বলে চললেন, “উনি ছেলে পছন্দ করেন। কেউ আছে নাকি?”
